ছাত্রশিবির সভাপতিকে রিমান্ডের নামে নির্মম নির্যাতন ছাত্রসমাজের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ

 মুহাম্মদ আবদুল জববার

সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণের ভবিষ্যৎ কারিগর ছাত্রসমাজ। ছাত্রসমাজের আদর্শিক সৌন্দর্য, দেশপ্রেম ও মানবতাবোধ অর্জনের ওপর নির্ভর করে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভালো ও মন্দ। আদর্শিক, নৈতিক, মানবিক ও দেশপ্রেমলব্ধ তরুণের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক বেশি। আবার বাস্তব সমস্যার ভিড়ে নিজেকে সত্য ও সুন্দরের পক্ষে জাতির জন্য তৈরি করে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে উৎসর্গ করাও চাট্টিখানি কথা নয়। ক্ষয়িঞ্চু পৃথিবীর ধ্বংসলীলার স্তুপের তুঙ্গে দাঁড়িয়ে আকাশচুম্বী আশাবাদী কালজয়ী যে কোনো আদর্শ বাস্তবায়ন কোনো নোবেল বিজয়ীর বা সিনেমার বুলি নয়। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি যোগ-বিয়োগ নিরন্তর হতাশায় কেবল অতল গহ্বরে তলিয়ে দিতে থাকে। পরস্পর বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের ফাটলে আদর্শচ্যুতি, দুর্নীতি ও সাম্রাজ্যবাদীদের উপর্যপুরি কষাঘাতে সমগ্র জাতি হতভম্ব, বাকরুদ্ধ; অচলপ্রায়। বাংলাদেশ নামক লাল-সবুজের পতাকাখচিত মানচিত্র ও সবুজ-শ্যামল ভূখণ্ডের যাত্রাতেই ছাত্রসমাজের  নির্ঘাত ধ্বংসস্তুপ মাড়িয়ে দেশপ্রেমিক, সৎ, যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির প্রত্যয়ে আপসহীন, দৃঢ়চিত্তে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পথচলা শুরু হয়। ৩৬ বছরে এই জাতিকে অসংখ্য সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে ছাত্রশিবির। এই সংগঠন মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও দেশপ্রেমে প্রজ্বল একদল কর্মনিষ্ঠ তরুণ তৈরির অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে এর অপ্রতিরোধ্য এগিয়ে যাওয়াকে পেশিশক্তির মন্ত্রে দিক্ষিত ও দেশদ্রোহীদের কাছে মোটেও ভালো লাগেনি। তাই সর্বশক্তি দিয়ে এর অগ্রযাত্রাকে ধূলায় মলিন করতে হীন চক্রান্ত নেই যার আশ্রয় বিরুদ্ধবাদীরা গ্রহণ করেনি। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রহত্যা, নিপীড়ন, ক্যাম্পাস বন্ধ করে ছাত্রসমাজকে জিম্মি করে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখে ভয়-হুমকি-ধমকি দিয়ে রক্ত পিচ্ছিল করেছে এই অকুতোভয় সংগ্রামী কাফেলাকে। নির্যাতন, হত্যা ও সন্ত্রাসের শিকার এই সংগঠনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও মিডিয়া আগ্রাসন চালিয়েছে যৌথভাবে। যা এখনও অব্যাহত। সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আর মিথ্যাকে সত্য দিয়ে ঢাকার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে হরদম। রাষ্ট্রের এহেন ভূমিকায় দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির কাজ এখন হুমকির মুখে।
দেশের সকল দুর্যোগে ছাত্রসমাজকে সাথে নিয়ে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রশিবির। স্বেচ্ছাচারী ফ্যাসিস্ট শাসকদের অপ্রতিরোধ্য অবিবেচক অনাচার রুখে দিতে প্রতিবাদ করে আসছে ছাত্রশিবির। তাই ক্ষমতালোভী সরকারের চরম দাবদাহে ছাত্রশিবিরকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে রাষ্ট্রের সকল শক্তি ও সামর্থ্যকে একত্র করে। বর্তমান আওয়ামী জোট সরকার ক্ষমতার সিংহাসনে চেপে বসার পর থেকে বার বার হত্যা, সন্ত্রাস চালিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডাকাতদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। ছাত্রশিবির এর প্রতিবাদ করতে গেলে হারাতে হয়েছে অনেক তাজা প্রাণকে। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি  অন্তঃকোন্দলে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান। এই সময় হাজার হাজার ছাত্রকে বিনা কারণে কারারুদ্ধ করেছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। ছাত্রত্ব হারিয়ে শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়েছে জাতির ভবিষ্যতকে। সন্ত্রাসের ভয়ঙ্কর তাণ্ডবে তটস্থ হয়ে সমগ্র জাতি প্রধানমন্ত্রীকে ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরার আর্তি জানালেও তার কোনো প্রতিকার, সুরাহা জাতির ভাগ্যে জুটল না।  দিন-দুপুরে রাজপথে ২৮ অক্টোবর ২০০৬-এর মতো বিশ্বজিৎসহ অসংখ্য বনি আদমকে বলির খাতায় নাম লিপিবদ্ধ করতে হলো। এখনও কেউ জানে না এর শেষ কোথায়, সবাই নিরুপায়, নির্বাক স্বাধীন জাতি!
ইসলামী ছাত্রশিবির এসবের প্রতিবাদ করে ছাত্রসমাজকে নিয়ে দেশের শহরে, নগরে, বন্দরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। তাই ছাত্রশিবির বাকশালী সরকারের একমাত্র চক্ষুশূলে পরিণত হয়। এ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হত্যা, গুম, জেল-জুলুমের স্টিম রোলার চালিয়ে নিঃশেষ করতে সর্বগ্রাসী চেষ্টায় নিমজ্জিত রাষ্ট্র। ছাত্রশিবিরের মেধাবী নেতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের প্রিয়মুখ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি শরীফুজ্জামান নোমানী হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা শুরু করে খুনের মহোৎসব। একদিকে দলীয় সন্ত্রাস অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলে সমান্তরাল গতিতে। এ যেন এক খুনের হোলি খেলা! এর মাত্র কয়েকদিন আগে রাজশাহীর মেধাবী ছাত্র হাফিজুর রহমান শাহীনকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। রাষ্ট্র যখন হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করে তখন কার কাছে বিচার চাইবে এই অবলা জাতি? এভাবে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে লাশের কফিন যুক্ত হয়েই চলল। পরিবার, সমাজ, জাতি গঠনের প্রত্যয়ে যে সন্তানকে সর্বোচ্চ বিদ্যানিকেতনে পাঠানো হলো, তার কফিন সামনে রেখে কার কাছে বিচার চাইবে তার পরিবার-পরিজন? জামালপুরে হাফেজ রমজান আলীকে দিনদুপুরে শিবির করার অপরাধে স্থানীয় ছাত্রলীগ ক্যাডাররা জবাই করে রেললাইনের ওপর ফেলে রাখে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নরপিশাচদের হাতে মহিউদ্দিন মাসুম ও হারুনুর রশীদ কায়সার নির্মমভাবে হত্যার বছরের মাথায় পুলিশ প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ অস্ত্রের মহড়ায় ক্ষত-বিক্ষত হয় মেধাবী মুখ শিবিরনেতা মাসুদ বিন হাবিব ও মুজাহিদুল ইসলাম মাসুম। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার মাটিতে দীনের এই অপ্রতিরোধ্য কাফেলাকে অপদমনের চেষ্টার অংশ হিসেবে সরকারের নির্দেশে প্রশাসন ঢাকা যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে নামিয়ে চিরতরে গুম করে ক্যাম্পাসের সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রদীপ্ত আল মুকাদ্দাস ও ওয়ালীউল্লাহকে। কখন থামবে তাদের স্বজনদের নিরন্তর অশ্রুধারা; কখন শেষ হবে পথপানে দৃষ্টি নিক্ষেপের শেষ সময়, কেউ বলতে পারে না। কার কাছে আছে এর উত্তর তাও জানা নেই আমাদের।
এরপর আরো বীভৎসতা। যার উদাহরণ বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতোপূর্বে কোনো পাতায় লেখা হয়নি। এক নির্মম বর্বরতা রক্ত-পিপাসার হোলিখেলা! কথিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইস্যুতে যুদ্ধাপরাধের ধুয়া তুলে সরকার একতরফাভাবে জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে ইসলামী নেতৃত্বের চরিত্র হননে কূট রাজনীতিতে মেতে ওঠে, যা বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় জনতা কোনোভাবেই মেনে নেয়নি। প্রতিবাদমুখর নিরস্ত্র জনগণের ওপর জনগণের ট্যাক্সের টাকায় লালিত সশস্ত্র প্রশাসনকে নির্লজ্জভাবে অপব্যবহার করে সরকার রক্তসাগর আর লাশের স্তুপ মাড়িয়ে ক্ষমতার শেষ রক্ষা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। সভা-সমাবেশে চলতে থাকে নির্বিচারে মারণাস্ত্রের অপব্যবহার। ক্ষত-বিক্ষত পঙ্গুত্ব নিয়ে হাজারো বনি আদম এখন শুধু কালের নির্মম সাক্ষী। কিন্তু রাষ্ট্র নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তার শপথ গ্রহণ করলেও সরকারের এমন আচরণে বিচারের বাণী বরাবরের ন্যায় নিভৃতে কাঁদে। দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সর্বপ্রকার সতর্কতা সরকারকে অপকর্ম থেকে মুহূর্তের জন্য নিবৃত করতে পারেনি। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের পর প্রতিবাদমুখর ছাত্রজনতার ওপর পুলিশ-র‌্যাব ও বিজিবির গুলিতে হারিয়ে গেল অর্ধশত প্রাণ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাস্সিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম মিথ্যাচারের ওপর ভিত্তি করে রচিত সাজানো রায়ের পর দুই শতাধিক বনি আদমের জীবন শেষ করল রক্ত-পিপাসু আওয়ামী লীগ সরকার। কি নির্মম জিঘাংসা!
স্বাধীনতা আমাদের অহঙ্কার, ইসলাম আমাদের প্রাণ। সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সুকৌশলে স্বাধীনতা ও ধর্মকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে ৫ মে মধ্যরাতে ঘুমন্ত ও ইবাদতরত আলেমসমাজ ও মুসল্লিদের ওপর ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালালো যা দ্বিতীয় কারবালার ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে লেখা হয়ে থাকবে। নিরস্ত্র, দরিদ্র কøান্ত মুসাফির যাদের হাতের সম্বল তসবিহ ও জায়নামাজ, যাদের মুখে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ যিকির, তাদেরই ওপর চালানো হলো রাতের অন্ধকারে এলাকার সব আলো নিভিয়ে দিয়ে মিডিয়ার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। রক্তের সাগর বইয়ে দেয়া হলো সেখানে। দেশবাসীকে রাখা হলো অন্ধকারে। তাইতো ভোর না হতেই হোসপাইপের মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে ধুয়ে-মুছে ষাফ-সুতরো করা হলো রক্তের দাগগুলো। সরিয়ে ফেলা হলো মুসল্লিদের পড়ে থাকা অসংখ্য জুতা-সেন্ডেল আর ব্যবহৃত অন্যান্য সামগ্রীগুলোও। কিন্তু তারপরও প্রকাশ না হয়ে থাকেনি সেদিনের সেই নির্মম গণহত্যার খবর। বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার মাধ্যমে সারাবিশ্ব জেনে গেছে সেদিন শাপলা চত্বরে কী ঘটেছিল। বিশ্বের প্রভাবশালী টিভি চ্যানেল আলজাজিরা সেদিনের সংবাদ বেশ গুরুত্বের সাথেই প্রচার করেছে। এবং তারা দাবিও করেছে যে তাদের কাছে সেদিনের মধ্যরাতের গণহত্যার ভিডিও চিত্র সংরক্ষিত আছে।
কিন্তু কেন প্রয়োজন ছিল এই ক্র্যাকডাউনের? স্বদেশের জনগণের বুকে কেন এই গুলি বর্ষণ? আরো কত নির্মমতা, অবর্ণনীয় নির্লজ্জতা প্রত্যক্ষ করবো আমরা? ক্ষমতার এমন নির্মমতা পৃথিবী ইতিপূর্বে দেখেনি। মাঝে মাঝে তাই ভাবতে কষ্ট হয় যে আমি এদেশেরই নাগরিক- যেখানে মানবাধিকার গুমরে মরে। এই তো কয়েকদিন আগে রাজশাহী মহানগরীর ইসলামী ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম মাসুমকে সরকারের ইশারায় গুম করে ফেলা হলো, আজ পর্যন্ত তার কোনো হদিস মিলল না । শাহাদাত নামে এক শিবিরকর্মী রাজধানীর মিরপুর থেকে নিখোঁজ হওয়ার ৭ দিনের মাথায় রাজশাহী নগরীতে র‌্যাবের সাথে কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয় বলে মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করা হলো। কেন এসব? কারো যদি কোনো অপরাধ চিহ্নিত হয়, রাষ্ট্রের আইন-আদালত কি নেই? সবই তো সরকারের আজ্ঞাবহ। তাই বুঝতে কষ্ট হয় না যে, হত্যা করে ভয় দেখিয়ে আন্দোলন অবদমন করার স্বপ্ন দেখছে আওয়ামী সরকার। কথিত বন্দুকযুদ্ধ বলে অপপ্রচার চালিয়ে তারই জানান দিতে চায়। লাভ নেই, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত কোনো আদর্শিক আন্দোলন কেউ নিঃশেষ করতে পারেনি; হয়তোবা সময়িকভাবে কিছুটা অবদমন করা যায় ও ফায়দা লুটা যায়। পরবর্তীতে এ সকল আন্দোলন আরো সংগঠিত হয়ে ফুলে-ফেপে বৃহৎ আন্দোলনে রূপ নেয়, যার নজির পৃথিবীতে ভুরি ভুরি।
আওয়ামী আমলে রিমান্ড নামক আইনী খড়্গ বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর দেদারসে চলছে। জজ সাহেবরা সরকার পক্ষের মামলা আমলে নিয়ে রিমান্ড মঞ্জুর করার পর আসামীর কী বেহাল দশা বা তার ভাগ্যাকাশে কী ঘটে তার খবর কি কোনোদিন শুনেছেন বা উপলব্ধি করেছেন? ফৌজদারী আইনে যতটুকু জেনেছি কোনো বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিবাদীর কাছে কোনো স্পর্শকাতর বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার নিমিত্তে রিমান্ডে নেয়া হয়। কিন্তু রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে পঙ্গু অথবা অকেজো করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এখন অহরহ। এবং এটা যে সত্যিই ঘটছে তা তো বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত ছবি থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। রিমান্ডে নিয়ে পরিবার অথবা স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার বিষয়ও প্রতিনিয়ত চলছে।
ছাত্রশিবিরের প্রিয় নেতা কেন্দ্রীয় সভাপতি মোঃ দেলাওয়ার হোসেনকে ডিবি পুলিশ তার বোনের বাসা থেকে গ্রেফতার করার পর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তার গ্রেফতারের পর সারাদেশে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ ছাত্র ও ছাত্রশিবিরের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা। শিবিরের সভাপতি গ্রেফতারের পরদিন এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন ছিল। সারাদেশ থেকে সেইদিনই হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি প্রদানের জন্য দাবি থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে ২ এপ্রিল সারাদেশে কেন্দ্রীয় সভাপতি গ্রেফতারের প্রতিবাদে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের আহ্বান  করা হয়। পরদিন ১৮ দলও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মুক্তি ও কেয়ারটেকার সরকার পুনর্বহালের দাবিতে হরতাল আহ্বান করে। ছাত্রশিবির তাদের ঘোষণা অনুযায়ী ছাত্রসমাজকে সাথে নিয়ে সারাদেশে সর্বাত্মক সকাল-সন্ধ্যা  শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন  করে।
সরকার ছাত্রশিবিরের দাবিকে উপেক্ষা করে শিবির সভাপতিকে নিঃশর্ত মুক্তি না দিয়ে মামলার পর মামলা দিয়ে রিমান্ডের নামে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখল। ছাত্রশিবির বাধ্য হয়ে পুনরায় ১০ এপ্রিল কেন্দ্রীয় সভাপতির নিঃশর্ত মুক্তি ও রিমান্ডের নামে নির্যাতনের প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও ১১ এপ্রিল হরতালের আহ্বান করে। সমগ্র জাতি প্রত্যক্ষ করেছে যে, সরবভাবে ছাত্রসমাজ ছাত্রশিবিরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হরতাল সফল করেছে। এ হরতালে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তির পক্ষের ছাত্রসংগঠনগুলো সমর্থন দেয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসে এই পর্যন্ত কোনো ছাত্রসংগঠনের সভাপতির মুক্তির দাবিতে এই প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল। প্রিয় নেতার মুক্তির দাবিতে সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় শান্তিপূর্ণ মিছিল সমাবেশ থেকে গ্রেফতার করা হয় অসংখ্য ছাত্রকে।
সরকারের প্রত্যক্ষ ইশারায় এ পর্যন্ত ১২০টি মামলা ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় ষভাপতির নামে দেয়া হয়েছে, আরো শত শত মামলা রেডি করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। এ পর্যন্ত ৪৫ দিন রিমান্ড দেয়া হয়েছে।  ২০ মে আরো ১৭ দিনের রিমান্ড চেয়েছেন প্রশাসন। তিনি শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ, তার শারীরিক অবস্থার এমন হয়েছে যে তাকে পাজাকোলা করে আদালতে আনতে হয়েছে। নির্যাতনের মাত্রাতিক্ততায় তরল খাবার গ্রহণের শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন। সীমাহীন নির্যাতনে তিনি অজ্ঞান হয়েছেন বেশ কয়েক বার। হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে। নির্যাতনের অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরে চলেছেন এ প্রিয় নেতা। আসলে তারা কী জানতে চায় শিবির সভাপতির কাছ থেকে। কোথায় তাদের শক্তির উৎস? কোথায় তাদের অর্থের উৎস? দিবালোকের ন্যায় শিবির জাতির কাছে স্পষ্ট করতে চায়Ñ আমাদের শক্তির উৎস হলেন মহান আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ যদি কারো জিম্মাদারী হয়ে যান তাদের কি আর কোনো ভয় থাকে? ক্লান্তি অবস্বাদ থাকে? আর শিবিরের অর্থের উৎস হলো তার জনশক্তিদের নিজের দান। তাই জানিয়ে দিতে চাই, আরো নির্যাতন! এ সংগঠনের জনশক্তির জানা আছে দীনের পথে অবিচল থাকার অপরাধে রাসূলের (সা) প্রিয় সাহাবীদের জীবনে নির্মম নির্যাতনের সময় আল্লাহর ওপর দৃঢ়তা ও তাঁর সাহায্যের উপমা। সাইয়েদ কুতুব শহীদ ও জয়নাব আল গাজালীর মতো জিন্দাদিল আপসহীন মর্দে মুজাহিদের উদ্দীপ্ত প্রেরণার বাতিঘর আমাদের সামনে রয়েছে। নির্যাতন নিষ্পেষণ করে কোনো ব্যক্তিকে চিরতরে নিঃশেষ করা যায় কিন্তু তার আদর্শকে শেষ করা কখনো সম্ভব নয়। আমাদের সকল জনশক্তির ধমনীতে শহীদের রক্ত। ছাত্রশিবিরের শত তরুণ জিন্দাদিলের তপ্তরক্তে আমরা খরিদ করেছি জনপদ থেকে জনপদ। আমাদের আদর্শ হচ্ছে কালজয়ী আদর্শ মুহাম্মাদ (সা)-এর আদর্শ। যুগে যুগে এ আদর্শকে যারা শেষ করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারাই ইতিহাসের অতল গহবরে নিমজ্জিত হয়েছে, হয়েছে ঘৃণিত, ধিকৃত, লাঞ্ছিত ও অপমানিত।
প্রিয় নেতার মমতাময়ী মায়ের আর্তনাদে শোকাহত আজ লক্ষ তরুনের মা। সবার প্রশ্ন, কেন এই নির্মম পষণ্ডতা? গ্রেফতারের পর অনেক দিন তার সন্তানের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি মাকে। তার মা সুদূর ঠাকুরগাঁও থেকে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন সন্তানের সাথে একটিবার দেখা করার জন্য, কিন্তু নিষ্ঠুর প্রশাসন সে সুযোগ পর্যন্ত তাকে দেয়নি। তার মা তৈয়বা খাতুন এখন শুধু সন্তানের জন্য বিলাপ করেন। আর মহান রবের কাছে দোয়া করেনÑ আর কোনো মায়ের আবস্থা যেন এ রকম না হয়।
জাতির কাছে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন, একটি আদর্শবাদী ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতির সাথে সরকারের এমন অশোভন আচরণ যদি হয় তাহলে একজন সাধারণ ছাত্রের ভাগ্যে কী ঘটতে পারে? সাধারণ যেসব ছাত্র সরকারের রোষানলে পড়ে গ্রেফতার হয়েছেন, তাদের ভাগ্যে কী ঘটছে তা এখান থেকেই অনুমেয়। এতো রিমান্ড, নির্যাতন! কোথায় বাংলাদেশের মানবাধিকার? কোথায় মানবাধিকারের বুলি আওড়ানো ভাড়াটে লোকগুলো? কোন্ পর্দার আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছেন তারা? কোথায় বাংলাদেশের সরব মিডিয়া? ধিক তাদের জন্য। এরা জাতির জন্য কোনো উপকারে আসবে না। কারণ এরা তো পরগাছা। এদের শিকড় এদেশের মাটিতে নেই। বিদেশী কোনো শক্তি তথা অ্যাড ফার্মের গোলামী করতেই এদের যত কার্যক্রম। এরা জাতির মধ্যে ঐক্য বিনষ্ট করে বিভক্তি ও দাঙ্গা বাঁধাতে ওস্তাদ; সাম্রাজ্যবাদীদের মেহমান হিসেবে সাদরে গ্রহণের প্রমাদ গুনছে। জাতির বিবেকের কাছে নিঃশেষে প্রশ্ন করতে চাইÑ ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার তো শুনেছেন, কোনো প্রমাণ কি দেখেছেন? পেয়েছেন? সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, মাদকাসক্ত, ইভটিজিারÑ আপনার পাশের কোনো শিবিরের ভাইয়ের মধ্যে কি এগুলো খুঁজে পেয়েছেন কখনো? প্লিজ, আপনাদের ভাই হিসেবে, আপনাদের সন্তান হিসেবে যাচাই করুন। আমাদের পক্ষ নিবেন? না, তার ও প্রয়োজন নেই। সত্যকে সত্য বলবেন আর মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সৎ সাহস দেখাবেন। হয়ত বলবেন কেউÑ তাহলে শিবিরের বিরুদ্ধে এতো অপপ্রচার কেন? তাহলে বলতে হয় স্বয়ং নবী (সা)ও যখন কালিমার দাওয়াত নিয়ে মানুষের কাছে গেলেন তখন তাঁকে গনক, পাগল, জাদুকর ইত্যাদি বলা হয়েছে। যে মানুষটিকে ওই আরবের লোকেরাই ‘আল-আমিন, আস্-সাদিক’ উপাধি দিয়েছিলÑ তারাই সত্যের বাণী প্রচারের কারণে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করল। কিন্তু তিনি কি তাঁর মিশন থেকে বিচ্যুত হয়েছেন? কুরআনে মুমিনের ওপর নির্যাতনের কারণ বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে : “তাদের অপরাধ হচ্ছে একটাই, তারা মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালার ওপর ঈমান এনেছে।” (সূরা বুরুজ)
ছাত্রশিবির আজ সবচেয়ে মজলুম। তারপরও ধৈর্যের বাঁধ এখনো আকড়ে ধরে আছে। কিন্তু তাই বলে সরকারের অবিবেচকের মতো বাড়াবাড়ি কখনো মেনে নেয়া যায় না। সংগঠনের প্রিয় নেতাকে কারারুদ্ধ করে রিমান্ডের নামে নির্মম নির্যাতন সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী আর সহ্য করতে রাজী নয়। যার জন্য প্রতিটি কর্মী জীবন দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তার প্রতি এহেন জুলুম হৃদয়ে অনবরত রক্তক্ষরণ বৈ কী হতে পারে? সরকারের এমন ফ্যাসিস্ট আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে হাজার হাজার ছাত্র আজ কারারুদ্ধ। প্রতি মুহূর্তে গ্রেফতার করা হচ্ছে সংগঠনের নেতাকর্মীদের। সরকার তরুণ তাজা স্বপ্নিল সোনার বাংলার আগামীর কারিগরদেরকে দলিত-মথিত করে নিঃশেষ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গণজাগরণের নামে একদল ভ্রান্ত যুবককে দিয়ে স্বাধীনতা ও ইসলামকে পরস্পরের সম্মুখ সমরে হাজির করে জাতির মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তির রেখা টেনে দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে; অন্যদিকে অসাম্প্রদায়িক বাংলা গড়ার ঢাকঢোল পেটাচ্ছে! হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে সত্য ও সুন্দরকে গলাটিপে নিঃশেষ করে নয়া ইতিহাস রচনার মহাপ্রলয়ঙ্কারী আয়োজন চলছে তরুণ প্রজন্মের ধুয়া তুলে। অথচ এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, তরুণ প্রজন্ম আমাদের সংগঠনেই বেশি। কারণ, ইসলামী ছাত্রশিবির সমগ্র দেশের ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। সরকার ও তার দোসররা কি একবারও ভেবে দেখেছে এই তরুণ প্রজন্ম কী চায়? বোধকরি সে সৎসাহস তাদের নেই। তাইতো চিহিত কয়েকজন কথিত ব্লগার যারা আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সা), ইসলাম ও ইসলামের অন্যান্য অনুশাসন নিয়ে অবমাননাকর ব্লগ লিখে মুসলিমের অন্তরে রক্তক্ষরণের মরণ খেলায় মগ্ন ও বামঘরানার কিছু ভ্রান্ত বিপথগামী তরুণকে দিয়ে তরুণ প্রজন্মের দোহায় দিয়ে যাচ্ছেতাই করার প্রয়াস চালাচ্ছে। এ কারণেই ছাত্রশিবির দরাজ কণ্ঠে বলতে চায়Ñ এই মুক্তিকামী কাফেলার লক্ষ লক্ষ তরুণ-তাজা প্রাণকে বাদ দিয়ে আজকের তরুণ প্রজন্ম কল্পনা করা যায় না। শুধু বয়স নয়, মন-মননে মেধা-যোগ্যতায় ছাত্রশিবির তরুণ প্রজন্মের অহঙ্কার। ছাত্রশিবিরের ন্যায্য গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত না করে জেল-জুলুম-হত্যা-গুমের যে রাজনীতির সুচনা আওয়ামী ১৪ দলীয় জোট শুরু করেছে, ক্ষমতার লোলুপতায় বিরোধী মতকে শেষ মরণ কামড় দিয়ে শেষ রক্ষা পেতে চায়, তার পরিণাম শুভ হবে না। সত্যিকারার্থে দলের প্রিয় নেতারা যখন নির্যাতনের শিকার হন, কর্মীরা আরো বেশি ক্ষিপ্র গতিতে লক্ষ্য অর্জনের পথে সম্মুখে এগুতে থাকে নিরলসভাবে। জুলুম-নির্যাতনের সমুচিত জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে পুরোদমে, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরাও তার ব্যতিক্রম নয়।
সরকার বা বিরুদ্ধবাদীরা সাময়িকভাবে এর থেকে ফায়দা লুটতে পারে কিন্তু ভুক্তভোগীরাই ভালো করে জানে প্রকৃত ঘটনা। সময়ে এর জবাব মিলবে ইনশাআল্লাহ, ইতিহাস এর সাক্ষী। সম্প্রতি প্রশাসন ও সরকারি দলের সাথে শিবিরের সংঘর্ষের কিছু ঘটনা ঘটেছে; যা ছাত্রশিবিরের মতো একটি দায়িত্বশীল ছাত্রসংগঠন সমর্থন করে না। তাতে মিডিয়া ও প্রশাসন কেবল শিবিরকেই দায়ী করেছে; ঘটনার সূত্রপাত কোথা থেকে হলো তার কোনো কারণ কি জাতিকে জানানো হয়েছে! এসব ঘটনার নেপথ্যে কে বা কারা? যদি একজন অসহায় মানুষ নির্যাতন সহ্য করতে করতে জীবনহানির প্রান্তিক সীমানায় আত্মরক্ষার শেষ চেষ্টা করে তাহলেও কি তাকে দায়ী করা উচিত? ছাত্রশিবির বিশ্বাস করে মজলুমের ফরিয়াদ পৃথিবীর কেউ শুনতে না পেলেও মহাশক্তির মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ভালো করেই শুনতে পান। ছাত্রশিবির আরো বিশ্বাস করে যে, তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের খড়গহস্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়। তাই তাড়াহুড়ো নয়, হিংসা-বিদ্বেষ নয়, আল্লাহ ও রাসূল (সা)-এর পথ ধরে চলতে গিয়ে যে সকল বাঁধা আসবে সকল বাঁধাকে মাড়িয়ে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে যুবসমাজকে সাথে নিয়ে সত্য সুন্দর আগামী গড়ার মধ্য দিয়ে নেতার ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতনের সমুচিত জবাব দেবে ছাত্রশিবির ইনশাআল্লাহ।

লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
zabbarics@gmail.com

SHARE

Leave a Reply