জানা-অজানা

শৈত্যপ্রবাহে মানুষের মৃত্যু রহস্য!
শীতকালে তাপমাত্রা খুব দ্রুত কমতে থাকলে তাকে শৈত্যপ্রবাহ বলে। সাধারণভাবে খুব বেশি শীত পড়লে তাকে শৈত্যপ্রবাহ বলে ধরে নেওয়া হয়। যেমন, আমাদের দেশে ঢাকায় সাধারণত খুব শীত মানে ১০-১২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। কিন্তু যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাপমাত্রা হঠাৎ কমে আট-নয় ডিগ্রি হয়ে যায় এবং এ রকম কয়েক দিন ধরে চলে, তাহলে তাকে আমরা বলব শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের সময় তাপমাত্রা চার-পাঁচ ডিগ্রিতেও নেমে যায়। এ সময় অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। গরু, ছাগল প্রভৃতি প্রাণীও শৈত্যপ্রবাহে মারা যেতে পারে। কারণ, এরাও মানুষের মতো উষ্ণ রক্তের প্রাণী, মানে তাদের শরীরেরও একটি নির্দিষ্ট গড় তাপমাত্রা ধরে রাখতে হয়। খুব বেশি শীতে তারাও সমস্যায় পড়ে।
শৈত্যপ্রবাহের সময় শরীর থেকে দ্রুত তাপ বেরিয়ে যায় বলে কারও কারও মৃত্যু হতে পারে। কারণ, মানুষের শরীরের গড় তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। বেঁচে থাকার জন্য এই তাপমাত্রা ধরে রাখতে হয়। কিন্তু তীব্র শীতের সময় শরীর থেকে তাপ বেরিয়ে যেতে থাকে। তখন শরীর তার সঞ্চিত চর্বি পুড়িয়ে তাপ তৈরি করে তাপমাত্রা ঠিক রাখার চেষ্টা করে। এভাবে শরীর খুব দ্রুত ক্যালরি হারায়। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার দু’টি উপায়। একদিকে গায়ে গরম কাপড় পরে, লেপ-কম্বল জড়িয়ে এবং ঘরের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে বাইরের শীত ঠেকানোর চেষ্টা করা। আমাদের দেশে, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের অনেক গরিব মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে এ সময় প্রচুর খাওয়া দরকার। কারণ, অতিরিক্ত ক্যালরিসম্পন্ন খাবার না খেলে শরীর থেকে যে ক্যালরি দ্রুত বেরিয়ে যায়, তা পূরণ করা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে। শরীর দ্রুত ক্যালরি হারালে হাইপোথারমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ বিপন্ন হতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে নেমে গেলে তাকে হাইপোথারমিয়া বলে। এ অবস্থায় ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, কিডনিসহ দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শরীরের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলে অবস্থা বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। বেশি শীতে চামড়ায় ঘা ও হাত-পা অবশ হয়ে যেতে পারে। এসব মিলে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।

পানির বদলে চা!
বিমানে ভ্রমণের সময় কিছুক্ষণ পর পর চা-কফি বা অন্যান্য পানীয় দেওয়া হয়। কিন্তু শুধু এগুলো শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করে না। ক্যাফেইন অথবা অ্যালকোহল বরং শরীরের পানি বেশি হারে বের করে দেয়। তাই এ ধরনের পানীয় বেশি পান করলে বিশুদ্ধ পানি বেশি খেতে হয়। তা না হলে পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিমানে ভ্রমণের সময় বিশুদ্ধ পানি বেশি পান করা দরকার। বেশি উচ্চতায় শরীর থেকে দ্রুত পানি বেরিয়ে যায়, চা-কফি দিয়ে সেটা পূরণ হয় না। শুধু তৃষ্ণা পেলে পানি পান করার অভ্যাস অনেক সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে, কারণ শরীর থেকে লিটারখানেক পানি বেরিয়ে গেলেও হয়তো তৃষ্ণা পাবে না। তাই কিছু সময় পর পর পানি পান করাই ভালো। পুষ্টিবিদদের মতে, একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের জন্য দিনে অন্তত ছয় থেকে আট গ্লাস (কমবেশি দুই লিটার) পানি পান করা উচিত। যাঁরা বেশি পরিশ্রম করেন, তাঁরা বেশি পানি পান করলে ক্ষতি নেই। পরিশ্রম বা ব্যায়ামের আগে ও পরে ওজন নেওয়া যেতে পারে। প্রতি কেজি ওজন হ্রাসের জন্য প্রায় এক লিটার পানি পান করা উচিত। যদি কোনো কারণে শরীর থেকে দুই লিটারের মতো পানি বেরিয়ে যায় তাহলে গায়ের চামড়া কুঁচকে যাওয়া, পেশি-দুর্বলতা, ক্লান্তি, জ্বালাপোড়া, ঝিমানি ও মাথাব্যথার মতো মারাত্মক সমস্যা দেখা দেবে। পর্যাপ্ত পানি ওজন কমাতে সাহায্য করে। ডায়েটিংয়ের সময় বাড়তি মেদ পুড়ে শরীরে যে আবর্জনা সৃষ্টি হয়, পানি তা কিডনির সাহায্যে শরীর থেকে বের করে দেয়। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্যও বেশি পানি দরকার। দেহের ওজন কমানোর জন্য খাওয়ার আগে ও মধ্যে এক গ্লাস করে পানি খেলে উপকার পাওয়া যায়।

দুশ্চিন্তায় কি মানুষের ওজন কমে?
আমরা অনেকসময় বলি, চিন্তায় চিন্তায় মানুষটা শুকিয়ে গেল। দুশ্চিন্তায় মানুষের যে ওজন কমে সেটা আমাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। কিন্তু আসলে এটা মস্তিষ্কের কাজের কারণে না। চিন্তার কাজটা এককভাবে মানুষের মস্তিষ্কই করে। এবং যেকোনো কাজে শক্তি ব্যয় হয়। মস্তিষ্কের কাজেও এর ব্যতিক্রম নেই। সুতরাং প্রশ্ন ওঠে, চিন্তায় যে শক্তিক্ষয় হয়, তাতে তো ওজন কমারই কথা। সেটা না হওয়ার কারণ হলো চিন্তায় এতো কম শক্তি ব্যয় হয় যে তা অনায়াসে উপেক্ষা করা যায়। আমরা যদি শরীরের চর্বি পুড়িয়ে শক্তি তৈরির কথা ভাবি তাহলে বলতে হয় মস্তিষ্কের কাজের কারণে সেরকম কিছু হয় না। কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তার সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পিইটি (পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি) স্ক্যান ও এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং)-এর সাহায্যে প্রাপ্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে চিন্তার বিভিন্ন পর্যায়ে শক্তি ব্যয়ের বিশদ মানচিত্র আঁকা হয়েছে। দেখা গেছে মস্তিষ্কে সংকেত আদান-প্রদান প্রক্রিয়ায় শক্তি ব্যবহারটা হয় দেহকোষ ও পরমাণু স্তরে। কিন্তু এতে খুব সামান্য তাপ তৈরি হয়। সুতরাং চিন্তার কারণে মানুষের ওজন হ্রাসের কোনো কারণ নেই। তবে খুব সম্ভবত দুশ্চিন্তায় মানুষের মন ভারাক্রান্ত হয়ে খাওয়ার রুচি কমে যায়। আর কম খেলে তো ওজন কমবেই। আবার কেউ কম খেয়ে পরিকল্পিতভাবে ওজন কমানোর কর্মসূচি গ্রহণ করলে মনকে সেদিকে অনুপ্রাণিত করার জন্য চিন্তাভাবনাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেদিক থেকে আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখি চিন্তা বা দুশ্চিন্তায় মানুষ কিছু ওজন হারায়।

কুকুরের লেজ নাড়ার কারণ
আমরা সাধারণত বলি কুকুরের লেজ নাড়া প্রভুভক্তির লক্ষণ। কথাটা ঠিক। কিন্তু কুকুর তো সব সময় গৃহপালিত ছিল না। থাকত বনে-জঙ্গলে। তখনো তো লেজ নাড়ত। তাহলে সেই লেজ নাড়ার অর্থ কী? বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে গবেষণা করে দেখেছেন যে কুকুরের লেজ নাড়া ও চোখের দৃষ্টির নানা ভঙ্গি আসলে কুকুরের দলের মধ্যে ভাববিনিময়ের জন্য জন্মগত এক জটিল পদ্ধতি। একদল কুকুর যখন কোনো আগন্তুকের মুখোমুখি হয়, তখন লেজের অবস্থান থেকে তারা বুঝে নেয় কে তাদের মধ্যে দলপতি। যেমন- হুমকির মুখে লেজ যদি খাড়া ওপরে তোলা থাকে, এর মানে সে ওই দলের নেতা। আর যার লেজ নিচের দিকে থাকে, ধরে নিতে হবে সে অন্যদের বশ্যতা মেনে নেওয়ার সংকেত দিচ্ছে। আমরা যে বলি ‘লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে’, সেটা হয়তো এখান থেকেই এসেছে। সাধারণভাবে লেজ নাড়ার মধ্য দিয়ে আবেগের প্রকাশ ঘটে। অনেক সময় একে উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ রূপেও দেখা চলে। কুকুর প্রজাতির নেকড়ে বাঘের মধ্যে এ ধরনের সংকেত বিশেষ অর্থবহ হয়ে ওঠে। দুই নেকড়ের মধ্যে ঝগড়া লাগলে তারা একে অপরের নাড়ির গতি, রক্তচাপ প্রভৃতি বোঝার চেষ্টা করে। এগুলো পরোক্ষভাবে পরিমাপের জন্য তারা একে অপরের চোখের গতিবিধির ওপর লক্ষ রাখে। চোখের মণি যদি বিস্ফোরিত হয়, তার মানে সে ভীত। অন্যদিকে, যদি চোখের মণি ছোট হয়ে আসে আর সেই সঙ্গে থাকে নানা অঙ্গভঙ্গি, তাহলে বুঝতে হবে সে বেশ ক্ষিপ্ত, এবং সেটা চিন্তার বিষয়। অবশ্য বাসায় পোষ মানা কুকুরের ক্ষেত্রে এতো সব বোঝা যায় না। কারণ মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে তাদের আদি ভাবভঙ্গি অনেকাংশে বদলে গেছে।

গবেষণাগারে কৃত্রিম ত্বক তৈরি
মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে ত্বক বা চামড়া। কয়েকটি স্তরে বিভক্ত মানবদেহের ত্বকের আকার দুই বর্গমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যার ওজন গোটা দেহের শতকরা প্রায় ১৬ ভাগ। মানবদেহের এক বর্গইঞ্চি ত্বকে রয়েছে সাড়ে ছয়শ’ ঘামের গ্রন্থি, ২০টি উপশিরা, ৬০ হাজার মেলানোসাইটস এবং এক হাজারেরও বেশি স্নায়ুতন্তু। সম্প্রতি জার্মানির প্রখ্যাত ফ্রাউনহফার ইন্সটিটিউটের টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে দুই স্তর বিশিষ্ট কৃত্রিম ত্বক তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন। তারা আশা করছেন, ভবিষ্যতে তারা পুরোপুরি মানব ত্বক হুবহু তৈরি করতে পারবেন। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা ক্যান্সার নিয়ে গবেষণারও নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ পাবেন।
গ্রন্থনা : জে হুসাইন

SHARE

Leave a Reply