জান্নাতের বাগানে একটি প্রস্ফুটিত গোলাপ শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা

মোবারক হোসাইন

Kader-Mollaমহান রাব্বুল আলামিনের দ্বীনকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে যারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তাদের পথ চলা নিঃসন্দেহে বর্ণনাতীত কঠিন। এ কাঠিন্যের মাপকাঠি দিয়ে মহান প্রভু তার অতি প্রিয় বান্দাদেরকে বাছাই করে নেন। কিছু বান্দার জীবনকে কবুল করে নিয়ে একটি আদর্শের বুনিয়াদ দুনিয়ার মানুষের জন্য তৈরি করে নেন সত্যের সাক্ষ্য রূপে। শহীদ ভাইদের স্মৃতি আল্লাহপ্রিয়তা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। পথ চলতে চলতে যখন নানা মোহ, ভীতির আশঙ্কা আমাদের পথ আগলে দেয়। তখন হৃদয়ের মাঝে অমর হয়ে থাকা শহীদের স্মৃতি, আমাদের মনে আশার দ্বীপ শিখা জ্বালায়। As the star that are starry in the time of our darkness. অর্থাৎ শহীদরা মিল্লাতের জীবন, মিল্লাতের গৌরব, দুর্যোগের রাহবার। হতাশাগ্রস্ত মুসাফিরের জন্য তারা দিশাহারা ধ্রুব তারা। শোহাদায়ে কারবালা মুজাহিদদের হৃদয়ে তাইতো সৃষ্টি করে চলছে বিপ্লবের জজবা। সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব পৃথিবীর চিরন্তন ইতিহাস। মানুষ যখন অন্যায় অত্যাচার আর অসত্যে নিমজ্জিত, শয়তান তার অনুসারীদের সাথে নিয়ে পৃথিবীতে শয়তানী শক্তির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত; তখন আল্লাহ মানবজাতির কল্যাণে যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য নবী-রাসূল। তাদের সঙ্গী সাথী হিসেবে প্রেরণ করেছেন দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গকারী মর্দেমুজাহিদ। নবী-রাসূলদের পর তাদের উত্তরাধিকারীরা এ দায়িত্ব পালনে ব্রত হন। তারা শয়তানী শক্তি নির্মূলের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। এমনকি জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে সাক্ষী হয়ে আছেন।

শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা
শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার সংক্ষিপ্ত জীবনী : ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামের মরহুম সানাউল্লা মোল্লার ছেলে আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৪৮ সালের ২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকায় ৪৯৩ বড় মগবাজারে গ্রিন ভ্যালি অ্যাপার্টমেন্টের ৮/এ ফ্ল্যাটে থাকতেন। কাদের মোল্লা ১৯৬১ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনস্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে বিএসসি প্রথম বর্ষে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগদান করেন।
১৯৬৮ সালে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করে ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন আবদুল কাদের মোল্লা। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবের শাসনকালেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত উদয়ন হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর ১৯৭৪ সালে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরি নেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে দেশের কোথাও হত্যা মামলা দাখিল করা হয়নি।
১৯৭৮ সালে তিনি ঢাকার রাইফেল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতিবের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও আর্থিক সহায়তায় দেশে মুসলমান ছেলেমেয়েদের আন্তর্জাতিক মানের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে গুলশান ১ নম্বর মার্কেটের দক্ষিণ পাশে ‘মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে মানারাত ইউনিভার্সিটি হিসেবে পরিচিত। সেখানে তিনি প্রায় এক বছর কাজ করেন। ১৯৮০ সালে তিনি দৈনিক সংগ্রামে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ঢাকা মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য এবং এরপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োজিত হন। পরে আবদুল কাদের মোল্লা জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োজিত হন। তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ (সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচন করেন। কাদের মোল্লা ১৯৯৫ সালে কেয়ারটেকার সরকার আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সর্বদলীয় লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

যে অপরাধে শহীদ হলেন আবদুল কাদের মোল্লা
এভাবে হত্যা করা হবে তা গোটা দেশবাসী তথা বিশ্ববাসী কখনও কল্পনা করতে পারেনি। আবদুল কাদের মোল্লা আমাদের প্রেরণা। তার অপরাধ, তিনি মানুষকে কুরআন ও হাদিসের কথা বলতেন, ইসলামী সংগঠন করতেন। তিনি বাংলাদেশকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখতেন।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কাদের মোল্লার ভাই
ফাঁসির রায় কার্যকরের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তাঁর ভাই মাঈনুদ্দিন বলেন, আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি, স্বৈরাচার এই সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের আর কী বলার আছে?
কাদের মোল্লা ছেলে হাসান জামিল রাষ্ট্রের কাছে ৪টি প্রশ্ন তুলেছেন-
১.    আমার বাবা এত বড় যুদ্ধাপরাধী এটাতো ঘাদানিক জানতো। জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ যখন জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করেছে তখন আমার বাবা আবদুল কাদের মোল্লা লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ছিলেন। ৯৬ সালে তৎকালীন সরকার আমার বাবা এবং আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদকে গ্রেফতারের চেষ্টা করেছে। তখন শেখ হাসিনা আমার বাবা ও তোফায়েল আহমেদকে আত্মগোপনে থাকার নির্দেশ দিলে তারা একসঙ্গেই ছিলেন। বাবা যদি এতো বড় যুদ্ধাপরাধী হয়ে থাকেন তখন কেন আওয়ামী লীগ চুপ ছিলো। তোফায়েল সাহেব কেন তখন সংবাদ সম্মেলন করে আপত্তি জানালেন না। তখন কোথায় ছিল ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি? তারা কেন তখন সংবাদ সম্মেলন করে বলেন নাই কাদের মোল্লা যুদ্ধাপরাধী?
২.    তিনি (কাদের মোল্লা) যদি যুদ্ধাপরাধী কিংবা হত্যাকারী হন তবে ২০০৭ সালে তার বিরুদ্ধে মামলার আগ পর্যন্ত কোন মামলা বা কোনো জিডি (সাধারণ ডায়েরি) কেন নেই?
৩.    ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত কাদের মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনশিপ (আইআর) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন। তিনি যদি যুদ্ধাপরাধী হয়ে থাকেন দেশ স্বাধীন হবার পরও দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেলেন কিভাবে?
৪.    তৎকালীন রাইফেলস পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে (বর্তমান বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ) সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন, পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি উদয়ন স্কুলেও শিক্ষকতা করেছেন। (তাদের বক্তব্য অনুযায়ী) এতো বড় যুদ্ধাপরাধী হলে কিভাবে তিনি এই সুযোগ পেলেন? কেন তাকে তখন বরখাস্ত করা হলো না? আমার বাবা সাংবাদিক ইউনিয়নে পরপর দু’বার নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। এত বড় যুদ্ধাপরাধীকে কেন সাংবাদিকরা ভোট দিলেন? কেন সেই সময়কার সাংবাদিকরা সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলেন না?
উপেক্ষিত আন্তর্জাতিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ
আপিল বিভাগে ফাঁসির রায়ের পর এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং কাদের মোল্লার ফাঁসি নিশ্চিত করার জন্য দৃশ্যত সরকারের অবিরাম প্রচেষ্টায় আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা তার মৃত্যুদ- মওকুফের ও রায় বাতিলের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদ- লঙ্ঘিত হয়েছে বলে বর্ণনা করে। সংগঠনটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড এডামস এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সব সময় ১৯৭১ সালে সংঘটিত বর্বরতার বিচার চেয়ে আসছে। কিন্তু এই বিচার ন্যায়সঙ্গতভাবে ও আইনানুযায়ী হওয়া উচিত।’ কোনো কারণে মৃত্যুদ- দেয়া হলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা খুব জরুরি। আন্তর্জাতিক রীতি মেনে বাংলাদেশ সরকারের মৃত্যুদ-ের মতো শাস্তি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তবে শুরু থেকেই যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে দেশে-বিদেশে তীব্র সমালোচনা হয়। এদিকে ফাঁসির রায় স্থগিত রাখার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনও আহ্বান জানিয়ে আসছে। এদিকে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে ব্রিটেনের পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী সাঈদা ওয়ার্সি এক বিবৃতিতে বলেছেন, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া রায় রিভিউ করতে অনুমতি দেয়া হয়নি বলে আমরা জেনেছি। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সব নাগরিকের প্রতি সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন ওয়ার্সি। তিনি বলেন, ‘কাদের মোল্লার মৃত্যুদ-ে আমি উদ্বিগ্ন। ব্রিটেন সব পরিস্থিতিতে মৃত্যুদ-বিরোধী। এটা মানুষের মর্যাদা ক্ষুণœ করে।’ এ দিকে সৌদি আরবের প্রভাবশালী সংবাদপত্র সৌদি গেজেটে ৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান যুদ্ধাপরাধের বিচারের মান নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলেও হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন তিনি।

কাদের মোল্লার ফাঁসি বন্ধে নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক চাপ
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় স্থগিত রাখার জন্য সরকারের ওপর নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিচারের ‘স্বচ্ছতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফাঁসির রায় স্থগিত রাখার জন্য সরকারের ওপর প্রকাশ্যেই চাপ দিয়েছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে দুই স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার গ্যাব্রিয়েলা নাউল ও ক্রিস্টফ হেইনস আপিলের সুযোগ না দিয়ে কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর না করার আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে দেশের বিরাজমান পরিস্থিতির পাশাপাশি আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের বিষয়ে ওয়াশিংটনের নেতিবাচক মনোভাবের কথা জানান। হাসিনাকে এরদোগানের টেলিফোন : কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর না করার আহ্বান জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর না করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েব এরদোগান।

আজীবন শহীদি মৃত্যু চেয়েছি
আইনজীবীদের আবদুল কাদের মোল্লা
আবদুল কাদের মোল্লা বলেছেন, আমি আজীবন শহীদি মৃত্যু কামনা করেছি। অনেক আগে ছাত্রজীবনে শহীদ সাইয়েদ কুতুবের শাহাদাতের ইতিহাস বলতে গিয়ে অধ্যাপক গোলাম আযম আমার গলায় স্নেহের হাত রেখে বলেছিলেন, একদিন এই ফাঁসির দড়ি তোমার গলায়ও পড়তে পারে। তার আইনজীবীরা কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে কাদের মোল্লা তাদের এ কথা বলেন। পরে কাদের মোল্লার এ বক্তব্য সাংবাদিকদের জানান তার আইনজীবী এম তাজুল ইসলাম। কাদের মোল্লার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তার অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম দৈনিক আমার দেশকে জানান, মৃত্যুদ-ের চূড়ান্ত আদেশপ্রাপ্ত একজন মানুষের সঙ্গে তার জীবনের প্রথম সাক্ষাতে তিনি মুগ্ধ ও স্তম্ভিত। তাজুল ইসলাম বলেন, নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কী করে একজন মানুষ এমন অবিচল ও শঙ্কাহীন থাকতে পারেন? একজন সত্যিকার ইসলামী আন্দোলনের নেতার মতোই স্মিত হেসে আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। আইনি বিষয়ে পরামর্শের পাশাপাশি তিনি বলছিলেন তার নিজের কথা। কাদের মোল্লা তাজুল ইসলামকে বলেছেন, তিনি জীবনে যেসব অপরাধের কথা চিন্তাও করেননি তার দায় তার ওপরে চাপানো হয়েছে। যে জায়গায় তিনি কখনও যাননি, যাদের কখনও দেখেননি, সেই জায়গায় ওই লোকদের হত্যার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। ভুয়া ও সাজানো লোকদের সাক্ষী বানিয়ে আদালতে আনা হয়েছে। এমন কঠিন অবস্থায় কেমন লাগছে, জানতে চাইলে আইনজীবীকে কাদের মোল্লা বলেন, ‘আজীবন শহীদি মৃত্যু কামনা করেছি। অনেক আগে ছাত্রজীবনে শহীদ সাইয়েদ কুতুবের শাহাদাতের ইতিহাস বলতে গিয়ে অধ্যাপক গোলাম আযম আমার গলায় স্নেহের হাত রেখে বলেছিলেন, একদিন এই ফাঁসির দড়ি তোমার গলায়ও পড়তে পারে।’ এ ইতিহাস বলতে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, ‘আমি আবদুল কাদের মোল্লা কোনো অপরাধ করিনি। তোমরা নিশ্চিত থাকো, মাথা উঁচু ছিল উঁচুই থাকবে। তোমরা কখনও আমার চোখে পানি দেখবে না, ইনশাআল্লাহ।’

কর্মীরা যেন আমার রক্তকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজে লাগায়
আবদুল কাদের মোল্লার পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ মাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রদান করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, আমার শাহাদাতের পর যেন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে আমার রক্তকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজে লাগায়। কোনো ধরনের কর্মকা-ে যেন জনশক্তি নিয়োজিত না হয়। যারা আমার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে আমি তাদের শাহাদাত কবুলিয়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করি। আল্লাহ তাদেরকে সর্বোত্তম পুরস্কার দান করুন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পরিবারের সদস্যগণ আবদুুল কাদের মোল্লার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি কথাগুলো বলেন। তিনি আরও বলেন, আমি আগেই বলেছি, সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে এ সরকার আমাকে হত্যা করতে চাচ্ছে। আমি মজলুম। আমার অপরাধ আমি ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছি। শুধুমাত্র এ কারণেই এ সরকার আমাকে হত্যা করছে। আমি আল্লাহ, রাসূল, কুরআন ও সুন্নাহতে বিশ্বাসী। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমার এ মৃত্যু হবে শহীদি মৃত্যু। আর শহীদের স্থান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু দিলে এটা হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পাওয়া। এর জন্য আমি গর্বিত। আমি বিশ্বাস করি, জীবন-মৃত্যুর মালিক আল্লাহ। আমাকে ১০ তারিখ রাতেই সরকার হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সে দিন আমার মৃত্যু নির্ধারণ করেননি। যে দিন আল্লাহর ফয়সালা হবে সে দিনই আমার মৃত্যু হবে। প্রত্যেক প্রাণীরই মৃত্যু আছে। আমাকেও মরতে হবে। শহীদি মুত্যুর চাইতে বড় সৌভাগ্য আর কিছু নয়। আজীবন আমি সে মৃত্যু কামনা করেছি। আজও করছি। আমার অনুরোধ, আমার শাহাদাতের পর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা যেন ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেয়। তারা যেন কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক বা প্রতিহিংসাপরায়ণ কর্মকা-ে লিপ্ত না হয়। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে এটাই আমার আহ্বান। আমি ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের উদ্দেশে বলছি, শাহাদাতের রক্তপিচ্ছিল পথ ধরে অবশ্যই ইসলামের বিজয় আসবে। আল্লাহ যাদের সাহায্য করেন তাদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারে না। ওরা আবদুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করে ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে চায়। আমি বিশ্বাস করি, আমার প্রতিফোঁটা রক্ত ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করতে এবং জালেম সরকারের পতন ডেকে আনবে। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যেন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা আমার রক্তের বদলা নেয়। তিনি তার স্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, আমি পরিবারের অভিভাবক ছিলাম। আমার পরে আল্লাহ আমার পরিবারের অভিভাবক হবেন। তুমি পরিবারকে দেখাশোনা করবে মাত্র। আল্লাহর কাছে আমি দোয়া করি, তোমার এই দায়িত্ব পালন শেষ হওয়ার পরই যেন আল্লাহ তায়ালা তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসেন। আবদুল কাদের মোল্লা ইসলামী আন্দোলনের কর্মী ও দেশবাসীর প্রতি সালাম জানান। তিনি আরও বলেন, খবরে দেখেছি ১০ বছরের শিশুদেরকে হত্যা করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের রক্তে ভাসছে দেশ। এই রক্তের বদলা অবশ্যই আল্লাহ দেবেন। আমি মোটেই বিচলিত নই। আমি দেশবাসীর দোয়া চাই। আমার জীবনের বিনিময়ে যেন ইসলামী আন্দোলন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে আল্লাহ হেফাজত করেন। মহান আল্লাহর কাছে এটাই আমার কামনা।
স্ত্রীকে লেখা আবদুল কাদের মোল্লার
শেষ চিঠি
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
প্রিয়তমা জীবন সাথী পেয়ারী, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আজ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর খুব সম্ভব আগামী রাত বা আগামীকাল জেলগেটে আদেশ পৌঁছানোর পরই ফাঁসির সেলে আমাকে নিয়ে যেতে পারে। এটাই নিয়ম। সরকারের সম্ভবত শেষ সময়। তাই শেষ সময়ে তারা এই জঘন্য কাজটি দ্রুত করে ফেলার উদ্যোগ নিতে পারে। আমার মনে হচ্ছে তারা রিভিউ পিটিশন গ্রহণ করবে না। যদি করেও তাহলে তাদের রায়ের কোন পরিবর্তন হওয়ার দুনিয়ার দৃষ্টিতে কোন সম্ভাবনা নেই। মহান আল্লাহ যদি নিজেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন, তাহলে ভিন্ন কথা। অথচ আল্লাহর চিরন্তন নিয়মানুযায়ী সব সময় এমনটা করেন না। অনেক নবীকেও তো অন্যায়ভাবে কাফেররা হত্যা করেছে। রাসূলে করীম (সা)-এর সাহাবায়ে কেরাম এমনকি মহিলা সাহাবীকেও অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। আল্লাহ অবশ্য ঐ সমস্ত শাহাদাতের বিনিময়ে সত্য বা ইসলামকে বিজয়ী করার কাজে ব্যবহার করেছেন। আমার ব্যাপারে আল্লাহ কী করবেন তা তো জানার উপায় নেই। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং এসে আওয়ামী লীগকে শুধু সাহসই দেননি, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে চাপও দিয়েছেন এবং সতর্ক করার জন্য জামায়াত শিবিরের ক্ষমতায় আসার ভয়ও দেখিয়েছেন। এতে বোঝা যায় যে জামায়াত এবং শিবির-ভীতি এবং বিদ্বেষ ভারতের প্রতি রক্তকণায় কিভাবে সঞ্চারিত। আমি তো গোড়া থেকেই বলে আসছি, আমাদের বিরুদ্ধে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে এটার সবটা ছকই ভারতের অঙ্কন করা। আওয়ামী লীগ চাইলে এখান থেকে পেছাতে পারবে না। কারণ তারা ভারতের কাছে আত্মসমর্পণের বিনিময়েই এবার ক্ষমতা পেয়েছে। অনেকেই নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে কথা বলেন, আমাকেসহ জামায়াতের সকলকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে যে কায়দায় জড়ানো হয়েছে এবং আমাদের দেশের প্রেসের প্রায় সবগুলোই সরকারকে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করছে, তাতে সরকারের পক্ষে নীতি নৈতিকতার আর দরকার কী? বিচারকরাই স্বয়ং যেখানে জল্লাদের ভূমিকায় অত্যন্ত আগ্রহভরে নিরপরাধ মানুষকে হত্যার নেশায় মেতে উঠেছে তাতে স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের আশা অন্তত এদের কাছ থেকে করা কোনোক্রমেই সমীচীন নয়। তবে একটি আফসোস, যে আমাদেরকে বিশেষ করে আমাকে যে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মৃত্যুদ-াদেশ দেয়া হয়েছে, তা জাতির সামনে বলে যেতে পারলাম না। গণমাধ্যম বৈরী থাকায় এটা পুরোপুরি সম্ভবও নয়। তবে জাতি পৃথিবীর ন্যায়পন্থী মানুষ অবশ্যই জানবে এবং আমার মৃত্যু এই জালেম সরকারের পতনের কারণ হয়ে ইসলামী আন্দোলন অনেক দূর এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। কালই সূরা আত-তাওবার ১৭ থেকে ২৪ আয়াত আবার পড়লাম। ১৯ নম্বর আয়াতে পবিত্র কাবাঘরের খেদমত এবং হাজীদের পানি পান করানোর চাইতে মাল ও জান দিয়ে জেহাদকারীদের মর্যাদা অনেক বেশি বলা হয়েছে। অর্থাৎ স্বাভাবিক মৃত্যুর চাইতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আল্লাহর দেয়া ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা অর্থাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জেহাদে মৃত্যুবরণকারীদের আল্লাহর কাছে অতি উচ্চ মর্যাদার কথা আল্লাহ স্বয়ং উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ নিজেই যদি আমাকে জান্নাতের মর্যাদার আসনে বসাতে চান তাহলে আমার এমন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। কারণ জালেমের হাতে অন্যায়ভাবে মৃত্যু তো জান্নাতের কনফার্ম টিকেট। সম্ভবত ১৯৬৬ সালে মিসরের জালেম শাসক কর্নেল নাসের সাইয়্যেদ কুতুব, আবদুল কাদের আওদাসহ অনেককে ফাঁসি দিয়েছিলেন। ‘ইসলামী আন্দোলনের অগ্নিপরীক্ষা’ নামক বিষয়ে বিভিন্ন শিক্ষা শিবিরে বক্তব্য শুনেছি। একাধিক বক্তব্যে অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেব বাম হাতটা গলার কাছে নিয়ে প্রায়ই বলতেন, ‘ঐ রশি তো এই গলায়ও পড়তে পারে।’ আমারও হাত কয়েকবার গলার কাছে গিয়েছে। এবার আল্লাহ যদি তার সিদ্ধান্ত আমার এবং ইসলামের অগ্রগতির সাথে সাথে জালেমের পতনের জন্য কার্যকর করেন, তাহলে ক্ষতি কী? শহীদের মর্যাদার কথা বলতে গিয়ে রাসূলে করিম (সা) বারবার জীবিত হয়ে বারবার শহীদ হওয়ার কামনা ব্যক্ত করেছেন। যারা শহীদ হবেন, জান্নাতে গিয়ে তারাও আবার জীবন এবং শাহাদাত কামনা করবেন। আল্লাহর কথা সত্য, মুহাম্মদ (সা)-এর কথা সত্য। এ ব্যাপারে সন্দেহ করলে ঈমান থাকে না। এরা যদি সিদ্ধান্ত কার্যকর করে ফেলে তাহলে ঢাকায় আমার জানাজার কোনো সুযোগ না-ও দিতে পারে। যদি সম্ভব হয় তাহলে মহল্লার মসজিদে এবং বাড়িতে জানাজার ব্যবস্থা করবে। পদ্মার ওপারের জেলাগুলোর লোকেরা যদি জানাজায় শরিক হতে চায়, তাহলে আমাদের বাড়ির এলাকায়ই যেন আসে। তাদেরকে অবশ্যই খবর দেয়া দরকার। কবরের ব্যাপারে তো আগেই বলেছি আমার মায়ের পায়ের কাছে। কোন জৌলুসপূর্ণ অনুষ্ঠান বা কবর বাঁধানোর মতো বেদআত যেন না করা হয়। সাধ্যানুযায়ী ইয়াতিমখানায় কিছু দান খয়রাত করবে। ইসলামী আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সাহায্য সহযোগিতা করবে। বিশেষ করে আমার গ্রেফতার এবং রায়ের কারণে যারা শহীদ হয়েছে, অভাবগ্রস্ত হলে ঐসব পরিবারকে সাহায্য সহযোগিতার ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাসান মওদুদের পড়াশোনা এবং তা শেষ হলে অতি দ্রুত বিবাহ-শাদির ব্যবস্থা করবে। নাজনীনের ব্যাপারেও একই কথা।
পেয়ারী, হে পেয়ারী,
তোমাদের এবং ছেলেমেয়ের অনেক হকই আদায় করতে পারিনি। আল্লাহর কাছে পুরস্কারের আশায় আমাকে মাফ করে দিও। তোমার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করেছি যদি সন্তান-সন্ততি এবং আল্লাহর দ্বীনের জন্য প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আল্লাহ যেন আমার সাথে তোমার মিলিত হওয়ার ব্যবস্থা করেন। এখন তুমি দোয়া করো, যাতে আমাকে দুনিয়ার সমস্ত মায়া-মহব্বত আল্লাহ আমার মন থেকে নিয়ে শুধু আল্লাহ এবং রাসূলে করীম (সা)-এর মহব্বত দিয়ে আমার সমস্ত বুকটা ভরে দেন। ইনশাআল্লাহ, জান্নাতের সিঁড়িতে দেখা হবে। সন্তানদেরকে সবসময় হালাল খাওয়ার পরামর্শ দেবে। ফরজ, ওয়াজিব, বিশেষ করে নামাজের ব্যাপারে বিশেষভাবে সকলেই যতœবান হবে। আত্মীয়-স্বজনদেরকেও অনুরূপ পরামর্শ দেবে। আব্বা যদি ততদিন জীবিত থাকেন তাকে সান্ত¦না দেবে।
তোমাদেরই প্রিয়
আবদুল কাদের মোল্লা
এক নজরে কাদের মোল্লার গ্রেফতার থেকে ফাঁসি
গ্রেফতার : ১৩ জুলাই ২০১০ সুপ্রিম কোর্ট এলাকা থেকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার।
তদন্ত শুরু : ২১ জুলাই ২০১০
তদন্ত শেষ : ৩১ অক্টোবর ২০১১
আদালতে অভিযোগ উত্থাপন : ১৮ ডিসেম্বর ২০১১
শ্যোন অ্যারেস্ট : ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জ থানায় মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম মোস্তফা নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগে কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করা হয়। দুই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
অভিযোগের সংখ্যা : ৬টি
৬ অভিযোগ : কবি মেহেরুন্নেছাসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা, পল্লবীর আলোবদি গ্রামে ৩৪৪ জনকে হত্যা, আইনজীবী-সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে হত্যা, বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবসহ সাতজনকে হত্যা, কেরানীগঞ্জের শহীদনগর গ্রামের ভাওয়াল খানবাড়ি ও ঘাটারচরসহ পাশের আরও দুটি গ্রামের অসংখ্য লোককে হত্যা।
অভিযোগ আমলে নেয় : ২৮ ডিসেম্বর ২০১১
চার্জ গঠন করে : ২৮ মে ২০১২
অভিযোগের ওপর সূচনা বক্তব্য শুরু হয় : ১৬ জুন ২০১২
রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষ্য : ৩ জুলাই ২০১২
রাষ্ট্রপক্ষের মোট সাক্ষী : ১২ জন
সাক্ষ্য শেষ হয় : ৪ নভেম্বর ২০১২
কাদের মোল্লার পক্ষের সাক্ষীর আবেদন : ৫ নভেম্বর ২০১২
কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষী : ৬ জন
কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য শুরু : ১৫ নভেম্বর ২০১২
কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য শেষ হয় : ৬ ডিসেম্বর ২০১২
রাষ্ট্রপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক : ১৭ ডিসেম্বর
মামলা পুনর্বিচারের জন্য আবেদন : ৩ জানুয়ারি ২০১৩
পুনর্বিচারের আবেদন খারিজ : ৭ জানুয়ারি ২০১৩
আসামিপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক : ৭ জানুয়ারি ২০১৩
রায় দেয়ার ঘোষণা : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩
ট্রাইব্যুনালের যাবজ্জীবন কারাদ-ের রায় : ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
শাহবাগেিদর দাবি অনুযায়ী সরকারকে আপিলের সুযোগ দিতে আইন সংশোধন : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
সরকারে আপিল : ৩ মার্চ ২০১৩
কাদের মোল্লার আপিল : ৪ মার্চ ২০১৩
আপিলের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩
আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ : ৯ ডিসেম্বর ২০১৩
ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যু পরোয়ানা জারি : ১০ ডিসেম্বর ২০১৩
মৃত্যুদ- কার্যকর স্থগিত : ১০ ডিসেম্বর রাত ১০টা।
রিভিউ আবেদনের শুনানি খারিজ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৩
মৃত্যুদ- কার্যকর : ১২ ডিসেম্বর ২০১৩ রাত ১০টা ১ মিনিট।
উপসংহার
ইতালির কবি দান্তে বলেছিলেন, The hottest place in hell are reserved for those who, in time of moral crisis maintain their neutrality. অর্থাৎ নৈতিক সঙ্কটের সময় যারা নিরপেক্ষ থাকে তাদের জন্য দোজখের সবচেয়ে উত্তপ্ত জায়গাটি সংরক্ষিত আছে। কাজেই গণতান্ত্রিক ও নৈতিক বোধসম্পন্ন কোনো মানুষের পক্ষে এখন নীরব থাকা সম্ভব নয় একটি কঙ্কর নিয়ে হলেও গণতন্ত্রের পক্ষে আজ দাঁড়াতে হবে। থমাস জেফারসনের কথামতো, When injustice becomes law, resistance becomes duty. অর্থাৎ অবিচার যখন আইন হয়ে পড়ে প্রতিরোধ তখন কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই সামনে উদ্ভূত পরিস্থিতির সব দায়টুকু এই নব্য বাকশালকেই নিতে হবে। হত্যা, নিপীড়ন, জিম্মি করে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখে ভয়-হুমকি-ধমকি দিয়ে রক্তপিচ্ছিল করেছে এই অকুতোভয় সংগ্রামী কাফেলার। নির্যাতন, হত্যা ও সন্ত্রাসের শিকার এই সংগঠনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও মিডিয়া আগ্রাসন চালিয়েছে যৌথভাবে। সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আর মিথ্যাকে সত্য দিয়ে ঢাকার অপপ্রয়াস চালিয়েছে হরদম। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের রক্তে ভাসছে দেশ। এই রক্তের বদলা অবশ্যই আল্লাহ দেবেন। আমরা মোটেই বিচলিত নই। আমরা দেশবাসীর দোয়া চাই। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার জীবনের বিনিময়ে যেন ইসলামী আন্দোলন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে আল্লাহ হেফাজত করেন। মহান আল্লাহর কাছে এটাই আমাদের কামনা।
লেখক : কেন্দ্রীয় শিক্ষা সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply