ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস

duমুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলার উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সঙ্কটময় মুহূর্তে আশাহীন-দিশাহীন জাতিকে মুক্তির নেশায় উজ্জীবিত করতে, পূর্ববাংলা তথা আজকের বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাশ্চাত্যের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। ইতিহাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে, নানা ভাস্বর অধ্যায়ের রূপকার হয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠার গৌরবের ৯৩ বছর পেরিয়ে পা রাখতে যাচ্ছে ৯৪ বছরে।

বঙ্গভঙ্গ রদেরও ১০ বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকার পূর্বে আমাদের এই ভূখণ্ডে ইসলামী শিক্ষার ছোট-বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল। ব্রিটিশরা আসার পর ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার বিকাশ হলেও আমাদের এই বাংলা প্রদেশ থেকে যায় বরাবরের মত অবহেলিত। বঙ্গভঙ্গ থেকে বঙ্গভঙ্গ রদের পরবর্তী সময়ে পূর্ববাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী উচ্চশিক্ষার সার্বিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। আধুনিক প্রাশ্চাত্য শিক্ষা অর্জনের অধিকার এই ভূখণ্ডের মুসলমানদের আন্দোলন করেই অর্জন করে নিতে হলো। দীর্ঘ আন্দোলনের অর্জন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে খ্যাত এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
অধিকাংশ কলেজ কলকাতা বা তার আশপাশে অবস্থিত ছিল। পূর্ববাংলা আসাম অঞ্চলে কলেজ কম ছিল। উচ্চশিক্ষার জন্য গোটা আসামে মাত্র দু’টি কলেজ ছিল। সিলেটের এমসি কলেজ ও গৌহাটির কটন কলেজ। গৌহাটিতে তখন একটি ল কলেজও ছিল। উল্লেখ্য যে, আজকের সিলেট তখন আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বঙ্গভঙ্গে আসাম ও পূর্ববাংলা নিয়ে আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গ রদ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে, পূর্ববাংলার আশাহত, বিক্ষুব্ধ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সান্ত¡না দিতে ও বিক্ষোভের মাত্রা প্রশমিত করতে তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। অনেকেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য ছিল। দীর্ঘ সময় কোন জনগোষ্ঠীকে অধিকারবঞ্চিত রেখে ক্ষমতার স্থায়িত্ব দীর্ঘ করা যায় না, এ কথা তারা খুব ভাল করেই জানতো। কৃষক মুসলমানের সন্তানরা শিক্ষাদীক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাক, এমন মহৎ উদ্দেশ্য তাদের মধ্যে ছিল না। সহজ কথায় ব্রিটিশরা তাদের রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী করতে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। প্রথমত, বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানরা ছিল বিক্ষুব্ধ। এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ক্ষুব্ধ রেখে শাসন দীর্ঘস্থায়ী করা যাবে না। এমন উপলব্ধি থেকে শাসনক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার কূটকৌশলের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ সরকার এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। দ্বিতীয়ত, তারা চেয়েছিল কিছু ‘মহৎ বর্বর’ (ঘড়নষব ঝধাধমব) তৈরি করতে, যারা তাদের দালালি করবে। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এ ভারতবর্ষে শাসন দীর্ঘস্থায়ী করতে কিছু অগ্রসর শ্রেণীর দালাল প্রয়োজন ছিল। এমন মানসিকতা নিয়ে তারা ইতঃপূর্বে কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বাই এই প্রধান শহরে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী যোগ দেয়নি। আর ইংরেজরা এ বিষয়টি সামনে রেখেই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার জন্য তারা চেয়েছিল ভারতীয়দের একাংশকে সভ্যতা ও ভব্যতার শিক্ষা দিয়ে ‘মহৎ বর্বরে’ রূপান্তর করতে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।
ঢাকাকে রাজধানী করে বাংলা ও আসাম প্রদেশ নিয়ে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ‘বঙ্গভঙ্গ’ নামের প্রদেশটি কার্যকর হয়। শিক্ষাদীক্ষাসহ সব দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের জন্য বঙ্গভঙ্গ তাদের প্রাণে আশার সঞ্চার করেছিল। তৎকালীন হিন্দু নেতারা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রচণ্ড বিরোধী। তারা শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারকে বঙ্গভঙ্গ বাতিলে বাধ্য করে। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘বঙ্গভঙ্গ রদ’ ঘোষিত হয়। এ খবর পূর্ব বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত মুসলমানদের কাম্য ছিল না। বঙ্গভঙ্গের ফলে সামান্য কয়েক বছরের ব্যবধানে মুসলিম সমাজে সার্বিক যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল, এ ঘোষণায় তা কর্পূরের মতো উবে যায়। মুসলিম সমাজ তাতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। বিক্ষোভের তীব্রতা আঁচ করতে পেরে পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে ২৯ জানুয়ারি তিন দিনের এক সফরে ঢাকা আসেন। এ সময় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ ১৯ জন মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধিদল ৩১ জানুয়ারি গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে দেখা করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে পূর্ববাংলার মুসলমানরা সব দিক থেকে যে নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ বিষয়টি জানিয়ে তারা আবার বঙ্গভঙ্গ চালুর দাবি জানান। না হয় এর ক্ষতিপূরণ স্বরূপ কমপক্ষে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার দাবি করেন তারা। জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রæতি দিয়ে লর্ড হার্ডিঞ্জ ঘোষণা করেন :  The Government of India realised that education was the true salvation of the Muslims and that the Government of India, as an earnest of their intentions, would recommend to the Secretary of State for the constitution of University of Dacca.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এ ঘোষণা এবং পদক্ষেপ বিশাল বিতর্কের সৃষ্টি করে। আবারো বাধার সৃষ্টি করেন হিন্দু নেতারা। তারা এর বিরোধিতা করতে থাকেন। চলতে থাকে প্রচণ্ড বিরোধিতা। তারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার মতো এর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সভা-সমিতি ও পত্রপত্রিকায় জনমত গড়ে তোলার জন্য বক্তৃতা-বিবৃতি প্রকাশ করতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ তার ‘বঙ্গভঙ্গ : তৎপরর্তী সমাজ ও রাজনীতি’ বইয়ে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে আশাহত পূর্ববঙ্গবাসীর জন্য সান্ত¡না হিসেবে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রæতি ব্রিটিশ শাসকরা দেয়, সেটি হিন্দু ভদ্রলোকদের বিরোধিতার মুখে ১০ বছর বিলম্বিত হয়। বর্তমান বাংলাদেশে প্রগতি, আধুনিকতা ও উন্নত সংস্কৃতি ও সভ্যতা নির্মাণে যত রকম প্রয়াস আমরা লক্ষ করি, তার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯২১ সালে এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না হলে আমরা আমাদের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে পারতাম না। বঙ্গভঙ্গ না হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও হতো না।’

du01
লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরলে ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রæয়ারি ড. রাসবিহারি ঘোষের নেতৃত্বে একটি হিন্দু প্রতিনিধিদল তার সঙ্গে দেখা করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করে। এই প্রতিনিধিদলে ছিলেন রাজা পিয়ারী মোহন মুখার্জি, বাবু ভূপেন্দ্রনাথ বসু, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, অম্বিকা চরণ মজুমদার, কিশোরী মোহন চৌধুরী প্রমুখ। তারা গভর্নর জেনারেলের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে বিভিন্ন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। চাষাভুষা মুসলমানদের সন্তানরা শিক্ষিত হয়ে উঠুক, এমনটি তারা মেনে নিতে পারছিলেন না। ওই স্মারকলিপিতে এর প্রতিফলন ছিল এ রকম : The Muslims of Eastern Bengal were in large majority cultivators and they would be benefited in no way by the foundation of a University.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার ক্ষেত্রে অন্যান্য হিন্দু নেতাদের মতো কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করে কলকাতার গড়ের মাঠে একটি সভা হয়। সে সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং বিশ্বকবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অন্যান্য হিন্দু নেতার বিরোধিতার বিষয়টি জাতীয় অধ্যাপক ইন্নাছ আলী তার ‘সমাজ ও রাজনীতি’ বইয়ে স্পষ্ট করে আলোচনা করেছেন। প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হিন্দু নেতারা ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিদ্রুপ করেছেন সে সময়।

বিরোধিতা সত্তে¡ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এরই ফলে সরকার ১৯১২ সালের ৪ এপ্রিল এক পত্রে বাংলার গভর্নরকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আর্থিক খতিয়ানসহ একটি পরিপূর্ণ প্রকল্প প্রণয়নের নির্দেশ দেন। এই পত্রে বাংলার মুসলিমদের স্বার্থ ও প্রয়োজন মেটানোর দিকে লক্ষ রাখার জন্য বিশেষ নির্দেশ ছিল। এ মর্মে একটি নির্দেশ ছিল, যাতে শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলমানদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে এবং মুসলমান ছাত্ররা নিজেদের ধর্মীয় তাহজিব ও তমদ্দুন রক্ষায় সফল হয়। সেই লক্ষ্যে বলা হয় :”There might be a faculty of Arabic and Islamic Studies in the University.”
ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলার সরকার ১৯১২ সালের ২৭ মে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট ‘নাথান কমিটি’ নামের একটি কমিটি গঠন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৪৫০ একর জমিবিশিষ্ট একটি মনোরম এলাকার সুপারিশসহ এ কমিটি প্রদত্ত রিপোর্ট ১৯১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘ভারত সচিব’ কর্তৃক চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ সময়ে ১৯১৫ সালে সংক্ষিপ্তভাবে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন করার জন্য আবার প্রস্তাব করা হয়। ফলে ১৯১৬ সালে ভারত সরকার বাংলার সরকারের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সর্বনিম্ন খরচের সংশোধিত পরিকল্পনা পেশ করার নির্দেশ দেয়।
প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিলম্বিত হতে থাকায় মুসলিম নেতাদের মনে সরকারের সদিচ্ছার ব্যাপারে সন্দেহ বাড়তে থাকে। নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিষয়টি ১৯১৭ সালের ৭ মার্চ রাজকীয় আইন পরিষদে উত্থাপন করেন এবং ২০ মার্চ সরকারের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অচিরেই প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব পেশ করেন। তিনি অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানান। রাজকীয় আইন পরিষদের সমাপনী অধিবেশনে ১৯১৭ সালের ২৩ এপ্রিল অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দেয়া হয়।
নাথান কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশাল জমির প্রয়োজন দেখা দেয়। জমি অধিগ্রহণ করা যাচ্ছে না- এমন অজুহাতেও এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ বিলম্বিত হতে থাকে। এগিয়ে আসেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। তিনি তার জমিদারির বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ছেড়ে দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করেন। এ দিকে আর্থিক সঙ্কট নিরসনে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী যে ভূমিকা রাখেন, তাও অবিস্মরণীয়। টাঙ্গাইলে তার জমিদারির বিরাট একটা অংশ বিক্রি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ড গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।
এ দিকে ১৯১৭ সালের ৬ জানুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে লর্ড চেমসফোর্ড তার চ্যান্সেলরের ভাষণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নানা অসুবিধা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেন। এই কমিশনের কাছে প্রস্তাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি বিজ্ঞ মতামত ও পরামর্শের জন্য পাঠানো হয়। নাথান কমিটির রিপোর্টটি যথাযথভাবে পর্যালোচনার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে রিপোর্ট দেয়। নাথান কমিটির পেশ করা সুপারিশের সঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের মতানৈক্য দেখা দেয়। এটা কি কেবল একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে, না ‘টিচিং’ এবং ‘এফিলিয়েটেড’ থাকবে? এই বিতর্কের সময় জনমত যাচাইয়ের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন একবার রাজশাহীতে আসে। তখন একটি মুসলিম প্রতিনিধিদল তাদের সঙ্গে দেখা করে এই দাবি করে যে, পূর্ববাংলার সব কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ‘এফিলিয়েটেড’ বা সংযুক্ত থাকবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাতে টিচিং কাম এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় না হতে পারে, সে জন্য হিন্দু নেতারা বিরোধিতা করতে থাকেন। অবশ্য কিছুসংখ্যক উদার মনোভাবাপন্ন হিন্দু নেতা এর সপক্ষে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন। নাথান কমিটির সঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন এ মত পোষণ করে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবলই একটি সরকারশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে না, বরং তা হবে স্বায়ত্তশাসিত। ভারত ও বাংলা সরকার এবং নাথান কমিটি এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তা সব জাতি ও শ্রেণীর ছাত্রদের জ্ঞান আহরণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে মুসলমান ছাত্রদের জন্য একটি আরবি ও ইসলামি শিক্ষা বিভাগ খোলা হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যা বলা হয় তা স্মরণীয় : “We do not forget that the creation of the University was largely due to the demand of Muslim community of Eastern Bengal for greater facilities for higher education.”

অবশেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতামত ও নাথান কমিটির সুপারিশের আলোকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল’ প্রণীত হয় এবং ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ আইন আকারে পাস হয়। শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলার মুসলমানরা তাদের ন্যায্য দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। মাত্র ৬০ জন শিক্ষক, ৮৪৭ জন ছাত্র, তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম নেয়, তা আজ ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে বিরাট মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ১৩টি অনুষদ, ৯টি ইনস্টিটিউট, ১৮টি হল এবং ৬০টির বেশি বিভাগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ অধ্যয়ন করছে প্রায় ৩৫ হাজার ছাত্রছাত্রী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা পূর্ববঙ্গের পশ্চাৎপদ দরিদ্র মুসলমান কৃষক সন্তানদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে একটি সম্ভাবনাময় মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভবে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। তবে একটি তিক্ত সত্য হলো, মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনা ও দরিদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির বিষয়টি মাথায় রেখে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল; সেখানে আজ মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ যেন অনেকটা অপরাধ। এটি কাম্য নয়। তথাকথিত প্রগতিশীলরা যেন সুচতুর ইংরেজদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যস্ত।

ছাত্র সংবাদ ডেস্ক

SHARE

Leave a Reply