ডেঙ্গু সচেতন হোন, নিরাপদ থাকুন -ডা: আহমেদ ইয়াসীন

ডেঙ্গু এক ধরনের গুরুতর জ্বরজাতীয় রোগ যা মাঝে মধ্যে মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং মৃত্যু যখন গুরুতর আকার ধারণ করেছে ঠিক তখনই ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। এই প্রবণতা এখন পর্যন্ত ঢাকা শহরের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে। মশা নিধনের কার্যক্রম জোরদার করতে না পারলে পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। চিন্তার বিষয় হলো একজন ব্যক্তি একই সাথে কোভিড-১৯ এবং ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হতে পারেন। দেশে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। ডেঙ্গু নির্মূল করার জন্য সবার ডেঙ্গু সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য জানা থাকা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু কী?
ডেঙ্গু একধরনের ভাইরাসঘটিত জ্বর। ভাইরাসের নাম ডেঙ্গু ভাইরাস বা DENV। চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছে। DENV-1, DENV-2, DENV-3 এবং DENV-4। প্রত্যেকটি ভাইরাসই একজন ব্যক্তিকে আলাদা আলাদাভাবে সংক্রমণ করতে পারে। বর্তমানে পৃথিবীর ১০০টিরও বেশি দেশে ডেঙ্গুজ্বর দেখা যায়। জনসংখ্যা হিসেবে পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ডেঙ্গু দেখা যায় ২০০০ সালে।

ডেঙ্গু কিভাবে ছড়ায়?
ডেঙ্গু ভাইরাস নিজ থেকে ছড়াতে পারে না। স্ত্রী এডিস মশার মাধ্যমে মূলত ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে, সেই ব্যক্তি ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়। আবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে, সেই মশাটিও বাকি জীবনের জন্য ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে।
রক্তের মাধ্যমে কদাচিৎ ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। জ্বর থাকা অবস্থায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত কোনোভাবে সুস্থ ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করলে ঐ ব্যক্তিও ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে পারেন। গর্ভাবস্থায় কিংবা ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় আক্রান্ত মা থেকে শিশুর দেহে ডেঙ্গু সংক্রমিত হতে পারে। এমনকি মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমেও ডেঙ্গু ছড়াতে পারে।

ইনকুউবেশন পিরিয়ড
জীবাণু শরীরে প্রবেশ করা ও রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হওয়ার মধ্যবর্তী সময়কে ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলা হয়। ডেঙ্গুর ইনকিউবেশন পিরিয়ড ৪ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মশা কামড়ানোর ৪-১০ দিন পরে ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে থাকে।

এডিস মশা সম্পর্কিত তথ্য
এডিস মশা খালি চোখে দেখে শনাক্ত করা সম্ভব। এরা আকারে মাঝারি আকৃতির হয়ে থাকে। এডিস মশার দেহে সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। এ কারণে এটিকে টাইগার মশাও বলা হয়। মূলত দেহের ডোরাকাটা দাগ এবং অ্যান্টেনা দেখে এডিস মশা চেনা সম্ভব। এর অ্যান্টেনা কিছুটা লোমশ দেখতে হয়। পুরুষ মশার অ্যান্টেনা স্ত্রী মশার চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি লোমশ দেখতে হয়। আবার স্ত্রী মশার শুঙ্গ পুরুষ এর তুলনায় সুঁচালো হয়। এডিস মশার জীবনে চারটা পর্যায় রয়েছে। ডিম, লার্ভা, পিউপা ও পূর্ণবয়স্ক মশা। এডিস মশার অনেক প্রজাতি রয়েছে। তবে Aedes aegypti প্রজাতি মূলত সারা পৃথিবীতে ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য দায়ী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে Aedes albopictus নামক প্রজাতিও ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। পুরুষ এডিস ডেঙ্গু ছড়ায় না। কারণ এরা মানুষকে কামড়ায় না। এরা পাতার রস, ফুলের মধু খেয়ে জীবন ধারণ করে। ডেঙ্গু ছড়ায় স্ত্রী এডিস মশা। মশার ডিমের পূর্ণাঙ্গতার জন্য প্রোটিন প্রয়োজন হয়। এই প্রোটিন আসে রক্ত থেকে। সেজন্য স্ত্রী মশা প্রোটিন সংগ্রহের জন্য মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকে কামড়ায় এবং ডেঙ্গু ছড়ায়। এডিস মশা ডেঙ্গু ছাড়াও চিকুনগুনিয়া, ইয়োলো ফিভার এবং জিকা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী।

ডেঙ্গুজ্বর কখন ও কাদের বেশি হয়
পৃথিবীর উষ্ণ ও অর্ধ উষ্ণ অঞ্চলে ডেঙ্গু বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বিশেষ করে গরম এবং বর্ষার সময়টাতেই ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। শীতকালে সাধারণত ডেঙ্গু দেখা যায় না। এডিস মশার ডিম বা লার্ভা অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে। বর্ষার শুরুতেই সেগুলো থেকে মশা বিস্তার লাভ করে। সাধারণত শহর অঞ্চলে অভিজাত এলাকায় এডিস মশার প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই ডেঙ্গুজ্বরও এসব এলাকার বাসিন্দাদের বেশি হয়। এডিস মশা স্থির ও পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই যাদের বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকে তাদের ডেঙ্গু বেশি হয়।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহ
৪০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। প্রাথমিকভাবে ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণগুলো হলো আকস্মিক জ্বর, মাথা ব্যথা, অস্থসন্ধি ও মাংসপেশিতে ব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা। অনেক সময় ব্যথা এত তীব্র হয় যে মনে হয় বুঝি হাড় ভেঙে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম ব্রেক বোন ফিভার।
অন্য সব জ্বর, যেমন টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া বা সাধারণ জ্বরের সঙ্গে ডেঙ্গুজ্বরের মূল পার্থক্য হলো প্রথম দিন থেকেই জ্বর অনেক বেশি থাকে। জ্বর ও অন্যান্য লক্ষণগুলো ২ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে। তবে জ্বর শেষ হলেও অনেক সময় ক্রমাগত বমি, পেট ব্যথা, রক্তক্ষরণের মত অপেক্ষাকৃত গুরুতর লক্ষণ প্রকাশিত হয়ে থাকে।
তীব্রতার উপর ভিত্তি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গুকে দুই ভাগে ভাগ করেছে।
১. ডেঙ্গু (সতর্কসংকেতহীন ও সতর্কসংকেতসহ)
২. গুরুতর ডেঙ্গু

সাধারণ ডেঙ্গু : যদি কারো উচ্চমাত্রার জ্বর (৪০ক্কঈ/১০৪ক্ক ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে) এবং একইসাথে নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনো দুটি লক্ষণ থাকে, সেটা ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
– তীব্র মাথাব্যথা
– চোখের পেছনে ব্যথা
– মাংসপেশি এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
– গা-গোলানো বা বমি বমি ভাব
– বমি
– বিভিন্ন গ্রন্থি ফুলে যাওয়া (যেমন লালাগ্রন্থি)
– র‌্যাশ বা লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়া (গা থেকে হাতপায়ে ছড়ায়)

গুরুতর ডেঙ্গু : অসুস্থতার ৩ থেকে ৭ দিন পর যখন জ্বর পড়তে শুরু করে (৩৮ক্ক সে./১০০ক্ক ফারেনহাইট এর কম) ডেঙ্গুরোগী একটি সঙ্কটপূর্ণ অবস্থায় বা ক্রিটিক্যাল ফেজে প্রবেশ করে। অধিকাংশ রোগী এ পর্যায়ে আরোগ্য লাভ করতে শুরু করে। তবে মোট ডেঙ্গুরোগীর প্রায় ৫% এ সময় গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। গুরুতর (ংবাবৎব) ডেঙ্গুতে আক্তান্ত রোগী প্লাজমা লিকেজ (রক্ত থেকে রক্তের তরল অংশ রক্ত নালীর বাইরে বেরিয়ে আসা), পেটে বা ফুসফুসে পানি আসা, শ্বাসকষ্ট, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তীব্র রক্তক্ষরণ, এমনকি অঙ্গের মারাত্মক অকার্যকারিতার মতো জটিলতায়ও আক্রান্ত হতে পারেন। প্লাজমা লিকেজ বা অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে রোগী ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে (উঝঝ) আক্রান্ত হতে পারেন যাতে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। এ সময় নিম্নোক্ত গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্তান্ত রোগীর নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে পারে।
– তীব্র পেট ব্যথা
– ক্রমাগত বমি হওয়া
– স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস
– নাক বা দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ
– ক্লান্তি বা অবসাদ
– অস্থিরতা
– রক্তবমি
– পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া (কালো পায়খানা হতে পারে)

এ ধরনের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত এবং অন্তত ২৪-৪৮ ঘণ্টার জন্য চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। এতে করে রোগীকে প্রয়োজনীয় ও জরুরি চিকিৎসা যথাযথভাবে দেয়া সম্ভব হবে। ডেঙ্গুজনিত জটিলতা ও মৃত্যুহার কমবে।
ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার এবং ডেঙ্গু শক সিনড্রম শব্দ দুটো আমরা অনেকে শুনেছি। ২০০৯ সালের পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) ডেঙ্গুকে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু, ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার, ডেঙ্গু শক সিনড্রম এই ৩ ভাগে ভাগ করতো। এর মধ্যে ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার ও ডেঙ্গু শক সিনড্রম পরিভাষা দুটি চিকিৎসকরা প্রায় ব্যবহার করে থাকেন।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (উঐঋ)
এটা ডেঙ্গুর একটা জটিল অবস্থা। ডেঙ্গুতে যখন অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি রক্তক্ষরণ কিংবা প্লাজমা লিকেজের লক্ষণ দেখা দেয় তখন ডেঙ্গু না বলে ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার বলা হয়। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভারের যথাযথ চিকিৎসা না নিলে এটা ডেঙ্গু শক সিনড্রমে মোড় নিতে পারে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (উঝঝ)
ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ হলো ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। প্লাজমা লিকেজ ও প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে মূলত ডেঙ্গু শক সিনড্রম হয়। এর লক্ষণগুলো হলো-
– রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া।
– নাড়ির স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হয়।
– শরীরের হাত পা ও অন্যান্য অংশ ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
– প্রস্রাব কমে যায়।
– হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে।
ডেঙ্গু শক সিনড্রমের যথাযথ চিকিৎসা না হলে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। তাই উপর্যুক্ত লক্ষণগুলো দেখা দিলে মোটেও কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

ডেঙ্গু ও করোনা আলাদা করা উপায়
কিছু লক্ষণ এবং উপসর্গ আছে যেগুলা শুরুর দিকে ডেঙ্গুজ্বর এবং কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে একই রকম। রোগীর সঠিক চিকিৎসার জন্য ডেঙ্গু নাকি করোনা নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু ও কোভিড উভয় ক্ষেত্রেই জ্বর, গলাব্যথা, সর্দি, এবং স্বাদ না থাকা হতে পারে। করোনার ক্ষেত্রে এসব লক্ষণের সাথে নাকে ঘ্রাণ পায় না এবং কারো কারো পাতলা পায়খানা হয়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা হতে পারে, যা ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে হয় না। ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে শরীরে লাল অ্যালার্জির মতো র‌্যাশ হতে পারে। রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যেতে পারে। করোনাতে এরকম দেখা যায় না।
সর্বোপরি একজন চিকিৎসকই পারবেন রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে কিংবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার মাধ্যমে রোগীর সঠিক কারণ নির্ণয় করতে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকরা অনেক রোগীকে ডেঙ্গুজ্বর এবং কোভিড-১৯ দুটোরই পরীক্ষা করার উপদেশ দিয়ে থাকেন।

প্রয়োজনীয় পরীক্ষা
ডেঙ্গুজ্বর নিশ্চিত হওয়ার জন্য ঘঝ১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হয়। ঘঝ১ জ্বর শুরু হওয়ার ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত পজিটিভ আসতে পারে। তাই জ্বর শুরুর পর ৩ দিন হয়ে গেলে ঘঝ১ ও ওমগ কিংবা শুধু ওমগ নামক অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হয়। ওমএ নামক আরেকটি পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। যদিও ডেঙ্গুর সক্রিয় অবস্থা নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষাটি অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে, বাকি জীবনে ওমএ পজিটিভ থাকে।
আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের অবস্থা বিশেষ করে প্লাটিলেট ও হেমাটিক্রিট দেখার জন্য করা হয় ঈইঈ (ঈড়সঢ়ষবঃব ইষড়ড়ফ ঈড়ঁহঃ) নামক পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। গুরুতর ডেঙ্গুরোগীর ক্ষেত্রে নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এছাড়া রোগীর সার্বিক অবস্থা বুঝে চিকিৎসক অন্যান্য পরীক্ষা দিয়ে থাকেন।

চিকিৎসা
ডেঙ্গুজ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সাধারণত নিজ থেকেই ২ থেকে ৭ দিনের মধ্যে এই জ্বর ভালো হয়ে যায়। তাই ডেঙ্গুর চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামলই যথেষ্ট। ঘঝঅওউ জাতীয় ঔষধ (যেমন এসপিরিন বা ইবুপ্রোফেন) কোনক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে।
তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চলতে হবে, যাতে ডেঙ্গুজনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়। বিশেষ করে জ্বর কমতে শুরু করলে রোগীকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা লাগবে। এ সময় রোগী গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে। গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলেই কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

অযথা অ্যান্টিবায়োটিক নয়
ডেঙ্গুজ্বরে অথবা অন্য কোন জ্বরেও অযথা অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা উচিত নয়। দেখা যায়, জ্বর হলে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়েই, ঔষধ বিক্রেতার কথায় কিংবা নিজ থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন শুরু করেন। রোগ শনাক্ত না করে এ ধরনের পদক্ষেপ বিপজ্জনক।

ডেঙ্গু রোগীর পরিচর্যা
– সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে।
– যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।
– প্রচুর ফল খেতে হবে। বিশেষ করে ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ ফল যেমন মাল্টা, কমলা, পেঁপে, লেবু পেয়ারা ইত্যাদি। এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
– রোগী খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে।
– জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।
– খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত আমিষ থাকতে হবে। দুধ, ডিম ও এগুলোর তৈরি নানা খাবার, মাছ ও গোশত খেতে হবে।
– ইদানীং ডেঙ্গুতে অনেকেরই পেটে হজমের সমস্যা, বমি, পেট ব্যথা হচ্ছে। যকৃতেও অস্বাভাবিকতা হয় ডেঙ্গুতে। তাই অতিরিক্ত মসলা ও চর্বি তেলযুক্ত খাবার না খাওয়াই ভালো।
ষ শিশুদের খাবার দাবারের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। এরা সহজেই ডিহাইড্রেটেড হয়।

ডেঙ্গুজ্বর কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়
ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হল এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং আক্রান্ত বা সুস্থ কাউকে যেন এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। এডিস মশা জমে থাকা স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে লার্ভা হয়, লার্ভা পরিণত হয়ে পিউপা এবং পরে মশা হয়। ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পানি এদের পছন্দ নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সাথে মশকনিধনের জন্য প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সেজন্য যে কাজগুলো আমরা করতে পারি:
– বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
– ভাঙা ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার বা এমন কিছু যাতে পানি জমে থাকে, সরিয়ে ফেলতে হবে।
– ব্যবহৃত জিনিস যেমন মুখ খোলা পানির ট্যাংক, ফুলের টব ইত্যাদিতে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
– ঘরের বাথরুমে বা অন্য কোথাও যেমন অ্যাকুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচে যেন জমানো পানি না থাকে।
– এডিস মশা সাধারণত দিনে বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে বের হতে প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
– দিনে ঘুমালে মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে।
– ঘরের চারদিকে দরজা জানালায় নেট লাগাতে হবে।
– বাইরে যাওয়ার সময় লম্বা হাতাযুক্ত কাপড়চোপড়, মোজা, শু পরলে ভালো হয়।
– বাচ্চারা যখন স্কুলে বা মাঠে খেলতে যায় যেন হাফ প্যান্ট পরে না যায় খেয়াল রাখা দরকার। তাদের হাতে পায়ে মসকুইটো রিপেলেন্ট ক্রিম মেখে দেয়া যেতে পারে।
– ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে করে রোগীকে কোনো মশা কামড়াতে না পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভ্যাকসিন
FDA (US Food & Drug Administration) ২০১৯ সালে উবহমাধীরধ নামক একটি ভ্যাকসিন অনুমোদন দিয়েছে। উবহমাধীরধ পৃথিবীর প্রায় ২০টি দেশে অনুমোদন পেয়েছে এবং ১১টি দেশে ভ্যাকসিনটি বাণিজ্যিকভাবে বিপণন হচ্ছে। যারা অন্তত একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে কেবল তাদেরকে এই ভ্যাকসিন দেয়া যায়। বাংলাদেশে এ ভ্যাকসিনের কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।

ডেঙ্গু সম্পর্কিত নানা প্রশ্ন
এডিস মশা কি শুধু দিনে কামড়ায়?
এডিস মশা সাধারণত দিনে কামড়ায়। বিশেষ করে ভোরবেলা ও সূর্যাস্তের পূর্বে এ মশা বেশি কামড়ায়। তবে কদাচিৎ হলেও এডিস মশা রাতেও কামড়ায় এরকম প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই দিনে কিংবা রাতে সবসময় সতর্কতা জরুরি।

শুধু কি পায়েই কামড়ায় এডিস মশা?
দেশে একটা কথা ছড়িয়ে পড়েছে, এডিস মশা শুধু মানুষের পায়েই কামড়ায়। এ দাবি ভিত্তিহীন। শরীরের অনাবৃত যেকোনো অংশেই এডিস কামড়াতে পারে। পা অধিকাংশ সময় অনাবৃত থাকে কিংবা দেহের উপরের অংশের তুলনায় পায়ের দিকে দৃষ্টি কম থাকায় যেকোনো মশা-ই পায়ে বেশি কামড়ানোর সুযোগ পায়।

এডিস মশা কামড়ালেই কি ডেঙ্গু হয়?
এডিস মশা কামড়ালেই ডেঙ্গুজ্বর হবে, বিষয়টি এমন নয়। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা কামড়ালেই কেবল ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কামড়ানোর ৪-১০ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশিত হতে পারে।

ডেঙ্গু হলেই কি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়?
সাধারণ ডেঙ্গুতে হাসপাতাল ভর্তি হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেই রোগীর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। তবে জ্বর কমতে শুরু করলে যদি সিভিয়ার ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশ পায় সেক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া জরুরি হতে পারে।

পেঁপে পাতার রস কি ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে?
পেঁপে পাতার রসে কাইমোপ্যাপিন ও প্যাপাইন রয়েছে? যা রক্তের প্লাটিলেটের সংখ্যা ও রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। তাই পেঁপে পাতার রস খেলে ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা বেড়ে যায়। এ ধরনের একটা কথা বাংলাদেশ ও পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রচলিত আছে। তবে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। যদিও অনেকে পেঁপে পাতার রস খেয়ে উপকৃত হয়েছেন বলে মতামত দিয়েছেন। পেঁপে পাতার বিষয়টি এখনো গবেষণাধীন।

ডেঙ্গুতে যেসব ঔষধ খাওয়া উচিত নয়
ডেঙ্গুতে ঘঝঅওউ জাতীয় ঔষধ (যেমন এসপিরিন বা ইবুপ্রোফেন) কোনোক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। তবে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। স্বাভাবিক ওজনের একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির জন্য প্যারাসিটামলের সর্বোচ্চ ডোজ প্রতিদিন চার গ্রাম। কিন্তু কোনো ব্যক্তির যদি লিভার, হার্ট এবং কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা থাকে, তাহলে প্যারাসিটামল সেবনের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

প্লাটিলেট নিয়ে চিন্তিত?
প্লাটিলেট কাউন্ট নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার কোনো প্রয়োজন নেই। বিষয়টি চিকিৎসকের উপর ছেড়ে দেয়াই ভালো। প্রতি ঘন মিলিমিটার রক্তে একজন সুস্থ ব্যক্তির প্লাটিলেট থাকে দেড় থেকে সাড়ে চার লাখ। ডেঙ্গুতে এ পরিমাণ অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই দেড় লাখ কিংবা এক লাখের নিচে নেমে আসে। এতে চিন্তার কিছু নাই, সুস্থতার সাথে সাথে প্লাটিলেটের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। তবে প্লাটিলেটের পরিমাণ ২০ হাজারের নিচে চলে এলেই কেবল রক্তক্ষরণের ভয় থাকে। আর তা যদি ৫ হাজারের কম হয়, তাহলে মস্তিষ্ক, কিডনি, হৃৎযন্ত্রে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে। তাই কখনো কখনো প্লাটিলেটের পরিমাণ ১০ হাজারের নিচে নেমে এলে রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসকরা রোগীকে রক্ত বা প্লাটিলেট ট্রান্সফিউশনের উপদেশ দিয়ে থাকেন।

একজন মানুষ কি একাধিকবার ডেঙ্গু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে?
কোনো ব্যক্তি একবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে তিনি ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আজীবন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেন। সমস্যা হলো তিনি আরো তিনবার ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হতে পারেন। কারণ চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস রয়েছে। প্রত্যেকটি ভাইরাসই আলাদা আলাদাভাবে সংক্রমণ করতে পারে। ধরুন কোন ব্যক্তি যদি উঊঘঠ-১ দ্বারা আক্রান্ত হলেন। তাহলে তিনি শুধুমাত্র উঊঘঠ-১ এর বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করবেন। বাকি তিন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। বাকি তিন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা ঐ ব্যক্তি জীবনে আরো তিনবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি জীবনে চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা সর্বোচ্চ চারবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হতে পারেন। যারা আগেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু হলে তা মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেশি দেখা।

ডেঙ্গু হওয়ার পর ভাইরাস শরীরে থেকে যেতে পারে কি?
এরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। যেটুকু সময় জ্বর থাকে শুধু সে সময়টুকুই ভাইরাসটা সচল থাকে। এরপরে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে রক্তে আর ভাইরাসটির থাকার সুযোগ নেই। বরং ওমএ নামক অ্যান্টিবডিটি সারাজীবন রক্তে থেকে যায়। এই অ্যান্টিবডি বাকি জীবন ওই নির্দিষ্ট ধরনের ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের সুরক্ষা দেয়।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের দেশ। তার উপর পৃথিবীর উষ্ণতা ধীরে ধীরে বেড়ে চলছে। মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ এদেশে আছে। তাই ডেঙ্গুজ্বর ভবিষ্যতেও থাকবে। এদিকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর কোনো উপযুক্ত ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

লেখক : চিকিৎসক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply