ড. কাজী দীন মুহম্মদ প্রাজ্ঞ-পুরুষ, প্রখর প্রতিভা

মোশাররফ হোসেন খান

ড. কাজী দীন মুহম্মদ। আমাদের বাংলা সাহিত্যের এক বহুদর্শী প্রাজ্ঞপণ্ডিত এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনুষঙ্গে এক অনিবার্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর হাতে উঠে এসেছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হীরকসমান অজস্র মণি-মাণিক্য। আমরা প্রথমত তাঁর পরিচিতি ও সৃষ্টিপুঞ্জের দিকে দৃষ্টি দেব। এক নজরে দেখে নেব ড. কাজী দীন মুহম্মদের বহুবর্ণিল চিত্রল চিত্রায়ন।
ড. কাজী দীন মুহম্মদের পিতা কাজী আলিমুদ্দিন আহমদ। মাতা- মোসাম্মৎ কাওসার বেগম; জন্ম- ১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৭; জন্মস্থান- নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার রূপসী গ্রাম। স্থায়ী ঠিকানা- গ্রাম ও ডাকঘর: রূপসী, থানা : রূপগঞ্জ, জেলা : নারায়ণগঞ্জ। পিতামহ- কাজী গোলাম হোসেন; পিতামহী- মোসাম্মৎ রহিমা খাতুন; মাতামহ- মাওলানা শরাফতুল্লাহ্ চিশতী; মাতামহী- মোসাম্মৎ সালেহা বেগম।
কর্মজীবন
ড. কাজী দীন মুহম্মদ ১৯৪৯ সালে এম.এ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন। ১৯৫০ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় তাঁর লেখাপড়া শেষ করতে এক বছর দেরি হয়। লেখাপড়া শেষ করে সিএসপি হওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু একদিন মাস্টার্স পরীক্ষার পর ভিসি সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেনের সাথে দেখা করে নিজের ইচ্ছা ব্যক্ত করলে ভিসি তাঁকে তাঁর মনের আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করে বলেন, ‘আপনাদের ইউনিভার্সিটি আপনারা রক্ষা না করলে কে করবে?’ এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষকদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। তারপর মাত্র কিছুদিন হলো দাঙ্গা শেষ হয়েছে। তখন তিনি আর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি, শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে চূড়ান্ত করেন। অবশ্য রেজাল্ট বের হওয়ার আগে তিনি দুই মাস রংপুর কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৫১ সালে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ছিলেন, ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর [রিডার] হিসেবে শিক্ষকতা করার পর ১৯৭৬ সালে প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে তিনি তাঁর পেশাগত জীবন থেকে অবসর নেন। এর মধ্যে তিনি ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত চার বছর বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের মাঝে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা ছিলেন। এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর পরিচালকের [বর্তমান ডিজি] দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর কিছুদিন তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি কিছুদিন সেখানে ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। শিক্ষানুরাগী এই ব্যক্তি শিক্ষাবিষয়ক কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেকে সক্রিয়ভাবে জড়িত রেখেছিলেন আজীবন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি ‘ড. কাজী দীন মুহম্মদ আদর্শ শিক্ষাভবন’-এর রেক্টর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ‘কলেজ অব এডুকেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ [সেডস]’-এর র্বোড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি ছিলেন।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ বাংলা একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, ল্যাঙ্গুয়েজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, লাহোর, পাকিস্তানের জীবন সদস্য। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ আর্ট ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণা পরিষদের সদস্য হিসেবে অবদান রাখেন। তিনি বাংলা একাডেমীর নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ স্কুল টেক্সটবুক বোর্ডের পাঠ্যক্রম কমিটির সদস্য ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও তৎকালীন দেশের সকল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লার সদস্য ছিলেন।  তিনি ইসলাম প্রচার সমিতি ও বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে কাজ করেছেন।
তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুই বছর জেল খেটেছেন। এতে তিনি মানসিকভাবে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন তেমনি পারিবারিক জীবনেও বিপর্যয় নেমে আসে। যার রেশ তিনি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। একাত্তরে তার সংগৃহীত অত্যন্ত মূল্যবান ও দামি বইপত্রসহ প্রায় ১৩ হাজার বই লুট হয়ে যায়, সেদিককার ক্ষতিও তিনি পুষিয়ে উঠতে পারেননি। তার মধ্যে নিজের কিছু মূল্যবান পাণ্ডুলিপিও ছিল।
জীবনের বিভিন্ন সময় তিনি ওয়াজ মাহফিলের বক্তা ছিলেন। তিনি বেশ সুনামের সাথেও ওয়াজ করতেন। এটাকে  কখনো পেশা হিসেবে না নিলেও জীবনে বহু ওয়াজ করেছেন। কলাবাগানের ১২৯ নম্বর বাড়িতেই তিনি মৃত্যুর আগে বসবাস করতেন। এই বাড়িকে কেন্দ্র করেই আজকের রাজধানী ঢাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কলাবাগান-এর নামকরণ করা হয়।
সাহিত্যজীবন
স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ড. কাজী দীন মুহম্মদ লেখালেখি শুরু করেন। ক্লাস সেভেনে থাকতেই স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ছাপা হয়। পরপর তিনটি প্রবন্ধ তিনটি ইস্যুতে ছাপা হয়েছিল। পরে কলেজে উঠে সাপ্তাহিক ও মাসিক মোহাম্মদীতে লেখা শুরু করেন। স্কুলে থাকাবস্থায় ‘জঞ্জাল’ নামে একটি গল্প আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয়। গল্পের বিষয়বস্তু ছিল নায়ক অনেকের অসুবিধা, সমস্যা দূর করে পরে নিজে মারা যায়। সে সময় ড. কাজী দীন মুহম্মদ-এর বেশ কিছু কবিতাও পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়।
ছোটবেলা থেকেই তাঁর ভেতর লেখালেখির একটা প্রবণতা ছিল। পরবর্তীতে নানারকম আগ্রহ ও অগ্রজদের অনুপ্রেরণায় সাহিত্যের জগতে তিনি একনিষ্ঠভাবে কাজ শুরু করেন। প্রথম দিকে গল্প ও উপন্যাস দিয়ে লেখা শুরু করলেও পরে অনেক কবিতা লেখেন। তবু তিনি নিজেকে কবি বলে দাবি করতে চাননি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি তাঁর ১০টি মূল্যবান বইয়ের পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেন। তার ভেতর ভাষাতত্ত্বের বিষয়ও ছিল, গল্প-উপন্যাসও ছিল, প্রবন্ধ ছিল। সেই পাণ্ডুলিপির অনুরূপ নতুন প্রস্তুতিতে তিনি নিজেকে আর নিমগ্ন করতে পারেননি। জেলের দুই বছরের বিপর্যয়ের ফলে পরবর্তীতে তার পক্ষে মূল্যবান ক্রিয়েটিভ কিছু করা আর সম্ভব হয়নি। ভাষার ওপর তিনি বিশেষজ্ঞ এবং এর ওপরই তার প্রধান কাজ ছিল। তিনি একজন খ্যাতিমান ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবেই সমধিক পরিচিত।
ড. কাজী দীন মুহম্মদের প্রকাশিত গ্রন্থÑ
মানব মর্যাদা [১৯৬০; ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনস] ২. পাকিস্তান সংস্কৃতি [১৯৬১; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ৩. সাহিত্য শিল্প [১৯৬৪; আহমদ পাবলিশিং হাউস] ৪. সাহিত্য সম্ভার [১৯৬৫; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ৫. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস [১-৪ খণ্ড] [১৯৬৮; স্টুডেন্টস ওয়েজ] ৬. লোকসাহিত্যে ধাঁধা ও প্রবাদ [১৯৬৮; বাংলা একাডেমী] ৭. সূফিবাদ ও আমাদের সমাজ [১৯৬৯; নওরোজ কিতাবিস্তান] ৮. সে কালের সাহিত্য [১৯৬৯; পুথিপুস্তক] ৯. সংস্কৃতি ও আদর্শ [১৯৬৯; পুথিপুস্তক] ১০. এ কালের সাহিত্য [১৯৭০ পুথিপুস্তক] ১১. ভাষাতত্ত্ব [১৯৭১; বইবিতান] ১২. জীবন সৌন্দর্য [১৯৭৩; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ১৩. বর্ণমালা [১৯৭৪; স্বকীয়তা] ১৪. প্রবাত [কাব্যগ্রন্থ, ১৯৭৫; স্বকীয়তা প্রকাশনী] ১৫. একুশের আগাছারা [কাব্যগ্রন্থ, ১৯৭৬] ১৬. সুফিবাদের গোড়ার কথা [১৯৮০; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ১৭. মানব জীবন [১৯৮১; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ১৮. প্রতিবর্ণায়ন নির্দেশিকা [ ১৯৮২; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ১৯. The verb structure in colloquial bengli [১৯৮৫; বাংলা একাডেমী] ২০. ঘুষ [গল্পগ্রন্থ, ১৯৮৫] ২১. সুখের লাগিয়া [১৯৮৯; পুথিপুস্তক] ২২. শিক্ষা [১৯৮৯; পুথিপুস্তক] ২৩. ইসলামী সংস্কৃতি [ ১৯৮৯ পুথিপুস্তক] ২৪. সমাজ সংস্কৃতি ও সাহিত্য [১৯৯০, পুথিপুস্তক] ২৫. বাংলাদেশে ইসলামের আবির্ভাব [১৯৯০, স্বকীয়তা প্রকাশনী] ২৬. বিচিত্র প্রবন্ধ [১৯৯১; মারকাযুল কুরআন] ২৭. নাস্তিকতা ও আস্তিতা [১৯৯৩; মারকাযুল কুরআন] ২৮. আমি তো দিয়েছি তোমাকে কাওসার [১৯৯৩; মারকাযুল কুরআন] ২৯. মহানবীর বাণী শতক [১৯৯৮; মারকাযুল কুরআন] ৩০. বিধান তো আল্লাহরই [১৯৯৯; মারকাযুল কুরআন] ৩১. অবিশ্বাস্য [১৯৯৯, স্বকীয়তা] ৩২. বাণী চিরন্তন [১৯৯৯; পুঁথিপুস্তক] ৩৩. ছোটদের হযরত মোহাম্মদ [সা] [১৯৯৯; ইসলামিক ফাউন্ডেশন] ৩৪. Thus spoke prophet Muhammad [sm] [২০০০; স্বকীয়তা প্রকাশনী] ৩৫. হাসাহাসি [২০০০; পুথিপুস্তক] ৩৬. বিসমিল্লাহর তাৎপর্য।
তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত কুরআন শরীফ, বোখারি, তিরমিযি, মোয়াত্তা, আবু দাউদ হাদিসগ্রন্থের অনুবাদ ও সম্পাদনার সাথে জড়িত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সম্মেলনে  অংশগ্রহণ :
1.    Third International Congress for classic studies, London,1958.
2.    Asian Writers Conference, New Delhi, 1950.
3.    Pakistan Lingustic Association, Lahore, 1964,65 & 68.
4.    International Islamic Conference, Colombo, 1978.
5.    International Seminer, Iran, 1984.
দেশ ভ্রমণ :
ড. কাজী দীন মুহম্মদ একজন স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদের পাশাপাশি একজন ভ্রমণ পিপাসু ব্যক্তিও। নিজের দেশ বাংলাদেশের প্রায় অঞ্চলই তার দেখা। ডক্টরেট ডিগ্রি লাভের জন্য বিলেত যাওয়া বাদেও তিনি নানা আন্তর্জাতিক সেমিনারে অনেক দেশে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। সরকারি কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও ভ্রমণের আকাক্সক্ষা তীব্র হওয়ার কারণে পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছেন। তার ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও বিশাল। বিশ্বের প্রায় গুরুত্বপূর্ণ দেশেই তিনি গিয়েছেন। যে সব দেশে তিনি ভ্রমণ করেছেন:
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সাইপ্রাস, গ্রিস, সিরিয়া, ব্রিটেন, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, আলজেরিয়া, মরোক্কো, সুদান, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, মেক্সিকো, কিউবা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, আমেরিকা, মিসর।
পুরস্কার ও সম্মাননা:
১.    বাংলাদেশ দায়েমী কমপ্লেক্স পুরস্কার [১৯৮৯]।
২.    বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার [১৯৯০]।
৩    Distinguished leadership award, American biographical institute published in 7th edition of biographical encyclopedia.
৪    Pandit Iswar Chandra Vidyasagar gold plaque [2002] the Asiatic Society, Calcutta, India.
৫.    আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রকল্প স্বর্ণপদক [২০০৩]।
৬.    কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার [২০০৪]।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলেও সত্য যে, যে বাংলা একাডেমীর পরিচালক ছিলেন [তখন ডিজি ছিলেন না, পরিচালকই ছিলেন প্রধান], সেই বাংলা একাডেমী, সেই ‘জাতির মননের প্রতীক’ থেকে বাংলা সাহিত্যের এই সাধক পুরুষ কোনো পুরস্কার পাননি। জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান কোথায়Ñএতেই সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ মূলত ভাষাতাত্ত্বিক রূপে আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী। তবে ভাষাতত্ত্ব ব্যতীত বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য বিষয়েও তাঁর আলোচনা-গবেষণার নজির রয়েছে। কেবল ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যের নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপক এবং ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবেও তিনি সকলের নিকট সম্মানিত ও সুপরিচিত। একজন মৌলিক গবেষক, ভাষাতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ ড. কাজী দীন মুহম্মদ লিখেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসও। সে জন্য এই বহু মাত্রিক ও বহুকৌণিক সাহিত্য প্রতিভার সমগ্র পরিচয়Ñএকটা সাধারণ নিবন্ধে দেয়া সম্ভব নয়।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতকে সমর্থন করে এই যুগে গৌড়ীয় অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব বলে জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেনÑ‘আধুনিক ভারতীয় আর্য ভাষাগুলোর প্রাচীনতম রূপ ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত। বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ পরিবর্তন করে মধ্য বাংলায় [গবফফষব ইবহমধষর] পরিণত হয়। এ মধ্য বাংলা থেকে আধুনিক বাংলার [গড়ফবৎহ ইবহমধষর] উৎপত্তি হয়েছে। প্রাচীন বাংলা ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। সন্ধি যুগ ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। মধ্য যুগ ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। নব্য যুগকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পুরাতন কাল এবং ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ হতে এখন পর্যন্ত বর্তমান কাল।
ড. কাজী দীন মুহম্মদ সাত হাজার বছর পাড়ি দিয়ে বাংলা ভাষার রূপ রূপায়ণের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আজ পর্যন্ত কোনো বিরোধের মুখোমুখি হয়নি।
সৈয়দ আলী আহসানের দৃষ্টিতে, ‘ড. কাজী দীন মুহম্মদ খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। নিম্ন শ্রেণী থেকে আরম্ভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শ্রেণীতে কুশলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে পি.এইচ. ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রাবস্থা থেকে তাঁকে দেখে আসছি। সকল ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে তিনি অপরাজেয় ছিলেন কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর স্বধর্মে নিষ্ঠা। শরীয়তের নিয়মাবলি পালন করার সঙ্গে সঙ্গে সুফী তত্ত্বে তিনি দীক্ষা নিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর ধর্ম চর্চার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। মেধাবী ছাত্র অনেক দেখা যায়; কিন্তু মেধার সঙ্গে আত্মজিজ্ঞাসা অনেকের থাকে না। দীন মুহম্মদের আত্ম-জিজ্ঞাসা প্রবল ছিল। দীন মুহম্মদ আধুনিক নন, আবার প্রাচীনপন্থীও নন। স্বাভাবিক শৃঙ্খলায় তিনি মানুষ হয়েছেন। শিক্ষক হিসাবে দীন মুহম্মদ কি রকম তা আমি জানি না। কিন্তু তাঁর ছাত্রদের মুখে আমি তাঁর প্রশংসা শুনেছি। শুনেছি যে জটিল ভাষাতত্ত্বের ব্যাখ্যা তিনি অবলীলাক্রমে করতে পারেন। এক সময় তিনি টেলিভিশনে কুরআন শরীফ পাঠ করেছেন এবং ব্যাখ্যাসহ তা পরিবেশন করেছেন। আমার এ অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয়েছিল। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তাঁর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায়। চকবাজারে এক হেকিম সাহেব ছিলেন। তিনি আমাদের পরিবারের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার সঙ্গে দীন মুহম্মদের খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। দীন মুহম্মদ তার মাহফিলে প্রায়ই উপস্থিত থাকতেন এবং মনোযোগ দিয়ে তাসাউফের জটিল তত্ত্বের ব্যাখ্যা শুনতেন। আমি হুগলিতে তাঁকে দেখেছি যখন তিনি ছাত্র। তিনি ছিলেন মেধাবী, নিয়মতান্ত্রিক এবং সরল। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। মধ্যবিত্তদের সুবিধা-অসুবিধা সবকিছু অতিক্রম করে তিনি মেধা ও মননে সকলের অগ্রগামী হয়েছিলেন। মেধাবী ছাত্র অনেক দেখা যায়, জীবনে তারা অনেক কিছু সঞ্চয় করে। দীন মুহম্মদ সে রকম মেধাবী ছাত্র ছিলেন না। মেধার সঙ্গে ধর্মবোধের সাযুজ্য রক্ষা করে দীন মুহম্মদ জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তিনি সংসার জীবনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতার জন্য তাঁর অভিমান ছিল না। আমি যখন বাংলা একাডেমীতে তখন একাডেমী বৃত্তি নিয়ে কিছু সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী গবেষণা করতো। সে গবেষণা প্রকল্পে দীন মুহম্মদ সাহায্য করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের যথেষ্ট পরিশ্রম করিয়ে নিতেন। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের গবেষণা প্রকল্পের আমি পরীক্ষক ছিলাম। যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের গবেষণা পরিচালনা করেছেন তা খুবই প্রশংসনীয়। বাংলা একাডেমীর অনেক কাজে তিনি অংশ নিয়েছেন এবং দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।’
কথাশিল্পী শাহেদ আলীর দৃষ্টিতে- ‘ড. কাজী দীন মুহম্মদ আমাদের দেশের প্রবীণতম শিক্ষাবিদগণের অন্যতম। তিনি দীর্ঘকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের পদস্থ কর্মকর্তা, ছিলেন বাংলা একাডেমীর একজন সফল পরিচালক। তিনি ছাত্র হিসাবে প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পাঠ্য পুস্তক নির্বাচন এবং শিক্ষার সব স্তরের পরীক্ষার সংগে তাঁর সম্পৃক্ততা দীর্ঘ দিনের। তিনি কাজ করেন নীরবে। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছিলেন ভাষাতত্ত্বের ওপর। তিনি যে ডিগ্রিটি অর্জন করেছিলেন, শোনা যায়, এই উপমহাদেশে আর কেউ অনুরূপ ডিগ্রি আজও লাভ করেননি। কিন্তু এজন্য তাঁর কোনো অহমিকা নেই। তাঁর চালচলনে, কথাবার্তায় কেউ বুঝতে পারবে না যে তিনি এদেশের একজন সেরা পণ্ডিত।
সেই ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার মোহ থেকে মুক্ত। যেন-তেন প্রকারে জনপ্রিয়তা অর্জন কখনো তাঁর লক্ষ্য ছিল না। এখনো নেই। তিনি নিজেকে কখনো স্রোতে ভাসিয়ে দেননি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তাঁর অধ্যয়নের বিষয় হলেও তিনি তাঁর চিন্তাকে প্রসারিত করেছেন। তিনি আজীবন পড়াশোনায় মগ্ন থেকে শিল্প-সাহিত্য ও সমাজের সকল অঙ্গনে বিচরণ করেছেন। এখনো তাঁর অধ্যয়নের বিরাম নেই। এখনো তিনি লিখে চলেছেন। তাঁর প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা ছোট-বড় মিলিয়ে কুড়িটির মতো। এর মধ্যে বিশাল পরিসরে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস [প্রথম থেকে চতুর্থ খণ্ড] আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসকে প্রকৃতই সমৃদ্ধ করেছে।  ভাষাতত্ত্ব; সাহিত্য শিল্প; বর্ণমালা, একালের সাহিত্য, সেকালের সাহিত্যÑএসব তাঁর দীর্ঘ জীবনের সাহিত্য চিন্তার স্বাক্ষর বহন করে। মানব জীবন, জীবন সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও আদর্শ, মানব মর্যাদা, প্রভৃতি পুস্তকে জীবনরসিক কাজী দীন মুহম্মদ তাঁর চিন্তার বিচিত্রগামিতার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি ইসলামে গভীরভাবে বিশ্বাসী বলে তাঁর সমস্ত রচনার মধ্যে একটি বলিষ্ঠ প্রত্যয় এবং প্রবল আশাবাদ ধ্বনিত হয়। তাঁর সমস্ত কাজ কর্মেরই লক্ষ্য সমাজমুখী, সমাজের উন্নতি ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ। তিনি বিশ্বাস করেন ইসলামের মর্মবাণীতে। অনুরঞ্জিত ও অনুপ্রাণিত ব্যক্তি ও সমাজই মানবজীবনের সার্থকতা অর্জন করতে পারে। এই বিশ্বাসের বশে তিনি তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে মানুষকে আলোকিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।’
ড. আনিসুজ্জামানের শিক্ষক ছিলেন ড. কাজী দীন মুহম্মদ। তিনি তাঁর স্মৃতিতে এভাবে মূল্যায়ন করেন, ‘ড. কাজী দীন মুহম্মদ স্যারকে আমি তিন দশকেরও অধিককাল ধরে জানি। ঘনিষ্ঠতা দু’দশকের বেশি সময়ের। এ সময় আমরা কলাভবনের দোতলায় পাশাপাশি রুমে বসতাম। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাস কালে তো বটেই, এমনকি ষাট বছর বয়স হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা ছেড়ে কলাবাগানে তাঁর নিজের বাড়িতে চলে যাওয়ার পরও স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত আসতেন এবং তাঁর রুমে বসে কাজ করতেন। অনেক অধ্যাপকের মতো প্রায়ই অনুপস্থিত থাকতেন না। তাকে কেবল তাঁর নিজ কক্ষ ও ক্লাস রুমেই নিয়মিত পাওয়া যেত না, প্রয়োজনে পরীক্ষার হলে তত্ত্বাবধায়কের কাজ করতেও তিনি ইতস্তত করতেন না, অথচ একটু সিনিয়র হলে আমাদের মাঝে অনেকেই পরীক্ষার হলে যেতে উৎসাহ বোধ করতেন না। অথচ পরীক্ষার হলে তিনি অলসভাবে সময় কাটাতেন না।…স্যার অত্যন্ত কৃতী ছাত্র ছিলেন এবং আমাদের এ অঞ্চলে তিনিই ভাষাতত্ত্বের ওপর প্রথম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রিপ্রাপ্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যানসহ দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করা ছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমির সর্বোচ্চ পদটিতে দীর্ঘদিন সমাসীন ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত সাদাসিধে ও সুফি প্রকৃতির মানুষ তিনি। তাঁকে দেখে কেউ বুঝতে পারবে না যে তিনি বাংলার অধ্যাপক, অনেক বিদেশী ভাষা জানেন; সর্বোপরি, পাশ্চাত্যের অন্যতম অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী লন্ডনে দীর্ঘদিন অধ্যয়ন ও গবেষণাসূত্রে বসবাস করেছেন এবং ভাষাতত্ত্বের মতো জটিল, বহুমাত্রিক ও আধুনিক বিষয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুনামের সাথে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ভাষাতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ হলেও তাঁর পড়াশুনা ও গবেষণার গভীরতা ও ব্যাপ্তি অনেক। কর্মময় দীর্ঘজীবনে তিনি প্রচুর লিখেছেন।’
বাংলাদেশের দু’জন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বÑআমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ এবং ড. কাজী দীন মুহম্মদের ব্যাপারে কিছুটা ব্যক্তিগত কষ্টবোধ রয়ে গেছে। দু’জনই মেধাবী, পণ্ডিত এবং স্ব স্ব বিষয়ে সমধিক প্রাজ্ঞ। কিন্তু আমার কষ্টবোধটা ঐখানে যে, তাঁরা তাঁদের চারণক্ষেত্র ছাড়িয়ে বহুবিধ কর্মধারায় গোটা জীবনই ব্যস্ত থেকেছেন। বিষয়ী-সীমার মধ্যে থাকলে তাঁদের কাছ থেকে বাংলা সাহিত্য আরও অনেক বেশি লাভবান হতে পারতো। এটাও হতে পারে যে, তাঁরা সাহিত্যের পাশাপাশি সামাজিক অন্যবিধ দায়িত্ববোধেও সমান সজ্ঞাত এবং পরিচালিত। সমাজই তাঁদের কাছ থেকে সময়ের প্রয়োজনীয়তা আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু তাতে করে তাঁরা তাঁদের মৌল কর্ম ক্ষেত্র থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন। এই অপূরণীয় ক্ষতিই আমাকে আজও ব্যথিত করে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই প্রবীণতম প্রাজ্ঞ পুরুষ ড. কাজী দীন মুহম্মদকে বাংলা একাডেমী  নয়, পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত করছে চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র। এটা আমাদের জন্য অবশ্যই শ্লাঘার বিষয়। চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্র তাঁকে পুরস্কৃত করে আমাদের এই হীনম্মন্য জাতির ঋণভার অনেকটাই হালকা করে দিল। এজন্য চট্টগ্রাম সংস্কৃতি কেন্দ্রের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ মুবারকবাদ। আশা করি চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির এমনি মহৎ কর্মধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। সেটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।
লেখক : কবি ও সম্পাদক, নতুন কলম ও নতুন কিশোরকণ্ঠ

SHARE

Leave a Reply