সর্বশেষঃ
post

ছাত্রলীগ আতঙ্কে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা

মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান

১২ নভেম্বর ২০২২

বর্তমান সময়ে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররাজনীতি মানেই ছাত্রলীগের রাজনীতি। ঘোষিত বা অঘোষিতভাবে অন্য সকল ছাত্রসংগঠনের প্রকাশ্য তৎপরতাকে তারা নিষিদ্ধ করে রেখেছে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য তাদের অন্যায় অপরাধের অবাধ সুযোগের পথকে প্রশস্ত করে রেখেছে। ২০০৮ সালের পর থেকে দেশে এককেন্দ্রিক যে শাসনব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়েছে তার ঢেউ সবার আগে লেগেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে ছাত্রলীগের ঘোষিত-অঘোষিত শাসন জারি আছে। তারাই যেন সেখানকার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর কর্তাব্যক্তিরা দিতে পারবে কি না, জানা নেই। আলো-আঁধারের দিকচক্রবালে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে শঙ্কিত সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা, শঙ্কায় অভিভাবকরা। সন্তান বিজয়ীর বেশে উচ্চ শিক্ষার সনদ নিয়ে ফিরবে, নাকি লাশ হয়ে? বাড়িতে ফেরার সময় তার হাতে কি নিজ লাগেজ থাকবে, নাকি ক্ষত-বিক্ষত ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াবে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে আনমনা মনে মায়েদের দিনগুলো কেটে যায়। জীবনের স্বপ্নগুলো পূরণে প্রিয় ক্যাম্পাসে শিক্ষাজীবনের দিনগুলো সাবলীল গতিতে এগিয়ে যাবে নাকি মাঝপথে থেমে যাবে? প্রতিটি সাধারণ শিক্ষার্থী ভয় আর শঙ্কিত জীবনের সময়গুলো পার করে নিজ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই চিন্তায়। দখল, সিট বাণিজ্য, চুরি ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, গেস্টরুম কালচার, মাদক, হামলা, মামলা, খুন, অপহরণ, বাকি খাওয়া, ফাও খাওয়া, টেন্ডারবাজি, এবং লুটপাট করে  বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার শর্টকাট রাস্তা ছাত্রলীগারদের জন্য অতি সহজ ব্যাপার। অপরাধ বিজ্ঞানে যতগুলো শব্দ আছে এর কোনটির সাথে ছাত্রলীগ জড়িত নেই, এমন শব্দ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। তাদের এহেন কর্মকাণ্ডে ছাত্রলীগ নাম শুনলেই সাধারণ শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। ছাত্রলীগ যেন তাদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের হাজারো অপকর্ম আর জুলুম নির্যাতনের খবর চাপা পড়ে যায় নানা কারণে। জীবনের নিরাপত্তা, শিক্ষাজীবনের বাকি সময়গুলো নির্বিঘ্নে পার করা, কোনো ট্যাগের কবলে পড়ে মার খেয়ে জীবনের নিরাপত্তার পরিবর্তে মামলার আসামি হয়ে জেল খাটা এ সকল নানা আশঙ্কায় অনেক শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েও সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে যায়। ছাত্রলীগের প্রতি সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ভয় এবং অপছন্দের মাত্রা কী পরিমাণ তা বোঝার এবং পরিমাপ করার সাধারণ কোনো ব্যারোমিটার নেই। পরিমাপ করা সম্ভবও নয়। তবে এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করলে দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্রলীগের সম্মানজনক ভোট প্রাপ্তিও যে সম্ভব নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাধারণ কলেজগুলোতে ছাত্রলীগের রাজনীতির নামে অপরাজনীতির যে সয়লাব, তা সকলে নীরবে সহ্য করলেও জনগণের ঘৃণা আর ভয়ের মাত্রা কত পরিমাণ তা বোঝা গেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর। একটি তথ্য সূত্রে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়। প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে রাজনীতি চালু না হয় এ জন্য অভিভাবকদের পক্ষ হতে ১২ হাজার ইমেইল এসেছে। অভিভাবকরা কেন এতো আতঙ্কিত এবং চিন্তিত? তা ছাত্রলীগের সাম্প্রতিক কালের কর্মকাণ্ডের অতি সামান্য কিছু দিক পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। 

সংগঠনের অভ্যন্তরেই নেতৃত্বের প্রতি অভিযোগের পাহাড়

নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকেই হাজারো অভিযোগ ছাত্রলীগ সভাপতি-সেক্রেটারির বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগ সভাপতি সেক্রেটারির বিরুদ্ধে নিজ সংগঠনের নেতারা নানা অভিযোগ করছে। যা প্রায় সবগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের টেন্ডার নিয়ে চাঁদাবাজিসহ নানান অভিযোগে ২০১৯ সালে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ঐ কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয়কে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারির দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রায় এক বছর পর ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সম্মেলনে এই দুইজনকে পূর্ণাঙ্গ সভাপতি-সেক্রেটারি করা হয়। জয়-লেখক ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটির অধিকর্তা হওয়ার পর থেকে নানা অপকর্মে জড়ান বলে অভিযোগ করেন অনেক কেন্দ্রীয় নেতা। বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস, দামি গাড়ি ব্যবহার, আয়েশি জীবন যাপনের অর্থ কোত্থেকে আসে এ প্রশ্ন প্রায় সবার। টাকার বিনিমেয় পদ বিক্রি, নিজ অনুগত শ্রেণি তৈরি। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়সহ যেসব অভিযোগ তা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতে হলে যে ছাত্রলীগের অনুমোদন ব্যতীত থাকা সম্ভব নয়, তা নানান সময়ে পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। হলের দখল মানেই সিট বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী গোটা বাণিজ্যিক এলাকায় দখলদারিত্বের সুবাদে ছাত্রলীগ পরিচয়ে চাঁদাবাজি করার পর এসব অপকর্মে জড়িতরা যে নানান আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া তাতো বোঝাই যাচ্ছে। ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সাথে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের সংঘাতের পেছনে দখলদারিত্ব আর চাঁদাবাজির একটি যোগসূত্র আছে  তা যেন ওপেন সিক্রেট। সভাপতি-সেক্রেটারির বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এই সংগঠনেরই বেশ কিছু নেতা আওয়ামী লীগ সভাপতিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিতে গিয়েছিলেন বলে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। 

ইডেন কলেজে ছাত্রলীগ সভাপতির ত্রাসের রাজত্ব

সম্প্রতি ইডেন কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মারামারি হওয়ার পর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তার বৈশাখী গণমাধ্যমকে বলেছেন, এই আচরণ নতুন কিছু নয়। আগেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। বৈধ রুমের মেয়েরা উপস্থিতি খাতায় স্বাক্ষর করার সময় সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভার অনুসারীরা তাদের ছবি তুলে রাখেন। সেখান থেকে সুন্দরীদের বাছাই করেন। পরে বাছাইকৃত মেয়েদের রুমে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিয়ে খারাপ উদ্দেশ্যে তাদের বিভিন্ন ধরনের কু-প্রস্তাব দেওয়া হয়। কারণ, তারা ওই মেয়েদের দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করাতে চান। ছাত্রলীগের নেত্রীরা সিট-বাণিজ্য, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও ছাত্রীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করানোর অভিযোগ গুরুতর। গত আগস্টেও নির্যাতনের সময় ২ শিক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ভাইরাল করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে সভাপতি তামান্না জেসমিন রীভার বিরুদ্ধে। এর আগে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি তামান্না জেসমিনের একটি অডিও ফাঁস হওয়ার পর প্রায় সবগুলো মিডিয়ায়ই তা প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। সেই অডিও ক্লিপের ভাষা এত নিম্নমানের যার অনেক শব্দ এবং বাক্যই মিডিয়ায় প্রকাশের অযোগ্য। অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কথা ভাইরাল হয়েছে। যে তামান্না জেসমিনকে বলতে শোনা গেছে, ‘এক পায়ে পাড়া দিমু, আরেক পা টাইনা ধইরা ছিঁড়া ফেলমু।’ সে নিজেকে কলেজের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে সেখানে উঁচু গলায় কথা বলেছে। এ অডিওবার্তায় প্রকাশ পেয়েছে যে, আইনসিদ্ধভাবে কেউ কলেজ হোস্টেলে সিট পেলেও তার থাকা বা না থাকা নির্ভর করে ছাত্রলীগ সভাপতির ইচ্ছার ওপর। তাকে টাকা দিলে হোস্টেলে থাকতে পারবে নচেৎ থাকতে পারবে না। লিগ্যাল অথবা ই-লিগ্যাল বিষয়টি নির্ভর করে ছাত্রলীগ সভাপতির ওপর। তার অডিও ক্লিপ প্রকাশের পর একটি টিভি চ্যানেল কয়েকজন ছাত্রীর সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। তাতে তারা বলেছে যে, ছাত্রলীগ সভাপতির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে মেয়েদের এই বড়ো প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রীদের শিক্ষাজীবনের ভবিষ্যৎ। অহেতুক মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হল থেকে বের করে দেওয়া, জঙ্গি ট্যাগ লাগিয়ে পুলিশে দেওয়া,  অনুমোদনহীন ছাত্রীদেরকে টাকার বিনিময়ে হলে সিটের ব্যবস্থা করা সেখানকার নিয়মিত ব্যাপার। কলেজ হোস্টেলে থাকতে হলে ছাত্রলীগ সভাপতিকে চাঁদা পরিশোধ করতে হবে। ছাত্রীদেরকে জোরপূর্বক সভা-সমাবেশ মিছিলে নিয়ে যাওয়া, মিছিলে না গেলে রুমে ডেকে নিয়ে নির্যাতন সেখানকার নিয়মিত ব্যাপার বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। তবে অধিকাংশ ছাত্রীই ভবিষ্যৎ নির্যাতনের ভয়ে মিডিয়ার সামনে কথা বলতে চায়নি। 

এতো অভিযোগের পরও তামান্না জেসমিনের পদ-পদবি এতদিন ঠিক ছিল। এ বিষয়ে সাংবাদিকগণ ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সুপ্রিয়া ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিষয়টি নিয়ে  কথা বলেননি। যা নিয়ে সারাদেশ তোলপাড় তা তিনি জানেন না। তিনি কি ভিনগ্রহের মানুষ? এগুলো হচ্ছে অপরাধ এবং অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার দুষ্টুপ্রবণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এমনকি এই ভিডিও ক্লিপ ফাঁস হওয়ার পর মিডিয়ায় এতো সমালোচনার পরও ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের ১৫ আগস্টের আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা এবং ছাত্রলীগ সভাপতি সেক্রেটারি সেই সভায় অতিথি হিসেবে ছিলেন। যেখানে সভাপতিত্ব করেছেন তামান্না জেসমিন। এ থেকেই বোঝা যায় ছাত্রলীগের অপকর্মের অলিখিত অনুমোদন তারা পেয়ে এসেছে বরাবর। 

একই ঘটনা দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও।  ছাত্রদল মিছিল করার প্রাক্কালে তাদেরকে শুধু ক্যাম্পাস থেকেই তাড়া করেনি বরং হাইকোর্টের ভিতরে ঢুকে অমানুষিকভাবে পিটিয়েছে। ছাত্রদলকে ক্যাম্পাস হতে বিতাড়নের পর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একজন নেতা তাদেরকে বাহবা দিয়ে বলেছেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় হতে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের বিতাড়িত করে ছাত্রলীগ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। ঐ নেতার বক্তব্যই প্রমাণ করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খুঁটির জোর কত মজবুত। 

ক্যাম্পাসগুলোতে ছায়া প্রশাসন চালায় ছাত্রলীগ

দেশের সব কয়টি পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আধিপত্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বোঝার উপায় থাকে না, প্রশাসনিক ক্ষমতা কার বেশি, বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের, নাকি ছাত্রলীগের! ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ডেইলি স্টারের বাংলা বিভাগে এমন একটি মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি ছাত্রলীগের অপরাধের সহযোগী’? ছাত্রলীগের নেতাদের ইচ্ছা-আবদারের ওপর নির্ভর করে কে হলে থাকতে পারবে আর কে থাকতে পারবে না। প্রায়শই দেখা যায় শুধুমাত্র ভিন্ন মতের কারণে হল থেকে বের করে দেয়া, চাঁদার বিনিময়ে সিট পাওয়া এবং মানসিকভাবে ছাত্রলীগ না করেও নিয়মিত ছাত্রলীগের মিছিলে যেতে বাধ্য হওয়ার মতো অনিচ্ছুক কাজ করতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। রাবিতে ২০১৫ সালে তাদের কাউন্সিলের আগে বিভিন্ন নেতারা পদ পাওয়ার জন্য হল পরিবর্তন করেছিলেন। হল পরিবর্তনের জন্য যে কোনো শিক্ষার্থীই আবেদন করতে পারে। কিন্তু ছাত্রলীগের সম্মেলনের আগে এভাবে হল পরিবর্তনে প্রশাসনের অনুমোদন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন সৃষ্টি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি ছাত্রলীগের অপরাধের সহযোগী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ভিন্ন মতের কারণে শতাধিক ছাত্রকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে ক্যাম্পাস ছাড়া করেছে। পুলিশের সামনে এক শিবির নেতার পা কেটে বিচ্ছিন্ন করেছিল ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। পুলিশ সেই সময়ে ছাত্রলীগকে শায়েস্তা করার পরিবর্তে ভুক্তভোগীদেরই বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়ই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মাঝে মারামারির খবর পত্রিকায় আসে। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ মারামারির মূল কারণ শাটল ট্রেনের নিয়ন্ত্রণ, হলের সিট বাণিজ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এবং বাইরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাঁদার নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। ইতঃপূর্বে কুয়েটে ছাত্রলীগের মানসিক নির্যাতনে এক শিক্ষকের মৃত্যুর পর ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়নি। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের সহযোগী হিসেবে ছাত্রলীগের নাম উঠে এসেছিল। এ বিশ্ববিদ্যালয়েই ২০১৯ সালে আল আমিন ও সৌম্য সরকার নামে দুই শিক্ষার্থী কর্র্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতিতে সিট পেয়ে হলে উঠতে গেলে তারা ছাত্রলীগের মারধরের শিকার হয়। এ বিষয়ে ঐ দুই শিক্ষার্থী হল প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা যায়নি। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা বাস এবং শাটল ট্রেন আটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গেট বন্ধ করে অনির্দিষ্ট মেয়াদে ধর্মঘট করছে, কারণ একটিই তারা পদ বঞ্চিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, ছাত্রলীগের কে পদ পেল আর কে পেল না, এ জন্য কি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করা হবে? অথচ ছাত্রলীগের এই উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো প্রকার ব্যবস্থা নিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। 

কুয়েটে এক শিক্ষার্থীকে ধরে এনে প্রায় তিন ঘণ্টা মারধরের পর তাকে পুলিশে দিয়েছে ছাত্রলীগ এবং ঐ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলাও করেছে নির্যাতকরা। নির্যাতিত ঐ শিক্ষার্থীর ওপর ছাত্রলীগের নির্যাতনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা সিভিল প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং উল্টো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে পুলিশ। নির্যাতকরা আরো উল্টো ঐ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ায় সে এখন কারাগারের ঘানি টানছে। এতে স্পষ্ট হয় যে, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছায়া প্রশাসন চালাচ্ছে ছাত্রলীগ অথবা ছাত্রলীগের অপরাধের সহযোগীর ভ‚মিকা পালন করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন। 

তোকেও আবরারের মতো পিটিয়ে মেরে ফেলব

ছাত্রলীগের ধারাবাহিক ফ্যাসিজমের নির্মম শিকার বুয়েটের আবরার ফাহাদ। প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রলীগের এ ধরনের টর্চার সেল রয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই সংবাদ প্রকাশিত হয়। বুয়েটে যেভাবে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ধরনের মারধরের ঘটনা ছাত্রলীগের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। তারা প্রায়ই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করে ভিন্নমতের সংগঠনের কর্মী আখ্যা দিয়ে অথবা অন্য কোনো ট্যাগ যুক্ত করে হল থেকে বের করে দেয় অথবা পুলিশে সোপর্দ করে। করিতকর্মা পুলিশ ছাত্রলীগের কথামতো মামলা দিয়ে তাকে গ্রেফতার দেখায়। আবরার ফাহাদের ব্যাপারেও হয়তো তাদের এমন পরিকল্পনা ছিলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের নির্যাতনে আবরার মারা যাওয়ায় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ছাত্রলীগের বিপক্ষে চলে যায়। আবরার হত্যাকে ছাত্রলীগের  কোনো কোনো নেতাকর্মী যেন গর্বের এবং অনুকরণের বিষয় মনে করে। এমন একটি ঘটনা প্রায় সব জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। আগস্ট মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে হলকক্ষে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার পাশাপাশি বলা হয় তোকেও আবরারের মতো মেরে ফেলবো।

১৯ আগস্ট, ২০২২ বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত  বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সামছুল ইসলামকে নির্মম নির্যাতনের সময় এমন কথা বলে ভাস্কর সাহা। জানা গেছে, ছাত্রলীগ নেতা ভাস্কর সাহা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং মতিহার হলে থাকে। সে সামছুল ইসলামকে রুমে ডেকে নিয়ে  তিন ঘণ্টা যাবৎ এমন নির্যাতন করে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। নির্যাতনের শিকার ঐ শিক্ষার্থীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি কমিটিও গঠন করেছে। সেই কমিটি আসলে কী করতে পারবে তা ভাবনার বিষয়। 

লাম্পট্য ও অনৈতিকতা তাদের চরিত্রে মিশে গেছে

কয়েক বছর আগে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ নেত্রী কর্তৃক সাধারণ ছাত্রীদেরকে বিভিন্ন নেতাদের বাসায় পাঠানোর মতো চরম জঘন্য অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার পর নানা ঘটনায় তার কোনো তদন্তপ্রক্রিয়া সামনে এগিয়েছে বলে জানা যায়নি। অতি সম্প্রতি রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাকিবুল ইসলাম রানার আপত্তিকর একটি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়েছে। মুঠোফোনে সে কথা বলছে এক নারী নেত্রীর সাথে। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রানা ছাত্রলীগ সভাপতি হওয়ার পরপরই এক নারীর সঙ্গে তার আপত্তিকর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ছবিকে ছাপিয়ে এবারে সরাসরি তার ফোনালাপ ভাইরাল হয়েছে। সে ফোনালাপে তাকে বলতে শোনা গেছে, বহু চিটারি করে আমি সভাপতি হয়েছি, চিটার দলের সর্দার আমি। এই একই লোকের বিরুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি দেওয়ার নাম করে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগ আছে। ভুক্তভোগী এক যুবক চাকরি না  পেয়ে রাজশাহী আদালতে রানার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। জেলার দুর্গাপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান ১৫ সেপ্টেম্বর আদালতে রানার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। আদালত সভাপতি রানার বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন। তাকে ১২ ডিসেম্বর সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু চাকরি দেওয়ার জন্যই টাকা গ্রহণ নয়,  খোদ নিজ দলের নেতাকর্মীদের পদ দেওয়ার জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভ‚রি ভ‚রি, উপজেলা কমিটিগুলো ভেঙে নতুন কমিটি দেওয়ার নাম করে পদপ্রত্যাশী নেতাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে রানা। এ ছাড়া তার মাদক সেবনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সম্প্রতি গভীর রাতে রাজশাহী মহানগরীর ঘোষপাড়া মোড়ে মাতলামি করার সময় স্থানীয়রা রানাকে ধাওয়া দেয়। সে সময়  সে এবং তার সহযোগীরা দুটি মোটরসাইকেল ফেলে পালিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে মোটরসাইকেল দু’টি বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ উদ্ধার করে। থানা থেকে মোটরসাইকেল দুটি ছাড়িয়ে আনে রানা এবং তার সহযোগীরা।

একই অভিযোগ জেলা সেক্রেটারি অমির বিরুদ্ধেও এক কলেজ ছাত্রকে আটকে রেখে রাতভর নির্যাতন শেষে ৫০ হাজার টাকা চাঁদার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া। চাকরি দেয়ার নাম করে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকা আদায়, লাইসেন্সবিহীন পিস্তলের ব্যবহার, মদ্যপ অবস্থায় রাস্তায় ঘোরাঘুরি করার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তার।

২০২২ সালের আগস্ট মাসে মাতলামি করা অবস্থায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে কয়েকজন নারীকে নিগ্রহ করেছে ছাত্রলীগের পদধারী নেতারা। এ সময় মদ খেয়ে মাতলামি করা অবস্থায় তারা অভিজিৎ নামে একজনের স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করছিল। অভিজিৎ তাদের কাজে বাধা দিলে তারা তাকে মারধর করে। ছাত্রলীগের মাতাল নেতাদের হামলায় আহত অভিজিৎ দাস বলেন, আমার মাথা ফেটে গেছে, পায়ে-পিঠেও আঘাত পেয়েছি। অভিজিৎ জানান, ঘটনার দিন রাতে স্ত্রীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশনে বসে ছিলেন তিনি। এ সময় কিছু  ছেলে মদ খেয়ে এসে তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করে। এ সময় তাদের হাতে মদের বোতল ছিল। ভুক্তভোগীর পক্ষ হতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। 

২০২২ সালের আগস্ট মাসের ২২ তারিখ রাত আটটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আল আমিন নামে ছাত্রলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা মদ্যপ অবস্থায় ছাত্রীদের ওয়াশ রুমে ঢুকে পড়ে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী জানা যায়, অভিযুক্ত মদ্যপ ছাত্রলীগারের নাম তানজিন আল আলামিন। সে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি সংসদের সভাপতি ও ছাত্রলীগের  কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সংস্কৃতিবিষয়ক উপ-সম্পাদক। পাশবিক নিগ্রহের শিকার ছাত্রী বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগকারী তার অভিযোগে বলেছেন যে, মদ্যপ অবস্থায় মেয়েদের ওয়াশ রুমে ঢুকে পড়ে একটি রুমের দরজা খোলা রেখে চরম আপত্তিকর অবস্থায় অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে। ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়, পরবর্তীতে তাদের কী শাস্তি হয় তা আর জানা যায় নি। বরং অনেক সময় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। কেন বাধ্য হয়, তা মনে হয় বোঝার বাকি থাকে না। 

আর টিভির অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় নেশার ট্যাবলেট খাইয়ে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেতা রিপন রায়কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে শহরের সকাল বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি উপজেলার বসাকপাড়া মহল্লার শ্রী বিদু রায়ের ছেলে রিপন রায়। সে বগুড়া  জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক।

নারায়ণগঞ্জের জনৈক এমপি যখন বক্তৃতা দেন, ছাত্রলীগের নেতারা সিগারেট খায় না। তার পরের দিন জেলা পর্যায়ের এক নেতা হাজার পিস ইয়াবা নিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। অপর ছাত্রলীগ নেতার বাসা হতে প্রচুর পরিমাণ ফেনসিডিল উদ্ধার হয়। 

অনৈতিকতা আর মাতলামির এমন হাজারো খবরের ভিড়ে ছাত্রলীগের পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের একটি হলের ছাদে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা বিয়ার খেয়ে চিয়ার্স করছিল। সেখানে হঠাৎ জুনিয়র ছাত্রও বিয়ারের বোতল নিয়ে আগমন করায় বিশ^বিদ্যালয়ের সিনিয়র ছাত্র এবং ছাত্রলীগ নেতারা তাকে মারধর করে আহত করে। 

ছাত্রলীগের অপরাধের লেজ টেনে ধরা জরুরি

প্রকাশ্য দিবালোকে বিশ্বজিৎ হত্যা কিংবা রাতের আঁধারে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু বকর হত্যা, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে রাবিতে নিজ দলের কর্মী হত্যা ছাত্রলীগের চেঙ্গিসীপনাকে শুধু উৎসাহই দিয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণের সেঞ্চুরিয়ান মানিক যখন সরকারি চাকরি পায়, তখন সেই সংগঠনের নেতারা ধর্ষণে উৎসাহ বোধ করতেই পারে। মদ্যপ অবস্থায় নারী নিগ্রহের পর যেই দলের নেতা বহাল তবিয়তে থাকে তার অনুজরা এতে উৎসাহ বোধ করতেই পারে। হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে ভিন্ন মতের লোকদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করার পর তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না, বরং সাহসিকতার জন্য ধন্যবাদ দেয়া হয়। স্কুলের কোমলমতি ছাত্রদের ওপর চড়াও হতে যারা দ্বিধা করে না, তারা সামান্য মোমবাতি প্রজ্বলনের মতো নীরব প্রতিবাদেও হামলে পড়তে কিভাবে দ্বিধা করতে পারে। সন্ত্রাস, সহিংসতা, মাদকতা, দখল, চাঁদাবাজি আর নানান কেলেঙ্কারির অতিমাত্রিক অপরাধে জড়িত ছাত্রলীগ তাই সাধারণ শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। একটি অন্যায়কে বৈধতা দেয়ার জন্য হাজারো অন্যায়ের পথকে যেমন প্রলম্বিত করা হয়, একইভাবে জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন ক্ষমতায় থাকা অবৈধ সরকারের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী হিসেবে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করছে এটা বোঝাই যায়। ক্ষমতাসীনরা যে ফ্রাঙ্কেইনস্ট্যান দানব পুষছে তা আদতে তাদের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে। এ উপলব্ধি তাদের যত দ্রুত হবে তত তাদের জন্য মঙ্গল এবং জাতির জন্য কল্যাণকর। যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা তাদের ছাড় দিয়ে যাচ্ছেন, একদিন ছাত্রলীগ তাদের ঘার মটকাবে। সিভিল প্রশাসনের যারা ছাত্রলীগের অপরাধকে অপরাধ ভাবছেন না, ওরা একদিন আপনার সন্তান এবং স্ত্রীর ওপর চড়াও হতে দ্বিধা করবে না। তাই সময় এখনই, তাদের রুখে দেওয়ার। 

কে রুখবে ছাত্রলীগের এই চেঙ্গেসীপনা?

একটি সমাজ এবং রাষ্ট্রের বিকৃতি শুরু হয় মস্তিষ্ক বিকৃতির মাধ্যমে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যে আদর্শ এবং  নৈতিকতার লালন দরকার স্রোতের হাওয়া তার বিপরীতে প্রবাহিত করা হচ্ছে। সেক্যুলার শিক্ষানীতির মাধ্যমে একদিকে তরুণ প্রজন্মকে ধর্মহীন করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হচ্ছে অপর দিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে সকল ছাত্র ব্যক্তিগত জীবনে আদর্শ ও নৈতিকতাকে লালন করতে চায় তারা নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীর টেবিলে কেন কুরআন মাজিদ, এ জন্য তাকে সরকারবিরোধী মামলায় জড়িত করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। যে ঘটনা ঘটেছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ব্যাপারে। কেন একটি ছেলে নিয়মিত নামাজ পড়ে সে জন্য তাকে জঙ্গি তকমা লাগিয়ে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনাও ঘটে প্রায়শ। তরুণ ছাত্রসমাজের নৈতিক চরিত্রগঠনের মতো কোনো আদর্শ ছাত্রলীগের কাছে নেই। একটি আদর্শবাদী সংগঠনের মাঝে আদর্শ  ও নৈতিকতার প্রসারে যে চিন্তা এবং বোধের উন্মীলন দরকার তা তাদের মাঝে পাওয়া সম্ভব নয়। নৈতিক চরিত্রগঠনের হাতিয়ার হচ্ছে মানুষকে স্রষ্টা যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জীবনের পরিকল্পনা তৈরি করা, কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। শুধুমাত্র কিছু স্লোগান দিয়ে আর যাই হোক আদর্শ মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। সমাজ এবং রাষ্ট্রে মানুষই প্রধান নিয়ামক শক্তি। মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলে সে তার জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কেও অজ্ঞ থাকবে। জীবনের নীতিনির্ধারণে তখন শয়তানি পথ তার কাছে প্রশস্ত হবে। ছাত্রলীগের এই চেঙ্গেসীপনার বিপরীতে যারা ¯্রষ্টা প্রদত্ত জীবনবিধান আল কুরআনকে বুকে ধারণ করে জীবন পরিচালনার নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের ওপর নির্যাতনের খড়গ নয় বরং দীন প্রচারের পথকে অবারিত করতে হবে। সেক্যুলারিজমের বিপরীতে আদর্শ নৈতিকতা তথা ইসলামের সুমহান আদর্শকে লালন করতে হবে। তবে অনৈতিকতা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বপ্লাবী বিপ্লব সাধিত হবে ইনশাআল্লাহ!  

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন

তানজিন

- 1 week ago

https://morningtribune.news/%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%87-%E0%A6%A2%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BF-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D/

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির