জনসংখ্যা বেড়েছে ২৮ লাখ ৫০ হাজার শিক্ষিতদের কাজের সুযোগ কম -হারুন ইবনে শাহাদাত

এক বছরে জনসংখ্যা ২৮ লাখ ৫০ হাজার বেড়ে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজারে। এর আগে ২০১৫ সালের নমুনা জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৮৯ লাখ। ইধহমষধফবংয ইঁৎবধঁ ড়ভ ঝঃধঃরংঃরপং বা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ নমুনা জরিপে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে এ জরিপের তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন এর প্রকল্প পরিচালক এ কে এম আশরাফুল হক। তিনি বলেন, “সারা দেশে নিদির্ষ্ট কিছু এলাকায় নির্দিষ্ট কিছু জরিপ কর্মী দিয়ে এ জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতি বছরই এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। সারা দেশের ২ হাজার ১২টি এলাকায় এ নমুন জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে এক হাজার ৭৭টি পল্লী এলাকার আর ৯৩৫টি শহর এলাকা থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়।” জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারী পর্যন্ত হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ পুরুষ আর ৮ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার নারী। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৮ লাখ। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ৫ লাখ আর নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩ লাখ। এক বছর আগে বা ২০১৫ সালে মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৮৯ লাখ। ওই বছর পুরুষের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৯৬ লাখ আর নারীর সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৯৩ লাখ।
নমুনা জরিপ সাধারণ দুটি আদমশুমারির মধ্যবর্তী সময়ে করা হয়েছে। আদমশুমারিতে প্রতিটি বাড়ি ও ঘর থেকে জনসংখ্যার তথ্য সংগ্রহ করা হলেও নমুনা জরিপে তা করা হয় না। নমুনা জরিপে দুটি পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দুই পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা এসব তথ্য মিলিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর জরিপের ফল নির্ধারণ করা হয়।
আদমশুমারিতে জনসংখ্যার প্রকৃত তথ্য বের হয়ে আসলেও নমুনা জরিপে তা নয়। বাংলাদেশে সবর্শেষ আদমশুমারি হয়েছিল ২০১১ সালে। পঞ্চম ওই আদমশুমারি প্রতিবেদনে জনসংখ্যা ছিলো ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার। ওই আদমশুমারির তথ্যের সঙ্গে সর্বশেষ নুমনা জরিপের তথ্যের তুলনা করলে গত ছয় বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় দুই কোটি।
জরিপে বেকার সমস্যা, কাজের সুযোগ, রেমিট্যান্সপ্রবাসীদের মোট আয়, নারী নির্যাতন, প্রতিবন্ধিতার কারণসহ বিভিন্ন বিষয় তুল ধরা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন ও পত্রপত্রিকার আলোকে জরিপের ফলাফল সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
ডিগ্রিধারী প্রতি ১০০ জনে ৯ জন বেকার: ইধহমষধফবংয ইঁৎবধঁ ড়ভ ঝঃধঃরংঃরপং বা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে ১৪ লাখ নতুন শ্রমশক্তি দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছে, কর্মসংস্থানও হয়েছে ১৪ লাখ। বেকারত্বের হার ৪.৩ থেকে কমে ৪.২ শতাংশ হয়েছে। এরপরও দেশে বেকারত্বের সংখ্যা ২৬ লাখ। এর মধ্যে ডিগ্রিধারী প্রতি ১০০ জনে ৯ জন বেকার। যা শতাংশের হিসাবে উচ্চ শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ৯ শতাংশ। বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বেকারত্বের এই হিসাব আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) দেয়া মানদ- অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ না করলে ওই ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশে সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কাজ করতে পারেন না এমন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ। অন্যদিকে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ করেন অথবা নিজেদের উপযোগী নয়, তাই নতুন কাজ খুঁজছেন এমন ‘আন্ডার এমপ্লয়মেন্ট’-এর সংখ্যা ১৮ লাখ। অর্থাৎ দেশে প্রকৃত বেকারত্বের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৪৪ লাখ। বিবিএস প্রতিবেদন মতে, এ দেশে পড়াশোনা না করলেই কাজ পাওয়ার সুযোগ বেশি। কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগ পাননি, এমন মানুষের মধ্যে মাত্র ২.২ শতাংশ বেকার। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীর মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি বেকার। ২০১৩ সালের হিসাবে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৯০ হাজার। জরিপ অনুযায়ী, এখন বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ। তবে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি বেকার। নারীদের বেকারত্বের হার ৬.৮ শতাংশ এবং পুরুষদের ৩ শতাংশ। নারী ও পুরুষ উভয়েই ১৩ লাখ করে বেকার। বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ হালনাগাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর ১০.৪ ভাগ বেকার।
বিবিএস পরিচালক কবির উদ্দিন বলেন, উচ্চ শিক্ষিতদের মাঝে ১২.১ ভাগ বেকার। তাদের মধ্যে নারীদের হার বেশি, ১৫ শতাংশ। শহর অঞ্চলে বেকারত্বের হার (৪.৪%) গ্রামের তুলনায় (৪.১%) বেশি। দেশের কর্মক্ষম নারীদের ৬.৮ ভাগ বেকার, পরুষদের মধ্যে ৩ শতাংশ বেকার। কর্মসংস্থানে নিয়োজিত রয়েছে এমন জনগোষ্ঠীর ৩২.৮ ভাগ রয়েছে কৃষি খাতে। ১৫.৬ ভাগ রয়েছে সেবা খাতে। কারুশিল্প ও এ ধরনের অন্য শিল্পে নিয়োজিত রয়েছে ১৬.২ ভাগ শ্রমশক্তি। ১৪.৪ ভাগ শ্রমিক রয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে, যার ৩০ ভাগ রয়েছে গার্মেন্টস খাতে। তবে মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ৩২ ভাগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। দেড় কোটি শ্রমশক্তির প্রাথমিক শিক্ষা রয়েছে। ১ কোটি ৭৯ লাখ শ্রমশক্তি মাধ্যমিক গ-ি পেরিয়েছেন। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রমশক্তির ১৫ ভাগ কোনো মজুরি ছাড়াই শ্রম দিয়ে থাকেন, এর বড় অংশ পারিবারিক কাজে নিয়োজিত। তবে পারিবারিক খাতে মজুরি ছাড়া নিয়োজিতদের সংখ্যা ১৮.৯ ভাগ কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবিএসের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কাজ করেন এমন মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৯৫ লাখ। এর আগের ২০১৩ সালের জরিপে এই সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৮১ লাখ। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত দেড় বছরে কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ১৪ লাখ, যা নতুন কর্মসংস্থান বলে মনে করে বিবিএস।
এক দশকের ব্যবধানে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সোয়া এক কোটি। ২০০৬ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, তখন দেশে ৪ কোটি ৭৪ লাখ কর্মজীবী মানুষ ছিলেন। ২০১০ সালে এসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৪১ লাখে। ওই সময়ে বছরে গড়ে ১৩ লাখ ৪০ হাজার বাড়তি কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চার প্রান্তিকের মধ্যে জুলাই-সেপ্টেম্বর এই প্রথম প্রান্তিকেই কর্মসংস্থান কম বেড়েছে। আর সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে। দুই বছরের ব্যবধানে নারী ও পুরুষ উভয়ের গড় মজুরি বা আয় বেড়েছে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের চেয়ে নারীরা কম আয় করেন। নারীদের গড় আয় ১২ হাজার ১০০ টাকা। ২০১৩ সালে আয় ছিল ১০ হাজার ৮১৭ টাকা। এখন একজন পুরুষ গড়ে ১৩ হাজার ১০০ টাকা আয় করেন, দুই বছর আগে ছিল ১১ হাজার ৭৩৩ টাকা।
রেমিট্যান্সের ২৫.৩৩ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে: রেমিট্যান্সপ্রবাসীদের মোট আয় বা রেমিট্যান্স থেকে গড়ে ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ বিনিয়োগ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীরা প্রত্যেকে বছরে গড়ে তিন লাখ দুই হাজার ১৮৪ টাকা টাকার বেশি দেশে পাঠাচ্ছেন। ২০১৫ সালে প্রবাসীরা যে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, তা মোট জাতীয় আয়ের ১২ দশমিক ৮৩ ভাগ। এছাড়া ২০১৫ সালে প্রবাসী আয়ের ৭৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ অর্থ বাড়িঘর/ফ্ল্যাট নির্মাণ ও সংস্কার খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে। আর অন্যান্য খাতে ১ থেকে ৭ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে। প্রবাস আয়ের ৯ দশমিক ০৮ শতাংশ জমি কেনায় ব্যবহার করা হয়েছে। এ সময় দিলদার হোসেন বলেন, ২০১৩ সালে বিবিএস অর্থনৈতিক শুমারি পরিচালনা করে। ওই শুমারির জন্য বরাদ্দ থেকে বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়ে প্রবাস আয়ের জরিপের প্রস্তাব করা হয়। তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রীর সম্মতিতে এ জরিপ করা হয়। তিনি আরও জানান, সারা দেশ থেকে ১০ হাজার ৪৫১টি খানা নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে গত ১ থেকে ৯ মার্চ পর্যন্ত মাঠ পর্যায় হতে জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুরো এক বছরের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, রেমিট্যান্সের ৭৮ শতাংশ আসে বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে। অবৈধ চ্যানেলের মধ্যে হুন্ডির মাধ্যমে আসে ১২ শতাংশ।
জরিপ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, আর গত বছরে প্রবাস আয় গ্রহণকারীদের মধ্যে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ প্রবাস আয় সঞ্চয় করেছে। তবে ৫৯ দশমিক ২৯ শতাংশ প্রবাস আয় গ্রহণকারী কোনও সঞ্চয় করেননি। আর প্রবাস আয় থেকে সঞ্চয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সঞ্চয় করা হয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থায়। এর মধ্যে প্রায় ৫০ ভাগ সঞ্চয়ী হিসাব, ডিপিএস, এসডিপিএস আকারে ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ, স্থায়ী আমানত হিসাবে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ, সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ প্রবাস আয় সঞ্চয় করা হয়েছে। জরিপে বলা হয়, ৮৬ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত আছেন। ২০১৫ সালে প্রবাস আয়ের ৯৬ শতাংশ আসে নগদে এবং ৪ শতাংশ আসে দ্রব্যমূল্য হিসেবে। রেমিট্যান্স পাঠানোয় সবচেয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ব্যাংক। এছাড়াও বিকাশের মাধ্যমে আসছে ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, আর ১২ দশমিক ৬৬ ভাগ পাঠানো হচ্ছে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ও মানিগ্রামের মাধ্যমে।
প্রতিবন্ধিত্বের ৩ শতাংশই ভুল চিকিৎসায় : সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক প্রতিবেদনেও ভুল চিকিৎসায় রোগীর প্রতিবন্ধিত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে। চির প্রতিবন্ধিত্বের শীর্ষ পাঁচটি কারণের মধ্যে ভুল চিকিৎসা একটি প্রধান কারণ। বিবিএস জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট প্রতিবন্ধীর মধ্যে ৩ শতাংশ ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে প্রতিবন্ধিত্ববরণ করেছেন। প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো গত দুই বছরের ব্যবধানে দেশে ভুল চিকিৎসার হার বেড়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণে সহায়তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক সূচকের তথ্য বিবিএস সংগ্রহ করে থাকে। এ জরিপের জন্য ১৯৮০ সাল থেকে ১০টি খাতের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সর্বশেষ জরিপে নমুনার সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। বছরব্যাপী প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে বিবিএস। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের এক হাজার মানুষের মধ্যে নয়জন প্রতিবন্ধী। এর ৩ শতাংশ ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে চিরতরে প্রতিবন্ধী হয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নারীরা। শহরের সাড়ে ৩ শতাংশ ও গ্রামের ৩ শতাংশ নারী ভুল চিকিৎসায় স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ২০১২ সালে বিবিএস ভুল চিকিৎসা বিষয়ে প্রথম তথ্য সংগ্রহ করে। ওই বছর ভুল চিকিৎসার কারণে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্তের হার ছিল আড়াই শতাংশ।
বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জন্মগত কারণে ৫০ শতাংশ, দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সাড়ে ১১ শতাংশ, অসুস্থতার কারণে ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী হচ্ছে। এর বাইরে বার্ধক্যজনিত কারণে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধী হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধী হওয়া মানুষের মধ্যে ৭ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। বিভাগ অনুযায়ী প্রতিবন্ধী হওয়া মানুষের হিসাবও করেছে বিবিএস। সংস্থাটির হিসাবে এক হাজার মানুষের মধ্যে বরিশালে ৯, চট্টগ্রামে ৯, ঢাকায় ৮, খুলনায় ১০, রাজশাহীতে ১০, রংপুরে ১২ ও সিলেটে ৮ জন ভুল চিকিৎসার বলি হয়ে চিরতরে প্রতিবন্ধী হয়ে গেছেন।
বিবিএসের মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশের (এমএসভিএসবি) প্রকল্প পরিচালক এ কে এম আশরাফুল হক সমকালকে বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় মানুষ কেন পঙ্গুত্ব এবং প্রতিবন্ধী হচ্ছে, তার কারণ খুঁজে বের করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, মানুষের শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ার অন্যতম কারণ ভুল চিকিৎসা। এ কারণে কেউ কেউ চিরদিনের মতো অন্ধ, বধির, বিছানা থেকে উঠতে না পারা, খাওয়াসহ ব্যক্তিগত কাজে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিবিএসের জরিপ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। তবে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের একজন চিকিৎসককে দিনে ১২০ জনের বেশি রোগীকে সেবা দিতে হয়। বিশ্বের কোথাও এত রোগী দেখার ইতিহাস নেই। এ কারণে চিকিৎসায় ভুলের অভিযোগ উঠতে পারে। তবে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বেশি মামলা হলে তারা ঝুঁকি নিতে চাইবেন না বলে মনে করেন তিনি।
বিশিষ্ট আইনজীবী শাহ্দীন মালিক বলেন, ভুল চিকিৎসার কারণে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ থাকলেও আইনজীবীদের অজ্ঞতা এবং ভুক্তভোগী রোগীর আত্মীয়স্বজনের প্রতিহিংসার কারণে সম্ভব হচ্ছে না। ভুল চিকিৎসার কারণে দুনিয়াব্যাপী ক্ষতিপূরণের মামলা হয়। দেশে ভুলের কারণে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হলে চিকিৎসকরা রোগীর প্রতি অবহেলা করার সাহস পাবেন না। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি মনজিল মোরসেদ বলেন, চিকিৎসকদের ভুল চিকিৎসার কারণে ভুক্তভোগীর মামলা করার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ এবং ফৌজদারি দুই ধরনের মামলা করার সুযোগ রয়েছে। তবে অনেকে বিষয়টি জানেন না। এ কারণে ভুল চিকিৎসা দিয়েও অনেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
স্বামীরা অকারণে রাগ করেন : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫’ শীর্ষক দ্বিতীয় জরিপ বলছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণসংক্রান্ত নির্যাতনের মধ্যে বেশি ছিল স্বামীর অকারণে রেগে যাওয়া। ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ বিবাহিত নারী (বিবাহিত ছিলেন এবং আছেন) অকারণে স্বামীর রেগে যাওয়ার কারণে নির্যাতনের শিকার হন। সম্প্রতি এ জরিপটি প্রকাশিত হয়। দেশীয় ও জাতিসংঘের মানদ- অনুযায়ী জরিপে স্বামীর এ ধরনের আচরণের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক ছিল, স্ত্রী স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার আগে স্বামীর অনুমতি নেবেন, এ ধরনের চাওয়া। জীবনের কোনো না কোনো সময় ৩৬ শতাংশ নারীর এ অভিজ্ঞতা হয়। স্বামীর হাতে নির্যাতন বলতে এখন পর্যন্ত শারীরিক নির্যাতনই প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে স্বামীর এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের কারণেও যে নির্যাতন হয়, তা-ও উঠে এসেছে বিবিএসের এ জরিপে। জরিপটি পরিচালনায় সহায়তা করে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জরিপমতে, বর্তমানে বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামীর মাধ্যমে কোনো না-কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের কারণে নির্যাতনের পরিসংখ্যান নিয়ে জরিপ প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, কেননা মোট নির্যাতনের মধ্যে বিবাহিত নারীর ১৫ শতাংশই এ ধরনের নির্যাতনের শিকার। জরিপে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা রেখে স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের একটি সংজ্ঞা খোঁজা হয়েছে। জাতিসংঘের মানদ- অনুযায়ী, স্বামী বন্ধুদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে বাধা দেন কি না; বাবার বাড়ি যেতে দেন কি না; স্ত্রী কোথায় থাকেন, কীভাবে সময় কাটান, কী করেন তা সন্দেহজনকভাবে জানতে চান কি না; ভালো বা মন্দ লাগা বিষয়ে কোনো তোয়াক্কা না করে বা গুরুত্ব না দিয়ে অগ্রাহ্য করে কি না; আত্মীয় বা অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে স্বামী রেগে যান কি না; স্বামী প্রায়ই কোনো না কোনো কারণে সন্দেহ বা অবিশ্বাস করেন কি না; স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার আগে স্বামীর অনুমতি নিতে হয় কি না এই প্রশ্নের ভিত্তিতে জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের উত্তর দিতে বলা হয়। এই বিষয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে যে প্রশ্নগুলো যোগ করা হয়েছে তা হলো: পোশাকের বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করেন কি না; পড়াশোনা বা চাকরি করতে বাধা দেন কি না; বাইরে বেড়াতে যেতে বাধা দেন কি না; মা-বাবা সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য বা তাঁদের গালাগাল ও অসম্মান করে কথা বলেন কি না; জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া গ্রহণে বাধ্য করেন কি না বা পদ্ধতি গ্রহণে বাধা দেন কি না; কন্যাসন্তান প্রসবের কারণে খারাপ কথা বা খারাপ আচরণ করেন কি না; ননদ, দেবরসহ পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের নালিশের কারণে খারাপ আচরণ করেন কি না; কোনো কারণ ছাড়াই রেগে যান কি না এবং অন্যান্য কারণ। জরিপমতে, ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ নারীই জীবনে কোনো না কোনো সময়ে স্বামীর এ ধরনের এক বা একাধিক আচরণ সহ্য করেছেন। আর জরিপ পরিচালনার আগের গত ১২ মাসের হিসাবে ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ নারীর এ অভিজ্ঞতা হয়। দেশের সাতটি বিভাগের শহর, গ্রাম, সিটি করপোরেশন ও সিটি করপোরেশনের বাইরের শহরকে জরিপের আওতায় আনা হয়েছে। শারীরিক, যৌন, অর্থনৈতিক, স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ বা মনোভাবের কারণে এবং আবেগীয় নির্যাতনকে জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে ১৫ বছরের বেশি বয়সী ২১ হাজার ৬৮৮ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অবিবাহিত নারীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭০১ জন। মাঠপর্যায়ে গত বছরের ১৩ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
বিবিএসের জরিপের প্রকল্প পরিচালক জাহিদুল হক সরদার বলেন, বাংলাদেশে বাইরে বা চিকিৎসকের কাছে যেতে স্বামীর অনুমতি নেওয়া বা অন্য বিষয়গুলোকে নির্যাতন বলেই ভাবা হয় না। জরিপে শুধু এ নির্যাতনকে যুক্ত করায় নির্যাতনের হার অনেক বেড়ে গেছে। নীতিনির্ধারকদের কাছে পরিসংখ্যান তুলে দেওয়া হয়েছে, এখন সে অনুযায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে। জরিপে কোন বয়সী বিবাহিত নারীরা স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক নির্যাতনের শিকার বেশি হন, তা-ও তুলে ধরা হয়েছে। জীবনব্যাপী অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে ৬০ বছর এবং তার বেশি বয়সী নারীদের ৫৮ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারীর এ নির্যাতনের অভিজ্ঞতা আছে। তবে গত ১২ মাসের হিসাবে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৪৪ শতাংশের এ অভিজ্ঞতা ছিল, একই সময়ে ৫৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশের এ অভিজ্ঞতা ছিল। জীবনব্যাপী এবং গত ১২ মাসের হিসাবে তালাকপ্রাপ্তা, আলাদা থাকছেন বা স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের মধ্যে এ নির্যাতনের হার বেশি ছিল।
এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার পেছনে শিক্ষা প্রভাব ফেলে। জরিপ বলছে, অশিক্ষিত নারীদের ৫৬ শতাংশের বেশি নারী এ ধরনের নির্যাতনের শিকার। গত ১২ মাসের হিসাবেও তা ৩৯ শতাংশের বেশি ছিল। ডিগ্রি এবং এর থেকে বেশি পড়াশোনা করা নারীর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশের এ অভিজ্ঞতা ছিল। অন্যদিকে দরিদ্র এবং গ্রামীণ নারীদেরও এ নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বেশি ছিল। জরিপে বলা হয়, স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর বেশির ভাগ নারী (৭২ দশমিক ৭ শতাংশ) কখনোই নির্যাতনের কথা কাউকে জানাননি। বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ নারী পুলিশের সহায়তা চান। কেন নির্যাতনের কথা জানাননি, এ প্রশ্নের উত্তরে শতকরা ৩৯ জনের বেশি নারী বলেছেন, পারিবারিক সম্মানের কথা চিন্তা করে, নির্যাতনের ভয়ে, স্ত্রীকে স্বামীর মারার অধিকার আছে ভেবে অথবা লজ্জায় তাঁরা বিষয়গুলো কাউকে জানানোর প্রয়োজনই মনে করেননি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
:harunibnshahadat@gmail.com

SHARE

Leave a Reply