টেকসই উন্নয়ন: ইসলামী দৃষ্টিকোণ -ড. মুহাম্মদ নাজমুস সাকিব

পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত দু’টি প্রত্যয়। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে পরিবেশ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। টেকসই উন্নয়নের সাথে পরিবেশ প্রসঙ্গটি জড়িত। বিশব্যাপী উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই কিন্তু বৈষম্য প্রকট। অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জনের কারণে সম্পদ বৈষম্য বাড়ছে। সম্পদ বৈষম্য হ্রাসের ক্ষেত্রে তেমন কোনো উন্নতি হচ্ছে না। মানুষ অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। উন্নয়ন থেকে কেউ বাদ যাবে না। সবাইকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে। উন্নয়ন এমনই এক বিষয় বা ধারণা যার কোনো শেষ নেই।
আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশকে অবিবেচ্য রেখে একটি সুন্দর পৃথিবীর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এই দুয়ের যথাযথ সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বিশ্ব সংরক্ষণ করে যে উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যায় তাই টেকসই উন্নয়ন।
শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) পরবর্তীকালে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে এ কথা সত্য। পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশেও বয়ে এনেছে পারিবেশিক অবক্ষয় ও বিপর্যয়। পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিপন্ন, হুমকির মুখে আশরাফুল মাখলুকাত-মানবজাতির অস্তিত্ব। যান্ত্রিক সভ্যতায় ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক ও পারমাণবিক পদার্থের ব্যবহারই এর মূল কারণ। পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশগত হুমকির ও তার স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় র‌্যাচেল কারসনের বক্তব্যে। তিনি তার বিখ্যাত Silent Spring গ্রন্থে বলেন- মানুষের সামনে দু’টি রাস্তা খোলা আছে। মানুষ বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ, মৃত্যুর মদিরা’ দিয়ে পৃথিবীর বসন্তকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। অথবা প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণী এবং বিশেষ করে জীবাণুর সাথে পৃথিবীকে ভাগ করে ব্যবহার করতে পারে। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ নয়, জীবাণুর সাথে সামঞ্জস্যপর্ণ জীবন ধারা তৈরি করেই আমরা টিকে থাকতে পারি।১
জেমস মিডগাল তার ‘সামাজিক উন্নয়ন’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন, Sustainable development creates a process that ensures that natural resources are replenished, and that future generations continue to have the resources they need to meet their own needs.” টেকসই উন্নয়নে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। পরিবেশ আর উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্ক পরস্পরবিরোধী নয়। পরিবেশকে রক্ষা করে দেশের উন্নয়ন না করলে তা টেকসই হবে না। এ জন্য শুধু সরকার বা উন্নয়ন সংস্থাকে কাজ করলে চলবে না; সমাজের প্রত্যেক মানুষকেই যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে। পরিবেশ বাঁচিয়েই অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।২
টেকসই উন্নয়ন আধুনিক বিশ্বে উন্নয়ন মতবাদ হিসেবে অতি দ্রুত স্থান করে নিয়েছে। একদিকে বর্তমান প্রজন্মের উন্নয়ন, চাহিদা মেটানো, দারিদ্র্য দূরীকরণ (Poverty eradication), স্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করা অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখা এ দু’টি বিপরীতমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উদ্ভব আজকের টেকসই উন্নয়নের ধারণা।

টেকসই উন্নয়নের প্রত্যয়গত ধারণা
টেকসই উন্নয়নের ইংরেজি প্রতিশব্দ Sustainable Development এবং আরবি প্রতিশব্দ আততান ইনয়্যাতুল মুসতাদালাহ। স্থিতিশীল উন্নয়ন বা উন্নয়নের স্থিতিশীলতা উভয় ক্ষেত্রে জনপ্রিয় এই পরিভাষাটি প্রয়োগ করা হয়। ইংরেজি Sustainable শব্দটি এসেছে ক্রিয়াবাচক শব্দ Sustain থেকে। সংক্ষিপ্ত অক্সফোর্ড ডিকশনারিতেSustain বলতে বোঝানো হয়েছে- To keep in being, to cause to continue in a certain state. সুতরাংSustainable বলতে বোঝায় কোনো অবস্থা, ঘটনা বা প্রপঞ্চ যে রকম আছে সেভাবে রাখা, পূর্বোক্তকে অক্ষত রেখে পরিবর্তন করা, টেকসই করা। স্থিতিশীল বা সহনশীল বা স্থায়ী বা টেকসই ধারণাটি কোনো নতুন কিছু নয়, প্রায় এক শতাব্দী আগে বনপালন পেশার সাথে যুক্ত লোকদের দ্বারা এই শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।
ইংরেজি Development পরিভাষার বাংলা হচ্ছে উন্নয়ন। উন্নয়ন শব্দটির ধারণা ব্যাপক। এটি ব্যাপক অর্থে এবং বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত উন্নয়ন বলতে কোনো দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৃষ্টিগত উন্নয়নকে বুঝায়। এগুলোর কোনো একটিকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংক-এর ১৯৯১ সালে প্রণীত বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবদন (World Development Report) এ বলা হয়েছে, Development never will be and never can be defined to universal satisfaction.’ উন্নয়ন হলো উৎকর্ষের পথে এক পরিবর্তন প্রক্রিয়া, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে দেশের প্রতিটি মানুষ এবং একই সাথে সামগ্রিক দিক। প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টি বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। এখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনের বিষয়টিও আলোচিত হচ্ছে। পরিবেশ আজ বিপন্ন। এর দায়ভার শুধু বর্তমান প্রজন্মকেই নয়, অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও যুগ যুগ ধরে বহন করতে হবে। এই প্রেক্ষিতেই উন্নয়ন ধারণায় চলে আসে উন্নয়নের স্থায়িত্ব ও এর পরিবেশগত ও প্রতিবেশগত প্রভাবের বিষয়টি যা ‘টেকসই উন্নয়ন’ প্রত্যয় হিসেবে বর্তমানে বহুল আলোচিত। টেকসই উন্নয়ন এমন এক ধারণাকে ব্যক্ত করে যার অর্থ হলো উন্নয়ন কার্যক্রম এমন হতে হবে যে, মানুষের উন্নয়ন চাহিদা মিটবে ঠিকই, কিন্তু সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাবে না অথবা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি হবে না, সর্বোপরি, সমস্ত জীবজগতের মধ্যে সমতা এবং বৈচিত্র্য রক্ষা হবে।

টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞা
আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশকে অবিবেচ্য রেখে একটি সুন্দর পৃথিবীর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এই দুয়ের যথাযথ সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সংরক্ষণ করে যে উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যায় তাকে টেকসই উন্নয়ন বলে।
১. পরিবেশ এবং উন্নয়নবিষয়ক বিশ্ব কমিশন (World Commission on Environment and Development) প্রদত্ত সংজ্ঞা: ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ এবং উন্নয়ন বিষয়ক বিশ্ব কমিশন। (WCED) টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা অক্ষুন্ন রেখে বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটানোর জন্য যে উন্নয়ন তাই টেকসই উন্নয়ন। (Sustainable development is development that meets the needs of the present without compromising the ability of future generations to meet their own needs.)৩ আসলে টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটি উন্নয়ন পদ্ধতি যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন পূরণের সুযোগ ব্যাহত না করে বর্তমান জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এ সংজ্ঞায় দু’টি মূল ধারণা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ক. চাহিদার ধারণার বিশেষ করে, পৃথিবীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অপরিহার্য চাহিদা, যার প্রতি একান্তভাবে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। (The concept of needs in particular, the essential needs of the world’s poor, to which overriding priority should be given) খ. বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটাতে পরিবেশের সামর্থ্যরে উপর রাষ্ট্র কর্তৃক প্রযুক্তি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উপর আরোপিত সীমাবদ্ধতার ধারণা (The idea of limitations imposed by the state of technology and social organization on the environment’s ability to meet present and future needs.)

২. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশন প্রদত্ত সংজ্ঞা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশন থেকে বলা হয়েছে টেকসই উন্নয়ন মূলত একটি প্রক্রিয়া, যা দ্বারা জনগণ তাদের চাহিদা মেটায়, তাদের বর্তমান জীবন মানের উন্নতি ঘটায় এবং সেই সাথে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে তাদের আপন চাহিদা পূরণ করতে পারে তাদের সেই সামর্থ্যরে সুরক্ষা করে।৪
৩. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রদত্ত সংজ্ঞা: বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের মতে, সহজ কথায়, টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে মানুষকে কেন্দ্রে রেখে, পরিবেশ সংরক্ষণ করে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন।৫ বস্তুত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের স্তম্ভ হচ্ছে- পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রাণ বৈচিত্র্য রক্ষা করা। এই প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন হলে যেমন পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষিত থাকে, তেমনি উন্নয়নের সুফল পায় সাধারণ মানুষ।৬ তিনি আরও লিখেছেন, টেকসই উন্নয়নের মোদ্দা বিষয় হচ্ছে, মানুষের আর্থ-সামাজিক ও মানবিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা এবং তা এমনভাবে। করা যাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষিত হয় এবং পৃথিবীর জীবন সহায়ক প্রাকৃতিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া সমূহ বিদ্যমান ও কার্যকর থাকে। প্রচলিত ব্যবস্থায় অর্থনীতির সঙ্গে প্রকৃতির দ্বন্দ্ব এরং বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন ধারণা এ সকল দ্বন্দ্বের নিরসন ও বিষয়গুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে নিবিষ্ট। বর্তমান প্রজন্মকে এমনভাবে তাদের আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনসমূহ মেটাতে হবে যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মসমূহ তাদের আর্থ-সামাজিক প্রয়োজন যাথাযথভাবে মেটাতে পারে। একই সাথে বর্তমান প্রজন্মের সকলে যাতে ন্যায্যভাবে সকল অগ্রগতির অংশীদার হতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।৭

টেকসই উন্নয়ন ও ইসলাম
ইসলাম বিশ্বজনীন জীবনাদর্শ। ইসলামে রয়েছে বিশ্বদৃষ্টি (International outlook)। সার্বজনীনতা বিশ্বজনীনতা ও চিরস্থায়িত্ব এর অনন্য বৈশিষ্ট্য। ইসলাম আল্লাহর শাশ্বত পথনির্দেশ। এর শিল্পসমূহ নবীন উষার মতো তরতাজা, স্বচ্ছ ও আধুনিক। মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যতা এর গুণবৈশিষ্ট্য। এ সত্যটি ভালোভাবে অনুধাবন করা অবশ্যক যে, ইসলামই হচ্ছে একমাত্র ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা এবং সমুদয় সমতা, উদারতা, সুষম নীতি তার দেয়া অধিকার ও কর্তব্যসমূহের ব্যবস্থাবলিতে পূর্ণ অবয়বে বিদ্যমান রয়েছে। পাশ্চাত্য থেকে টেকসই উন্নয়নের যে আওয়াজ উঠেছে এবং সারা বিশ্বে যা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- মহান দ্বীন ইসলাম আল্লাহ যে দ্বীনকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন এবং মানুষের জন্য একমাত্র দ্বীন হিসেবে মনোনীত করেছেন সে ইসলামের মধ্যে রয়েছে টেকসই উন্নয়ন ধারণা। দেড় হাজার বছর পূর্বে মহানবী সা. এর উপর অবতীর্ণ দ্বীনের বিশ্বজনীন আহবান আজকের প্রচলিত উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়নের আহবান থেকে শ্রেষ্ঠ, অনেক ব্যাপক। ইসলামের কল্যাণ বিশ্বজাহানের জন্য। ইসলামের দৃষ্টিতে উন্নয়ন শুধু বস্তুগত বিষয় নয়, বরং নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করে। এ উন্নয়ন সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনাকে অন্যসব টেকসই উন্নয়ন মডেল থেকে সহজেই পৃথক করা যায়।
ইসলাম মানুষের সব ধরনের চাহিদার ব্যাপারে সার্বিক বা পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করে। ফলে ইসলাম টেকসই উন্নয়নকেও তার দৃষ্টিসীমার বাইরে স্থান দেয়নি। ইসলামের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বজগতে মানুষের অবস্থান, এ পৃথিবীতে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য এবং দুনিয়ার সুযোগ সুবিধা বা নেয়ামত ভোগ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত। ইসলামী নীতিমালায় সরকার ও সমাজের অর্থনৈতিক আচরণ বা তৎপরতা এবং সামাজিক পরিবেশকে এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যে, এর ফলে টেকসই ও কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জিত হয়। ইসলামী সমাজে অর্থনৈতিক তৎপরতায় মানবীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ বা বিধানগুলোর ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে ইসলামী সমাজে অর্থনৈতিক তৎপরতাগুলো সুস্থ পরিবেশে এবং সঠিক নীতিমালা বা বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এম খালফান টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে যেয়ে বলেন- “টেকসই উন্নয়নকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে আমরা বুঝতে পারি, ইসলাম পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সামাজিক গতিবিধির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়।” এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে, ভোক্তার কল্যাণ, অর্থনৈতিক পর্যাপ্ততা এবং অভিব্যক্তিমূলক জ্ঞান ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার বিভিন্ন মডেল তথা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দারিদ্র্য হ্রাসকারী দু’টি বিশেষ কৌশল তথা বদান্যতা ও যাকাতভিত্তিক পরিকাঠামোতে পরিবেশগত ভারসাম্য অর্জন।
Sustainable development from Islamic perspective seeks to establish a balance between the environment, economic and social dimensions. It means the balance of consumer welfare, economic efficiency, achievement of ecological balance in the framework of evolutionary: knowledge-based, and socially interactive model defining the social justice, charity and zakat are two mechanisms to reduce poverty.8
উন্নয়নের ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অনুয়ায়ী পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। মানুষ যে সব সম্পদ ভোগ করে, ইসলামের দৃষ্টিতে তার প্রকৃত মালিক হলেন মহান আল্লাহ। তিনি মানুষকে অন্য সব সৃষ্টির চেয়ে বেশি মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছেন এবং পৃথিবীর সব কিছু মানুষের আওতাধীন করেছেন, যাতে মানুষ তার প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে। এরই আলোকে ইহকাল ও পরকালে মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যত নির্ভর করে তার আচার-আচরণের প্রকৃতির ওপর। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আমরা বনি আদমকে মর্যাদা দিয়েছি এবং স্থলে-সমুদ্রে চলাচলের জন্য তাদের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে উত্তম জীবিকা দিয়েছি এবং তাদেরকে আমাদের অনেক সৃষ্টির উপর দিয়েছি শ্রেষ্ঠত্ব।”৯
পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে দুনিয়ার নেয়ামতসমূহ মানুষের প্রতি মহান আল্লাহর অনুগ্রহ মাত্র, যাতে মানুষ একদিকে তাদের চাহিদগুলো পূরণ করতে পারে ও এভাবে নিজেকে উন্নত করার সুযোগ পেতে পারে এবং অন্যদিকে তাকওয়া বা খোদাভীরুতা অবলম্বনের মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তিগুলো দমন করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, “হে মানবকুল। তোমরা পৃথিবীর যেসব খাদ্য আহার করো, যেগুলো হালাল এবং ভালো। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। কারণ সে তোমাদের সুস্পষ্ট শত্রু।”১০
ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক চাহিদাগুলোর দিকে লক্ষ্য রেখে তাদের উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথ খোলা রেখেছে। কিন্তু ইসলামের কাক্সিক্ষত টেকসই উন্নয়ন মানব জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতই কিছু নিয়ম কানুন ও নীতিমালা দ্বারা বেষ্টিত। মানুষ যাতে বস্তুগত বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে ছুটতে যেয়ে লোভ-লালসা, অপচয় জুলম ও অত্যাচারে জড়িয়ে না পড়ে সে জন্যেই এই সীমারেখা বা সীমাদ্ধতা রাখা হয়েছে। একজন মানুষের জন্যে দুনিয়া ও এর সম্পদগুলো তখনই অপছন্দনীয়, যখন তা তাকে খোদাদ্রোহিতার দিকে নিয়ে যায় এবং এর ফলে সে অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি ও জুলুমের অতল গহবরে নিক্ষিপ্ত হয়।
টেকসই উন্নয়ন প্রসঙ্গে হাসান যুবায়ের বলেন, “মানবজাতি এই পৃথিবী নামক গ্রহে মহান আল্লাহর প্রতিনিধি এবং তাদেরকে প্রয়োজনীয় সম্পদ একচেটিয়াভাবে ভোগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” মানবজাতি অবশ্যই পবিত্র কুরআন এবং মুহাম্মদ সা.-এর শিক্ষা অনুযায়ী তাদের সমসাময়িক চাহিদা পূরণ করবে এবং উন্নতির চেষ্টা করবে তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কোনো অধিকার যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকে দৃষ্টি রাখবে।
Human beings are Allah Almighty’s representatives of the planet Earth, and they are entitled to benefit from its resources without selfishly monopolizing them. Human beings must seek to develop this planet in accordance with the provisions of the Holy Quran and the teachings of Prophet Muhammad, with the stipulation that current needs must be met without jeopardizing the rights of future generations.com.11

টেকসই উন্নয়নের পাশ্চাত্য ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির তুলনা
পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে টেকসই উন্নয়ন বলতে কেবল ভোগ ও মুনাফা অর্জনকেই বুঝায়। পাশ্চাত্য রেনেসাঁর পর ভোগবাদী ও মুনাফাকামী নীতি গ্রহণ করে এবং মানুষকে চরম ভোগবাদী হতে উৎসাহ দেয়া হয়। এ বিষয়টি অর্থনৈতিক তৎপরতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। পাশ্চাত্যের উন্নয়ন সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের বৈষয়িক চাহিদাগুলো মেটানোর ক্ষেত্রে চরমপন্থা গৃহীত হওয়ায় ভোগবাদ লাগামহীনভাবে বেড়েছে। এর ফলে অনেক কৃত্রিম বা অপ্রয়োজনীয় চাহিদাও সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এই চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ি বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। পাশ্চাত্যের টেকসই উন্নয়ন মডেলে যান্ত্রিকতাবাদ বা মেশিনিজমের মোকাবেলায় মানুষের মর্যাদা ও ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এটাই টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কিত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রধান বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ইসলামে টেকসই উন্নয়নকে নৈতিকতার (Morality) সাথে সমন্বিত করা হয়েছে। ফলে ইসলামী সমাজে অর্থনৈতিক তৎপরতাগুলো হয় লক্ষ্যপূর্ণ ও যৌক্তিক। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ধনসম্পদ বা ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন তৎপরতা যেন মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন না করে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেন, “সেই সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা বিরত রাখে না আল্লাহর যিকির, সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান করা। তারা ভয় করে সেই দিনটিকে যেদিন মানুষের অন্তর আর চোখ উল্টে যাবে।”১২
এ আয়াতে এমন লোকদের ব্যাপারে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যাদের বৈধ বা ইতিবাচক অর্থনৈতিক তৎপরতা তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখে না। এটা স্পষ্ট যে, যারা মহান আল্লাহকে সব সময় স্মরণ রাখে তারা অর্থনৈতিক তৎপরতাসহ যে কোনো কাজেই জুলুম, প্রতারণা এবং দুর্নীতি থেকে দূরে থাকে। এ ধরনের লোকদের জন্যে সব সময় সৌভাগ্য বা সুফল অপেক্ষা করে।
ইসলামে টেকসই উন্নয়ন ব্যাপক অর্থবোধক ও বিস্তৃত এবং তা নৈতিক দিকসহ আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত দিকগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। এ কারণেই একে পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের বৈশিষ্ট্য থেকে সহজেই পৃথক করা যায়। পুঁজিবাদী সমাজ শুধু মুনাফাকামিতা ও বস্তুগত চাহিদা পূরণকেই টেকসই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করে, কিন্তু ইসলাম গঠনমূলক উৎপাদনের পাশাপাশি মানবীয় মূল্যবোধ রক্ষা করাকেও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে।
লেখক: বিশিষ্ট কলামিস্ট ও উন্নয়ন গবেষক

১. এস আমিনুল ইসলাম, উন্নয়ন চিন্তার পালাবদল, দিব্যপ্রকাশ, ২০০৪, পৃ. ৩৯।
২. টেকসই উন্নয়নে পরিবেশ, গোলটেবিল বৈঠক, দৈনিক সমকাল, ১৭ জুন ২০১৬,পৃ. ১১।
৩.World Commission on Environment and Development, Our Common Future (1987)
৩. জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০১০-২০১১, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, মে ২০১০, পৃ. ৫।
৪. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে অংশীদায়িত্ব জরুরী (প্রবন্ধ), দৈনিক সমকাল, ১৪ নভেম্বর, ২০১৫, পৃ. ৮।
৫. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, রাতারগুল রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা চাই (প্রবন্ধ), দৈনিক সমকাল, ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫, পৃ. ৮।
৬. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষনা প্রতিষ্ঠান, শের ই বাংলা নগর, ঢাকা, সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যা, খ. ২৬, নভেম্বর ২০১৮,পৃ. ১৮৩।
৭. M Khalf an. Sustainable Development and Sustainable Construction, 2002, P. 40.
৮. সুরা ১৭ বনি ইসরাঈল: আয়াত ৭০
৯. সূরা ২ আল বারাকা: আয়াত ১৬৮
১০. ZubairHasan, Sustainable Development from an Islamic Perspective: Meaning, Implications and policy concern, JKAU, Islamic Economics, 19:9, P. 3-18.

১১. সূরা ২৪ আন নূর: আয়াত ৩৭।

SHARE

Leave a Reply