ড. কাজী দীন মুহম্মদ

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান

Chhatrasangbadশিক্ষা, সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব ও জ্ঞান-গবেষণার ক্ষেত্রে যেসব মনীষী বাংলাদেশে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন, প্রফেসর ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ (জন্ম ১ ফ্রেবুয়ারি ১৯২৭- মৃত্যু ২৮ অক্টোবর ২০১১) নিঃসন্দেহে  তাঁদের অন্যতম। অর্ধ শতাব্দীর অধিক কাল ধরে তিনি এসব ক্ষেত্রে ব্যাপক ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
কাজী দীন মুহম্মদ নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার অন্তর্গত রূপসী গ্রামে ১৯২৭ সালের ১ ফেব্র“য়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাজী আলিমুদ্দীন আহমদ, মাতা মোসাম্মৎ কাওসার বেগম। পিতা কাজী আলিমুদ্দীন সেকালে রেঙ্গুনে এক বিদেশী কোম্পানীতে চাকরি করতেন। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে কাজী দীন মুহম্মদ ছিলেন মেঝ। তাঁর নানা মাওলানা শরাফতুল্লাহ চিশতী তৎকালে একজন পীর হিসাবে বিশেষ সম্মান ও খ্যাতি অর্জন করেন। কাজী দীন মুহম্মদের দাদা কাজী গোলাম হোসেন সোনারগাঁওয়ের ইতিহাসখ্যাত কাজী সিরাজউদ্দীনের অধস্তন পুরুষ। উক্ত কাজীর ন্যায়বিচারের কাহিনী ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। উক্ত কাজী বাংলার তৎকালীন সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহকে আদালতে এক সাধারণ বিধবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তলব করেছিলেন। পিতৃ ও মাতৃকূলের এ সমৃদ্ধ ঐতিহ্য কাজী দীন মুহম্মদের বংশধারায় প্রবহমান।
কাজী দীন মুহম্মদ ক্ষুরধার মেধা ও ধী-শক্তির অধিকারী ছিলেন। ছাত্র জীবনে শিক্ষার সর্বস্তরে তিনি বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। সেকালে সম্ভ্রান্ত বংশের রীতি অনুযায়ী কাজী দীন মুহম্মদের শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁর বিদূষী মাতা মোসাম্মৎ কাওসার বেগমের হাতে। মায়ের কাছে তিনি আরবি ভাষা শেখেন। এরপর তিনি রূপসী বোর্ড প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। চতুর্থ শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়ে তিনি ডবল প্রমোশন লাভ করেন। কিন্তু ডাবল প্রমোশনের সুযোগ না নিয়ে ধর্মীয় শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি উক্ত বিদ্যালয় ত্যাগ করে মাছিমপুর জুনিয়র মাদরাসায় পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। উক্ত মাদরাসায় দু’বছর অধ্যয়নের পর তিনি ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমান কবি নজরুল কলেজ) সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৪৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি হুগলী ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে অধ্যয়ন করে ১৯৪৫ সালে কলকাতা বোর্ড থেকে প্রথম বিভাগে তৃতীয় স্থান অধিকার করে আই এ পাস করেন। অতঃপর ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বাংলায় বি.এ (অনার্স) ও ১৯৪৯ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম. এ পাস করেন। ছাত্র জীবনে তিনি সর্বদা বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করে সরকারি বৃত্তি লাভ করেছেন। ১৯৫৭ সালে কাজী দীন মুহম্মদ সরকারি বৃত্তি নিয়ে বিলাত গমন করেন। সেখানে তিনি লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝপযড়ড়ষ ড়ভ ঙৎরবহঃধষ ধহফ অভৎরপধহ ঝঃঁফরবং বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৬১ সালে ভাষাতত্ত্বে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এই বিষয়ে এ অঞ্চলে তিনিই প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রীধারী স্কলার।
এম এ পরীক্ষা শেষ করে ফল প্রকাশের আগেই কাজী দীন মুহম্মদ রংপুর কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। প্রথম জীবনে তিনি যে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন, সেটাই ছিল তাঁর আজীবনের পেশা ও সাধনা। এরপর তিনি ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে লেকচারার হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৫১-৬১ পর্যন্ত লেকচারার, ১৯৬২-৭৬ পর্যন্ত রিডার এবং ১৯৭৬-৮৬ পর্যন্ত প্রফেসর হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ইতোমধ্যে ১৯৮১-৮৪ পর্যন্ত চার বছর তিনি বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় তিনি ডেপুটেশনে ১৯৬৪-৬৫ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা এবং ১৯৬৬-৬৯ পর্যন্ত বাংলা একাডেমীর পরিচালক (তখনো মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি হয়নি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অবসর গ্রহণের পর কাজী দীন মুহম্মদ ১৯৯৬-২০০২ পর্যন্ত ঢাকাস্থ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও ভারপ্রাপ্ত ভাইস-চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর তিনি তাঁর নিজ উদ্যোগে গঠিত ‘ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ আদর্শ শিক্ষায়তন’ এর রেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া, ‘কলেজ অব এডুকেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজ’ (সেডস) এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি ও বিভিন্ন শিক্ষা-কার্যক্রমের সাথে জড়িত থেকে তিনি শিক্ষা ও জ্ঞান-চর্চার ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রেখেছেন।
কাজী দীন মুহম্মদ বাংলা একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, লাহোরস্ত ল্যাগুয়েজ রিসার্স ইনস্টিটিউট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের জীবন সদস্য ছিলেন। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ আর্ট ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গবেষণা পরিষদ, বাংলাদেশ স্কুল টেক্সটবুক বোর্ডের পাঠক্রম কমিটিসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সাহিত্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত থেকে এসব ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকাস্থ ‘ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন’, ‘ইসলাম প্রচার সমিতি’ ও ‘বাংলাদেশ মসজিদ মিশন’ সহ বিভিন্ন শিক্ষা-সাহিত্য, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন।
ব্যক্তি জীবনে কাজী দীন মুহম্মদ উপমহাদেশের প্রখ্যাত মনীষী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একান্ত অনুরাগী ও প্রীতিধন্য ছাত্র ছিলেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মত তিনিও একজন জ্ঞান-সাধক, ভাষা-বিজ্ঞানী, সাহিত্য-সমালোচক ও কৃতি শিক্ষাবিদ ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম। শ্ক্ষিা-সাহিত্য ছাড়াও তিনি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতই একজন প্রসিদ্ধ চারণ-বক্তা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আয়োজিত সভা-সেমিনারে তিনি শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইসলামী বিষয়ের উপর তিনি বিভিন্ন সময় বক্তৃতা প্রদান করেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর জনপ্রিয়তা ও অবদান কম নয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম। সাহিত্যিক, ভাষাতাত্ত্বিক, লেখক, কবি, শিক্ষাবিদ ইত্যাদি নানা পরিচিতির মধ্যে একজন সুফী-সাধক হিসেবেও তাঁর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। এতগুলো বিরল গুণের অধিকারী এবং পাণ্ডিত্য ও মননশীলতায় একজন অসাধারণ ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল ও নিরহঙ্কারী। তাঁর দায়িত্ববোধ ও কর্তৃব্য নিষ্ঠা সম্পর্কে তাঁর ছাত্র ও পরবর্তীতে তাঁর সহকর্মী প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ডক্টর আনিসুজ্জামান বলেন:
“ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ স্যারকে আমি তিন দশকেরও  অধিককাল ধরে জানি। ঘনিষ্ঠতা দু’দশকের বেশি সময়ের। এ সময় আমরা কলা ভবনের দোতলায় পাশাপাশি রুমে বসতাম। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসবাসকালে তো বটেই, এমনকি ষাট বছর বয়স হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কলাবাগানে নিজের বাড়িতে চলে যাওয়ার পরও স্যার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত আসতেন এবং তাঁর রুমে বসে কাজ করতেন। অনেক অধ্যাপকের মতো প্রায়ই অনুপস্থিত থাকতেন না। তাঁকে কেবল তাঁর নিজ কক্ষ ও ক্লাসরুমেই নিয়মিত পাওয়া যেত না, প্রয়োজনে পরীক্ষার হলে তত্ত্বাবধায়কের কাজ করতেও তিনি ইতস্তত করতেন না। অথচ একটু সিনিয়র হয়ে আমাদের মাঝে অনেকেই পরীক্ষার হলে যেতে উৎসাহবোধ করেন না। অথচ পরীক্ষার হলে তিনি অলসভাবে সময় কাটাতেন না।… স্যার অত্যন্ত কৃতী ছাত্র ছিলেন এবং আমাদের এ অঞ্চলে তিনিই ভাষাতত্ত্বের ওপর প্রথম লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রিপ্রাপ্ত।”
ছাত্রাবস্থায় কাজী দীন মুহম্মদ লেখালেখি শুরু করেন। সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে প্রথম তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধ স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। এরপর প্রতি বছরই স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রবন্ধ ছাপা হতো। অতঃপর সাপ্তাহিক ও মাসিক ‘মোহাম্মদী’, ‘দৈনিক আজাদ’ ও অন্যান্য পত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হয়। প্রথম দিকে তিনি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ ইত্যাদি সব কিছুই লিখেছেনে। তাঁর লেখা ‘জঞ্জাল’ শিরোনামে একটি গল্প তৎকালে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখা কয়েকটি কাব্য ও গল্পগন্থ প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে তিনি গল্প, কবিতা লেখায় উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন এবং গবেষণামূলক রচনায় বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট ৩৮টি। এছাড়াও তাঁর রচিত বহুসংখ্যক গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি এখনো অপ্রকাশিত রয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের একটি ধারাবাহিক তালিকা নিচে প্রদত্ত হলোÑ
ষ    মানব মর্যাদা (১৯৬০, ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনস)।
ষ    পাকিস্তান সংস্কৃতি (১৯৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
ষ    সাহিত্য শিল্প (১৯৬৪, আহমদ পাবলিশিং হাউস)।
ষ    সাহিত্য সম্ভার (১৯৬৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
ষ    বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (১-৪ খন্ড, ১৯৬৮, স্টুডেন্টস ওয়েজ)।
ষ    লোকসাহিত্যে ধাধা ও প্রবাদ (১৯৬৮, বাংলা একাডেমী)।
ষ    সুফিবাদ ও আমাদের সমাজ (১৯৬৯, নওরোজ কিতাবস্তিান)।
ষ    সেকালোর সাহিত্য (১৯৬৯, পুথিপুস্তক)।
ষ    সংস্কৃতি ও আর্শ (১৯৬৯, পুথিপুস্তক)।
ষ    একালের সাহিত্য (১৯৭০, পুথিপুস্তক)।
ষ    ভাষাতত্ত্ব (১৯৭১, বইবিতান)।
ষ    জীবন সৌন্দর্য (১৯৭৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
ষ    বর্ণমালা (১৯৭৪, স্বকীয়তা)।
ষ    প্রভাত (১৯৭৫, কাব্যগ্রন্থ; স্বকীয়তা প্রকাশনী)।
ষ    একুশের আগাছারা (১৯৭৬, কাব্যগ্রন্থ)।
ষ    সুফিবাদের গোড়ার কথা (১৯৮০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
ষ    মানব জীবন (১৯৮১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
ষ    প্রতিবর্ণায়ন নির্দেশিকা (১৯৮২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
ষ    The Phonology of the verbal Structure in Colloquial Bengali (১৯৮৫, বাংলা একাডেমী)।
ষ    ঘুষ (১৯৮৫, গল্পগ্রন্থ)।
ষ    সুখের লাগিয়া (১৯৮৯, পুথিপুস্তক)।
ষ    শিক্ষা (১৯৮৯, পুথিপুস্তক)।
ষ    ইসলামী সংস্কৃতি (১৯৮৯, পুতিপস্তক)।
ষ    সমাজ সংস্কৃতি ও সাহিত্য (১৯৯০, পুথিপুস্তক)।
ষ    বাংলাদেশের ইসলামের আবির্ভাব (১৯৯০, স্বকীয়তা প্রকাশনী)।
ষ    বিচিত্র প্রবন্ধ (১৯৯১, মারকাযুল কুরআন)।
ষ    অবিস্মরণীয় (১৯৯১, স্ককীয়তা)।
ষ    জুমুআর ঘরে (১৯৯১, মারকাযুল কুরআন)।
ষ    নাস্তিকতা ও আস্তিকতা (১৯৯৩, মারকাযুল কুরআন)।
ষ    আমতো দিয়েছি তোমাকে কাওসার (১৯৯৩, মারকাযুল কুরআন)।
ষ    মহানবীর বাণী শতক (১৯৯৮, মারকাযুল কুরআন)।
ষ    বিধান ওতা আল্লাহরই (১৯৯৯, মারকযুল কুরআন)।
ষ    অবিশ্বস্য (১৯৯৯, স্বকীয়তা)।
ষ    বাণী চিরন্তন (১৯৯৯, পুঁথিপুস্তক)।
ষ    ছোটদের হযরত মোহাম্মদ (সা.) (১৯৯৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)।
ষ    Thus Spoke Prophet Muhammad (sm) (২০০০, স্বকীয়তা প্রকাশনী)।
ষ    হাসাহাসি (২০০০, পুঁথিপুস্তক)।
ষ    বিসমিল্লাহর তাৎপর্য।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর লেখা দশটি মূল্যবান পাণ্ডুলিপি বিনষ্ট হয়। এর মধ্যে ভাষাতত্ত্বের উপর লেখা তাঁর একটি অতি মূল্যবান পাণ্ডুলিপিও ছিল। কাজী দীন মুহম্মদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত কোরআন শরীফ, বোখারী, তিরমিযী, মোয়াত্তা, আবু দাউদ প্রভৃতি প্রখ্যাত হাদীস গ্রন্থসমূহের অনুবাদ ও সম্পাদনার সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে লেখালেখির কাজে নিয়োজিত থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা মূলব্যবান অবদান রেখে গেছেন। ‘বাংলা একাডেমীর প্রান্তর থেকে’ শিরোনামে তাঁর লেখা একটি ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী মাসিক ‘নতুন কলম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
উপরোক্ত গ্রন্থ-তালিকা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ, ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছেন। প্রথম জীবনে তিনি কিছু কবিতা ও গল্প লিখলেও মূলত প্রবন্ধকার হিসেবেই তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর প্রবন্ধের ভাষা সহজ-সরল ও অতিশয় প্রাঞ্জল। কঠিন বিষয়কেই তিনি সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাঁর লেখার মধ্যে বিভিন্ন তত্ত্ব-তথ্য ও প্রামাণ্য সূত্রের উপস্থাপনা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মননশীল ও গবেষণামূলক রচনাতেই তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।
কাজী দীন মুহম্মদ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বের উপর গবেষণা করে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ভাষাতত্বের উপর শিক্ষকতা ও গবেষণা করে তিনি বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। তিনি ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় তিনি মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন। বাংলা ভাষার ব্যুৎপত্তি সম্পর্কে তাঁর গবেষণাও পণ্ডিতজনদের নিকট বিশেষরূপে সমাদৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর পূর্বসূরি ও ওস্তাদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অনেকটা পদাঙ্কানুসারী। এ ক্ষেত্রে অবশ্য পরবর্তীরা আরো গবেষণা করেছেন এবং স্বভাবতই নতুন নতুন তথ্য আবি®কৃত হচ্ছে। তবু ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় ও বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে বিশিষ্ট প্রাচ্যবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যে চ্ন্তিা-গবেষণা করে গেছেন, তাঁর সুযোগ্য ছাত্র ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ সে পথ অনুসরণ করে অনেক নতুন চিন্তার সংযোজন ও আলোক বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছেন। ভাষাতাত্ত্বিক গবেষকগণ এজন্য তাঁকে চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
বাংলা ভাষার ইতিহাস, বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বাংলা বর্ণমালার পরিচিতি সম্পর্কে কাজী দীন মুহম্মদের রচিত গ্রন্থসমূহ সর্বাধিক গুরুত্ব লাভের অধিকারী। তাঁর রচিত ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ (১-৪ খণ্ড),‘ভাষাতত্ত্ব’, বর্ণমালা’, The Phonology of the Verbal Structure in Colloquial Bengali’ উল্লিখিত বিষয়ে মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে বিশেষভাবে সমাদৃত। ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’ চার খণ্ডে ভিভক্ত একটি বিশালাকার গ্রন্থ। এতে বাংলা সাহিত্যের আদিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইতিহাস বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। ‘ভাষাতত্ত্ব’ গ্রন্থটিও ভাষা-গবেষণার ক্ষেত্রে এক মূল্যবান মাইলফলকতুল্য গ্রন্থ। ‘বর্ণমালা’ গ্রন্থটি বাংলা বর্ণমালার স্বকীয়তা বিষয়ক একটি গবেষণামূলক মূল্যবান গ্রন্থ।
ইংরেজি ভাষায় লেখা তাঁর ‘ Zuvi ‘The Phonology of the Verbal Structure in Colloquial Bengali’’ গ্রন্থটি তিন অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে গ্রামাটিক্যাল ক্যাটালিরিজ, সিট্যাটিক স্ট্রাকচার এবং সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার গঠন প্রণালী ইত্যাদি। দ্বিতীয় অংশে স্থান পেয়েছে বাংলা স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জণধ্বনির আলোচনা। সর্বশেষ তৃতীয় অংশে বাংলা ক্রিয়াপদের নমুনা প্যালাটোগ্রাম ও কিমোগ্রাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ধ্বনিতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে তিনি গ্রন্থটিতে বিভিন্ন আন্তার্জাতিক খ্যাতনামা গবেষকদের মতামত উদ্ধৃত করেছেন। এ গ্রন্থটি সম্পর্কে ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদের অন্যতম কৃতি ছাত্র ও পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মী বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক ডক্টর আবুল কালাম মনজুর মোর্শেদ বলেনঃ “অধ্যাপক দীন মুহম্মদের ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কিত একাধিক গ্রন্থ ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও উপরিউক্ত গ্রন্থটি নানা কারণে বাংলা ভাষার ওপর একটি মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ। বিষয় উপস্থাপনা ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাঁর অনুসন্ধিৎসু ও বিশ্লেষণধর্মী মনের উপস্থিতিই বিশেষ লক্ষণীয়। অধ্যাপক কাজী দীন মুহম্মদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণার ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সাহিত্য ও ভাষা সম্পর্কিত নিজের আদর্শ ও মনোভাব উপস্থাপন করেছেন।”
কাজী দীন মুহম্মদের সাহিত্য ও গবেষণা সম্পর্কে তাঁর আরো দু’জন ছাত্র ও প্রখ্যাত সাহিত্যিকের মন্তব্য তুলে ধরছি। ডক্টর মাহমুদ শাহ কোরেশী বলেন- “আমাদের দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে তাঁর অবদান অসামান্য। বহু বিষয়ে তিঁনি লিখেছেন। সরস, প্রাঞ্জল সেসব লেখা, তাঁর ব্যক্তিত্বেরই যথাযথ প্রতিফলন। ক্রিয়াপদের ওপর তাঁর চমৎকার কাজটি গবেষকেরা বহুকাল ব্যবহার করতে থাকবেন। স্বধর্মে নিষ্ঠাবান ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ ইসলামি চিন্তাবিদ। তবে স্বদেশের ভিন্ন সংস্কৃতিকেও তিনি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। কোনো সংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন হননি কখনো। শুদ্ধতা ও সৌন্দর্যে তিনি ছিলেন তারই তুলনা।”
(ডক্টর মাহমুদ শাহ কোরেশী : “কাজী দীন মুহম্মদঃ শুদ্ধতা ও সৌন্দর্যে ছিলেন অনন্য”, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৪ নভেম্বর ২০১১)।
মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ বলেনÑ “কাজী দীন মুহম্মদ মধ্যযুগের সাহিত্য এবং মুসলিম সংস্কৃতিবিষয়ক একাধিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। চলতি ভাষার পুঁথিকারদের রচনার পরিচিতি-নির্মাণ এবং উৎকর্ষ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতার পরিচয় মেলে। তিনি আধুনিক সাহিত্যিকদের রচনার ওপর আলোকপাত করেছেন; তবে মধ্যযুগের সাহিত্য-সম্পর্কিত আলোচনাতেই তিনি স্বচ্ছ্বন্দবিহারী; তাঁর মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক আলোচনায় নতুন তথ্য উপস্থাপনা কিংবা গভীরতর বিশ্লেষণ ধর্মিতার পরিচয় না থাকলেও একটি নিজস্ব দৃষ্টিকোণের উদ্ভাস লক্ষণীয়।… তিনি ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্য ইত্যাদি বিষয়ে এবং ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে অনেক বই লিখেছেন। তিনি ছিলেন ইসলামী আদর্শ ঐতিহ্য ও মূল্যবোধে গভীরভাবে বিশ্বাসী এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বকীয়তায় আস্থাবান।”
(মোহাম্মদ মাহ্ফুউল্লাহ : কিছু স্মৃতি, কিছু কথাঃ দৈনিক আমার দেশ, ১১ নভেম্বর ২০১১)।
একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক হিসাবে কাজী দীন মুহম্মদ বিভিন্ন সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। সেসব সেমিনারগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলোÑ
l    Third International Congress for Classical Studies, London, 1958.
l    Asian Writers Conference, New Delhi, 1950.
l    Pakistan Linguistic Association, Lahore, 1964, 65 & 68.
l    International Islamic Conference, Colombo, 1978.
l    International Seminar, Iran, 1984.

বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে যোগদান করা ছাড়াও কাজী দীন মুহম্মদ হজ উপলক্ষে এবং নিজের দেশ দেখার অভিজ্ঞতা অর্জনের আকাক্সক্ষা থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেন। তিনি যেসব দেশ সফর করেছেন তার তালিকা নিম্নরূপঃ পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, সাইপ্রাস, গ্রিস, সিরিয়া, বৃটেন, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরী, আলজেরিয়া, মরক্কো, সুদান, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, মেক্সিকো, কিউচা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, আমেরিকা, মিসর।
কাজী দীন মুহম্মদ ভাষা, বর্ণমালা, ব্যকরণ, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি ও গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য ভাষাতাত্ত্বিক গবেষক, শিক্ষাবিদ ও মনীষী হিসেবে তিনি দেশে-বিদেশে বিশেষভাবে সুপরিচিত ও খ্যাতিমান ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত এতবড় একজন সাধক ও চিন্তাশীল গবেষককে জাতি তাঁর জীবনকালে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়নি। তিনি অনেক পুরস্কার-সম্মাননা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ

  •  বাংলাদেশ দায়েমী কমপ্লেক্স পুরস্কার (১৯৮৯)
  •  বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৯০)
  • Distinguished Leadership Award, American Biographical Institute Published in 7th Edition of Biographical Encyclopedia.
  • Pandit Iswar Chandra Vidyasagar Gold Plaque (2002), The Asiatic Society, Calcutta, India.
  • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রকল্প স্বর্ণপদক (২০০৩)।
  • কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০০২)

ব্যক্তি হিসেবে কাজী দীন মুহম্মদ ছিলেন একজন মহৎ সহজ-সরল ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী সজ্জন ব্যক্তি। গবেষক হিসেবে তিনি অনন্যতুল্য। পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়। ধর্মবেত্তা ও সুফী-সাধক হিসেবে তিনি একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। সর্বোপরি মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন উদার ও মহানুভব। তাঁর মত এমন অসাধারণ প্রতিভাবান আদর্শ ব্যক্তিত্ব সমাজে অতিশয় বিরল। দেশ-জাতি যদিও তাঁর উপযুক্ত মর্যাদা দিতে সমর্থ হয়নি, তবু দেশ ও জাতিকে সারা জীবন তিনি দিয়েছেন অকৃপণ হাতে।
[email protected]

SHARE

Leave a Reply