তথ্যসন্ত্রাসের শিকার ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

Storyসম্মিলিত মিডিয়া সন্ত্রাস
বাংলাদেশে তথ্যসন্ত্রাসের আরেক নজির শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। যেখানে দেশের অধিকাংশ মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল, দাবি একটাই- কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সাল থেকে টানা ২ মাস এ সকল মিডিয়া দিনে রাতে কুড়ি থেকে বাইশ ঘণ্টা লাইভ নিউজ করতে লাগল। সারা দেশের মানুষ স্তম্ভিত হলো, শাহবাগের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে শাস্তি বাড়াতে নতুন আইন পাস করা হলো। সিন্ডিকেট নিউজে দেশবাসী অতিষ্ঠ হতে লাগল, দেশে যেন আর কোন খবর নেই, খবর একটাইÑ তরুণ প্রজন্ম জেগেছে! মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জেগেছে! কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই। এর পর ক্ষণে ক্ষণে মঞ্চের আস্তরণ পরিবর্তন হতে লাগল। দাবি এলোÑ ইসলামী রাজনীতি বন্ধ করতে হবে, ইসলামী ব্যাংক বন্ধ করতে হবে। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি বন্ধ করতে হবে। ইসলামী ব্লগ, ওয়েবসাইট ও পেজগুলো বন্ধ করতে হবে। শুধু তাই নয়, আন্দোলনকারীরা মিডিয়াগুলোর ছত্রছায়ায় আল্লাহ, রাসূল, নামাজ ও রোজা নিয়ে কটূক্তি করতে থাকল। নিহত ইসলামবিদ্বেষী রাজিব হায়দারের নামাজে জানাজা শাহবাগে নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হলো! শুধু তাই নয় সংসদে নিহত রাজিব হায়দারের ওরফে থাবা বাবাকে শহীদ হিসেবে আখ্যা দিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে তার সম্মানে নীরবতা পালন করলেন। এভাবে সরকার শাহবাগীদের কথা আমলে নিয়ে দেশের অধিকাংশ জনমত উপেক্ষা করে প্রায় সকল দাবি এক এক করে পূর্ণ করে চলছে। যে সকল সাংবাদিক নামধারী নপুংসক ব্যক্তি এ ধরনের র্নির্লজ্জকর মিথ্যাচারে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন থেকেই যায়। জানি না তাদের বিকৃত মগজে কোন নাড়া দেবে কি না? স্বাধীনতার চেতনা ও তরুণ প্রজন্মের নবজাগরণের নামে নিরপরাধ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা এ কেমন চেতনা? নির্লজ্জ মিথ্যার বেসাতির বাদ্য বাদকদেরকে কথিত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার প্রশ্নগুলোর কি কোন উত্তর আছে?
Ñ১৯৭১ সালে দালাল আইনে প্রায় ৩৭ হাজার লোকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। এমন একজন কুখ্যাত খুনির(?) বিরুদ্ধে কেন বাংলাদেশের কোথাও ১৯৭১-২০১০ পর্যন্ত কোন মামলা তো দূরের কথা সাধারণ ডায়েরি হয়নি?
Ñ তিনি কী করে ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে অবস্থান করে অধ্যয়ন অব্যাহত রাখেন ও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পড়াশুনা করেন।
Ñ তিনি যদি যুদ্ধাপরাধী হয়ে থাকেন তাহলে ১৯৭৭ সালে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পিলখানার রাইফেলস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব কিভাবে পালন করলেন?
Ñ তিনি কিভাবে ১৯৭৪-১৯৭৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের উদয়ন স্কুলের শিক্ষকতা করেন?
Ñ কিভাবে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জনাব আবদুল কাদের মোল্লাকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন?
Ñ তিনি কিভাবে ১৯৮১-৮২ সালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের পরপর দুইবার সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন?
মিডিয়ায় মিথ্যার বেসাতি যারা অনুরণিত করছেন ১৯৮১-৮২ সালে কাদের মোল্লা যখন সাংবাদিক নেতা ছিলেন তখন তাদের মুখে কে আঠা লাগিয়ে দিয়েছিল? তাহলে কি তারা কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন? তাহলে তার অপরাধ কী?
এগুলো কি তার অপরাধ…?
Ñ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে গোল্ড মেডেল লাভ করেছেন।
Ñ তিনি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ প্রত্যাখ্যান করে ইসলাম ও দেশের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেছেন।
Ñ তিনি বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তারে নেতৃত্বদানকারী সংগঠক এবং ‘ঢাকা মানারাত’সহ দেশে শতাধিক আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছেন।
Ñ তিনি জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নীতিনির্ধারক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। ঢাকা মহানগরী শাখার সাবেক আমীর এবং বিগত দুই দু’টি জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ছিলেন।
Ñ তিনি রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা থাকাকালীন ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বাম রাজনীতি পরিত্যাগ করেন।
উল্লিখিত বিষয়গুলোর উপস্থাপন নেতিবাচক বিকৃতমনা নরঘাতকদের কাছে অরণ্যরোদন ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা তাদের চক্ষু অন্ধকারের মোটা আস্তরণ দিয়ে ঢেকে রেখেছে। এরা দেখেও দেখে না, বুঝেও বুঝে না। তাদের কাছে সত্য- মিথ্যার পার্থক্য করার সক্ষমতা নেই, তারা যেন মানুষ নামের অচেতন লাশ। অর্থের গোলাম। তাদের হীন চক্রান্ত শুধুমাত্র নিরপরাধ এক আবদুল কাদের মোল্লা বা কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। তারা দেশে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ সেক্যুলারিজমের বিষবাষ্প চিরতরে দায়েম-কায়েম করতে চায়।

মজলুমদের ওপর ঘটনার দায় চাপানোর মিথ্যাচার
৫ মে ২০১৩ সাল। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত দিন। রাজধানীর শাপলা চত্বরে সারা দেশ থেকে হেফাজতে ইসলামের আহবানে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমে দ্বীন আল্লামা শফীর নেতৃত্বে নাস্তিকদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজধানী অভিমুখে রওনা দেন। রাজধানীর ফটক দ্বারগুলোতে হাজার হাজার মুসল্লি জড়ো হতে থাকেন, কার্যত সেদিন গণমানুষের জোয়ারে ঢাকার প্রায় সকল রাস্তা অচল হয়ে গিয়েছিল। পরে হেফাজত আমীর আল্লামা শফীর নির্দেশে তারা পুলিশের অনুমতিক্রমে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাপলা চত্বরে সমাবেশ করতে অবস্থান নেয়। এদিকে দুপুর থেকে সমাবেশের দিকে আগত হেফাজতকর্মী ও সাধারণ মুসল্লিদের ওপর চলে পুলিশ ও আওয়ামী যুবলীগ-ছাত্রলীগের উপর্যুপরি আক্রমণ। আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে মুক্তাঙ্গন, বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও দক্ষিণ গেট হয়ে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আওয়ামী সীমাররা আগত মুসল্লিদের ওপর আক্রমণ চলাতে থাকে। আওয়ামী আক্রমণের ক্ষিপ্রতা এত প্রচণ্ড ছিল যে, মনে হলো রাজধানীর বুকে কোন আলেম ওলামা প্রবেশ করাটাই অন্যায়। শুনা গেল একের পর এক হেফাজতকর্মীদের লাশ এখানে সেখানে পাওয়া যাচ্ছে। সময় গড়াচ্ছে আর লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছিল। বায়তুল মোকাররম এলাকায় তাদের হামলায় আশপাশ সকল ফুটপাথের দোকানগুলো আগুনে ছাই হয়ে গেল। বইস্টলগুলোতে সাজানো কুরআন শরীফগুলোও পুড়িয়ে দেয়া হলো। পুলিশি আক্রমণ সহ্য করতে না পেরে আগত মুসল্লিরা বায়তুল মোকাররম মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করলেন; পরক্ষণে আক্রমণের ভয়াবহতায় মসজিদে আশ্রয় নেয়া মুসল্লিরা সেখানে অবস্থান নিতে পারছিলেন না। কারণ টিয়ার শেলের প্রচণ্ড ঝাঁজে মসজিদে অবস্থানটা অসহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশের নিক্ষিপ্ত টিয়ার শেলে মসজিদের কার্পেটে আগুন লেগে যায়। হলুদ মিডিয়াগুলো অনবরত মিথ্যাচার অব্যাহত রাখল, হেফাজত-জামায়াত কর্মীরা মসজিদে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, কুরআন শরীফ পুড়িয়ে দিয়েছে, সমাবেশস্থলে সশস্ত্র অবস্থান করছে, পুলিশের ওপর আক্রমণ করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কুরআনের সম্মান রক্ষার তাগিদে তারা মুখে আল্লাহর জিকির, হাতে তাসবিহ ও জায়নামাজ নিয়ে এসেছিল। যারা কুরআনের সম্মান রক্ষার্থে সকল বাধা-বিপত্তি মাড়িয়ে সারা দেশ থেকে রাজধানীতে এসেছে তাদের পক্ষে কুরআন পুড়ানো সম্ভব? ড. তুহিন মালিক টিভি টক শো-তে বলেছিলেন প্রকৃত ছাত্রলীগের পক্ষে যেভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে গালাগাল করা সম্ভব নয়, ঠিক একইভাবে কুরআনপ্রেমী হেফাজতের কর্মীদের পক্ষে কুরআন পোড়ানো সম্ভব নয়। মসজিদে আগুন জ্বালিয়ে আগত হেফাজতকর্মীরা নাশকতা ও তাণ্ডব চালিয়েছে বলে যে প্রচার করা হয়েছে, আসলে তা কি যুক্তিযুক্ত? যারা মসজিদকে ভালোবাসেন, হরদম মসজিদের খেদমত করেন তারা কেন মসজিদে আগুন দেবেন? মসজিদে কিসের নাশকতা? কার স্বার্থে এ নাশকতা? অন্তত যাদের সামান্য বোধশক্তি আছে তারা এ ধরনের নির্বোধ অপ্রপচার বা মন্তব্য করতে পারেন না। আর যদি যুক্তির খাতিরে বলি তাহলে স্বভাবত প্রশ্ন আসে যদি মুক্তাঙ্গন থেকে পুলিশ ও আওয়ামী পেশিশক্তির যৌথ আক্রমণ হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবে এ আক্রমণের শিকার হয়েছে পল্টন মোড় হয়ে বায়তুল মোর্কারম মসজিদের উত্তর দিকের প্রথম অংশ হয়ে, যেখানে ফুটপাথে বেশ কয়েকটি বুকস্টল ছিল। সেখানে কুরআন-হাদিসও বিক্রি হতো। সে আক্রমণে অনেক কুরআন পুড়ে গেল। সে আক্রমণে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে বিএনপি নেতা জনাব এম কে আনোয়ার মামলা করেছিলেন। আর আওয়ামী ঐ নেতারা ওনার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করলেন, বুড়ো বয়সে আনোয়ার সাহেবকে জেলে যেতে আওয়ামী আদালত বাধ্য করল। এতে যারা প্রকৃত অপরাধী তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েই গেলেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও নির্লজ্জভাবে তার সরকারি খরচে নির্বাচনী সভাগুলোতে দেদার বলে যাচ্ছেন হেফাজতের কর্মীরা, তেঁতুল হুজুররা কুরআন পুড়িয়েছে, মসজিদে আগুন লাগিয়েছে। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, সেনানিবাসে গিয়ে বক্তব্য কালেও বললেন, ‘হেফাজত, বিএনপি জামায়াত কুরআন পুড়ায়, মসজিদে আগুন লাগায় তাদের মুখে ইসলামের কথা মানায় না, আপনারা এদের থেকে সতর্ক থাকুন।’ অথচ তিনি তার বক্তব্যে প্রায়ই এ-ও বলেন, ‘ধর্মকে ব্যবহার করে বিরোধী দল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করছে।’ তিনি বিরোধী দলকে দুষলেন যে তারা ইসলামকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায় অথচ তিনি তার বক্তব্য সে ইসলামকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন তাতে কি তিনি ইসলামকে ব্যবহার করছেন না? বলেন এক রকম, করেন আরেক রকম, যাকে বলে রাজনৈতিক মিথ্যা স্ট্যান্টবাজি! কিছু গণমাধ্যম প্রধানমন্ত্রীর মিথ্যার বেসাতি প্রচারের সফরসঙ্গী হয়ে অসত্যকে রঙচঙ লাগিয়ে যে মিথ্যাচার হচ্ছে তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। তবে এসব অসত্য মিথ্যাচার ধীরে ধীরে দিনের আলোর মতো জনসম্মুখে স্পষ্ট হয়ে চলছে এবং এসব গণমাধ্যম থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
৫ মে শাপলার খোলা আকাশের নিচে আমীরের অপেক্ষা করছিলেন হেফাজতকর্মীরা। আমীরের পরবর্তী নির্দেশ পালন করবেন তারা। মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজে চারদিকে এক ভয়ানক পরিবেশ ঘনীভূত হয়েছিল। কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই পুলিশ ও আওয়ামী পেশিশক্তি সমাবেশের আশপাশে আক্রমণ অব্যাহত রাখল। হেফাজত নেতারা মাইকে সমস্বরে বারবার প্রশাসনকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছিলেন যে আমাদের আমীরের নির্দেশে আমরা যাবো। অনেকে মনে করেন সেদিন যদি হেফাজত আমীর আল্লামা শফীকে লালবাগ মাদ্রাসা থেকে প্রশাসনের উদ্যোগে সমাবেশ স্থলে নিয়ে আসা হতো তাহলে হয়তো বা হেফাজতকর্মীরা চলে যেতেন। আর যদি না-ও যেতেন সরকারের কী এমন ক্ষতি হতো এক রাত শাপলা চত্বরে থাকলে? স্বাধীনতার চেতনায় গণজাগরণ মঞ্চ মাসের পর মাস রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পথ আটকে রাখলে যদি কোন অসুবিধা না হয়, তাহলে ইসলামের চেতনায় উদ্ভাসিত হেফজতকর্মীরা তাদের যৌক্তিক দাবিতে এক দিন সেখানে থাকলে কী এমন অসুবিধা হতো? সরকার সহ্য করতে পারল না। শুরু হলো ঘুমন্ত, ক্ল¬ান্ত, নামাজরত মুসল্লিদের ওপর নারকীয় হিটলারীয় কায়দায় হত্যাযজ্ঞ। অসংখ্য বনি আদম হতাহত হলেন। লাশ গুম করা হলো। সারা দুনিয়া দেখেছে হতাহতের সুনির্দিষ্ট তালিকা সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। পুলিশ-র‌্যাব ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরস্পরের নিহতের সংখ্যার প্রকাশে ছিল গরমিল ও সন্দেহ-সংশয়। প্রশাসনের দানবীয় চেহারার কাছে নিরীহ নিহতের স্বজনেরা বিচারের জন্য যেতে সাহস করলেন না। তারা মনে করেন যারা দেশের মানুষকে গুলি করে রাতের অন্ধকারে গণহত্যা চালাতে পারে কে তাদের কাছে বিচার চাইবে? বিচার চেয়ে কী লাভ? যারা বিচার চাইতে গেছেন তার বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, পোহাতে হয়েছে নানা ধরনের ঝক্কি-ঝামেলা, পড়েছেন প্রশাসনের হুমকি-ধমকির মুখোমখি। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে তাদের কাছে শাপলা চত্বরের নিহত ৬৫ জনের তালিকা আছে। এ তথ্য প্রকাশের পর এই সংগঠনের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমানকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করা হলো। তাহলে কি এতে বুঝতে অসুবিধা হয় সরকারের গণহত্যার দানবীয় চেহারা উন্মোচিত হওয়ার ভয়ে তারা জনাব আদিলকে গ্রেফতার করেছে? সেদিন সরকারের যথার্থ সমালোচনাকারী টিভি চ্যানেলগুলোর লাইভ বন্ধ করে দেয়া হলো। এক লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার বুলেট খরচ করে আলেম ওলামাদের চার ঘণ্টার ব্যবধানে শাপলা মুক্ত করলেন। শুধু রাখলেন সরকারের কিছু পদলেহী মিডিয়া। তারা এমনভাবে খবর পরিবেশন করল যেন দেশে কিছুই ঘটেনি! সব দোষ যেন আলেম-ওলামাদের। কেন তারা ঢাকা এলো? এ ধরনের মিথ্যার বাহকদের কাছে সচেতন দেশবাসী কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। যেগুলোর জবাব তারা এখনো দিতে পারেনি, পারেনি সরকার বাহাদুরও। কেন সে দিন অপারেশনের সময় লাইট পোস্ট বন্ধ করে দিয়েছিল? কেন সেদিন লাইভ সম্প্রচারকারী দু’টি টিভি বন্ধ করে দেয়া হলো? বলা হয়েছিল জামায়াত- হেফাজত কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থান করছিল- কোথায় তাদের অস্ত্রের গর্জন? কেন সেদিন কোন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ হতাহত হয়নি? তাহলে এটি নিরপরাধ আমজনতার ওপর পরিচালিত গণহত্যা নয় কি? কেন এ সকল সত্য ঘটনা দেশের মিডিয়াগুলো মিথ্যার মোড়কে ঢেকে রাখে? তারা বড়ই নির্বোধ। সাময়িক ফায়দা হাসিল করে তারা আহলাদে আটখানা হলেও সত্য একদিন বীরের বেশে প্রতীয়মান হয়।

সিন্ডিকেট তথ্যসন্ত্রাস
বর্তমান দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষের দেশ-বিদেশ থেকে খবর জানার জন্য, তথ্য পাওয়ার জন্য অন্যতম মাধ্যম হলো ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া। এর মধ্যে বিবিসি, সিএনএন, ভুয়া, রয়টার্স, টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, আল-জাজিরা, দি ইকোনমিস্ট, এএফপি ইত্যাদি প্রভাবশালী গণমাধ্যম অন্যতম। এ সকল মিডিয়া খবর প্রকাশের সাথে সাথে শত কোটি মানুষের কাছে সংবাদ পৌঁছে যায়। ইহুদিদের চক্রান্তস্বরূপ ইসলামকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মৌলবাদের সাথে প্রতিনিয়ত সম্পৃক্ত করতে বেশ কিছু মিডিয়া সৃষ্টি করা হয়েছে। যে সকল মিডিয়ার ইনভেস্টমেন্ট আসে চক্রান্তকারীদের হাত থেকে। ভয়াবহ ব্যাপার হলোÑ মিডিয়াগুলো আজগুবি আজগুবি তথ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশে ইসলামপন্থী স্বাধীনতাকামীদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে চলছে। যেমন, ফিলিস্তিন, কাশ্মির। বিষয়টা এমন যে, এখন ডাকাত ঘরে ঢুকে সব নিয়ে যাচ্ছে, আর গেরস্থের কিছু বলার অধিকার নেই। যেমনটি আচরণ করছে ইসরাইল। রাষ্ট্রবিরোধী মতকে দমনের জন্য পৃথিবীর অধিকাংশ শাসকই মিডিয়াকে অপব্যবহার করে থাকে। তবে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের স্বরূপই আলাদা, ১/১১ টুইন টাওয়ার হামলার সাথে মুসলমানদের জড়িত করতেই বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের জঙ্গি সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য অপচেষ্টা চালিয়েছিল বুশ প্রশাসন। কিন্তু এখানে মুুসলমানদের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না তা প্রমাণ তো দূরের কথা বরং খোদ তখনকার বুশ প্রশাসন ও ইহুদিদের দিকেই সন্দেহের তীর ঘনীভূত হয়েছে। ইসলামপন্থীদের উত্থানে শঙ্কিত রাষ্ট্রগুলো উত্থান দমাতে মিডিয়ার মাধ্যমে অমানবিক তথ্যসন্ত্র¿াস চালাচ্ছে। ইসলামের প্রচারক নেতৃবৃন্দকে বা তাদের অনুসারীদেরকে গ্রেফতার করে একপক্ষীয়ভাবে মিথ্যা বক্তব্য উপস্থাপন করে সর্বমহলে ইসলামের ব্যাপারে নেগেটিভ ধারণা সৃষ্টি করছে। অথবা ইসলামপন্থী আন্দোলনের কর্মীদের চরম নির্যাতনের মাধ্যমে জোর জবরদস্তিভাবে স্বীকারোক্তি আদায় করে মিডিয়াতে দেদার প্রচার করছে। আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে ইসলামপন্থীদের সাথে সরকারের আচরণ বীভৎস, অমানবিক; যা একই সূত্রে গাঁথা। ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সরকারের ইসলামের বিরুদ্ধে নানামুখী বিদ্বেষমূলক কর্মযজ্ঞের প্রতিবাদ করলে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়। ৫ মে শাপলা চত্বরে আলম-ওলামাদের সাথে মাদ্রাসার অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রদেরকে যোগ দিতে দেখা যায়, মাদ্রাসা ছাত্ররা এই ধরনের সমাবেশে যোগ দেয়াকে চরম অন্যায় বলে মিডিয়াগুলো প্রচার করে। আর অন্য দিকে গণজাগরণ মঞ্চ স্কুলের কোমলমতি ছাত্রদেরকে নিয়ে আসে সরকারি ফরমায়েসে বাধ্যতামূলকভাবে। তারা ইসলামবিরোধী শ্লোগান দেয়। এটা তাদের ভাষায় অন্যায় নয় বরং স্বাধীনতার চেতনা! বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে তাদের সামনে অস্ত্র, গোলা-বারুদ জিহাদী বই সাজিয়ে রেখে মিডিয়াগুলো প্রচার করে ধৃত ব্যক্তিবর্গ নাশকতার পরিকল্পনা করছে, হামলা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজারে অবস্থিত মুফতি ইযহারুল ইসলাম পরিচালিত মাদ্রাসায় আইপিএসের বিস্ফোরণজনিত কারণে অগ্নিপাত ও কয়েকজন ছাত্র আহত হয়েছে বলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হয়। কিন্তু পরক্ষণে পুলিশ সেখানে বোমা বানানোর সরঞ্জাম পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছে, এর পর যেন নাটকের স্ক্রিপ্ট আরো দীর্ঘতর হতে লাগলÑ সেখানে শক্তিশালী গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়েছে, যে নুরুন্নবী সেখানে গ্রেনেড বানাত সে শিবিরের ক্যাডার! অথচ যে দু’জন আহত ছাত্র মারা গেছে ফরেনসিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, তাদের শরীরে কোন ধরনের বোমার স্পি­ন্টার লাগেনি, তারা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। ৭১ টিভি চ্যানেলসহ বেশ ক’য়েকটি চ্যানেল বেশ ফলাও করে এ রিপোর্ট প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এর পরের দিন ৭১ টিভি অফিসে আইপিএসের বিস্ফোরণে একজন কর্মচারী আহত হয়েছেন এবং অফিসে অগ্নিপাত হয়েছে। যদি একই সুরে কেউ বলে যে- এই টিভি চ্যানেল যেহেতু আওয়ামী সমর্থিত সেহেতু এখানে ছাত্রলীগ বোমা বানাচ্ছিল, এতেই সেখানে বোমার বিস্ফোরণ হয়েছে। তাহলে কি কেউ বিশ্বাস করবে? হয়তোবা অন্যায়ভাবে পুলিশ অভিযান চালিয়ে একটি নাটকও সাজাতে পারত, অন্য মিডিয়াগুলোও রঙ মেখে প্রচার করতে পারত। প্রকৃতপক্ষে কারো ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য অনেক কিছু প্রকাশ করা যায়, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ফল ভালো হয় না। যারা অত্যাচারিত তাদেরকেই শাসকরা অত্যাচারী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। এসব মিডিয়ায় বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্ট, আর্টিকেল প্রচার-প্রকাশ করা হয় সমাজতন্ত্রের কল্যাণে। শ্লোগান প্রচার করা হয় ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। আবার এ প্রচারমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে অপরাধীদেরকে সাধু হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চলে অনবরত। সম্প্রতি লন্ডনে সফরে গিয়ে মহাজোট সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু কতিপয় যুবকের হমলার শিকার হন এবং প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘এটা স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদীগোষ্ঠী ও বিএনপি- জামায়াতের কাজ হতে পারে। এ ধরনের হামলা ও ভিন্নমতের চ্যানেলের মান ক্ষুণœ করার চেষ্টা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য হুমকি।’ উনার এই দায়িত্বপরায়ণ বক্তব্যের পর অনেকে মন্তব্য করেন, যখন দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামী টেলিভিশন ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয় তখন কি তিনি ভিন্নমতের মিডিয় বন্ধ করার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ভূলুণ্ঠিত করার দায়িত্বই নিয়েছিলেন? এসব জ্ঞানপাপী সমাজ ভাঙনের কাজে উস্তাদ। নিজেদের আখের গোছাতে সুবিধা মতো শব্দ ব্যবহার করে। অবশ্য অতি চালাকের গলায় দড়ি, তারা নিজেদের পাতা ফাঁদে নিজেরাই পতিত হয়। যাদেরকে যে বিষয়ে অভিযুক্ত করা হয় তারা সে বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত না থাকলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তেজিত হয় এবং অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টিতে এসব মিডিয়া অনাকাক্সিক্ষত ভূমিকা পালন করে, যা মোটেও কাম্য নয়। দেশের শান্তিশৃঙ্খলায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ তাই যাচাই বাছাই করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসাই তাদের অন্যতম দায়িত্ব। কারো স্বার্থসিদ্ধি করার জন্য কারো ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়া চরম অন্যায় ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। আর আসল সত্য খুঁজে বের করার আগে মিডিয়ায় যাতে অসত্য সংবাদ পরিবেশন না হয় সে ব্যাপারেও নজর দেয়া অতীব জরুরি।

পর্নোগ্রাফি সন্ত্রাস
পশ্চিমাবিশ্ব ইসলামের অবিশ্বাস্য উত্থান ঠেকাতে না পারায় চিন্তায় পড়ে যায়। সারা বিশ্বে মুসলমানদের ওপর জুলুম নির্যাতন অব্যাহত থাকার পরও তাদর কেন অবদমিত করা যাচ্ছে না? পশ্চিমা পরামর্শকরা বলেছিল তারা তাদের আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখে, তাকে ভালোবাসে ও তাকে ভয় করে। মুসলমান যুবকদের যদি দমন করা যায় তাহলেই শুধু ইসলামের অগ্রযাত্রাকে স্তিমিত করা যাবে। তাই তাদের নৈতিক পদস্খলন ঘটানোর পরিকল্পনা আঁটল। নামমাত্র দামে চরিত্রবিধংসী ব্লু ফিল্ম ছড়িয়ে দেয়া হলো, সাথে মাদক। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলও চালু করল। সিনেমা হলগুলোতেও চলে এসব আপত্তিকর চলচ্চিত্র। এখন আর সিনেমা হলে যেতে হয় না, ভিসিডিও কিনতে হয় না, হাতের মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপে ইন্টারনেট কানেকশন দিয়ে এসব না চাইতে পাওয়া যায়; মাদক পাওয়া যায় হাতের নাগালে। এক ভয়াবহ নীচুতা! এসব গোগ্রাসে ধারণ করে সকল প্রকার সামাজিক শৃংখলা ও ধর্মীয় অনুশাসন খান খান করে দিয়ে যৌনাসক্ত হয়ে মানুষ কুকুরের মতো আচরণ করছে যত্রতত্র। ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, মাদকাসক্তিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে দেশ গড়ার আগামীর কারিগররা। কবিতা, যৌন সুড়সুড়িমূলক বই, ম্যাগাজিন, পত্রিকাও এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সাথে ওতপ্রোতভাবে যুবাদের জড়িয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করছে। তাদের কাছে ধারণা জন্মেছে অবাধ যৌনতা ও মাদকসেবন মানে আধুনিকতা, স্মার্টনেস। এর অপরিণামদর্শী রেজাল্ট ভয়াবহ। যেমন, পশ্চিমা দেশে যে কোন মানুষের পিতৃ পরিচয় জানতে চাওয়া মানা; জানতে চাইলে অধিকাংশ লোক রেগে যায়। কারণ তারা অনেকে জানে না তাদের পিতৃ পরিচয়। আরো জঘন্য ব্যাপার এ যৌনব্যাধি কোন প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত খবরে দেখা যায়, পিতা মেয়ের সাথে অথবা ছেলে মায়ের সাথে বা ভাই বোনের সাথে এহেন নগ্ন আচরণ করতে মোটেও দ্বিধা করছে না। ইসলামের সুমহান আদর্শকে উড্ডীন করার জন্য যুগে যুগে যুবক সম্প্রদায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। এখন এ যুবকদেরকেই কুরে কুরে শেষ করে দিচ্ছে যৌনপীড়া ও মাদক। অমুসলিম সম্প্রদায়ের মতো মুসলিম যুবক-যুবতীরাও বিয়ের আগে লিভটুগেদার, অবাধ প্রেম ও একজনকে শয্যাশায়ী হিসেবে বেছে নিচ্ছে। যা ইসলাম সম্পূর্ণ হারাম করেছে। এ ধরনের আচরণ সমাজজীবনে বিশৃংখলা সৃষ্টি করছে। এ অবস্থা রোধের জন্য সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও আল্লাহর শাস্তির ভয় হৃদয়ে বপন করতে না পারলে সামনে আরো বড় ধরনের বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারকারীরা ইসলামপন্থীদের চরিত্র হননের সুযোগ করে নেবে আর হযরত লূত (আ)-এর সময় যেভাবে তাঁর সম্প্রদায় সমকামিতার মহামারীর কারণে গজব নেমে এসেছিল, মিল্লাতের ওপর সে ধরনের গজব নেমে আসবে কি না তা-ও ভাববার বিষয়। এ ক্ষেত্রে মিডিয়াগুলোর অনৈতিক নগ্ন আচরণ ভদ্র সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রতিনিয়ত পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টিভি সিরিয়াল যৌন ফিচার, আর্টিকেল, টেলিফিল্ম ছাপানো ও প্রদর্শন করা হয়। নগ্ন-অর্ধনগ্ন ছবি ছাপানো এসব যেন নিত্য দিনের কর্মসূচি। সুশীলসমাজের হাস্যকর ও নাটকীয় পদক্ষেপগুলোও আমাদের যথেষ্ট ভাবিয়ে তুলেছে। তারা একদিকে সমাজ থেকে ইভটিজিং বন্ধ করতে চায়, অন্য দিকে ইভটিজিংয়ের সমস্ত আয়োজন করে নির্লজ্জতার মহোৎসবে সমাজকে ভাসিয়ে দিতে চায়। এসব প্রতিরোধে মিডিয়াগুলোর হাস্যকর নীতিবাচক আচরণের অন্তরালে নেতিবাচক আচরণ সভ্য সমাজকে ভাবিয়ে তুলেছে।

ইসলামের নারীর অধিকার নিয়ে নির্ভেজাল মিথ্যার বেসাতি
নারীরা আমাদের কারো মা, কারো বোন বা কারো স্ত্রী। ইসলাম নারীদের সম্মান বৃদ্ধি করেছে। তাদেরকে মায়ের জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশতের সুসংবাদ প্রদান করেছে। কেউ কেউ বলে থাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীরা নিষ্প্রাণ অবলা। অথচ ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ে উভয়ের পরিপূরক বলে ঘোষণা দিয়েছে। যারা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেন তারা নারীরা নির্যাতিত, শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে, সমাজের নেতৃত্বে নেই, তাদের স্বাধীনতা নেই ইত্যাদি ইত্যাদি কথা বাজারে সরব রাখেন। এসব রোধে ইসলাম স্বীকৃত যে নারীর সম্মান রক্ষার পদ্ধতি আছে তা-ও অনুসরণ করতে চান না। এ সকল গলাবাজ প্রকৃতপক্ষে সমাজে নারীর শান্তি-সম্ভ্রম প্রতিষ্ঠা করতে চায় কি না তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ সংশয় রয়েছে। তারা মূলত নারীদেরকে উত্তেজিত করে মানবসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অশান্তির দাবানল জ্বালিয়ে দিতে ও নারীদের সম্মান মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। সারা বিশ্বব্যাপী নারীসমাজের স্বাধীনতা, অধিকার প্রতিষ্ঠার শ্লোগান উঠেছে ঠিকই কিন্তু এর সমাধানের জন্য কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে শ্লোগানিস্ট অথবা তাদের সমর্থক গোষ্ঠীর দেখা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে নারীদের মর্যাদার কথা ইসলামই নিশ্চিত করেছে। তা শুধু কথায় নয় বাস্তবেও প্রতিষ্ঠা করেছে। কিছুসংখ্যক নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে নিজেদেরই সর্বস্ব হারিয়েছে, তারা এখন সতীত্ব হারিয়ে বৃথা আর্তচিৎকার করছে। এসব দুরবস্থা নিরসনে ইসলামী নেতৃবৃন্দ যখনই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে নারীসমাজকে আহবান জানিয়েছেন তখনই নারীস্বাধীনতার ধুয়া তুলে আবারো সমাজে বিশৃংখলার পাঁয়তারা চালানো হয়েছে। গণমাধ্যমগুলো এ সকল ফেরিওয়ালার সাথে দেদার চিৎকার করতে থাকেÑ ইসলাম নারীদেরকে পশ্চাৎপদ করে ফেলবে, নারী শিক্ষা অর্জন করতে দেবে না, তারা ঘর থেকে বের হতে দেবে না, অফিস আদালতে চাকরি করতে পারবে না, গার্মেন্টসে চাকরি করতে পারবে না ইত্যাদি বানোয়াট দুর্নাম ছড়ানো হয়ে থাকে। অথচ ইসলাম নারীর সম্ভ্রম বজায় রেখে নারীর সীমারেখার মধ্যে সকল কর্ম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে। যেমন শিক্ষার বেলায় ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছে। উম্মুল মুমিনুন হযরত আয়েশা (রা) হাদীসশাস্ত্রের পণ্ডিত ছিলেন, সাহাবীরা তার কাছে এসে হাদীস শিক্ষা নিতেন। দ্বীনের প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে নারীদেরকে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। সুতরাং ইসলাম নারীদের স্বাধীনতা, সতীত্ব বজায় রেখে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছে। যারা এর বিরোধিতা করছে তা না জানার কারণে অথবা জেনেও না জানার ভান করছে দ্বীনের কাজকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য যেভাবে যুগে যুগে পথভ্রষ্ট কিছু মানুষ করেছে। নারীদের অধিকার নিয়ে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা নিম্নরূপ :
হে ঐসব লোক, যারা ঈমান এনেছো! জবরদস্তি করে মহিলাদের ওয়ারিশ হয়ে বসা তোমাদের জন্য হালাল নয়। আর যে মোহরানা তোমরা তাদেরকে দিয়েছো, তার কিছু অংশ আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে জ্বালাতন করো না। অবশ্য তারা যদি সুস্পষ্ট অশ্লীলতার কাজ করে (তাহলে তাদেরকে জ্বালাতন করার অধিকার আছে)। তাদের সাথে ভালোভাবে জীবনযাপন কর। যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর তাহলে হতে পারে, তোমরা এমন জিনিসকে অপছন্দ করছ, আল্লাহ যাতে অনেক মঙ্গল রেখে দিয়েছেন। (সূরা নিসা- ০৪ : ১৯)
পুরুষদের জন্য ঐ মালে হিস্যা রয়েছে, যা বাপ-মা ও আত্মীয়স্বজনরা রেখে গেছে এবং মহিলাদের জন্যও ঐ মালে হিস্যা রয়েছে, যা বাপ-মা ও আত্মীয়স্বজনরা রেখে গেছে, সে মাল অল্পই হোক আর বেশিই হোক। এ হিস্যা (আল্লাহর পক্ষ থেকে) ফরজ করা হয়েছে। (সূরা নিসা- ০৪ : ৭)
আরো বর্ণনা আছে : সূরা নিসা- ১১, ২৩, ৫৪ নং আয়াতে।
সাক্ষ্য আইনে নারী : সূরা বাকারার ২৮ নং আয়াতে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ দেয়া হয়েছে।
হাদীসে রাসূল (সা)-এ নারীর মর্যাদা
হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি দু’টি মেয়েকে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত লালন পালন করল, সে কিয়ামতের দিন এরূপ অবস্থায় আসবে যে, আমি ও সে এরকম একত্রিত থাকব। তিনি তার আঙুলগুলো মিলিয়ে দেখালেন। (মুসলিম: বাবু ফাদলিল ইহসানি ইলাল বানাতি, ৪৭৬৫)
(বুখারী : বাবু রাহমাতিল ওলাদি ওয়া তাক্ববীলিহি, ৫৫৩৬)
হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, হে আল্লাহ! দুই দুর্বল অর্থাৎ ইয়াতিম ও নারীদের প্রাপ্য অধিকার নষ্ট করাকে আমি অন্যায় ও গুনাহ হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিলাম। (ইবনে মাজাহ : বাবু হাককিল ইয়াতিমি, ৩৬৬৮)
হয়রত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, সমগ্র পৃথিবীটাই সম্পদ। আর পৃথিবীর সর্বোত্তম সম্পদ হলো সৎ কর্মপরায়ণ স্ত্রী। (মুসলিম : বাবু খাইরু মাতাঈদ দুনিয়া আল মার আতুস সালিহাতু ২৬৬৮)
পর্দার ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ : হে নবী! আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুুমিন মহিলাদেরকে বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের এক অংশ তাদের ওপর ঝুলিয়ে দেয়। এটা বেশি সঠিক নিয়ম, যাতে তাদেরকে চিনে নেয়া যায় এবং তাদেরকে কষ্ট দেয়া না হয়। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান (সূরা আহজাব-৩৩) (আন নূর-২৭, ৩০, ৩১, ৫৯, আহজাব-৫৩, ৫৯, মু’মিনূন-৫ আ’রাফ-২৬)
ইসলামী সমাজে নারী : সূরা বাকারা-২২৩, ২২৮, ২৩১, ২৩৫, ২৪০,২৪১, নিসা- ৩৪।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে : নিসা ৭, সমাজজীবনে নারী : বাকারা- ২৩৪,
আমাদের দেশে নারীদেরকে ইসলাম সম্মতভাবে জীবন পালনে আলেম-ওলামা ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিয়োজিত সংগঠনগুলো কাজ করে যাচ্ছে। তাদের এ তৎপরতাকে ইসলামবিদ্বেষীরা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে যখন নারী-পুরুষ অবাধে মেলা মেশা শুরু করছে তখন আল্লামা আহম্মদ শফী এর সমালোচনা করে এসব নোংরামি বন্ধ করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান। আল্লামা আহমদ শফীর তার এক বক্তব্যে নারীকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করেছেন। এতে নাকি তিনি নারীজাতির সম্মান হানি করেছেন। সংসদে এটি নিয়ে রসালোভাবে আলাপও করলেন, অনেক এমপি-মন্ত্রীরা শফী সাহেবকে গ্রেফতারের জোর দাবি জানালেন। আবার শফী সাহেবকে লক্ষ্য করে প্রধানমন্ত্রী বললেন যে আপনি যখন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সাথে বসেন তখন জিবে পানি আসে না? তার কাছে আমার সবিনয়ে প্রশ্নÑ জাবি ছাত্রলীগ নেতা মানিক যখন ১০০ জন নারীকে ধর্ষণ করে সেঞ্চুরি উৎসব করে, ভিকারুন্নেসার ছাত্রীরা পরিমল বাবুর সংস্পর্শে সম্ভ্রম হারাতে হয়, কুষ্টিয়া জেলার আদর্শ স্কুলের আদর্শহীন শিক্ষক হেলাল উদ্দিন পান্না শতাধিক কোমলমতি স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর ভিডিও ধারণ করে বাজারজাত করার পরও আইনের আওতায় আসে না, তখনও কি নারীদের লাঞ্ছিত করা হয় না? কবি শামসুর রাহমান, হুমায়ুন আজাদ, জাফর ইকবালসহ রামপন্থীরা যখন নারীদের সর্বাঙ্গ খুলে নিখুঁতভাবে প্রেম নিবেদনের কাব্য-উপন্যাস লিখেন সেগুলোকে আপনি মায়ের জাতির সম্মান রক্ষার কথা বলবেন? ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে পতিতাবৃত্তি করাতে বাধ্য করছে, আপনি কি এটাকেও মায়ের জাতির সম্মান রক্ষার কথা বলবেন? বলবেন না, কিছুই বলবেন না, কারণ আপনাদের মতে এসব নারীর সুখ, প্রেম নিবেদন; যত দোষ হুজুরের। রাসূল (সা) নৈতিকতার ১০টি শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন, হক কথা বল, যদিও বা তিক্ত। শফী সাহেব সেই হক কথাই বলেছেন। নাস্তিক+আ’লীগ এসব অবাস্তব ইস্যুকে ইস্যু করে ভুল বুঝিয়ে নারীসমাজকে বিভ্রান্ত করতে চায়। আমার বিশ্বাস এসব কানকথায় কান না দিয়ে দ্বীনের পক্ষেই তারা অবস্থান নিয়ে হলুদ মিডিয়ার বিভ্রান্তিকর প্রচারণার মুখে চাপেটাঘাত করে সময়োচিত জবাব দেবে। নারীদেরকে প্রমাণ করতে ইসলামীই নারীর অধিকার সুনিশ্চিত করেছে; সে সুখী সমাজ গঠনের জন্যই মুসলিম নারীদেরকে ভূমিকা রাখতে হবে। যেভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন রাসূল (সা), নারী সাহাবায়ে আজমায়িন।
(বাকি অংশ আগামি সংখ্যায়)

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি,
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply