ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগ বিরোধের মূলকেন্দ্র

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে একদিকে সরকারি লোকদের হাতে জামায়াত-শিবিরের জ্ঞানের ভাণ্ডার লুটপাট হচ্ছে। অন্য দিকে যুবলীগ-ছাত্রলীগের অস্ত্রের ভাণ্ডার অক্ষত থেকে যাচ্ছে। দেশজুড়ে যুবলীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডাররা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে বেড়ালেও তারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ এই অস্ত্রের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। অপর দিকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার লোকেরা জামায়াত-শিবিরের বইয়ের ভাণ্ডার তথা পাঠাগারের অসংখ্য গ্রন্থ কথিত ‘জিহাদি বই’ আখ্যা দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে বস্তায় ভরে। আর ছাত্রলীগ পুড়িয়ে দিয়েছে কুরআনসহ পবিত্র গ্রন্থাদি। পুলিশ ও প্রশাসনের এই দুষ্টের লালন-শিষ্টের দমন নীতিতে জাতি বিস্মিত।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, বর্তমান মহাজোট সরকারের সোয়া চার বছরে আওয়ামী ছাত্রলীগ-যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা বিপুল অস্ত্র ভাণ্ডার গড়ে তোলে এবং এসব অস্ত্র গোপনে নয়, একেবারে প্রকাশ্যে ব্যবহার করে। তারা পুলিশের সামনে পিস্তল লোড, অস্ত্র তাক করে গুলিও ছোড়ে। পুলিশের সামনে প্রতিপক্ষকে রামদা দিয়ে কোপায়, পুলিশের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পেটায়Ñ এমন ছবি অহরহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাদের গায়ে হাত দেবার ক্ষমতা যেন লোপ করে দেয়া হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গত বছরের ২ অক্টোবরের ঘটনা তার উদাহরণ। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন কোন সপ্তাহ নেই যে তারা কোন ঘটনা ঘটায়নি। হয় অন্য সংগঠনের ওপর চড়াও হয়েছে কিংবা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটিয়েছে অথবা কোন শিক্ষক বা ছাত্রের ওপর আঘাত করেছে। আর এসব ঘটনায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অহরহ ব্যবহার করছে বিভিন্ন প্রকার অস্ত্র। সামান্য কোনো ঘটনাতেই চলেছে গুলিবর্ষণ। এখন রিভলবার, পিস্তল, কাটা রাইফেল, স্টেনগান, রামদা ছাত্রলীগের হাতে খেলনার মতো ব্যবহৃত হয়। পুলিশের সামনে দিয়ে অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ কিছুই বলে না। সেদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা যে অস্ত্রের প্রদর্শন করেছে এর আগে এ রকম অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ক্যাম্পাসে আর কখনও ঘটেনি। ছাত্রলীগের অন্তত ১৩ নেতাকর্মীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র দেখা গেছে। এসব পিস্তল দিয়ে পুলিশের সামনেই শিবিরকর্মীদের লক্ষ্য করে অন্ততপক্ষে ৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় এবং বারবার সেগুলোয় গুলি লোড করা হয়। পুলিশের সামনেই এত অস্ত্রের প্রদর্শনের পর পুলিশ আজো এসব অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার করেনি। বরং পুলিশ বলছে, ‘অস্ত্র প্রদর্শন হয়েছে তারাও জানে। কিন্তু অস্ত্র প্রদর্শন করলে কিছু করার নেই। শুধু অস্ত্রসহ ধরা পড়লেই মামলা করা যাবে। কিন্তু অস্ত্র পাওয়া না গেলে কিংবা কারো বিরুদ্ধে মামলা না হলে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না।’ রাবিতে ছাত্রলীগের অস্ত্র প্রদর্শনের দৃশ্য গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রদর্শিত হলেও পুলিশের ‘কিছুই করার নেই’।
শুধু রাবিতে নয়, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত বছর ১ অক্টোবর দিনাজপুরে পুলিশের ছত্রছায়ায় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে ইসলামী ছাত্রশিবির কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে অন্তত ৩০ জন শিবিরকর্মী আহত হয়। ছাত্রলীগ ছাত্রাবাসে হামলা চালিয়ে পবিত্র কুরআন-হাদিস ও ইসলামী সাহিত্যে অগ্নিসংযোগ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ছাত্রলীগ কর্মীদের সহায়তা করেছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন। এ ছাড়া গত বছর ৮ জুলাই কলেজ হোস্টেলে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ হোস্টেল পুড়িয়ে দেয় ছাত্রলীগ। এতে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয় অপরূপ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ‘সেমি পাক্কা আসাম’ টাইপ এর এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের তিনটি সুবিশাল ভবন। শুধু ইট-কাঠ নয়, এতে পুড়ে গেছে কয়েক শ’ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের মূল্যবান ডকুমেন্ট। পুড়েছে বহু বই-খাতা- নোটের বিপুল সম্ভার। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই বর্বরোচিত ঘটনার পর তিন তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত কাজ শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ে। অপরাধী শনাক্ত করার পর ক্ষমতাসীন দলের ‘ছাড়পত্র’ না পাওয়ায় তা আলোর মুখ দেখেনি জেলা প্রশাসন, এমসি কলেজ কর্তৃপক্ষ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠন করা তিনটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন। তবে তদন্ত কমিটির সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসন ও এমসি কলেজ প্রশাসনের গঠন করা দুই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তরা ছাত্রলীগ নেতাকর্মী হওয়ায় প্রশাসন বিব্রত হয়। বিষয়টি সরকারের উপর মহলকে অবগত করা হলেও কোনো ‘গ্রিন সিগন্যাল’ না পাওয়ায় প্রতিবেদনের আর কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে আলোচিত ও আলোড়িত এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত ধামাচাপাই পড়ে যায়। আর ছাত্রলীগ পেয়ে যায় দায়মুক্তি। সর্বসাম্প্রতিক ঘটনায় চট্টগ্রাম নগরের ইস্পাহানি মোড়ে গত ১০ এপ্রিল সোমবার হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ওপর যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য দিদারুল আলম ওরফে মাসুম (৪৩) হেফাজতের কর্মীদের লক্ষ্য করে শটগান থেকে গুলি ছোড়ে। যুবলীগের ওই নেতার গুলিতে হেফাজতের বেশ কয়েকজন কর্মী আহত হন। জাতীয় পত্রপত্রিকায় অস্ত্রধারী ক্যাডারের ছবি প্রকাশও পায় একাধিক দিন। কিন্তু গুলি চালানো যুবলীগের সেই নেতাকে আজো গ্রেফতার করেনি পুলিশ। বরং তার বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রের’ প্রতিবাদে সমাবেশ-মিছিল করে দলের নেতা-কর্মীরা। আর পুলিশ বলেছে, ‘অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়েছে কি না তদন্ত করে দেখা হবে।’ এদিকে গত বছর জুন মাসে সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টে রাজধানীর ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের কাছে তিন হাজার অস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়, এসব অস্ত্র উদ্ধার করা দূরে থাক-তাদের চাঁদাবাজিতে পুলিশ ‘মদদ’ দিচ্ছে। সরকার সমর্থক একটি দৈনিকে বলা হয়, ঢাকা কলেজের বিভিন্ন হলে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে এবং এর সংখ্যা হবে আনুমানিক তিন হাজার। বিভিন্ন ছাত্রাবাসে তল্লাশি চালিয়ে দেশী-বিদেশী শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। তবে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
অপর দিকে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকেরা গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে ব্যক্তিগত সংগ্রহের ও পাঠাগারে সংরক্ষিত হাজার হাজার কপি বই জব্দ করে নিয়ে গেছে। এসব বইয়ের মধ্যে যেমন আছে পবিত্র কুরআন শরীফ, কুরআনের অনুবাদ, তফসির গ্রন্থ, হাদিস গ্রন্থ ও হাদিসের ব্যাখ্যা সংবলিত ও ফিকাহ গ্রন্থ। তেমনি আছে ইসলামের বিভিন্ন ইবাদতের নিদের্শনার বই, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বই, কম্পিউটার ও ভাষা শিক্ষার বই প্রভৃতি। এসব বইকে ‘জিহাদি’ নাম দিয়ে কল্প-কাহিনী ফেঁদে মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, এসব গ্রন্থের মধ্যে একটিও কোন নিষিদ্ধ বই ছিল না। বিভিন্ন পাঠাগারে তল্লাশি চালিয়ে এসব বই তছনছ করা হয়েছে এবং তাচ্ছিল্যভরে বস্তাবন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের তথা সভ্য দেশের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা বলে পর্যবেক্ষকরা অভিমত প্রকাশ করেন। বর্তমান সরকারের আমলেই প্রথম ‘জিহাদি বই উদ্ধার’-এর নতুন এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। একজন বিশিষ্ট আলেম জানান, ‘জিহাদ’ শব্দকে অপব্যাখ্যা করে এর বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে বিরূপ ধারণা তৈরি করতেই ইসলামবিরোধীদের ষড়যন্ত্রে এই ট্রেন্ড চালু করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, পবিত্র কুরআনে বহুবার জিহাদের কথা উল্লেখ আছে। তাহলেতো পবিত্র কুরআনকেই সবচেয়ে বড় ‘জিহাদি’ গ্রন্থ বলতে হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি কুরআনের দু’টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ আয়াতের উল্লেখ করে বলেন, সূরা আল-মায়েদাহর ৩৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য অন্বেষণ কর এবং তাঁর পথে জেহাদ কর যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ সূরা আল-ইমরানের ১৪২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের কি ধারণা, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ আল্লাহ এখনও দেখেননি তোমাদের মধ্যে কারা জেহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্যশীল?’ উল্লেখ করা যেতে পারে, এসব বইয়ের লেখকরা বাংলাদেশে নিষিদ্ধ নন। এই বইগুলো দেশের প্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত প্রকাশকদের মাধ্যমে প্রকাশিত। তথাকথিত ‘জিহাদি’ বই উদ্ধারের বহুসংখ্যক ঘটনার মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো।
চলতি বছর ১৮ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নগরীর বিনোদপুর এলাকায় শিবিরের একটি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ‘জিহাদি’ বইপত্র জব্দ করে র‌্যাব-পুলিশের একটি দল। এ সময় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নামের তালিকা, চাঁদা আদায়ের একটি লেজার বই, একটি কম্পিউটারসহ বেশ কিছু জিনিসপত্র জব্দ করা হয়। বইগুলো বস্তায় ভরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে ওই কার্যালয়টি সিলগালা করে দেয়া হয়। উল্লেখ্য, এটি ছিল শিবিরের একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। এই পাঠাগার থেকে শিবিরের শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন করতো। গত ২ জানুয়ারি গাইবান্ধা শহরের সার্কুলার রোডে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের অফিস থেকে মঙ্গলবার রাতে এক কার্টন ‘জিহাদি’ বই উদ্ধার করে পুলিশ। কার্টনে ৩২ প্রকারের ৯০টি ‘জিহাদি’ বই পাওয়া যায়। সদর থানার ওসি জানান, ঢাকার মগবাজার থেকে বইগুলো পাঠানো হয়েছে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ইসলামিক টিভির মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রতিনিধির মালিকানাধীন আদর্শ কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ সময় পুলিশ ‘জিহাদি’ বই এবং কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক উদ্ধার করে। তবে এ সময় প্রতিষ্ঠানের মালিক উপস্থিত ছিলেন না। এ বছর ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর ফতুল্লা থানা পুলিশ বিপুল পরিমাণ ‘জিহাদি’ বইসহ জামায়াত-শিবিরের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে প্রায় তিনশ ‘জিহাদি’ বই এবং দু’টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। গত বছর ৫ জুন রংপুর কারমাইকেল কলেজের ওসমানী ছাত্রাবাসের তালা ভেঙে পুলিশ বিপুল পরিমাণ ‘জিহাদি’ বই উদ্ধার করে। ১ মার্চ ২০১০ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা, সৈয়দ আমীর আলী ও জিয়াউর রহমান হলে তল্লাশি চালিয়ে দু’টি লাইব্রেরি থেকে প্রায় ছয় হাজার ‘জিহাদি’ ও ইসলামী বই, সিল-প্যাড, শিবিরের কাগজপত্র প্রভৃতি উদ্ধার করে পুলিশ। শামসুজ্জোহা হলের প্রভোস্ট ড. মর্ত্তুজা খালেদ বলেন, বেলা ১১টার দিকে হল শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক শরিফুল আলমের কক্ষে শিবিরের রাবি শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ‘শরীফুজ্জামান স্মৃতি পাঠাগারের’ সন্ধান পাওয়া যায়। এই পাঠাগার থেকে পুলিশ প্রায় ছয় হাজার ‘জিহাদি’ ও ইসলামী বই, ম্যাগাজিন, সিডি, চাঁদা আদায়ের রসিদ, অ্যালবাম, সিল-প্যাডসহ বিভিন্ন কাগজপত্র উদ্ধার করে। গত বছর ৩ এপ্রিল গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ আলিয়া মাদরাসার একটি ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে কাউকে গ্রেফতার করতে না পারলেও ১৬টি বিভিন্ন জিহাদি বই উদ্ধার করা হয়। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১০ রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি মেস থেকে বিপুলসংখ্যক ‘জিহাদি’ বইসহ শিবিরের দলিলপত্র উদ্ধার করে নিউমার্কেট থানার পুলিশ। এই মেস থেকে বিপুলসংখ্যক জিহাদি বই, বাংলাদেশের পতাকা, লিফলেট, পোস্টার, টেলিভিশন, ব্যানার, ভিডিও ও অডিও ক্যাসেট প্রভৃতি উদ্ধার করা হয়। গত ২১ জুলাই ২০১০ তারিখে সাতক্ষীরা শহরের মধ্য কাটিয়ার আবুল কালাম আজাদ ও মুন্সিপাড়ার আব্দুর রহমানের বাড়ি থেকে পুলিশ দুই শতাধিক ‘জিহাদি’ বই-পুস্তক উদ্ধার করে। গত ৬ অক্টোবর ২০১০ পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলার বালিপাড়ার চান সিরাজিয়া মহিলা আলিম মাদরাসা থেকে দুই শতাধিক ‘জিহাদি’ বই-পুস্তক উদ্ধার করে পুলিশ। এখান থেকে তিন জামায়াত কর্মীকে আটক করা হয়। এ বছর ২৯ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি পৌর শহরের কলাবাগান এলাকার সমাজ উন্নয়ন পাঠাগার থেকে ‘জিহাদি’ বই, সিডি ক্যাসেট, চাঁদার রসিদ বই প্রভৃতি উদ্ধার করে পুলিশ।
সমাজ সভ্যতা বিনির্মাণের ভবিষ্যৎ কারিগর ছাত্রসমাজ। ছাত্রসমাজের আদর্শিক সৌন্দর্য দেশপ্রেম ও মানবতাবোধ অর্জনের ওপর নির্ভর করে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভালো ও মন্দের। আদর্শিক, নৈতিক, মানবিক ও দেশপ্রেম লব্ধ তরুণের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক বেশি। আবার বাস্তব সমস্যার ভিড়ে নিজেকে সত্য ও সুন্দরের পক্ষে জাতির জন্য তৈরি করে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে উৎসর্গ করাও চাট্টিখানি কথা নয়। ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীর ধ্বংসলীলার স্তূপের তুঙ্গে দাঁড়িয়ে আকাশচুম্বী আশাবাদী কালজয়ী যে কোন আদর্শ বাস্তবায়ন কোন নোবেল বা সিনেমার বুলি নয়। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি যোগ বিয়োগ নিরন্তর হতাশায় কেবল অতল গহ্বরে তলিয়ে দিতে থাকে। পরস্পর বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের ফাটলে আদর্শচ্যুতি, দুর্নীতি ও সাম্রাজ্যবাদীদের উপর্যুপরি কশাঘাতে সমগ্র জাতি হতভম্ব, বাকরুদ্ধ; অচলপ্রায়। বাংলাদেশ নামক লাল সবুজের পতাকা খচিত মানচিত্র ও সবুজ শ্যামল ভূখণ্ডের যাত্রাতেই ছাত্রসমাজের নির্ঘাত ধ্বংসস্তূপ মাড়িয়ে দেশপ্রেমিক, সৎ, যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির প্রত্যয়ে আপসহীন, দৃঢ়চিত্তে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পথ চলা শুরু হয়। ৩৬ বছরে এই জাতিকে অনেক সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে ছাত্রশিবির। এই সংগঠন মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও দেশপ্রেমে প্রোজ্জ্বল একদল কর্মনিষ্ঠ তরুণ তৈরির অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এর অপ্রতিরোধ্য এগিয়ে যাওয়াকে পেশিশক্তি ও দেশদ্রোহীদের কাছে মোটেও ভালো লাগেনি। তাই সর্বশক্তি দিয়ে এর অগ্রযাত্রাকে ধুলোয় মলিন করতে হীন চক্রান্ত নেই যার আশ্রয় বিরুদ্ধবাদীরা গ্রহণ করেনি। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রহত্যা, নিপীড়ন, ক্যাম্পাস বন্ধ করে ছাত্রসমাজকে জিম্মি করে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখে ভয়-হুমকি-ধমকি দিয়ে রক্ত পিচ্ছিল করেছে এই অকুতোভয় সংগ্রামী কাফেলার। নির্যাতন, হত্যা ও সন্ত্রাসের শিকার এই সংগঠনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও মিডিয়া আগ্রাসন চালিয়েছে যৌথভাবে। সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আর মিথ্যাকে সত্য দিয়ে ঢাকার অপপ্রয়াস চালিয়েছে হরদম। রাষ্ট্রের এহেন ভূমিকায় দেশের নেতৃত্ব তৈরি কি ছেলের হাতে মোয়া? দেশের সকল দুর্যোগে ছাত্রসমাজকে সাথে নিয়ে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রশিবির। স্বেচ্ছাচারী ফ্যাসিস্ট শাসকদের অপ্রতিরোধ্য অবিবেচক অনাচার রুখে দিতে প্রতিবাদ করেছে ছাত্রশিবির। তাই ক্ষমতালোভী সরকারের চরম দাবদাহে ছাত্রশিবিরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে রাষ্ট্রের সকল শক্তি সামর্থ্যকে। বর্তমান আওয়ামী জোট সরকার ক্ষমতার সিংহাসনে সমাসীন হওয়ার পর একের পর এক হত্যা, সন্ত্রাস চালিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডাকাতদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। ছাত্রশিবির এর প্রতিবাদ করতে গেলে হারাতে হয়েছে অনেক তাজা প্রাণকে। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আন্তঃকোন্দলে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান। এই অভিযোগে হাজার হাজার ছাত্রকে বিনা কারণে কারারুদ্ধ করেছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। ছাত্রত্ব হারিয়ে শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়েছে জাতির ভবিষ্যৎকে। সন্ত্রাসের ভয়ঙ্কর তাণ্ডবে তটস্থ হয়ে সমগ্র জাতি প্রধানমন্ত্রীকে ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরার আর্তি জানালেও তার কোন প্রতিকার, সুরাহা জাতির ভাগ্যে জুটল না। দিন দুপুরে রাজপথে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ এর মতো বিশ্বজিৎসহ অসংখ্য বনি আদমকে বলির খাতায় নাম লিপিবদ্ধ করতে হল। এখনও কেউ জানে না এর শেষ কোথায়, সবাই নিরুপায়, নির্বাক স্বাধীন জাতি!
ইসলামী ছাত্রশিবির এর প্রতিবাদ করেছিল ছাত্রসমাজকে নিয়ে দেশের শহরে, নগরে, বন্দরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। তাই ছাত্রশিবির বাকশালী সরকারের একমাত্র চক্ষুশূলে পরিণত হয়। এ সংগঠনের নেতাকর্মীদের হত্যা, গুম, জেল-জুলুমের স্টিম রোলার দিয়ে নিঃশেষ করতে সর্বগ্রাসী চেষ্টায় নিমজ্জিত রাষ্ট্র। ছাত্রশিবিরের মেধাবী নেতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের প্রিয় মুখ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি শরীফুজ্জামান নোমানী হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা শুরু করে খুনের মহোৎসব। একদিকে দলীয় সন্ত্রাস অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলে সমান্তরাল গতিতে, এ যেন এক খুনের হোলি খেলা! তার মাত্র কয়েকদিন আগে রাজশাহীর মেধাবী ছাত্র হাফিজুর রহমান শাহিনকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। রাষ্ট্র যখন হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করে তখন কার কাছে বিচার চাইবে এই অবলা জাতি? এভাবে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লাশের কফিন যুক্ত হয়েই চলল। পরিবার, সমাজ, জাতি গঠনে প্রত্যয়ে যে সন্তানকে সর্বোচ্চ বিদ্যানিকেতনে পাঠালো তার কফিন সামনে রেখে কার কাছে বিচার চাইবে তার পরিবার পরিজন? জামালপুরে হাফেজ রমজান আলীকে দিনদুপুরে শিবির করার অপরাধে স্থানীয় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা জবাই করে রেললাইনের ওপর ফেলে রাখে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নরপিশাচদের হাতে মহিউদ্দিন মাসুম ও হারুনুর রশীদ কায়সার নির্মমভাবে হত্যার বছরের মাথায় পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ অস্ত্রের মহড়ায় ক্ষত-বিক্ষত হয় মেধাবী মুখ শিবির নেতা মাসুদ বিন হাবিব ও মুজাহিদুল ইসলাম মাসুম। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার মাটিতে দ্বীনের এই অপ্রতিরোধ্য কাফেলাকে অপদমনের চেষ্টার অংশ হিসেবে সরকারের নির্দেশে প্রশাসন ঢাকা যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে নামিয়ে চিরতরে গুম করে ক্যাম্পাসের সদা হাস্যোজ্জল প্রদীপ্ত আল মুকাদ্দাস ও ওয়ালীউল্লাহকে। কখন থামবে তাদের স্বজনদের নিরন্তর অশ্রুধারা; কখন শেষ হবে পথের দিনের শেষ দৃষ্টি? কে জানে? কার কাছে আছে এর উত্তর? এরপর আরো বীভৎসতা! যার উদাহরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতঃপূর্বে কোন পাতায় লেখা হয়নি। এক নির্মম বর্বরতা রক্ত পিপাসার হোলি খেলা! আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ইস্যুতে যুদ্ধাপরাধের ধুয়া তুলে সরকার একতরফাভাবে জামায়াতকে দায়ী করে ইসলামী নেতৃত্বের চরিত্র হননে কূট রাজনীতিতে মেতে ওঠে। যা বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় জনতা কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। প্রতিবাদমুখর জনগণের ওপর জনগণের ট্যাক্সের টাকায় লালিত সশস্ত্র প্রশাসনকে নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে অপব্যবহার করে সরকার রক্ত সাগর আর লাশের স্তূপ মাড়িয়ে ক্ষমতার শেষ রক্ষা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। সভা সমাবেশে চলে নির্বিচারে মারণাস্ত্রের অপব্যবহার। ক্ষত-বিক্ষত পঙ্গুত্ব নিয়ে হাজারো বনি আদম এখন শুধু কালের নির্মম সাক্ষী। কিন্তু রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তার শপথ গ্রহণ করলেও সরকারের এমন আচরণে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কতা সরকারকে অপকর্ম থেকে মুহূর্তের জন্য নিবৃত্ত করতে পারেনি। ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়ের পর সাঙ্গ হল নির্বিচারে অর্ধশত প্রাণ। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর দুই শতাধিক বনি আদমের জীবন শেষ করল রক্ত পিপাসু আওয়ামী লীগ সরকার। কী নির্মম জিঘাংসা!
স্বাধীনতা আমাদের অহঙ্কার, ইসলাম আমাদের প্রাণ। সরকারের স্বাধীনতা ও ধর্মকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে ৫ মে মধ্যরাতে ঘুমন্ত ও ইবাদতরত আলেমসমাজ ও মুসল্লিদের ওপর ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় যা দ্বিতীয় কারবালা ছাড়া আর কী হতে পারে? নিরস্ত্র, দরিদ্র ক্লান্ত মুসাফির যাদের হাতের সম্বল তসবিহ ও জায়নামাজ, যাদের মুখে আল্লাহ আল্লাহ জিকির। কেন প্রয়োজন ছিল এই ক্র্যাকডাউন? স্বদেশের জনগণের বুকে গুলি! আরো কত নির্মমতা, অবর্ণনীয়, নির্লজ্জ; ক্ষমতার এমন নির্মমতা পৃথিবী ইতঃপূর্বে দেখেনি। মাঝে মাঝে ভাবতে কষ্ট হয় আমি এদেশের নাগরিক। যেখানে মানবাধিকার গুমরে মরে। গত কয়েকদিন আগে রাজশাহী মহানগরীর ইসলামী ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম মাসুমকে সরকারের ইশারায় গুম করে ফেলে, আজ পর্যন্ত তার কোন হদিস মেলেনি। শাহাদাত নামে এক শিবিরকর্মী রাজধানীর মিরপুর থেকে নিখোঁজ হওয়ার ৭ দিনের মাথায় রাজশাহী নগরীতে র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় বলে মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করা হয়। কেন এসব? কারো যদি কোন অপরাধ চিহ্নিত হয়, রাষ্ট্রের আইন আদালত কি নেই? সবই তো সরকারের আজ্ঞাবহ। ওহ্ হত্যা করে ভয় দেখিয়ে আন্দোলন অবদমন করবে? কথিত বন্দুকযুদ্ধ বলে অপপ্রচার চালাবে? লাভ নেই, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত কোন আদর্শিক আন্দোলন কেউ নিঃশেষ করতে পারেনি; হয়ত বা সাময়িকভাবে কিছুটা অবদমন করা যায় ও ফায়দা লুটা যায়। পরবর্তীতে এ সকল আন্দোলন আরো সংগঠিত হয়ে ফুলে ফেঁপে বৃহৎ আন্দোলনে রূপ নেয়, যার নজির পৃথিবীতে ভূরি ভূরি।
আওয়ামী আমলে রিমান্ড নামক আইনি খড়গ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দেদার চলছে। জজ সাহেবরা সরকার পক্ষের মামলা আমলে নিয়ে রিমান্ড মঞ্জুর করার পর আসামির কী বেহাল দশা বা তার ভাগ্যাকাশে কী ঘটে তার খবর কি কোনদিন শুনেছেন বা উপলব্ধি করেছেন? ফৌজদারি আইনে যতটুকু জেনেছি কোন বাদির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিবাদির কাছে কোন স্পর্শকাতর বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার নিমিত্তে রিমান্ডে নেয়া হয়। কিন্তু রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে পঙ্গু অথবা অকেজো করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এখন অহরহ। রিমান্ডে নিয়ে পরিবার অথবা স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বিষয়ও অভিযোগ উঠেছে। তবে ভুক্তভোগী বা অভিযুক্ত ব্যক্তি কেবল বলতে পারেন তার সাথে কী ব্যবহার করা হয়েছে অথবা দায়িত্বশীল অভিযুক্ত ব্যক্তি কী অর্থ গ্রহণ করেছেন।
ছাত্রশিবিরের প্রিয় নেতা কেন্দ্রীয় সভাপতি মো: দেলাওয়ার হোসেনকে ডিবি পুলিশ তার বোনের বাসা থেকে গ্রেফতার করার পর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তার গ্রেফতারের পর সারা দেশে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ ছাত্র ও ছাত্রশিবিরের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা। শিবিরের সভাপতি গ্রেফতারের পরদিন এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন ছিল। সারাদেশ থেকে সেইদিনই হরতালের মত কঠোর কর্মসূচি প্রদানের জন্য দাবি থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে ২ এপ্রিল সারাদেশে কেন্দ্রীয় সভাপতি গ্রেফতারের প্রতিবাদে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের আহ্বান করা হয়। পরদিন ১৮ দলও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মুক্তি ও কেয়ারটেকার সরকার পুনর্বহালের দাবিতে হরতাল আহ্বান করে। ছাত্রশিবির তাদের ঘোষণা অনুযায়ী ছাত্রসমাজকে সাথে নিয়ে সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করে।
সরকার ছাত্রশিবিরের দাবিকে উপেক্ষা করে শিবির সভাপতিকে নিঃশর্ত মুক্তি না দিয়ে মামলার পর মামলা দিয়ে রিমান্ডের নামে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখল। ছাত্রশিবির বাধ্য হয়ে পুনরায় ১০ এপ্রিল শিবিরের সভাপতির নিঃশর্ত মুক্তি ও রিমান্ডের নামে নির্যাতনের প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও ১১ এপ্রিল হরতালের আহ্বান করে। সমগ্র জাতি প্রত্যক্ষ করেছে যে সরবভাবে ছাত্রসমাজ ছাত্রশিবিরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হরতাল সফল করেছে। এ হরতালে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তির পক্ষের ছাত্র সংগঠনগুলো সমর্থন দেয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসে এই পর্যন্ত কোন ছাত্রসংগঠনের সভাপতির মুক্তির দাবিতে এই প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল। প্রিয় নেতার মুক্তির দাবিতে সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় শান্তিপূর্ণ মিছিল সমাবেশ থেকে গ্রেফতার করা হয় অসংখ্য ছাত্রকে। সরকারের প্রত্যক্ষ ইশারায় ১২০টি মামলা তার নামে দেয়া হয়েছে, আরো শত শত মামলা রেডি করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ পর্যন্ত ৪৫ দিন রিমান্ড দেয়া হয়েছে। ২০ নভেম্বর আরো ১৭ দিনের রিমান্ড চেয়েছে প্রশাসন। তিনি শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ, তার শারীরিক অবস্থার এমন হয়েছে যে তাকে পাঁজাকোলে করে আদালতে আনতে হয়েছে; নির্যাতনের মাত্রারিক্ততায় তরল খাবার গ্রহণের শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন। সীমাহীন নির্যাতনে তিনি অজ্ঞান হয়েছেন বেশ কয়েকবার। হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। নির্যাতনের অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন এ প্রিয় নেতা। আসলে তারা কী জানতে চায় শিবির সভাপতির কাছ থেকে। কোথায় তাদের শক্তির উৎস? কোথায় তাদের টাকার উৎস? দিবালোকের ন্যায় শিবির জাতির কাছে স্পষ্ট করতে চায় আমাদের শক্তির উৎস হলো মহান আল্লাহতায়ালা। আল্লাহ যদি কারো জিম্মাদারি হয়ে যান তাদের কি আর কোন ভয় থাকে? ক্লান্তি অবস্বাদ থাকে! শিবিরের অর্থের উৎস হলো তার জন শক্তিদের বে- হিসেবে সংগঠনের জন্য নিজের দান। আরো নির্যাাতন! এ সংগঠনের জনশক্তির জানা আছে দ্বীনের পথে অবিচল থাকার অপরাধে রাসূলের সাহাবীদের জীবনে নির্মম নির্যাতনে ও আল্লাহর ওপর দৃঢ়তা ও তার সাহায্যের উপমা। সাইয়্যেদ কুতুব শহীদ ও জয়নাব আল গাজ্জালীর মতো জিন্দা দিল আপসহীন মর্দেমুজাহীদের উদ্দীপ্ত প্রেরণার বাতিঘর। নির্যাতন নিষ্পেষণ করে কোন ব্যক্তিকে চিরতরে নিঃশেষ করা যায় কিন্তু তার আদর্শকে শেষ করা কখনো সম্ভব নয়। আমাদের সকল জনশক্তির ধমনীতে শহীদের রক্ত। ছাত্রশিবিরের শত তরুণ জিন্দা দিলের তপ্তরক্তে আমরা খরিদ করেছি জনপদ থেকে জনপদ। আমাদের আদর্শ হচ্ছে কালজয়ী আদর্শ মুহম্মদ (সা)-এর আদর্শ। যুগে যুগে এ আদর্শকে যারা শেষ করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারাই ইতিহাসের অতল গহবরে নিমজ্জিত হয়েছে, হয়েছে ঘৃণিত বিকৃত লাঞ্ছিত ও অপমানিত।
প্রিয় নেতার মমতাময়ী মায়ের আর্তনাদে শোকাহত আজ লক্ষ তরুণের মা। সবার প্রশ্ন কেন পাষণ্ডতা? গ্রেফতারের পর অনেক দিন তার সন্তানের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি। তার মা সুদূর ঠাকুরগাঁও থেকে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন সন্তানের খোঁজে কিন্তু নিষ্ঠুর প্রশাসন সে সুযোগ পর্যন্ত দেয়নি। তার মা তৈয়বা খাতুন এখন শুধু সন্তানের জন্য বিলাপ করেন। আর দোয়া করেন আর কোন মায়ের অবস্থা যেন এ রকম না হয়।
জাতির কাছে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন একটি আদর্শবাদী ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী ছাত্রসংগঠনের সভাপতির সাথে সরকারের এমন অশোভন আচরণ যদি হয় তাহলে একজন সাধারণ ছাত্রের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে? এত রিমান্ড, নির্যাতন! কোথায় বাংলাদেশের মানবাধিকার? কোথায় বাংলাদেশের সরব মিডিয়া? ধিক তোমাদের জন্য। এরা জাতির জন্য কোন উপকারে আসবে না, এরা কোন অ্যাড ফার্মের পা-চাটা গোলাম, এরা জাতির মধ্যে বিভক্তি ও দাঙ্গা বাঁধাতে ওস্তাদ; সাম্রাজ্যবাদীদের মেহমান হিসেবে সাদরে গ্রহণের প্রমাদ গুনছে। জাতির বিবেকের কাছে নিঃশেষে প্রশ্ন করতে চাই ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার শুনেছেন কোন প্রমাণ কি দেখেছেন? পেয়েছেন? সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, মাদকাসক্ততা, ইভটিজিং? প্লিজ! আপনাদের ভাই হিসেবে যাচাই করুন। আমাদের পক্ষ নেবেন? না, তারও প্রয়োজন নেই। সত্যকে সত্য বলবেন আর মিথ্য বলার সৎ সাহস দেখাবেন। হয়তো বলবেন কেউ তাহলে শিবিরের বিরুদ্ধে এত অপপ্রচার কেন? তাহলে বলতে হয় স্বয়ং নবী (সা)ও যখন কালিমার দাওয়াত নিয়ে মানুষের কাছে গেলেন তখন তাকে গণক, পাগল, জাদুকর ইত্যাদি বলল। কিন্তু তিনি কি তার মিশন থেকে বিচ্যুত হয়েছেন? কুরআনে মুমিনের ওপর নির্যাতনের কারণ বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে- “তাদের অপরাধ হচ্ছে একটাই তারা মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তা’য়ালার ওপর ঈমান এনেছে।” (সূরা বুরুজ)
ছাত্রশিবির আজ সবচেয়ে মজলুম; ধৈর্যের বাঁধ এখনো আঁকড়ে ধরে আছে। সরকারের অবিবেচকের মত বাড়াবাড়ি কখনো মেনে নেয়া যায় না। সংগঠনের প্রিয় নেতাকে কারারুদ্ধ করে রিমান্ডের নামে নির্মম নির্যাতন অসহ্য। যার জন্য প্রতিটি কর্মী জীবন দিতে প্রতিটি নেতাকর্মী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তার প্রতি জুলুম প্রত্যেক জনশক্তির হৃদয়ে অনবরত রক্তক্ষরণ বৈ কী হতে পারে? সরকারের এমন ফ্যাসিস্ট আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হাজার হাজার ছাত্র কারারুদ্ধ। সরকার তরু তাজা স্বপ্নিল সোনার বাংলার আগামীর কারিগরদেরকে দলিত মথিত করে নিঃশেষ করতে মরিয়া হয়ে উঠছে। গণজাগরণের নামে একদল ভ্রান্ত যুবকদের দিয়ে স্বাধীনতা ও ইসলামকে সম্মুখ সমরে হাজির করে জাতির মধ্যে দ্বিধা বিভক্তির রেখা টেনে দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে; অন্য দিকে অসম্প্রদায়িক বাংলা গড়ার ঢাক ঢোল পেটাচ্ছে! হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে সত্য ও সুন্দরকে গলাটিপে নিঃশেষ করে নয়া ইতিহাস রচনার মহাপ্রলয়ঙ্করী আয়োজন চলছে তরুণ প্রজন্মের ধুয়া তুলে। ছাত্রশিবির দরাজ কণ্ঠে বলতে পারে ছাত্রশিবিরের লক্ষ লক্ষ তরুণ তাজা প্রাণকে বাদ দিয়ে আজকের তরুণ প্রজন্ম কল্পনা করা যায় না। শুধু বয়স নয় মন মননে মেধা যোগ্যতায় ছাত্রশিবির তরুণ প্রজন্মের অহঙ্কার। ছাত্রশিবিরের ন্যায্য গণতান্ত্রিক অধিকার না দিয়ে জেল-জুলুম হত্যা গুমের যে রাজনীতির সূচনা আওয়ামী ১৪ জোট শুরু করেছে, ক্ষমতার লোলুপতায় বিরোধী মতকে শেষ মারণকামড় দিয়ে শেষ রক্ষা পেতে চায় তার পরিণাম শুভ হবে না। সত্যিকারার্থে দলের প্রিয় নেতারা যখন নির্যাতনের শিকার হন কর্মীরা আরো বেশি ক্ষিপ্রগতিতে লক্ষ্য অর্জনের সম্মুখে এগোতে থাকে নিরলসভাবে। জুলুম নির্যাতনের সমুচিত জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে পুরোদমে, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়। ছাত্রশিবিরের নেতা কর্মীরাও তার ব্যতিক্রম নয়।
সরকার বা বিরুদ্ধবাদীরা সাময়িকভাবে এর থেকে ফায়দা লুটতে পারে কিন্তু ভুক্তভোগীরাই ভাল করে জানে প্রকৃত ঘটনা। সময়ে এর জবাব মিলবে, ইতিহাস এর সাক্ষী। সম্প্রতি প্রশাসন ও সরকারি দলের সাথে শিবিরের সংঘর্ষের কিছু ঘটনা ঘটেছে; যা ছাত্রশিবিরের মতো একটি দায়িত্বশীল ছাত্রসংগঠন সমর্থন করে না। তাতে মিডিয়া ও প্রশাসন কেবল শিবিরকেই দায়ী করেছে; ঘটনার সূত্রপাত কোথা থেকে হলো তার কোন কারণ কি জাতির কাছে জানানো হয়েছে! এসব ঘটনার নেপথ্যে কে বা কারা? যদি একজন অসহায় মানুষ নির্যাতন সহ্য করতে করতে জীবনহানির প্রান্তিক সীমানায় আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা করে তাহলেও কি তাকে দায়ী করা উচিত? ছাত্রশিবির বিশ্বাস করে মজলুমের ফরিয়াদ পৃথিবীর কেউ শুনতে না পেলেও মহাশক্তির মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ভালো করেই শুনতে পান। ছাত্রশিবির আরো বিশ্বাস করে যে তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের খড়গহস্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়। তাই তাড়াহুড়া নয় হিংসা-বিদ্বেষ নয় আল্লাহ ও রাসূল (সা)-এর পথ ধরে চলতে গিয়ে যে সকল বাধা আসবে সকল বাধাকে মাড়িয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে যুবসমাজকে সাথে নিয়ে সত্য সুন্দর আগামী গড়ার মধ্য দিয়ে নেতার ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতনের সমুচিত জবাব দেবে ছাত্রশিবির। ইনশাআল্লাহ।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও
কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply