জীবন-প্রভাতের শপথ একান্ত অনুভবের আয়না । ইয়াসিন মাহমুদ

জীবন-প্রভাতের শপথ একান্ত অনুভবের আয়না । ইয়াসিন মাহমুদপ্রতিটি মানুষের জন্মগ্রহণের ফিতরাত এক ও অভিন্ন। তবে জীবনযাপন ও জীবনাচরণের রয়েছে ব্যাপকতর পার্থক্য। রয়েছে চিন্তাগত মৌলিক দর্শনের বিভেদ। একেকজন একেকভাবে জীবনকে সাজায়। জীবনকে প্রস্তুত করেন একান্ত অনুভবে। এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে- হাজিব ইবনু ওয়ালিদ (রহ) আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি নবজাতক একই ফিতরাতে জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদি বানায়, খ্রিষ্টান বানায় এবং অগ্নিপূজক বানায়, যেমন চতুষ্পদ জানোয়ার পূর্ণাঙ্গ চতুষ্পদ বাচ্চা প্রসব করে। তোমরা কি তাতে কোন কর্তিত অঙ্গ (বাচ্চা) দেখ? এরপর আবু হুরায়রা (রা) বললেন, তোমরা চাইলে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করতে পার; আল্লাহর ফিতরাতে (অবিচল থাক) যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। (সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৬৫১৫)
দৃষ্টিভঙ্গির ওপর মানুষের স্বভাব ও জীবনপ্রবাহের দিকদর্শন নির্মিত হয়। জীবনপ্রভাতে যে যেভাবে বেড়ে ওঠার অনুষঙ্গ পায় সে সেভাবেই গড়ে ওঠে আগামীর পৃথিবীর জন্য। কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাডভোকেট, পাইলট, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ আরো অনেক কিছু। তবে সবাই মানুষ হতে পারে না। আবার কেউ কেউ এগুলো হয়েও মানুষ হয়; মনুষ্যত্বের স্তম্ভে বেঁচে থাকে আমৃত্যু। মৃত্যুপরবর্তী জীবনকে সাজান এই জীবন থেকে। সবাই একই সময়, একই সমাজ এবং একই পৃথিবী থেকে গুছিয়ে নেন নিজেকে। মূলত নিজেকে গড়ার, জীবন গড়ার অনুপ্রেরণাটা তৈরি হয় শৈশব থেকে। জীবনের প্রথম প্রভাত: প্রথম পাঠই জীবনকে নন্দিত গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। জীবনকে গড়ার জন্য তাই সেই ছোট্ট থেকেই আদিষ্ট হতে হয়। জীবনের অলি-গলিতে, পথে-প্রান্তরে গভীর অনুভবে একান্ত তুলে রাখতে হয় জীবন-প্রভাতের সেই প্রতিজ্ঞা ও জীবনকে যথার্থ করে গড়বার মন্ত্রণাগুলো। কবি মতিউর রহমান মল্লিক বলেছেন এভাবে-
জীবন-প্রভাত-বেলা/ যে শপথ করেছিনু আমি
সে শপথ মনে রেখে/ পথ চলি যেন দিবাযামী।

২. আমরা মানুষ। আমরাই শ্রেষ্ঠ। বিবেকের শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যেমন রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। তেমনি রয়েছে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হওয়ার কঠিন পরীক্ষা। আমাদের স্বাধীনতা আছে বলেই আমরা অনেক সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠি নিজের অজান্তে গাফিলতির খেয়ালে। আমাদের ঠিকানা ভুলে যাই মাঝে মাঝে। উদ্দেশ্যহীনভাবে বেনামি প্রাপকের দিকে ঝুঁকে দেই নিজেকে। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেছেন- মানুষ কি মনে করে নিয়েছে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তারা ছাড়া পেয়ে যাবে এবং কোনো পরীক্ষা করা হবে না? অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নিবেন (ঈমানের দাবিতে) কারা সত্যবাদী এবং কারা মিথ্যাবাদী। (সূরা আল আনকাবুত : ২-৩)
দুনিয়ার লাভ-ক্ষতির হিসাব যখন সামনে আসে তখন আমরা কিভাবে যে শয়তানের ধোঁকায় কুপোকাত হই কেউ বুঝে উঠতে পারিনি। অথচ এই পৃথিবী খেল তামাশার জায়গা ছাড়া কিছু নয়। আমাদের শপথ তো মহান প্রভুর সন্তষ্টি।
পৃথিবী এক কঠিন পরীক্ষার জায়গা। প্রতিটি সময় বড়ই চ্যালেঞ্জের। ছাত্রজীবনে ক্লাসের পরীক্ষাসহ আরো অনেক দায়িত্ব আমাদের কাঁধে থাকে। লেখাপড়া শেষে নতুন আরেকটি জীবন। পারিবারিক জীবনটি আরেকটি নতুন পরীক্ষাকেন্দ্র। দায়িত্ববোধটা একটু বাড়িয়ে দিতে হয় প্রয়োজনে। অখণ্ড অবসর কিংবা ব্যস্ততা- পেরেশানি থেকে বাঁচার একটু উপায় খুঁজি। আসলে অবসর নিয়ে আমরা কোথায় যাবো? কোথায় পালাবো কেউ বলতে পারেন? আজাজিল এসে হয়তবা আমাদেরকে দলে ভিড়াবেন। এইতো। কিন্তু জীবন-প্রভাতের সেই শপথ আর ভালোবাসা এক নিমিষেই জলাঞ্জলিতে দিয়ে দিবেন? দিনান্তে শ্রান্তি-ক্লান্তির শেষাব্দে একটু সময় দেই নিজেকে; অনন্ত আনন্দ-উচ্ছ্বাস আয়োজনের মহামিলনের সেই দিনের জন্য। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের এই গানটিও মনে রাখি বন্ধু। তাহলে পথ হারানোর সম্ভাবনা অনেকটা কমে যাবে। কবি বলেছেন-
হঠাৎ করে জীবন দেয়া
খুবই সহজ তুমি জান কি?
কিন্তু তিলে তিলে অসহ জ্বালা সয়ে
খোদার পথে জীবন দেয়া
নয়তো সহজ তুমি মানো কি?

৩. অলস কিংবা নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিকে আমরা কেউই পছন্দ করি না। বরং অনেকটা বাঁকা চোখে দেখি। ক্লাসের অমনোযোগী ছাত্রকে যেমন শিক্ষকরা পছন্দ করেন না। অফিসের বস কাজে ফাঁকি কিংবা অযোগ্য কর্মীকে ছাঁটাই করেন। মেধাবী, চৌকস ও কর্মঠকে প্রমোশন দেন। মহান আল্লাহও তাঁর দ্বীনের পথে অক্লান্ত কর্মীকে পছন্দ করেন। ভালোবাসেন। মহান আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা- “নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐসব লোককে পছন্দ করেন, যারা তাঁর পথে এমনভাবে কাতারবন্দী হয়ে লড়াই করে, যেন তারা সীসা গলানো মজবুত দেয়াল।” (সূরা আস সফ: ৪)
মহান আল্লাহ তায়ালা এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগারদের জন্য।” (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩)
আল্লাহ তায়ালা কাদেরকে প্রিয় হিসাবে দেখতে চান তাদেরকে নিয়ে বলেছেন- “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে সে নিশ্চয়ই সত্য ও সঠিক পথ প্রদর্শিত হবে।” (সূরা আলে ইমরান: ১০১)

৪. মানুষ হিসাবে পাওয়া-না পাওয়ার বেদনা সবসময়ই পীড়া দেয়। মানুষ হিসেবে এ দুর্বলতা আজন্ম। চকমক দুনিয়ার মোহ আমাদেরকে টানে। স্পর্শ করে। অসতর্কতাবশত শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পা দিয়ে ফেলি। হিসাব কষে নিজের সফলতা-ব্যর্থতার পরিসংখ্যান মিলাই। কখনো কখনো ভগ্নাংশ অবশিষ্ট থেকে যায়।
ব্যর্থতা-সফলতার হিসাব তো কেবলই সম্পদই না। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের আকাক্সক্ষা অনেক সময় আমাদেরকে অন্ধবনে নিয়ে যায়। নিজেকে অসহায় করে তোলে। অন্যান্য সকল অর্জনকে তুচ্ছজ্ঞান করে। অথচ এই দুনিয়া স্থায়ী নয় এটা আমরা সবাই জানি। তবুও বার বার পেছন ফিরে তাকাই; হায়! কী হলো আমার। কবি মতিউর রহমান মল্লিক কী দারুণ উপমা দিয়েছেন এ সম্পর্কে-
হতাশার রাত যে প্রভাত এলো রক্তমাখা
জেহাদের ময়দানে তাই উড়ছে নিশান হেলাল আঁকা
তুইও আজ হ’ মুজাহিদ
পয়গামে ঐ আল কোরানের।

৫. প্রতিটি কাজের লক্ষ্য থাকে। বিশদ উদ্দেশ্য থাকে। যারা জীবনের বিনিময়ে জান্নাত ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতই তাদের টার্গেট। সব পিছুটান উপেক্ষা করে তারা কেবলই সেদিকে ধাবিত হবে। আল্লাহকে ভালোবেসে যারা সঁপেছে জীবন তাদের তো পরাজয় ও পরাভবের ভয় থাকে না। উদ্দেশ্যহীন কোন কাজই কাঙ্ক্ষিত মনজিলে পৌঁছায় না বরং একসময় তা ধসে পড়ে কালের খেয়ায়। দ্বীন হচ্ছে জীবন উদ্দেশ্য যাদের, তারা কেবলই অহর্নিশ ছুটে বেলায় মুক্তির স্বীয় সীমানায়। যেই পথ আল্লাহর। যেই পথ রাসূলের, সেই পথ আমাদের সকলের। সেইপথে আজীবন টিকে থাকার প্রত্যয়- প্রত্যাশা। কবি আবু তাহের বেলালের সাথে আমরাও কণ্ঠ মিলাই-
ঈমানের পথে অবিচল থেকে
আমার মরণ যেন হয়
তোমারি কাছে মিনতি আমার
মহামহিম দয়াময়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply