জেনেটিকস

গোলাপ মুনীর

জেনেটিকস হচ্ছে প্রাণের জন্ম বা সৃষ্টি কিংবা উদ্ভব এবং বিকশিত হওয়া সম্পর্কিত বিজ্ঞান। একে কেউ কেউ সুপ্রজননবিদ্যা বলেও অভিহিত করেন। জেনেটিকসকে আমরা জিনবিজ্ঞান বা বংশগতি বিজ্ঞান বলতে পারি। জিনবিজ্ঞান জীববিজ্ঞানেরই একটি অংশ। জিন হচ্ছে বংশানুগতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপাদান। বিগত ৫০ বছরে বিজ্ঞানের কোনো ক্ষেত্রেই জেনেটিকসের মতো এত বেশি পরিবর্তন আসেনি। আমাদের দৈহিক ও আচরণগত নানা দিকের উন্মোচন করেছে জেনেটিকস নামের এই বিজ্ঞান। হিউম্যান জেনোম প্রজেক্টের মাধ্যমে আমাদের জিনগত নানা রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। এ অর্জন জেনেটিকসে উল্লেখযোগ্য অর্জন বলতে হবে। জেনেটিকসের ক্ষেত্রে অর্জিত বৈজ্ঞানিক ও প্রাযুক্তিক অগ্রগতি চিরদিনের জন্য পাল্টে দিয়েছে কৃষি, জীববিজ্ঞান, ওষুধবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞানসহ এমনকি নৃবিজ্ঞান ও ডাক্তারি সাক্ষ্যবিজ্ঞানকেও। এক জীবের ডিএনএ আরেক জীবে স্থানান্তর বা সংস্থাপন করে ওই জীবের গঠনগত ও আচরণগত বিষয়-আশয় পাল্টে দেয়া যায়। এভাবে পাল্টে দেয়া যায় প্রাণী, উদ্ভিদ ও ব্যাকটেরিয়াকে। চিকিৎসায় সম্ভব হয়েছে অসাধারণ অগ্রগতি। জীববিজ্ঞানের আধুনিক শাখা জেনেটিকসের এই অসাধারণ অগ্রগতির কথা ভেবে বর্তমান একুশতম শতাব্দীকে চিহ্নিত করা হয়েছে জীববিজ্ঞানের শতাব্দী বলে।
কেন ও কিভাবে মা-বাবার কিংবা দূরাত্মীয়ের বিশেষ কিছু দৈহিক বা আচরণগত বৈশিষ্ট্য কোন ব্যক্তির মধ্যে সঞ্চারিত হয়, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহল কম ছিল না। মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে, কেন বংশানুক্রমে এসব বৈশিষ্ট্যের ধারক-বাহক হয় মানুষ? আর শুধু মানুষই বা বলছি কেন? উদ্ভিদ, পরভুক প্রাণী বা প্যারাসাইট ও আদিপ্রাণী প্রোটোজোয়ার মধ্যেও তো বর্তমান থাকে এসব  বৈশিষ্ট্য। আবার ডিএনএ বা জিনগত জটিলতার কারণে এসব বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্ম হারিয়েও ফেলে। জীব মাত্রের ক্ষেত্রেই এটি কী করে ঘটে, সে প্রশ্নও ছিল মানুষের মধ্যে। এ বিষয়টি মানুষকে বিস্ময়াভিভূত করেছে, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলেছে হাজার হাজার বছর ধরে। এক সময় মানুষ জানতে পারে, প্রত্যেক জীবদেহে থাকে ডিএনএ (ডিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) নামের এক ধরনের অণু। এই অণুই জীবের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, সে নির্দেশ বহন করে। সে নির্দেশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করে এবং সেগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত করে এই ডিএনএ-ই। ডিএনএ কিভাবে এসব কাজ করে তা নিয়ে আলোচনা আর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে জেনেটিকসে।
এ বিষয়ে নানা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে চধহমবহবংরং থেকে খধসধৎপশরংস পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য নানা হেরিডিটি থিওরি বা বংশগতি তত্ত্ব। প্যানজেনেসিস হচ্ছে বংশগতির একটি হাইপথেটিক্যাল মেকানিজম বা প্রকল্পিত বন্দোবস্ত। এ মেকানিজমে কোষগুলো পার্টিকল বা কণাসমূহ ছুড়ে মারে। আর এই কণাগুলো ছড়িয়ে পড়ে গোটা ব্যবস্থায়। বিভাজনের মাধ্যমে কণার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আর এগুলো জমা হয় প্রজনেন্দ্রিয়ে বা অঙ্কুরে। এ প্রক্রিয়ায় ডিম্ব বা অঙ্কুর মা-বাবার দেহের সব অংশের কণাগুলো ধারণ করতে পারে।
আধুনিক জেনেটিকস অবশ্য অগাস্টিনিয়ান আমলের সন্ন্যাসী গ্রেগর মেন্ডেলের বাগানের মটরশুঁটি গাছের বংশানুক্রম চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। মেন্ডেল তার বাগানের মটরশুঁটি নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন, তার বাগানে দুই ধরনের মটরশুঁটি বীজ রয়েছে। কিছু বীজ ছিল বিশুদ্ধ ও মসৃণ। আর কিছু বীজ ছিল কুঁচকানো। তিনি সব সময় বিশুদ্ধ মসৃণ বীজ দেয় এমন মটরশুঁটির এবং সব সময় কুঁচকানো বীজ দেয় এমন মটরশুঁটির আলাদা চাষ করলেন। তিনি এরপর দেখলেন, কুঁচকানোর সঙ্গে কুঁচকানো প্রজনন করালে কুঁচকানো এবং মসৃণের সঙ্গে মসৃণ প্রজনন করালে মসৃণ বীজ পাওয়া যায়। কিন্তু মসৃণের সঙ্গে কুঁচকানো প্রজনন করালে তখনো শুধু মসৃণ বীজই পাওয়া যায়। তখন স্পষ্ট  বোঝা গেল, সুযোগ পেলেই মসৃণ হওয়ার একটা প্রবণতা মটরশুঁটির মাঝে আছে। এই মসৃণ হওয়ার গুণটি একটি বাহক কণার মাধ্যমে বাবা ও মায়ের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে সঞ্চালিত হয়। একটি বাহক কণার মসৃণ হওয়ার গুণ এক ধরনের, আর কুঁচকানো হওয়ার গুণ আরেক ধরনের। সন্তান বাবার কাছ থেকে এ ধরনের একটি কণা পায়, আর মায়ের কাছ থেকে পায় আরেকটি কণা। প্রতিটি গুণের জন্য এমন ধরনের দু’টি কণা সবার মধ্যে থাকে। দু’টি কণাই যদি মসৃণ হওয়ার কণা হয়, তখন সন্তান নিজে মসৃণ হয়। আর দু’টি কণাই যদি কুঁচকানো হওয়ার কণা হয়, তবে সন্তান নিজে কুঁচকানো হয়। কিন্তু একটি কণা মসৃণ আরেকটি কুঁচকানো হলে তখনও সন্তান নিজে মসৃণ হয়। কারণ মসৃণ হওয়াটা একটি মুখ্য গুণ। তাই মসৃণ ও কুঁচকানো উভয় ধরনের কণা থাকলে মসৃণ হওয়ার প্রবণতাই প্রাধান্য পায়।
এ ধরনের দু’টি প্রজননের সময় চার ধরনের পরিস্থিতি হতে পারে। এক. বাবা থেকে মসৃণের কণা ও মা থেকেও মসৃণের কণাÑ এ ক্ষেত্রে সন্তান মসৃণ হবে। দুই. বাবা থেকে মসৃণের কণা ও মা থেকে কুঁচকানোর কণাÑ এ ক্ষেত্রেও সন্তান মসৃণ হবে। তিন. বাবা থেকে কুঁচকানোর কণা আর মা থেকে মসৃণের কণাÑ এ ক্ষেত্রে সন্তান হবে মসৃণ। চার. বাবা ও মা উভয় থেকে কুঁচকানোর কণাÑ শুধু এই একটি ক্ষেত্রেই সন্তান কুঁচকানো হবে। ফলে চারটি ক্ষেত্রের মধ্যে তিনটি সন্তান মসৃণ আর একটি ক্ষেত্রে সন্তান কুঁচকানো হবে। এরপর মেন্ডেল যা দেখালেন, তা আরো চমকপ্রদ। প্রজনন করার সময় তিনি বাবা ও মায়ের দু’টি গুণ এক সাথে নিয়ে দেখালেন সন্তানে গিয়ে সেগুলো কী হয়।
মেন্ডেল বিশুদ্ধ মসৃণ মটরশুঁটি গাছ ও কুঞ্চিত মটরশুঁটি গাছের বংশানুক্রমিক প্রলক্ষণ পরীক্ষা করে আবিষ্কার করেন, বেশির ভাগ বংশানুক্রমিক প্রলক্ষণ বাহিত হয় একটি ডিসক্রিট ফ্যাক্টরের তথা অসম্বন্ধ বা বিযুক্ত বিষয়ের মাধ্যমে। পরে এই ডিসক্রিট ফ্যাক্টরেরই নাম দেয়া হয় জিন। এই কণাসদৃশ জিন বিভিন্ন গুণকে বহন করে প্রতিলিপি হওয়ার মাধ্যমে কোষ থেকে কোষে নিয়ে যায়, পরের প্রজন্মেও নিয়ে যায়। শুধু এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে জেনেটিকস বা বংশগতি বিজ্ঞান আরো অনেক এগিয়ে যায়। এভাবেই মানুষ জানল, জীবের পূর্ব-প্রজন্মের দৈহিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য উত্তর-প্রজন্মে নিয়ে যাওয়ার সেই বাহনই হচ্ছে ডিএনএ।
ডমিনেন্ট অ্যান্ড রেসেসিভ জিন
এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বেরিয়ে আসে জেনেটিকসের মৌল নীতি বা তত্ত্ব। যেমন এসব পরীক্ষায় জানা যায়, বেশির ভাগ অর্গানিজম বা অণুজীবের প্রতিটি জিনে রয়েছে দু’টি করে কপি। একটি আসে প্রতিটি প্যারেন্ট থেকে, আর অপর জিন আসে বিভিন্ন জিনের আকারে বা ধষষবষব-র আকারে। অ্যালিলি এক ধরনের জিন, যা নির্দিষ্ট লোকাসে একটা পর পর অস্তিত্বশীল থাকে। সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা একটি মটরশুঁটি গাছে লম্বা দু’টি লম্বা অ্যালিলি জিন থাকে, সংক্ষেপে যাকে ঞঞ দিয়ে নির্দেশ করা হয়। আর খাটো গাছের থাকে দু’টি খাটো অ্যালিলি, যা নির্দেশ করা হয় দিয়ে। তাদের সন্তানের থাকে একটি লম্বা ও একটি খাটো জিন (ঞঃ) । এই প্রথম প্রজন্ম লম্বা হওয়ার কারণ লম্বা অ্যালিলি ডমিনেন্ট বা প্রধান।
মটরশুঁটি গাছের রেসেসিভ বা প্রচ্ছন্ন প্রলক্ষণ তখনই প্রকাশ পায়, যখন দু’টি রেসেসিভ অ্যালিলি এক সাথে মিলে। কিভাবে একই চেহারার অণুজীব বা ফেনোটাইপ অ্যালিলির (লম্বা প্যারেন্ট আর খাটো অফস্প্রিং) থাকতে পারে জেনোটাইপ অথবা জিন সম্মিলন , এটি তারই একটি উদাহরণ।
মেন্ডেলের গবেষণাকর্ম প্রকাশের ১০০ বছর পর বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন- জিনগুলো গঠিত ডিএনএ নামের ডাবল-হেলিক্যাল (দুইবার পেঁচানো) মলিকিউল দিয়ে। আর এই ডিএনএ গঠিত আমাদের রাসায়নিক বর্ণমালা বা ক্ষার অ্যাডেনিন, থাইমাইন, সাইটোসিন ও গুয়ানিন দিয়ে। ১৯৫৩ সালে ডিএনএ কাঠামো আবিষ্কারের পর পরই ডিএনএ রেপ্লিকেশন অর্থাৎ ডিএনএ প্রতিলিপি  তৈরির একটি পরামর্শ আসে।
হিউম্যান জেনোম প্রজেক্টের লক্ষ্য ছিল ডিএনএ সিকুয়েন্স বা ধারাক্রম ব্যবহার করে আমাদের ক্রোমোজমে (জীব বা উদ্ভিদকোষে থাকা সূক্ষ্ম তন্তুসদৃশ বস্তু) থাকা ৩০০ কোটি ডিএনএর সবগুলোর রহস্য উদঘাটন করা এবং আমাদের সব জিনকে জানা। আমাদের জিনগত গঠনকে ইঁদুর, চিকা, চিংড়ি, মুরগি, কুকুর, ক্ষুদ্র কীট, ফলমাছি ও ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদির জেনোমের সাথে তুলনা করে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন সময়ের সাথে কিভাবে জিনের উদ্ভব ঘটে এবং এর সাথে মানুষের রোগেরই বা সম্পর্ক কী।
জেনেটিক বিপ্লবের আরেকটি শক্তিশালী প্রযুক্তি হচ্ছে পলিমারাসি চেইন রিয়েকশন (পিসিআর)। এই রিয়েকশনের মাধ্যমে ছোট্ট ধ্বংসপ্রাপ্ত নমুনা থেকে বিপুল সংখ্যায় ডিএনএ সিকুয়েন্স তথ্য পাওয়া যায়। পিসিআর অপরাধ তদন্তে এক অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে অপরাধ স্থলে রেখে যাওয়া রক্ত, বীর্য অথবা চামড়া (এমনকি এক দশক সময় আগে রেখে যাওয়া) পরীক্ষা করে অপরাধীদের ধরা ও নির্দোষ ব্যক্তিকে অভিযোগ থেকে রেহাই দেয়া যায়। এই প্রযুক্তি মানুষের বংশ পরিচয় এবং অনেক প্রজাতির উদ্ভবের ইতিহাসকেই পাল্টে দিচ্ছে। ধ্বংসাবশেষ ও ফসিলের ডিএনএ পরীক্ষা করে এসব নতুন করে জানা যাচ্ছে। অন্যান্য নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেও পিসিআরের তুলনায় আরো দ্রুত এসব প্রমাণ করা যাচ্ছে।
¬ডিএনএ থেকে অতীত জানা
আজকের এই আমি ও আপনার মধ্যে যে ডিএনএ বার্তা রয়েছে, তা কিন্তু আপনার আমার জীবদ্দশায় সৃষ্টি হয়নি। এই ডিএনএ বংশানুক্রমে এসেছে সুদূর অতীতের আমাদের পূর্ব-প্রজন্ম তথা পূর্বপুরুষ থেকে। কাজেই আজকের প্রজন্মের মাঝে অতীতের পরিচয় থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। ডিএনএর গঠন উদঘাটন করে এর সিকুয়েন্সিং করতে পারার পর আমরা অতীতকে উন্মোচন করার সুয়োগ পেয়েছি। আজকের মানুষের ডিএনএর মধ্যে মিল-অমিল লক্ষ করে  বোঝা যায়, তাদের সবার পূর্বপুরুষেরা কত নিকট অতীত বা দূর অতীতে ছিল। কারণ বংশধরদের মধ্যে ডিএনএর পার্থক্য দেখা যায় কালক্রমে তার বিভিন্ন জিনের ডিএনএর মিউটেশন জমতে জমতে। যত বেশি কাল অতিক্রান্ত হবে, তত বেশি এই পার্থক্য দেখা দেবে। এভাবে আমরা অতীতের দিকে যেতে যেতে আজকের ডিএনএ পরীক্ষা করে বহু লক্ষ বছর আগের যুগের কথা জানতে পারি।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
আমরা এখন ব্যবহার করার মতো যে প্রাচীন ডিএনএ সংগ্রহ করতে পারছি, তা এক লাখ বছরের বেশি আগের নয়। এর আরো আগের সময়ের ডিএনএ সংগ্রহ করা যাবে কি না, তা এক কঠিন প্রশ্ন। বিষয়টি জিনবিজ্ঞানের জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ। তবে আশা করা যায়, সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একদিন জিনবিজ্ঞান সক্ষম হবে। আমরা একদিন অতিক্রম করতে পারব লক্ষ বছরের আজকের এই সময়সীমা। এ পর্যন্ত বেশি অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে মাইটোকড্রিয়াল ডিএনএর বেলায়। নিউক্লিয়াসে থাকা মূল ডিএনএর বিশ্লেষণ বেশি সম্ভব হয়নি এর কার্যকর ডিএনএ পাওয়া না যাওয়ায়। বরফের মধ্যে পাওয়া ম্যামথের ৪০ হাজার বছরের পুরনো দেহাবশেষে নিউক্লিয়াস ডিএনএ বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে। এ সময়সীমা অতিক্রম করাও জিনবিজ্ঞানের জন্য চ্যালেঞ্জ।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply