তথ্য অধিকার আইনে তথ্য সংগ্রহের স্বাধীনতা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান
তথ্য অধিকার একটি রাষ্ট্রের সুশাসনের মূলভিত্তি। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী তথ্য জানার অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মানুষ সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নানা ধরনের তথ্য উদঘাটন করে নিজেদের এবং দেশের অনেক উন্নয়ন করছে। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা বিবেক, বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ ও তথ্য অধিকার (তথ্যপ্রাপ্তি সংক্রান্ত) বিধিমালা-২০০৯ প্রণয়ন করা হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি নির্মূলের জন্য এনজিওসমূহ হতেও জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার রয়েছে। পরবর্তীতে তথ্য অধিকার (তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা) প্রবিধানমালা-২০১০, তথ্য অধিকার (তথ্য প্রকাশ ও প্রচার) প্রবিধানমালা-২০১০ এবং তথ্য অধিকার (অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তি) প্রবিধানমালা-২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে তথ্য কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আলোচ্য প্রবন্ধটিতে তথ্য অধিকার আইন ও তথ্য কমিশনের ভূমিকা এবং তথ্য অধিকার বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি আলোকপাত করা হয়েছে।
তথ্য অধিকার আইন ও বাস্তবতা
তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর প্রধান বিশেষত্ব হলো- (ক) বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইনে একটি স্বাধীন ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘তথ্য কমিশন’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশে এরূপ আইন থাকলেও কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়নি। (খ) তথ্য অধিকার আইনে তথ্য কমিশনকে দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এ আইনের অধীনে তথ্য কমিশন কোনো ব্যক্তিকে কমিশনে হাজির করার জন্য সমন জারি এবং শপথপূর্বক মৌখিক বা লিখিত প্রমাণ-দলিল বা অন্য কোনো কিছু হাজির করতে বাধ্য করতে পারবে। দোষী প্রমাণিত হলে তথ্য কমিশন কোনো কর্মকর্তাকে জরিমানা করতে পারবে, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট সুপারিশ করতে পারবে এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের আদেশও দিতে পারবে। (গ) এ আইনে তথ্যপ্রাপ্তির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাকে জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে, যা অধিকাংশ দেশের তথ্য অধিকার আইনে অনুপস্থিত। (ঘ) এ আইনে ইন্দ্রিয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পৃথক একটি উপ-ধারা সংযোজিত হয়েছে, যা সচরাচর অন্যান্য আইনে দেখা যায় না। আইনের ৯ (১০) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ইন্দ্রিয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তথ্য লাভে কোনো ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবেন।
তথ্য অধিকার আইনের সুফল ও উন্নয়ন
তথ্য জনগণকে সমৃদ্ধ করে আর জনগণ তথ্যপ্রাপ্ত হয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে। ফলে একদিকে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, অপর দিকে তথ্যহীনতা সমাজে দুর্নীতির জন্ম দেয়। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই উন্নয়নের প্রধান বাধা দুর্নীতি। অথচ তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং সহজলভ্যতা দুর্নীতি রোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। ‘মুহম্মদ লুৎফুল হক, তথ্য অধিকার আইন-২০০৯, সেমিনার প্রবন্ধ আরকাইভস এবং নথি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কর্মশালা’ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ আরকাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি, ঢাকা এবং হেরিটেজ : বাংলাদেশের ইতিহাসের আরকাইভস, রাজশাহী কর্তৃক আয়োজিত, ১৫-১৮ নভেম্বর-২০০৯, পৃ: ২০।’ তথ্য আইনে তথ্য প্রদানে বাধ্য কর্তৃপক্ষ হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করায় সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মকা- সম্পর্কিত তথ্য জনগণের কাছে প্রকাশ ও প্রদান করতে বাধ্য।
আমাদের দেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগণ তাদের অঞ্চলের জন্য ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিসেবা, প্রতিবন্ধী শিক্ষাসেবা বা পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোনো ব্যবস্থা যেমন, বয়স্ক-ভাতা, বিধবা-ভাতা সুবিধাভোগী, দুস্থ নারী ও শিশুর পুনর্বাসন কার্যক্রম, প্রতিবন্ধী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ তৈরি বা মেরামত ইত্যাদি সম্পর্কে জানে না। তথ্য অধিকার আইন জনগণকে এ অধিকার দিয়েছে যে, এসকল প্রতিষ্ঠান জনসেবামূলক কার্যক্রম সঠিকভাবে পালন করছে কি না তা যাচাই করার। ‘সানজিদা সোবহান, তথ্য অধিকার : আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবতা, দৈনিক প্রথম আলো, ২৯ মার্চ ২০১০, পৃ: ১২।’ এ আইন প্রয়োগ করে জনগণ জাতীয় বাজেটের বিভিন্ন সেবামূলক খাত সম্পর্কেও জানতে পারবে। এসব সেবা সম্পর্কে যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যথাসময়ে সঠিক তথ্য জানতে পারবে, তখন তারা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এভাবে আমাদের শিক্ষা, সমাজ সেবামূলক পরিকল্পনা এবং জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য সেবা, পানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, যানবাহনব্যবস্থা এবং বাজার-ব্যবস্থার মতো অধিক সংখ্যক সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণ সঠিক তথ্য পেলে তারা তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
তথ্যপ্রাপ্তির অনুরোধ ও তথ্য প্রদান পদ্ধতি
তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৮ অনুযায়ী তথ্যপ্রাপ্তির অনুরোধ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মুদ্রিত ফরমে নির্ধারিত ফরম্যাটে হতে হবে। তবে ফরম মুদ্রিত বা সহজলভ্য না হলে সাদা কাগজে, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা ই-মেইলেও তথ্যপ্রাপ্তির জন্য অনুরোধ করা যাবে। তবে উল্লিখিত অনুরোধে অনুরোধকারীর নাম, ঠিকানা, ফ্যাক্স নম্বর এবং ই-মেইল ঠিকানা; যে তথ্যের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে তার নির্ভুল এবং স্পষ্ট বর্ণনা; অনুরোধকৃত তথ্যের অবস্থান নির্ণয়ের সুবিধার্থে অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিক তথ্যাবলি এবং কোন পদ্ধতিতে তথ্য পেতে আগ্রহী তার বর্ণনা অর্থাৎ পরিদর্শন করা, অনুলিপি নেয়া, নোট নেয়া বা অন্য কোনো অনুমোদিত পদ্ধতি উল্লেখ থাকতে হবে। তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনুরোধকারীকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক উক্ত তথ্যের জন্য নির্ধারিত যুক্তিসঙ্গত মূল্য পরিশোধ করতে হবে।
তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণের কর্তব্যসমূহ
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় জনসাধারণকে তথ্য প্রদানের সাধারণ বিধান হলো, প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি দফতরে একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথ্য প্রদানের জন্য নিয়োজিত থাকবেন, যিনি জনগণের আবেদনের প্রেক্ষিতে আইনের বিধান ও ব্যতিক্রমসমূহ অনুসরণপূর্বক কাক্সিক্ষত তথ্য নির্ধারিত ফি গ্রহণপূর্বক সরবরাহ করবেন। তথ্য অধিকার আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, তথ্যের জন্য কোনো নাগরিকের কাছ থেকে অনুরোধ পাবার ২০ দিনের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সেই তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহ করতে হবে। তবে যে তথ্য চাওয়া হয়েছে তা যদি অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে সংগ্রহ করতে হয় তাহলে এই সময় ৩০ দিন পর্যন্ত বেড়ে যাবে। আর যদি কোনো কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনুরোধকৃত তথ্য প্রদান করতে না পারে তাহলে তার কারণ উল্লেখ করে আবেদন পাবার ১০ দিনের মধ্যে তা অনুরোধকারীকে জানাতে হবে। অবশ্য আইনের ৯ (৪) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো তথ্য কোনো ব্যক্তির জীবন-মৃত্যু, গ্রেফতার বা কারাগার থেকে মুক্তি সংক্রান্ত হয় তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত প্রাথমিক তথ্য সরবরাহ করতে হবে।
তথ্য দেয়ার এই সময়সীমার মধ্যে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথ্য সরবরাহ করতে অপারগ হন তাহলে ধওে নেয়া হবে যে, তিনি এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অনুরোধপ্রাপ্তির তারিখ থেকে অনধিক ২০ কার্য দিবসের মধ্যে অনুরোধকৃত তথ্য সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে আপিল কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল করার এবং সেক্ষেত্রেও ব্যর্থ হলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা যাবে।
কোনো ব্যক্তি তার অনুরোধকৃত তথ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না পেলে অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবেদন পাননি বা হারিয়ে গেছে বলে জানালে বা তার দেয়া কোনো সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হলে তিনি পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে যে সংস্থা কর্তৃপক্ষের (ইউনিটের) কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে, আইনের ২৪ ধারা অনুযায়ী সেই সংস্থা বা ইউনিটের ঠিক ওপরের কার্যালয়ের কাছে আপিল করতে পারবে। এই আপিল পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে আপিল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিবে অথবা আপিল আবেদনটি অগ্রহণযোগ্য বিবেচিত হলে তা খারিজ করে দিতে পারে। তথ্য কমিশন দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ করে সমন জারি ও শুনানি গ্রহণ এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া অনুসরণ পূর্বক অভিযোগ নিষ্পত্তি করবে, তবে জনগণের অনুরোধে তথ্য সরবরাহের জন্য প্রতিটি দফতর যথাযথ প্রক্রিয়ায় তথ্য সংরক্ষণ করবে এবং তথ্যপ্রাপ্তির অনুরোধ ছাড়াও স্বপ্রণোদিতভাবে তাদের কর্মকা- জনসাধারণকে অবহিত করার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করবে। ‘তথ্য কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১১, তথ্য কমিশন, প্রকাশকাল: ১৫ মার্চ-২০১২, পৃ: ১২।’
তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা
তথ্য গোপন রাখার বিধানÑ তথ্য আইন অনুযায়ী আবেদনকারী সর্বনিম্ন ২০ দিন এবং সর্বোচ্চ ২১০ দিনের মধ্যে তথ্য পেয়ে যাবে। যদিও তথ্য আইনে সরকারি বেশির ভাগ তথ্যই জনগণের জানার আওতায় আনা হয়েছে কিন্তু ৭ ধারা মোতাবেক কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম করা হয়েছে। অর্থাৎ কিছু কিছু তথ্য সরকার এখনো গোপন রাখতে পারে যেমন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষতিসাধন করতে পারে, অন্য কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে, কোনো তথ্য প্রকাশের ফলে অন্য কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কোনো তথ্য প্রকাশের ফলে আইনের প্রয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা জনগণের নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে এ ধরনের তথ্য। এসব তথ্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো নাগরিককে দিতে বাধ্য হবে না।
যে ক্ষেত্রে তথ্য আইন প্রযোজ্য নয়
তথ্য আইন অনুযায়ী আবেদানকারী সর্বনিম্ন ২০ দিন এবং সর্বোচ্চ ২১০ দিনের মধ্যে তথ্য পেয়ে যাবে। যদিও তথ্য আইনে সরকারি বেশির ভাগ তথ্যই জনগণের জানার আওতায় আনা হয়েছে কিন্তু ৭ ধারা মোতাবেক কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম করা হয়েছে। অর্থাৎ কিছু কিছু তথ্য সরকার এখনো গোপন রাখতে পারে যেমন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষতিসাধন করতে পারে, অন্য কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে, কোনো তথ্য প্রকাশের ফলে অন্য কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কোনো তথ্য প্রকাশের ফলে আইনের প্রয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা জনগণের নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে এ ধরনের তথ্য। এসব তথ্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো নাগরিককে দিতে বাধ্য হবে না।
যে ক্ষেত্রে তথ্য আইন প্রযোজ্য নয়
তথ্য আইন অনুযায়ী সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এ আইন বলবৎ হবে। তবে ৩২ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাজে নিয়োজিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান যেমন, এনএসআই, ডিজিএফআই, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা ইউনিট, সিআইডি, এসএসএফ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, র‌্যাবের গোয়েন্দা সেল এবং রাজস্ব বোর্ডের সেল-এর ক্ষেত্রে এ আইন প্রযোজ্য নয় এবং তাদের কাছ থেকে জনগণ তথ্য চাইতে পারবে না। এছাড়া ১৯৭২ সালের সাক্ষ্য আইন মোতাবেক রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি যা দ্বারা গণস্বার্থ বিঘিœত হতে পারে এমন সাক্ষ্য প্রদানে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই আইনের ১২৩ ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধান কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া রাষ্ট্রীয় বিষয়াদির সাথে সম্পর্কিত অপ্রকাশিত সরকারি দলিল থেকে কোনো ব্যক্তিকে সাক্ষ্য দিতে অনুমতি দেয়া যাবে না। এ ছাড়া ১২৪ ধারা অনুযায়ী তথ্য প্রকাশ করলে জনস্বার্থ বিঘিœত হতে পারে এমন কোনো তথ্য গোপনীয়ভাবে প্রাপ্ত সরকারি খবর প্রকাশ করার জন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে বাধ্য করা যাবে না। একইভাবে ১৬২ ধারায় আদালতে সাক্ষী যেকোনো ধরনের দলিল দাখিল করতে পারবে এ বিষয়ে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে দলিলটি যদি রাষ্ট্রীয় বিষয় সংক্রান্ত না হয়, তবে প্রয়োজনবোধে আদালত তা পরিদর্শন করতে পারবেন এবং এর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে অন্য সাক্ষ্য গ্রহণ পারবেন।
তথ্য কমিশন ও এর ভূমিকা
তথ্য অধিকার আইনকে কার্যকর করার জন্য একটি তথ্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। তথ্য কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ স্বাধীন সংস্থা। তথ্য কমিশনের গঠন পদ্ধতি, দায়িত্ব-কর্তব্য, ক্ষমতা, কর্মপরিধি, প্রশাসনিক বিষয় ইত্যাদি এ আইনে বর্ণিত আছে।
তথ্য কমিশনের ক্ষমতা
তথ্য অধিকার আইনকে কার্যকর করার জন্য একটি তথ্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। তথ্য কমিশন এ আইনের বিধানাবলিসাপেক্ষে নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্রসমূহে অভিযোগ গ্রহণ, অনুসন্ধান এবং নিষ্পত্তি করতে পারবে। যথা-
(ক) কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না করা কিংবা তথ্যের জন্য অনুরোধপত্র গ্রহণ না করা;
(খ) কোনো তথ্য চাহিদা প্রত্যাখ্যাত হলে;
(গ) তথ্যের জন্য অনুরোধ করে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো জবাব বা তথ্য না পেলে;
(ঘ) কোনো তথ্যের জন্য এমন অংকের মূল্য দাবি করা বা প্রদানে বাধ্য করা যা তার বিবেচনায় যৌক্তিক নয়;
(ঙ) অসম্পূর্ণ তথ্য প্রদান করা হলে বা যে তথ্য প্রদান করা হয়েছে তা ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তিকর বলে মনে হলে;
(চ) এ আইনের অধীন তথ্যের জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন বা তথ্যপ্রাপ্তি সম্পর্কিত অন্য যে কোনো বিষয়।
তথ্য কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে বা কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে এ আইনের অধীন উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে পারবে। নিম্নলিখিত বিষয়ে ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধির অধীন একটি দেওয়ানি আদালত যে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে তথ্য কমিশন এই ধারার অধীন সেরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। যথা- (ক) কোনো ব্যক্তিকে তথ্য কমিশনে হাজির করার জন্য সমন জারি করা এবং শপথপূর্বক মৌখিক বা লিখিত প্রমাণ-দলিল বা অন্য কোনো কিছু হাজির করতে বাধ্য করা; (খ) তথ্য যাচাই ও পরিদর্শন করা; (গ) হলফনামাসহ প্রমাণ গ্রহণ করা; (ঘ) কোনো অফিসের কোনো তথ্য আনয়ন করা; (ঙ) কোনো সাক্ষী বা দলিল তলব করে সমন জারি করা; এবং (চ) এ আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্য যেকোনো বিষয়।
অন্য কোনো আইনে ভিন্নরূপ যা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানকালে তথ্য কমিশন বা ক্ষেত্রমত প্রধান তথ্য কমিশনার বা তথ্য কমিশনার কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট রক্ষিত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট যে কোনো তথ্য সরেজমিনে পরীক্ষা করতে পারবে।
তথ্য কমিশনের কার্যক্রম
তথ্য আইনের ১৩ (৫) ধারা অনুযায়ী তথ্য কমিশনের কার্যাবলি হবে নিম্নরূপ। যথা:
(ক) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, প্রকাশ, প্রচার ও প্রাপ্তির বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান;
(খ) কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য প্রাপ্তির লক্ষ্যে অনুরোধের পদ্ধতি নির্ধারণ ও তথ্যের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ;
(গ) নাগরিকদের তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ ও তথ্যের উপযক্ত মূল্য নির্ধারণ;
(ঘ) তথ্য অধিকার সংরক্ষণের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান বা বলবৎ অন্য কোনো আইনের ব্যবস্থাদি পর্যালোচনা করা এবং বাস্তবায়নের জন্য অসুবিধাসমূহ চিহ্নিত করে তা দূরীকরণার্থে সরকারের নিকট সুপারিশ প্রদান;
(ঙ) তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে বাধাসমূহ চিহ্নিত করা এবং প্রতিকারের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান;
(চ) তথ্য অধিকার বিষয়ক চুক্তিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক দলিলাদির ওপর গবেষণা করা এবং বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান;
(ছ) নাগরিকদের তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে তথ্য অধিকার সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দলিলের সাথে বিদ্যমান আইনের সাদৃশ্যতা পরীক্ষা করা এবং বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হওয়ার ক্ষেত্রে তা দূরীকরণার্থে সরকার বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান;
(জ) তথ্য অধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক দলিল অনুসমর্থন বা তাতে স্বাক্ষরে সরকারকে পরামর্শ প্রদান;
(ঝ) তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে গবেষণা করা এবং শিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠানকে উক্তরূপ গবেষণা পরিচালনায় সহায়তা প্রদান;
(ঞ) সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর নাগরিকদের মধ্যে তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রচার এবং প্রকাশনা ও অন্যান্য উপায়ে তথ্য অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিকরণ;
(ট) তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রণয়নের ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান;
(ঠ) তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মরত সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান;
(ঢ) তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষকে কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান;
(ণ) তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের জন্য একটি ওয়েব পোর্টাল স্থাপন;
(ত) তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের বিষয়ে অন্য কোনো আইনে গৃহীত ব্যবস্থাদি পর্যালোচনা করা।
তথ্য কমিশন কর্তৃক অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তিকরণ পদ্ধতি
তথ্য আইনের ২৫ ধারা বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক নিম্নলিখিত যে কোনো কারণে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে:
(ক) ধারা ১৩ এর উপধারা (১) এ উল্লিখিত কারণে তথ্য প্রাপ্ত না হলে;
(খ) ধারা ২৪ এর অধীন প্রদত্ত আপিলের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে;
(গ) ধারা ২৪ এর উল্লিখিত সময়সীমার মধ্যে তথ্য প্রাপ্তি বা ক্ষেত্রমত তথ্য প্রদান সংক্রান্ত সিদ্ধান্তপ্রাপ্ত না হলে।
ধারা ১৩ এর উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত বিষয়ে যে কোনো সময় এবং ধারা ২৪ এ উল্লিখিত বিষয়ে উক্তরূপ সিদ্ধান্ত প্রদানের তারিখ বা ক্ষেত্রমত সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে তথ্য কমিশনে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। তথ্য কমিশন যুক্তিসঙ্গত কারণে নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পরও অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবেন। কোনো অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ আইনের বিধানাবলি অনুসরণে করণীয় কোনো কাজ করতে ব্যর্থ হলে তথ্য কমিশন উক্ত কর্তৃপক্ষ বা ক্ষেত্রমত, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবে। অভিযোগপ্রাপ্তির পর প্রয়োজন হলে প্রধান তথ্য কমিশনার উক্ত অভিযোগটি অনুসন্ধান করবে বা অনুসন্ধানের জন্য অন্য কোনো তথ্য কমিশনারকে দায়িত্ব প্রদান করবেন। কোনো অভিযোগের অনুসন্ধানকালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তার সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ প্রদান করতে হবে। কোনো অভিযোগের বিষয়বস্তুর সাথে তৃতীয় পক্ষ জড়িত থাকলে তথ্য কমিশন উক্ত তৃতীয় পক্ষকেও বক্তব্য পেশ করার সুযোগ প্রদান করবে। প্রাপ্ত অভিযোগে তথ্য কমিশন সাধারণভাবে ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করবে, তবে অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা, বর্ধিত সময়সহ কোনমতেই সর্বমোট ৭৫ দিনের বেশি হবে না।
তথ্য প্রদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য জরিমানা
তথ্য কমিশন যদি মনে করে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আইন অমান্য করেছেন তাহলে তাকে জরিমানা করতে পারবে। তথ্য আইনের ২৭ ধারায় জরিমানা সংক্রান্ত বিধানের কথা বলা হয়েছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য প্রদান বা এ বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত জানতে না পারলে কিংবা ভুল, অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর বা বিকৃত তথ্য প্রদান করলে কিংবা তথ্য প্রদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাকে তথ্য দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিনের পর থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে অনধিক ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা তথ্য কমিশন আরোপ করতে পারবে, তবে ২৯ ধারা মোতাবেক তথ্য কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কেউ কোনো আদালতে আপিল করতে পারবে না। তবে সংবিধানের ১০৩ ধারা অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উচ্চ আদালতে রিটু করতে পারবে।
তথ্য অধিকার আইন ও সামাজিক বাস্তবতা
২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণীত হলেও এই ৩ বছরে এ আইন সম্পর্কে সাধারণ জনগণ এখনও সচেতন নয়। আইনটি তথ্য দেয়ার জন্য যে সুযোগ, ব্যবস্থা এবং পদ্ধতি চালু করেছে সে সম্পর্কে সকল পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতার অভাব রয়েছে। তথ্য মাধ্যম সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত ও দুর্নীতির খবর মানুষকে দিতে পারে এবং অধিকার রক্ষায় মানুষকে সচেতন করতে পারে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, তথ্য চাওয়া থেকে শুরু করে তথ্য পাওয়া পর্যন্ত যা কিছু করতে হবে তা আইন অনুযায়ী করার জন্য যে ধরনের জ্ঞান এবং দক্ষতার প্রয়োজন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই।৪ ‘ফারজানা আফরোজ, বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন শঙ্কা ও সম্ভাবনা, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২০ নভেম্বর-২০১০, পৃ: ৬।’ তথ্য কমিশন গঠন হলেও এখনও সুসংগঠিত হতে পারেনি। কমিশন নিজস্ব ওয়েবসাইটও চালু করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা করপোরেট সংস্থাও তথ্য কমিশনের সাথে যৌথভাবে তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তথ্যপ্রাপ্তির জন্য আগ্রহী জনগণ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে তথ্য চেয়ে না পেয়ে দাখিলকৃত আবেদনের কপি তথ্য কমিশনে আসছে। এসব তথ্যকে স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করার জন্যও প্রয়োজন হবে দক্ষতা এবং জনবল। যতক্ষণ পর্যন্ত তথ্য প্রদানে দক্ষ জনবল নিয়োগ করা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তথ্য আইনের বাস্তব প্রয়োগ হবে না।
কমিশন প্রতিষ্ঠার পর হতে তথ্য কমিশনে সর্বমোট ১০৪টি অভিযোগ দাখিল করা হলে কমিশনের বিভিন্ন তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় ৪৪টি অভিযোগ আমলে আনা হয়। ৬০টি অভিযোগ ত্রুটিপূর্ণ বিবেচনায় কমিশনের সভায় আমলে গ্রহণ করা হয়নি। এরূপ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীকে তার অভিযোগ গ্রহণ না করার কারণ পত্র মারফত অবহিত করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অভিযোগ দাখিলের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।৫ ‘তথ্য কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১১, তথ্য কমিশন, প্রকাশকাল : ১৫ মার্চ, ২০১২, পৃ. ৮৯।’
তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা
তথ্য অধিকার আইন পাস হওয়ার পর আইনটি বাস্তবায়নের পথে যে সকল প্রতিবন্ধকতা দেখা যায় তা নিম্নরূপÑ
শহরকেন্দ্রিক জনসচেতনতা : তথ্য অধিকারের বিষয়টি মূলত রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। শহরের সুশীলসমাজ তথ্য অধিকার সম্পর্কে যতটা সচেতন তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষ ততটা সচেতন ও আগ্রহী কোনোটাই নয়।৬ ‘এম আজিজুর রহমান, ‘তথ্য অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব রয়েছে, দৈনিক প্রথম আলো, ২৭ ডিসেম্বর-২০০৯, পৃ. ১২।’ তথ্য অধিকার আইন ও এর ব্যবহার সম্পর্কে জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশ অবহিত নয়। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশের মাঝেও তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। কমিশনে দায়েরকৃত অর্ধেকের বেশি অভিযোগ ত্রুটিপূর্ণ বিবেচিত হওয়ার পেছনেও আইনটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকাই প্রধান কারণ।
তথ্য সংরক্ষণ ও চিহ্নিতকরণের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা : আমাদের দেশে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। সংরক্ষণের অভাবে অনেক তথ্য নষ্ট হয়ে যায়। তথ্য শ্রেণিবদ্ধ করা বা সুশৃঙ্খলভাবে সাজিয়ে রাখার ব্যবস্থাও আমাদের দেশে দুর্বল। এর ফলে কখনো কখনো প্রার্থিত তথ্য খুঁজে পাওয়া সময়সাধ্য হয়ে পড়ে আবার কখনো খুঁজে পাওয়াই যায় না। এর ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তথ্য সরবরাহ করতে সমস্যায় পড়তে হয়। তথ্য অধিকার আইনের সফলতার অনেকাংশই নির্ভর করবে তথ্য সংরক্ষণ ও সহজে চিহ্নিতকরণের ওপর। কিন্তু আমাদের দেশে বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে তথ্য বা দলিল-দস্তাবেজ সঠিক পন্থায় সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা নেই। এ বিষয়ে সম্প্রতি আইন প্রণীত হলেও তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ কোন বিষয় যাতে দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করে রাখা যায় যে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, … ‘ছোট বিষয় হোক কি বড় মেয়াদসহ তা নিলে রাখতে তোমরা কোনরূপ বিরক্ত হবে না।’৭ ‘আল-কুরআন, ২:২৮২।’ কাজেই তথ্য সংরক্ষণ করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য অধিকার আইন চর্চার ক্ষেত্রে অনীহা : আমাদের দেশে দীর্ঘদিনের গোপনীয়তার সংস্কৃতি চর্চার কারণে তথ্য অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে বেশ অনীহা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তথ্য অধিকার আইন অনুসারে নির্ধারিত ফরমে তথ্য প্রাপ্তির আবেদন দাখিল করা হলে আবেদনকারীকে যথাসময়ে তথ্য সরবরাহ করা এবং সম্ভব না হলে অপারগতার নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেয়া তথ্য অধিকার চর্চার অংশ। কিন্তু অনেক দফতরে তথ্য অধিকারের আবেদনপত্র গ্রহণ করতেই আপত্তি দেখা যায়। তথ্য প্রদানে ব্যর্থতার জন্য অপারগতার নোটিশ প্রদানের কোন নজির সচরাচর দেখা যায় না। পাশাপাশি তথ্যের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রেও তথ্যপ্রত্যাশী অনেকেই অনীহা প্রদর্শন করেন।
তথ্য প্রকাশ ও সংরক্ষণের অভাব : অথ্য অধিকার আইনের সুস্পষ্ট বিধান এবং তথ্য কমিশন হতে প্রবিধানমালা জারি করা সত্ত্বেও স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি দফতরসমূহ তেমন তৎপরতা প্রদর্শন করছে না। বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ বা অন্য কোনো মাধ্যমে তথ্য প্রকাশের প্রবণতাও সকল দফতরের মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আধুনিক প্রক্রিয়ায় তথ্য সংরক্ষণের অভাবে দফতরসমূহে আবেদনের প্রেক্ষিতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তথ্য সরবরাহে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে।
সকল দফতরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়া : সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত বা অধীনস্থ অধিদফতর, পরিদফতর বা দফতরের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয়, জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে এবং সকল বেসরকারি সংস্থায় তথ্য কর্মকর্তা বা তথ্য দেয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং তাদের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর বা ই- মেইল ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য অবহিতকরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও এ সকল প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদান করা হচ্ছে না। এছাড়া বিপুলসংখ্যক বেসরকারি সংস্থা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রদর্শন করছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা না থাকায় তথ্যপ্রত্যাশী জনসাধারণ তথ্যের জন্য আবেদন করতে প্রতিনিয়ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এ বিষয়ে ইসলামে তথ্য সরবরাহে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।” ‘আল-কুরআন, ২১:৭।’ মহানবী সা. বলেছেন, “তোমাদের যা মনে চায় আমার কাছে জিজ্ঞেস করো।’’ ‘ইমাম বুখারী, সহীহ আল-বুখারী, অধ্যায় : আল-ইল, অনুচ্ছেদ : আল-গাদাব ফিল মাওইযাহ ওয়াত তা’লীম ইযা রাআ মা-ইয়াকরাহু, আল-কুতুবুস সিত্তাহ, রিয়াদ : দারুস সালাম, ১৪২১/২০০০, পৃ. ১১।’
প্রশাসনিক অভ্যস্ততার কুফল : তথ্য অধিকার আইন অনুসারে তথ্য সরবরাহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু প্রশাসনিক অভ্যস্ততার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাগণ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তথ্য প্রদান করতে সাধারণ জনগণ সময় মতো তথ্য সংগ্রহ করতে পারে না।
পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ব্যবস্থার অভাব : তথ্য গ্রহণকারী এবং প্রদানকারী উভয়ের মধ্যে তথ্য প্রযুক্তি সংযোগের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। বর্তমানে সরকারি, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংরক্ষণের ডিজিটাল পদ্ধতি কার্যকর নেই। এছাড়া অধিকাংশ দফতরে ফটোকপি মেশিন না থাকায় তথ্য সরবরাহ করার জন্য ফটোকপি করার প্রয়োজন হলে দাফতরিক নথিপত্র দোকান থেকে ফটোকপি করতে হয়। এর ফলে নথির নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনেক দফতরে কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার এবং ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও সংগ্রহের ক্ষেত্রে সমস্যা হয় যা তথ্য প্রদান প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
তথ্য অধিকার আইনের অস্পষ্ট বিধান : তথ্য অধিকার আইনের কতিপয় ধারা ও উপ-ধারা সম্পর্কে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে আপিল কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ এবং তথ্য প্রদানে স্থগিত রাখার ক্ষেত্রে তথ্য কমিশনের পূর্বানুমতি গ্রহণের বিষয়টি সুস্পষ্ট না থাকায় তথ্য কমিশনকেও অনেক সময় সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয়। এছাড়া সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত, সরকারি লাইসেন্স ও ভর্তুকি গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তথ্য অধিকার আইনের আওতাভুক্ত হওয়া নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে যা তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করছে।
অপর্যাপ্ত জরিমানা : তথ্য আইন অনুযায়ী তথ্য প্রদান না করলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জরিমানার বিধান থাকলেও জরিমানার পরিমাণ অনেক কম (৫০০০/- টাকা)। ইচ্ছা করে দেরি করলে প্রতিদিন ৫০/- টাকা জরিমানা। আমাদের দেশে যেখানে দুর্নীতি অনেক বেশি, তাই এ জরিমানা অনেক কম। এ ছাড়া এ পরিমাণ জরিমানা অনেকেই দিতে পারবে। জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।
কতিপয় সুপারিশ
তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি
তথ্য অধিকার আইন পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ আইনটি সম্পর্কে কর্মকর্তা ও জনসাধারণের মাঝে সঠিক ধারণা না থাকা। সে কারণে তথ্য অধিকার আইন ও নাগরিকের তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি জানানো ও সচেতন করার জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন। সর্ব শ্রেণীর মানুষ বিশেষ করে গ্রামীণ প্রান্তিক ও আদিবাসী জনগণকে তথ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। আইনটির উপযোগিতা, সুফল ও তথ্যগত সেবা পাওয়া সংক্রান্ত তথ্যাদি তৃণমূল পর্যায়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারণার ব্যবস্থা করলে আইনটি নিজস্ব লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি প্রতি জেলায় একজন করে তথ্য অধিকার আইন বিষয়ক পরামর্শক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা : আইনের বিধান অনুসারে প্রতিটি সরকারি, বেসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত অফিসের দৃশ্যমান স্থানে ‘তথ্য প্রদান শাখা’ স্থাপন করাসহ সেখানে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োজিত করতে হবে। প্রত্যেক ইউনিটে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পাশাপাশি একজন করে বিকল্প কর্মকর্তা নিয়োগ করা প্রয়োজন যাতে একজনের অনুপস্থিতি বা অসুস্থতার সময়কালে তথ্য আবেদনকারী ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। জনগণের সুবিধার্থে নিয়োগকৃত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ইত্যাদি তথ্যসহ প্রচারপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, আপিল কর্তৃপক্ষ এবং অভিযোগ কর্তৃপক্ষের ঠিকানাসহ বোর্ড টাঙানো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করার জন্য কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়েও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা করা : তথ্য অধিকার আইন এবং তথ্য অধিকার (তথ্য প্রকাশ ও প্রচার) প্রবিধানমালা অনুসারে সকল দফতর কর্তৃক স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের কার্যক্রম নিশ্চিত করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সকল মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ দফতরগুলোকে স্বপ্রোণিদত তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মন্ত্রণালয়ে ও স্ব-স্ব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মবৃত্তে তথ্য অধিকার ব্যবস্থাকে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ নিলে এটি আরো শক্তিশালী হবে। স্ব-স্ব সংস্থা/ প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ত কর্মকর্তাগণের আন্তরিকতা, সদিচ্ছা ও কমিটমেন্ট তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করতে পারে।
তথ্য অধিকার আইনের সাথে সাংঘর্ষিক আইন সংস্কার : তথ্য অধিকার আইনের সাথে যে সকল আইন (বিশেষত অফিসিয়াল গোপনীয় আইন ১৯২৩, বিভিন্ন বিজনেস রুলস) সাংঘর্ষিক সেগুলো আইন সংস্কারের মাধ্যমে তথ্য অধিকার আইনের ব্যবহার সহজ করা প্রয়োজন। অফিসিয়াল গোপনীয় আইন, ১৯২৩ বলবৎ থাকায় তথ্য প্রদানের সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
তথ্য অধিকার আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করা : তথ্য অধিকার আইন সংশোধন করে এর দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাসমূহ দূর করা প্রয়োজন। তথ্যপ্রাপ্তির সময়সীমা কমিয়ে আনা, আপিল কর্তৃপক্ষ নিয়োগ সম্পর্কে অস্পষ্টতা দূরীকরণ, তথ্য না প্রদান সংক্রান্ত তালিকা হ্রাস করা, সরকারি অনুদান ও ভর্তুকি গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা, আইনের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা, তথ্য কমিশনের জরিমানা আরোপ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রভৃতি ক্ষেত্রে আইনটি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া আপিলেট অথরিটি অর্থাৎ প্রশাসনিক প্রধানের বিষয়টি সুস্পষ্ট হওয়া দরকার। আপিলেট অথরিটি ডেলিগেট করার বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। তথ্য সরবরাহের ব্যাপারে প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি বিবেচনার অবকাশ আছে বলে মনে হয়। সব তথ্য সবার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। সেহেতু আবেদনের ফরমে তথ্য নেয়ার ‘উদ্দেশ্য’ উল্লেখ থাকা বাঞ্ছনীয়। আপিল নিষ্পত্তির জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানের দায়িত্ব প্রয়োজনবোধে বিশেষ ক্ষেত্রে ডেলিগেট করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। ত্রুটিপূর্ণ আবেদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আবেদনপত্রের মাধ্যমে পুনরায় তথ্যের জন্য আবেদন করার বিধান রাখা প্রয়োজন। এ ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক প্রদেয় তথ্য বিকৃত করে যে কোনো মাধ্যমে বা সরাসরি প্রকাশ করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তথ্য অধিকার আইনটিতে রাখা যেতে পারে।
তথ্য কমিশনের বিপুল সংখ্যক কার্যালয় স্থাপন : তথ্য পাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া দূর করতে প্রত্যেক বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে তথ্য কমিশনের কার্যালয় স্থাপন করা যেতে পারে। কারণ তথ্য সেবাকে জনগণের কাছে সহজলভ্য করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনমান উন্নয়ন, কৃষি প্রযুক্তি, দ্রুত সেবা লাভ কার্যক্রম, চিকিৎসা, জেলা ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইটগুলোর তথ্য সমৃদ্ধকরণের কাজ জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। তবেই তথ্য আইনের উদ্দেশ্য সফল হবে।
তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার প্রচলন : তথ্য সংরক্ষণ ও সহজে চিহ্নিতকরণের জন্য তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন। দ্রুত তথ্য প্রদানের প্রয়োজনে ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসের সিলেবাসে তথ্য অধিকার আইন অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। এ ছাড়া তথ্য প্রদান ও গ্রহণে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইন সংবিধানের প্রত্যাশার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু তথ্য অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের দেশ বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে ব্যক্তিগত, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিম-লে কিভাবে সুফল পাওয়া যায় সে বিষয়ে জনসাধারণ সুস্পষ্ট ধারণা ও কার্যকর কৌশল এখনো রপ্ত করতে পারেনি। সে জন্য তথ্য আইনটি বাস্তবায়নের জন্য তথ্য জানতে আগ্রহী পক্ষ, তথ্য প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ এবং সে পক্ষ তথ্য সংরক্ষণ করবে তাদের সমানভাবে তথ্য আইন ও বিধির ব্যবহার সম্পর্কে দক্ষতা ও পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। আর তা যদি নিশ্চিত করা যায় তাহলে সমাজের অবহেলিত ও পিছিয়ে থাকা লোকজন তথ্য অধিকার আইনটি কাজে লাগিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে। প্রতিষ্ঠার তিন বছর অতিক্রান্ত হলেও তথ্য কমিশন এখনো শাসনব্যবস্থার মূল ধারার একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। জনসাধারণের বড় অংশের অসচেতনতা, আইনটি প্রচারে অপর্যাপ্ত গৃহীত ব্যবস্থাপনা, আইন বিষয়ে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের অসম্পূর্ণতা, আইন ব্যবহারে পরামর্শমূলক ও উৎসাহমূলক কর্মকা-ের অনুপস্থিতি এবং তথ্য কমিশনের অপর্যাপ্ত জনবল এবং কর্মকা-ের সীমাবদ্ধতা তথ্য অধিকার আইনের সফল বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এসকল সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য তথ্য কমিশনের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, দেশ প্রেমিক সচেতন জনগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আশা করা যায়, উপরে বর্ণিত পরামর্শের আলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের চাহিদা পূরণ হবে, সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply