তাওবাহ ও ক্ষমা -আলী আহমাদ মাবরুর

 

রোজার মাস আসন্ন। অন্য সময়ের পাশাপাশি এই মাসে প্রায়শই আমাদের মনে যে চিন্তাটি আসে তাহলো, আমরা যে এত ইবাদত করছি, নামাজ পড়ছি, রোজা রাখছি, আল্লাহর কাছে নিজেদের গুনাহের জন্য মাফ চাইছি, কিন্তু আসলেই কি আমরা মাফ পাচ্ছি? আল্লাহ পাক কি আমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন?
মূলত এই প্রশ্নের উত্তর পেতে পারেন আপনি নিজেই। আপনার অন্তরে কেমন প্রভাব পড়ছে, কতটা প্রভাব পড়ছেÑ তার আলোকেই ক্ষমা পাওয়ার বিষয়টিকে যাচাই করে নিতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “যখন তোমার ভালো কাজগুলো তোমাকে স্বস্তি দেয় আর মন্দ কাজগুলো তোমাকে বিষণ্ন করে তোলে তখন তুমি বুঝতে পারবে যে, তোমার মধ্যে এখনো ঈমানটি জীবন্ত রয়েছে।” (মুসনাদে আহমাদ : ২১৬৯৫) তাই ক্ষমা পাওয়া নিয়ে আপনার ভেতর যে উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা রয়েছে তাকেও ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবেই মূল্যায়ন করা যায়।
এতো গেলো আধ্যাত্মিক পর্যালোচনা। অন্যদিকে, তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে, কুরআন ও সুন্নাহতে আমরা ক্ষমা বিষয়ে দু’টি আমল বারবার দেখতে পাই। একটি হলো, ইসতিগফার আর অন্যটি হলো তাওবাহ। অনেকেই এ দুটো বিষয়কে এক মনে করেন। তবে, প্রকৃতার্থে এই দুটি আমলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সূরা আল হুদে আল্লাহ বলেছেন,
“তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অন্তরকে তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর এবং তাওবাহ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশি করে দেবেন আর যদি তোমরা বিমুখ হতে থাক, তবে আমি তোমাদের ওপর এক মহা দিবসের আজাবের আশঙ্কা করছি।” (সূরা আল হুদ: ৩)
ক্ষমা আর তাওবাহ যখন একসাথে করা হয়, তখন আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন মর্মে আশা করা যায়। কারণ, ইসতিগফার হলো পূর্বে কৃত গুনাহগুলোর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর তাওবাহ হলো আল্লাহর সাথে এক ধরনের ওয়াদা করা, এক ধরনের চুক্তি করা যে, আমি ভবিষ্যতে আর কখনোই অতীতের সেই গুনাহগুলো করব না।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসতিগফারের ধরনটা কেমন হবে? এটা কি শুধু মৌখিক ক্ষমা প্রার্থনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? তাওবাহর ধরন ও প্রকৃতি কেমন হতে পারে আল্লাহ তাআলা নিজেই সূরা আত তাওবায় তার একটি ধারণা দিয়েছেন। রাসূলের (সা.) জমানায় তিনজন সাহাবি তাবুকের যুদ্ধে অংশ নিতে না পেরে ভীষণ অনুতপ্ত ছিলেন। তারা প্রচণ্ড অপরাধবোধে ভুগছিলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
“সেই তিনজন যাদেরকে পেছনে রাখা হয়েছিল এবং যাদের তাওবাহ গ্রহণ না করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গেল এবং তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলো; আর তারা বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই-অতঃপর তিনি সদয় হলেন তাদের প্রতি যাতে তারা ফিরে আসে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ দয়াময় করুণাময়।” (সূরা আত তাওবাহ: ১১৮)
এই আয়াতে বলা হচ্ছে, যদিও গোটা পৃথিবী অনেক বেশি বিস্তৃত তথাপি তাদের অবস্থা এমন হয়ে গেলো যেন গোটা পৃথিবীটাই তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে পড়লো। এই কথাটির ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আবু বকর আল ওয়াক্কাসের (র.) একটি উদ্ধৃতিতে, যা আল্লামা নাসফির ‘মাদারাক-উত-তানজিল’ নামক গ্রন্থে সঙ্কলিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, “যখন একজন মানুষ আল্লাহর কাছে তাওবাহ করে এবং অনুতপ্ত হয় তখন গোটা জমিন যেন তার জন্য সংকুচিত ও সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এই তিন সাহাবির ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনাই ঘটেছিল। তারা মদিনায় ছিলেন ঠিকই, কিন্তু মদিনার পরিবেশ বা মদিনার মানুষজন- কোনো কিছুর সাথেই তারা খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা বলতে পারি, যখন আমরা তাওবাহ করব, তখন যেন আমরা অপরাধবোধে কাতর থাকি। তাওবাহ যেন কোনো সাদামাটা ওয়াদা বা গতানুগতিক পাপের স্বীকৃতি না হয়। সূরা আত তাওবাহর উপরোক্ত আয়াত অনুযায়ী যখন একজন তাওবাহকারী প্রকৃতপক্ষেই অনুধাবন করতে পারবে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল নেই, অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, কেবলমাত্র তখনই আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি নরম হবেন, তাকে ক্ষমা করবেন।
আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সৌন্দর্য এখানেই। আমরা যখন কোনো মানুষের কাছে ক্ষমা চাই, তখন কয়েকটি বিষয় হয়:
সেখানে ক্ষমা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না
যদি সে ব্যক্তি ক্ষমা করেও দেয় তথাপি সে খোঁটা দিতে ছাড়ে না। নানাভাবে অতীতের দোষ বা ভুল নিয়ে হেয় করে যায়।
আর ক্ষমা করে দিলেও পারস্পরিক সম্পর্কটা আর কখনোই আগের মতো হয় না। কিছুটা তিক্ততা বা অস্বস্তি থেকেই যায়।
কিন্তু মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৌন্দর্য হলো, আল্লাহ তাঁর পাপী বান্দাকে শুধু ক্ষমাই করেন না বরং তাকে ভালোও বাসতে পারেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- “তোমাদের মহান ও পরাক্রান্ত প্রতিপালক বলেছেন, একটি ভাল কাজ করলে দশটি পুণ্য লেখা হয় আর একটি খারাপ কাজের জন্য একটি পাপ লেখা হয়, অথবা আমি তা মাফ করে দেই। আর যে লোক পৃথিবী পরিমাণ পাপ নিয়ে আমার সাথে দেখা করে তাকে আমি পৃথিবী পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে দেখা দেই। আর যে লোক একটি পূর্ণ কর্ম করার সঙ্কল্প করে, কিন্তু তখনও তা সম্পন্ন করেনি, আমি তার জন্য একটি সওয়াব লিখি। আর যে লোক আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই, আর আমার দিকে যে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে এক গজ এগিয়ে আসি।” (আবু দাউদ এ হাদীসটি আবু যার রা- থেকে সংগ্রহ করেছেন)
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: তোমাদের কোন লোক হারানো প্রাণী পাওয়ার পর যে সমান আনন্দিত হয়, তোমাদের তাওবার কারণে আল্লাহ তা’আলা এর চেয়েও বেশি খুশি হন। (সহিহ মুসলিম: ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৭০১)
আল কুরআনে আল্লাহ জানিয়েও দিয়েছেন যে, যারা তাওবাহ করে আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন। “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন।” (সূরা আল বাকারা : ২২২)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামী চিন্তাবিদরা মন্তব্য করেছেন যে, আল্লাহ আসলে সেই পাপী বান্দাদেরকেই বেশি ভালোবাসেন যারা অনুতপ্ত হয়ে তাঁর কাছে ফিরে আসে এবং তাওবাহ করে। তার মানে এই নয় যে, তিনি পাপ করতে অন্যদেরকে উৎসাহিত করছেন বা তিনি পাপীকে ভালোবাসেন। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, তাওবাহ করার জন্য মানুষকে পাপ করতে হয়। তাই যারা পাপ করায় অনুতপ্ত হয় তাওবাহ করে তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করতে পছন্দ করেন।
আল্লাহ আমাদের তাওবাহ কবুল করতে ও ক্ষমা করতে এত বেশি পছন্দ করেন যে, এই কারণেই তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। ইবনুল কাইয়ুম (র.) বলেন, “আদম সন্তান তৈরি করার পেছনে আল্লাহর অন্যতম একটি কারণ ছিল, এই সৃষ্টিটাকে ক্রমাগতভাবে ক্ষমা করে যাওয়া। কারণ, আল্লাহ দেখাতে চেয়েছিলেন যে, তিনি আত তাওয়াব। ফেরেশতাদের তাওবাহ করার প্রয়োজন হয় না। তারা ক্ষমাও চায় না। অথচ আল্লাহ ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। তাই আমরা হলাম সেই সৃষ্টি, যারা তাওবাহর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করি।”
এ কারণেই আমরা যে যতটুকুই অপরাধ করি না কেন, আমাদেরকে তাওবাহ করতে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। পবিত্র রামাদান মাস তাওবাহ করার ও তাওবাহ কবুলের মাস। এই মাসে এমনও রজনী আছে যে রাতে তাওবাহ করলে তা কবুল হয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে।
এবার আমরা আলোচনা করব যে, কিভাবে একজন মানুষের তাওবাহ করা উচিত।
প্রথম যে বিষয়টা তাওবাহ করার ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে, তা হলো একনিষ্ঠতা। তাওবাহ করতে হবে শুধু আল্লাহর জন্য।
অন্তরে অবশ্যই সত্যিকারের অনুশোচনা ও অপরাধবোধ থাকতে হবে। এটা ছাড়া তাওবাহ সম্পূর্র্ণ হবে না। তাওবাহ আসতে হবে অন্তর তথা কলব্ থেকে। আর অন্তরে এই বোধটি থাকতেই হবে, যে আমি ভয়াবহ গুনাহ করে ফেলেছি। রাসূল (সা.) বলেছেন, “অপরাধবোধে ভোগাটাই হলো তাওবাহর অপরিহার্য শর্ত।”
বারবার ইস্তিগফার করা। আমরা ইয়া গাফফার, ইয়া তাওয়াব, ইয়া রাহিম বলে বলে তাওবাহ করব। তবে এইগুলো সবই হলো তাওবাহর ন্যূনতম স্তর। তাওবাহকে নিখাদ ও নিখুঁত করার জন্য আরো কিছু করতে হবে। আল্লাহ বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে তাওবাহ করো-আন্তরিক তাওবাহ।” এই আন্তরিক তাওবাহ করার জন্য শেষ দুই শর্ত মানা একান্তভাবে প্রয়োজন।
আমরা নিয়ত করব, যেই গুনাহের জন্য আমরা তাওবাহ করছি, আমরা তা আর কখনোই করব না। কারণ, কোনো ব্যক্তি তাওবাহ করার সময় যদি এমন অনুভূতি লালন করে যে, সে আবারও একই অপরাধ করতে পারে তাহলে তার তাওবাহটি আন্তরিক ও একনিষ্ঠ হতে পারে না। এরকম তাওবাহ যে মিথ্যা তাওবাহ তাও নয়। তবে তা পরিপূর্ণ তাওবাহ হিসেবে গণ্য হবে না। কিছু না করার চেয়ে এরকম তাওবাহ করাও শ্রেয়, কিন্তু তাই বলে এটা পরিপূর্ণ তাওবাহ নয়।
সর্বশেষ শর্ত হলো, কৃত গুনাহটিকে ঢাকার জন্য তিনি তার পরিবর্তে একটি নেক আমল করবেন। একটি প্রকৃত তাওবাহ একজন মানুষকে নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষে পরিণত করে। তাই তাওবাহ করার পর বান্দাকে অবশ্যই দান, সাদাকা, নামাজ, দোয়া, জিকির, কুরআন তেলাওয়াত, এতিমের প্রতি দয়ার মতো আমল বাড়াতে হবে। কেননা, প্রতিটি মুহূর্তে একজন তাওবাহকারীকে এই তাড়না অনুভব করতে হবে যে, আমি গুনাহ করেছি, তাই আমার সেই ঘাটতি পূরণ করতেই হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অনুবাদক

 

SHARE

Leave a Reply