তত্ত্বাবধায়ক সরকার অতীত ও ভবিষ্যৎ

আলফাজ আনাম..

আদালতের একটি অসমপূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত রায়ের ওপর ভিত্তি করে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো আসেনি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা জাতীয় সংসদে বাতিলের পর দেশের রাজনীতি সঙ্ঘাতময় হয়ে উঠেছে। সংবিধান সংশোধনের পর ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে কোনো অবস্থাতেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে না। ইতোমধ্যে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে। এর পর সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনের আভাস দেয়া হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি আন্দোলন করেছে। বিএনপি সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প প্রস্তাবও সে সময় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল সেসব প্রস্তাবে সম্মত না হয়ে বরং আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ে একের পর কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে অনেকটা অকার্যকর করে ফেলেছিল। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন বিএনপি সরকার শেষ পর্যন্ত দাবি মেনে নিয়ে আইন প্রণয়ন করেছিল। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান সংযোজন করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। এর দু’টিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ও একটিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে।
কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর বাংলাদেশে আগামী দিনের নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে গভীর সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় শিগগিরই প্রকাশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
কেন ও কোন পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি তোলা হয়েছিল সেই দিনগুলো এখন নতুন করে পর্যালোচনার সময় এসেছে। এ কথা সত্য, গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে আস্থাহীনতার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু সেই আস্থাহীনতার অবসান এখনো হয়নি। আমাদের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বৈপরীত্যমূলক অবস্থান আর আস্থাহীনতার দিকটি উঠে আসবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অতীত পর্যালোচনা করলে।

বিতর্ক শুরু
মাগুরা উপনির্বাচন : বিএনপি সরকারের প্রথম দফায় ১৯৯৪ সালে
মাগুরা উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জানায় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি। মাগুরা-২ নির্বাচনী এলাকায় সদর থানার চারটি ইউনিয়ন শালিখা থানা ও মহম্মদপুর থানা নিয়ে গঠিত। এই নির্বাচনী আসনে বরাবর আওয়ামী লীগ প্রার্থী নির্বাচিত হলেও ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থীর চারজনই ছিল মহম্মদপুর থানার এবং  ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী কাজী সলিমুল হক কামাল ছিলেন শালিখা থানার অধিবাসী। শালিখা থেকে অতীতে কোনো প্রার্থীই বিজয়ী হয়নি। এ নির্বাচনে যেহেতু মহম্মদপুর থেকেই ছিল চারজন প্রার্থী তাতে কাজী কামালের বিজয় ছিল অনেকটা নিশ্চিত। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির নিতাই রায় চৌধুরী সংখ্যালঘু প্রার্থী হওয়ায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সংখালঘু ভোট পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল কম। নির্বাচনের পর প্রাপ্ত ভোটের তথ্যে দেখা গেছে আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি যেসব ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ আনে সেসব ভোটকেন্দ্রের সব ভোট আওয়ামী লীগ প্রার্থী পেলেও তাতে তার বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।
অথচ তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির নির্বাচনে কারচুপির নানা অভিযোগ আনে। এসব অভিযোগ ছিল অনেকটাই উদ্দেশ্যমূলক।
আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয় অনেকটা নিশ্চিত এ বিষয়টি অনুধাবনের পর আওয়ামী লীগ ভোট কারচুপি ও সহিংসতার অভিযোগ আনে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে থেকে বিতর্কিত নানা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এমনকি মাগুরা সার্কিট হাউজের ছয়টি কক্ষের সবগুলো নির্বাচন কমিশনের সচিবালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু ১৮ মার্চ তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা কারো অনুমতি ছাড়াই সার্কিট হ্উাজের একটি কক্ষ দখল করে নেন। ১৯ মার্চ বেলা ১টায় তিনি সার্কিট হাউজ ত্যাগ করেন। ২০ মার্চ ভোট দেয়ার আড়াই ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বিরোধীদলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ প্রার্থীর শহরের বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে। আমরা এটি প্রত্যাখ্যান করছি। এ সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন হতে পারে না। আমরা একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই। মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচন উদহারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার সহিংস আন্দোলন শুরু হয়।

সংসদে বিল
মাগুরা উপনির্বাচনের আগ থেকেই তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী সংসদ বর্জন করে আসছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে হেবরনে একটি মসজিদে ২৯ জন ফিলিস্তিনি নাগরিককে হত্যার ঘটনায় নিন্দা প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল সংসদ থেকে বেরিয়ে যায়। মাগুরা উপনির্বাচনের পর দাবি করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে রাজি হলেই কেবল বিরোধী দল সংসদে যোগদান করবে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয় ২৬ জুনের মধ্যে সরকার একটি সংশোধনী বিল উত্থাপন করলে সংসদে যোগদান করবে। সরকারকে এ নিয়ে আলোচনায় বাধ্য করে তুলতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তিনটি অনুরূপ সংশোধনী বিলও জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়। ২৭ জুন বিরোধী দল এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের উদ্যোগে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভবিষ্যতের সব সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি কাঠামো বা রূপরেখা প্রকাশ করে। এই রূপরেখায় বলা হয়, এ ধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার পর :
১.    প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন।
২.    সংসদের নির্বাচন না হওয়া এবং নয়া সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি বিরোধী দলগুলোর সাথে পরামর্শক্রমে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্তি দেবেন যিনি উক্ত সময়ে সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
৩.    অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী কিংবা তার মন্ত্রীরা অনুষ্ঠেয় কোনো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন না কিংবা তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যও হতে পারবেন না।
৪.    অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল দায়িত্ব হবে অবাধ, মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা এবং দেশের জরুরি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সহ সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা।
৫.    নয়া প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদবলে শপথ গ্রহণ করার অব্যবহিত পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে এই রূপরেখায় আরো বলা হয় :
১.    নির্বাচন কমিশন এমনভাবে পুনর্গঠিত ও পুনর্বিন্যস্ত করা হবে যাতে করে এটা একটি সত্যিকারের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারে।
২.    একটি স্বব্যাখ্যাত নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে ও তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দেয়া হবে।
৩.    উপরিউক্ত দু’টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনবোধে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।
আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের এই প্রস্তাব তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি নাকচ করে দিয়ে বলে, বিরোধী দল স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করে সেখানে মনোনীত ও অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় বসাতে চাইছে। এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক প্রস্তাব কখনোই জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

আওয়ামী লীগের নোটিশ
অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান রেখে আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধনের একটি বিল পেশ করার নোটিশ প্রদান করে। আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে দিনাজপুর-৩ হতে নির্বাচিত সদস্য এম আবদুর রহিম দুইটি সংবিধান সংশোধনী বেসরকারি বিলেরই নোটিশ ২৮ অক্টোবর ’৯৪ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে দাখিল করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান সংবলিত একটি সংবিধান সংশোধনী বিলের নোটিশ জামায়াতের পক্ষ থেকে ইতঃপূর্বে দাখিল করা হয়।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিলে সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের ৪ দফা পরিবর্তন এবং ৪-এর পরে ৫, ৬ ও ৭ দফা সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া সংবিধানের ৫৭ অনুচ্ছেদের ৩ দফা, ৫৮ অনুচ্ছেদের ১ দফার ঘ উপদফা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়। ৫৬ অনুচ্ছেদের ৪ দফার পরিবর্তে প্রতিস্থাপিত দফা হবে ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া গেলে অথবা সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (৩) দফার বিধান কার্যকর হইলে অথবা সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে সরকার পরিচালনা এবং অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট দেশের প্রধান বিচারপতিকে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আহ্বান জানাইবেন।’ ৫৬ অনুচ্ছেদের ৪ দফার পরে ৫ম দফা হবে ‘প্রেসিডেন্টের আহ্বানের প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হইবেন না এমন ব্যক্তিবর্গকে লইয়া যথাসম্ভব ছোট আকারে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করিবেন। ৬ দফা : অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নূতন সরকার শপথের পরমুহূর্তেই নূতন সরকারের নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। ৭ দফা : অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসাবে দেশের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন তাঁহার স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসাবে বিবেচিত হইবে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালন শেষে পুনরায় প্রধান বিচারপতিরূপে কার্য করিবার ক্ষেত্রে কোনোরূপ অন্তরায় থাকিবে না।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দীর্ঘ স্বৈরশাসনে দেশের নির্বাচনীব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, সামগ্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা বিনষ্ট হয়েছে। রক্তক্ষয়ী বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণ স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও সুসংহত করার অভিযাত্রা শুরু করেছে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নজির স্থাপন করে নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন। সেই অবস্থাকে আরো সুদৃঢ় এবং নির্বাচনের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত রেখে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা একান্ত আবশ্যক। এমতাবস্থায় জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থে সংবিধানের উপরোক্ত সংশোধন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
জামায়াতের বিল
জাতীয় সংসদে উত্থাপনের জন্য
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের অধিকতর সংশোধনকল্পে আনীত বিল
যেহেতু, নিম্নবর্ণিত উদ্দেশ্য পূরণকল্পে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অধিকতর সংশোধন প্রয়োজন, সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল :
১. সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও প্রবর্তন :
(১) এই আইন সংবিধান (সংশোধন) আইন ১৯৯৩ নামে অভিহিত হইবে।
(২) …. অবিলম্বে বলবৎ হইবে।
২. সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের সংশোধন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ-এর সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৪ উপ-অনুচ্ছেদের পরে নিম্নলিখিত উপ-অনুচ্ছেদগুলি সন্নিবেশিত হইবে :
দফা ৫. এই সংবিধানের অন্যত্র যাহা কিছুই থাকুক না কেন এই সংবিধানের ১২৩ (৩) (ক) ও (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের নির্বাচন ঘোষণার তারিখের দিন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র পেশ করিবেন।
দফা ৬. এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও সংবিধানের ১২৩ (৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি তাঁহার সন্তোষ অনুযায়ী একজন সিনিয়র উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করিবেন। উপদেষ্টা পরিষদ উত্তরাধিকারী হিসাবে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পালন করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করিবেন না অথবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হইতে পারিবেন না…….
অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও ৫৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার সাথে সাথেই উপদেষ্টা পরিষদ বিলুপ্ত বলিয়া গণ্য হইবে।
দফা …। এই সংবিধানের কোনো কিছুই
(১) …….., নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা হইতে এবং
(২) শুধুমাত্র জরুরি রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হইতে এই উপদেষ্টা পরিষদকে নিবৃত করিবে না।

উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতি
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকার গঠিত হওয়া প্রয়োজন বিধায় ১৯৮৩ সালের ২৩শে নভেম্বর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কেয়ারটেকার সরকার গঠনের দাবি পেশ করে এবং এর ফর্মুলা প্রদান করে। কেয়ারটেকার সরকার গঠনের দাবি সর্বাত্মক দাবিতে পরিণত হইলে একপর্যায়ে এরশাদ সরকার পদত্যাগ করে এবং কেয়ারটেকার সরকার গঠিত হয়। গত ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় যে অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছে তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সে কারণে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া এবং দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রেক্ষিতে আগামীতেও জাতীয় নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। সেই কারণেই সংবিধানের এই সংশোধন চাওয়া হইয়াছে।
(মতিউর রহমান নিজামী)
জাতীয় সংসদ সদস্য

জাতীয় পার্টির সংশোধনী বিলের নোটিশ
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর প্রেসিডেন্টের সন্তুষ্টি অনুযায়ী একজন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান রেখে জাতীয় পার্টি সংবিধান সংশোধনের একটি বিল পেশ করে। জাতীয় পার্টি সংসদীয় দলের হুইপ মনিরুল হক চৌধুরী এই বেসরকারি বিলটি সংসদ সচিবালয়ে দাখিল করেন।
জাতীয় পার্টি পেশকৃত বিলে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের সংশোধন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ৪ উপ-অনুচ্ছেদের পরে ৫, ৬ উপ-অনুচ্ছেদগুলি সন্নিবেশিত হবে। এই উপ-অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : দফা-৫ : এই সংবিধানের অন্যত্র যাহা কিছুই থাকুক না কেন এই সংবিধানের ১২৩(৩) (ক) ও (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের নির্বাচন ঘোষণার তারিখের দিন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগপত্র পেশ করিবেন। দফা-৬ : এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা সত্ত্বেও সংবিধানের ১২৩ (৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি তাহার সন্তোষ অনুযায়ী একজন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন, যিনি উত্তরাধিকারী হিসাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করিবেন। তবে শর্ত থাকে যে, অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী বা তাহার মন্ত্রিসভার সদস্যগণ কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করিবেন না অথবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হইতে পারিবেন না। আরো শর্ত থাকে যে, এই সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ ও ৫৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত বলিয়া গণ্য হইবে।
দফা-৭ : এই অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা (১) শুধুমাত্র জরুরি রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করিবেন; এবং (২) অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করিবেন।
নোটিশের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয় : গণতন্ত্রকে সুসংহত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার স্বার্থে দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং সেই লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক পথ সুগম করার উদ্দেশ্যে এই বিল উত্থাপন করা হইয়াছে।

নিনিয়ানের মধ্যস্থতা
ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে অনমনীয় মনোভাবে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় কয়েকটি পশ্চিমা দেশের প্রতিনিধি রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে কমনওয়েলথ সচিবালয়ের মহাসচিব এমেকা আনিয়াওকু বাংলাদেশ সফরকালে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতার আয়োজন করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সাথে কয়েক দফা আলোচনায় মিলিত হয়ে তার সচিবালয়ের মাধ্যমে সমস্যাগুলো নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উভয় কারণে উভয় পক্ষ এ মধ্যস্থতা মেনে নিতে সম্মত হন।
তিনি দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার জন্য তিন দফা পরিকল্পনা পেশ করেন, যা সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী মেনে নেন। তিন দফা প্রস্তাব ছিল নিম্নরূপ:
১.    ক্ষমতাসীন সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দলগুলো সরল বিশ্বাসে এবং মুক্ত একটি এজেন্ডার ভিত্তিতে এমন একটি সংলাপ শুরু করতে মনস্থ করেছে যাতে যেকোনো পক্ষ কর্তৃক নির্বাচন কমিশনকে জোরদারকরণ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং রাজনৈতিক গোটা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা করবেন।
২.    চলমান ঘটনা ও বিষয়সমূহের ওপর জনগণের অশেষ সংবেদনশীলতার প্রেক্ষাপটে জনমনে আস্থাভাব স্থাপনের লক্ষ্যে সংলাপ চলাকালে সকল অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল প্রতিদিনকার সংলাপ শেষে শুধু একটি যৌথ বিবৃতিতে জনগণকে সংলাপের ফলাফল ব্যাখ্যায়িত করবেন এবং অংশগ্রহণকারীরা এর বাইরে যেকোনো প্রকাশ্য বক্তব্য বা বিবৃতি দেয়া থেকে বিরত থাকবেন।
৩.    প্রয়োজনবোধে যেকোনো ধরনের আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টিকারী হিসেবে সাহায্য করার লক্ষ্যে মহাসচিব একজন দূত নিয়োগ করবেন।

এই ৩-দফার ভিত্তিতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানে সাহায্য করার জন্য কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান মার্টিন স্টিফেন ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকায় আসেন।
সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার প্রস্তাব
স্যার নিনিয়ানের মধ্যস্থতায় প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক সংলাপে অংশ নেন এবং উভয় পক্ষ স্যার নিনিয়ানের মাধ্যমে নিজ নিজ মনোভাব ও অবস্থান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা স্বীকার করে নিলেও তাদের দাবি ছিল তা করতে হবে দেশের সাংবিধানিক কাঠামো অনুসারে।
এতে স্যার নিনিয়ান সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের কথা বলেন। এই সরকারে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের পাঁচজন ও বিরোধী দলের পাঁচজন মন্ত্রী থাকবেন। তারা সবাই পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচিত এমপিদের মধ্যে থেেক মনোনীত হবেন। এ ছাড়া বাকি একজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। যার ওপর স্বরাষ্ট্র, সংস্থাপন এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর ভার ন্যস্ত থাকবে।

নিনিয়ানের বিদায়ী বিবৃতি
আমার প্রস্তাবে সরকারি সম্মতিতে খুশি
সহিংসতা হাঙ্গামায় কিছুই অর্জিত হবে না।
সংলাপের সাফল্য সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করে স্যার নিনিয়ান স্টিফেন বলেছেন, সহিংসতা ও হাঙ্গামার মাধ্যমে কিছুই অর্জিত হবে না। এ পথ পরিহারের জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সহিংসতা ও হাঙ্গামা শুধু ক্ষোভ আর হতাশার পথেই দেশকে নিয়ে যাবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান উত্তেজনা ও সঙ্ঘাতময় পরস্থিতির নিরসন এখনো সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন রোববার সকালে এক সংবাদ সম্মলেনে দেয়া বিবৃতিতে বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার সাথে অনেক আলাপ-আলোচনার পর আমি কিছু প্রস্তাব  রেখেছিলাম। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাবে যদি সবাই সম্মত হতো এবং এগুলো যদি বাস্তবায়ন করা যেত, তবে উভয় পক্ষের উদ্বেগেরই নিরসন হতো এবং বর্তমান অচলাবস্থা দূর করা সম্ভব হতো। এ প্রসঙ্গে স্যার নিনিয়ান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি পক্ষ তার এই প্রস্তাব মেনে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, তার এই প্রস্তাব পেশ করা রইল এবং দু’পক্ষই বিচার-বিবেচনা করে এবং প্রয়োজনে কিছু সংশোধন করে যথাসময়ে এটি গ্রহণ করবেন বলে তিনি আশাবাদী।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত জনাকীর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে স্যার নিনিয়ানকে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ দেয়া হয়নি। তিনি শুধু তার বিবৃতি পাঠ করেন এবং এটি পড়া শেষ হতেই দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করেন। সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগেই স্যার নিনিয়ানের অন্যতম সহকারী ক্রিস্টোফার চাইল্ড সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, স্যার নিনিয়ান কোনো প্রশ্নের জবাব দেবেন না। তাকে কোনো প্রশ্ন না করার জন্য তিনি অনুরোধ জানান। স্যার নিনিয়ান ১০টা ৫ মিনিটে সম্মলেন কক্ষে আসেন। পাঁচ মিনিট সময় দেয়া হয় আলোকচিত্র সাংবাদিকদের। ছবি তুলে তারা বেরিয়ে গেলে তিনি বিবৃতি পড়া শুরু করেন। বিবৃতি পাঠ করতে তার সময় লাগে ১৩ মিনিট।
দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে স্যার নিনিয়ান স্টিফেন ১৩ অক্টোবর সস্ত্রীক ঢাকায় আসেন।
বিবৃতির শুরুতইে তিনি সোমবার তার এবং লেডি স্টিফেনের বাংলাদেশ ত্যাগের কথা ঘোষণা করে বলেন, কমনওয়েলথ মহাসচিবের কাছে তিনি পূর্ণাঙ্গ লিখিত বক্তব্য পেশ করবেন। তিনি বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি অভাবিত কোনো অগ্রগতি না ঘটে তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার মিশনের সাফল্য সম্পর্কে কিছুই আমি এই রিপোর্টে পেশ করতে পারব না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি দুঃখজনকভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ঢাকায় আমার অব্যাহত উপস্থিতি আর কোনো প্রয়োজনেই আসবে না। তাই আমি এখন অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাচ্ছি।
বাংলাদেশের জনগণের আতিথ্যের ভূয়সী প্রশংসা করে স্যার নিনিয়ান বলেন, এমন অতিথিপরায়ণ ও দরদি জাতি তিনি আর কখনো  দেখেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই জনগণই হচ্ছে এ দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই শক্তিকে কখনোই অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়। প্রজ্ঞা ও সহনশীলতা দিয়ে পরিচালিত হলে এই জনগণই বাংলাদেশের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অর্জন করে আনবে এবং অতীতের বৈরিতা ও বর্তমানের রাজনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারবে।
স্যার নিনিয়ান বলেন, বাংলাদেশে এখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের এক ক্রান্তিকাল রয়েছে। এ অবস্থায় এ দেশের জন্য প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সমঝোতা। এগুলো কায়েম করা গেলেই বর্তমান প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজে এ দেশের মানুষ আত্মনিয়োগ করতে পারে। তিনি বলেন, এ কারণেই আমি আমার মিশনের সাফল্য নিশ্চিত করার ব্যাপারে এত আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু সে কাজে সফল হতে না পেরে আমি হতাশ হয়ে পড়েছি।
বাংলাদেশে আসার পটভূমি ব্যাখ্যা করে স্যার নিনিয়ান বিবৃতিতে বলেন, কমনওয়েলথ মহাসচিব আনিয়াওকুর তিন দফা প্রস্তাব সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষ মেনে নেয়ায় সংলাপ প্রক্রিয়ার যে সূচনা হয় তাকে সহায়তা করতে মহাসচিবের দূত হিসেবে আমি এখানে আসি। কিন্তু সংলাপে কোনো সমঝোতায় পৌঁছতে না পারায় আমি অবশ্যই অত্যন্ত হতাশ।
স্যার নিনিয়ান বলেন, এখানকার রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের প্রাথমিক দায়িত্ব বরাবরই এ দেশের জনসাধারণের। তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করে বলেন, যেসব ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো দূর করা এবং স্বাভাবিক রাজনৈতিক তৎপরতা আবার শুরু করা সম্ভব হবে।
স্যার নিনিয়ান বলেন, বাংলাদেশে এসে আমি বলেছিলাম, সংলাপপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এ সুযোগ এখনো রয়েছে। পরস্পরের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস অত্যন্ত গভীর ও দৃঢ় হওয়া সত্ত্বেও বাস্তব সত্য হচ্ছে, পক্ষগুলো এগিয়ে এসেছিল, একটা যুক্তিসঙ্গত বিতর্কে অংশ নিয়েছিল। সহিংসতা-হাঙ্গামার পথ পরিহারের জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সহিংসতা ও হাঙ্গামার দ্বারা কিছুই অর্জিত হয় না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কট নিরসনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, উত্তেজনা ও সঙ্ঘাত পরিস্থিতির নিরসন করা, স্বাভাবিক রাজনৈতিক তৎপরতা আবার শুরু করা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা সংহত করা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এখনো সম্ভব বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন।
স্যার নিনিয়ান বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেয়ার আগে এই আশা ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের জনগণের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি এবং সত্যিকারের গণতন্ত্রসংবলিত একটি ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা বিধানে দেশের নেতৃবৃন্দ সক্রিয় উদ্যোগ নেবেন এবং তাদের সে উদ্যোগ অবশ্যই ফলপ্রসূ হবে।

নিনিয়ানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
নিনিয়ানের এই প্রস্তাবে ক্ষমতাসীন বিএনপি সম্মতি জানালেও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানিয়ে দেন, তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া অন্য কোনো ফর্মুলা তিনি মানবেন না। একই সাথে আওয়ামী লীগ স্যার নিনিয়ানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ আনে এবং তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করে কমনওয়েলথ মহাসচিব চিফ এমকো আনিয়াওকুর কাছে ফ্যাক্সবার্তা পাঠায়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শাহ এ এম এস কিবরিয়া এই ফ্যাক্সবার্তা পাঠান। কমনওয়েলথ চিফ এমকো আনিয়াওকু আওয়ামী লীগের এ অভিযোগ নাকচ করে দেন। পাকিস্তান সফররত কমনওয়েলথ চিফ ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নিনিয়ান কোনো পক্ষপাতিত্ব করেননি।
সব মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সমঝোতার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে স্যার নিনিয়ান সাংবাদিকদের কাছে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, সহিংসতা ও হাঙ্গামার মাধ্যমে কিছুই অর্জিত হবে না। সহিংসতা ও হাঙ্গামা শুধু ক্ষোভ আর হতাশার পথেই  দেশকে নিয়ে যাবে। ব্যর্থ মিশন শেষে তিনি ১৪ নভেম্বর দেশে ফিরে যান।

হাসিনাকে খালেদার চিঠি
এর আগে ২৮ অক্টোবর বেগম জিয়া বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানসংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানান। ৩০ অক্টোবর দেয়া জবাবে শেখ হাসিনা প্রস্তাব করেন যে, সরকারকে প্রথমে নীতিগতভাবে স্বীকার করতে হবে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তিনি আলোচনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ২ নভেম্বর বেগম জিয়া শেখ হাসিনার কাছে আরেকটি চিঠি দিলে প্রত্যুত্তরে ৪ নভেম্বর শেখ হাসিনা জানান যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা নীতিগতভাবে মেনে না নিলে কোনো আলোচনাই ফলপ্রসূ হবে না। ১২ নভেম্বর পাঠানো তার তৃতীয় চিঠিতে বেগম জিয়া পুনরাবৃত্তি করেন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে তিনি আলোচনায় প্রস্তুত। কিন্তু নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়।

খালেদাকে হাসিনার ফোন
বিরোধীদলীয় নেত্রী ২৬ নভেম্বর অনেকটা নাটকীয়ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তখন সেখানে ছিলেন না। প্রায় তিন ঘণ্টা পর প্রধানমন্ত্রী ফিরতি কল করেন। টেলিফোনে তারা ১৬ মিনিট কথা বলেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী রাষ্ট্রপতিকে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে পরামর্শ দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রীকে তার বক্তব্য নিয়ে আলোচনায় বসার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু একই সময়ে তিনি বলেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেত্রী কী বোঝাতে চাইছেন তা তিনি বুঝতে পারছেন না। ফলে এই টেলিফোন সংলাপ কোনো ইতিবাচক ফল নিয়ে এলো না এবং পক্ষান্তরে কোনো পক্ষ তাদের নিজ নিজ অবস্থানের ব্যাপারে নমনীয়তা প্রদর্শনের জন্য তৈরি না থাকায় এই টেলিফোন সংলাপের সূত্র ধরে কোনো পক্ষই আর সঙ্কট নিরসনে এগিয়ে আসেনি।
(সূত্র : দক্ষিণ এশিয়া উন্নয়নের সঙ্কট, মওদুদ আহমদ)

সংসদ থেকে পদত্যাগ
১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর সংসদের বিরোধীদলীয় সদস্যরা তাদের নিজ নিজ সংসদীয় নেতাদের নেতৃত্বে পদত্যাগপত্র দাখিল করতে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে যান। একই দিন রাত সাড়ে ৯টায় বিরোধীদলীয় সব সদস্যের উপস্থিতিতে স্পিকারের কাছে তাদের পদত্যাগপত্র দাখিল করেন। এরপর শুরু হয় সহিংস আন্দোলন। পদত্যাগের সাথে সাথে আন্দোলনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ছিল ২-৪ জানুয়ারি তিন দিনব্যাপী হরতালের কর্মসূচি। বোমা বিস্ফোরণ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও দাঙ্গাহাঙ্গামার মধ্য দিয়ে তিন দিনের হরতাল শেষ হয়। এরপর বিরোধী দল ১৯ জানুয়ারি দেশব্যাপী নৌপথ ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি ও জানুয়ারি মাসব্যাপী অন্যান্য বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

সহিংস আন্দোলনের চিত্র
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ’৯৪, ’৯৫ ও ’৯৬ সালের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী অভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মোট ৯৬ দিন হরতাল, অবরোধ এবং অসহযোগ কর্মসূচি পালন করে। এর মধ্যে ৭০ দিন হরতাল অবরোধ এবং ২৬ দিন অসহযোগ। এসব কর্মসূচিতে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের পাশাপাশি একটি লাগাতার ৯৬ ঘণ্টা, ২টি ৭২ ঘণ্টা এবং ৫টি ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডাকা হয়। আর ২৬ দিনের অসহযোগ কর্মসূচির মধ্যে লাগাতার পালিত হয় ২২ দিন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় ’৯৪ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত হরতাল, অবরোধ এবং অসহযোগসহ সহিংস আন্দোলনের চিত্র :
১৯৯৪ সাল : ২৬ এপ্রিল হরতাল, ১০ সেপ্টেম্বর অবরোধ, ১১, ১২ ও ১৩  সেপ্টেম্বর হরতাল, ২৭ সেপ্টেম্বর অবরোধ, ৩০ নভেম্বর অবরোধ, ৭ ও ৮ ডিসেম্বর হরতাল, ২৪ ডিসেম্বর অবরোধ, ২৯ ডিসেম্বর অবরোধ।
১৯৯৫ সাল : ২, ৩ ও ৪ জানুয়ারি হরতাল। ১৯ জানুয়ারি অবরোধ। ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি হরতাল। ১২ ও ১৩ মার্চ লাগাতার ৪৮ ঘণ্টা হরতাল। ২৮ মার্চ ঢাকা অবরোধ। ৯ এপ্রিল ৫ বিভাগে হরতাল। ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর লাগাতার ৩২ ঘণ্টা হরতাল। ৬ সেপ্টেম্বর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। ১৬, ১৭, ১৮ সেপ্টেম্বর লাগাতার ৭২ ঘণ্টা হরতাল। ৭ ও ৮ অক্টোবর পাঁচ বিভাগে লাগাতার ৩২ ঘণ্টা হরতাল। ১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ অক্টোবর লাগাতার ৯৬ ঘণ্টা হরতাল। ৬ নভেম্বর ঢাকা অবরোধ। ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫ ও ১৬ নভম্বের প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। ৯, ১০ ও ১১ ডিসেম্বর লাগাতার ৭২ ঘণ্টা হরতাল। ১৭ ডিসেম্বর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। ৩০ ডিসেম্বর দেশব্যাপী অবরোধ।
১৯৯৬ সাল : ৩ ও ৪ জানুয়ারি লাগাতার ৪৮ ঘণ্টা হরতাল। ৮ ও ৯ জানুয়ারি লাগাতার ৪৮ ঘণ্টা হরতাল। ১৭ জানুয়ারি সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। ২৪ জানুয়ারি সিলেটে ১১ ঘণ্টা হরতাল। ২৭ জানুয়ারি খুলনায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। ২৮ জানুয়ারি খুলনায় অর্ধদিবস হরতাল। ২৯ জানুয়ারি ঢাকায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। ১ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হরতাল। ৩ ফেব্রুয়ারি অর্ধদিবস হরতাল। ৭ ফেব্রুয়ারি ফেনীতে সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত হরতাল। ৮ ফেব্রুয়ারি ফেনীতে হরতাল। ১০ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে হরতাল। ১১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে হরতাল। ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী অবরোধ। ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী ৪৮ ঘণ্টা লাগাতার হরতাল। ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি লাগাতার অসহযোগ। ৯ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত লাগাতার ২২ দিন অসহযোগ।
আন্দোলনের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টার্গেট করে হরতালের কর্মসূচি দেয় আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জামায়াত। এ ক্ষেত্রে ’৯৬ সালের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যেখানেই নির্বাচনী সফরে যান সেখানেই হরতাল ডাকা হয়। বিরোধী দলগুলোর জাতীয় ও আঞ্চলিকভাবে ডাকা এসব কর্মসূচিতে ব্যাপক ভাঙচুর, বোমাবাজি, ককটেল নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে এবং সহিংসতায় নিহত হয় প্রায় অর্ধশত লোক, আহত হয় সহস্রাধিক।
এ দিকে বিরোধী দলগুলোর হরতাল, অবরোধ ও অসহযোগ কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের  নেতারা রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পিকেটিংয়ে অংশ নেন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের জিল্লুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মতিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, কাজী জাফর আহমদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, কাজী ফিরোজ রশীদ, জামায়াতে ইসলামীর আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ প্রমুখ।

ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ-জামায়াত ও জাতীয় পার্টির নেতারা ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেন।
’৯৬ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আয়োজিত এক জনসভায় বলেন,  প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভেবেছেন রোজার মাসে হরতাল হবে না। ইচ্ছামতো ভোট চুরি করে একদলীয় নির্বাচন করিয়ে নেবেন। কিন্তু তিনি জানেন না রোজার মাসেও যুদ্ধ হয়েছিল। লাগাতার ৯৬ ঘণ্টা হরতাল চলাকালে ১৯৯৫ সালের ১৮ অক্টোবর ফার্মগেটের এক সমাবেশে শেখ হাসিনা বলেন, এ সরকার হরতাল ছাড়া আন্দোলনের কোনো ভাষা বোঝে না। হরতালে মানুষের দুুঃখ-কষ্ট হয়। কিন্তু এ ছাড়া আমাদের করারই বা কী আছে? এ দিকে লাগাতার ৯৬ ঘণ্টা হরতাল চলাকালে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়িাম সদস্য কাজী জাফর আহমদ এক সমাবেশে বলেন, ৯৬ ঘণ্টা হরতাল রাজনীতির ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিএনপির প্রস্তাব
১৯৯৫ সালের ১২ ডিসেম্বর বিএনপি নেতারা বিরোধী দলগুলোর সাথে একটি সমঝোতায় আসার প্রচেষ্টা চালান। রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে সরকার একটি ৩-দফা প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবগুলো ছিল নিম্নরূপ :
১. প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর বিরোধী দলগুলো ক্ষমতাসীন দলের মধ্য থেকে একজনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করবে এবং সেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।
২. নয়া প্রধানমন্ত্রী পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেবেন না।
৩. বিরোধী পক্ষ বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি প্রস্তাব বা রূপরেখা প্রণয়ন করবে।
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর মধ্যে বেশ কয়েক দফা চিঠি লেখালেখি হয়। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর অনমনীয়তার কারণে তা থেকে ইতিবাচক কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের সিদ্ধান্ত না নিলে তার সাথে কোনো আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে না এবং আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু হবে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন। তারা আরো দাবি করেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমে সেই আলোচনা সরাসরি প্রচার করতে হবে।

নির্বাচনের প্রস্তুতি
ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে সব ধরনের সমঝোতা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার ফলে নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলতে থাকে। বিরোধী দল আগেই জানিয়ে দিয়েছে এ ধরনের নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না। ২১ জানুয়ারি শেখ হাসিনা এক জনসভায় ঘোষণা করেন যে, ২৩ জানুয়ারির মধ্যে তার মতে ‘প্রহসনের’ নির্বাচন বাতিল না করা হলে গণ-আন্দোলন তীব্রতর করার মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটানো হবে। শেখ হাসিনার ঘোষণার পরপরই রাজধানীর ঢাকার রাজপথে শতাধিক গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় বিরোধী দলগুলোর প্রতিরোধের মুখে বিএনপি প্রার্থীরা যথাযথভাবে নির্বাচনী প্রচারণায়ও অংশ নিতে পারেননি। সন্ত্রাসবাদীরা ঢাকার একমাত্র পাঁচতারা হোটেল সোনারগাঁওয়ে হামলা চালায়। মন্ত্রী এবং বিএনপি নেতাদের জনসভায় হামলা চালিয়ে গোটা দেশের পরিস্থিতিকে চরম অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়।
৩ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন সাধারণ নির্বাচনের একটি তফসিল ঘোষণা করে। প্রথমে ১৯৯৬ সালের ১৮ জানুয়ারি ভোটের দিন ঠিক করা হলেও পরে তা পিছিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি স্থির করা হয়। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও সহযোগী রাজনৈতিক দল জামায়াত ও জাতীয় পার্টি নির্বাচনের এই তফসিল প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচন তফসিল প্রত্যাখ্যান করে ৯, ১০ ও ১১ ডিসেম্বর ৭২ ঘণ্টাব্যাপী হরতাল ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

সাধারণ নির্বাচন
ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬
নির্বাচন প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৬ দিনব্যাপী এক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালনের আহ্বান জানানো হয়। বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের দিন দেশব্যাপী গণকারফিউ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। হরতালের মধ্যে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া ১৫ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সহিংসতার কারণে নির্বাচন কমিশন ১১৯টি নির্বাচনী এলাকার নির্বাচন বাতিল বলে ঘোষণা করেন।
নির্বাচনে দেশব্যাপী জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দল আবার ২৪ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকারের বিরুদ্ধে তিন দিনব্যাপী এক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে সরকারি ও আধা সরকারি অফিসগুলোতে অনুপস্থিত থাকা, সড়ক-নদী-রেলপথ অবরোধ ও চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর বন্ধ করে দেয়ার কর্মসূচি দেয়। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অসহযোগ আন্দোলন চরম সহিংস আকার ধারণ করে বন্দরকে অচল করে দিলে পরিস্থিতি দমনের জন্য সেখানে সেনাবাহিনী তলব করা হয়।
বিরোধী দলের আন্দোলনের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে যায় এবং সারা দেশে সহিংসতার কারণে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। বিদেশী বিনিয়োগ শুধু চরমভাবে হ্রাস পায়নিÑ দেশের গোটা অর্থনীতি এক স্থবিরতার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে এগিয়ে যায়। ’৯৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন হরতাল ও গণকারফিউ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে ১৫ জন নিহত হয় এবং আহত হয় আরো ছয় শতাধিক।
নির্বাচনের দিনের চিত্র তুলে ধরে সরকারি ট্রাস্টের পত্রিকা দৈনিক বাংলার রিপোর্টটি ছিল :
বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী হাঙ্গামায় নিহত ৯ জন বহু আহত
স্টাফ রিপোর্টার : দেশব্যাপী নির্বাচনী হাঙ্গামা, বোমা, সংঘর্ষ, গুলবিনিমিয় ও গণপিটুনিতে গতকাল ৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। গত বুধবার রাতে রাজবাড়ীতে উচ্ছৃঙ্খল জনতা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে একজন আনসার ও একজন ছাত্র নিহত হয়। হামলা ও হাঙ্গামায় আহত হয়েছেন ৬ শতাধিক ব্যক্তি। চট্টগ্রামে একজন গুলিতে এবং একজন বোমায় প্রাণ হারান। ঝিনাইদহে গুলি ও গণপিটুনিতে দুইজনের মৃত্যু ঘটে। ফরিদপুরে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের সময় পুলিশের গুলিতে একজন মারা যান। দিনাজপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে একজন প্রাণ হারান। সিলেটের বিয়ানীবাজারে নিহত হয়েছেন একজন।
নির্বাচনবিরোধীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যালট বাক্স ও ভোটের সরঞ্জাম লুটপাট, ভোট কেন্দ্র এবং প্রার্থীর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। কোনো কোনো জায়গায় প্রিজাইডিং অফিসারদের অপহরণের ঘটনাও ঘটেছে।…  (দৈনিক বাংলা : ১৬ ফেব্রুয়ারি ’৯৬)

জনতার মঞ্চ
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের প্রশাসন তথা আমলাতন্ত্রের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। কিছু সরকারি কর্মকর্তা রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষিত কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করে। সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তারা রাস্তায় নেমে পড়ে। ২৩ মার্চ ঢাকা শহরের মেয়র ও আওয়ামী লীগের নেতা প্রেস ক্লাবের সামনে ‘জনতার মঞ্চ’ নামে বিশাল এক মঞ্চ তৈরি করেন। সরকারি ও আধা সরকারি সংস্থাগুলোর কর্মচারীরা বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের সাথে মিলে আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে ‘জনতার মঞ্চে’ শামিল হতে থাকেন। বিরোধী দলগুলোর ইন্ধনে কয়েকজন সচিবসহ উচ্চপর্যায়ের সরকারি কিছু কর্মকর্তা ২৭ মার্চ রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করে দেশের আইনশৃঙ্খলাজনিত ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা ৬-দফাভিত্তিক একটি প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তর করে বলেন যে, রাষ্ট্রপতি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন না করা পর্যন্ত তারা তাদের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন। ৩০ মার্চ ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তারা সরকারি কর্মচারী সংহতি পরিষদের সাথে মিলে সচিবালয়ের বাইরে বের হয়ে আসেন ও ‘জনতার মঞ্চে’ যোগ দেন। বেসামরিক কর্মকর্তাদের নেয়া এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ দেশের প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। বেসমারিক প্রশাসনে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে। বেসামরিক প্রশাসন তখন থেকেই কার্যত দলীয় ভিত্তিতে বিভাজিত হয়ে পড়ে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস
১৯ মার্চ খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বে ৪৭ সদস্যের একটি নয়া মন্ত্রিপরিষদ শপথ গ্রহণ করেন। একই দিনে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন যে, সংবিধানে একটি উপযুক্ত সংশোধনী আনা হবে যাতে করে আগামী সাধারণ নির্বাচন একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি যখন বিরোধী দলের দাবি মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন তখন সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকা এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। রাজধানীতে নির্বিচারে যানবাহন, পেট্রল পাম্প, দোকানপাট ও সরকারি বাসভবনগুলোতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
২৫ মার্চ রাতভর আলোচনা শেষে ভোররাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস এবং সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২৬ মার্চ সকাল ৬টায় জাতীয় সংসদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাসের পর সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন, আমি আমার প্রতিশ্রুতি পূরণ করলাম।
পরদিন (২৭ মার্চ বুধবার) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রেসিডেন্টকে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস করা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনসহ বিল যত শিগগির সম্ভব অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। ২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট আইন অনুযায়ী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলে সম্মতি দেন।  প্রেসিডেন্টের এই সম্মতির পর বিলটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পথ সুগম হয়। ২৯ মার্চ শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আবারো রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং মে মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের প্রতি অনুরোধ জানান।
৩০ মার্চ বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন ও সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেন। ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ বলে কথিত বিশাল এক গণমঞ্চ থেকে তিনি জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া তার গত্যন্তর ছিল না, কারণ সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। তিনি দাবি করেন যে, জাতির কাছে তিনি বলেছিলেন যে সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া এমন কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসা যাবে না; কাজেই নির্বাচন অনুষ্ঠান করে সংসদের প্রথম অধিবেশনে তিনি ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল গ্রহণ করে সেই ব্যবস্থাই করেছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শপথ
৩০ মার্চ সন্ধ্যায় সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ নেন। বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও দেশের গণমান্য ব্যক্তিবর্গ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি পূরণ হওয়ায় শেখ হাসিনা ছিলেন খুবই হাস্যোজ্জ্বল।

শেখ হাসিনার বিবৃতি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করুন : শেখ হাসিনা
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা শনিবার এক বিবৃতিতে তার দলের পক্ষ থেকে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়ার আশ্বাস দেন। বিবৃতিতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাফল্য কামনা করেন।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও তার সুযোগ্য সহযোগীদের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। তাদের প্রজ্ঞা, নিরপেক্ষতা এবং কর্মদক্ষতার ওপর আমরা আস্থা জ্ঞাপন করছি।
শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের অপরিসীম ত্যাগ ও তিন দলের আন্দোলনের ফলে বিএনপি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, বাঙালি জাতি আর একবার প্রমাণ করেছে, জনতার ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কাছে কোনো স্বৈরাচারী শক্তি টিকে থাকতে পারে না। ন্যায্য ও সত্যের সংগ্রাম সব সময় জয়ী হয়। আন্দোলনে বহু ত্যাগ ও তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে  দেশকে মুক্ত করার জন্য সব রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সংস্কৃতিসেবী, কবি, সাহিত্যিক, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, ব্যবসায়ী, নারীসমাজ, এনজিও, সাংবাদিক, খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষসহ সবাই আন্দোলনে যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন তার জন্য তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
বিবৃতির শুরুতে তিনি বলেন, বিজয়ের এই আনন্দঘন মুহূর্তে সংগ্রামী জনগণের পক্ষ থেকে আমি পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। গণতন্ত্রকে মুক্ত করার আন্দোলনে যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন তাদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তিনি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। যারা আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে তিনি বলনে, বিরোধী দলগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মী রাজবন্দী হিসেবে কারাগারে আছেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে তাদের মুক্তি ও তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য তার দল দীর্ঘ দিন সংগ্রাম করেছে। পঞ্চম সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ  থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পেশ করা হলেও ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের একদলীয় মনোভাবের কারণে সে বিল সংসদে উত্থাপনের সুযোগ পাওয়া যায়নি। মিরপুর, মাগুরাসহ বিভিন্ন উপনির্বাচনে এবং স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ভোট কারচুপি, সন্ত্রাস ও প্রাণহানির ঘটনার কারণেই বিরোধী দল এই দাবি করেছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য জনগণের ভোটের অধিকার জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়া এবং নিরাপদে যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সে ব্যবস্থা করাই আমাদের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। সংসদে চেষ্টা করেও যখন আমরা অপারগ হই তখন সব বিরোধী দল জনগণের স্বার্থে পদতাগে বাধ্য হই, রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলি। তিনি বলেন, জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে বিএনপি সরকার নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি  মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। আজ জনগণের কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, অবাধ ও মুক্ত পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দেশবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই  দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে এবং দেশবাসী অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে পারবে বলে বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ দ্রুত গতিতে সম্পন্ন করতে হবে। বিএনপি সরকারের পাঁচ বছরের শাসনামলে দেশ অনেক পিছিয়ে গেছে এ কথা উল্লেখ করে তিনি সমগ্র জাতিকে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, তার দল প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তিনি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা এবং দেশের সর্বত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে আইন নিজ হাতে তুলে না নেয়ার আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বললেন, আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলার মানুষের দুর্ভাগ্য যখন বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত অর্থনৈতিক কর্মসূচি সুফল পেতে শুরু করে ঠিক তখন জাতির জনককে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। এর পর থেকেই মানুষের ভোটের অধিকার ও ভাতের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি  খেলা শুরু হয়।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ২৫ বছর উদযাপনকালে অধিকার আদায়ের জন্য জনগণকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে, বুকের তাজা রক্ত দিতে হচ্ছে এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের দরবারে যে মর্যাদা ও গৌরব অর্জন করেছিল, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আবার তা করব ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, অসহযোগ আন্দোলনের সব কর্মসূচি এ মুহূর্তে প্রত্যাহার করা হলো।
বিজয়ের আনন্দ যেন জনগণের জীবনে স্থায়ী হয় এবং এই আন্দোলন  যেন জাতির জীবনে নব অধ্যায়ের সূচনা করে এই আশা ব্যক্ত করে  দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।
(দৈনিক বাংলা : ৩১ মার্চ, রোববার  ’৯৬)

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি ও রিট দায়ের
ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। ষষ্ঠ সংসদে গৃহীত এ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি সম্মতি জানান ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ। এর পর থেকে নির্বাচিত সরকারের  মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ অবস্থায় ত্রয়োদশ সংশোধনীর  বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে অ্যাডভোকেট এম সলিমউল্লাহসহ কয়েকজন আইনজীবী ১৯৯৯ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন। আবেদনে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বা পদ্ধতি গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। এটা সংবিধানেরও পরিপন্থী। কারণ গণতন্ত্র ও সংবিধানের চেতনা হচ্ছে সব সময় নির্বাচিত সংসদ বহাল থাকবে। নির্বাচিত সরকারই দেশ পরিচালনা করবে। ওই আবেদনের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরে রুলের শুনানি গ্রহণ করে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বৃহত্তর  বেঞ্চ ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ  ঘোষণা করে রায় প্রদান করেন।

হাইকোর্টের রায়
২০০৪ সালে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চে রিটের চূড়ান্ত শুনানি হয়। বিচারপতি মো: জয়নুল আবেদীন, বিচারপতি মো: আওলাদ আলী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চে ওই শুনানি হয়। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়। বিচারপতি মো: জয়নুল আবেদীন মূল রায় লিখেন। অন্য দুই বিচারপতিও তার সাথে একমত পোষণ করে রায় লিখেন।
রায়ে হাইকোর্ট বলেছিলেন, ১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ও সংবিধানসম্মত। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনা ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদে কোনো সংশোধন আনা হয়নি। এ কারণে কোনো গণভোটের প্রয়োজন ছিল না। এই সংশোধনী সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করেনি বিশেষ করে গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে। তবে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন হাইকোর্ট। সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো মামলায় হাইকোর্ট যদি মনে করে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত রয়েছে তাহলে সার্টিফিকেট দেয়া হয়। এতে আর লিভ টু আপিল দায়ের করতে হয় না। সরাসরি আপিল দায়ের হয়ে যায়।
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন
হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান আবেদনকারীরা। মূল রিট আবেদনকারী এম সলিমউল্লাহ মারা যাওয়ায় এবং অন্য আবেদনকারী অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস বাবু হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায়  আপিলটি  মো: আবদুল মান্নান খান বনাম বাংলাদেশ সরকার নামে কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
আপিল বিভাগে গত ১ মার্চ ২০১১আপিলের শুনানি শুরু হয়, শেষ হয় ৬ এপ্রিল ২০১১। এরপর বিষয়টি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন আপিল বিভাগ।

আপিল বিভাগের সংক্ষিপ্ত আদেশে যা বলা হয়েছে
সংক্ষিপ্ত আদেশে আপিল বিভাগ বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে আপিল মঞ্জুর করা হলো। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন ১৯৯৬ এখন থেকে বাতিল ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হলো। দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন ত্রয়োদশ সংশোধনীর অধীনে হতে পারে। আইনের বহু পুরনো নীতি হচ্ছে এই, কোনো কিছু বেআইনি হলেও প্রয়োজনের তাগিদে তা বৈধ হতে পারে। একইসাথে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা হচ্ছে সর্বোচ্চ আইন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নিয়োগের বিধান বাতিলে আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদের স্বাধীনতা থাকবে।

সংবিধান সংশোধন কমিটি
সংবিধান সংশোধনে  ২১ জুলাই ২০১০ সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ১৫ সদস্যের এ কমিটির  চেয়ারপারসন করা হয় সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীকে ও কো-চেয়ারম্যান করা হয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আওয়ামী লীগের  তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আবদুল মতিন খসরু, রহমত আলী, শিরিন শারমীন চৌধুরী, ফজলে রাব্বী মিয়া, হাছান মাহমুদ, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন এবং জাসদের হাসানুল হক ইনু।
জাতীয় সংসদে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব করে  প্রধানমন্ত্রী  বলেন, বাংলাদেশর মানুষের বুকে যাতে জগদ্দল পাথর আর চেপে বসতে না পারে সে জন্যই সংবিধান সংশোধন করা  প্রয়োজন।
ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর সভাপতিত্বে  সংসদ অধিবেশনে এ সময় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার দুই শরিক দল জামায়াতে ইসলামী ও বিজেপির সদস্যরা অনুপস্থিত ছিলেন। সংসদের এই  বিশেষ কমিটির জন্য বিরোধী দলের কাছে নাম চাওয়া হলেও তারা নাম দেননি।

আওয়ামী লীগ চেয়েছিল সংস্কার
তত্ত্বাবধায়ক সরকারে পরিবর্তন আনতে আওয়ামী লীগ  সুস্পষ্ট কিছু  প্রস্তাব দিয়েছিল।  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ হবে ৯০ দিন। এই ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে ব্যর্থ হলে আগের সরকার পুনর্বহাল হবে। সেই সরকার যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করবে। সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটির সাথে বৈঠকে এই  প্রস্তাব দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
২৮ এপ্রিল ২০১১ সংবিধান সংশোধন কমিটির সাথে বৈঠক শেষে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রস্তাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ৯০ দিনের মধ্যে অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে। ব্যর্থ হলে পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সরকার বহাল হয়ে যাবে এবং তারা নির্বাচন করবে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের শাসনকালের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ক্ষমতার  লোভ তাদেরও পেয়ে বসেছিল। তাই তিন মাসের বদলে তারা দুই বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দেয়া হয়। এই বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মতিয়া চৌধুরী, আবদুল জলিল,  মোহাম্মদ নাসিমসহ ১৩ জন যোগ দেন। সভাপতিত্ব করেন কমিটির  চেয়ারপারসন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।

প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পরিধি বাড়বে
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংসদের সরকারি ও বিরোধী দল পাঁচজন করে নাম প্রস্তাব করবে। এখান থেকে আলোচনার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিদ্যমান ব্যবস্থাও থাকবে। আমরা চাই, বিচার বিভাগের বাইরে আরো বিকল্প ব্যবস্থা থাকুক।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সংসদে সরকার ও বিরোধী দল আলোচনা করে ১০ জন উপদেষ্টার নাম দিতে পারে। কিন্তু এটা সম্ভব কি না জানি না। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম চাওয়া হয়েছিল। সেটাও প্রধান বিরোধী দল দেয়নি।’
তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির জরুরি অবস্থা জারির ক্ষমতাসহ একক ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, সে ব্যাপারে কমিটি প্রস্তাব দেবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে বিএনপি এককভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাস করে। আইনটি তারা নিজেদের মনমতো করে পাস করিয়েছে। এতে অন্যদের মত দেয়ার সুযোগ ছিল না। যে কারণে এই বিধানটিকে সংশোধনীর মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করতে হবে।
২৮-০৪-২০১১,  প্রথম আলো

উল্টে গেল আওয়ামী লীগ
তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্কারের প্রস্তাব দেয়ার এক মাস পর আগের অবস্থান পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ। ৩১ মে ২০১১  প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখার কোনো সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, অন্যান্য দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও আগামী নির্বাচন সেভাবেই হওয়া উচিত।
শেখ হাসিনা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিরোধী দল বিএনপির কোনো মতামত থাকলে তা জাতীয় সংসদে এসে দেয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারেও বিএনপি সংসদে এসে মত দিতে পারে বলে তিনি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আরো বলেন, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। আর তাহলে তাদের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব। এর আগের দিন ৩০ মে সংবিধান সংশোধন কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেন। এর এক দিন পর আগের অবস্থান পরিবর্তনের কথা জানান।
৩১-০৫-২০১১, প্রথম আলো
সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৩০ জুন  ২০১১ জাতীয় সংসদে  দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় পর বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপির অনুপস্থিতিতে সংসদে বিভক্তি ভোটে সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন-২০১১ পাস হয়। ১৯৯৬ সালের ২৬ মার্চ ত্রয়োদশ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়। এর অধীনে তিনটি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকালে কয়েকটি বিধানের অপ্রযোজ্যতা (অনুচ্ছেদ ৫৮ক) অনুচ্ছেদ এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২ক পরিচ্ছদে (অনুচ্ছেদ ৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ, ৫৮ঙ); সংবিধানের ২ক পরিচ্ছেদসহ অন্যান্য বিধান বিলুপ্তির প্রস্তাব রাখা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন  প্রথম  নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। বিএনপি নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়। আওয়ামী লীগ সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বশেষ অবসর গ্রহণকারী  বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০১ সালে ১ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়।

২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার
চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে সংবিধান অনুযায়ী  সর্বশেষ অবসর গ্রহণকারী বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি প্রধান উপদেষ্টা হলে পক্ষপাতমূলক আচরণ করতে পারেন এমন অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগ তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মানতে অস্বীকার করে। এর মধ্যে মেয়াদ শেষে খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। এ  অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ইয়াজ উদ্দিন আহমেদ সংবিধান অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নির্বাচন কমিশনও ২০০৬ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্টকে একই সাথে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মানতে অস্বীকার করে। যদিও সংবিধান অনুযায়ী দুই পদ গ্রহণে বাধা ছিল না। আওয়ামী লীগ  নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। দেশে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়। এর মধ্যে ঢাকার রাজপথে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন সমর্থককে পিটিয়ে হত্যা করে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে কিছু সেনাকর্মকর্তা প্রেসিডেন্টকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদকে  প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়।
প্রবল রাজনৈতিক চাপ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতায় গণ-অসন্তোষের মধ্যে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন দেয়ার ঘোষণা দেয়। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ এই সরকারের সব কর্মকাণ্ড বৈধতা দেয়ার ঘোষণা দেয়। এই সরকারের সাথে আওয়ামী লীগের আঁতাত হয়।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সন্দেহজনক একটি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়। বিএনপিকে মাত্র ৩০টি আসনে বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনে কারচুপি ও আঁতাতের বিষয়টি ধারণা করলেও গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার স্বার্থে অতীতে আওয়ামী লীগের মতো নির্বাচন বর্জন করেনি।

অবৈধ সরকার না তত্ত্বাবধায়ক সরকার
সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিন হলেও তারা প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো এখতিয়ার না থাকলেও তারা এ ধরনের বহু নিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি দুই নেত্রীকে কারাগারে পাঠিয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো এই সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে অভিহিত না করে অসাংবিধানিক ও  অবৈধ সরকার হিসেবে চিত্রিত করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে মনে করে। যদিও  বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেয়ার পর আমেরিকা যাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন এই সরকারের সব কাজের বৈধতা দেবেন। বিএনপির পক্ষ থেকে এই সরকারের কুশীলবদের বিরুদ্ধে শাাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হলেও তাতে ক্ষমতাসীন দল সাড়া দেয়নি।

আগামী নির্বাচন : অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে। এর পর থেকে বিরোধী দল এই দাবিতে আন্দোলন আরো জোরদার করবে। অপর দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ও শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। এই রায়ে দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে এমন কোনো নির্দেশনা দেয়া হয় তাহলে জাতি বড় ধরনের সঙ্কট থেকে উত্তরণ পাবে আবার যদি আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ে কাদের নিয়ে সরকার গঠন করা হবে সরাসরি এমন নির্দেশনা দেয়া হয় তাহলে জটিলতা আরো বাড়বে।
অর্থাৎ আদালতের এই পূর্ণাঙ্গ রায়ের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply