জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হোক

নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যে বিজয় অর্জিত হয়, তার চার দশক পার হয়েছে আগেই। স্বাধীন বাংলাদেশের আজ বিয়াল্লিশতম বিজয়বার্ষিকী। বিজয়ের পর থেকে বাংলাদেশের মাটিতে আমাদের লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে। নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ এতগুলো বছর পার করে এসেছে। সময়ের এই হিসাব একটি জাতির জন্য কম নয়। আমাদের গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি স্বাধীন দেশই দেয়নি, দিয়েছিল অনন্য জাতীয় ঐক্যও। এই ঐক্য ছিল ধর্ম-বর্ণ, উঁচু-নিচু, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে সুসংহত একটি জাতি গঠনের প্রত্যয়ে। আমাদের অঙ্গীকার ছিল- আমরা শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে মুক্ত গণতান্ত্রিক এক সমাজ কায়েম করব। আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হবে আমাদের।
অত্যন্ত বেদনার বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সব ভেদাভেদ ভুলে জাতি গঠনের যে অঙ্গীকার আমরা করেছিলাম, সেই জাতীয় ঐক্য থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। রাজনৈতিক স্বার্থের হানাহানি; ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থ, অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়নে জাতি আজ বহুধা বিভক্ত। বিশ্বের দরবারে এত দিনে আমাদের পরিচিতি হতে পারত একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। এখনো আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য সব দিক থেকে পশ্চাৎপদ দেশের তালিকায়।
স্বাধীনতার লক্ষ্য প্রকৃতপক্ষে আমরা বিস্মৃত হচ্ছি। উন্নয়ন-অগ্রগতির সম্মুখ রাস্তার দিকে যদি না তাকাই, আমাদের স্বাধীনতা অর্থহীন থেকে যাবে। জাতি হিসেবে আজকের এই দিনে আমাদের নতুন করে শপথ নেয়া প্রয়োজন। স্বাধীনতার জন্য অকাতরে বুকের তাজা রক্ত হাসিমুখে ঢেলে দিতে পেরেছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ আমাদের পূর্বপ্রজন্মের মুক্তিকামী মানুষ। আজ কেন আমরা পারব না উন্নয়ন-অগ্রগতির ভবিষ্যৎ গড়তে? অথচ দেখা যাচ্ছে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার সময়ের সাথে বিরোধী দল নিয়ন্ত্রণে ক্রমেই অধিক থেকে অধিকতর বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিরোধী দল দমনে পুলিশ বাহিনীর সাথে মাঝে মধ্যেই সরকারি দলের সশস্ত্র ক্যাডারদেরও নামাতে দেখা যাচ্ছে এ সরকারের বিভিন্ন সময়ে। পুলিশের সামনে, কখনো কখনো পুলিশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সরকারি দলের লোকজন বিরোধী দলের ওপর সন্ত্রাসী হামলা করছে। হামলাকারীদের নাম ও দলীয় পদপদবি উল্লেখ করে তাদের ছবিসহ খবর ছাপা হয়েছে সরকারি দলের সমর্থক পত্রপত্রিকায়ও। কিন্তু সরকার তাদের থামানোর ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অতি সম্প্রতি জামায়াত-শিবির দমনে মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সরকার যে অগণতান্ত্রিক অবস্থান নিয়েছে, তা দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকেই আরো বড় মাপে উসকে দিচ্ছে। সরকারের বর্তমান অবস্থান হচ্ছেÑ সরকার জামায়াত-শিবিরকে আর কোনো শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিই পালন করতে দেবে না। তাদের রাজপথে মিছিল-সমাবেশ করতে দেবে না। এমনকি জাতীয় প্রেস ক্লাবেও তাদের বৈঠক করতে দেয়া হচ্ছে না। পুলিশ জামায়াত ও শিবিরের নির্ধারিত মিছিলে হামলা চালাচ্ছে। সারা দেশে চলছে জামায়াত-শিবির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নির্বিচার গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন। অতি সম্প্রতি যখনই জামায়াত ও শিবির রাজপথে মিছিল করতে নামছে, তখনই পুলিশের বাধার ফলে তাদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ বাধছে। এতে পুলিশের সাথে যোগ দিচ্ছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি দলের অনেক নেতানেত্রী তাদের কর্মীদের প্রকাশ্যে বলেছেন, যেখানেই জামায়াত-শিবিরের কাউকে পাবে, তারা যেন তাদের গণধোলাই দেয় আর তাদের গ্রেফতার করে পুলিশে দেয়। যুবলীগের সভাপতি একই সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, এ কাজ যুবলীগের নয়। তার এ বক্তব্য থেকে ধরে নেয়া হয়েছিল, অন্তত যুবলীগের কেউ এভাবে জামায়াত-শিবির নিধনের কাজে নামবে না। কিন্তু তা ঘটেনি। বরং দেখা যাচ্ছে, ছাত্রলীগের সাথে যুবলীগও মাঠে নামছে। সরকারের এই যে অগণতান্ত্রিক আচরণ দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মাত্রাকে যে আরো শত গুণে বাড়িয়ে দেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পুলিশবাহিনীকে এখন ব্যস্ত রাখা হয়েছে জামায়াত-শিবিরসহ অন্যান্য বিরোধী দল দমনে। এই সুযোগে দেশের দুর্বৃত্তরা বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। পুলিশবাহিনীর ১০ হাজার সদস্য এখন ব্যস্ত জামায়াত-শিবিরের কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে কিংবা বানচালে।
আমরা মনে করি, অগণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধী দল দমনের পথ বেয়ে দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বাড়ে বৈ কমে না। ভুললে চলবে না, জামায়াত গণতান্ত্রিক ও সরকারি বিধিসম্মত উপায়ে একটি বৈধ ও নিবন্ধিত দল। ছাত্রশিবির দেশের সাধারণ ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি ছাত্রসংগঠন। চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে তারা ইতোমধ্যেই একটি ‘ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। এদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার অধিকার আছে। বিনা উসকানিতে এ ধরনের কর্মসূচির ওপর সরকারের পুলিশবাহিনীর ও সেই সাথে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলা কোনো মতেই সমর্থনযোগ্য নয়। তাই অবিলম্বে সরকারকে এসব দলন-নির্যাতন থেকে বিরত হতে হবে এবং অবৈধ বিতর্কিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে অন্যায়ভাবে আটককৃত শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দিতে হবে। নইলে দেশে যে অরাজকতার সৃষ্টি হবে তাতে এই সরকার পেছন দরজা দিয়ে পলানোরও পথ খুঁজে পাবে না।

SHARE

Leave a Reply