জনগণ ফের জানিয়ে দিলো

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

Nirbachonউপজেলা নির্বাচন বহুল আলোচিত ঘটনা বাংলাদেশে। ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে খেলা করেছে সরকার। উপজেলা নির্বাচন নিয়েও তেমনি খেলার ছক কেটেছিল তারা। কিন্তু দেখা গেল, জনগণ যতটুকু সুযোগ পেয়েছে, এর সদ্ব্যবহার করে সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে যে, এরা এদের আর চায় না। ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে যেন কিছুতেই বিরোধী দল অংশ নিতে না পারে তার এক চমৎকার পরিকল্পনা করেছিল সরকার। নির্বাচনের আগে বিরোধী ১৯ দলীয় জোটের সব নেতাকে আটক করেছিল সরকার। মামলা করেছে হাজারে হাজারে। কোথায় বোমা ফুটেছে, কোথায় গাড়ি পুড়েছে, সেই অভিযোগে বিএনপি-জামায়াতের বয়োবৃদ্ধ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এরা কারারুদ্ধ ছিলেন। মামলার ধরন অদ্ভুত ছিল। সে মামলায় পুলিশ দু-চারজনের নাম উল্লেখ করে হাজার হাজার লোককে আসামি করেছে। এরা অজ্ঞাত পরিচয়। অর্থাৎ যেকোনো সময় বিরোধী দলের যেকোনো কর্মীকে যেন ওই সব মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়া যায়। এরও লক্ষ্য ছিল, বিরোধী দলের কর্মীরা যাতে নির্বাচনী মাঠে না থাকতে পারে।
এর ওপর পুলিশ করেছে অপরিমেয় গ্রেফতারবাণিজ্য। তার মাত্রা যে কী সেটি দেখা গেছে সাভার থানার এক এসআইয়ের অপহরণ কাণ্ডে। আর চট্টগ্রামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরী অপহরণের ঘটনায়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, র‌্যাবের সদস্যরা ঢাকায় পাঠানো তার স্বর্ণ লুট করে নিয়ে যায়। এরপর অপহৃত হন মৃদুল চৌধুরী। অপহরণ করে যেমন তাকে নির্যাতন করা হয়, তেমনি সব সময় রাখা হয় চোখ বেঁধে আর হ্যান্ডকাফ পরিয়ে। আর বারবার শাসানো হয়, কেন তুই র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করলি। প্রাণে বেঁচে স্বর্ণ ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরী এখন যেন অনেকটাই নির্বাক। মৃদুল চৌধুরী কী রাজনীতি করেন না করেন সংবাদপত্রে তা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি। অর্থাৎ অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে জীবননাশের হুমকিতে পড়েছিলেন মৃদুল চৌধুরী। কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশি নির্যাতন আরো নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ। এখানে র‌্যাব-ডিবি-পুলিশ পরিচয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তার লাশ পাওয়া যায়। কখনো লাশও মেলে না। প্রশ্ন করলে বলা হয় পুলিশ, র‌্যাব, ডিবি এমন কোনো কাজই করেনি। কাউকে গ্রেফতার করেনি। ব্যস, দায়দায়িত্ব ওখানেই শেষ। আর কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি কারো বিরুদ্ধে মামলা করেন, তাহলে বিচার-আচারের বালাই উঠে গেছে। প্রমাণ নেই, সাক্ষী নেই দেখা গেছে, অভিযুক্তরা একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছেন। এসব খুনের ব্যাপারে পুলিশ কখনো বলছে তারা কিছুই জানে না। কখনো বলছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্রসফায়ারে মারা গেছেন।
কিন্তু ক্রসফায়ার বিষয়টা এখন আর কেউ বিশ্বাসই করে না। পুলিশ ক্রসফায়ারের কথা বললেই মানুষ ধরে নেয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পুলিশ ঠাণ্ডামাথায় খুন করল। এ রকম খুনের উৎসবই এখন বাংলাদেশে চলছে। সরকারে কর্তৃত্বকারীরা যেন রক্তপিপাসায় উন্মত্ত হয়ে পড়েছে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রহসনের বেশ আগে থেকেই এসব কাণ্ড ঘটে আসছিল। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গৃহবন্দী। আর তার দলের সব নেতা ছিলেন কারাগারে। দ্বিতীয়, তৃতীয় সারির যেসব নেতা দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন, এরা যেতে পারছিলেন না অফিসে। কখনো কখনো ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তারা দলের বক্তব্য তুলে ধরছিলেন। সেটিকেও আবার ব্যঙ্গ করেছেন শেখ হাসিনা। বলেছেন, তারা এতটাই সাহসহীন যে সামনে আসতে পারে না। ওসামা বিন লাদেনের মতো ভিডিও বার্তার মাধ্যমে গোপন স্থান থেকে কথা বলে। ভাবটা এমন যে, সামনে এলে ওটাকেও খপ করে ধরে ফেলতে পারি।
সেভাবেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী প্রহসন হয়ে গেছে বাংলাদেশে। ১৫৩টি আসনে সরকার দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান। কারণ বিরোধী জোট ওই নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানান। আর এ দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাতে সাড়া দেন। নির্বাচনকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রোদ পুহিয়েছেন। নির্বাচনী কর্মকর্তারা টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছেন। কেন্দ্রে ভোটারের বদলে শুয়ে থাকতে দেখেছি নিঃসঙ্গ কুকুর। আর নির্বাচন কমিশন মানে সরকারের কিছু দাসানুদাস একেবারে জো হুকুম হিসেবে কাজ করেছে। সরকারের তো একটা বিরোধী দল দরকার হয়। নির্বাচনের আগে নাটকের স্বার্থে এরশাদকে সরকারবিরোধী দল হিসেবে আসনে বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে বোধ হয় ভাগবাটোয়ারায় মিলছিল না। ফলে এরশাদ ঘোষণা দেন যে, তিনি নির্বাচন বর্জন করেছেন এবং নির্বাচন কমিশনকে তিনি চিঠি দেন যে, যেন কাউকে লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ দেয়া না হয়। আর নিজেও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং তার দলের বিদ্রোহীদের লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ করে। আর এরশাদ গিয়ে আশ্রয় নেন (কিংবা তাকে নিয়ে রাখা হয়) ঢাকা সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। তারপর যথারীতি নির্বাচনী প্রহসন মঞ্চস্থ হয়। এ দেশের মানুষ এ রকম একটি পাতানো নির্বাচন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। পৃথিবীর কোথায়ও এই নির্বাচনকে বৈধ বলে স্বীকার করা হয়নি। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে যারা মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন বিভিন্ন স্থানে তারা জনরোষের শিকার হচ্ছেন।
ওই নির্বাচন নিয়ে হাসি-তামাশা, ঠাট্টা-মশকরা, ক্ষোভ এমন হয়ে উঠেছিল যে, এখান থেকে দৃষ্টি সরানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। এ ক্ষেত্রে প্রথমে খেলা হয়েছিল আওয়ামী লীগের পুরনো তাস, সংখ্যালঘু নির্যাতন। আওয়ামী লীগ নিজেরাই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে, তাদের ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে তার দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ধর্মের ঢাক কত দিন রুদ্ধ রাখা যায়। এবার সংখ্যালঘুরাই মানববন্ধন, প্রেস কনফারেন্স করে জানিয়েছেন যে, তাদের ওপর নির্যাতন করেছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াত বরং তাদের রক্ষা করেছে। আশ্রয় দিয়েছে।
বিতর্ক আছে, এ সরকারের যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে। মানুষ সরকারের অপশাসনের প্রতিবাদে রাস্তায় নামলেই সরকারের তরফ থেকে একই ভাঙা রেকর্ড বাজানো শুরু হয়। আর তা হলো, ওরা যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে চায়। বিদ্যুৎ নেই কেন, জনগণের প্রতিবাদ। সাথে সাথে সরকারি শেয়ালদের রা, ওরা যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে চায়। কিন্তু বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই হবে। কৃষক আলুর দাম পাচ্ছে না। প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেছে। সরকারের ভাষ্য, বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের লীলাখেলা চলতে দেয়া হবে না। এসব কথাবার্তা এখন তামাশায় পরিণত হয়েছে। জনগণ এগুলোকে আমলে নেয়নি বা নিচ্ছে না।
তাহলে কী করা যায়? বশংবদ নির্বাচন কমিশনকে বলা হলো, মাসের পর মাস ধরে লাগাও স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন। আর নির্বাচন কমিশন বগল বাজিয়ে সাষ্টাঙ্গে জোহুকুম বলে উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করল। বিষয়টা এমনভাবে সাজানো হলো, যাতে ৫ জানুয়ারির ভানুমতির খেল থেকে মানুষের দৃষ্টি সরে যায়। আর উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই যেন বিরোধী দলের নেতাকর্র্মীদের ওপর অত্যাচারের মাত্রাটা আর এক দফা বাড়িয়ে দেয়া হলো। অনেক প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়। অনেকের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দেয়া হয়। মধ্যরাতে গ্রামে গ্রামে র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি আওয়ামী লীগ মিলে হানা দিতে থাকে। যাতে বিরোধী দল সমর্থকেরা এলাকাছাড়া হয়। নির্বাচন কমিশন নিজেদের চোখে নিজেরাই কালো কাপড় বেঁধে কিছুই ঘটেনি ভাব দেখায়।
এর মধ্যেই এলো ১৯ ফেব্রুয়ারির প্রথম দফা ৯৭টি উপজেলায় নির্বাচন। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা তেমনই ছিল। কিন্তু নির্দলীয় নির্বাচন বলে এই নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীরা জোটগতভাবে অথবা দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু নৌকা, ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লা এই নির্বাচনের প্রতীক ছিল না। প্রতীক ছিল অন্য কিছু। দিনভর টেলিভিশনের সামনে বসে ছিলাম। আর বিভিন্ন উপজেলায় আমাদের সংবাদদাতাদের সাথে কথা বলছিলাম। উপজেলা নির্বাচনী চিত্র ছিল ভয়াবহ। বুথ দখল, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাইÑ এ সবই ছিল টেলিভিশনগুলোর স্ক্রলে। সরকারের স্তাবক কিছু টিভি বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে, খুব শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হচ্ছে। কিন্তু তাদের চ্যানেলেরই স্ক্রলে দেখানো হচ্ছিল ভিন্ন চিত্র। শত শত কেন্দ্র তো আর জাল ভোট, ছিনতাই এগুলো করা সম্ভব ছিল না। মানুষ ভোটও দিতে এসেছিল। যতটুকু সুযোগ তারা পেয়েছে, তার সবটাই সদ্ব্যবহার করেছে। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন এখন শূন্যের কোঠায়। সেটা দেখাতে চায়নি আওয়ামী লীগ। আর দাসানুদাস নির্বাচন কমিশন। ফলে ব্যাপক অনিয়মকে প্রশ্রয় দেয়া হলো।
তা সত্ত্বেও নির্বাচনী ফলাফল আওয়ামী লীগের আশানুরূপ হলো না। এরা হেরেই গেল। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে ৪৩টি আসনে। আওয়ামী লীগ ৩৪টিতে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৩টিতে। আর শেখ হাসিনার গৃহপালিত বিরোধী দল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি মাত্র একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপি জয়ী হয়েছে ৭২টিতে। আওয়ামী লীগ ৫৮টিতে। আর জামায়াত ৩৩টিতে। এখানে জাতীয় পার্টি চারটি আসনে জয়লাভ করে। জোট হিসেবে চিন্তা করলে বিএনপি-জামায়াত জোট পেয়েছে ৫৬টি আসন। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি পেয়েছে ৩৫টি। আর নির্বাচন যদি অবাধ ও নিরপেক্ষ হতো, তাহলে পাঁচটি আসনও পেত কি না সন্দেহ আছে।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ কথাই প্রমাণিত হলো যে, জনগণের ওপর অনন্তকাল ধরে জবরদস্তি খাটানো যায় না। জনগণ তার প্রতিবাদ করেই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী প্রহসনে ইলেকট্রনিক মিডিয়া যে ভূমিকা রেখেছিল, এবার তারা তা পারেনি। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা ৫ জানুয়ারির পর বলে দিয়েছিলেন যে, এসব করলে চলবে না। মিডিয়াকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। মিডিয়ারও সম্ভবত কোনো উপায় নেই। কারণ টিভি চ্যানেলগুলোর ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। যেকোনো সময় যেকোনো চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া যায়। দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ করার পর কেউ সম্ভবত আর ঝুঁকি নিতে চায়নি। কিন্তু এত কিছুর পরও সংবাদপত্রে আমরা নির্বাচনী কাণ্ডকারখানা দেখেছি। কোথায়ও বালক ভোট দিচ্ছে। কোথায়ও ব্যালট পেপার রাস্তায় পরা। আর বহুসংখ্যক ছবি ছাপা হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ব্যালট পেপারের বই নিয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তি কেবল সিল মেরেই চলছে। এ দেশের কোটি কোটি মানুষ তা দেখতে পেয়েছে। কেউ প্রত্যক্ষভাবে। কেউ সংবাদপত্রের মাধ্যমে। শুধু কিছুই দেখতে পায়নি জন্মান্ধ নির্বাচন কমিশন।
সামনে আরো উপজেলা নির্বাচন আছে। সেখানে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ প্রযোজনায় কী ঘটে, আল্লাহ তায়ালা বাঁচিয়ে রাখলে সম্ভবত তাও দেখব। কিন্তু জনগণের ওপর সব সময় যে জবরদস্তি খাটে না, সরকার যদি সেই সত্য উপলব্ধি করত তাহলে ভালো হতো।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply