ডিজিটাল বাংলাদেশ ডিজিটাল চুরি

গত ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৮১ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৬৩২৪৯১৬০৯ টাকা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি করা হয় যা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে গচ্ছিত ছিল। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বাংলাদেশ অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হওয়া এই ডলার ফিলিপাইনের জুয়ার বাজারে পাওয়া গেছে। এ অর্থপাচার ফিলিপাইনের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অর্থপাচার ঘটনা।
হ্যাকাররা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাব থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার চুরির চেষ্টা করে। তা-ও যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয় বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহজ পরিচালনাপদ্ধতি ও ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার সহযোগিতায় তারা সহজে হ্যাক করে বাংলাদেশ ব্যাংকের হয়ে ৩৫টি অর্থ স্থানান্তরের আবেদন জমা দেয়। এই আবেদনসমূহের মধ্যে পাঁচটি আবেদন কার্যকর হয়। ৫ ফেব্রুয়াারি ২০১৬ তারিখে ৮১ মিলিয়ন ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক করপোরেশনের মাধ্যমে জালিয়াতি হয় এবং পরে তা জুয়া বাজার ঘুরে হংকংয়ে স্থানান্তরিত হয়। অন্য ২০ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে শ্রীলঙ্কায়, যার মালিক বাংলাদেশ ব্যাংক। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক আরো ৮৭০ মিলিয়ন ডলার লেনদেন অবরোধ করে।
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে হ্যাকারদের টাকা চুরি দেশের আর্থিক খাতে হ-য-ব-র-ল অবস্থার এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এর আগে দেশের শেয়ারমার্কেট থেকে লক্ষ-কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। ৪ হাজার কোটি টাকার হলমার্ক কেলেঙ্কারি হলো। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় কারা দোষী আর কারা নির্দোষ এর চেয়ে বড় কথা হলো এ টাকার বেশির ভাগই বাংলাদেশী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত নগদ অর্থ।
২০০৯ সালের পর এই পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠিত হয়েছে। শেয়ারবাজারে সর্বস্ব খুইয়ে আত্মহত্যা করেছেন তিন ব্যক্তি। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, যুবক, ডেসটিনি, বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের এফডিআর চুরির ঘটনাও ঘটেছে। এখন পর্যন্ত এতো বড় লুণ্ঠনের দায়ে একজনেরও শাস্তি হয়নি। এভাবে চুরি-ডাকাতির প্রশ্রয় পেয়ে লুটেরাগণ বেপরোয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে হাত বাড়াতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি এসব অপরাধী চক্র।
এ আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা না করলে আর্থিক খাতে মানুষের আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। যা সে দেশের ব্যবসা-বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি ভুক্তভোগী দেশ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে যায়।
অপরাধ করে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই আমাদের দেশের অপরাধপ্রবণতা ক্রমবর্ধমান। শুধু আর্থিক বা ব্যাংকিং খাত নয়, বরং রাষ্ট্রের সকল বিভাগই এখন রুগ্ণ হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি রিজার্ভ চুরি এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেশের সচেতন মানুষকে রীতিমত ভাবিয়ে তুলেছে। আসলে রাষ্ট্রের রিজার্ভই যদি এতটা অরক্ষিত হয়, তাহলে সার্বিক সুরক্ষাও রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, মূলত আমাদের দেশের বিশেষ করে আর্থিক সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে না অন্য কোথাও? সদুত্তর কারো জানা আছে বলে মনে হয় না।
ঘটনার শেকড় অনেক গভীরেই বলে মনে হচ্ছে। এতে রাঘববোয়ালদের সংশ্লিষ্টতাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। কারণ, এর আগে চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারের কথা বলা হলেও এখন এ বিষয়ে আর কাউকে কথা বলতে শোনা যাচ্ছে না। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে, জনগণের টাকা যেকোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনতে হবে।

SHARE

Leave a Reply