জনশক্তির মানসংরক্ষণ ও উন্নয়নে দায়িত্বশীলের ভূমিকা

নিজামুল হক নাঈম

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়দীপ্ত একটি শহীদি কাফেলার নাম। আল্লাহপ্রদত্ত রাসূল (সা) প্রদর্শিত বিধানানুযায়ী মানুষের সার্বিক জীবনের পুনর্বিন্যাস সাধন করে আল্লাহর সন্তোষ অর্জন যার একমাত্র উদ্দেশ্য। সাময়িক বা চমক লাগানো কোন উদ্দেশ্য হাসিল এর লক্ষ্য নয়। এ উদ্দেশ্য হাসিলে মানুষের সার্বিক জীবনকে ইসলামের ছাঁচে ঢেলে সাজাবার কাজটিই করে যাচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির। এ ক্ষেত্রে ইসলামী ছাত্রশিবিরের মূল অগ্রাধিকার হচ্ছে ছাত্রাঙ্গন। ছাত্রশিবিরের এ কাজটি নিজেদের কোন আবিষ্কার নয়, নয় কেবল নিজেদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার বিষয়। বরং এ কাজটি হচ্ছে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনপ্রদত্ত দায়িত্ব ও আমানত। যে কাজের জন্য যুগে যুগে পাঠানো হয়েছিল অসংখ্য নবী ও রাসূল, যাঁদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিশেষ যোগ্যতা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। সর্বশেষ রাসূলে করীম (সা)-এর আগমনের মধ্য দিয়ে এই ধারার সমাপ্তি ঘটানো হয়। সকল নবী ও রাসূলের মূল কাজ ছিল শেরক এবং কুফর থেকে মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে আলোর দিকে ফিরিয়ে আনা। এরশাদ হচ্ছে, ‘আমিতো একনিষ্ঠভাবে নিজের মুখ সেই সত্তার দিকে ফিরিয়ে নিয়েছি যিনি জমিন ও আসমানের সৃষ্টি করেছেন এবং আমি কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ সূরা আন’আম, আয়াত-৭৯। শুধুমাত্র জাহেলিয়াত থেকে ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয় বরং একটি মানুষের গোটা অস্তিত্বজুড়ে যে বিশ্বাসের প্রভাব ছিল তা থেকে পরিশুদ্ধির যে বিশাল কাজ তাও সরাসরি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে সুচারুরূপে আঞ্জাম দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ (সা)। ইরশাদ হচ্ছে, তিনিই সেই সত্তা, যিনি উম্মিদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন। যে তাদেরকে তাঁর আয়াত শোনান, তাদের জীবন পবিত্র করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেন। অথচ এর আগে তারা স্পষ্ট গোমরাহিতে নিমজ্জিত ছিল। সূরা জুমুয়া, আয়াত ২। সুতরাং এই নবী-রাসূলদের (সা) ধারাবাহিকতার পর সর্বশেষ রাসূলের উম্মাত হিসেবে রাসূলের রেখে যাওয়া দায়িত্ব আমাদের ওপর অর্পিত হয়েছে।
জনশক্তি
ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Man Power. যে কোন সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের লোকবলকেই জনশক্তি বলে। ইসলামী ছাত্রশিবির যে লক্ষ্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছে তা বাস্তবায়নের মৌল শক্তি যাঁরা তারাই হচ্ছে জনশক্তি। স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির জনশক্তিদেরকে তিন স্তরে বিভক্ত করেছে। কর্মী, সাথী এবং সদস্য। প্রত্যেকটি স্তরের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কাজ, যোগ্যতা এবং দায়িত্ব। প্রত্যেক জনশক্তিই সংগঠনের কোন না কোন পর্যায়ের প্রতিনিধি। সমাজের যত মানুষ বইপুস্তক পড়ে সংগঠনকে জানেন তার চেয়ে অনেক বেশি লোক জনশক্তিদের দেখে সংগঠন সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। যদিও এটাই বাস্তব সত্য যে, একজন জনশক্তি বা প্রতিনিধি যা বলেন বা করেন তাই সংগঠনের বক্তব্য বা দৃষ্টিভঙ্গি না-ও হতে পারে। বরং একজন জনশক্তি বা প্রতিনিধিকে সংগঠন যা বলতে এবং করতে বলে তাই হচ্ছে মূলত সংগঠনের বক্তব্য বা দৃষ্টিভঙ্গি এবং সেই আলোকে সংগঠনকে মূল্যায়ন করাই হচ্ছে সবচাইতে সঠিক কাজ। তাই প্রত্যেক জনশক্তির পক্ষ থেকে সংগঠনের প্রত্যাশিত বক্তব্য, ভূমিকা এবং আচরণ তখনই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব যখন তার সঠিক মান সংরক্ষিত হবে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাজ হলো মূলত ছাত্রদের মাঝে। যারা দেশের টোটাল পপুলেশনের অংশ। এই সাধারণ ছাত্র তথা জনমানুষকে জনশক্তি তথা জনসম্পদে পরিণত করার কাজটিই করছে ইসলামী ছাত্রশিবির। এটা মৌলিকভাবে বৈষয়িক যোগ্যতা এবং দ্বীনি যোগ্যতা দু’টি দিক থেকেই।
মানসংরণে দায়িত্বশীলের করণীয়:
১. জনশক্তির নিজের এবং সংগঠনের উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দান:
উদ্দেশ্যের প্রতি আকর্ষণই একজন মানুষকে স্বীয় পথে আটকে রাখে। চাকচিক্যের পোশাকে আবৃত এ পৃথিবীতে বসে বস্তুবাদের কঠিন আবরণকে ভেদ করে আল্লাহর গোলামদের জন্য মালিকের পক্ষ থেকে সাজানো সেই নেয়ামতের প্রতি আকর্ষণ না থাকলে এ পথে টিকে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ জন্য প্রত্যেক জনশক্তিকে কি জন্য এ সংগঠনে সম্পৃক্ত হয়েছে তা জেনে না এলেও এখানে সম্পৃক্ত একজন জনশক্তির কি উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তা তাকে অবশ্যই জানতে হবে, জানাতে হবে। কেননা একজন ভাই সঠিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে নাও আসতে পারেন। কেউ হয়ত পারিবারিক কারণে, কোন ভাইয়ের সুন্দর বক্তৃতা শুনে, কোনোভাবে উপকৃত হয়ে ইত্যাদি কারণে সংগঠনে চলে এসেছেন। এরকম কোন কারণে সংগঠনে সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়া খুব দোষণীয় না হলেও সম্পৃক্ত হওয়ার পর সঠিক ধারণা না পাওয়াটা অবশ্যই ক্ষতিকর। কেননা ইসলামী আন্দোলনের বাহ্যিক কিছু কর্মসূচি এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো দেখলে এটাকে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মত বা অন্য সকল রাজনৈতিক দলের চেয়ে সবচাইতে সুন্দর একটি দল মনে করা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্য একজন রাজনৈতিক কর্মীর মিছিলে আসা, শ্লোগান দেয়া, মার খাওয়া ইত্যাদি কাজে শরিক হওয়া আর ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মী একই কাজে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যের ফারাক রাত আর দিনের মতো। একজন জনশক্তির উদ্দেশ্য ও আদর্শের সুস্পষ্ট ধারণার কমতি বা অনুপস্থিতিই তার নিরন্তর সক্রিয় থাকার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। এ জন্য একজন দায়িত্বশীলকে স্বীয় জনশক্তির বিশুদ্ধ নিয়ত এবং নিজের ও সংগঠনের উদ্দেশ্য-আদর্শ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দানে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
২. সালাত আদায়ে গুরুত্ব দান:
সকল পর্যায়ের জনশক্তিদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতে আদায়ের তত্ত্বাবধান ও জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং নফল ইবাদাত বন্দেগি বিশেষ করে সালাতুল তাহাজ্জুদ আদায়ে করার প্রতি তত্ত্বাবধান বাড়ানো দরকার। আমাদের প্রত্যাশিত ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম কাজ হবে নামাজভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। আর নামাজভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আগে আমাদের পরিবেশকে নামাজভিত্তিক পরিবেশে পরিণত করতে হবে। আর সে জন্য জরুরি কাজ হচ্ছে নামাজকে আমাদের অধীনস্থ না করে আমাদেরকে নামাজের অধীনস্থ হতে হবে। তাহলেই কেবল নামাজের মাধ্যমে আবেদ আর মাবুদের মধ্যকার কাক্সিত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিক কর্মসূচিসমূহ নামাজের সময়কে বেস ধরে ঠিক করা, প্রোগ্রামসমূহের মধ্যে নামাজের সময় পড়ে গেলে প্রোগ্রাম সূচিতেই বিরতির সময়কে কার্যকর করা জরুরি। ব্যক্তিগত ভূমিকা এবং মোটিভেশনও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিধায় নামাজের শেষে গিয়ে আগে আসার প্রবণতা পরিহার করে আগে গিয়ে পরে আসার প্র্যাকটিস বাড়ানো দরকার। রাসূল (সা) বলেছেন নামাজ হচ্ছে মুমিনের মি’রাজ। অন্য হাদিসে নামাজে মনোযোগী হওয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘তুমি এমনভাবে নামাজ আদায় করবে যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ, এমনটি সম্ভব না হলেও অন্তত আল্লাহ তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন এই অনুভূতি অন্তরে লালন করবে।’ এই অনুভূতি ছাড়া নামাজের সত্যিকার ফায়দা হাসিল করা সম্ভব নয়।
৩. সকল জনশক্তির প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা:
সংগঠনের একজন দায়িত্বশীলের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো প্রত্যেকটি জনশক্তির প্রত্যাশিত মান নিশ্চিত করা। এ জন্য তার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ একান্ত জরুরি। আমাদের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামসমূহ অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মানোন্নয়নের টার্গেটের লোকদের নিয়ে হয়ে থাকে, এর বাইরে বিশাল পরিমাণ জনশক্তি প্রশিক্ষণের আওতার বাইরে থেকে যায়। অথচ একজন জনশক্তির মানোন্নয়ন যত গুরুত্বপূর্ণ অন্য আর একজনের মান-অবনতি ঠেকানো আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের পরিকল্পনা গত বছর কতটি হয়েছে সে আলোকে না নিয়ে বরং ময়দানের জনশক্তির আলোকে কতটি প্রোগ্রাম দরকার সেই পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। দায়িত্বশীলকে নিশ্চিত করতে হবে একজন জনশক্তিও যেন প্রশিক্ষণের আওতা থেকে বাদ না পড়ে। শুধুমাত্র শিক্ষাশিবির-শিক্ষা বৈঠকগুলোকেই প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় ডোজ মনে করলে হবে না বরং প্রত্যেক স্তরের জনশক্তির জন্য সাপ্তাহিক, মাসিক অন্যান্য নিয়মিত কর্মসূচিও প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মনে রাখা উচিত একজন ভাইকে প্রশিক্ষণের আওতায় এনে মানসংরক্ষণ করতে না পারার অর্থ অনেকটা মান- অবনতির দিকে ঠেলে দেয়া। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন।
৪. সবাইকে স্ব স্ব দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া এবং দায়িত্বের ওপর তৎপর রাখা:
জনশক্তির মানসংরক্ষণই শুধুমাত্র নয় মানোন্নয়নের ক্ষেত্রেও দায়িত্বে তৎপর থাকা জরুরি। দায়িত্বপালন তখনই সহজ হবে যখন একজন ভাই স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকবে। ছাত্রসংগঠন হওয়ার কারণে প্রত্যেকটি সেটাপেই নতুন নতুন দায়িত্বশীল নির্বাচিত বা মনোনীত হন, যাঁদেরকে প্রয়োজনীয় কাজগুলো বুঝিয়ে দেয়া খুবই জরুরি। প্রত্যেক জনশক্তির জন্য নির্ধারিত কর্মসূচিগুলোতে তৎপর রাখা এবং যেখানেই যাকে অনুপস্থিত দেখা যাবে সেখানেই তাকে খুঁজে বের করা দরকার। এখন আমাদেরকে অনেকটা প্রোগ্রাম এবং রিপোর্টনির্ভর হওয়ার কারণে অনেক জনশক্তি এক দু’টি কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থেকে পরবর্তী কাজগুলোতে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং অনেকে নিজের অর্থনৈতিক সমস্যা, পারিপার্শি¦ক অবস্থা এবং চোখ ধাঁধানো বস্তুতান্ত্রিক বিভিন্ন আয়োজন ও আহবানে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। যার ফলে অনেক জনশক্তিকে দীর্ঘসময় একাডেমিক ছাত্রজীবন থাকার পরও ছাত্রজীবন শেষ(?) বাতিল ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক সুন্দর অনুভূতি নিয়ে এক সময় সংগঠনে সম্পৃক্ত হওয়া ভাইটিকে অপ্রত্যাশিতভাবে বিদায় দিতে হয়। এসব কিছুর হাত থেকে জনশক্তিদেরকে হেফাজত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হচ্ছে চিন্তা এবং তৎপরতার দিক থেকে সক্রিয় রাখা। যেহেতু মানুষ শুধুমাত্র ঘুমছাড়া এ দু’টি কাজ থেকে কখনো বিশ্রাম নেয় না, বিধায় মনটাকে সুন্দর চিন্তা এবং তৎপরতার দিক থেকে ভালো কাজ না দিলে খারাপ চিন্তা ও অসুন্দর আচরণ করা খুবই স্বাভাবিক।
৫. সকল জনশক্তিকে যোগাযোগের আওতায় রাখা:
জনশক্তির মানসংরণের েেত্র যোগাযোগ অতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যোগাযোগ ছাড়া একজন মানুষ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা যায় না। আর সঠিক ধারণা ছাড়া একজন মানুষকে পরিচালনা সম্ভব নয়। যোগাযোগের মাধ্যমে একজন জনশক্তির যেমন ভাল কোন খবর বা তৎপরতা জানতে পারলে নিজের কাছে ভাল লাগে, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করা যায়। তেমনি কোন দুঃসংবাদে তার পাশে দাঁড়ানো যায়। আবার তার মধ্যে কোন ত্রুটি লক্ষ্য করলে যথাসময়ে সংশোধনের ব্যবস্থা নেয়া যায়। যোগাযোগ হচ্ছে জনশক্তিকে ইনসাফপূর্ণভাবে কাজে লাগানোর পূর্বশর্ত। এছাড়া জনশক্তির মধ্যকার কোন ত্রুটি দেখা দিলে সংগঠনের প্রয়োজনে প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা নিতে হয় কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি কল্যাণকর হচ্ছে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, যার জন্য যোগাযোগ অন্যতম একটি মাধ্যম।
৬. জনশক্তির মধ্যে আখিরাতমুখী চিন্তা সুদৃঢ় করা:
শয়তান আল্লাহর কাছ থেকে অবকাশ নিয়ে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল যে আমি দুনিয়াকে চাকচিক্যময় করে ঈমানদারদেরকে বিভ্রান্ত করবো। সেই চাকচিক্যময় দুনিয়ার সবচাইতে বড় উপাদান হচ্ছে বস্তুবাদ, যা অতি সূক্ষ্মভাবে ব্যবসায় ভাল করা, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ইত্যাদি চিন্তার মাধ্যমে মুমিনদের পেয়ে বসতে পারে। বিশেষ করে ছাত্রজীবনেই কিছু শুরু করা, ভেতরে ভেতরে কোন জায়গায় নাম দিয়ে রাখা ইত্যাদি চিন্তা ও কাজ নিজের প্রতি আস্থাহীনতা এবং আখেরাতমুখী চিন্তার অনুপস্থিতি বা কমতিকেই প্রমাণ করে। একজন জনশক্তির জন্য আন্দোলনের প্রতি সবচাইতে ন্যায়সঙ্গত ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ হল সংগঠন তাকে যেভাবে চায় নিজেকে সেভাবে সংগঠনের জন্য উৎসর্গ করা এবং সবকিছুর প্রতিদান পাওয়ার জন্য একমাত্র আখিরাতকে সামনে রাখা।
৭. সরাসরি কুরআন হাদিস অধ্যয়নের প্রতি গুরুত্ব দান:
দায়িত্বশীলসহ সকল জনশক্তির কুরআন ও হাদিসের অধ্যয়ন বাড়ানো এবং তা থেকে শিা গ্রহণ করার প্রতি গুরুত্ব দেয়া। মাসিক বৈঠকে দারসুল কুরআন ও দারসুল হাদিস পেশ নিশ্চিত করা। নিবিষ্টচিত্তে বুঝে বুঝে কুরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। কুরআন তেলাওয়াতকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রেখে কোন ফায়দা হাসিল করা সম্ভব নয় বরং তেলাওয়াতে কুরআনকে ‘যা-দাতহুম ঈমানান’ এর অন্যতম উৎসে পরিণত করার অনবরত আপ্রাণ চেষ্টা করা দরকার। কুরআনকে কেবলমাত্র মানার উদ্দেশ্যে জানতে হবে অন্য কোন উদ্দেশ্যে কুরআন অধ্যয়ন করে কুরআন থেকে সঠিক ফায়দা হাসিল করা সম্ভব নয়।
৮. নৈতিক মানসংরণে জনশক্তির দাওয়াতি কাজের কোন বিকল্প নেই:
দাওয়াতি কাজ যেমনি নতুন মানুষকে সংগঠনে আনার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ তেমনি নিজের আত্মশুদ্ধির জন্য তার চেয়ে বেশি অপরিহার্য। সংগঠনের জনশক্তির মধ্যে তারাই সবচাইতে বেশি ভাল যারা বেশি দাওয়াতি কাজ করে। দাওয়াতের কাজটি অন্যকে সংশোধনের জন্য মনে হলেও মূলত এটি নিজের জন্যই বেশি কাজে লাগে। এ জন্য দাওয়াতের কমন দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে দাওয়াত হবে ‘সবসময় সবখানে’ আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামষ্টিক দাওয়াতের চেয়ে ব্যক্তিগত দাওয়াতের জন্য ‘জনে জনে দাওয়াত’ শ্লোগানকে সকল পর্যায়ে আরো বেশি ছড়িয়ে দেওয়া, কেন্দ্রীয় সংগঠনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১২, ১০, ৫ হারে সমর্থক বৃদ্ধির জোরতৎপরতা চালানোর পাশাপাশি সোমবারকে দাওয়াতি বার হিসেবে কাজে লাগানো দরকার। যা জনশক্তির নিজের মানসংরক্ষণের জন্যই বেশি প্রয়োজন।
৯. সময় অপচয় রোধ করা এবং বেহুদা কাজ থেকে দূরে থাকা:
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেছেন, অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে। যারা তাদের নামাজে বিনয়ী ও ভীত থাকে। যারা বেহুদা কাজ থেকে বিরত থাকে। সূরা মুমিনুন আয়াত : ১-৩। অতিরিক্ত পরিমাণে টিভি দেখা, সাংগঠনিক আড্ডা, ফেইসবুক-টুইটার ইত্যাদিতে অতিরিক্ত সময় দেয়ার মতো কাজগুলো থেকে জনশক্তিদেরকে দূরে থাকা এবং দূরে রাখা জরুরি।
১০. গুনাহর কাজ নয় তবে গুনাহর পথ সৃষ্টি করতে পারে এমন বিষয়ে সতর্ক করা:
পর্দার বিধান, পরিধি, লঙ্ঘনের সুযোগগুলো সৃষ্টি হয় এমন বিষয়সমূহে জনশক্তিদেরকে ওয়াকিফহাল করা। এক্ষেত্রে নিকটআত্মীয়দের (গাইরে মুহরিমাত) সাথে দেখা সাক্ষাৎ, কাস বা অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে অবাদে মেলামেশা, টিভি নাটক দেখা, মিউজিক দিয়ে গান শুনা এবং লজিং টিউশনিতে ছাত্রী পড়ানোর মত বিষয়গুলো থেকে জনশক্তিদেরকে বিরত রাখার ব্যপারে সর্বোচ্চ মোটিভেশন জরুরি।
মানোন্নয়ন এবং তার আবশ্যকতা :
মান ইংরেজি প্রতি শব্দ হল standard. ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মান দুই ধরনের হতে পারে- ১. সাংগঠনিক মান ২. আদর্শিক মান। সাংগঠনিক মান বলতে নিজ নিজ সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামোতে যে স্তরসমূহ রয়েছে তাকে বুঝানো হয়। আদর্শিক মান বলতে ইসলামী চিন্তাচেতনা, ঈমান, আমল এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উচ্চতাকে বুঝানো হয়। যার স্তরসমূহ হচ্ছে- ঈমান, ইসলাম, তাকওয়া এবং ইহসান। মানোন্নয়ন বলতে সাংগঠনিক এবং আদর্শিক দিক থেকে সৌন্দর্যের পর্যায়ে উন্নীত হওয়া। রাসূল (সা) বলেছেন- ‘যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে সুন্দর হলো না তার জন্য ধ্বংস।’ রাসূলের (সা) এই সতর্কবাণী অনুযায়ী নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে থাকতে হলে একজন মুমিনের জন্য স্বীয় মানের উন্নতির প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। কারণ উন্নতি বা এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা না চালিয়ে কোন নির্দিষ্ট স্তরে অবস্থান করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা একজন মুমিন এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করলেও তাকে পেছনে ঠেলে দেয়ার জন্য শয়তানি সকল আয়োজন ঠিকই সচল রয়েছে। তাই প্রত্যেকটি অবস্থান থেকে এগিয়ে যাওয়ার নিরলস প্রচেষ্টাই হল মানোন্নয়ন।
দায়িত্বশীলের করণীয়:
১. সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা:
ইংরেজিতে একটি কথা আছে, If we fail with right scheme, we will take the wrong to succeed. যদি আমরা সঠিক পরিকল্পনা নিতে ব্যর্থ হই তাহলে আমরা ব্যর্থ হওয়ার পরিকল্পনা নিলাম। আমাদের সংগঠনের যত কাজ রয়েছে তার সবই মানোন্নয়নকে কেন্দ্র করে, অর্থাৎ সব কাজের প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে মানোন্নয়ন। এই দৃষ্টিভঙ্গি মাথায় রেখেই একজন দায়িত্বশীলকে তার সামগ্রিক সিদ্ধান্ত এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী ছাত্রশিবির একটি গতিশীল ছাত্রসংগঠন হওয়ার কারণে এখানে দায়িত্বশীলের পরিবর্তন ঘটে খুব দ্রুত। আর এই কম সময়ের মধ্যেই যে কাজ একজন দায়িত্বশীলকে আঞ্জাম দিতে হয় তার ব্যাপকতা এবং বিস্তৃতি অনেক বেশি। উপশাখার কুরআন তালিম, হাদিস পাঠ, ফলচক্র বা ঝাল-মুড়ি খাওয়ার আসর থেকে শুরু করে ইউনিয়ন, থানা এবং শাখা পর্যায়ের বড় বড় সম্মেলনও আমাদেরকে বাস্তবায়ন করতে হয়। এতসব কাজের ভিড়ে একটি সুন্দর পরিকল্পনা ও সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত ছাড়া মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা কোনোভাবে সম্ভব নয়।
২. জীবনের ল্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ:
একজন মুমিন স্বীয় জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করতে হবে। কারণ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের প্রতি যার ধারণা যত স্বচ্ছ তার প্রতিটি পদক্ষেপ তত মজবুত, যার আকর্ষণ যত তীব্র তার গতি তত ক্ষিপ্র এবং তার কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা তত বেশী। অপরদিকে যদি জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা স্বচ্ছ এবং সঠিক না হয় তাহলে চলার গতি শুধু মন্থরই নয় বরং বিপরীত বা ক্ষতিকরও হতে পারে। এজন্য একজন জনশক্তির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সঠিক ভাবে নির্ধারিত হওয়া জরুরী।
৩. জনশক্তি বাছাই:
মানোন্নয়নের জন্য জনশক্তি বাছাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ জন্য বয়স, আগ্রহ, যোগ্যতা, ময়দানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলোকে সামনে রেখে জনশক্তি বাছাই করতে হবে। বয়স ও যোগ্যতার সাথে জনশক্তির মধ্যে মানোন্নয়নের আগ্রহ থাকলে বিষয়টি বাড়তি কাজ দেয়। কিন্তু বয়স ও যোগ্যতার ঘাটতি রেখে প্রচণ্ড আগ্রহী ভাইদেরকে যতেœর সাথে তত্ত্বাবধান করা জরুরি। অপর দিকে যোগ্যতা সুযোগ এবং সংগঠনের জন্য যাদেরকে প্রয়োজন এমন ভাইদের আগ্রহ কম থাকলেও তাদেরকে দরদের সাথে মানোন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা যোগ্যতার ঘাটতি থাকলে হয়ত অনেক পরিমাণে সাথী-সদস্য পাওয়া যাবে কিন্তু দায়িত্বশীল বানাতে না পারলে এই সাথী সদস্যরা একদিকে সংগঠনের বোঝায় পরিণত হবে, অন্য দিকে সংগঠনের অশ্বস্তির কারণ হবে।
৪. কোটা পূরণ নয় লোক তৈরি:
কোন সংখ্যা পূরণ নয় বরং কাক্সিত টেকসই নেতৃত্বের সঙ্কট পূরণই মানোন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত। কোন মানুষের শরীরের ভেতর রোগ রেখে বাইরে কেতাদুরস্ত পোশাক পরলেই সুস্থ বা স্বাভাবিক মানুষ হতে পারে না বরং বাহ্যিক পোশাক আশাক জীর্ণ-শীর্ণ হলেও অভ্যন্তরে সুস্থ, পরিচ্ছন্ন মানুষটি অনেক বেশি শক্তিশালী ও মূল্যবান। ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মীর মধ্যে যদি সাথী হওয়ার সকল যোগ্যতা তৈরি হয়ে যায় কিন্তু যে কোন কারণে আনুষ্ঠানিকতা বাকি থাকার কারণে সাথী পরিচয় দিতে না পারেন, শুধু এতটুকু কারণে সাথী বলতে না পারলেও একজন সাথীর সার্ভিস তার কাছ থেকে সংগঠন সারা জীবনই পাবে। অন্তত এই মানের কোন ক্ষতি করা তার পক্ষে সম্ভবই নয়। অপর দিকে যথাযথ মান অর্জন করে সাথী না হলে অর্থাৎ কোন ত্রুটি রেখে সার্টিফিকেট পেয়ে গেলে তা সংগঠনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। এ জন্য জনশক্তির মাঝে মানোন্নয়নের প্রচণ্ড আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে, গলিপথ খোঁজা যাবে না। ভাইয়ের ঘাটতিগুলো দূরীকরণে একজন দায়িত্বশীল অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও করুণাসিক্ত হবেন। তাড়াহুড়া করা, মাত্রাতিরিক্ত ওয়ার্কশপ এবং অতি ভালোবাসার কারণে বা কয়েকবার কণ্টাকে এসেছেন বলে দূর্বলতাগুলোকে ওভারলুক করা যাবে না। বরং জনশক্তিদের সাহচর্য ও নিবিড় তত্ত্বাবধান বাড়ানোর পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত লেগে থেকে তত্ত্বাবধান করতে থাকলে অনেক দূর্বল লোকও ভাল মানে উন্নীত হতে পারেন।
শেষ কথা : সর্বোপরি একটি আদর্শিক আন্দোলনের জনশক্তিদেরকে সঠিক লক্ষ্যে এগিয়ে নেয়া এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মেজাজে গড়ে তোলার জন্য একজন দায়িত্বশীলকেই সর্বাধিক যত্নবান হতে হবে। প্রত্যেকটি জনশক্তিকে মূল্যবান আমানত মনে করে তার হেফাজতের জন্য যথাযথ পেরেশানির সাথে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারলে একদিকে সফল ইসলামী সমাজ বিনির্মানের জন্য কাংখিত লোক তৈরী হবে অন্যদিকে অনাকাক্সিতভাবে কোন জনশক্তিকে হারাতে হবে না, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply