জ্বালানি ও নিত্যপণ্যে আগুন প্রতিবাদের ভাষা ভুলে গেছে মানুষ -হারুন ইবনে শাহাদাত

কথায় আছে ‘অল্প শোকে কাতর অতি শোকে পাথর’। এ দেশের নিরন্ন মানুষগুলোও যেন বোবা পাথরে পরিণত হয়ে গেছে। তারা প্রতিবাদের ভাষা ভুলে গেছে। ভুলে গেছে কাঁদা-ও। তাই করোনার সময় চাকরি হারিয়ে ঘটি-বাটি নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে গ্রামের বাড়ি। করোনাক্রান্ত স্বজনের মৃত্যু দৃশ্য দেখেছে দূরে দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল নয়নে। রাজধানীচ্যুত মানুষের সারি মিছিলের মতো মনে হলেও কেউ কোনো শ্লোগান দেননি। চাকরিচ্যুতির নোটিশ পেয়েও কোনো প্রতিবাদ করেনি। আর্তচিৎকার বুকের গভীরে লুকিয়ে রেখেছে। একবারও মুখ ফুটে জানতে চায়নি, ‘আমার রক্ত ঘামে গড়া এই প্রতিষ্ঠান থেকে এই দুঃসময়ে কেন আমাকে চলে যেতে হবে।’ প্রতিবাদের ভাষা হারানো এই মানুষগুলোর ওপর একের পর এক শোষণের হাতিয়ার চালানো হচ্ছে।

করোনার দুর্যোগ থেকে একটু হলেও স্বস্তি মিলেছে। কিন্তু শান্তি কই? শান্তির পায়রা উড়ে গেছে অস্বাভাবিক দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে। নিত্যপণ্যের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আগুনে সরকার ঘি ঢাললো ডিজেল, কেরোসিন ও এলপি গ্যাসের অস্বাভাবিক দাম নির্ধারণ করে। কোনো প্রকার গণশুনানি ছাড়াই উৎপাদনের এই অতি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ ডিজেল, কেরোসিন আর এলপি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। অজুহাত আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। কিন্তু এর আগে আরেকবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার পর কমেও কমানো হয়নি। আবার বাড়লে সরকার আর বাড়াবে না, এমন প্রতিশ্রুতির কথা বেমালুম ভুলে গেছে। এই দুর্ভাগা দেশে একবার কোনো জিনিসের দাম বাড়লে আর কমে না। বাড়তেই থাকে। জনগণের কথা কেউ ভাবে না। কারণ তারা এখন আর কারো ক্ষমতার যাওয়া আসার সিঁড়ি নয়। প্রতি পাঁচ বছর পর পর ভোটের জন্য আর তাদের কাছে যেতে হয় না। তাই জনগণ এখন আর ক্ষমতার উৎস নয়, ইনকামের উৎস। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সরকার ব্যস্ত জনগণকে শোষণ করে নিজের দল, গোষ্ঠীর পকেট ভরতে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করে প্রজ্ঞাপন জারি এই শোষণের অংশ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) করোনাভাইরাসের অর্থনীতির ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে মানুষ যখন মরিয়া; তখন জ্বালানি তেল ডিজেল ও কেরোসিনের যে দাম বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি সরকারের কাছে জ্বালানি তেল আগের দামে ফিরিয়ে নেয়ার সুপারিশ করেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে বৈজ্ঞানিক কোনো মেথড মানা হয়নি। কেরোসিন ও ডিজেলের দাম বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তিসঙ্গত নয়। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটা রাজনৈতিকভাবে এটা কোনো আলোকিত সিদ্ধান্ত নয়।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জ্বালানির দাম বৃদ্ধির যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তিসঙ্গত নয়। সরকারের নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং রাজনৈতিকভাবে এটা কোনো আলোকিত সিদ্ধান্ত নয় বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে হয়তো বিত্তবানদের ওপর খুব একটা প্রভাব পড়বে না। কিন্তু যারা দরিদ্র এবং যারা নতুন করে দরিদ্র হয়েছে, যারা কোভিড আক্রান্ত অর্থনীতিতে নতুন করে রিকোভারির চেষ্টার মধ্যে রয়েছে, তাদের ওপর প্রভাব পড়বে। আমরা যদি ন্যায্যতার কথা বলি সেই ন্যায্যতার দিক থেকেও এটা (জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি) একটা অন্যায্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই দাম বাড়ানো হচ্ছে বিপিসির লোকসানের কথা বলে। বিপিসির লোকসানের কারণ কী? আমরা জানি এখানে সুশাসনের অভাব রয়েছে। বিপিসির তেল সংগ্রহ, বিক্রি, মার্কেটিংয়ে সিস্টেমের ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের অনেক অভিযোগ রয়েছে। তারা বিভিন্ন মার্কেটিং কোম্পানিকে দিয়ে তেল মার্কেটিং করে। সেখানেও আমরা দেখি দুর্নীতির খবর এসেছে। তেলের যে হারে দাম বাড়ানো হয় বাজারে তার থেকে বেশি হারে প্রভাব পড়ে এমন অভিযোগ করে ড. ফাহমিদা বলেন, যখন কোনো একটা জিনিসের মূল্য ৫, ১০ বা ২০ শতাংশ বাড়ানো হলো, তখন আমরা বাজারে গিয়ে দেখবো, মূল্য অনেক বেশি। এই যে এখন তেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, সেখানে বাসের ভাড়া প্রকৃতপক্ষে ৫০ শতাংশ বেশি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মূল্য নির্ধারণ করার মেকানিজমে আমরা বৈজ্ঞানিক কোনো মেথড দেখি না। আমরা যদি আন্তর্জাতিক বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকি, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন মূল্য কম থাকে তখন সেটার সুফল কেন জনগণ পায় না? যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হয়, লোকসানের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানো হয়। এই যুক্তিকে কোনো বৈজ্ঞানিক বা সঠিক যুক্তি বলে মনে হয় না। সুতরাং এই প্রাইস মেকানিজমটিকে ঠিক করার প্রয়োজন রয়েছে। এটি (জ্বালানি তেল) একটি কৌশলগত পণ্য। এই পণ্য ছাড়া অর্থনীতি অচল হয়ে পড়বে। এই প্রেক্ষিতে আমরা বলছি পূর্ববর্তী দামে ফিরে যাওয়া দরকার। ডিজেল এবং কেরোসিনের যে মূল্য বাড়ানো হয়েছে, আমরা এই মূল্য প্রত্যাহার করে আগের মূল্যে ফেরত যাওয়ার সুপারিশ করছি। তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

বাসের নতুন ভাড়ার হার
নির্ধারিত নতুন ভাড়া অনুযায়ী দূরপাল্লার বাস ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাস-ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ১৫ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে মিনিবাসের ভাড়া হবে এর চাইতে ১০ পয়সা কম। মিনিবাসের নতুন নির্ধারিত ভাড়া বেড়ে প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ৫ পয়সা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাসের সর্বনিম্ন বাস ভাড়া ১০ টাকা, মিনিবাস ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপেক্ষিতে ৬০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। প্রতি ১০০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৩০ পয়সা। এই ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে লঞ্চ ভাড়া বাড়ল ৩৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। অন্যদিকে ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা। ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে লঞ্চ ভাড়া বেড়েছে ৪২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। লঞ্চের সর্বনিম্ন ভাড়া ১৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে
জ্বালানি এমন একটি নিত্যপণ্য যার মূল্যবৃদ্ধির নেতিবচাক প্রভাব প্রতিটি ক্ষেত্রেই পড়বে এবং প্রত্যেক নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক (ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর) আলী রিয়াজ এ প্রসঙ্গে বলেন, “দরিদ্র মানুষদের নিয়ে সরকারের উদ্বেগ আছে এমন মনে হয় না। যারা কষ্টেসৃষ্টে বেঁচে-বর্তে আছেন, সীমিত আয়ে চলছেন তাঁদের জীবনযাপনের ওপর আরেক দফা খড়গ নামার ব্যবস্থা হয়েছে ডিজেল কেরোসিনের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশ। এর প্রভাব যেসব জিনিসপত্রের ওপরে পড়বে সেটা বোঝার জন্য জ্যোতিষী হতে হয় না, অর্থনীতিবিদও নয়। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে। এবং নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য বেঁচে থাকার সংগ্রাম কঠিন হচ্ছে প্রতিদিন। কিন্তু বাংলাদেশে অর্থবিত্তের আলোকচ্ছটা এতো যে বাংলাদেশের এই চিত্রটা নিয়ে আমরা কতটা ভাবী, ভাবতে চাই সেটাই প্রশ্ন।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সমাজে দিন দিন বৈষম্য বাড়ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের যেভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে, যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারা যেভাবে সম্পদ গড়ছে বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় সেভাবে বাড়ছে না। আমাদের ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন দরকার। সেদিকে কারও নজর দেখছি না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসভাড়া যেভাবে বাড়ানো হলো তাতে তো মনে হয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের ব্যাপারে সরকার যে খুব মনোযোগী তা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। দেশে আমদানিকারক, পাইকারি বাজার, খুচরা বাজার ঘুরে পণ্যের দাম বিশ্ববাজারের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। পণ্যবাহী যানবাহনকে ধাপে ধাপে চাঁদাবাজির শিকার হওয়াও দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মতো। তারা নিজেদের দাবি আদায়ে সরকারকে চাপ সৃষ্টি করে এবং সফলও হয়। যেমন করে তারা বাসভাড়া বৃদ্ধির দাবি আদায়ে সফল হয়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারের দুর্বলতা থাকাটা সবচেয়ে দুঃখজনক। ব্যবসায়ীরাই তো আবার রাজনীতিবিদ। বর্তমান পরিস্থিতিকে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হলে মানুষের আয় বাড়তে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে। মানুষের চাহিদা যে খুব বেড়েছে তা কিন্তু নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো নজরদারি নেই। মাঝে মধ্যে লোকদেখানো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কোনো কাজ হবে না। এটা প্রতিনিয়ত করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তারা হয়তো মনে করেন, তারা ঠিক মতো দায়িত্ব পালন না করলেও তো সুযোগ-সুবিধা সবই পাওয়া যাচ্ছে। তাই মাঝে মধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেই হবে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হলে, যারা অযৌক্তিক মূল্য বাড়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেই বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র কৃষক
প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে কৃষকের ধানের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। সার ও কীটনাশকের দাম ঊর্ধ্বমুখী। কৃষিশ্রমিকের মজুরিও বাড়ছে। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ বছরে বাড়ছে এক থেকে দুই টাকা করে। সরকারি হিসাবে, গত মৌসুমে বোরো ধানের কেজি-প্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় এক হাজার ৮০ টাকা। এবার সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপ পড়বে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বলছে, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ও চাষ দিতে দরকার ২০ লিটার ডিজেল। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে এ বছর কৃষকের বিঘাপ্রতি ৩০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে। এতে তার মুনাফাও প্রায় ৩ শতাংশ কমে যাবে। এবারের বোরো মৌসুমে কৃষকের সেচ বাবদ বাড়তি খরচ হবে ৭৫৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) জানায়, দেশে ধান ছাড়াও কৃষির অন্য খাতেও সেচযন্ত্রের দরকার হয়। যেমন শীতকালীন সবজি, পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষে সেচযন্ত্রের ব্যবহার হয়। জমি চাষ থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, নৌযান চালানোর মতো কাজে সারা বছর শ্যালো মেশিনের ব্যবহার হয়। এসব যন্ত্র ডিজেলনির্ভর। ব্রির হিসাব মতে, শুধু ধান রোপণ বা চাষাবাদে নয়, মাড়াই, পরিবহনের কাজেও ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন ব্যবহৃত হয়। ধান ছাড়াও নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রবি মৌসুমে শীতকালীন সবজি, গম, ভুট্টাসহ প্রধান ফসলগুলো উৎপাদিত হয়। বৃষ্টিহীন এ মৌসুমে সেচ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। নদী, সাগর ও জলাশয়ে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত নৌকার জ্বালানি হিসেবেও ডিজেল ব্যবহৃত হয়। সব মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে সব ধরনের কৃষিপণ্যের ওপরে ডিজেলের এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, এ বছর ৪৮ লাখ ২০ হাজার হেক্টর (তিন কোটি দুই লাখ ৯১ হাজার বিঘা) জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এর ৭০ শতাংশ বা ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর (দুই কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার বিঘা) জমিতে সেচ দেয়া হবে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে। এ হিসাবে কৃষককে বাড়তি খরচ গুনতে হবে ৭৫৬ কোটি ৬১ লাখের বেশি টাকা। বাকি ৩০ শতাংশ জমিতে সেচ দেয়া হবে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে। এমনিতেই ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বেশি। এবার বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করা কৃষকদের সাথে তাদের খরচের পার্থক্য আরো বেড়ে যাবে।
বিএডিসির সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্র সেচ) মো: জিয়াউল হক বলেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে শুধু বোরো বা সেচে নয়, সামগ্রিকভাবে কৃষিতে প্রভাব পড়বে। কারণ পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর ও হারভেস্টার ক্ষেতে নিতে ডিজেলেরই প্রয়োজন পড়ে। ধান রোপণ, ধান কাটা, ধান ঝাড়াতে লাগবে- সবকিছুতেই ডিজেলের যন্ত্র ব্যবহৃত হয়।

সরকারের অবস্থান
করোনায় মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে, চাকরি হারিয়েছে, পণ্যের দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে ডিজেলের দাম বাড়ায় ট্রাক, বাস, লঞ্চসহ পরিবহন খরচ বেড়েছে। জনগণের ওপর এই চাপ দেয়াটা কতোটা যৌক্তিক? এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ‘এর পুরোটাই যৌক্তিক। সরকার কোত্থেকে টাকা পাবে? রেভিনিউ অর্জন করেই সরকারকে কাজ করতে হচ্ছে। তারপরও সরকার যতটুকু সম্ভব সামঞ্জস্য করে দেয়। ভালো দিক দেখবেন না, তেলের দাম কি আমরা বাড়িয়েছি? আমাদের সরকার বাড়িয়েছে?’

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ পড়বে, এর কোনো বিকল্প ছিল কিনা? অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা স্বীকার করি। যখন দাম কমে আমরা দাম কমাই, যখন বাড়ে বাড়াই। বাসভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আগে আমাকে জানতে হবে মূল্যবৃদ্ধির কারণ। আমি যদি দেখি কোনো ভিত্তি ছাড়া দাম বাড়ানো হয়েছে, সেটা বিবেচনা করার অবশ্যই সুযোগ রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম যখন আন্তর্জাতিক বাজারে কম ছিল সেই সুবিধা কি আমরা সবাই পাইনি? সবাই সুবিধা পেয়েছে। এখন দাম বেড়েছে, কী পরিমাণ বেড়েছে নেটে গেলে পাবেন। আমরা তেল উৎপাদন করি না, আমরা ভোক্তা। আমরা রিসিভিং করি, আমাদের এখানে হাত দেয়াও সম্ভব নয়। তারপরও আমরা চেষ্টা করবো যে পরিমাণ বাড়বে সে পরিমাণ যেন আমাদের ভোক্তারা সহ্য করতে পারেন সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখা হবে। আমি একজন নাগরিক ও অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি বলছি। তিনি আরও বলেন, অর্থমন্ত্রী হিসেবেও আমার দায়িত্ব আছে। আমাকে রেভিনিউ জোগান দিতে হয়। রেভিনিউ জোগান দিতে না পারলে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে না। আমরা পিছিয়ে যাবো, আমরা পিছিয়ে যেতে চাই না।’
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply