জীবন সন্ধ্যায় কবি ফররুখ আহমদ । মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

জীবন সন্ধ্যায় কবি ফররুখ আহমদ । মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্২৭শে রমজান ১৯৭৪ ফররুখ হঠাৎ ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। জ্বরের প্রকোপে হারিয়ে ফেলেন সংজ্ঞা। মধ্যরাতে একটু সুস্থ হলে সবাই তাকে রোজা না রাখার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু কবি তাতে একটুও রাজি হননি। খাদ্য গ্রহণের শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তবুও প্রায় না খেয়েই পরবর্তী রোজাগুলো রাখলেন। জ্বর তখনো লেগেই আছে।
পরিবারের সদস্যরা তাদের ঘরে যা মওজুদ ছিলো- সে অর্থ-সামর্থ্য দিয়ে কবির চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু তাঁর স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হলো না। রোজার শেষ দিন ইফতারির পর কবি আবার সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন।
জীবন বাজি রেখে ফররুখ ৩০টি রোজা রাখলেন। কিন্তু আফসোস! পবিত্র ঈদের দিন তাঁর পক্ষে ঈদের জামাতে শরিক হওয়া সম্ভব হলো না। সংজ্ঞাহীন স্বাস্থ্যের অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে চলে গেলো।
ফররুখের অন্তিম অসুস্থতাকালীন অবস্থার কিঞ্চিৎ বর্ণনা পাওয়া যায় কবি মুহাম্মদ হাবীবুর রহমানের এই সংক্ষিপ্ত বিবরণে। তিনি কবির এক আত্মীয়ের জবানীতে বলেন-
“ফররুখের মৃত্যুর আগে জ্বর হয়েছিলো। শেষ ক’বছর অসম্ভব অর্থাভাব ছিলো, ফলে যথাযথ চিকিৎসা হয়নি। ঈদের পরদিন বিকেলবেলা আমি সস্ত্রীক ফররুখ ভাইয়ের বাসায় গেলাম। সামনের কামরার দোরগোড়ায় পা দিতেই একটি ছেলে ব্যস্তভাবে এসে খবর দিল : চাচা, আপনি এসে ভালো করেছেন। আব্বার শরীর খুব খারাপ। আমি কালবিলম্ব না করে ফররুখ ভাইয়ের দিকে নজর পড়তেই আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। তাঁর বাকশক্তি তখন সম্পূর্ণ রুদ্ধ, স্মৃতিশক্তিও লুপ্ত। গোটা শরীর যেন একটা জীবন্ত কঙ্কাল, বিছানায় শুয়ে তিনি অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ করেছেন। কখনো কখনো উঠে বসার চেষ্টা করছেন। একবার তাঁকে ধরে বসিয়েও দিলাম কিছুক্ষণের জন্য। কিন্তু কিছুতেই তিনি স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। এক পর্যায়ে তিনি বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন বলতে চাইলেন। চোখ-মুখের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো, হঠাৎ যেন তিনি আমার চেহারা শনাক্ত করে ফেলেছেন। তাই ব্যগ্র হয়ে কিছু বলতে চাইছেন। কিন্তু না, কিছুই তিনি বলতে পারলেন না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর মুখের ভাবভঙ্গি আবার পাল্টে গেল।…..” [শেষ মুহূর্ত, মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান]
অনুজ বন্ধুপ্রতিম কবি আবদুস সাত্তার ঈদের দিন সন্ধ্যায় অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে হাসপাতালে নিতে ব্যর্থ হলেন। ভাগ্নে ড. হাসান জামান পরদিন ১৯ অক্টোবর ১৯৭৪ সন্ধ্যায় ডা: গোলাম মোয়াজ্জমকে নিয়ে এলেন ফররুখের বাসায়।
ডাক্তার কবির শিয়রে বসে রোগ নির্ণয় আর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ব্যস্ত। ঠিক সে সময় ইস্কাটন গার্ডেন কলোনির মসজিদের মিনার থেকে ভেসে এলো চিরপরিচিত সে স্বর্গীয় আহ্বান: এসো সালাতের ধ্যানে। এসো কল্যাণের পানে। ‘হাইয়া আলাস্-সালাহ্, হাইয়া আলাল ফালাহ।’ না; প্রতি সন্ধ্যার মতো কবি দ্রুত পায়ে ছুটে আসেননি মসজিদ পানে। বরং মুসল্লিরা যখন মাগরিব নামায সেরে সবেমাত্র মসজিদ আঙিনায় পা রাখলেন, ঠিক তখনই শুনতে পেলেন পাশের ফ্ল্যাটের তিনতলার বাসা থেকে গুমরে উঠছে প্রিয় বঞ্চিত কান্নার রোল। নেই, নেই আর নেই….।
চির সংগ্রামী ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ মাত্র ৫৬ বছর বয়সে পাড়ি জমালেন অনন্তের পথে, বিশ্ব প্রভুর মহান সান্নিধ্যে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ ফররুখের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে তাঁর বাসায় ‘শেষে’ নামে একটি কবিতার খাতা খুঁজে পান। আশ্চর্য, সেই কবিতার খাতার শেষ কবিতাটি যেন আল্লাহ্র ডাকে প্রশান্ত মনে দুনিয়ার কোলাহল ছেড়ে কবরে যেতে পারেন তারই প্রতিবিম্ব : কবি লিখেছেন-
যেদিন আমার কাজ ফুরোবে/সেদিন আমায় ডাকে যেন মাটি,
মায়ের মত মেলেছে সে/কোমল স্নেহে যেথায় শীতলপাটি।
সেই ধূলিতে মায়ের সাথে/মিশবো আমার মায়ের শ্যামল দেহে,
মাটি হয়ে মিশবো মাটির/গভীর বুকের অতল মধুর স্নেহে।
রইবে পড়ে এই এপারের/তুফান ঝড়ের প্রবল কোলাহল,
মাটির মাঝে মিশবো যেদিন/মাটিতে মোর মিশবে তনুতল।

ফররুখ আহমদ ইন্তেকাল করেছেন। রেডিওতে এ সংবাদ প্রচারের সাথে সাথে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, আত্মীয়-স্বজন, গুণগ্রাহী এবং মুক্তিযোদ্ধাসহ সমাজের সর্বস্তরের অগণিত লোক তাঁর বাসভবনে এসে ভিড় জমালেন। প্রাণ ভরে সবাই দেখলেন মৃত মুমিনের ঠোঁটের ডগায় লেগে আছে জান্নাতি হাসি। কপাল থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে নূরের আভা।
প্রশ্ন উঠলো, কবিকে কোথায় কবর দেয়া হবে?
প্রখ্যাত সাংবাদিক আসফউদ্দৌলা রেজাসহ কবির অনেক গুণগ্রাহী চেষ্টা চালালেন কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল মসজিদ সংলগ্ন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্র কবরের পাশে সমাহিত করতে।
এ ব্যাপারে জনাব রেজার আগ্রহ ও প্রচেষ্টা ছিলো প্রাণান্তকর। কারণ- একবার কী এক অসুবিধায় দৈনিক ইত্তেফাকের কর্মচারীদের বেতন বন্ধ করে দেয়া হলো। সতীর্থ বন্ধু ও অনুজ প্রতিম সিরাজুদ্দীন হোসেন ও আসফউদ্দৌলা রেজার কথা চিন্তা করে কবি ফররুখ শঙ্কিত হলেন। কারণ এ দু’জনের পারিবারিক সদস্য সংখ্যা ছিল বেশি। তাই তিনি দু’জনের নামে পরিচিত একজন লোক দিয়ে দুটো খাম পাঠিয়ে দিলেন। তাঁরা খাম খুলে দেখেন প্রত্যেক খামে দুটো করে একশ টাকার নোট এবং সাথে ছোট্ট দু’টি চিঠি। তাতে লেখা- “তোমাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুব সামান্য এই উপহার। আশা করি, এই বিপদের মুহূর্তে প্রত্যাখ্যান করবে না।”
এ ছাড়া ২৫ মার্চ, ১৯৭১ গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী দৈনিক ইত্তেফাক ভবন উড়িয়ে দিলে ফররুখ বিপদগ্রস্ত ঐ সাংবাদিকদের গোপনে বহু সাহায্য করেন।
অনেক তদবির করেও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্র কবরের পাশে কবিকে সমাহিত করার সরকারি অনুমতি পাওয়া গেলো না।
দুঃখজনক ও নিন্দনীয় যে, এ মহান কবির মৃত্যুতে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান তো দূরের কথা, একজন মন্ত্রী পর্যন্ত পত্রিকায় একটি বিবৃতি দিয়ে শোক প্রকাশ করেননি। শুধু কি তাই? কবির মৃত্যুর পর সীমাহীন কষ্টে পতিত কবির ছেলেমেয়ে-স্ত্রীকে সমবেদনা জানানোর জন্যও উচ্চপদস্থ কোন সরকারি কর্মকর্তা তাঁর বাসায় যায়নি।
কার্জন হল মসজিদের পাশে কবিকে কবর দিতে না পারায় সবাই হতাশ হলেন। শেষ পর্যন্ত বাংলার অপ্রতিদ্বন্দ্বী এ কবিকে আর দশজন সাধারণ মানুষের মত আজিমপুর গোরস্থানে কবর দেয়ার সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু বাদ-সাধলেন ফররুখের আজীবন সুহৃদ বন্ধু কবি বেনজীর আহমদ। তিনি উপস্থিত সবার কাছে প্রস্তাব দিয়ে বললেন, “যদি কারো আপত্তি না থাকে, বিশেষ করে যদি কবি-পত্নী অনুমতি দেন, তাহলে আমার ভাই ফররুখকে আমার শাহজাহানপুর ডেরায় নিয়ে যাব। তাকে আমার জন্য নির্দিষ্ট কবরের পাশেই কবর দেব।”
আবেগ আপ্লুত অশ্রুসজল কণ্ঠে তিনি আরো বললেন, “ফররুখের বন্ধুত্বের দাবি নিয়েই আমি এ প্রস্তাব দিচ্ছি।”
উপস্থিত সকলে বৃদ্ধ কবি বেনজীরের এই বদান্যতায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। পরিশেষে সিদ্ধান্ত হলো কবিকে বেনজীর আহমদের শাহজাহানপুরস্থ আম্রকুঞ্জের ছায়া-ঢাকা, পাখি-ডাকা শান্ত-স্নিগ্ধ কবরগাহে সমাহিত করা হবে।
এদিকে কবিকে গোসল দিয়ে কাফনের আয়োজন চলছে। হঠাৎ একটা চঞ্চল উত্তেজনা সবার মধ্যে লক্ষ করা গেলো। খবর নিয়ে জানা গেলো, কাফনের সবকিছু আনা হয়েছে কিন্তু আতর আনার কথা কারো মনে ছিলো না। আবার ব্যস্ততা, আবার অস্থিরতা।
এমন সময় একজন আতরের একটি ছোট্ট শিশি এনে বললো, “এই যে আতর। মক্কা থেকে কবির এক গুণগ্রাহী ভক্ত কবির জন্য পাঠিয়েছেন।” কিন্তু সুদূর মক্কা থেকে কে এই আতর বয়ে নিয়ে এলো? আর কে-ই বা তাঁর জন্য আতর পাঠালো? খবর নিয়ে জানা গেলো, একজন সফেদ শ্মশ্রুমণ্ডিত সাদা আলখেল্লা পরিহিত দরবেশের মতো মানুষ এখানে এসে কবি ফররুখের খোঁজ করছিলেন। তিনি যা বলেছেন, তার মর্মার্থ হলো, তিনি যখন মক্কায় গিয়েছিলেন তখন কবির একজন ভক্ত তাকে এই আতরের শিশিটি নিজ হাতে পৌঁছে দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
তাঁরও কবির সাথে পরিচিত হবার আগ্রহ ছিলো বহুদিন থেকে। তাই এই আতরের কল্যাণে কবির সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পাবেন ভেবে আজ তিনি আতরের শিশিটি অতি আনন্দের সঙ্গেই বহন করে এনেছেন। কিন্তু নানা রকম ঝামেলায় এতদিন তাঁর পক্ষে এই আতর আর কবিকে পৌঁছানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আজ তিনি কবির কাছে সেই আতর পৌঁছাতে পেরে বড় আনন্দ বোধ করছেন।
কিন্তু কবির জানাজার পর যখন সেই আতর বহনকারীর খোঁজ করা হলো, তখন আর তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেলো না। এমনকি যিনি আতরের শিশি এনে বলেছিলেন, ‘এই যে আতর’ তাঁকেও আর সেই হাজার লোকের ভিড়ে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
কবির কোন্ এমন ভক্ত পবিত্র মক্কায় ছিলেন, যিনি শুধু শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ এই ছোট্ট এক শিশি আতর পাঠিয়েছিলেন? তিনি কে? আর তিনিই বা কে, যিনি ঠিক কবির কাফনের সময় সেই আতর নিয়ে হাজির হয়েছিলেন? কারা তাঁরা? না, সে পরিচয়ের আজ আর কোন প্রয়োজন নেই।

লেখক : সম্পাদক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া

SHARE

Leave a Reply