জৈব অস্ত্রের সাতকাহন- আহমেদ আফগানী

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে পুরো পৃথিবী থমকে গেছে। এটা কি শুধু একটা ভাইরাস নাকি ল্যাবের গবেষণাগারে তৈরি হওয়া মডিফায়েড ভাইরাস এই বিতর্ক চলছে একেবারে সংক্রমণের শুরু থেকেই। যদিও নিশ্চিত নয় তবে বেশির ভাগ গবেষকই বলছেন এটা উহানের ল্যাবে উৎপাদিত ভাইরাস। আমাদের আজকের আলোচনা জীবাণু অস্ত্র নিয়েই হবে। অবাক করা তথ্য হলো জীবাণু অস্ত্রের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঢাকায়।
ড. ফ্রান্সিস বয়েল দাবি করেন, কানাডার ল্যাবরেটরি থেকে ভাইরাস চুরি করে তার জিনের বদল ঘটিয়েছে উহানের বায়োসেফটি লেভেল ফোর ল্যাবরেটরি। তিনি ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়েস কলেজের আইনের অধ্যাপক এবং রাসায়নিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ সংগঠনের একজন অন্যতম সদস্য। তিনি জোর গলায় আরো বলেন, সার্স ও ইবোলা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার পরে অভিযোগের আঙুল ওঠে এই গবেষণাগারের দিকেই। রোগ প্রতিরোধ নয়, বরং প্রাণঘাতী জৈব অস্ত্র বানাতেই মত্ত এখানকার গবেষকরা। যার পরিণতি হাজার হাজার মৃত্যু। নোভেল করোনাভাইরাসের জিনগত বদল ঘটানো হয়েছে এবং উহানের এই ল্যাবরেটরি থেকেই যে ভাইরাস ছড়িয়েছে এটা জানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অথচ উহানের এই বায়োসেফটি লেভেল ফোর ল্যাবরেটরিকে সুপার ল্যাবরেটরির আখ্যা দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
২০১৫ সালে রেডিও ফ্রি এশিয়া তাদের রিপোর্টে দাবি করেছিল, উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজিতে ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতী সব ভাইরাস নিয়ে কাজ করছেন গবেষকরা। এর অর্থ জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্রের দিকে ক্রমশ ঝুঁকছে বেইজিং। ‘অরিজিন অব দ্য ফোর্থ ওয়ার্ল্ড ওয়ার’-এর লেখক জে আর নিকিস্ট দাবি করেন, কানাডার পি-৪ ন্যাশনাল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরি থেকে করোনাভাইরাসের স্যাম্পল চুরি করেছে বায়োসেফটি ল্যাবের এক গবেষক। উইন্নিপেগের পি-৪ ন্যাশনাল মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে নিত্য যাতায়াত ছিল ওই গবেষকের। সেখান থেকেই ভাইরাসের নমুনা চুরি করে উহানের ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কানাডার ল্যাবের সেই গবেষক যার সঙ্গে উহানের ল্যাবের যোগসূত্র ছিল তার নাম ফ্রাঙ্ক প্লামার। মহামারী শুরু হওয়ার পর ২ ফেব্রুয়ারি প্লামারের মৃত্যু হয়েছে রহস্যজনকভাবে। উহানের বায়োসেফটি ল্যাবের ১২ জন গবেষকের মধ্যে দু’জন রয়েছেন সন্দেহের তালিকায়। অনুমান করা হচ্ছে, জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ওই ভাইরাস তাদের হাত থেকেই কোনোভাবে লিক হয়ে গেছে উহানের বায়োসেফটি ল্যাব থেকে। বায়োসেফটি ল্যাবে বাদুড় ও মানুষের মধ্যে সংক্রামক রোগ ছড়ায়, এমন জীবাণু নিয়ে গবেষণা চলে। কিভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চোখ এড়িয়ে কোনো ল্যাবে এমন সংক্রামক জীবাণু নিয়ে গবেষণা চলতে পারে!
করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে ডিসেম্বর ’১৯-এর শুরুর দিকে। এরই মধ্যে এই ভাইরাসটি নিজের জিন বদলে ফেলেছে বহুবার! হিউম্যান প্যাথজেনিক ভাইরাসের সংক্রমণজনিত অসুখের গবেষকদের ধারণা, এত কম সময়ের মধ্যে ঘন ঘন জিন মিউটেশন করে নিজের চরিত্র বদলে ফেলছে এই ভাইরাস। তাই একে রুখতে সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ ব্যবহার করা মুশকিল। চীনের উহান থেকেই দ্রæত ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের আরেক প্রজাতি সার্সও ১৮ বছর আগে উদ্বিগ্ন করেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের। এই রোগাক্রান্তদের মধ্যে মারা পড়তেন প্রায় ১০ শতাংশ।
গত তিন মাসের জরিপ অনুসারে, কোভিড-১৯ রোগাক্রান্তদের সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হলে ও শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমেই বাড়িয়ে চললে প্রাণঘাতী হয় না। এই রোগ শিশুদের বিশেষ কোনো ক্ষতি করতে পারে না। শিশুদের তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখা হলে সংক্রমণের ঘটনাও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। মহিলারা কোরোনাভাইরাসের থাবা থেকে কিছুটা নিরাপদ। এর কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, মেয়েদের মধ্যে অটোইমিউন ডিজিজের (শ্বেতী, এসএলই, থাইরয়েড ইত্যাদি) প্রবণতা বেশি হওয়ায় কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা বেশির ভাগ সময়ই জিতে যান। শরীর কোনো না কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলে। তাই আক্রান্ত মেয়েদের মৃত্যুহার অনেক কম। ধূমপায়ী পুরুষদের মধ্যে এই অসুখের মারাত্মক প্রভাব লক্ষ করা গেছে। এই লেখাটি যখন লেখা হচ্ছে ইতোমধ্যে বিশ্বের প্রায় ২ কোটি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় ২ লাখের অধিক মানুষ। হয়তো হিসাবের বাইরেও অনেকে আছেন।

জৈব অস্ত্র কী?
আধুনিক বিজ্ঞান জীবাণু অস্ত্রকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, সেই সাথে জীবাণু অস্ত্রের কার্যকারিতাকে অতীতের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি করতে সক্ষম। যথার্থভাবে প্রয়োগ করতে পারলে মাত্র কয়েক কিলোগ্রাম বোটালিনামের (Botulinum toxin) মত নিউরোটক্সিন দিয়ে সমগ্র মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া সম্ভব যা কিনা একটা ছোটখাটো ল্যাবে উৎপাদন করা সম্ভব। সমসাময়িক জীববিজ্ঞানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোন একটা জীবাণুতে প্রয়োজনীয় জিনগত পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধন এমনভাবে করা সম্ভব যে প্রচলিত প্রতিরোধক কিংবা প্রতিষেধক সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়বে।
কোন একটা বিশেষ ভাইরাসকে একটা নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর জেনোটাইপ লক্ষ করে এমনভাবে বানানো যেতে পারে যাতে করে কেবলমাত্র ঐ জাতিগোষ্ঠীর মানুষই আক্রান্ত হয়। ব্যাকটেরিয়ার বেলায় যক্ষ্মা (Tubercle Bacillus) অথবা এনথ্রাক্সের ((Bacillus Anthracis) প্রতিরোধক টিকা নেয়া থাকলেও নিজেদের নিরাপদ মনে করার কোন কারণ নেই। ল্যাবে এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর জিনোমে নির্দিষ্ট পরিবর্তন ঘটিয়ে টিকা প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বানানো কঠিন কোন কাজ নয়। জিনগত পরিব্যক্তি এখন কেবলমাত্র প্রকৃতির একান্ত খেয়াল নয়, একদল বিজ্ঞানী চাইলেই সেটা করতে পারেন। জৈব অস্ত্র কনভেনশন (BWC) ১৯৭২-এ সবরকম জৈব অস্ত্রের ব্যবহার, উৎপাদন এবং মজুদকরণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং এই কনভেনশন স্বাক্ষরের ১০ বছরের মধ্যে সকল স্বাক্ষরদানকারী পক্ষকে বিদ্যমান অস্ত্রের মজুদ এবং উৎপাদনকারী অবকাঠামো ধ্বংস করতে বলা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ উন্নত রাষ্ট্রই বিশ্বের চোখে ধুলো দিয়ে জৈব অস্ত্রের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
জৈব অস্ত্রে থাকে জৈব উপাদান যা মানুষ, জীবজন্তু এবং উদ্ভিদদের রোগাক্রান্ত করে তোলে। প্রচলিত জৈব উপাদানসমূহকে প্যাথোজেন (pathogens), টক্সিন toxins), জৈবনিয়ন্ত্রণকারী (bio regulators) ও প্রিয়ন (prions)- এই চার শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়।
১. প্যাথোজেন (pathogens) : প্যাথোজেন রোগাক্রান্তকারী অণুজীব যেমন, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস কিংবা রিকেটসিয়া। প্রকৃতিতে বিদ্যমান এবং বিক্ষিপ্ত পরিব্যক্তিসহ কৃত্রিম রিকম্বিনান্ট ডিএনএ তথা আধুনিক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি দ্বারা ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা যায়।
২. টক্সিন (toxins) : এক ধরনের জৈব বিষ যা জীবদেহের (অণুজীব, সাপ, কিট, মাকড়সা, সামুদ্রিক জীব, উদ্ভিদ ইত্যাদি) স্বাভাবিক মেটাবোলিজমের ফলে নির্গত হয়। কৃত্রিম পদ্ধতিতে উৎপাদন করা যায়। টক্সিন দুই রকমের হতে পারে। সাইটোটক্সিন (Cytotoxins) : কোষ বিধ্বংসী, যেমন রিসিন (Ricin)। আরেকটি হলো নিউরোটক্সিন (Neurotoxins) : স্নায়ুতন্ত্র বিকলকারী, যেমন বোটালিনাম টক্সিন।
৩. জৈবনিয়ন্ত্রণকারী (bio regulators) : এক ধরনের জৈবরাসায়নিক কম্পাউন্ড যা কোষ পর্যায়ের কার্যক্রম এবং দেহের সক্রিয় উপাদানসমূহ যেমন এনজাইম ও ক্যাটালিস্টদের নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাভাবিক দেহে স্বল্প পরিমাণে বিদ্যমান হলেও অধিক মাত্রায় রয়েছে নিশ্চিত মৃত্যুর সম্ভাবনা। যেমন, সাবস্ট্যান্স পি (Substance P)।
৪. প্রিয়ন (Prion) : এক ধরনের প্রোটিন যা মস্তিষ্কের কোষে প্রবেশ করে সেখানকার প্রোটিনকে প্রিয়নে রূপান্তর করে যার ফলে একসময় মস্তিষ্কের আক্রান্ত কোষের মুত্যু ঘটে এবং মস্তিষ্কের টিস্যুতে প্রিয়ন ছড়িয়ে দেয়। এই প্রিয়নগুলো মস্তিষ্কের অন্যান্য কোষগুলো আক্রান্ত করে ধ্বংস করে দেয় যার ফলশ্রুতিতে মৃত্যু অনিবার্য। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৬ সালে ব্রিটেনের ম্যাড কাউ (mad cow epidemic) মহামারীর কথা বলা যেতে পারে।

এই অস্ত্র কেন ব্যবহার করা হয়?
আগে জৈব অস্ত্রের মূল ব্যবহার ছিলো সেনাবাহিনীর মাঝে। প্রতিপক্ষ সেনাবাহিনীর মধ্যে প্লেগ, কলেরা ছড়িয়ে দেয়া হতো। এতে জয়লাভ সহজ হতো। বর্তমানের গ্লোবালাইজেশনের যুগে অর্থনীতি, জনসংখ্যা, রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে জৈব অস্ত্রের গোপন ব্যবহার চলছে। সাথে বন্ধনেই যুদ্ধে জৈব অস্ত্রের ব্যবহার। জৈব অস্ত্র ব্যবহার করে চার ধরনের আক্রমণ করা হয়।
১. মানুষ হত্যা : জৈব এন্টি পার্সোনেল উপাদান সরাসরি মানবদেহে ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় যার মধ্যে তাৎক্ষণিক মৃত্যু এবং বিকলাঙ্গতা অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে যেসকল উপাদান ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, রিকেটসিয়া, বায়োরেগুলেটর এবং টক্সিন।
২. পশু পাখি হত্যা : এগুলো গবাদিপশু ও পাখি সম্পদ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে বানানো হয়। বিশেষ রোগ ছড়িয়ে একটা দেশের গবাদি পশু-পাখি নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে সেই দেশের খাদ্য সরবরাহে ক্ষতিসাধন এবং অর্থনীতিতে ধস নামানোই এখানে মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে। অথবা এক ধরনের পশু পাখির বাজার দখলেরও উদ্দেশ্য থাকে।
৩. শস্য বিনষ্ট : একটা দেশের উদ্ভিদ এবং কৃষিকাজে সংশ্লিষ্ট চারা গাছে রোগের বিস্তার ঘটিয়ে খাদ্যসঙ্কট সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে পঙ্গু করা এখানে মূল উদ্দেশ্য যাতে করে জনগণ আমদানি নির্ভর শস্যের উপর নির্ভরশীল হয় এবং বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধাচরণ করার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হারিয়ে ফেলে।
৪. বস্তুবিধ্বংসী : বস্ত্র, চামড়া, রাবার ইত্যাদি বিনষ্টকারী ছত্রাক ছড়িয়ে দিয়ে মজুদ নষ্ট করে অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করা হয়। কিছু ব্যাকটেরিয়া পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ হতে শক্তি সঞ্চয় করে এবং এরা জ্বালানি সরবরাহ লাইন বন্ধ করে দিতে পারে।

পৃথিবীর প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক জীবাণু অস্ত্র গবেষণাগার
১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব সংঘটিত হয়। তারই হাত ধরে কমিউনিস্ট আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একত্রে যুদ্ধ করে জয়ী হয়ে কমিউনিস্টরা পৃথিবীতে আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া দেশগুলোর ভাগ নিয়ে (যেমন জাপান, কোরিয়া) এবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের বিরোধ নিয়মিত হয়। আদর্শবাদী কমিউনিস্টদের উত্থানে শঙ্কিত হয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো। সেই সাথে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানও কমিউনিস্টদের নিয়ে শঙ্কায় থাকে। কারণ উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তানসহ বহু মুসলিম রাষ্ট্র এমনকি আফগানিস্তানেও কমিউনিস্ট আন্দোলন জমে উঠেছিলো। যদিও পাকিস্তানে কমিউনিস্ট নিষিদ্ধ ছিল তারপরও আওয়ামী লীগের আড়ালে কমিউনিস্টরা অ্যাকটিভ ছিল।
কোরিয়া নিয়ে চীন ও আমেরিকার দ্বন্দে কোরিয়া দুই ভাগ হয়ে গেল। সেই দ্বন্দের সূত্র ধরে আমেরিকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ১৯৫৪ সালে একটি সামরিক জোট গঠন করে। এটি South-east Asia Treaty Organization (SEATO) নামে পরিচিত। সিয়াটো চুক্তি ম্যানিলা চুক্তি নামেও পরিচিত। এই সামরিক চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করেছে আটটি রাষ্ট্র। তারা হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। চুক্তি অনুসারে এই রাষ্ট্রগুলো কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই করার প্রস্তুতি নেয়। সিয়াটোর নেতৃত্বে জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণার জন্য একটি রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সদস্য দেশ পাকিস্তানে এই সেন্টার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। সে সময় পূর্ব-পাকিস্তানে কলেরার বেশ প্রকোপ দেখা যায়। তাই এই জীবাণু অস্ত্রের রিসার্চ সেন্টার পূর্ব-পাকিস্তানের ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সেন্টারটির নাম ছিল পাকিস্তান সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি। গিনিপিগ হিসেবে নির্ধারণ করা চাঁদপুরের মতলব উপজেলাকে।
১৯৬০ সালে চঝঈজখ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই সিয়াটো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। এই যুদ্ধে আমেরিকার বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র অর্থাৎ কলেরা ছড়ানোর অভিযোগ ভিয়েতনাম ও চীন করে থাকে। যদিও বলা হয় আমেরিকার সৈন্যদের কলেরা থেকে রক্ষা করার জন্য এই রিসার্চ সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু একটি সামরিক জোট যখন জীবাণু নিয়ে গবেষণা করে তখন সন্দেহ থেকেই যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে কলেরা ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ প্রমাণ করে এই সেন্টারটি জীবাণু অস্ত্র গবেষণার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছিল। এভাবেই পৃথিবীর প্রথম জীবাণু অস্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ল্যাব প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে।
১৯৬৩ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এখানে বিভিন্ন কলেরা টিকার কার্যকারিতার ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। সে সঙ্গে বিভিন্ন ঔষধ, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপরও গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে গেলে এই সেন্টারটির নাম হয় ‘কলেরা রিসার্চ ল্যাব’। এই ল্যাবের ব্যয়ভার বহন করতো সিয়াটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো। এর মধ্যে আমেরিকা ২৫%, ইংল্যান্ড ১৬%, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়া ১৩.৫% এবং বাকিরা ৮% করে খরচ বহন করতো। ১৯৭৭ সালে সিয়াটো ভেঙে যায়। ফলে ফান্ডিংয়ের অভাবে গবেষণাগারটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক এবং বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের এক কমিটি ১৯৭৮ সালে কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিকট প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবটির অনুকূলে সাড়া দিয়ে সরকার জাতীয় সংসদের এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ঈজখ-কে আন্তর্জাতিক এক গবেষণাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এর নাম দেয়া হয় International Centre for Diarrhoeal Disease Research, Bangladesh (ICDDRB)
আইসিডিডিআরবি-এর প্রশাসনিক দায়িত্বভার পালনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি বোর্ড অফ ট্রাস্টি (Board of Trustees) রয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীকে বাংলাদেশ সরকার মনোনয়ন প্রদান করে। এই বোর্ড তিন বছরের জন্য কেন্দ্রের নির্বাহী প্রশাসক হিসেবে একজন পরিচালক নিযুক্ত করে এবং সাধারণত তার কার্যকাল দ্বিতীয়বার নবায়ন করা হয়। এতে কর্মরত বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বর্তমান সংখ্যা প্রায় ১৪০০। বার্ষিক বাজেট প্রায় ১২০ লাখ মার্কিন ডলার যার শতকরা ৮০ ভাগ বেতনবাবদ ব্যয় হয়।
এই গবেষণা কেন্দ্রের সব গবেষণার মূল্যায়ন করার জন্য ‘রিসার্চ রিভিউ কমিটি’ (Research Review Committee) নামক একটি কমিটি রয়েছে। বর্তমানে এর মূল আয়ের উৎস হলো বাংলাদেশ সরকার এবং দেশী-বিদেশী বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর অনুদান। প্রধান দাতাগোষ্ঠীরা হচ্ছে: অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার। আর অর্থসংস্থানে অংশগ্রহণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের মধ্যে রয়েছে: ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, ফোর্ড ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, সাসাওয়াকা ফাউন্ডেশন এবং আরও কিছু বেসরকারি সংস্থা।
খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও এই প্রতিষ্ঠানের বড় অবদান রয়েছে কলেরা নিরাময়ে। এই সেন্টারের উদ্যোগে ১৯৭১ সালে খাবার স্যালাইনের সবচেয়ে কার্যকর ফর্মুলা আবিষ্কৃত হয়। বিজ্ঞানী ও ডা: রফিকুল ইসলামের সেই ফর্মুলা ব্যবহার করে উপকার পায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী ক্যাম্পে থাকা উদ্বাস্তু বাঙালিরা। পঞ্চাশ বছর আগেও কলেরা ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ। কলেরা রিসার্চ ল্যাবের আবিষ্কৃত খাবার স্যালাইন কলেরাকে একেবারে সাধারণ রোগ বানিয়ে ছেড়েছে। বর্তমানে আইসিডিডিআরবি-এর গবেষণা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হয়েছে, এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যক্ষ্মা, শ্বাসরোগ, যৌনরোগ, এইডস, হেপাটাইটিস, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং বিভিন্ন অন্যান্য সংক্রামক রোগ। বাংলাদেশের কারাগারগুলোতেও এই সংস্থাটি য²া নিয়ে কাজ করছে। যাদেরই কাশি আছে তাদের কফ পরীক্ষা করছে এবং কারাগারে তাদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করছে।
জৈব অস্ত্র প্রয়োগের অভিযোগে অভিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ এটাই শেষ নয়। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত কিউবাতে ডেঙ্গু জ্বরে কয়েক লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। ওই সময় কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো অভিযোগ করেছিলেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের জীবাণু অস্ত্রের আক্রমণে। পেন্টাগন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দিয়ে থাকে জীবাণু অস্ত্র নিয়ে গবেষণা করার জন্য। এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে অনুদানপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নামে জীবাণু অস্ত্রের গবেষণাগার গড়ে তোলে। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পোকামাকড়ের মাধ্যমে জীবাণু অস্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের ছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অ্যালগিপ্টি মশার মাধ্যমে আফ্রিকায় ইয়েলো ফিভার ছড়ানো হয়।
এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকা ১৯৬০ সালে জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপে জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। ফলে সেই দ্বীপের জীববৈচিত্র্য যেমন হুমকির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা ছিল, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারতো ফসল উৎপাদনও। শুধু তাই নয়, একই ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়েছে তাইওয়ানে, এমনকি খোদ আমেরিকাতেও। তাইওয়ানের কিয়োডো বার্তা সংস্থা জানায়, তারা মার্কিন সেনাবাহিনীর কিছু নথিপত্র পেয়েছে, যাতে দেখা যায় জাপান, তাইওয়ান ও নিজের দেশের ভেতরেই জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে আমেরিকা। তারা মূলত চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রম অগ্রসরমান দেশগুলোর কথা মাথায় রেখে এ পরীক্ষা চালিয়েছিল। রিপোর্টের দাবি এরকমই। ১৯৬১ থেকে ১৯৬২ সালের মাঝামাঝি সময়ে ধানক্ষেতগুলোতে ‘ৎরপব নষধংঃ ভঁহমঁং’ ছড়িয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এক ডজনেরও বেশিবার এ জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়। এরপর প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয় এ ছত্রাক ধানের উৎপাদনের ওপর কতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। এ ছত্রাকের কারণে ধানগাছে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, কমে যায় ধানের উৎপাদন।
বিশ্বের ৮৫টি দেশে এ ছত্রাকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। আর প্রতি বছর এ ছত্রাকের কারণে যে পরিমাণ ধান নষ্ট হয় তা দিয়ে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ৬০ মিলিয়ন মানুষের খাবারের সংস্থান হতে পারতো। এরপর মার্কিন সরকার নিজেদের কাছে থাকা সব জীবাণু অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৫ সালে একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের মাধ্যমে জীবাণু অস্ত্রের উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ওকিনাওয়া দ্বীপটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত আমেরিকার অধীনে ছিল। এর আগে আমেরিকা হাওয়াই, পুয়ের্তো রিকো ও উটাহ রাজ্যে জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো সংক্রান্ত নথিপত্র নিজেরাই উন্মুক্ত করে দেয়। প্রাপ্ত নথি থেকে আরো জানা যায়, ওকিনাওয়া দ্বীপের নাগো ও সুরিতে জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়।
বর্তমানে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে জীবাণু অস্ত্রের ধারণা একেবারেই বাতিল করে দেয়া যায় না। বেশির ভাগ গবেষকই করোনাভাইরাসকে জীবাণু অস্ত্র মনে করলেও নিশ্চিত না এর জন্য দায়ী কে। এ নিয়ে বিভাজন আছে। একটি অংশ মনে করে যুক্তরাষ্ট্র এর পেছনে থাকতে পারে। নিজেদের অস্ত্রের পরীক্ষা এবং বিশ্বকে একটু টলিয়েও দেয়ার জন্য এই অস্ত্রের প্রয়োগ করেছে। আবার অপর একটি অংশ মনে করছে, চীন নিজেই এর জন্য দায়ী। চীনের ল্যাবরেটরিতে করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণা হচ্ছিল। অসাবধানতাবশত এই জীবাণু পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর বিস্তার ঘটেছে বলে তাদের অভিযোগ।
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply