তথ্য সন্ত্রাসের শিকার ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

ইসলাম এক শাশ্বত জীবনবিধানের নাম। আল্লাহর একমাত্র মনোনীত জীবনবিধান। রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের মাঝে এক অনুকরণীয় আদর্শ ছিলেন। আল্লাহর নির্দেশের আলোকে যা বলতেন তা করতেন। এ দর্শন অন্য দার্শনিকের দর্শন নয় যে তারা পৃথিবীতে যা বলতেন তা করতেন না। ইসলামের সুমহান আলোকদ্যুতি রাসূলে আকরাম (সা)-এর সময় থেকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের চৌদিকে। খোলাফায়ে রাশেদার শাসনকালে ইসলামী শাসনের পরিধি ছিল প্রায় অর্ধজাহান। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবস্থান ছিল উতুঙ্গশীর্ষে। মুসলমানদের নৈতিক ও জাগতিক যোগ্যতার প্রভাবে কয়েক শ; বছর ছিল নেতৃত্ব-কর্তৃত্বে। ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে পথহারা ক্লান্ত অসংখ্য বনি-আদম আশ্রয় গ্রহণে জীবনকে ধন্য করে। সুশাসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অনন্য নজির ছিল এই সময়কাল। আশরাফুল মাখলুকাতের সৃষ্টির প্রকৃত তত্ত্ব মানবজাতির আয়ত্ত করতে লাগল। ইসলামের এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করার জন্য যুগে যুগে বিরুদ্ধবাদীদের প্রয়াস ছিল সম্মিলিতভাবে।
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূল (সা)-এর সাহাবী ছিলেন। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি মুনাফিকদের সর্দার ছিলেন। তিনি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কথার মাধ্যমে সাহাবীদের ঐক্যে ফাটল ধরাতেন, এমনকি রাসূল (সা) ও তাঁর স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা)-এর মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছিলেন; ইতিহাসে যা ইফকের ঘটনা নামে পরিচিত।
আদর্শের লড়াইয়ে পরাজিত ব্যক্তি ও দল ইসলামের সুমহান যাত্রাকে স্তিমিত করে দেয়ার জন্য ইসলামপন্থীদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে পাহাড়সম মিথ্যা অভিযোগ। বর্তমান যুগটা মিডিয়ার, চলছে মিডিয়ার অপ্রতিরোধ্য দাপট। মিডিয়ার দাপটের কাছে হার মানছে সবাই। মিডিয়া দিনকে বানাচ্ছে রাত, রাতকে বানাচ্ছে দিন, সাদাকে বলছে কালো, কালোকে বলছে সাদা, চোরকে বলছে মহাসাধু, সাধুকে বলছে মহাচোর। তবুও যেতে হয় মিডিয়ার কাছে। প্রতারকের কাছে সততা ও নিষ্ঠা কিংবা ছলনাময়ীর কাছে নির্ভেজাল ভালোবাসার প্রত্যাশায়। কেননা মিডিয়াই অনবরত করছে তিলকে তাল, তালকে তিল। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কেরামতিতে পাল্টে দেয়া হচ্ছে মানুষের বোধ-বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও সব কিছু। মিডিয়ার তথ্য সন্ত্রাসের গোলকধাঁধায় হাবুডুবু খাচ্ছে গোটা বিশ্ব।
কোনো এক পক্ষকে বিশেষ উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত করা হচ্ছে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টকারী ইত্যাদি অবয়বে। ইসলামের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করার জন্য বহুরূপী সন্ত্রাসী কার্যক্রম ইহুদি-খ্রিষ্টান ও জায়নবাদীরা যুগে যুগে পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আইন আদালতকে অপব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সরকারি-রেসরকারি প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে অবদমিত করার প্রয়াস উল্লেখযোগ্য। তবে সভ্যতার কথিত চরম উৎকর্ষতার সাথে সাথে সন্ত্রাসবাদের বহুরূপী খোলস প্রতিনিয়ত উন্মোচন হয়ে উঠছে। এখন রাষ্ট্রীয় সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাস ও নানামুখী অপপ্রচারের মাধ্যমে ইসলাম ও ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টারত সংগঠনগুলোকে নিশ্চিহ্ন ও সেগুলোর কার্যক্রমকে আপত্তিকর বা প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন কায়দায় মিশন চলছে। সন্ত্রাসের জন্মদাতা ও লালনকারী ইসলামবিদ্বেষীরা উল্টো ইসলামের ওপর সন্ত্রাসবাদ চাপিয়ে দিচ্ছে। এসকল সন্ত্রাসের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে তথ্যসন্ত্রাস। এ সন্ত্রাস মারাত্মক ফেতনা সৃষ্টিকারী, যা মানবহত্যাকাণ্ডের চেয়েও জঘন্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, “যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করে তাদেরকে অবশ্যই দোষ দেয়া যায়। এরা ঐ সব লোক যাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক আজাব রয়েছে।” (সূরা শুরা : ৪২)
“তারচেয়ে বড় যালিম কে হতে পারে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যাচার আরোপ করে, অথবা সত্য তার সামনে এসে যাওয়া সত্ত্বেও তাকে মিথ্যা মনে করে? দোজখই কি এ ধরনের কাফেরদের ঠিকানা নয়?” (সূরা আনকাবুত : ৬৮)

ইসলামের পরিচয়
ইসলাম এক শাশ্বত জীবনবিধানের নাম। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছেÑ ইসলাম আল্লাহ মনোনীত জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানে শান্তি, নিরাপত্তা ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম প্রচলিত কোনো ধর্মের নাম নয়। ইসলামকে পড়সঢ়ষবঃব পড়ফব ড়ভ ষরভব বলা হয়। ইসলামকে অধিকাংশ মুসলমান না বুঝে অন্যান্য ধর্মের মতো মনে করে এবং অন্যান্য ধর্মের মতোই আনুষ্ঠানিকতা পালন করে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতকেই ইসলাম হিসেবে তারা গ্রহণ করে নিয়েছে। তাদের মতে ইসলাম সম্পূর্ণ আলাদা একটা পবিত্র সত্তা, এটির সাথে জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্ম বা জীবন সম্পূর্ণ আলাদা। অথচ ইসলাম মানুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের জীবনের প্রতিটি অংশই এর সাথে জড়িত। পরিবার থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল পরিচালনা বিধি আল্লাহতায়ালা নির্দেশ করেছেন। মোদ্দাকথা ইসলাম মানে হচ্ছে স্বভাবজাত জীবনপ্রণালী। যাতে মানুষের সমৃদ্ধি ও কল্যাণ সুনিশ্চিত নিহিত রয়েছে।
ইসলামের গোড়পত্তন হয়েছিল হজরত আদম (আ)-এর সময় থেকে। পৃথিবীতে আগত প্রত্যেক নবী ও রাসূল ইসলামেরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এর অনুসারীরা আল্লাহর নির্দেশিত বিধান অনুয়ায়ী জীবন পরিচালনা করেছেন। ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে কায়েম হলে সেটাকে ইসলামী রাষ্ট্র বলে। এ রাষ্ট্রে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান। কোনো ধরনের বৈষম্য এখানে গ্রহণীয় নয়। ভোগ নয় ত্যাগের মহিমায় এর অনুসারীরা নিজদেরকে উজ্জীবিত করেন। ইসলামী রাষ্ট্রের সমনীতির উদাহরণ হচ্ছে খোলাফায়ে রাশেদার শাসনামল।
যারা ইসলমামের অনুসারী তাদেরকে মুসলমান বলে। মুসললমান মানে আত্মসমর্পণকারী। যারা জীবনের সবকিছু আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, যারা আল্লাহর আদেশ নিষেধ ও রাসূল (সা)-এর নির্দেশিত পথে চলবেন। বর্তমান সময়ে ইসলামের অনুসারীরা যথাযথভাবে ইসলামের অনুসরণ করতে ব্যর্থ। যার কারণে ইসলামের বিকৃতিপূর্ণ পরিচয় অন্য ধর্মাবলম্বীরা ধারণ করছে। অনেকাংশেই তাদের ধর্ম ও ইসলামের মধ্যে তেমন কোনো বিশেষত্ব খুঁজে পায় না। ইসলামের অনুসারীরা তাদের নাম ইসলামের অনুসরণে রাখছে এবং ইসলামকে কিছু আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ আল্লাহর কুরআন ও রাসূল (সা)-এর গাইডলাইন হচ্ছে নির্ভুল গাইডলাইন; যেটি যথাযথাভাবে অনুসরণ করলে মুসলমানেরা বিশ্বসভায় বীরের বেশে নেতৃত্ব দিতে পারবে। এটিকে অনুসরণ করলে তারা অশান্ত পৃথিবীকে শান্তির নীড় হিসেবে উপহার দিতে পারত। রাসূল (সা) বিদায় হজের সময় বলেছেন, “আমি তোমাদের জন্য দু’টি জিনিস রেখে গেলামÑ একটি কুরআন ও অপরটি সুন্নাহ বা হাদিস। তোমরা যদি এ দু’টিকে আঁকড়ে ধর তাহলে পথভ্রষ্ট হবে না।” কিন্তু আমরা কী দেখছি? কুরআন ও হাদিসকে ঝাড়-ফুঁ-তাবিজ প্রদানের কাজে ব্যবহার করছে। কুরআন-হাদিসের শিক্ষাকে মুসলমানেরা মসজিদ, মাদরাসা ও আমাদের বাসাবাড়ির মাঝে সীমাবদ্ধ রেখেছে। আমাদের বাড়িঘরে যেসব কুরআন ও হাদিস সুন্দর কাপড়ে মুড়ানো আছে যেগুলো পড়ার সময় আমাদের সময় নেই। এসব পড়ার, গবেষণার ও জানা-মানার দায়িত্ব শুধু যেন আলেমদের। আর মুসলমানরা পড়লেও সওয়ারের নিয়তে পড়ে থাকেন, পড়া শেষে চুমো খেয়ে আবার সুন্দরভাবে রেখে দেন। সেখান থেকে জানার ও মানার জন্য চেষ্টা সাধনার ভয়াবহ ঘাটতি সর্বত্র।
উম্মাহর ভয়াবহ মহামারী চলছে বললেও ভুল হবে না। ইসলামের সুমহান আদর্শ, শিক্ষা, কল্যাণমুখী কার্মকাণ্ড ও জীবনাচরণ মুসলমানদের জীবনে ধারণ করে পৃথিবীতে শান্তি ও আখেরাতে মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য উম্মাহর সকল নেতৃবৃন্দকে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও কার্যক্রমের উদ্যোগ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। ইসলাম আগমনের শ্লোগানই হলো সত্য সমাগত, মিথ্যা বিদূরিত, সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী।

ইসলামী আন্দোলনের পরিচয়
ইসলামের কল্যাণ সমৃদ্ধি ও সত্যবার্তা যথাযথভাবে মানবতার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সংঘবদ্ধভাবে প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। নবী ও রাসূলরা যুগে যুগে এভাবে সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করেছেন। কুরআনে কারীমে এ সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাকে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বলা হয়েছে। বাংলায় আমরা যাকে ‘ইসলামী আন্দোলন’ বলি। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য সংঘবদ্ধ উম্মাহর যে প্রচেষ্টা তাই জিহাদ, তাই আন্দোলন। নেতৃত্বের পরিকল্পনা, কর্মতৎপরতা, দৃষ্টিভঙ্গি, কর্মীবাহিনীর নিরলস প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করে সফলতা ও ব্যর্থতা। পৃথিবীর সৃষ্টিলঘœ হতে অদ্যাবধি অনেক আন্দোলনের উত্থান পতন হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের অনুসারীরাও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। তবে কোথাও কোনো আন্দোলন প্রচেষ্টা ছাড়া, চ্যালেঞ্জহীন বাধা বিপত্তিহীনভাবে সফলতার মুখ দেখেছে তার কোনো নজির নেই। তবে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ত্যাগ কোরবানি প্রচেষ্টায় খুশি হয়ে আল্লাহ নিজেই সাহায্যকারী হয়ে যান।
বিরুদ্ধবাদীদের পাহাড়সম কূটকৌশল মোকাবেলায় আল্লাহর ওপর দৃঢ়তার সাথে পরিকল্পনা ও ক্লান্তিহীন কর্মনিষ্ঠা বাঞ্ছনীয়। সাহসিকতা তবে হঠকারিতা নয়। কৌশলী তবে পিছুটান নয়, অপপ্রচারের জবাব তবে মিথ্যাচার নয়, আক্রমণের প্রতিরোধ তবে বাড়াবাড়ি বা জুলুমবাজি নয়। সত্যপন্থীদের অসত্যের আস্তরণের ভিড়েও সতেজ বীজ বপন করে ফুলে-ফলে সুশভিত সোনালি সমাজ প্রতিষ্ঠার সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টাই ইসলামী আন্দোলন।
ইসলামী জাগরণে যারা ভীত সন্ত্রস্ত তারা মনে করেন ইসলামে রাজনীতি নেই। তাদের মতে ইসলাম ঘর, মসজিদ ও মাদ্রাসার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে। অনেক আলেম ওলামাও এক সময় মনে করতেন যে, ইসলামী রাজনীতি হারাম, বাংলাদেশে ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়া তেমন কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না আশির দশকের আগ পর্যন্ত। সুসংবাদের বিষয় হলো অনেক আলেম-ওলামা বর্তমান সময়ে মনে করেন যে ইসলামকে যদি বিজয়ী শক্তি হিসেবে দেখতে চায় তাহলে ইসলামী হুকুমাত কায়েমের কোনো বিকল্প নেই। তাই তারা চেষ্টা সাধনাও করে যাচ্ছেন। তবে আরেকটা সতর্কতার বিষয় হলো যে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা এর অগ্রযাত্রাকে নিঃশেষ করার জন্য ইসলামী সংগঠনের মোড়কে ইসলামী সংগঠনের নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করছে। যাতে যে সকল ইসলামী সংগঠনগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে তাদের ব্যাপারে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে এবং জনতার হৃদয়ে ইসলামের ব্যাপারে যে পজেটিভ চেতনাবোধ আছে তাকে ম্লান করা যায়। সুতরাং সব কিছুর অপঃরড়হ ও জবধপঃরড়হ থাকবে সেটি ধরে নিয়েই উম্মাহর নকিবদেরকে কঠিন স্রোত পাড়ি দিতে হবে। কোনো প্রকার পিছুটান, শঠতা ও ভীরুতা আন্দোলনের সিপাহসালারদের জন্য বড়ই বেমানান।

সন্ত্রাসের পরিচয়
Terrorism- অতিশয় ত্রাস, ভয়ের পরিবেশ (Terror a cause of create fear) আর সন্ত্রাসবাদ হলো রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের জন্য অত্যাচার, হত্যা প্রভৃতি হিংসাত্মক ও ত্রাসজনক কর্ম অবলম্বনীয়। সন্ত্রাসের যথার্থ সংজ্ঞা যথার্থ ও সর্বসম্মতভাবে সংজ্ঞায়িত হয়নি। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে ক্ষমতাধরদের বিভিন্নভাবে সন্ত্রাসবাদের ব্যাখ্যার বয়ান করতে দেখা যায়। যা একটি গোষ্ঠীর কাছে স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, তা অন্যের ভাষায় চরম ধিকৃত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগ্রাম। কারো ভাষায় মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আর কারো ভাষায় ঠিক তা-ই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। এ সংজ্ঞাটি মূলত পশ্চিমাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তাই চতুরতার সাথে এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায় তারা স্থির নয়। যাতে পরিস্থিতির আলোকে যাকে যেভাবে সন্ত্রাসী সাজাবার অবারিত সুযোগ থাকে।
একজন সমীক্ষায় লিখেছেন-
“United states’ reluctance to come up with a working definition for terrorisom out of fears that a Clear-cut definition terrorism but of fears that a clear cut definition would change the fight against terrorism from a political issue into an ethical one……… in its capacity of a superpower, America does not need ethical laws restricting its ambition and targets. Rather, it wants to have spacious room for movement and maneuvering and as such keeping the definition ambisous fits perfectly with this strategy”.
world of Book’ encyclopedia সন্ত্রাসের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছে- ‘Terrorism is the use or threat of violence to create feare and alarm. Terrorists murder, kidnap people, sat of bombs, hijack airplanes, set fires and commit other serous crimes. common victims of terrorist kidnappings and associations include diplomats, business executives, political leaders, judges and police”.

সন্ত্রাসের ইতিহাস
সন্ত্রাসবাদ (Terrorism) প্রথম দেখা মেলে ফরাসি বিপ্লবের সময় (১৭৪৯-১৭৯৯)। ক্ষমতা দখলকারী কিছু বিপ্লবী তখন তাদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আচরণের নীতি গ্রহণ করে। এই শাসনামলকে বলা হয় ‘Region of Terror’. এটা ঘটেছিল শাসনবর্গের অধীনে। কিন্তু বেসরকারিভাবে রাজনৈতিক বা ভিন্নমতাবলম্বী গ্রুপের দ্বারা সন্ত্রাসের প্রথম যাত্রা শুরু হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ১৮৬৫ সালের গৃহযুদ্ধের পর এবং পুনরায় ঊনিশ শতকে ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান নামক একটা শ্বেতাঙ্গ গ্রুপ কৃষ্ণাঙ্গ ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী সন্ত্রাস চালায়।
বিংশ শতকের ত্রিশের দশকের দিকে হিটলার জার্মানিতে, মুসোলিনি ইতালিতে এবং জোসেফ স্টালিন সোভিয়েট ইউনিয়নে বিরোধী পক্ষকে দমনের জন্য হত্যা-নির্যাতন চালায়। ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান ছিল প্রাইভেট গ্রুপ। কিন্তু এসব সন্ত্রাস চলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের অধীনে বেআইনিভাবে। বিশ শতকের ষাটের দশকে সন্ত্রাসী বাহিনী ‘রেড ব্রিগেড’ এর উত্থান ঘটে ইতালিতে এবং রেড আর্মির উত্থান ঘটে জার্মানিতে। এরা ত্রাসের মাধ্যমে তাদের ইচ্ছা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। তবে সবচেয়ে জঘন্য সন্ত্রাস শুরু করে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন বিভক্তির আগে। নিজেদের স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড রক্ষার জন্য ফিলিস্তিনিরাও বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপে সংঘবদ্ধ হয় এবং এখনও লড়াই করছে। প্রকৃতপক্ষে এরা নিজদের আত্মরক্ষাকারী স্বাধীনতা সংগ্রামী। এমন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্ভব ঘটে উত্তর আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে (I.R.A- Irish Republican Army)। ঠিক এমনিভাবে সত্তর দশকে ক্যারিবিয়ান সাগরের পোর্টারিকোতে FALN নামের স্বাধীনতা সংগ্রামী গ্রুপের উদ্ভব ঘটে আমেরিকান শাসনের বিরুদ্ধে। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্টের অসংখ্য বোমা হামলার ঘটনা ঘটায়। তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে সন্ত্রাস মূলত পাশ্চাত্যের তৈরি। ইসলামের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রীয় কোপানলে অতিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ও তাদের অধিকার আদায়ের জন্যও সন্ত্রাসের পথ বেছে নিতে পারে। তাই একপক্ষীয় দোষারোপ মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। এ ধরনের সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতরা সাধারণ অপরাধীর মতো নয় এদের থাকে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ। এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভবেরও কিছু কার্যকারণ বা উপসর্গ থেকে থাকে। এক সময় সন্ত্রাস শুধুমাত্র একপক্ষ আরেক পক্ষ বা এক দেশের বিরুদ্ধে আরেক দেশের সশস্ত্র সংঘাত ও সংঘর্ষকে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাস বলে জনমনে পরিচিত থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় সন্ত্রাসের নানামুখী অবয়ব লক্ষণীয়। যেমন রাষ্ট্রীয়, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা দলীয় সন্ত্রাস, অর্থ সন্ত্রাস, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক, মাদক সন্ত্রাস, সাম্রাজ্যবাদী ও তথ্যসন্ত্রাস। মিডিয়া সন্ত্রাস বা তথ্যসন্ত্রাস কুরে কুরে একটি জাতির চলার পথকে রুদ্ধ করে ফেলতে পারে এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতে গুরুর ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই বলা চলে তথ্য সন্ত্রাস যে কোনো জাতির জন্য এক ধরনের সাংঘাতিক হুমকি, এগিয়ে যাওয়ার পথে চরম অন্তরায়।
আগেই বলেছিলাম যে, সন্ত্রাসের কিছু কার্যকারণ আছে যা মানুষকে প্ররোচিত করে কখনো ইচ্ছায় বা কখনো অনিচ্ছা সত্ত্বেও। যেমন সাম্প্রদায়িক ও সংখ্যালঘু সমস্যা, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বর্ণবাদ, অর্থনৈতিক শোষণ, ভোগ বিলাসের তীব্র আকাক্সক্ষা, সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, মাদকাসক্তি ও অসৎপন্থা ইত্যাদি। উল্লিখিত কার্যকারণগুলো সমাজজীবনে অহরহ বিস্তৃতি লাভ করছে হু হু করে। এ ধরনের জাতিবিধ্বংসী কার্যকলাপ বিরোধী গণসচেতনতা ও প্রশমনের কার্যকরী উদ্যোগ সরকার বা সমাজসংঘ কর্তৃক নামেমাত্র চেষ্টা চালানো হয়। যারা এসব উপসর্গগুলোর মাধ্যমে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে পারে তারা দেশ ও দশের স্বার্থের পরিবর্তে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার নিমিত্তে যে কোন পন্থা অবলম্বন করতেও দ্বিধা করে না। অসত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সত্যের বিরুদ্ধে অবলম্বন নেয়া তাদের জন্য মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
যুগে যুগে সত্যের বিরুদ্ধে অসত্যের লড়াই হয়েছে, যে লড়াই শেষ হওয়ার নয়। সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন, অবশ্যম্ভাবী। কিছু লোক না বুঝে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন আবার কিছু লোক মিথ্যা প্রতিষ্ঠার কাজে নিজকে বলি দান করেন। ইসলাম ও ইসলামী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে মিডিয়ায় যে অপপ্রচার বা তথ্য সন্ত্রাসে অংশগ্রহণকারীরা ‘এন্টি ইসলাম ওয়ার’- ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সা) গ্রন্থে লেখক এ প্রসঙ্গে বলেন, একটি বাতিল ব্যবস্থার স্বার্থপর হোতাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য যে, তারা যুক্তির জবাবে উসকানি ও উত্তেজনা এবং প্রমাণের জবাবে হিংস্রতা ও সন্ত্রাস করে থাকে (বাংলায় অনূদিত- পৃ. ১২২)। লেখক নঈম সিদ্দিকী উল্লেখিত বইয়ে আরো লিখেন- বিরোধিতার প্রথম স্তর সব সময় ঠাট্টা-বিদ্রুপ, উপহাস ও কূটতর্কের মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হয় এবং ক্রমান্বয়ে তা সন্ত্রাস ও গুণ্ডামির রূপ ধারণ করে।
সত্যের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রমাণ সহকারে বক্তব্য দিতে অক্ষম লোকদের একমাত্র সম্বল থাকে নেতিবাচক প্রয়াস। তিনি রাসূল (সা)-এর সময়ে দ্বীন প্রচারের প্রাথমিক পর্যায়ে অপপ্রচারের ভয়াবহতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এ ধরনের প্রচারণার ঝড় যখন উঠতো তখন সাধারণ মানুষের জন্য পরিবেশ যে বহুভারী ও শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠতো, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। আর এ পরিবেশে সত্যের এই কাফেলা যে কী সঙ্কটের সম্মুখীন ছিল, তা কল্পনা করাও বোধ হয় সহজ নয়। কিন্তু পরিস্থিতি যতই বিপদসঙ্কুল হোক না কেন দৃঢ়চেতা সঙ্কল্পবদ্ধ লোকদের পথ আগলে রাখতে পাওে না।’ তথ্যসন্ত্রাস আজকের বিশ্বে ইসলামের অগ্রযাত্রার পথে বড় অন্তরায়।
তথ্যসন্ত্রাসের নানামুখী প্রতিচ্ছবি নিয়ে নিন্মে যৎসামান্য লিখছি-
নীরব শব্দ সন্ত্রাস : মুসলিম উম্মাহ তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে যুগে যুগে ইসলামী তাহজিব তমুদ্দুনের প্রচার-প্রসার করেছে। বর্তমান সময়ে আমাদের উম্মাহ্র স্বকীয়তায় চিড় ধরে চলছে ভয়াবহ শব্দ সন্ত্রাস। বক্তব্য, লিখনী, গল্প-কবিতা, নাটক, সিনেমায় এমনভাবে সুকৌশলে শব্দগুলো ব্যবহার করছে, যাতে এসব সময়ের ব্যবধানে মুসলমানরা গোগ্রাসে ধারণ করে। হয়েছেও তাই। বিশেষ করে আমাদের দেশে হিন্দুয়ানি শব্দগুলো ব্যবহার চলছে ভয়াবহভাবে। যে শব্দগুলো ব্যাখ্যা করলে সাংঘাতিক অর্থ বেরিয়ে আসবে। যা মুসলমানদের ঈমান-আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক। যেমন, দৈববাণী, তীর্থযাত্রী/তীর্থযাত্রা, একেশ্বরবাদ, কীর্তন, আচার্য/উপাচার্য, অগ্নিকণ্যা/অগ্নিপুরুষ, ভাবমূর্তি, লক্ষ্মী, সূর্যসন্তান, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, বিসমিল্লায় গলদ, মুখে ধূপ চন্দন পড়–ক, বেদী, জীবন রক্ষাকারী ঔষধ, উৎসর্গ, উপাস্য, জয়ন্তী, আংকেল/ আংটি ইত্যাদি। এ ধরনের শব্দসন্ত্রাস মূলত সাংস্কৃতিক বা তথ্যসন্ত্রাসের নমুনা। যার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে দৃষ্টি ভঙ্গিগত এক রকমের হয়ে যায়; যাতে বিজাতীয়দের সাথে মুসলমানদের শিল্প-সাহিত্যের কোনো ফারাক থাকে না, যা ইসলাম সমর্থন কওে না।
ইমলামী তাহজিব তমুদ্দুনের বিরুদ্ধে তথ্য সন্ত্রাস : ইহুদি-খ্রিষ্টান ও ইসলামের বিরুদ্ধবাদীরা ইসলামের স্বকীয়তা-তাহজিব তমুদ্দুন নিয়ে অহরহ ছিনিমিনি খেলছে। যা ভাবতে গা শিউরে ওঠে। নাটক সিনেমার পর্দায় দেখা যায় দাড়ি-টুপি ও ইসলাম পালনকারী ব্যক্তিটিই হচ্ছে ভিলেন, সবচেয়ে লম্পট, ইতর, কপট ও অপকর্মের হোতা। এতে দর্শকসমাজের কালের বিবর্তনে বদ্ধমূল ধারণা জন্ম নিচ্ছে যে দাড়ি-টুপি ওয়ালা বা ইসলাম পালনকারী ব্যক্তিরাই অপকর্মের গুরু। যাতে নতুন প্রজন্ম ইসলামের ব্যাপারে নেগেটিভ ধারণা অর্জন করে। বর্তমান সময়ে সমাজে ছোটরা আলেম-ওলামা বা দাড়ি টুপি ওয়ালা লোক দেখলে ভয় পায়। কারণ তারা কার্টুনে, নাটকে, সিনেমায় এ ধরনের ব্যক্তিদেরকে ভয়ঙ্কর ও দুষ্ট প্রকৃতির হিসেবে দেখছে। তার মানে এটিও বিরুদ্ধবাদীদের অপপ্রচারের জন্য একটি হাতিয়ার। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাশের দেশের নাটক সিনেমাতে এসব দেখা যায়। অথচ হিন্দুরা যখন তাদের সিরিয়াল নির্মাণ করে ধর্মকে তাদের সর্বাগ্রে শিরোধার্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা চালায়।
ইসলামের মোড়কে তথ্য সন্ত্রাস : ইসলাম আল্লাহর একমাত্র মনোনীত জীবনব্যবস্থার নাম। আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রতিটি মুসলমানের অন্যতম কাজ। মাজার পূজা, নজর-নিয়াজ, ওরস উৎসব, ঝার-ফুঁ, তাবিজ-তদবির, কবরে সিজদা, কবরে মোমবাতি প্রজ্বলন ও জসনে জুলুস পালনের নামে ব্যক্তি পূজা, ১০ মর্হরম তাজকিয়া মিছিলের নামে চাবুকের আঘাতে শরীর থেকে রক্তক্ষরণসহ ইসলামের জীবনপ্রণালীর সাথে সাংঘর্ষিক জীবনাচরণের মাধ্যমে অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইসলাম খেল তামাসা ও হাস্যরসের পাত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। অন্য ধর্মাবলন্বীরা ইসলামকে তাদের ধর্মের মতো একটি ধর্ম হিসেবে মনে করে। এসব কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত একটি অংশ এটিকে না জেনে অন্ধভাবে ইবাদত হিসেবে মেনে নিয়েছে এবং অন্য অংশ জেনেও এ অনৈসলামিক কাজকে ইসলামের মোড়ক দিয়ে নিজেদের রুটি-রুজি রোজগারের সহজ পথ হিসেবে বাছাই করে নিয়েছে। এসব জাহেলিয়াত সমাজে চরম আকার ধারণ করেছে। এ সকল ভ্রান্ত চিন্তার অনুসারীরা মনে করেন যে, এখন নবুয়তের কাল শেষ বেলায়তের যুগ শুরু। অথচ যারা এসব কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের সার্বিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে শিরক। কুরআন ও হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে আল্লাহ তার বান্দাহর অন্যসব গুনাহ মাফ করেন কিন্তু শিরকের গুনাহ মাফ করেন না। এ মতের অনুসারীদের বড় একটা অংশ মনে করে নামাজ পড়ার পরিবর্তে মাজার জেযারত বা কবরে সিজদাহ দেয়া অনেক বেশি সাওয়াবের কাজ। তাদের সাহয্যকারী অলি-গাউস-কুতুবারা। তাদের ধারণা কবর জিয়ারাত (কবর জিয়ারাতের নামে কবর পূজা) ও তাদের সার্বক্ষণিকভাবে স্মরণ করার মাধ্যমে তাদের গায়েবি সাহায্য লাভ করা যেতে পারে, তারা গায়েব জানেন! তারা এ-ও মনে করে যারা এসব কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে তারা চরম গর্হিত কাজ করে। যে কোন সময় আউলিয়া-ইকরামরা তাদের ক্ষতি করতে পারেন। তারা নিজদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বলে দাবি করে। অথচ তাদের জীবনাচরণে এসবের লেশমাত্র কোন চিহ্ন পরিলক্ষিত হয় না। তাদের মতবাদ ব্যাপক প্রচার প্রসারের জন্য কুরআন-হাদিসের বিকৃত ব্যাখ্যা করে প্রচার প্রকাশনা বের করে ব্যাপক ভিত্তিক বিলি করা হচ্ছে। এসব ইসলামের অননুমোদিত কর্মকাণ্ডকে তাদের কাছে ইসলামসিদ্ধ কর্মকাণ্ড বলে একটা অংশ মনে করে নিয়েছে। তারা কবরগুলোকে বিকল্প মন্দির হিসেবে গড়ে তুলেছে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতারাও তাদের ভোটের রাজনীতিতে এ সকল ইসলামবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন। আল্লাহকে একমাত্র সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ মনে করেন কবর জিয়ারত, মাজার পূজা, মান্নত ও নজর এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলামে বিদায়াত। আলেম ও পীর বেশে যারা এসব কর্মকাণ্ডের সমর্থন প্রদান করে তারা মূলত ইসলামেরই শত্রু। ইসলামের বিকৃত মেসেজ মানুষ এদের মাধ্যমে ধারণ করে। সাধারণ মানুষ এক আল্লাহর ইবাদতের পরিবর্তে বহু রবের ইবাদতের স্থান ইসলামে আছে বলে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়। আর এসব ইসলামের নামে চালিয়ে দেয়া অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডগুলোকে স্থানীয় ও জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতে দেদার প্রচার চালানো হয়। তারা এটিকে ইসলামেরই স্বীকৃত কর্মকাণ্ড বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। অনেক ইসলামী গবেষক মনে করেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলামের বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীদের দীর্ঘ দিনের চক্রান্ত ও ব্যাপকভিত্তিক অপপ্রচারের অংশ মাত্র।
জিহাদের বিরুদ্ধে তথ্যসন্ত্রাস : ইসলামে জিহাদকে ফরজ করা হয়েছে। যারা আল্লাহর কালিমা বাস্তবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালাবে তারা জিহাদী। অপপ্রচারকারীরা দু’ভাবে জিহাদের অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। তারা অত্যন্ত কুৎসিতভাবে জিহাদ শব্দটিকে তথ্যপ্রযুক্তি ও মিডিয়ার মাধ্যমে অপপ্রচার করেছে যেমনি ‘জঙ্গি, মৌলবাদ, মৌলবাদী, রক্ষণশীল’ শব্দগুলোকে প্রচার করেছে। তারা বলে জিহাদী বই, জিহাদী কর্মকাণ্ড, জিহাদী জঙ্গি গোষ্ঠী ইত্যাদি। বাংলাদেশে ও ইদানীংকালে ইসলামিস্টদের গ্রেফতার করে তাদের বাসাবাড়ি ও অফিস-আদালতে সংরক্ষিত কুরআন-হাদিস টেবিলে সাজিয়ে মিডিয়াতে প্রচার করা হয় জিহাদী বইসহ আটক এবং ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে যাতে জনগণের কুধরণা সৃষ্টি করা যায় সে লক্ষ্যে কুরআন-হাদিসের সাথে কথিত বোমা, বোমা বানানোর সরঞ্জাম, অস্ত্র সাজিয়ে দেয়া হয়। যা নিরপরাধ মানুষকে জবাই করার শামিল, বিচারের নামে অবিচার। নিরপরাধ কিছু মানুষকে অপরাধী হতে উসকে দেয়ার জন্য এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ দায়ী। আজকের বিশ্বে জিহাদকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রমাণ করার যার পর নাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। আর অন্য দিকে হাদিস জাল করে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে ‘নফসের বিররুদ্ধে জিহাদ করাই প্রকৃত জিহাদ’। মূলত জিহাদের আসল পরিচয়কে নকল করে বাজারজাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে একপক্ষ জিহাদে অংশগ্রহণ করাকে অন্যায় মনে করে, অন্যপক্ষ এটাকে নিরাপদ কাজ মনে করে ‘নফসের বিরুদ্ধে লড়াই’ করাকে প্রকৃত লড়াই বলে অন্যায়কে মাথা পেতে নিবে, চোখ বুজে সহ্য করবে। এতে ষড়যন্ত্রকারীরা অনায়াসে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে পারবে। জিহাদ মূলত সমস্ত অবিচার-অনাচারকে রুখে দিয়ে মানবতার সার্বিক কল্যাণ সাধনের এক প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার নাম। যারা মানুষকে শোষণ করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত তারাই এর বিকৃত পরিচয় সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে মানবতাকে বিভ্রান্ত করতে চায়। ইদানীং জিহাদের অপব্যাখ্যায় ‘যৌন জিহাদ’ নামক একটি শব্দকে ব্যাপকভিত্তিক বিশ্বমিডিয়াতে প্রচার করতে দেখা গেছে। এটি জিহাদের অপব্যাখ্যার নতুন সংস্করণ। ইসলামে যৌন জিহাদ বলতে কোনো কিছু নেই। মূলত গত ৯ এপ্রিল ২০১৩ সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারবিরোধী যোদ্ধাদের সাহায্যার্থে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার্থে জিহাদের ডাক দেন তিউনিশিয়ার কতক আলেম। ফলে ৬ হাজার যুবক-যুবতী এই কাফেলায় নাম লেখায়। যাদের অধিকাংশই আংটি বদল বা বিবাহ করেই সিরিয়াতে অবস্থান করছে। এদের মধ্যে ১৬-১৮ বছরের যুবতীও রয়েছে। তালিকাভুক্ত যারা সিরিয়ায় যেতে পারেনি তিউনিশিয়া সরকার তাদের প্রেফতার করেছে। সিরিয়ার জনগণের পাশে দাঁড়ানো এই তরুণ সমাজকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেও ফেরানো যাচ্ছে না। তখন বামপন্থী মানবাধিকার কর্মীদের চাপে তিউনিশিয়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে এই উদ্ভট তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। এটি ইসরাইলের ইহুদিদের চক্রান্তের বড় অংশ। হলুদ সাংবাদিকতার চেলা-চামুণ্ডরা যৌনতার রঙ মেখে তা সর্বত্র প্রচার করছে। আরব দেশের প্রায় শতাধিক পত্রিকায় এটাকে ‘বিবাহ জিহাদ’ বলেই উল্লেখ করেছে। যৌন জিহাদ বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার ঘোর বিরোধিতা করেছেন বিভিন্ন আলেম। ইসলামের প্রথম যুগের মুতা’আ বিবাহকে যৌন জিহাদ অপব্যাখ্যা দিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে আবারো ইসলামের মর্যাদায় কালিমা লেপনের চেষ্টা করছে। ইসলাম মুতা’আ বিবাহকে অনেক আগে রহিত করেছে। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে নিয়োজিত পশ্চিমা সেনাদের দ্বারা হাজার হাজার যুবতী নিয়মিত বিভিন্ন দেশে যৌন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছে, এমনকি নারী সহকর্মীদেরকেও তারা ধর্ষণ করছে। এ ব্যাপারে তাদের নীরবতাই প্রমাণ করে তারা সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল।
ইসলামে জিহাদের গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য বিষয়ে কুরআন-হাদিসের দিক নির্দেশনা হলোÑ
“তোমাদের কী হলো যে তোমরা ঐসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের খাতিরে আল্লাহর পথে লড়াই করছ না, যাদেরকে দাবিয়ে রাখা হয়েছে এবং যারা ফরিয়াদ করছে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে জালিম এ জনপদ থেকে উদ্ধার কর। আর তোমার পক্ষ হতে আমাদের জন্য অভিভাবক ও সাহায্যকারী ব্যবস্থা কর।” (সূরা নিসা : ৭৫)
“তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাক, যে পর্যন্ত না ফিৎনা খতম হয়ে যায় এবং দ্বীন শুধু আল্লাহর জন্য হয়ে যায়। তারপর যদি তারা বিরত হয় তাহলে জেনে রাখ, জালিমদের ছাড়া আর কারো ওপর হামলা করা উচিত নয়।” (সূরা বাকারা : ১৯৩)
“যে চেষ্টা সাধনা করবে, সে তার ভালর জন্যই করবে। নিশ্চয়ই গোটা সৃষ্টি জগতে কারো কাছে আল্লাহর কোন ঠেকা নেই।” (সূরা- আনকাবুত : ৬)
“আর যারা আমার খাতিরে চেষ্টা সাধনা করবে তাদেরকে আমি অবশ্যই অবশ্যই আমার পথ দেখাব। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ নেককার লোকদের সাথে আছেন।” (সূরা আনকাবুত : ৬৯)
হযরত আবু মুসা আশ’আরী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞস করা হলো : এক ব্যক্তি শৌর্য-বীর্য প্রদর্শনের জন্য, এক ব্যক্তি আত্মগৌরব ও বংশীয় মর্যাদার জন্য এবং অপর এক ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য লড়াই করে। এদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করে? রাসূল (সা) বলেন, যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করার জন্য লড়াই করে সে-ই আল্লাহর পথে রয়েছেন। [বুখারী : ১/৪২ (১২৩) ও মুসলিম: ৬/৪৬ (১৯০৪), (১৪৯) ও (১৫০)]    (চলবে)
zabbarics@gmail.com
লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply