জ্বরের নাম চিকুনগুনিয়া -ডা: আহমাদ হাবিবুর রহিম

একটি সাম্প্রতিক ঘটনা দিয়ে শুরু করছি। একটি জনপ্রিয় ছাত্র সংগঠনের সাবেক এক কেন্দ্রীয় সভাপতি কিছু দিন আগে চিকুনগুনিয়ার উৎপাতে দারুণ ভুগেছেন। তার জ্বর ছেড়েছে সপ্তাহ কয়েক হলো কিন্তু ব্যথা? সে তো কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না। কি আর করা! গেলেন একজন স্বনামধন্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে। কাতরকণ্ঠে তিনি তার গিঁট ব্যথার কথা চিকিৎসককে জানালেন। কিন্তু চিকিৎসক সাহেবকে কিছুটা উদাসীন মনে হলো। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া গিঁটগুলো একটু হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখলেন না তিনি। রোগী একটু আহত মনেই বললেন, ‘আপনি কি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না!’ ডাক্তার সাহেব মুখে একটা শুষ্ক হাসি টেনে বললেন, ‘চিকনগুনিয়ার ব্যথায় আমি আমার হাত নাড়াতে পারছি না আজ দুই সপ্তাহ। চেম্বার করতে পারিনি টানা পাঁচ দিন!’
চিকুনগুনিয়া এখন টক অব দ্য টাউন। দেশের মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে এসেছে এই রোগ। তীব্র ব্যথা আর উচ্চমাত্রার জ্বর যেন তীব্র ঝড়ের মতো শরীরের ওপর চড়াও হয়। সামান্য কয়দিন পরেই শরীরকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিয়ে আবার উধাও হয়ে যায়। কিন্তু এই অল্প কয়দিনের অসহ্য যন্ত্রণা আর জ্বর শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অনেকদিনের জন্য রেখে যাওয়া শরীরের গিঁট (ঔড়রহঃ) ব্যথার রেশ দারুণভাবেই ভোগায় আক্রান্ত রোগীকে।
আসুন চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে কিছুটা জানার চেষ্টা করি। ডেঙ্গু ও জিকার মতো চিকুনগুনিয়াও একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এটি ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে। আমরা জানি শুধুমাত্র নারী মশারাই কামড়ের মাধ্যমে রোগ ছড়ায়। পুরুষ মশারা কেন কোন রোগ ছড়ায় না এ ব্যাপারে কৌতূহল হলে সেটা না হয় ইন্টারনেট থেকে একটু কষ্ট করে দেখে নিলেন। ১৯৫২ সালে তানজানিয়ায় প্রথম এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ‘চিকুনগুনিয়া’ নামটিও এসেছে সেখানকার মাকোন্ডে নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা কিমাকোন্ডে থেকে, যার অর্থ গিঁটের ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া।
বাংলাদেশে রোগটির প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানায়, ২০০৫-০৬ সালের দিকে একবার ভারতে এই ভাইরাস দেখা যায়। তখন প্রায় ১৪ লাখ মানুষ এ জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। সে সময়েই বাংলাদেশে এটি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। ২০০৮ সালে রাজশাহীর পবা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম এ ভাইরাসের খোঁজ মেলে। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে ঢাকায় এই ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর দেখা মেলে। সাধারণত জুন-জুলাইয়ে বর্ষা শুরু হলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তবে এ বছর বর্ষা মৌসুমের আগেই বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় এর সময়কাল খানিকটা এগিয়েছে।
কিভাবে ছড়ায় চিকুনগুনিয়া?
বৃষ্টির কারণে বাসার আশপাশে ফেলে রাখা মাটির পাত্র, কলসি, বালতি, ড্রাম, ডাবের খোসাতে জমে থাকা বদ্ধ পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে।

এ ধরনের মশা সাধারণত দিনের বেলা বিশেষ করে ভোরবেলা বা সন্ধ্যার সময় কামড়ায়। এ ভাইরাস মশা থেকে মানুষের শরীরে আসে। আবার আক্রান্ত মানুষকে কামড় দিলে মশাও আক্রান্ত হয় এবং সে আবার রোগ ছড়াতে ভূমিকা রাখে। এছাড়াও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস আক্রান্ত রক্ত গ্রহণ করলে এবং ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার সময়ে অসাবধানতাতেও এ রোগ ছড়াতে পারে। সন্তানরা মায়ের দুধ পান করলে সাধারণত চিকুনগুনিয়া রোগ হয় না। তাই আক্রান্ত মায়েদের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটি মোটেও ছোঁয়াচে রোগ নয়।

কী কী উপসর্গ থাকে চিকুনগুনিয়াতে?
সাধারণত আক্রান্ত মশা কামড়ানোর তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে শরীরে রোগের লক্ষণগুলো প্রকাশিত হয়। উপসর্গগুলো হলো শরীরের গিঁটে গিঁটে প্রচন্ড ব্যথা, সাথে ১০৪-১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর, শরীরের গিঁট মানে হাড়ের সংযোগস্থল ফুলে যাওয়া, মাংসপেশিতে ব্যথা, ডেঙ্গুর মতো গায়ে ঘামাচির মতো লাল লাল দানা হওয়া। যদিও কিছুদিন পরে এই লাল দানাগুলো এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। এ রোগে ডেঙ্গুর মতো রক্তক্ষরণ হয় না, এমনকি রক্তের অণুচক্রিকাও কমে না।
এখানে মূল সমস্যা তীব্র ব্যথা। যদিও ৪-৫ দিনের মধ্যে জ্বর পুরোপুরি সেরে যায়; ব্যথা থেকে যেতে পারে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত। তবে এ রোগ জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি নয়। আর হ্যাঁ, এ জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে মায়েদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন প্রথম ১৩ সপ্তাহের মধ্যে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে।

রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা
সাধারণত উপসর্গগুলো শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে এন্টিবডি পরীক্ষা করে এবং জঞ-চঈজ করে রোগটি সনাক্ত করা যায়। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরীক্ষা করা জরুরি নয়; ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা দিয়ে দেয়া যায়।
এ জ্বরের চিকিৎসা কী?
যেহেতু এটি ভাইরাল জ্বর কিছুদিন পর এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তাই চিকিৎসা বলতে মূলত অসুস্থতাকালীন উপসর্গগুলোর কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করা বোঝায়। এ সময় দুর্বলতা কমাতে প্রচুর তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে। যেমনÑ পানি, শরবত, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি। সাথে পুষ্টিকর খাবার, মৌসুমি ফলমূল খাওয়া উচিত। বিশ্রামে থাকতে হবে। জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল খাওয়াতে হবে। ব্যথা অনেক বেশি হলে চিকিৎসকের সাথে কথা বলে ব্যথার ঔষধ দিতে হবে। নিজ থেকে কোন ঔষধ খাওয়ানো যাবে না। কোনো কারণে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। গিঁটের ব্যথার জন্য গিঁটের উপরে ঠান্ডা পানির স্যাঁক এবং হালকা ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। তবে প্রাথমিক উপসর্গগুলো ভালো হওয়ার পরও যদি গিঁটের ব্যথা ভালো না হয়, তবে সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে আমাদের করণীয়
চিকুনগুনিয়া রোগের কোনো ভ্যাক্সিন এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। মশানিধনই এই রোগ প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায়। মশার আবাসস্থল ও এর আশপাশের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করতে হবে। লোকালয়ের আশপাশে কোথাও যেন পানি জমতে না পারে সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখা জরুরি। নিয়মিত বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করা উচিত। সরকারি উদ্যোগের বাইরেও ব্যক্তি উদ্যোগেও লোকালয় পরিচ্ছন্নকরণ কর্মসূচি নিয়মিত নেয়া সময়ের দাবি।
এ ছাড়া মশার কামড় থেকেও বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকতে হবে। শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢেকে রাখার জন্য ফুল হাতা শার্ট এবং ফুল প্যান্ট পরা, জানালায় নেট লাগানো, প্রয়োজন ছাড়া দরজা জানালা খোলা না রাখা, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা, শরীরে মশা প্রতিরোধক ক্রিম ব্যবহার করার মাধ্যমে মশার কামড় থেকে বাঁচা যায়। শিশু, অসুস্থ রোগী এবং বয়স্কদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। যেহেতু এ মশা আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত থেকে জীবাণু নিয়ে অন্য মানুষে ছড়িয়ে দেয়, সেহেতু আক্রান্ত ব্যক্তিকে যাতে মশা কামড়াতে না পারে সে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তাকে এ সময়টা মশারির ভেতরে রাখলে কাজটি সহজ হবে।
এ ছাড়া ছাত্র, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো চাইলে এ রোগের প্রতিরোধে মশার বংশবৃদ্ধি রোধে জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচারণা করে ও বিভিন্ন গণমুখী কর্মসূচি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা এ ক্ষেত্রে দারুণ সহায়ক হতে পারে।
লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply