জঙ্গি হামলা ক্রসফায়ারের স্ক্রিপ্ট ও সাক্ষী গোপাল -মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

দেশের সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা (গুলশান ও শোলাকিয়া) সমগ্র দেশবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা শোকাহত, স্তম্ভিত ও বাকরুদ্ধ। সর্বসাধারণ উৎকণ্ঠিত ও আতঙ্কিত। নজিরবিহীন এসব ঘটনায় রক্ত ঝরেছে সাধারণ মানুষের, সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও। ঘটনার সাথে কারা জড়িত এর কোনো সঠিক তথ্য না মিললেও সারাদেশে এসবের নেপথ্যে সরকারের তরফ থেকে বিরোধী দল বা জঙ্গিগোষ্ঠী জড়িত বলে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনার নেপথ্য-নায়কদের ব্যাপারে সমগ্র জাতি বারবারই অন্ধকারেই রয়ে গেছে।
এর সাথে ধারাবাহিকভাবে চলছে বিচারবহির্ভূত রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড, যার কারণে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় জজ মিয়া নাটক বা সাক্ষী গোপালের মাধ্যমে বিচার-বিচার খেলা কখনো মানুষের বিচারিক ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। এতে আইন আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ভেঙে খান খান হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ের অধিকাংশ ঘটনার সন্দেহভাজন আসামিদের কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হয়েছে! এর অন্তরালে কী হয়, আসামিদের সাথে কেমন নাটক মঞ্চস্থ করে খবরে প্রচার হয় এখন তা কারো আর অজানা নয়। আসামিদের কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করে ভিক্টিমের অধিকার সুরক্ষা করাই বিচারের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু সন্দেহভাজনদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর প্রাক্কালেই কথিত বন্দুকযুদ্ধে আসামির মৃত্যু বিচারিক পদ্ধতির সাথে তামাশা বৈ কী!
এ ধরনের ঘটনায় সন্দেহ করা হয় যে, ঘটনার সাথে সন্দেহভাজন আসামির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বল প্রয়োগ করে স্বীকারোক্তি আদায় করতে চেষ্টা করে। এতে সফল না হলে নির্যাতনের মাধ্যমে এক সময় সন্দেহভাজন আসামিকে হত্যা করা হয়। আবার এটাও প্রকটভাবে সন্দেহ করা হয় যে, অনেক ঘটনায় রাষ্ট্রের অথবা সরকারদলীয় কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকে; যে কারণে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সন্দেহভাজন আসামিকে হত্যা করে বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন আসামি মৃত্যুর স্ক্রিপ্ট সাজানো হয়। এক্ষেত্রে সন্দেহভাজন আসামিকে হত্যার মূল কারণ হলো ভিক্টিমের অধিকার সুরক্ষার পরিবর্তে ঘটনার অন্তরালের ব্যক্তিবর্গকে সুরক্ষা (!) করা বা মূল ঘটনাকে আড়াল করা। কারণ, সন্দেহভাজন আসামি জীবিত থাকলে হয়তো ঘটনার সাথে জড়িত মূল হোতাদের খোলস খসে পড়বে, এর ফলে রাষ্ট্রের কথিত প্রভাবশালীরা জনরোষের শিকার হবেন। এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচারকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করতে প্রভাবশালী মহল বা রাষ্ট্র সাজানো নাটক ও সাক্ষী গোপালের আশ্রয় নেয়। এই প্রক্রিয়াটি রাষ্ট্রের বিচারিক পদ্ধতিকে ভঙ্গুর এবং অর্থহীন করে ফেলে, এতে শাসকগোষ্ঠী আরো বেশি স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। শেষ প্রক্রিয়াটি আমাদের দেশে চলমান রয়েছে বলে নিয়মিত অভিযোগ উঠছে। বর্তমান আওয়ামী সরকারের আমলে দেশে এমন অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলছে।
‘বন্দুকযুদ্ধে’র নমুনা

খবর : ‘পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলার সন্দেহভাজন দুই আসামি পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন মো: রাশেদ (২৮) ও নূর নবী (২৮)। আজ মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রানীরহাটের ঠান্ডাছড়ি এলাকায় একটি ইটভাটার পাশে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এ দু’জন নিহত হন।’ সূত্র : প্রথম আলো (৬/০৭/২০১৬)

মন্তব্য : পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকান্ডটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার সাথে জড়িত। তাই অতি সতর্কতার সাথে বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি ছিল। কিন্তু আসামিদের  গ্রেফতারের একদিনের মাথায় বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করায় স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে এই হত্যাকান্ডের আড়ালে কি সরকারের  কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পরিকল্পনা জড়িত? নাকি বাবুল আক্তার নিজেই জড়িত? ঘটনাটির বিচারিক প্রক্রিয়ার আঁতুড়ঘরেই অপমৃত্যুতে নিহত মিতু তার ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হলেন।  দেশবাসীর সামনে রক্তাক্ত নৃশংস ঘটনাটির নেপথ্য নায়করা মুখোশের আড়ালেই রয়ে গেল।

খবর : “(গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারির ছাদ থেকে পালানোর সময় সন্দেহভাজন ১ যুবককে আটক করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের সন্দেহ তার সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তার নাম সৌরভ। সে গুলশানের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ২/৭/২০১৬)”
গুলশানের জিম্মি ঘটনার অবসানের পরদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ১ জন জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন…..

খবর : “(ছয় জঙ্গি মারা গেছে, ধরা পড়েছে একজন- প্রধানমন্ত্রী
রাজধানীর গুলশানে রেস্তোরাঁয় অভিযানে ছয় জঙ্গি মারা গেছে এবং তাদের একজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘চার লেনে উন্নীত ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ জাতীয় মহাসড়কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য দেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘অপারেশন সফল হয়েছে, কমান্ডো অপারেশনে ১৩ জনকে বাঁচাতে পেরেছি। কয়জনকে বাঁচাতে পারিনি, তবে সন্ত্রাসীদের ছয়জনই মারা যায়, একজন ধরা পড়েছে’। সূত্র : প্রথম আলো ২/৭/২০১৬)।”
এ ছাড়াও ৩ জুলাই বিভিন্ন গণমাধ্যমে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) শহীদুল হক জানান, “হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই জঙ্গি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।” এর মধ্যে শাওন নামে একজন পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় গত ৮ জুলাই শুক্রবার হাসপাতালে মারা যায়।

মন্তব্য : গুলশানের জঙ্গি হামলা ও জিম্মি ট্র্যাজেডি আমাদের জন্য একটি শোকাবহ ঘটনা। নজিরবিহীন এই ঘটনার সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা এবং এর যথাযথ প্রক্রিয়া জনগণের সামনে স্পষ্ট করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর হৃদয়বিদারক হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা ও আইএসপিআরের ঘোষণা অনুযায়ী ঘটনাস্থল থেকে একজনকে আটক করা হয়েছে। এরপর আইজিপি বলেছেন, গোয়েন্দা হেফাজতে দু’জন সন্দেহভাজন ব্যক্তি আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘ঘটনাস্থল থেকে আটক’ ব্যক্তি সম্পর্কে পরে আর কোনো ঘোষণা আসেনি। তিনি কোথায়? এমনকি তাকে বা এই ঘটনায় কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকেই এ পর্যন্ত আদালতে সোপর্দ করা হয়নি। সুতরাং, সেদিক থেকে গুলশানের ঘটনাটির মধ্যে নানা সন্দেহ রয়েই গেল। অথচ বাংলাদেশ সংবিধানের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হলো, কেউ আটক হন আর গ্রেফতার হন, তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার বিভাগে সোপর্দ করতে হবে।
আবার পূর্বের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতায় সন্দেহ হয় হয়ত প্রকৃত আসামিরা কোন এক সময়ে গ্রেফতার হলেও বিচার হবে না অথবা সাজানো বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্পর্শকাতর ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটবে। মনে মনে ভাবি বন্দুকযুদ্ধের নামে এ ভয়াবহ ঘটনার রাঘববোয়ালরা কি পার পেয়ে যাবে? সন্দেহ তখন আরো বেশি গাঢ় হয় যখন দেখা যায় এসব ঘটনার সাথে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পরিবার-পরিজন জড়িত।

খবর : গুলশানে হামলাকারী জঙ্গি ইমতিয়াজ আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে।
গুলশানে জঙ্গি হামলা পরিচালনাকারী দলের সদস্য রোহান ইমতিয়াজ আওয়ামী নেতা ইমতিয়াজ খান বাবুলের পুত্র। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন। জানা গেছে, নিহত জঙ্গি রোহানের বাবা ইমতিয়াজ খান বাবুল ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য হাজী মকবুলের শ্যালক। গুলশান হামলার পর সাইট ইন্টেলিজেন্স হামলাকারী হিসেবে যেসব জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ করে সেখান থেকে রোহানের পরিবারের এক ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে তার পরিচিতজনরা। জঙ্গি রোহান ইমতিয়াজের ছবির সঙ্গে বেরিয়ে আসে তার পারিবারিক তথ্যও। ফেসবুকে ইমতিয়াজ খান বাবুল সঙ্গে তার ছেলে রোহান ইমতিয়াজের ছবিও পোস্ট করা হয়েছে। ইমতিয়াজ খান বাবুলের নির্বাচনী লিফলেটের তথ্যানুযায়ী তিনি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সূত্র : ৩/৭/২০১৬ শীর্ষ নিউজ)।
ইতোমধ্যে সরকারের তরফ থেকে এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সরকারের তরফ থেকে অসত্য তথ্য পার্শ্ববর্তী দেশকে জানানো হয়েছে। এতে বুঝা যায় হয়ত এই ঘটনার সাথে রাষ্ট্রের কোন প্রভাবশালী মহল জড়িত অথবা অতীতের ধারাবাহিকতায় এই ঘটনা কৌশলে বিরোধী মতের ওপর চাপিয়ে দিবে আওয়ামী সরকার।
খবর : জামায়াত নেতাকে ছাড়াতেই হানা, দাবি ঢাকার
ফাঁসির আসামি জামায়াতে ইসলামী নেতা মীর কাসেম আলীকে জেল থেকে মুক্ত করাটাও গুলশানের জঙ্গি হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বলে মনে করছেন বাংলাদেশের গোয়েন্দারা। হোলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলা নিয়ে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি নয়াদিল্লিকে যে প্রাথমিক তথ্য দিয়েছে, তাতে এই সন্দেহের কথা জানানো হয়েছে। ঢাকার দাবি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ভারতীয় গোয়েন্দা এবং গুপ্তচর সংস্থাগুলি এখন সেই তথ্যের বিশ্লেষণ করছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ নয়াদিল্লিকে জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই পাঁচ জঙ্গিকে পাকিস্তানের বালুচিস্তানে দু’মাসের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। বিদেশিদের পণবন্দী করে মীর কাসেম আলীকে মুক্ত করার পাশাপাশি সেনাদের বিদ্রোহে উসকানি দেয়াও উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গিদের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বৃহস্পতিবার বলেন, ‘ধনকুবের মীর কাসেমকে মুক্ত করাটা লক্ষ্য হয়ে থাকতে পারে। যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে এখন একমাত্র তার ফাঁসিই কার্যকর হওয়া বাকি। এই ফাঁসি আটকাতে নানা রকম চক্রান্ত চলছে। গোয়েন্দারা মনে করছেন, সাম্প্রতিক জঙ্গি তৎপরতাও তার অঙ্গ হতে পারে। সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা ৮/০৭/২০১৬)’

এবার আসি আরেকটি সাম্প্রতিক ঘটনায়। পবিত্র ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া মাঠের ঈদের জামায়াত অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে কে বা কারা অতর্কিতভাবে পুলিশ ও আগত সাধারণ মুসল্লিদের ওপর আক্রমণ করেন। প্রশাসন মারফতে জানা গেছে তারা জঙ্গি। কিন্তু কী উদ্দেশ্যে কেন তারা ঈদের জামায়াতে আক্রমণ করল তা এখনো জানা যায়নি, যা জানা খুবই সাংঘাতিক জরুরি। ঘটনাস্থলের পাশের বাসা থেকে একজন সন্দেহভাজন আসামি ও স্থানীয় আওয়ামী নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে আমরা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি।

খবর : শোলাকিয়ায় হামলা: আওয়ামী লীগ নেতাসহ আটক ৪
শোলাকিয়া ঈদগাহে টহলরত পুলিশের ওপর বোমা হামলার ঘটনায় এক আওয়ামী লীগ নেতাসহ ৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বোমা হামলা ও গোলাগুলির পর সন্ত্রাসীরা আশ্রয় নিয়েছে এমন সন্দেহে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও করিমগঞ্জের গুণধর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুল হান্নান ভূইয়া বাবুলের বাড়ি ঘিরে রেখেছে পুলিশ ও র‌্যাব। পুলিশ ওই বাড়ি থেকে বাবুলসহ আরও তিনজনকে আটক করেছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসী সন্দেহে আরও একজনকে আটক করেছে পুলিশ। তার পরিচয় জানা যায়নি। ঘিরে রাখা বাড়িটি শোলাকিয়া মাঠ-সংলগ্ন আজিমুদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের কাছে। নিরাপত্তা বাহিনী আশঙ্কা করছে, হামলার পর সন্ত্রাসীরা এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িটি ঘিরে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আবু সায়েম শীর্ষ নিউজকে বলেন, আমাদের সন্দেহ হচ্ছে সন্ত্রাসীরা হামলার পর এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এই বাড়ির মালিক আওয়ামী নেতাকে আটক করা হয়েছে। সূত্র : শীর্ষ নিউজ ৭/৭/২০১৬)।”
এই ঘটনায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মাধ্যমে সমগ্রজাতি এমন বর্বরোচিত নৃশংসতার আসল রহস্য জানতে চায়। কথিত বন্দুকযুদ্ধ মঞ্চায়নের মাধ্যমে যেন এই ট্র্যাজেডির ইতি না ঘটে।
যেকোনো ঘটনার দায় বিরোধীদলের ওপর বা সরকারি দলের ওপর চাপিয়ে দেয়ার রাজনীতি আমাদের দেশকে প্রতিনিয়ত বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে ও প্রশ্রয় পাচ্ছে; রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ও রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস ক্রমেই বেড়ে চলছে; যা শুধু দেশাভ্যন্তরে ভেদাভেদ ও অরাজকতাই ডেকে আনছে।
দেশে জোর করে সাক্ষী গোপাল বানানোর কারণে হাজারো বিরোধীমতের মানুষ ও জজমিয়ারা কারাভ্যন্তরে। কেউ ইচ্ছে করে সাক্ষী গোপাল হয়, কাউকে জোর করে করা হয়। নিরীহ জজমিয়ারা জানেই না তারা কোন অপরাধে বছরের পর বছরে কারান্তরীণ আছেন। এমন হাজার হাজার মামলায় লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ বিরোধীমতের ব্যক্তি বা ব্যক্তিরোষের কারণে ডজন ডজন মামলায় হাজার হাজার আসামির সাক্ষী গোপাল দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

খবর : ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা আদালতে সাক্ষ্য দিলেন জজ মিয়া
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন জজ মিয়া। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিনের আদালতে তিনি সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। বেলা দেড়টা পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ চলে।  আদালতে জজ মিয়া বলেন, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সময় তিনি নোয়াখালীর সেনবাগের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। ওই দিন সন্ধ্যায় গ্রামের একটি চায়ের দোকানের টেলিভিশনে গ্রেনেড হামলার খবর দেখতে পান। রাজধানীর নাখালপাড়া এলাকায় থাকতেন আর গুলিস্তানে সিডির ব্যবসা করতেন এমন দাবি করে জজ মিয়া। আদালতে বলেন, গ্রেনেড হামলার পর তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি আবার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। ওষুধ কেনার জন্য বাজারে যাওয়ার পথে গ্রামের মোকছেদ চৌকিদারের সঙ্গে তার দেখা হয়। মোকছেদ চৌকিদার তাকে বলেন, ‘তুমি চোরাচালানির ব্যবসা করো। তোমার নামে ওয়ারেন্ট আছে। তোমাকে থানায় যেতে হবে।’
এরপর মোকছেদ চৌকিদারের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেলে করে সেনবাগ থানায় যান জজ মিয়া। তিনি সেখানে গিয়ে দেখতে পান ঢাকা থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইডি) থেকে লোক এসেছেন। তারা জজ মিয়াকে ঢাকার মালিবাগের কার্যালয়ে নিয়ে যান। জজ মিয়া আদালতে বলেন, মালিবাগে সিআইডির কার্যালয়ে এনে তাকে সাজানো জবানবন্দি দিতে বলা হয়। অন্যথায়, তাকে ক্রসফায়ারে দেয়া হবে এবং তার পরিবারকে মেরে ফেরার হুমকি দেয়া হয়। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন বাঁচাতে সাজানো সাক্ষ্য দিতে রাজি হন আদালতে এমন দাবি করে জজ মিয়া বলেন, সিআইডি অফিসে একটি কাগজে জবানবন্দি লিখে দেয়া হয়। তা মুখস্থ করতে বলা হয়। জবানবন্দি মুখস্থ করে দৈনিক তিনবার সিআইডি কর্মকর্তাদের কাছে বলতে হতো। সূত্র : প্রথম আলো ৩০ সেপ্টেম্বর  ২০১৪ )’

দেশে চলমান এমন সাজানো নাটক ও সাক্ষী গোপালের অবসান কবে হবে? কবে ভিক্টিম তার বিচারিক অধিকার ফিরে পাবে? কখনইবা প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাবে? কখন দোষারোপের রাজনীতি বন্ধ হবে? আর কত? এবার একটু থামান বন্দুকযুদ্ধ ও সাক্ষী গোপালদের মাধ্যমে বিরোধীমত এবং ব্যক্তিদের দমন করার নৃশংসতা ও বিচারহীনতা। এই দেশ আমার আপনার সবার। দেশের মাটি ও মানুষকে হৃদয় থেকে ভালোবাসতে পারলেই কেবল সব ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব। আর তখনই যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নিজের দেশের অবস্থানকে বিশ^দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানো সম্ভব।
লেখক : কলামিস্ট

SHARE