চৌবাড়ীয়ায় ঘুমিয়ে আছেন শহীদ যোবায়ের

জাহিদ হাসান

তাকে দেখিনি কোনদিন তবুও তিনি আমার আপন। তার ভালোবাসা পাওয়ার সুযোগ হয়নি কোনদিন তবু তিনি আমার ভালোবাসার অবলম্বন। তার সাথে কাটেনি কোন প্রহর, তারপরও তিনি আমার স্মৃতির মণিকোঠায় সদা বিদ্যমান। একত্রে দ্বীনের কাজ করিনি কোনদিন তবুও তিনি আমার উৎসাহদানকারী। শহীদি মিছিলে তার সাথে স্লোগান দিইনি কোন দিন তবুও তিনি আমার অনুপ্রেরণা। আমি শিবিরের শততম শহীদ যোবায়ের ভাইয়ের কথা বলছি। যার শাহাদাতের সংবাদ শুনে ব্যাকুল হয়েছিল আমার হৃদয়, থেমেছিল ভাষা, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়েছিল দুই ফোঁটা অশ্র“।
যা ঘটেছিল সেদিন : ১৫ মে ১৯৯৯ সাল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ছোট্ট একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা দুপুরের নীরবতা ভেঙে আক্রমণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বিশ্রামরত শিবিরকর্মীদের ওপর। আক্রমণের পরও তাদের পশুত্ব নিবৃত্ত হয়নি, তারা খুঁজতে থাকে নেতৃবৃন্দকে। আর সেই সময় ক্লাস থেকে হলে একা একা ফিরছিলেন শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অফিস সম্পাদক যোবায়ের ভাই। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অবস্থিত ব্যাংকের কাছ থেকে তুলে নিয়ে যায় প্রিয় ভাই যোবায়েরকে। এই অপরহণ করার ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরকে জানানো হলেও তারা প্রশাসনের চেয়ারে বসে ছাত্রলীগের কর্মীর ভূমিকা পালন করে। শহীদের সাথীরা সারা ক্যাম্পাস খুঁজেও পেল না যোবায়েরের চাঁদমাখা মুখ। সময় দ্রুত বয়ে চলছে, দায়িত্বশীলদের হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে, চোখের জল ফেলে দোয়া করছে শহীদের সাথীরা। অতঃপর মাগরিবের আজান, আর ফরেস্ট্রি ছাত্রাবাসের পেছনে একটি গুলির শব্দ। কিছুক্ষণ পর সংবাদ এল যোবায়ের ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। শুরু হল বাঁধভাঙা কান্না আর শহীদি কাফেলার শহীদদের তালিকায় লেখা হলো একটি নাম শততম শহীদ যোবায়ের হোসেন।
শিক্ষাজীবন : “ছোট থাকব না মোরা চিরদিন/বড় হব নিশ্চয়ই একদিন।”
বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল শহীদ যোবায়ের ভাইয়ের। আর সেই স্বপ্নের ভিত গড়ে দিলেন স্বয়ং মা। তিনি তার আদরের সন্তানকে বলতেন- “তোমরা একটি করে বই পড়বে আর তার বিনিময়ে আমি তোমাদের দশটি করে টাকা দেব।” মায়ের উদ্দেশ্য ছিল সন্তানেরা টাকার আশায় বেশি করে বই পড়বে আর তার ফলে তাদের জ্ঞানের রাজ্য বিকশিত হবে। সত্যিই জ্ঞানী হয়েছিলেন শহীদ  যোবায়ের। তার শিক্ষাজীবনের দিকে তাকালেই এর সত্যতা পাওয়া যায়। নিজ গ্রামে চৌবাড়ীয়া চকদই প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়ে সব শ্রেণীতে প্রথম হন তিনি। প্রাইমারি ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তিলাভ এবং আনেহলা স্কুলের শিক্ষক মহোদয়গণ তার সুচরিত্র, সত্যবাদিতা, ন্যায়নীতিপরায়ণতা ও মেধাবী ছাত্র হিসেবে তাকে একটি রৌপ্য পদক দিয়ে ভূষিত করেন। এসএসসি এবং এইচএসসিতে লেটার মার্কসসহ ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন।
তাকওয়া : শহীদ যোবায়ের শিশুকাল থেকেই ছিলেন সহজ সরল। আল্লাহ ও রাসূলের (সা) প্রতি ছিল অকৃত্রিম বিশ্বাস ও ভালোবাসা। যোবায়ের ভাইয়ের বাবার কাছ থেকেই শুনি সে কথা : “শৈশবকাল থেকেই একটা সুন্দর অভ্যাস ছিল তার। আমাকে নামাজ পড়তে দেখলেই আমার ডান পাশে দাঁড়িয়ে যেত। আমি একদিন বারান্দায় চৌকির ওপর নামাজ পড়ছি এমন সময় যোবায়ের আমার ডান পাশে দাঁড়াল। আমি যেই জমিনে সিজদায় গিয়েছি, যোবায়েরও আমার সাথে সিজদা দিল কিন্তু ওর কপালটা চৌকির ওপর না ঠেকার কারণে ধপাস করে পড়ে মাটিতে পড়ে গেল। আমি নামাজ ছেড়ে ওকে কোলে তুলে নিলাম। কিছুক্ষণ পর যোবায়ের বলল, বাবা! নামাজ শেষ হয়েছে? না, বলে আমি আবার নামাজে দাঁড়ালাম যোবায়েরও আমার সাথে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ল। নামাজ শেষে বললাম, বাবা যোবায়ের! ব্যথা পেয়েছ? যোবায়ের হাসি দিয়ে বলল, নামাজ পড়তে কি মানুষ ব্যথা পায়?
রমজানের চাঁদ উঠেছে পশ্চিম আকাশে। রমজানের চাঁদ দেখেই যেন ঈদের আনন্দ পাচ্ছে শিশুরা। আমার যোবায়ের দৌড়ে এল তার মায়ের কাছে। বয়স তখন ৪ বছর। বলল, মা আমি রোজা রাখব। ওর মা কোন উত্তর দিলেন না। আমরা সেহরি খেয়ে শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ যোবায়ের উঠে বসে বলল, মা তোমরা ভাত খেয়েছ? আমি বললাম, হ্যাঁ, খেয়েছি। যোবায়ের মন খারাপ করে শুয়ে পড়ল। সকালে তার মা তাকে খাবার দিলে সে খেল না। ওর মা খাওয়ানোর জন্য ওকে ছয়বার গোসল করালো। তবু যোবায়ের খেল না, রোজাও ভাঙলো না।
আমার যোবায়ের কখনো টেলিভিশন দেখতো না। তবে সংবাদ শুনতো। আমরা ঘরের ভেতর সবাই টেলিভিশনে সংবাদ শুনতাম। আর আমার যোবায়ের ঘরের পাঠখড়ির বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে খবর শুনত। আমি বলতাম যোবায়ের তুমি সংবাদ দেখ না কেন? সে বলত- বাবা যে  মেয়েটি সংবাদ পড়ে তাকে দেখলে আমার চোখের পর্দা নষ্ট হতে পারে। এই হল আমার যোবায়ের, আমার গর্ব, আমার অহঙ্কার, আমার বিশ্বাস আমার ভালোবাসা।’
শাহাদাতের তামান্না : “মরতেই হবে যখন, শহীদি মরণ দিও আমাকে” এই গানটি যোবায়ের ভাই কখনো গেয়েছিল কি না আমি জানি না তবে শুনেছেন অবশ্যই। এই গান যেমন প্রেরণা দেয় শাহাদাতের তেমনি রাসূলের হাদিসও প্রেরণা দেয় আমাদের। হয়তো শহীদ যোবায়ের এই হাদিসটি জানতেন, “রাসূল (সা) বলেছেন, আলাহর নিকট শহীদদের জন্য ছয়টি পুরস্কার রয়েছে। সেগুলো হলো : ১. প্রথম রক্ত বিন্দু ঝরতেই তাকে মাফ করা হয়… ।”
একদিন ফজরের নামাজের ইমামতি করছেন ছেলে যোবায়ের আর মুক্তাদি হিসেবে আছেন পিতা মাস্টার রহমতুল্লাহ। নামাজ শেষে মুনাজাতরত অবস্থায় কাতরকণ্ঠে যোবায়ের ভাই বলছেন, হে আল্লাহ! আমাকে তুমি শাহাদাতের মৃত্যু দিও।” মুক্তাদি হিসেবে কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই বৃদ্ধ পিতা বললেন, আমিন। পিতার আমিন বলার চল্লিশ দিন পর ছেলের শহীদি কফিন উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন বৃদ্ধ পিতা।
যোবায়ের ভাইয়ের আব্বা বলেন, “সে দিন যোবায়ের বাড়ি হতে শেষবারের মত যায় তখন আমি বলেছিলাম, যোবায়ের! বাংলাদেশের দূর-দূরান্ত হতে শিবিরের ছেলেরা এসে লেখাপড়া করে, অনেক সময় ছাত্রলীগের শয়তানরা তোমাদের মেরে ফেলে। ঐ সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত ছেলের পিতা-মাতা কিভাবে খবর পায়? সে বলল, বাবা আলাহ পাকের রহমতে শিবিরের ভাইয়েরা সমস্ত ব্যবস্থা করে থাকেন। এ পর্যন্ত ৯৯ জন দ্বীনি ভাই শহীদ হয়েছেন। ওর কথা শেষ না হতেই আমি বললাম, তুমি কি একশজন পূরণ করতে চাও? এই কথা বলার সাথে সাথে আমার অন্তর কেঁপে উঠল, আমি যোবায়েরের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ও মিষ্টি সুরে বলল “আল্লাহ পাক দয়া করে কবুল করলে।”
সংগঠনের প্রতি শহীদ পরিবারের চাওয়া : শততম শহীদের মা বলেছেন, যোবায়ের আমার ত্রিশ বছরের সাধনায় সৎ, সাহসী, উদ্যমী, পরোপকারী ও ভালোবাসার হৃদয়ের অধিকারী একজন প্রকৃত মানুষ হয়েছিল। আজ ৩৪ বছরের টগবগে যুবকের নাম হচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির। এই সংগঠনের নেতাকর্মীরা কি পেরেছে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে? যদি না পারে তবে আমাদের চাওয়া অনেক বাকি। ১৪ এপ্রিল ২০১১ টাঙ্গাইল শহর শাখার সেক্রেটারি রাসেল আহমেদ ভাইকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম শহীদ যোবায়ের ভাইয়ের কবর জিয়ারত করতে ও পরিবারের লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করতে। শহীদ যোবায়ের ভাইয়ের শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতাকে যদিও আমরা পাইনি কিন্তু পেয়েছিলাম তার বড় ভাই জাকির হোসেনকে। তিনি জানালেন ৯০ বছর বয়সের বৃদ্ধ পিতা এখনো বুকভরা আশা নিয়ে বেঁচে আছেন দ্বীনের বিজয় দেখতে, এখনো দু’চোখের অশ্র“ বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন সংগঠনের জন্য। শহীদ যোবায়েরের মত লক্ষ লক্ষ সন্তানের প্রতি তাকিয়ে আছেন বৃদ্ধ মা কখন তারা এই বাংলার সবুজ জমিনে নারায়ে তাকবির স্লোগান দেবে। তার জিজ্ঞাসা আর কত রক্ত দিয়ে এদেশের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হত্যার রাজনীতি বন্ধ হবে, মা হারাবেন না তার সন্তানকে, ভাই তার বোনকে, সেদিন কবে আসবে? নাকি এই স্বপ্ন দেখে দেখেই শহীদ যোবায়ের ভাইয়ের পিতা-মাতাও ঘুমিয়ে যাবে চৌবাড়ীয়ার কবরস্থানে যেখানে ঘুমিয়ে আছেন শিবিরের শততম শহীদ যোবায়ের হোসেন।

লেখক : জেলা সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, টাঙ্গাইল জেলা

SHARE

Leave a Reply