জুলুম করার পরিণাম জাহান্নামের শাস্তি ভোগ – ড. মো: হাবিবুর রহমান

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ اتَّقُوا الظُّلْمَ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অনুবাদ: হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা জুলুম করা থেকে বিরত থাকো বা জুলুমকে ভয় করো। কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন ভীষণ অন্ধকার রূপ ধারণ করবে। (সহীহ মুসলিম)

রাবী পরিচিতি
নাম ও বংশ পরিচিতি: আবু যার, কুনিয়াত আবু আবদুল্লাহ বা আবদুর রহমান। পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আমর, মাতা নাসিবা বিনতে উকবা। যাবেরের পিতৃবংশের ঊর্ধ্বতন পুরুষ সালামা-র বংশধরগণ মদিনার হারার ও মসজিদে কিবলাতাইন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আমর ছিলেন শেষ আকাবায় মনোনীত অন্যতম নকিব। জাবিরের দাদা আমর ছিলেন তার খান্দানের নেতা বা সরদার।
জন্ম: হযরত যাবির ইবনে আবদুল্লাহ আমুল ফিল বা হাতির বছর মোতাবেক ৬১১ মতান্তরে ৬০৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।
ইসলাম গ্রহণ: সর্বশেষ ‘আকাবার শপথে’ পিতার সাথে হযরত যাবের (রা) অংশগ্রহণ করেন। ধারণা করা হয় এখানেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কেউ বলেছেন, তিনি আকাবার শপথের পূর্বেই মুসআব ইবনে উমায়েরের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত যাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বদর ও ওহুদ ছাড়া সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেছিলেন।
ইলমে হাদিসে অবদান: হযরত যাবির (রা) এর জীবনের একটা লক্ষ্য ছিলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসের প্রচার ও প্রসার করা। এ জন্য ইল্ম হাসিল শেষে তিনি তাদরিসের আসনে বসেন। মসজিদে নববীতে ছাত্রদের শিক্ষা দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটা ‘হালকা-ই দারস’ ছিলো যেখানে তিনি ছাত্রদের হাদিস শিক্ষা দিতেন। মক্কা, মদিনা, ইয়েমেন, কুফা, বসরা, মিসর প্রভৃতি স্থানের ছাত্ররা তার দারসে বসতো। তিনি প্রচুর পরিমাণে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ১৫৪০টি।
মৃত্যু: হিজরি ৭৮ সনে ৯৪ বছর বয়সে তিনি মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তিনি যখন ইন্তেকাল করেন তখন খুব কম সাহাবীই জীবিত ছিলেন।
হাদিসের ব্যাখ্যা:
اتَّقُوا الظُّلْمَ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“তোমরা জুলুমকে ভয় করো। কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন ভীষণ অন্ধকার রূপ ধারণ করবে।”
উপরোক্ত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুলুমের পরিণতি ও শাস্তি সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছেন এবং জুলুম থেকে বিরত থাকার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন কারণ এই জুলুম কিয়ামতের দিন জুলুমকারীর জন্য অন্ধকারে পরিণত হবে অর্থাৎ জুলুমের কারণে আল্লাহ তার যাবতীয় আমল বরবাদ করে দিবেন এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। উক্ত হাদিসের আলোকে নিম্নে জুলুম ও জুলুমের শাস্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

জুলুমের পরিচয়
জুলুম শব্দের অর্থ অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার, নিপীড়ন, সীমালঙ্ঘন ইত্যাদি। আর যার প্রতি জুলুম করা হয় তাকে মজলুম বলা হয়। ইসলামের পরিভাষায় কারো প্রতি অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার-নির্যাতন করা কিংবা কারো হক নষ্ট করাকে ‘জুলুম’ বলা হয়।
আল-কুরআনে জুলুমের পরিচয়
জুলুম কাকে বলে বা জালেম কারা এর সঠিক পরিচিতি তুলে ধরেছে আল-কুরআন। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ مَنَعَ مَسَاجِدَ اللَّهِ أَنْ يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ وَسَعَى فِي خَرَابِهَا
“আর তার চেয়ে অধিক জালেম কে, যে আল্লাহর মসজিদসমূহে তাঁর নাম স্মরণ করা থেকে বাধা প্রদান করে এবং তা বিরান করতে চেষ্টা করে?” (সূরা আল-বাকারা: ১১৪)
আল্লাহর আইন যারা অমান্য করে নিজের তৈরি করা আইন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে তারাই জালেম। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে-
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ فَمَنْ تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
“তাওরাতে আমি ইহুদিদের জন্য এ বিধান লিখে দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং সব রকমের জখমের জন্য সমপর্যায়ের বদলা। তারপর যে ব্যক্তি ঐ শাস্তি সাদকা করে দেবে তা তার জন্য কাফ্ফারায় পরিণত হবে। আর যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।” (সূরা মায়েদা: ৪৫)
এ ছাড়া জালেমের পরিচয়ে আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ كَذَّبَ بِآيَاتِهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ
“আর তার চেয়ে বড় জালিম আর কে যে আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটনা করে অথবা তার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে? নিশ্চয় জালিমরা সফলকাম হয় না।” (সূরা আন-আম: ২১)
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُوَ يُدْعَى إِلَى الْإِسْلَامِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
“সেই ব্যক্তির চেয়ে অধিক জালিম আর কে? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে, অথচ তাকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা হয়। আর আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” (সূরা সফ: ৭)

জুলুমের প্রকারভেদ
জুলুম দুই প্রকার- (১) আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত জুলুম: আকাশ এবং জমিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় জুলুম হলো আল্লাহর সাথে র্শিক করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
“আর স্মরণ কর, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে র্শিক করো না; নিশ্চয় র্শিক হলো বড় জুলুম’।” (সূরা লুকমান: ১৩)
মহান আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট প্রার্থনা করা, তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া ও আরোগ্য লাভের জন্য তাদের নিকট সাহায্য চাওয়া আল্লাহর ওপরে জুলুম করার শামিল। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-
وَلاَ تَدْعُ مِن دُونِ اللّهِ مَا لاَ يَنفَعُكَ وَلاَ يَضُرُّكَ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ
“আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো বস্তুকে ডেকো না; যা তোমার উপকার ও ক্ষতি করতে পারে না। তারপরও যদি তুমি তাই কর, তখন অবশ্যই তুমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা ইউনুস: ১০৬)
জুলুম সম্পর্কে আল-হাদিসে বলা হয়েছে-
سُئِلَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، أَيُّ الذَّنْبِ عِنْدَ اللهِ أَكْبَرُ قَالَ : أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهْوَ خَلَقَكَ
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো: সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর সঙ্গে র্শিক করা যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সহীহ আল-বুখারী)
শিরক মানুষের সকল আমলকে নষ্ট করে দেয়, এ জন্য শিরক থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, اجْتَنِبُوا الْمُوبِقَاتِ الشِّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ “তোমরা ধ্বংসাত্মক শিরক ও জাদু থেকে নিজেকে বিরত রাখো।” (সহীহ আল-বুখারী)
যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না, বরং তার আবাস হবে জাহান্নামে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে-
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ
“নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরিক করে, তার ওপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়েদা: ৭২)
র্শিকের পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন-
وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ “আর যে আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল।” (সূরা আল-হাজ্জ: ৩১)
(২) বান্দার সাথে সম্পর্কিত জুলুম: বান্দার সাথে জুলুম করা তিন প্রকার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, “তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান তোমাদের ওপর হারাম করা হলো।” এ বক্তব্যের আলোকে অন্যায়ভাবে মানুষের রক্তপাত করলে বা আঘাত দিলে, অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করলে এবং সম্মানহানি করলে তার ওপরে জুলুম করা হবে। যারা জুলুম করে তাদের আল্লাহ কখনোই ভালোবাসেন না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَاللهُ لَا يُحِبُّ الظَّالِمِينَ “আল্লাহ জালেমদের কখনোই ভালোবাসেন না।” (সূরা আলে ইমরান: ৫৭ ও সূরা আশ শূরা: ৪০)
সাধারণত পৃথিবীতে ধনীরা গরিবের ওপর, মালিকরা শ্রমিকের ওপর, শক্তিশালীরা দুর্বলের ওপর, ঊর্ধ্বতনরা অধীনস্থদের ওপর এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা বিরোধীদের ওপরে জুলুম করে থাকে। পৃথিবীর সর্বত্রই শক্তিশালীদের হাতে দুর্বলদের নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। যারা জুলুম করছে তারা সবাই ফেরাউন, নমরূদ, হামান, কারূন, আবু জেহেল, আবু লাহাব, উতবা, শায়বাদের উত্তরসূরি। পূর্ববর্তী জালেম শাসকদের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও শিশুরাও কেউ রেহাই পায়নি। বর্তমানেও তাদের উত্তরসূরিদের হাত থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। অধীনস্থ অসহায় এতিম-দুর্বলের ওপর অত্যাচারের কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতে বহু অত্যাচারী শাসক ও জাতি-গোষ্ঠীকে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছেন। যারা বিশ^ মানবতার কাছে কিয়ামত পর্যন্ত ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَقَدْ أَهْلَكْنَا الْقُرُونَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَمَّا ظَلَمُوا “আর অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, যখন তারা জুলুম করেছে।” (সূরা ইউনুস: ১৩)
সারা বিশ্ব আজ জুলুমে ভরে গেছে। সর্বত্র জুলুম আর অবিচার বিস্তার করেছে। অত্যাচারী শাসকরা দুর্বলদের ওপরে চালাচ্ছে অমানবিক নির্যাতন। বিশেষ করে যারা ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহী তাদের ওপরে চালানো হচ্ছে অমানবিক নির্যাতনের স্টিম রোলার। তবে যাদের ওপরে অত্যাচার করা হচ্ছে এর কারণ একটাই তাহলো- এই সকল মানুষ এক আল্লাহর ওপরে ঈমান এনেছে। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, وَمَا نَقَمُوا مِنْهُمْ إِلَّا أَنْ يُؤْمِنُوا بِاللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ “আর তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধুমাত্র এ কারণে যে, তারা মহাপরাক্রমশালী প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।” (সূরা বুরুজ: ৮)

জালিমদের পরিণতি
দুনিয়ার জীবনই মানুষের শেষ জীবন নয়, এর পরে আরো একটা জীবন আছে, তার নাম পরকাল সেখানেই আল্লাহর কাছে দুনিয়ার এই জীবনের সকল কর্মকা-ের হিসাব দেয়া লাগবে। এই বিশ্বাসটা জালেমদের অন্তরে থাকে না বিধায় তারা মনে করে, তাদেরকে কেউ ধরতে পারবে না, অথচ তাদের জুলুমের কারণে সীমাহীন শাস্তি ভোগ করতে হবে। এই জুলুমের পরিণাম যে কত ভয়াবহ হবে আল-কুরআনের পাতা খুললে হৃদয় শিহরিয়ে ওঠে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ (৪২) مُهْطِعِينَ مُقْنِعِي رُءُوسِهِمْ لَا يَرْتَدُّ إِلَيْهِمْ طَرْفُهُمْ وَأَفْئِدَتُهُمْ هَوَاءٌ (৪৩) وَأَنْذِرِ النَّاسَ يَوْمَ يَأْتِيهِمُ الْعَذَابُ فَيَقُولُ الَّذِينَ ظَلَمُوا رَبَّنَا أَخِّرْنَا إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ نُجِبْ دَعْوَتَكَ وَنَتَّبِعِ الرُّسُلَ أَوَلَمْ تَكُونُوا أَقْسَمْتُمْ مِنْ قَبْلُ مَا لَكُمْ مِنْ زَوَالٍ (৪৪)
“জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে করো না, তাদেরকে তো ঐদিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফারিত হবে। তারা মস্তক ওপরে তুলে ভীত-বিহবল চিত্তে দৌড়াতে থাকবে। তাদের দিকে তাদের দৃষ্টি ফিরে আসবে না এবং তাদের অন্তর উড়ে যাবে। মানুষকে ঐ দিনের ভয় প্রদর্শন করুন, যেদিন তাদের কাছে আজাব আসবে। তখন জালেমরা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে সামান্য মেয়াদ পর্যন্ত সময় দিন, যাতে আমরা আপনার আহবানে সাড়া দিতে এবং পয়গম্বরগণের অনুসরণ করতে পারি। তোমরা কি ইতঃপূর্বে কসম খেতে না যে, তোমাদেরকে দুনিয়া থেকে যেতে হবে না?” (সূরা ইবরাহীম: ৪২-৪৪)
জালেমদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেছেন
إِنَّمَا السَّبِيلُ عَلَى الَّذِينَ يَظْلِمُونَ النَّاسَ وَيَبْغُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ “অভিযোগ কেবল তাদের বিরুদ্ধে, যারা মানুষের ওপর অত্যাচার চালায় এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে বেড়ায়। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আশ-শূরা: ৪২)
আল-কুরআনে আরো বর্ণিত হয়েছে, وَقِيلَ لِلظَّالِمِينَ ذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْسِبُونَ “এসব জালেমকে বলে দেয়া হবে, এখন সেসব উপার্জনের ফল ভোগ করো যা তোমরা উপার্জন করেছিলে।” (সূরা যুমার: ২৪)

জালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই
যারা সমাজের মানুষের ওপরে জুলুম করে এবং আল্লাহর দ্বীনের কর্মীদের ওপরে অত্যাচার করে তাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না এবং আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমাও করবেন না। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ “আর জালেমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭০, আলে ইমরান : ১৯২, মায়েদা: ৭২)
আল্লাহ তাআলা আরো বলছেন
وَالظَّالِمُونَ مَا لَهُم مِّن وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ‌ “জালেমদের না আছে কোনো অভিভাবক না আছে সাহায্যকারী।” (সূরা আশ-শূরা: ৮)
যারা জুলুমকারী তাদের সাহায্য করা, তাদের সাথে থাকা মস্তবড় অপরাধ। বরং যারা জালেমদের সাহায্য করবে, তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করবে আল্লাহ তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا تَرْ‌كَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ‌ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُ‌ونَ
“জালেমদের দিকে মোটেই ঝুঁকবে না, নতুবা তোমাদেরকেও আগুনে ধরবে। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো বন্ধু নেই। অতএব কোথাও সাহায্য পাবে না।” (সূরা হুদ: ১১৩)

জালেমদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দেন না
যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না, বরং আল্লাহর নির্দেশ ও বিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, আল্লাহর দ্বীনের পথে যারা কাজ করে তাদের ওপরে অন্যায়ভাবে অত্যাচার করে তারা জালেম। আর আল্লাহ তাআলা এসকল জালেমকে হেদায়াত দেন না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলছেন-
اللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ وَ “আল্লাহ এ রকম জালেমদের হিদায়াত দান করেন না।” (সূরা আল-বাকারা: ২৫৮, আলে ইমরান: ৮৬)

জালেমদের দুনিয়ার শাস্তি
যারা আল্লাহর সাথে শিরক করবে, দ্বীনের বিরুদ্ধাচরণ করবে, দ্বীনের কর্মীদের ওপরে অত্যাচার করবে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার জীবনে তাদের লাঞ্ছিত-অপমানিত করবেন। আল্লাহ বলছেন, وَإِنَّ لِلَّذِينَ ظَلَمُوا عَذَابًا دُونَ ذَلِكَ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ “আর সেদিনটি আসার আগেও জালেমদের জন্য একটা আজাব আছে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।” (সূরা আত-তুর: ৪৭)
ইতঃপূর্বে যারা ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলো, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপরে অত্যাচার করেছিলো তাদেরকে আল্লাহ তাআলা ধ্বংস করেছিলেন, তাদের সেই স্মৃতি পৃথিবীর বুকে রেখে দিয়েছেন যা দেখে অনেক মানুষ আজো হেদায়েত হয়ে যায়। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (৫০) فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ مَكْرِهِمْ أَنَّا دَمَّرْنَاهُمْ وَقَوْمَهُمْ أَجْمَعِينَ (৫১) فَتِلْكَ بُيُوتُهُمْ خَاوِيَةً بِمَا ظَلَمُوا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ (৫২)
“এ চক্রান্ত তো তারা করলো এবং তারপর আমি একটি কৌশল অবলম্বন করলাম, যার কোনো খবর তারা রাখতো না। অবশেষে তাদের চক্রান্তের পরিণাম কী হলো দেখে নাও। আমি তাদেরকে এবং তাদের সমগ্র জাতিকে ধ্বংস করে দিলাম। ঐ যে তাদের গৃহ তাদের জুলুমের কারণে শূন্য পড়ে আছে, তার মধ্যে রয়েছে একটি শিক্ষণীয় নিদর্শন যারা জ্ঞানবান তাদের জন্য।” (সূরা আন-নামল: ৫০-৫২)
আল্লাহ তাআলা আরো বলছেন-
فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظَّالِمِينَ (৪০) وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يُنْصَرُونَ (৪১) وَأَتْبَعْنَاهُمْ فِي هَذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ هُمْ مِنَ الْمَقْبُوحِينَ (৪২)
“অতঃপর আমি তাকে ও তার বাহিনীকে পাকড়াও করলাম, অতঃপর আমি তাদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম অতএব, দেখ জালেমদের পরিণাম কী হয়েছে। আমি তাদেরকে নেতা করেছিলাম। তারা জাহান্নামের দিকে আহবান করত। কিয়ামতের দিন তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। আমি এই পৃথিবীতে অভিশাপকে তাদের পশ্চাতে লাগিয়ে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন তারা হবে দুর্দশাগ্রস্ত।” (সূরা কাসাস: ৪০-৪২)
জুলুমকারী ব্যক্তিরা সীমালঙ্ঘনকারী। এই সীমালঙ্ঘনের অপরাধে আল্লাহ ফেরাউনকে লোহিত সাগরের পানিতে ডুবিয়ে মেরেছেন। আল-কুরআনের এরশাদ হয়েছে-
وَعَادًا وَثَمُودَ وَقَدْ تَبَيَّنَ لَكُمْ مِنْ مَسَاكِنِهِمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَكَانُوا مُسْتَبْصِرِينَ (৩৮) وَقَارُونَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ (৩৯)
“আর আমি আদ ও সামুদকে ধ্বংস করেছি। তাদের বাড়ি-ঘরই তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ। শয়তান তাদের কাজকে তাদের সামনে আকর্ষণীয় করে রেখেছিল। অথচ তারা নিদারুণ বিচক্ষণ ছিল। কারূন, ফেরাউন এবং হামানকেও ধ্বংস করেছি।” (সূরা আনকাবুত: ৩৮-৩৯)

فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (৪০)
“অতঃপর তাদের সবাইকেই আমি (তাদের) নিজ নিজ পাপের কারণে পাকড়াও করেছি, তাদের কারো ওপর প্রচ- ঝড় পাঠিয়েছি, কাউকে মহাগর্জন এসে আঘাত হেনেছে, কাউকে আমি জমিনের নিচে গেড়ে দিয়েছি, আবার কাউকে আমি (পানিতে) ডুবিয়ে দিয়েছি।” (সূরা আনকাবুত: ৪০)

জালেমদের পরকালীন শাস্তি
যারা মজলুমের ওপরে অত্যাচার করেছে, সমাজের অসহায় মানুষদের ওপরে জুলুম করেছে, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করেছে এ সকল জালেমকে আল্লাহ তাআলা কঠিন শাস্তি দিবেন এবং এদের আজাব হালকা করা হবে না। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, وَإِذَا رَأَى الَّذِينَ ظَلَمُوا الْعَذَابَ فَلَا يُخَفَّفُ عَنْهُمْ وَلَا هُمْ يُنْظَرُونَ “জালিমরা যখন একবার আজাব দেখে নেবে তখন তাদের আজাব আর হালকা করা হবে না এবং তাদেরকে এক মুহূর্তের জন্য বিরামও দেয়া হবে না।” (সূরা আন-নাহল: ৮৫)
যে বা যারাই দুর্বল ও এতিমের সম্পত্তি গ্রাস করবে, জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে কোনো মানুষকে হত্যা করবে, কোন নারীকে গণধর্ষণ করবে, রাতের অন্ধকারে বিষ প্রয়োগ করে পুকুরের মাছ মেরে ফেলে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে ফেলবে ও মানুষের বাড়ি-ঘরে হামলা চালিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করবে, তাদের কাউকে আল্লাহ মাফ করবেন না বরং তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে কঠিন শাস্তি। আল্লাহ বলেন-
وَأَخَذْنَا الَّذِينَ ظَلَمُوا بِعَذَابٍ بَئِيسٍ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ
“আর যারা জুলুম করেছে তাদেরকে কঠিন আজাব দ্বারা পাকড়াও করলাম। কারণ, তারা পাপাচার করত।” (সূরা আরাফ: ১৬৫)

জালেমরা আখেরাতে হবে হতদরিদ্র:
যারা মানুষের ওপরে জুলুম করেছে, মানুষের হক নষ্ট করেছে, অন্যায়ভাবে মানুষকে আঘাত করেছে তারা হতদরিদ্র। কারণ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাদের দুনিয়ার জীবনের ভালো আমলের মাধ্যমে তাদের দ্বারা অত্যাচারিত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করে দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ ্র أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ গ্ধ. قَالُوا الْمُفْلِسُ فِينَا مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ وَلاَ مَتَاعَ. فَقَالَ ্র إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِى يَأْتِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَةٍ وَصِيَامٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِى قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْضَى مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِى النَّارِ-
“হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি জান গরিব কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নেই সে হলো গরিব লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো গরিব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে উঠবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল আত্মসাৎ করেছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত ব্যক্তিকে সেদিন তার নেক আমলনামা দিয়ে দেয়া হবে। আর যখন পাওনাদারদের হিসাব চুকানোর পূর্বেই নেক আমল শেষ হয়ে যাবে, তখন পাওনাদারদের গুনাহ তার আমল নামায় যোগ করা হবে। এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (সহীহ মুসলিম)
কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন জালিমের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে
দুনিয়ার জীবনে যে জুলুম করে মানুষের জিনিস হাতিয়ে নেবে, মানুষের কোন কিছু জোর করে দখল করে নেবে, এমনকি এক বিঘত পরিমাণ জমিন যদি জোর করে নিয়ে নেয় কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত তবক পরিমাণ জমিন ঝুলিয়ে দেয়া হবে। আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ سَعِيدِ بْنِ زَيْدٍ قَالَ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مَنْ أَخَذَ شِبْرًا مِنَ الأَرْضِ ظُلْمًا طُوِّقَهُ إِلَى سَبْعِ أَرَضِينَ
“হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুলুম করে কারো এক বিঘত পরিমাণ জমি অন্যায়ভাবে দখল করে নেয়, কিয়ামত দিবসে এর সাত তবক জমিন তার গলায় বেড়ি বানিয়ে দেয়া হবে।” (সহীহ আল বুখারি ও মুসলিম)
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ سَالِمٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم : مَنْ أَخَذَ مِنَ الأَرْضِ شَيْئًا بِغَيْرِ حَقِّهِ خُسِفَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِلَى سَبْعِ أَرَضِينَ.
“হযরত সালেম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায় করে কারো কাছ থেকে জমিনের কোন কিছু দখল করে নেয়, কিয়ামের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে।” (সহীহ আল-বুখারী)

জালিম ও মজলুম উভয়কে সাহায্য করতে হবে
একজন মুমিন-মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে, দুনিয়ার জীবনে যারা মজলুম তাদেরকে সাহায্য করতে হবে এবং যারা জালিম তারা যাতে জুলুম করতে না পারে সে জন্য চেষ্টা করতে হবে। এ কাজ করতে পারলে জালিম ও মজলুম উভয়কেই সাহায্য করা হবে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَنَسٍ رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ أَنْصُرُهُ إِذَا كَانَ مَظْلُومًا أَفَرَأَيْتَ إِذَا كَانَ ظَالِمًا كَيْفَ أَنْصُرُهُ قَالَ تَحْجُزُهُ أَوْ تَمْنَعُهُ مِنْ الظُّلْمِ فَإِنَّ ذَلِكَ نَصْرُهُ
“হযরত আনাস (রা) সূত্রে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অত্যাচারী এবং নির্যাতিত উভয়কে সাহায্য কর। জনৈক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! নির্যাতিত ব্যক্তিকে সাহায্য করার কথা তো বুঝলাম, কিন্তু জালেমকে কিভাবে সাহায্য করবো? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, জুলুমের গতি প্রতিরোধ কর অথবা তাকে বাধা প্রদান কর। এভাবেই তাকে সাহায্য করা হবে।” (সহীহ আল-বুখারী)
জুলুম করা মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলা হারাম করে দিয়েছেন। এ জন্য যে ব্যক্তি জুলুম করে আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত হন। আল্লাহ নিজেও নিজের ওপর জুলুমকে হারাম করেছেন, কাজেই আমাদেরকেও জুলুম করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي ذَرٍّ رضي الله عنه عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه و سلم فِيمَا رَوَى عَنْ اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى أَنَّهُ قَالَ: يَا عِبَادِي إِنِّي حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِي وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا فَلَا تَظَالَمُوا –
হযরত আবু যর (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন: আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন। হে আমার বান্দাহ! আমি আমার ওপর জুলুমকে হারাম ঘোষণা করলাম, সুতরাং তোমাদের মাঝেও জুলুমকে হারাম করে দিলাম। সুতরাং তোমরা একে অন্যের ওপর জুলুম করো না। (মুসলিম)

মজলুম ব্যক্তির দোয়া কবুল করা হয়
দুনিয়ার জীবনে যাদের ওপরে জুলুম করা হয়, যাদের অপরাধ না থাকার পরেও তাদের ওপরে দোষ চাপিয়ে তাদের ওপরে অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়। এই অত্যাচারিত ব্যক্তি যদি আল্লাহর কাছে দোয়া করে আল্লাহ সে দোয়া কবুল করে নেন। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه و سلم دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ مُسْتَجَابَةٌ وَإِنْ كَانَ فَاجِرًا فَفُجُورُهُ عَلَى نَفْسِهِ –
“হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, মজলুম ব্যক্তির দোয়া গৃহীত হয়, যদিও সে গুনাহগার। তার গুনাহ তার ওপরই বর্তাবে।” (মুসনাদে আহমদ)
আল-হাদিসে আরো বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَنَس بْنَ مَالِكٍ رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه و سلم اتَّقُوا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ وَإِنْ كَانَ كَافِرًا فَإِنَّهُ لَيْسَ دُونَهَا حِجَابٌ
“হযরত আনাস (রা) হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মজলুমের বদ দোয়াকে ভয় কর। যদিও সে কাফের হয়, কেননা মজলুম ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।” (মুসনাদে আহমদ)

তিন প্রকার মানুষের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন এর মধ্যে মজলুম অন্যতম। মজলুম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে সে দোয়া আল্লাহ কবুল করে নেন। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه أَنَّ النَّبِيَّ قَالَ ثَلَاثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَاتٌ لَا شَكَّ فِيهِنَّ دَعْوَةُ الْوَالِدِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ
“হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন: নিঃসন্দেহে তিন প্রকারের দোয়া গৃহীত হয়। (১) পিতা-মাতার দোয়া, (২) মুসাফিরের দোয়া, (৩) মজলুম তথা নির্যাতিত ব্যক্তির দোয়া।” (সুনান আবু দাউদ)
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তিন প্রকারের দোয়া প্রত্যাখ্যান করেন না, এর মধ্যে মজলুম অন্যতম।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه و سلم ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ وَالْإِمَامُ الْعَادِلُ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا اللهُ فَوْقَ الْغَمَامِ وَيَفْتَحُ لَهَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ وَيَقُولُ الرَّبُّ وَعِزَّتِي لَأَنْصُرَنَّكِ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ –
“হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন: তিন শ্রেণীর লোকের দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না। (১) রোজাদারের দোয়া যতক্ষণ না তিনি ইফতার করেন, (২) ন্যায়পরায়ণ নেতা বা বাদশার দোয়া (৩) মজলুম বা নির্যাতিত ব্যক্তির দোয়া। আল্লাহ এই ব্যক্তির দোয়া মেঘমালার ওপরে নিয়ে যান এবং তার জন্য আকাশের দরজা খুলে দেন। আল্লাহ তার ইজ্জতের শপথ করে বলেন, বিলম্বে হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করবো।” (সুনান আত-তিরমিযী)
পরিশেষে বলা যায়, যারা আল্লাহর সাথে শিরক করবে, অন্যায়ভাবে মানুষের হক নষ্ট করবে, মানুষের ওপরে জুলুম করবে, আল্লাহর দ্বীনের দায়ীদের ওপরে আঘাত করবে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করবেন না বরং দুনিয়ায় তাদের লাঞ্ছিত করবেন এবং আখেরাতে জুলুমের কারণে তাদের ভালো আমল সব নষ্ট হয়ে যাবে এবং তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে জুলুম-নির্যাতনের মতো কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: গবেষক ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply