জান্নাতের দু’টি পাখি -মো: শাহাবুল আলম

শহীদেরা মরে না, তারা অমর। তাদেরকে অন্য মৃতদের মধ্যে শামিল করা যায় না। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে একাধিকবার বলেছেন। সূরা বাকারায় ১৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- আল্লাহর পথে যারা নিহত হয় তাদের মৃত বল না বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাদের পথচলা নিঃসন্দেহে বর্ণনাতীত কঠিন। এ কাঠিন্যের মাপকাঠি দিয়ে মহান প্রভু তার অতি প্রিয় বান্দাহদেরকে বাছাই করে নেন। কিছু বান্দার জীবনের বিনিময়ে পরীক্ষা করতে চান কারা ঈমানের দাবিতে সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী। সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা, জান ও মাল এবং ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। (হে পয়গম্বর!) আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।
শহীদ ভাইদের স্মৃতি, খোদাভীতি আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। চলার পথে যাবতীয় ভয়-ভীতি দূর করে হৃদয়কে সুদৃঢ় করে দেয়। ইসলামী আন্দোলনের পথ ফুলশয্যা নয়। কণ্টকময় বাধা পেরিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সামনের দিকে চলতে হয়। প্রয়োজনে নিজের জীবনকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেয়ার মাধ্যমে ত্যাগ-কোরবানির নজির স্থাপন করতে হয়। অতীতে নবী-রাসূল এবং বিভিন্ন সময়ে মর্দে মুজাহিদদের জীবনে এরূপ ঘটনা ঘটেছে। ‘সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন’ পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটা থাকবে। তাই বলে যারা আল্লাহপ্রেমিক তারা ইসলামী আন্দোলন থেকে কখনো পশ্চাদগামী হয় না। তারা শয়তানি শক্তি নির্মূলের জন্য সদা প্রস্তুত থাকে। এমনকি জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে সত্যের সাক্ষ্য হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করেন।
শহীদ হাবিবুল্লাহ এবং শহীদ কামরুল হাসান যশোরে ইসলামী আন্দোলনের দু’টি প্রেরণার নাম। দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (এমএম) কলেজের অর্থনীতির তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র। তারা যেমন মেধাবী ছাত্র ছিলেন তেমন চরিত্রবান ও সংগঠক ছিলেন। তারা দু’জনই অর্থনীতির ছাত্র এবং কলা অনুষদের দায়িত্বশীল ছিলেন।
২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর রাত ১২টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ভাইকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধীর মামলায় অন্যায়ভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। সারাদেশের মতো আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ যশোরে আনন্দ মিছিল করে। ২২ নভেম্বর সরকারি এম এম কলেজে ছাত্রলীগ মিছিল করে এবং জামায়াত-শিবির বিরোধী স্লোগান দেয়। মিছিলের আগে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী মেসগুলাতে তারা সাধারণ ছাত্রদেরকে জোর করে অংশগ্রহণ করায়। যারা মিছিলে আসেনি তাদেরকে পরে টর্চার করে।
শহীদ কামরুল ইসলাম ভাই পারিবারিক চাপে সংগঠনের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী ‘নির্ঝর’ নামক একটি সাধারণ মেসে থাকতেন। নিয়মিত নামাজ পড়ার কারণে ছাত্রলীগ তাকে আগে থেকে শিবির সন্দেহ করত। কামরুল ভাই ছাত্রলীগের মিছিলে না গিয়ে বাড়িতে চলে যান। ২৩ নভেম্বর তার সম্মান ৩য় বর্ষের পরীক্ষা দেয়ার জন্য বাড়ি থেকে ক্যাম্পাসে আসেন। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ছাত্রলীগ তাকে জোরপূর্বক অপহরণ করে এম এম কলেজের শহীদ আসাদ হলের ২০১ নম্বর রুমে নিয়ে রড, হকিস্টিক, স্ট্যাম্প এবং রামদা দিয়ে পিটিয়ে অত্যন্ত পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করে। জোর করে দায়িত্বশীলের নাম এবং অবস্থান জেনে নেয়। এরপর ছাত্রলীগ এম এম কলেজ সভাপতি এবং বর্তমান যশোর জেলা সভাপতি রওশন ইকবাল শাহীর নির্দেশে জিসান, রনি, জুয়েল, নূর ইসলামসহ ৭-৮ ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী ‘আশিক ভিলায়’ মেসে হামলা চালায়। হাবিবুল্লাহ ভাই তাদের পরিচিত ছিল না যার কারণে মেসে গিয়ে হাবিবুল্লার নাম জিজ্ঞাসা করলে মেসের দায়িত্বশীল রাজু ভাই বলেন, হাবিবুল্লাহ মেসে নেই। এ কথা বলার সাথে সাথে তারা রাজু ভাইয়ের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হাবিবুল্লাহ ভাই তখন দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। রাজু ভাইয়ের ওপর নির্যাতন দেখে তিনি খাবার শেষ না করে বাইরে এসে বললেন, ওকে ছেড়ে দিন আমি হাবিবুল্লাহ। তখন নরপশুরা হাবিবুল্লাহ ভাইকে ধরে নিয়ে আসাদ হলের কসাইখানা খ্যাত ২০১ নম্বর রুমে আটকে রেখে হকিস্টিক, রড, স্ট্যাম্প, রামদা দিয়ে পিটিয়ে পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের কারণে তার সমস্ত অঙ্গ রক্ত জমাট হয়ে কালো হয়ে গিয়েছিল এবং দুই পা ভেঙে গিয়েছিল। সেদিন তাদের চিৎকারের আর্তনাদ ছাত্রলীগের নরপশুদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি। এদিকে থানায় পুলিশকে জানালে পুলিশ আমাদের ভাইদের উদ্ধার না করে ছাত্রলীগের সহায়তায় শহরের রেলগেটে অবস্থিত আমাদের আরেকটি মেসে হামলা চালায়। সেখানে শিবিরের সাথী আল মামুনকে মেরে মারাত্মকভাবে আহত করে। পরে তাকেও মুমূর্ষু অবস্থায় যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ দিকে হাবিবুল্লাহ এবং কামরুল হাসানের অবস্থা যখন আশঙ্কাজনক, নির্যাতনের প্রায় ২ ঘণ্টা পর বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ এ দুইজন ভাইকে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু পুলিশ এবং ডাক্তারদের অবহেলায় আমাদের ভাইয়েরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে তাদের অবস্থার আরো অবনতি হয়। অবশেষে বিকেল ৪টায় আমাদের প্রিয় ভাই হাবিবুল্লাহ শাহাদাত বরণ করেন। কামরুল হাসানের অবস্থা আরো অবনতি হলে দায়িত্বশীল ভাইয়েরা তাকে ঢাকায় পাঠানোর জন্য প্রশাসন এবং ডাক্তারদের কাছে অনেক অনুরোধ করেন কিন্তু তারা বিষয়টি মোটেও আমলে নেয়নি। অনেক চেষ্টার পরে তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর অনুমতি মিলল। নরপশুরা তার পেটে এমনভাবে নির্যাতন করেছিল যে তার ফুসফুস ফেটে গিয়েছিল। ফলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটে আসার আগে রাত সাড়ে ১২টায় আমাদের এ ভাইটিও সবাইকে কাঁদিয়ে মহান আল্লাহর কাছে পৌঁছে যান। আর আহত মামুনকে কোনো রকম চিকিৎসা শেষে কয়েকদিন পর মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠায়। সেদিন আমাদের ভাইদের চাপাকান্না হয়তোবা আল্লাহর আরশে পৌঁছেছে কিন্তু সরকারের পুলিশ এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের কানে পৌঁছায়নি। পুলিশ আমাদের ভাইদের হত্যাকারীদের নামে কোনো মামলা নেয়নি এমনকি একটি মিছিল পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। দুনিয়ার আদালতে এর কোনো বিচার না হলেও আখেরাতের আদালতে আল্লাহ অবশ্য এর বিচার করবেন ইনশাআল্লাহ।
যশোর শহর শাখায় আসার আগে অন্য থানা শাখায় কাজ করার কারণে শহীদদের সাথে খুব বেশি চলাফেরা হয়নি। তবে সংগঠনের শহর শাখার সেক্রেটারি থাকার কারণে থানা দায়িত্বশীল ছাড়াও শহরের সকল ক্যাম্পাসের অনুষদ সভাপতিদের নিয়মিত খোঁজখবর নিতে হতো। তা ছাড়া শহীদ হাবিবুল্লাহ ভাই সংগঠনের সর্বোচ্চ শপথের জন্য যখন ওয়ার্কশপে আসতেন তখন তার আচার, ব্যবহার, প্রখর মেধা এবং আনুগত্যের ব্যাপারে সকলে সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু কে জানে এই ভাইটি হবে যশোর সরকারি এম এম কলেজ শাখার ইসলামী ছাত্র-আন্দোলনের প্রথম শহীদ। পিতা-মাতার অতি আদরের সন্তান ছিলেন শহীদ হাবিবুল্লাহ। শহীদের সাথীরা যখন হাবিবুল্লাহ ভাইয়ের বাসায় যায় সন্তানহারা পিতা-মাতার কান্নায় বুঝতে পারে শহীদ হাবিবুল্লাহ তাদের কত আদরের ধন ছিলেন। তার পিতা আজও সন্তানহারার বেদনায় স্বাভাবিকভাবে কোন কাজ করতে পারেন না। শহীদ হাবিবুল্লাহ ভাই সদস্য হওয়ার জন্য চূড়ান্তভাবে বাছাইকৃত ছিলেন। তৎকালীন কেন্দ্রীয় ফাউন্ডেশন সম্পাদক আলামীন হাসান ভাই তাকে কন্টাকে যে কয়টি প্রশ্ন করেছিলেন তার সব কয়টির সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন যা অনেকের বেলায় এমনটি হয় না। কিন্তু কেন্দ্রে কন্টাক পিছিয়ে যাওয়ার কারণে চূড়ান্ত শপথের আগে আল্লাহর কাছে পৌঁছে যান। শহীদ হাবিবুল্লাহ ভাই সর্বশেষ সরকারি এম এম কলেজ শাখার কলা অনুষদ সভাপতি ছিলেন। তিনি সংগঠনকে সবসময় গুছিয়ে রাখতেন। তার আমানতদারিতা ছিল অনন্য। হাবিবুল্লাহ ভাই ‘আশিক ছাত্রাবাসেরও’ পরিচালক ছিলেন। শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত সংগঠন এবং মেসের সমস্ত হিসাব তার ডায়েরিতে পাওয়া যায়। আসলে আল্লাহ যাদেরকে শহীদ হিসাবে কবুল করেন তাদের জীবনটা এমনই হয়।
শহীদ কামরুল হাসান ভাই পারিবারিক চাপে বাইরের মেসে থেকেও নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ও কুরআন তেলাওয়াত করতেন। যার কারণে ছাত্রলীগের চক্ষুশূল হয়েছিলেন। কামরুল ভাই সকলের সাথে মিশে চলার চেষ্টা করতেন কিন্তু নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি হননি। মা-বাবার ছিলেন আশার প্রদীপ। তিনি সকলের সাথে ভালো ব্যবহার করতেন।
আজ শহীদ হাবিবুল্লাহ এবং কামরুল হাসান আমাদের মাঝে নেই। তাদের পিতা-মাতা হারিয়েছেন প্রিয় আদরের ধন। শহীদের সাথীরা হারিয়েছে তাদের প্রিয় দায়িত্বশীলকে। শহীদের সাথী এবং তাদের পিতা-মাতার কান্না আওয়ামী সন্ত্রাসীদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করবে না কারণ আল্লাহ তাদের অন্তরকে বোবা-বধির বানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ সূরা বাকারার ৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন,
আল্লাহ তাদের অন্তর ও কর্ণসমূহের ওপর মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তাদের চোখের ওপর আবরণ রয়েছে আর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
কিন্তু যে ক্যাম্পাসে দুইজন ভাই শহীদ হয়েছেন এবং অসংখ্য ভাই বাতিলের কাছে রক্ত ঝরিয়েছেন, যে ক্যাম্পাসে আমাদের অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং আবেগ জড়িত সে ক্যাম্পাসকে আমরা গুটি কয়েক সন্ত্রাসীর হাতে ছেড়ে দিয়ে সাধারণ ছাত্রদেরকে তাদের হাতে জিম্মি করতে চাই না। তাদের জন্য শুধু দোয়া এবং অশ্রু বিসর্জন দিলে এদেশে ইসলামী বিপ্লব কখনো কায়েম হবে না। তাই বেশি বেশি দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে শহীদের রেখে যাওয়া কাজকে আরো বেগবান করতে পারলে সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলো ইসলামী আন্দোলনের ঘাঁটিতে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ। আর তখনই শহীদের জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ-কোরবানি সার্থক হবে।
মহান রাব্বুল আলামিন শহীদ হাবিবুল্লাহ ও শহীদ কামরুল হাসানসহ যারা ইসলামী আন্দোলনের জন্য শহীদ হয়েছেন তাদেরকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং এ সকল শহীদের রক্তের বিনিময়ে এদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে কবুল করুন। (আমিন)
পরিশেষে কবি মোশাররফ হোসেন খানের কবিতা দিয়ে শেষ করছি।
বারুদ-বিশ্বাসে জ্বলে ওঠো ফের
বদর, ওহুদের মত
ঝরুক লহু, বয়ে যাক খুনের দরিয়া
তবুও থামবে না সিংহদল শত!
এ মিছিল এগুবেই সম্মুখে
খুনের তরঙ্গ পেরিয়ে
ঐতো শত শহীদ ডাকছে আমাদের
সাহসী হাত নাড়িয়ে।

SHARE

Leave a Reply