জেগে উঠুক বিজয় দিবসের চেতনা

মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক|

১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ বিজয় দিবস এলেই মুক্তিযুদ্ধের বিগত ৯ মাসের স্মৃতি ভেসে ওঠে। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে লাখো কোটি শব্দে এবং অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শুকরিয়া জ্ঞাপন করি যে, তিনি আমাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছিলেন এবং অন্তরকে মুক্তিযুদ্ধমুখী করেছিলেন; তাই আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তবে কোটি কোটি মুক্তিযোদ্ধার একজন। ১৯৭২ সাল থেকে নিয়ে ২০১১ সাল পর্যন্ত সময়ে কমপক্ষে পাঁচবার বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বা সরকারের অনুমতিতে অন্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাগণের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশের আগে যাচাই বাছাই করা হয়েছে বলে জানানো হতো। প্রত্যেকবারই মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে তথা কম বা বেশি হয়েছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যেসব বাঙালি সদস্য বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তাদের নামের তালিকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দফতরে আছে। অনুরূপভাবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনী সদর দফতরদ্বয়ে মুক্তিযোদ্ধা বিমান ও নৌসেনাদের বা অফিসারদের তালিকা আছে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যেসব ব্যাটালিয়ন মুক্তিযুদ্ধে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, তাদের সাথ যোগ দেয়া মুক্তিযোদ্ধাগণের তালিকা নিয়েও বিশেষ ঝামেলা নেই। ঝামেলা অন্যত্র তথা : দলীয় রাজনৈতিক কারণে তালিকাভুক্ত হওয়ার বা তালিকাভুক্ত করানোর বা তালিকা থেকে বাদ দেয়ার প্রবণতা অথবা মুক্তিযোদ্ধাগণের পারস্পরিক বৈরী সম্পর্কের কারণে কেউ কাউকে বাদ দেয়ার প্রবণতা অথবা কোনো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম ভুলক্রমে বাদ যাওয়ায় সেই নামটিকে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টাকালে রাজনৈতিক অথবা ব্যক্তিগত বাধার সৃষ্টি ইত্যাদি। অভিযোগ আছে যে, কোনো রকমেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি বা এমনকি পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, এমন প্রচুরসংখ্যক ব্যক্তিও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তৎকালীন (১৯৭২) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের স্বাক্ষর করা সনদপত্র সংগ্রহ করেন অথবা মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর স্বাক্ষর করা সনদপত্র সংগ্রহ করেন, যেকোনো নীতিবহির্ভূত পন্থায়। ১৯৭২-এর অস্থিতিশীল রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পরিবেশে এ কাজটি ঘটে যায়। তাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাগণের সংখ্যা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অস্ত্র নিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন তারাই একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা, এ কথাটি বিরাট পরিমাপের ভুল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের যুদ্ধ বা গণযুদ্ধ। জনগণের একটি ক্ষুদ্র অংশ অস্ত্র হাতে নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। বাংলাদেশের আপামর জনগণের জীবন হুমকির মুখে ছিল। জনগণের পক্ষে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাগণ সম্মুখসমরে গিয়েছিলেন। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাগণ প্রত্যক্ষভাবে নিজেদের জীবন হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাগণ হাসিমুখে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন অথবা আহত হয়েছেন। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাগণের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিলেন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। সব সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা তো বটেই, বিশেষভাবে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাগণ কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধ করতে পারতেন না, যদি জনগণ সাহায্য-সহযোগিতা-প্রেরণা-উৎসাহ না দিতেন। একটি উদাহরণ দিই। দেশের জনগণ ছিলেন একটি পুকুর বা দীঘি বা বৃহৎ জলাশয়ের পানির মতো। গেরিলাগণ ছিলেন ওই পানিতে মাছের মতো। এটাই নিয়ম। ১৯৩০ এবং ৪০-এর দশকে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্দোলন চলাকালে, লংমার্চ চলাকালে, সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে এই তত্ত্ব বা উপমা বাস্তব ছিল। ১৯৬০ এবং ৭০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনামে ভিয়েতকং গেরিলাদের পরিচালিত যুদ্ধ, আলজেরিয়ায় স্বাধীনতাকামী নেতা বেন বেল্লার নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধ, কাশ্মিরে গত ৬০ বছর ধরে পরিচালিত যুদ্ধ, ১৯৪৮ সালের আগে ১০ বছর যাবৎ মোশে দায়ানের নেতৃত্বে ইসরাইল নামে দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত গেরিলা যুদ্ধ, ১৯৫২ সাল থেকে নিয়ে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত জোরেশোরে পরিচালিত উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ডের গেরিলা যুদ্ধÑ এসব সংঘর্ষের সময় ওই তত্ত্ব বা উপমা বাস্তব ছিল, কারণ এর বিকল্প নেই।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের একাধিক রূপের উদাহরণ দিই। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীগণ ও তাদের পেছনে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ; অতি জনপ্রিয় ও ফলপ্রসূ অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র’-এর উপস্থাপক বা পাঠক এম আর আখতার মুকুল; নৌকার ওই মাঝিগণ যারা গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দিনে বা রাতে ছদ্মবেশে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পার করে দিতেন; গ্রামের মসজিদের ওই সচেতন মুয়াজ্জিন যিনি তাদেরই গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে সাহস ও উৎসাহ দিতেন বা মুসল্লি পরিচয়ে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে সাময়িকভাবে মসজিদে লুকিয়ে রাখতেন; গ্রামের বা শহরের ওই মধ্যবিত্ত গৃহিণী যাকে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা খালাম্মা ডাকত অথবা চাচী ডাকত অথবা আপা ডাকত এবং যেই গৃহিণী কাউকে না জানিয়ে গভীর রাতে নিজের ঘরে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আশ্রয় দিতেন অথবা রান্না করে তাদেরকে ভাত খাওয়াতেন; ওই সাংবাদিকগণ যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অথবা বিদেশী সংবাদ সংস্থার কাছে পৌঁছে দিতেন; ওই স্কুল শিক্ষক যিনি দিনের বেলা পাঠ দান করতেন কিন্তু রাতের বেলা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গিয়ে তথ্য আদান প্রদান করতেন; চট্টগ্রাম বন্দরের ওই কর্মচারীগণ যারা জাহাজে করে বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী কী আসছে সেটা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে জানাতেন, পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের ওই কর্মকর্তাগণ যারা পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে বাংলাদেশের জন্য দায়িত্ব পালন শুরু করেন; ওই বিশিষ্ট নাগরিকগণ বা আইনজীবীগণ বা অধ্যাপকগণ বা বিচারপতিগণ বা চিকিৎসকগণ যারা নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত থেকেও চতুর্দিকে জনগণের মনে ধৈর্যের পরিবেশ, সাহসের পরিবেশ, উৎসাহের পরিবেশ বজায় রাখতেন; ওইসব মহিলা বা ছাত্রী যারা নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবেই দেশের ভেতরে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন বা ভারতের মাটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে সেবা-শুশ্রƒষা করেছেন; ওইসব দুরন্ত কিশোর যারা মাঠে গরু চরানোর নাম করে বা ঘাস কাটার নাম করে বা হানাদার বাহিনীর বাজার করে দেয়ার নাম করে গুপ্তচরের কাজ করত; মাধবপুর থানার তেলিয়াপাড়া গ্রামের আশরাফ আলী দেওয়ানের (১৯৯৫ সালে মরহুম) মতো সচ্ছল গৃহস্থ যিনি তার ১২টি গরু, তিন মণ চাল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তাৎক্ষণিক ব্যয় করলেন এপ্রিল মাসের ১৫ দিনের মধ্যেই; তেমন আরো শত শত গৃহস্থ প্রমুখ।
রাজনীতিবিদগণ কলকাতায় যেমন ব্যস্ত ছিলেন তেমনি কিছুসংখ্যক তরুণ রাজনীতিবিদ বিভিন্ন সেক্টর হেড কোয়ার্টারে ব্যস্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বা পরামর্শ দিয়েছেন বা জনমত সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছেন। ছাত্ররাজনীতিবিদগণ নিজেরাই সশস্ত্রভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন অথবা অনুসারীদের উৎসাহিত করেছিলেন; শ্রমিকগণ জীবিকার তাগিদে শ্রম দিয়েছেন কিন্তু মনের তাগিদে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। মুজিবনগরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার দেশ পরিচালনা করেই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমি যুদ্ধ করেছি আমার সেক্টর কমান্ডারের নেতৃত্বে এবং তার ঊর্ধ্বতন অধিনায়ক ছিলেন প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী। শেষের চার মাস আমি যুদ্ধ করেছি আমার ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের নেতৃত্বে। সব সেক্টর কমান্ডারের প্রতি আমাদের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা। বিশেষ করে প্রথম সেক্টরের প্রথম সেক্টর কমান্ডার তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান যার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা এবং যিনি পরে হয়েছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, তার প্রতি বিশেষ সম্মান। মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় দিতে গিয়ে যতগুলো উদাহরণ দিতে পারলাম ততোধিক উদাহরণ স্থানাভাবে দিতে পারলাম না! তাই আমার মতো হাজার হাজার লোকের মত হচ্ছে, ১৯৭১-এর বাংলাদেশের কোটি জনতাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা; মাত্র কয়েক হাজার ছিল পাকিস্তান সমর্থক বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ বা কোটি কোটি বাঙালি প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রথম থেকে নিয়ে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত, মুক্তিযোদ্ধারাই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদেরকে ব্যস্ত রাখেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ভারতের মাটিতে। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে করে পাকিস্তানিদের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে এটা সত্য, তবে শুধু ওই রূপ অস্ত্র দিয়েই যুদ্ধ পরিচালিত হয়নি। বিশেষত বিভিন্ন সেক্টরে এবং ফোর্সগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের পোশাক, অস্ত্র, যানবাহন ইত্যাদি সরবরাহ করে ভারত সরকার। প্রায় এক কোটি বাঙালি ভারতের তিনটি প্রদেশ যথা পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় আশ্রয় গ্রহণ করে, তাদেরকে ভরণ-পোষণ দেয় ভারত সরকার। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এরূপ উদার সহযোগিতা দেয়া বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে এরূপ অনুকূলীয় অবস্থান গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে বিরল। ভারত যদি বাংলাদেশকে তথা মুক্তিযোদ্ধাগণকে এরূপ সহযোগিতা না দিত তাহলে কী হতো? অপর পক্ষে মুক্তিযোদ্ধাগণ তথা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার চিন্তাক্লিষ্ট ছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধ কত দিন চলবে বা চালানো সম্ভব হবে? এরূপ প্রেক্ষাপটে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। তাই ডিসেম্বর ১৯৭১-এর প্রথম সপ্তাহে (৩ ডিসেম্বর) ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যেটা পূর্ব পাকিস্তান ছিল সেটাই তো ছিল বাংলাদেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশকে পাকিস্তান বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করার নিমিত্তেই ভারত প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা শুরু করে। যদি ভারত প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করত তাহলে মুক্তিযুদ্ধ কত দিন চলত, এর উপকার এবং অপকার কী হতোÑ এই ধরনের প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া খুব কঠিন বা পেতে গেলেও দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন।
আমি একজন সৈনিক হিসেবে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাণ দান করেছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই; যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, ইজ্জত হারিয়েছেন, সম্পদ হারিয়েছেন তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানাই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালি প্রাণ দান করেছেন। এই ৩০ লাখ শহীদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা। দুই লাখ মা-বোন তাদের ইজ্জত হারিয়েছেন হানাদার বাহিনী ও তাদের সঙ্গীদের হাতে, তাদেরকে শ্রদ্ধা জানাই। বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমি ভাটিয়ারিতে আমি (তথা আমার নেতৃত্বে তৎকালীন অফিসার সম্প্রদায় ও সুবেদার মেজর কামাল উদ্দিনসহ সবার সহযোগিতায়) যেই ভাস্কর্য নির্মাণ করেছি (নাম : স্বাধীনতা মানচিত্র) সেখানে সাতটি স্তম্ভ প্রতীকীভাবেই সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ সব মুক্তিযোদ্ধার কথা মনে করিয়ে দেয়।
মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে যেসব ভারতীয় সৈনিক বাংলার মাটিতে রক্ত দান করেছেন, সেসব সহযোদ্ধাকে অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানাই। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ৪০৬১ জন অফিসার, জেসিও, সৈনিক যুদ্ধাহত হয়েছিলেন এবং ১৫২৫ জন অফিসার, জেসিও, সৈনিক নিহত হয়েছেন। অপরপক্ষে পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে যারা সারেন্ডার বা আত্মসমর্পণ করেছিলেন ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ তাদের মোট সংখ্যা হচ্ছে ৯১ হাজার, ৫৬৬৯৪ জন সামরিক ব্যক্তি, ১২১৯২ জন আধা-সামরিক ব্যক্তি ও বাকিরা বেসামরিক ব্যক্তি। এই সংখ্যাগুলোয় ভারতের ক্ষয়ক্ষতি ও পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের তথ্যগুলো দেয়া আছে একটি পুস্তকে নাম : ইন্ডিয়ান আর্মি আফ্টার ইন্ডিপেন্ডেন্স; লেখক : মেজর কে সি প্রভাল, প্রকাশক লান্সার ইন্টারন্যাশনাল, প্রথম প্রকাশ ১৯৮৭ সাল।
যা হোক, বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী হচ্ছে ভারত। বাংলাদেশের সীমান্তের পঁচানব্বই ভাগ হচ্ছে ভারতের সাথে এবং মাত্র পাঁচ ভাগ হচ্ছে বার্মা বা মিয়ানমারের সাথে। বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর আগস্ট পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল অতি উষ্ণ, ভারতের ওপর নির্ভরশীল কিন্তু বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগতভাবেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষার প্রধান উপাত্ত ছিলেন। মোশতাক, সায়েম ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সালের মে পর্যন্ত ছিল উষ্ণতা বহাল রেখে আনুষ্ঠানিক সম্মানজনক সম্পর্ক সৃষ্টির প্রয়াস। জেনারেল এরশাদের আমলে ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সম্পর্ক প্রকাশ্যে ছিল না অতি উষ্ণ না অতি শীতল; অপ্রকাশ্যে ভারতের ওপর ক্ষীণভাবে নির্ভরশীল। খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ছিল ভারতের প্রতি শীতল বন্ধুত্বের সময়। শেখ হাসিনার আমলে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ছিল অতীতের উষ্ণ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের কাল। খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় আমলে ২০০১ থেকে ২০০৬ ছিল ভারতের প্রতি শীতল বন্ধুত্ব ও ভারতনির্ভরতা কমিয়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে দৃষ্টি প্রশস্ত করার সময়। ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ থেকে ২০০৮ ছিল নাতিশীতোষ্ণ কিন্তু অপ্রকাশ্যে ভারতনির্ভর বা প্রকাশ্যেই ভারতের বন্ধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর। শেখ হাসিনার দ্বিতীয় আমলে ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত পারস্পরিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক আগ্রাসী পর্যায়ের অর্থাৎ এগ্রেসিভ ফ্রেন্ডশিপ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে ভারতের কী স্বার্থ কাজ করে থাকতে পারে সেটা অবশ্যই আলোচনার বিষয়। একান্তভাবে ভারতবিরোধীরা বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা এক রকম দৃষ্টিতে আলোচনা করেন। একান্তভাবে ভারত-অনুসারীরা আরেক রকম দৃষ্টিতে আলোচনা করেন। এই নিবন্ধ শেষ করার আগে শুধু এতটুকুই বলতে চাই যে, বিনা স্বার্থে ভারত বাংলাদেশের মাটিকে তাদের রক্ত দিয়ে সিক্ত করেনি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
১৯৭১ সালে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ৩ নম্বর সেক্টরের একজন মুক্তিযোদ্ধা

SHARE

Leave a Reply