ছাত্রশিবির : দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরিই যার লক্ষ্য

তৌহিদুর রহমান সুইট#

ছাত্ররাজনীতি আজ আমাদের দেশের মানুষের নিকট একটি আতঙ্কের নাম। দেশের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ আজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছাত্ররাজনীতির কুফল ভোগ করছে। মূল রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ফলে ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িতরা হয়ে উঠছে বেপরোয়া, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, ধর্ষণকারী ও মাদকাসক্ত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরাজ করছে অস্থিরতা, ঘটছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, পিতা-মাতা ও অভিভাবকেরা তাদের সন্তানকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নসহ জাতীয় উন্নয়নে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বর্তমান ছাত্ররাজনীতির এই ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করছে। ফলে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন যেমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে সামাজিক স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা।
ছাত্ররাজনীতি কাজ করবে শুধুমাত্র ছাত্রসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে এবং ছাত্রদের অধিকার নিয়ে যেমন- ছাত্রদের বর্ধিত বেতন, আবাসন সমস্যা, পরিবহন সঙ্কট, শিক্ষক সঙ্কট ও শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে। এর বাইরে সমাজ সংস্কারমূলক, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও দেশের যেকোনো জাতীয় সঙ্কট মুহূর্তে তারা কাজ করতে পারে। কিন্তু আমরা দেখি বর্তমান ছাত্রসংগঠনগুলো ছাত্রসংশ্লিষ্ট ইস্যু বাদ দিয়ে মূল রাজনীতির প্রচার, প্রসার, কর্মসূচি বাস্তবায়ন, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ইত্যাদির সাথে জড়িত। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ক্রমাগত বাড়ছে, চলছে অবাধ ভর্তিবাণিজ্য, ঘটছে ছাত্রীদের সম্ভ্রমহানি এমনকি ছাত্রহত্যার মতো জঘন্য কাজও আজ খুব সহজ হয়ে গেছে।
সমাজ সংস্কারক ও বিজ্ঞজনেরা ছাত্ররাজনীতির এই ক্রমবর্ধমান অধঃপতনের জন্য বারবার ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার কথা বলেছেন। কিন্তু কোনো গণতান্ত্রিক দেশে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করা সম্ভব না। ছাত্ররাজনীতির এই করুণ অবস্থার জন্য তারা অছাত্রদের নেতৃত্ব ও রাজনীতিবিদদের দায়ী করেছেন। আমাদের দেশের প্রায় সব কয়টি ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বই এখন অছাত্রদের হাতে, যাদের অ্যাকাডেমিক ছাত্রত্ব অনেক আগেই শেষ হয়েছে অথবা তারা নেতৃত্বে থাকার জন্য ছাত্রজীবন দীর্ঘ করছেন। আবার অনেক ছাত্রনেতাকে বিয়ে করে ঘর-সংসার, ব্যবসায় বাণিজ্য ও ঠিকাদারি করতে দেখা যায়।
নেতৃত্বের প্রতি এত আকর্ষণের কারণ হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা যেমন অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়া, হোস্টেলে বা হলে ফ্রি থাকা-খাওয়া, আর্থিক উন্নতি এবং মূল দলে পদ পাওয়া ইত্যাদি। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ীরা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ছাত্রসংগঠনগুলো যদি তাদের কাছে চাঁদাবাজি না করতো তাহলে অন্তত ১৫ শতাংশ কম মূল্যে তারা ক্রেতাদের নিকট পণ্য সরবরাহ করতে পারতেন। পরিবহন শ্রমিকদের সাথে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের ফ্রি যাওয়া নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা শোনা যায়, যা শুধুমাত্র পরিবহন মালিকদেরই ক্ষতি করে না, বরং সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। আমরা দেখেছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেছেন, তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে কিভাবে সে বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ পেল আর কেনই বা এত অপকর্মের পরও তাকে শাস্তি দেয়া হলো না? তাহলে কি এর পেছনে মূল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ইন্ধন আছে? শুধু এটিই না, আমরা আরও দেখেছি বর্তমান সরকারের আমলেই সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ পর্যন্ত খুন হয়েছে অনেক মেধাবী ছাত্র। কিন্তু কোন একটিরও বিচার হয়নি বরং খুনিরা বহাল তবিয়তে প্রশাসনের সামনে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে যেমন প্রশাসনের স্বচ্ছতা, সামর্থ্য ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, ঠিক তেমনি এসব সন্ত্রাসী আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এদের এই সাহস ও ধৃষ্টতার কারণ খুঁজতে গেলে ঠিকই দেখা যায় কোন না কোন রাজনৈতিক দল ও নেতার সুনজর (!) রয়েছে তাদের ওপর।
২০০২ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি মন্তব্য করে সেটি হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের উন্নতির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো সে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দেশের উন্নতির চেয়ে নিজের উন্নতির ব্যাপারে বেশি উদ্বিগ্ন। নেতৃবৃন্দের অধিকাংশই কালো টাকার অধিকারী। রাজনীতির এই দূষিত অবস্থায় সৎ ও দক্ষ লোকেরা রাজনীতিতে আসছে না। ফলে আমাদের রাজনীতিতেও গুণগত কোনো পরিবর্তন আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
নিজের দেশ সম্পর্কে এমন মন্তব্য শুনলে সত্যিই আমরা হতাশ হয়ে যাই। আমাদের চোখের স্বপ্নগুলো নিমিষেই কালো মেঘ হয়ে ভাসতে থাকে, ভাবতে থাকি এই কালো মেঘ কখন কেটে যাবে, সেখানে আসবে একটি আলোময় সূর্য। যে আলোয় আলোকিত হয়ে বিশ্বের মানচিত্রে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলবে একটি নাম বাংলাদেশ। কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারি না আমরা, তাই আমাদের অপেক্ষা করতে হবে একটি অজানা সময় পর্যন্ত। আজকের ছাত্ররাজনীতির এই নোংরা পরিবেশের কারণে মেধাবী ছাত্ররা ছাত্ররাজনীতিতে আসছে না, যার ফলে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে মেধাবী, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব থেকে।
ছাত্ররাজনীতির এই দুরবস্থা যখন আমাদের হতাশ করে তুলেছে, ঠিক সে মুহূর্তে একটি ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এ দেশের দেশপ্রেমিক সচেতন নাগরিকদের চোখে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটি যেন এ দেশের জন্য সত্যিই আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। প্রচলিত ছাত্ররাজনীতির চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তিব্যাণিজ্য, সিটব্যাণিজ্য ইত্যাদি থেকে বের হয়ে এসে গঠনমূলক কাজ করে যাচ্ছে এ দেশের কিশোর, তরুণ ও যুবকদের মধ্যে। তাদের এই গঠনমূলক কার্যক্রমের ফলে ধীরে ধীরে তারা এ দেশের ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের কাছে হয়ে উঠছে জনপ্রিয়। ছাত্রশিবিরের উদ্দেশ্য, আদর্শ, কর্মপদ্ধতি ও কার্যক্রম সব কিছুই অন্যান্য ছাত্রসংগঠন থেকে আলাদা। এটি কোনো সংগঠন নয়, যেন একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ছাত্রশিবির কাজ করছে এ দেশের ছাত্রসমাজের মধ্যে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যখন আমাদের নৈতিকতা শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, ছাত্রশিবির সেখানে শুধু নৈতিকতা শিক্ষাই নয়, বরং তা চর্চার উপযুক্ত পরিবেশও তৈরি করেছে সংগঠনের অভ্যন্তরে। শুধুমাত্র আইনের কঠোরতা দিয়ে কোনো মানুষকে ভালো করা যেমন সম্ভব নয়, আবার কোন অন্যায়কে সমাজ থেকে চিরতরে মুছে ফেলাও সম্ভব নয়। বরং আইনের শাসনের পাশাপাশি একটি সুন্দর পরিবেশও প্রয়োজন, যেখানে থাকবে পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য, আন্তরিকতা, সহযোগিতা আর ত্যাগের মানসিকতা। ছাত্রশিবির সকল ক্যাম্পাসে এবং সমাজের সকল ক্ষেত্রে এমন একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ছাত্রশিবিরের এই আলোর মশাল থেকে আলো নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র আজ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে, যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং পরিচিতি লাভ করেছে সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক আর পরিশ্রমী হিসেবে।
ছাত্রশিবির একটি গঠনমূলক ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রসমস্যা নিয়ে কাজ করছে তার যাত্রালগ্ন থেকেই। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশিবির ছাত্রদের অধিকার আদায়ে সবসময় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে আসছে। ছাত্রদের মেধা বিকাশের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রোগ্রাম ও প্রতিযোগিতা যেমন- বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা, ট্যালেন্ট সার্চ, কুইজ প্রতিযোগিতা ইত্যাদি প্রোগ্রামের আয়োজন করে থাকে। সাহিত্যচর্চার জন্য রয়েছে নিজস্ব মাসিক পত্রিকা ছাত্রসংবাদ ও কিশোরকণ্ঠ। ইংরেজি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা। বলা হয় ‘English is an International language. It is the key to access of any country of the world. তাই ছাত্রদের ইংরেজিতে দক্ষ করে তোলার জন্য ছাত্রশিবিরের রয়েছে মাসিক ও দ্বিমাসিক ইংরেজি পত্রিকা। নকল আজ আমাদের সমাজের মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা আমাদের ছাত্রসমাজকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অন্য ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা যখন নকল করা নিয়ে শিক্ষকদের সাথে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাচ্ছে সেখানে ছাত্রশিবির তাদের সকল নেতাকর্মীকে এ থেকে বিরত রেখেছে। ইভটিজিং ও মাদক একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দেখা যায় ছাত্র ও যুবসমাজ এই অপরাধের সাথে সবচেয়ে বেশি জড়িত। ছাত্রশিবির এ সকল অপরাধ ও অনৈতিক কাজ থেকে ছাত্রদের শুধু হেফাজত করাই নয় বরং এ সমস্ত অপরাধ সমাজ থেকে নির্মূল করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ছাত্রশিবির ছাত্রসমস্যার পাশাপাশি দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি যে দায়বদ্ধতা রয়েছে তার জন্য বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রেখেছে। ছাত্রশিবির তার সামর্থ্য অনুযায়ী গরিব ও মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান, শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প, বৃক্ষ রোপণ, ফ্রি শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, রক্তদান কর্মসূচি, ফ্রি রক্তের গ্রুপিং, ফ্রি কোচিং ক্লাস, বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে পথশিশুদের মধ্যে খাবার বিতরণ, ঈদের সময় পথশিশুদের নতুন পোশাক ও দুস্থদের সেমাই-চিনি বিতরণ ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ ছাড়াও মারাত্মক ব্যাধি এইডস ও মাদকের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই দিবসগুলোতে র‌্যালি, সভা, সমাবেশ ও উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।
যেকোনো গঠনমূলক কাজের জন্য প্রয়োজন একটি সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা, সদিচ্ছা, অপরের মতামতকে অগ্রাধিকার প্রদান আর ত্যাগের মানসিকতা। ছাত্ররাজনীতির উদ্দেশ্যই হচ্ছে ছাত্রদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য গড়ে তোলা, গণতন্ত্রের চর্চা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। যেন তারা পরবর্তীতে দেশ ও জাতিকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে ও পরিচালনা করতে পারে এবং বিশ্বের কাছে নিজের দেশকে তুলে ধরতে পারে। দেশের যেকোনো দুর্যোগে কাজ করতে পারে। বাস্তবে প্রচলিত কোনো ছাত্রসংগঠনের মধ্যেই আমরা তা খুঁজে পাই না বরং নেতৃত্বের জন্য আর আধিপত্য বিস্তারের জন্য মারামারি এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বীকে খুনের মতো ঘটনাও ঘটাতে দেখা যায়। আবার নতুন ছাত্রদের নানা ধরনের লোভ-লালসা আর ভয়ভীতি দেখিয়ে তারা নিজ নিজ সংগঠনে নিয়ে আসে। একমাত্র ছাত্রশিবির এ থেকে ব্যতিক্রম এবং তারা সফল। ছাত্রশিবির আন্তরিকতা, ভালোবাসা আর চারিত্রিক গুণাবলি দিয়ে ছাত্রদের সংগঠনের দাওয়াত দিয়ে থাকে। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে এক অনুপম শৃঙ্খলা, রয়েছে ভ্রাতৃত্ববোধ, পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা আর ত্যাগের মানসিকতা। দায়িত্বশীল বা নেতা নির্বাচনে অথবা কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে রয়েছে গণতন্ত্র চর্চার বাস্তব ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। নেতৃত্বের জন্য অন্য ছাত্রসংগঠনে যখন মারামারি হয় তখন ছাত্রশিবিরের নেতৃত্ব না নেয়ার জন্য অথবা নেতৃত্বের মতো কঠিন দায়িত্বের জন্য কান্নার রোল পড়ে যায়। কারণ তারা জানে নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন আর ব্যক্তি উন্নয়ন নয় বরং ইসলামের ঝান্ডাবাহী এ কাফেলার নেতৃত্ব গ্রহণ করা মানে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড়ানো, আমানত রক্ষার কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া।
নিন্দুকেরা চিরকালই সত্যকে ভয় পায়, অন্যের মাঝে নিজের দুর্বলতা খুঁজতে থাকে, নিজ স্বার্থের জন্য করতে পারে না এমন কোন কাজ নেই। ছাত্রশিবিরের সফলতা কখনোই মেনে নেয়নি একটি স্বার্থান্বেষী মহল। তাই বারবার তারা চেয়েছে ছাত্রশিবিরকে এ দেশ থেকে মুছে ফেলতে। সে জন্য তারা কখনো কখনো সরাসরি আঘাত হেনেছে আবার কখনো পরোক্ষভাবে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়েছে ছাত্রশিবিরকে মুছে ফেলার জন্য। কিন্তু আমরা জানি আল্লাহর ফয়সালা চূড়ান্ত। বাতিলরা যতই চেষ্টা করুক না কেন সত্যের আলোকে তারা কখনো নিভিয়ে দিতে পারবে না। কুরআনে সূরা আস সফের ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘কাফেররা তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। অথচ আল্লাহর ইচ্ছা তিনি তার নূরকে প্রজ্বলিত করবেন তা কাফেরদের যতই অপছন্দ হোক না কেন।’ তাওহিদে বিশ্বাসী একদল তরুণের এই কাফেলা কখনো পিছপা হয়নি, চলেছে সম্মুখ পানে সকল বাধা ভয়কে পায়ে দলে। ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে যারা বিজয়ের স্বপ্ন দেখাতে পারে, কালো মেঘ দেখে যারা ভয় পায় না, বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি যাদের চোখ ও মনের আলো নেভাতে পারে না তাদের কখনো আটকে রাখা সম্ভব নয়। রাসূলের (সা:) আদর্শবাহী এ কাফেলা এগিয়ে চলছে স্রোতের গতিতে আর আঘাত হানছে এ দেশের প্রতিটি কিশোর, তরুণ ও যুবকের মনের তীরে। যে আঘাতে এক দিকে ভেঙে চুরমার হচ্ছে মানবরচিত মতবাদের ধারক-বাহকেরা, অপর দিকে গড়ে উঠছে ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি সুউচ্চ মিনার। যে মিনারের ইট হচ্ছে উত্তম চারিত্রিক গুণাবলিসম্পন্ন একদল সাহসী তরুণ।
অপার সম্ভাবনাময় আমাদের বাংলাদেশ যাকে আমরা ভালোবেসে বলি সোনার বাংলা। কিন্তু স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে গেলেও আমরা সত্যিকারের স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারিনি। দেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারিনি। ক্ষুধা, দরিদ্রতা, অশিক্ষা এখনো আমাদের এগিয়ে চলার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। জনগণের জানমালের কোনো নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারিনি, দুর্নীতির কালো থাবা আমাদের সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের অভাব। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সে নেতৃত্ব তৈরির কাজই করে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে প্রতিটি সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। নিঃসন্দেহে ছাত্রশিবির এ দেশের জন্য একটি আশীর্বাদ। তারাই একদিন গড়বে সত্যিকারের সোনার বাংলা আর সোনার মানুষ।

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় আইটি সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply