জনে জনে দাওয়াত সংগঠন সম্প্রসারণ : মজবুতি অর্জন -সুলতান মাহমুদ

দাওয়াত : আরবি দাওয়াত শব্দটি দাওয়াতুন, আভিধানিক অর্থ আহ্বান, ডাকা, প্রার্থনা, ব্যাপক অর্থে কাউকে কোন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দিকে অনুপ্রাণিত করা, উৎসাহিত করা। ইংরেজিতে বলা হয় Missionary activity, Missionary work, Propaganda.
মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন উত্তম অবয়বে। তাঁদেরকে আত্মশুদ্ধি তথা পবিত্রতম জীবনযাপনের জন্য দিয়েছেন যুগে যুগে দিকনির্দেশনা। আর এ দিকে দিশেহারা জাতিকে পথের সঠিক নির্দেশনার জন্য পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী ও রাসূল। তাঁদের প্রত্যেকের এক ও অভিন্ন কাজ ছিল সৃষ্টিকে আহ্বান করে স্রষ্টার মহত্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী সুশীলসমাজ নির্মাণ করা। কিন্তু প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর তিরোধানের পর উম্মতে ওসাত হিসেবে কাজটি এসেছে উম্মতে মুহাম্মাদির ওপর। এ জন্যই বলা হয়, দাওয়াতি কাজ মুমিনজীবনের মিশন। ছাত্রশিবিরের কর্মপদ্ধতির আলোকে দাওয়াতের চমৎকার ব্যাখ্যা করা যায়-
প্রথম দফা : তরুণ ছাত্রসমাজের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছিয়ে তাদের মাঝে ইসলামী জ্ঞানার্জন এবং বাস্তবজীবনে ইসলামের পূর্ণ অনুশীলনের দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত করা।
এ দফার তিনটি দিক রয়েছে
প্রথমত, তরুণ ছাত্রসমাজের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছিয়ে দেয়া অর্থাৎ ইসলামের ব্যাপক প্রচার।
দ্বিতীয়ত, ছাত্রদের মাঝে ইসলামী জ্ঞানার্জনের দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত করা।
তৃতীয়ত, ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার জন্য দায়িত্বানুভূতি জাগ্রত করা। এ তিনটি দিকের কাজ হলেই বুঝতে হবে প্রথম দফার কাজ সঠিককভাবে হচ্ছে।
সংক্ষেপে এ দফাকে দাওয়াত বলে।
জনে জনে দাওয়াত
১.    ব্যক্তিগত দাওয়াতি কাজ
২.    ক্রমধারা অবলম্বন (কর্মপদ্ধতি)
৩.    আমাদের দাওয়াত তিনটি (দাওয়াত ও কর্মনীতি বইয়ের আলোকে )
৪.    সকলকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করার আহ্বান
৫.    বাস্তবজীবন থেকে মোনাফিকি ও কর্মবৈষম্য দূর করা এবং ইসলামের পূর্ণ আদর্শে আদর্শবান হতে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান।
৬.    সমাজের সকল জায়গা থেকে খোদাদ্রোহী নেতৃত্বের অপসারণ করে আল্লাহর নেক বান্দান্দের হাতে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সোপর্দ করার আহ্বান।

ব্যক্তিগত দাওয়াতি কাজ : দাওয়াতি কাজের সর্বোত্তম পন্থা হলো ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্রাবাস, গ্রাম ও মহল্লা থেকে বেছে নিয়ে এ পন্থায় কাজ করতে হবে। এরই নাম টার্গেট নির্ধারণ। টার্গেটকৃত ছাত্রের গুণাবলি পাঁচটি :
*    মেধাবী ছাত্র
*    বুদ্ধিমান ও কর্মঠ
*    চরিত্রবান
*    নেতৃত্বের গুণাবলি
*    সমাজে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাবশালী
১২:১০:৫ হারে দাওয়াতি কাজ (অর্থাৎ বছরে একজন সদস্য ১২ জন, সাথী ১০ জন, কর্মী ৫ জন সর্মথক বৃদ্ধি করবেন।)
১:১০০ (১ জন ১০০ জনের কাছে দাওয়াত পৌঁছাবে এ ক্ষেত্রে সকল শ্রেণীর লোকের কাছে। এক বছরে ১২ মাস, ১০০ কে ১২ দ্বারা ভাগ করলে ৮.৩৩ আসে এ ক্ষেত্রে আমরা ৯ কে হিসেবে নিয়ে আসি তার মানে মাসে ৯ জনের মাঝে দাওয়াতি কাজ করতে হবে।
৯ শ্রেণির লোক থেকে ১ জন করে তথা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, কবি, বাড়িওয়ালা, কমিটির লোক, শ্রমিক ইত্যাদি সব শ্রেণির লোকের কাছে প্রতি মাসে দাওয়াতি কাজ করা। এভাবে কাজ করলে ক্যাম্পাসের বেইজ এরিয়া এবং আবাসিকে গণভিত্তি রচনা করা সম্ভব।
সোমবার দাওয়াতি বার : (সকল জনশক্তিকে দাওয়াতি কাজে অংশগ্রহণ করানো)
১.    যত মাঠ তত টিম হিসেবে দাওয়াতি কাজ করা।
২.    মসজিদভিত্তিক দাওয়াতি কাজ করা।
৩.    মুহররমাদের মাঝে দাওয়াতি কাজ করা।
একজন মুহররমার মাঝে দাওয়াতি কাজ করলে ১৪ টার বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। যেমন খালার মাঝে দাওয়াতি কাজ করলে
১.    খালা সমর্থক হয়ে কর্মী হলো
২.    সংগঠনের সুধী হলো
৩.    ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের জন্য একজন ভোটার বাড়লো।
এভাবে খালা দাওয়াত দেবেন খালুকে, ভাইকে, বোনকে, ভগ্নিপতিকে তাহলে সবাই দাওয়াতি কাজের আওতায় চলে এলো।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত জানলেও তা অপরের কাছে পৌঁছে দাও। (বুখারী শরীফ)
নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য : “হে নবী! আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীস্বরূপ, সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদর্শনকারী হিসেবে এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর প্রতি আহ্বানকারী ও উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে।” (সূরা আহজাব :৪৫-৪৬)
মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য : “তোমাদেরকে উত্তম জাতি হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমাদের কাজ হলো তোমরা মানুষকে সৎ পথে আহ্বান করবে এবং অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। (সূরা আলে ইমরান : ১১০)
দাওয়াতি কাজ না করলে জালিম হতে হবে : “যার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সাক্ষ্য বর্তমান রয়েছে, সে যদি তা গোপন রাখে, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে? (সূরা বাকারা : ১৪০)
ক্রমধারা অবলম্বন
১.    প্রথম সাক্ষাতেই মূল দাওয়াত পেশ না করা।
২.    বন্ধুত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করা। একে অন্যের কল্যাণকামী হওয়া।
প্রথমত, টার্গেটকৃত ছাত্রের মন মগজে প্রতিষ্ঠিত ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে যাবতীয় ভুল ধারণার অসারতা বুদ্ধিমত্তার সাথে তুলে ধরতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আখেরাত তথা পরকাল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে এবং যাবতীয় সমস্যার সমাধানে ইসলামের সুমহান আদর্শের কার্যকারিতা তুলে ধরতে হবে। ইসলাম সংক্রান্ত তার যাবতীয় ভুল ধারণা দূর করে এর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে হবে। ইসলামের অনুশাসনগুলোর (ইবাদত) প্রতি পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে সজাগ করতে হবে।
তৃতীয়ত, তাকে ইসলামী আন্দোলনের ও সাংগঠনিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর জীবন, সাহাবায়ে কেরামদের জীবনের ঘটনাবলি, যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের সৃষ্টিকারী মহৎ ব্যক্তিদের জীবনীর মাধ্যমে তাকে আন্দোলন ও সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে হবে।
দাওয়াতের বিষয়ে শ্লোগান হচ্ছে “দাওয়াত হবে সবসময়, সবখানে।”
সংগঠন সম্প্রসারণ-মজবুতি অর্জন
উপশাখা সক্রিয় থাকলে সংগঠন সম্প্রসারণ, মজবুতি অর্জন করা সম্ভব হয়। উপশাখার কর্মীরা সক্রিয় হলে সংগঠনের কাজের গতি বাড়ে। যেমন- উপশাখার কর্মী ৮ জন। উপশাখার কর্মী বৈঠক দিয়ে শুরু করি। কর্মী বৈঠকের সর্বোচ্চ সময় ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট। কর্মী বৈঠকের কর্মসূচি নিম্নরূপ :
*    অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াত ১০ মিনিট
*    ব্যক্তিগত রিপোর্ট পেশ, মন্তব্য ও পরামর্শ ২৫ মিনিট
*    পরিকল্পনা গ্রহণ ২০ মিনিট
*    কর্মবন্টন ১০ মিনিট
*      সভাপতির বক্তব্য ও মুনাজাত ৫ মিনিট
উপশাখার বৈঠকগুলো সাধারণত শুক্রবারে হয়ে থাকে। আমি এক সপ্তাহের কাজের চিত্র তুলে ধরছি-
১.    কর্মী বৃদ্ধি- ৪ জন যেমন- আজহার, ইদরাক, ইদরিস, ইমরান
২.    সর্মথক বৃদ্ধি- ২০ জন
৩.    শুভাকাক্সক্ষী বৃদ্ধি- ২ জন
৪.    কুরআন তালিম প্রথম শুক্রবার
সামষ্টিক পাঠ দ্বিতীয় শুক্রবার
সাধারণ সভা তৃতীয় শুক্রবার
কর্মী বৈঠক চতুর্থ শুক্রবার
৫.    প্রত্যেক কর্মীকে মাসে একটি সূরা/ ৪ সপ্তাহে ৪টি সূরা অর্থসহ মুখস্থ করতে দেয়া।
৬.    এবার ৮ জন কর্মীকে ৪টি কর্মীকে গ্রুপ তৈরি করি। কর্মীদের নাম : Ashik, Bablu, Rubel, Arif, Yunus, Yusuf, Rayhan, Redowan.
৪টি গ্রুপ : ১. Ashik + Redowan, ২. Bablu + Rayhan, ৩. Rubel + Yusuf, ৪. Arif + Yunus.

একেক গ্রুপ একেক সপ্তাহে দাওয়াতি কাজ করবে। কর্মী বৃদ্ধি করার জন্য প্রত্যেক কর্মী একজন সমর্থক তত্ত্বাবধান করবেন।
জনশক্তিদের কাজে লাগানোর উপায়
শনিবার সমর্থকদের রিপোর্ট নেয়া যায়। কর্মীরা তার বাসা থেকে সমর্থকদের বাসায় যেতে আসতে যে সময় সে সময়টি অর্থাৎ ৩০ মিনিট-১ ঘন্টা সাংগঠনিক কাজ হবে। তাহলে ৮ জন কর্মী ৮ জন সমর্থককে রিপোর্ট দিলে ৮ জন সমর্থক তত্ত্বাবধান হচ্ছে।
রোববার কর্মীরা কিশোরকণ্ঠ বিতরণ/ বিক্রি, সুধীদের কাছ থেকে বায়তুলমাল কালেকশন করবে। এদিনও কর্মীরা সুধীদের কাছে, কিশোরকণ্ঠ বিক্রি করতে যে সময় লাগবে সেটি সাংগঠনিক কাজ তা হতে পারে ৩০ মিনিট-১ ঘন্টা। নতুন সুধী বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালাবে।
সোমবার দাওয়াতি বার। এ দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত যেকোনো সময় জনশক্তিরা দাওয়াতি কাজ করবে। সাধারণত বিকালে আমরা দাওয়াতি কাজ করে থাকি। তাই জনশক্তিকে যে ৪টি গ্রুপ করেছি তারা উপশাখায় বিভিন্ন এলাকায় এক একটি গ্রুপ দাওয়াতি কাজ করবে। দাওয়াতি কাজে নতুন ছাত্রদের কেউ দাওয়াত গ্রহণ করবে কেউ গ্রহণ করবে না। এভাবে এক গ্রুপে যদি ২ জন করে হয় তাহলে ৪টি গ্রুপে ৮ জন সমর্থক হচ্ছে ১ সপ্তাহে, মাসে হচ্ছে ৪ সপ্তাহ ´ ৮ = ৩২ জন সমর্থক ১ উপশাখায়। দাওয়াতি কাজ করতে গিয়ে সাংগঠনিক কাজ তথা দাওয়াতি কাজ হচ্ছে ৩০-১ ঘন্টা।
মঙ্গলবার জনশক্তিরা সমর্থকের রিপোর্ট দেখতে যাবে। যাওয়ার সময় তার কাছে রিপোর্ট/ স্টিকার/ বই/ পরিচিতি রাখবে। দেখা গেল যে সমর্থক রিপোর্ট হারিয়ে ফেলেছে তাহলে নতুন রিপোর্ট রাখাবে। এ সময় তাকে পরিচিতি দিয়ে পাঁচ দফার সংক্ষিপ্ত রূপটি মুখস্থ করিয়ে দিয়ে আসতে পারে। অথবা অন্য কোন কাজ যেমন বই পড়াতে পারে। আজকেও ৩০-১ ঘন্টা সাংগঠনিক কাজ হয়ে যাচ্ছে।
বুধবার জনশক্তিরা কাজ করলে ভালো না হলে ছুটি দেয়া যেতে পারে।
বৃহস্পতিবারে শুক্রবারের প্রোগ্রামের দাওয়াতি কাজ করবে ১টি গ্রুপ। প্রত্যেকে অর্থসহ সূরা মুখস্থ করার জন্য বলবে। প্রোগ্রামের দাওয়াত দিতে গিয়ে তাদের সাংগঠনিক কাজ ৩০-১ ঘন্টা হয়ে যাবে।
শুক্রবারে প্রোগ্রাম। শনিবারে আবার সমর্থকের রিপোর্ট দেখা। এভাবে সপ্তাহব্যাপী জনশক্তিদের সাংগঠনিক কাজ করানোটা সহজ হয়। প্রত্যেক জনশক্তি সক্রিয় থাকবে এবং সংগঠন সম্প্রসারণ, মজবুত হবে।
লেখক : সভাপতি, ঢাকা মহানগরী পশ্চিম, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply