ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ভর্তিতে আবারো শর্তারোপ মুক্তবুদ্ধি চর্চার এ কেমন নমুনা

duইদানীং বাংলা শব্দে বেশ কিছু নতুন শব্দ প্রায় উচ্চারিত হচ্ছে, যেমন সুশীলসমাজ, মুক্তবুদ্ধি চর্চা ইত্যাদি। সুশীলসমাজ নিয়ে আজ কিছু লিখে সম্মানিত পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। কারণ এত সুশীলদের এই দেশ কেন বারবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় তা আমার বুঝে আসে না। এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড, মাঝে দুষ্ট লোকেরা বলতো ডাকাতের গ্রাম, ইদানীং বলা হয় মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র। মুক্তবুদ্ধি শব্দের মাধ্যমেই ‘বুদ্ধি’ শব্দকে ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক হলো যে বুদ্ধি সকলের জন্য উন্মুক্ত বা খোলা আর একটি হলো যে বুদ্ধি বন্ধ অবস্থায় থাকে। আরো সহজ বাংলায় যাকে কূটবুদ্ধি বলা হয়। এই কূটবুদ্ধির ড্রাইভারকে আরবিতে সম্ভবত খান্নাস বা শয়তান বলা হয়। এখন আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে ঢাবিতে মুক্তবুদ্ধি যেখানে গড়াগড়ি যায় সেখানে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে খান্নাসি বুদ্ধি বা কুটবুদ্ধি আসে কিভাবে? সব সম্ভবের দেশ নাকি আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু তাই বলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ও কি অমান্য করা সম্ভব?

ভিসি মহোদয় ডিনদের সাথে আলোচনার প্রয়োজন বোধ না করে এককভাবে রেজুলেশন তৈরি করে কলা অনুষদের ডিনের কাছে পাঠিয়েছেন… কলা অনুষদের ডিন বলেছেন, তারা ভিসি’র কাছে জানতে চেয়েছেন সর্বোচ্চ আদালতের রায় সত্ত্বেও এমন সিদ্ধান্তের কারণ কী? ভিসি’র জবাব, পরবর্তী ভর্তি কমিটিতে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ভিসি’র রেজুলেশনে বিস্মিত হয়ে বলেছেন, ভিসি গায়ের জোরে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে চাইছেন। (সূত্র : দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৬ আগস্ট ’০৯)

এখানেই আমরা সাধারণ মানুষ আঁৎকে উঠি। ভিসি যদি গায়ের জোরে বিশ্ববিদ্যালয় চালাতে চান তাহলে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ গায়ের জোরে অন্যসব ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের হলছাড়া করবে নাতো কি আঙুল চুষবে? ভয় হয়, মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র ঢাবিকে দুষ্ট লোকেরা আবার ডাকাতের গ্রাম বলা শুরু করবে নাতো? ছোটকালে একটা গল্প শুনেছিলামÑ গ্রামের এক সরল লোক ধান ক্ষেতের মাঝ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। এমন সময় ক্ষেতের মালিক ক্ষেপে গিয়ে লোকটিকে ধমকের সাথে বললো, এই তুমি ক্ষেতের মাঝ দিয়ে হাঁট কেন? লোকটি বললো, ঠিক আছে ডান দিক দিয়ে যাই। মালিক বললো, ডান দিকে কি তোমার বাবার জায়গা? লোকটি বললো, ঠিক আছে, বাম দিক দিয়ে যাই। মালিক বললো, না। তাহলে পেছন দিকে। মালিক বললো, না। তাহলে সামনের দিকে। মালিক বললো, না। তাহলে কোন দিকে যাবো? মালিক বললো তুমি কোন দিকেই যেতে পারবে না। লোকটি বললো, তাহলে আমি কী করবো? মালিক বললো, তুমি কীও করতে পারবে না।

বাংলাদেশের শত বছরের প্রতিষ্ঠিত শীর্ষ মাদ্রাসার সেরা ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কীও করতে পারবে না। সুপ্রিম কোর্ট বলবে ভর্তি কর, ভিসি বলবেন না। সরকার বলবে মাদ্রাসাকে আধুনিক কর। মাদ্রাসা বোর্ড আধুনিক করার প্রস্তাব (বাংলা ও ইংরেজিতে ২০০ নম্বর) দিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলবে, দেখি কী হয়। অর্থাৎ আরো গবেষণার প্রয়োজন বলে প্রস্তাব সোজা ডিপ ফ্রিজে প্রেরণ।

এই পাটা-পোতার ঘষাঘষিতে মরিচের মরণ অবস্থার মতো মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের আজ মরণ দশা। দাখিল ও আলিম এ+ পাওয়ার পর বহু মেডেল, বহু সম্মাননা সনদসহ এক বুক আশা নিয়ে একটি ছাত্র যখন হাজারো ছাত্রের সাথে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফলাফল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যায়, তখন কিছু শিক্ষকের মুখ ভেঙচিতে সে জানতে পারে তাকে ভর্তি করা যাবে না। কারণ সে মাদ্রাসার ছাত্র। তখন সেই মুহূর্তে মনে হয় এ+ মেডেল আর সম্মাননা পদক সব আগুনে পুড়ে, আবার প্রাইমারিতে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন। এভাবে সর্বোচ্চ মেধাবীদের মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপারে হতাশ ও নেগেটিভ করাকে কোন অর্থে মুক্তবুদ্ধির চর্চা বলা যায়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে কলা অনুষদের ১৫টি, সামাজিক বিজ্ঞানে অনুষদের ১১টি এবং আইন অনুষদের ১টি বিভাগে ভর্তি করা হয়। আড়াই হাজারের মতো শিক্ষার্থী ‘খ’ ইউনিটের ২৭টি বিভাগে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর ভর্তিতে শর্তারোপ করে এই আড়াই হাজার শিক্ষার্থীকে মাদ্রাসামুক্ত ঘোষণার চক্রান্তকে মুক্তবুদ্ধি না বলে খান্নাসি বুদ্ধি বা শয়তানি বুদ্ধি বলা যায় না কি?

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এ ধরনের শয়তানি বুদ্ধি চলতে থাকলে আমাদের দিন বদল হবে কিভাবে? মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের কাছে বিনীত প্রশ্ন ১০০ নম্বর পড়ে কোন ছাত্র যদি ২০০ নম্বর পড়া কোন ছাত্রের চেয়ে ভাল করে তাতে দোষ কী? তা ছাড়া সিলেবাস কি ছাত্ররা তৈরি করে? এখন ২০০ নম্বর পড়ার প্রস্তাব এবং মাদ্রাসায় ব্যবসা শিক্ষাসহ অন্যান্য আধুনিকায়নের প্রস্তাব গত বৈঠকে পাস না হয়ে তাকে অধিকতর পরামর্শের জন্য সময় ক্ষেপণ করা হচ্ছে কেন? তাহলে একদিক দিয়ে বলবেন মাদ্রাসা শিক্ষা সেকেলের, আবার আধুনিকায়নের প্রস্তাবও পাস করবেন না, তাহলে হাজার হাজার মেধাবী মাদ্রাসা ছাত্রছাত্রীর দিন বদলে শরিক হবে কিভাবে? মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ‘দেশটাকে সবাই মিলে গড়ে তেলার’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সাড়া দেয়ার সুযোগ দিন। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আপনার একটি চোখ যদি স্কুল তথা জেনারেল শিক্ষা হয় তাহলে অন্য একটি চোখ মাদ্রাসা তথা ধর্মীয় শিক্ষা নয় কি? তাহলে আপনিই বলুন, আপনি আপনার কোন চোখের চেয়ে কোন চোখকে গুরুত্ব কম দেবেন। সুশীল আর মুক্তবুদ্ধি চর্চার নামধারীদের হাত থেকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের রক্ষায় আপনার সদয় হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ছে বলে আমরা মনে করি।

লেখক মাওলানা মো: আখতার হোসাইন: ইনচার্জ
নিবরাস ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা

SHARE

Leave a Reply