জীবন-মৃত্যু এবং জীবনের ব্যাপ্তি

সাইয়েদ কুতুব

বোনের কাছে লেখা সাইয়েদ কুতুব শহীদের চিঠি, যিনি মৃত্যুর কথা বেশি চিন্তা করতেন

প্রিয়তমা বোনটি আমার,
মৃত্যু-ভাবনা এখনো তোমার কল্পনা জগৎকে ব্যাপৃত করে আছে। সবখানে, সবকিছুতে শুধু মৃত্যুর কথাই চিন্তা করো। তোমার বিবেচনায় মৃত্যু এমন এক দুর্দান্ত প্রতাপশালী শক্তি, যা জীব ও জীবন সব কিছুকেই নির্মমভাবে মাড়িয়ে চলে। যার সান্নিধ্যে তুমি জীবনকে দেখছো ভীরু কম্পমান এক কাপুরুষ।
অথচ ক্ষণিক চেয়ে আমিতো মৃত্যুকে প্রাচুর্যে টলমল সদা বিকাশমান জীবনশক্তির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হীনবীর্য শ্রান্ত সত্য বৈ অন্য কিছুই দেখি না। জীবনে কক্ষপথ থেকে ঝরে পড়া উচ্ছিষ্টের গ্রাস নিয়ে উদরপূর্তি করা ছাড়া মৃত্যুর অন্য কোন শক্তি আছে বলে আমি ভাবি না।
এইতো জীবনের সেই উদ্দাম জোয়ার যা আমার চার পাশে সবসময় এক মধুর ধ্বনিময় ব্যঞ্জনা তুলে চলে, আমাদের জীবনের সব কিছুইতো প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে চলমান, চলিষ্ণু প্রবাহে বিকাশ বিভায়। চেয়ে দেখো, মানুষ আর জীব জগতের সব কিছুই নিরন্তর প্রাণশক্তির বিকাশে ব্যস্ত। কীট-পতঙ্গ, মাছ বা পাখি সবখানেই জীবনের বীজ বহন। এই মাটি, ফুল ও ফলবতী বৃক্ষের ফেটে পড়া ও প্রস্ফুটিত অঙ্কুর। আকাশও এখানে গতিময় বৃষ্টি নিয়ে, সমুদ্র নিয়ে আসছে ঢেউয়ের গর্জন। দেখেছো কিভাবে বেড়ে উঠছে সবকিছু, বিকাশ ঘটছে জীবনের!
তোমাকে হয়তো আলোড়িত করে আমাদের চারপাশে থেকে থেকে মৃত্যুর ঘনঘটা, এই নিষ্ঠুর দংশন। কিন্তু ভেবে দেখো, এভাবেইতো আমাদের পথচলা, এরপরেও। এতো শুধু জীবনের প্রাচুর্য থেকে ঝরে পড়া উচ্ছিষ্টের গ্রাসটুকু তুলে নিতে ক্ষণিক থমকে দাঁড়ানো। অথচ স্বীয় কক্ষপথে জীবনের প্রদক্ষিণ নিরন্তর, প্রাণবন্ত উচ্ছলতার পথচলা। তবুও কি তুমি মৃত্যুকে অনুভব করো! ভেসে ওঠে তোমার দৃষ্টির সীমানায়!
সত্যিই মৃত্যুর দংশনে জীবন গুমরে ওঠে বেদনায়। কিন্তু ক্ষতটুকু কত সহজেই না শুকিয়ে যায়, ব্যথার চাপা সুরটুকু অচিরেই ফিরে চলে জীবনের নিজস্ব আনন্দের দিকে। চলে মানুষ, চলে জীব জগৎÑ পাখি, মাছ, কীট-পতঙ্গ, ঘাস ও গাছপালা, সব। এই সুনেহরা জমিন ভরে ওঠে জীবনের সমারোহে। আর মৃত্যু? ঠায় দাঁড়িয়ে ঐ ওখানেই। জীবনের গায়ে দাঁত বসিয়ে সেই নির্মোহ সত্য তার নিজের মতই থাকে, কিংবা ঘাপটি মেরে থাকে অন্য কোথাও অন্য আরেক মুহূর্তে জীবনের ঝরে পড়া প্রাপ্যটুকু নেয়ার আশায়। উষা জাগে, আবার দিনমনিও অস্ত যায়। আর একে ঘিরেই আবর্তন করে পৃথিবী জীবনের অভ্যুদয় হেথায় সেথায়। সবকিছুই বিকাশ ধারায় সংখ্যায়, ধরনে, আকারে, আকৃতিতে মৃত্যুই যদি চূড়ান্ত ক্ষমতাবান হতো তবেতো জীবনের বিস্তার থমকে যেতো। অথচ উচ্ছল চপলা জীবন শক্তির সামনে সে শুধু দুর্বল হীনবীর্য এক শক্তি।
চেয়ে দেখো, চিরঞ্জীব ও সুমহান আল্লাহতায়ালার শক্তি থেকেই উন্মেষ এই জীবনের! আর তার বেগবান এই নিরন্তর পথচলার!
জীবনের ব্যাপ্তি বাড়ানো যায় কিভাবে? কিভাবে জীবনকে করে তোলা যায় তার নিজের সীমানার চেয়ে বেশি বিস্তৃত?
জীবনের পরিসর আমাদের কাছে তখনই সীমিত ও সামান্য প্রতিভাত হয়, যখন আমরা স্রেফ সত্তাসর্বস্ব জীবন যাপন করি। জীবনের যাত্রা নিশ্চয়ই আমাদের জন্মের মুহূর্তের সুতীব্র চিৎকার থেকেই শুরু হয়। যার শেষটা হলো সীমিত আয়ুর উপসংহার।
আর যখন আমরা সত্তার এই ক্ষুদ্র গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে গিয়ে চিন্তানির্ভর জীবনকে যাপন করতে পারি, তখন যেন জীবন আবির্ভূত হয় নতুন এক গভীর ও দীর্ঘতর রূপ নিয়ে, যার শুরু যেখান থেকে মানবতার সূত্রপাত, যার পরিসর পৃথিবী থেকে আমাদের চলে যাওয়ার পরও বিস্তৃত! কল্পনায় না, সত্যিকারার্থেই আমাদের ব্যক্তি জীবনের প্রবৃদ্ধি এভাবেই আমরা পেতে পারি। জীবনকে এই আঙ্গিকে দেখলে সময়ের পরিক্রমায় আমাদের অনুভূতিরও দিগন্ত ছড়িয়ে পড়বে। চিন্তা আর কাজগুলো বেড়ে উঠবে এমন এক নতুন দুনিয়ায়, যেখানে জীবন কোন বর্ষপুঞ্জির যোগফল নয়, বরং বিপুল অনুভূতি আর ভাবনার মিলনমেলা। বাস্তববাদীরা এই চিন্তাকে ফ্যান্টাসি বলতে পারে, অথচ জীবনের সার্থকতার জন্য এটাই হলো বাস্তবতা এবং নির্ভেজাল নিরেট সত্য! সত্যিকারার্থে জীবন কী? জীবনতো স্রেফ মানুষের বেঁচে থাকার অনুভূতি। প্রাণের এই অনুভূতিটুকু থেকে কোন মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দেখো, সে জীবন থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। মানুষ যখন তার এই প্রাণশক্তির প্রাচুর্য অনুভব করতে পারে, তখনই সে জীবনের বাস্তব বিস্তীর্ণতা অর্জন করে। আমার দৃষ্টিতে এ বিষয়টি এতই স্বতঃসিদ্ধ যে, এ প্রসঙ্গে বিতর্কেরই কোনো সুযোগ নেই।
যখন আমরা শুধু নিজের জন্যই জীবনকে যাপন করি না, বরং অন্যদের জন্য বেঁচে থাকার মাঝে আমরা দীর্ঘায়ু লাভ করি। যে মাত্রায় আমরা অপরের জন্য আমাদের অনুভূতির ব্যাপ্তি বাড়াই, সেই মাত্রায়ই আমাদের জীবনানুভূতির পরিসর বৃদ্ধি পায়। পরিশেষে প্রকারান্তরে এভাবে আমরা আমাদের জীবনকে দীর্ঘজীবী করে নিতে পারি।
সংগৃহীত

SHARE

Leave a Reply