তিউনিসিয়া-মরক্কো-মিসর সর্বত্রই ইসলামপন্থীদের বিজয়

জালাল উদ্দিন ওমর

মুসলিম বিশ্ব পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে আর সেই সাথে পরিবর্তন হচ্ছে বিশ্বব্যবস্থা। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে যেমন ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসছে, ঠিক তেমনি এর মাধ্যমে ইসলামপন্থীরাই হয়ে উঠছে বিশ্বরাজনীতির গতিনিয়ন্ত্রক। অপর দিকে এই পরিবর্তনের ফলে মুসলিম বিশ্বের ওপর থেকে পশ্চিমাদের প্রভাব যেমন কমে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি পশ্চিমারা বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে ফেলছে। মুসলিম বিশ্বের সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলেই এই অনিবার্য সত্যটি প্রমাণিত হবে। সাম্প্রতিককালে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি মুসলিম দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর তিনটি দেশেই ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হয়েছে। দেশ তিনটি হচ্ছেÑ তিউনিসিয়া, মরক্কো এবং মিসর। অথচ দেশ তিনটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজতন্ত্র এবং সামরিকতন্ত্র দ্বারা শাসিত হচ্ছিল এবং ইসলামপন্থীরা নিষিদ্ধ ছিল। গত ২২ নভেম্বর তিউনিসিয়ায় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী আন-নাহদা দল সবচেয়ে বেশি আসনে বিজয়ী হয়। তারা মোট ২১৭টি আসনের মধ্যে ৮৯টি আসনে বিজয়ী হয়ে দেশের একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর কয়েকদিন পর ২৬ নভেম্বর মরক্কোতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও ইসলামপন্থী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি সবচেয়ে বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছে। সংসদের মোট ৩৯৫টি আসনের মধ্যে দলটি ১০৭টি আসনে বিজয়ী হয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় মিসরে। তিন ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রথম ধাপে গত ২৮ নভেম্বর এবং দ্বিতীয় ধাপে ১৪ ডিসেম্বর সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পুরো নির্বাচন শেষ না হওয়ায় প্রথম দফা নির্বাচনের ফলাফল সরকারিভাবে ঘোষণা না করলেও বেসরকারিভাবে প্রকাশিত খবরে সেখানেও ইসলামপন্থী দলের বিজয়ের খবর পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছে। সেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আন-নূর পার্টিও একটি ইসলামপন্থী দল। স্বাভাবিকভাবেই চূড়ান্তভাবে ইসলামপন্থীরাই মিসরে ক্ষমতায় আসছে। এভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে তিউনিসিয়া, মরক্কো এবং মিসরে ইসলামপন্থীদের উত্থান হয়েছে। এসব দেশে ইসলামপন্থী দলের বিজয় বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিজয় ধর্মনিরপেক্ষ তিউনিসিয়া, মরক্কো এবং মিসরসহ পুরো মুসলিম বিশ্বে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। আর সেই পরিবর্তন একদিকে  যেমন ইসলামের উত্থান ও  পুনর্জাগরণের দিকে অপর দিকে তেমনি পাশ্চাত্য ও তাদের ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রত্যাখ্যানের দিকে। ইসলামপন্থী দলের বিজয় এ কথাই সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে যে সকল বাধা বিপত্তি পেরিয়ে, সকল প্রকার ষড়যন্ত্র ও দমন নির্যাতন মোকাবেলা করে ইসলাম আবারো পৃথিবীতে ফিরে আসছে তার আপন আদর্শ ও আসল ঐতিহ্য নিয়ে এবং ইসলামই পৃথিবীতে আবারো নেতৃত্ব দেবে। ইসলামপন্থীদের বিজয় সেই পথে অগ্রযাত্রারই একটি ধাপ। এই বিজয় দেশ তিনটির সামগ্রিক রাজনীতিতে আনবে সম্পূর্ণ নতুন এক গতি। এই বিজয় সারা বিশ্বের অনুন্নত, অধঃপতিত মুসলমানদের মনে জাগাবে নতুন এক আশা ও প্রেরণা। বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনসমূহকে দেবে নতুন এক উর্বরতা। অপর দিকে ইসলাম ও মুসলমানদের চিরশত্র“ পাশ্চাত্যকে গভীর হতাশা ও  আতঙ্কে নিমজ্জিত করবে। দেশ তিনটিতে ইসলামপন্থীদের বিজয় সেখানকার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি এবং তাদের প্রভু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইউরোপসহ পুরো পশ্চিমাবিশ্বের গালে একটি চপেটাঘাত।
মুসলিম দেশসমূহে ইসলামপন্থীদের এ বিজয় নিছক বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়, বরং অনিবার্য একটি বিষয়। কারণ মুসলিম দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই গণতন্ত্র নেই। দু-একটি দেশ বাদে অধিকাংশ দেশেই হয় রাজতন্ত্র না হয় সামরিকতন্ত্র। এসব দেশে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এক ব্যক্তির শাসন, যারা সবসময় পাশ্চাত্যের লেজুড়বৃত্তি করেছে। আর মুসলিম দেশগুলোতে গণতন্ত্র বিকশিত হোক, তা পশ্চিমাবিশ্ব কখনই চায়নি। কারণ গণতন্ত্র থাকলে সব সময় দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান হয়, যারা কখনো পরাশক্তির তাঁবেদারি করে না। এ জন্য পশ্চিমাবিশ্ব সবসময় মুসলিম দেশসমূহে গণতন্ত্রের বিকাশকে বন্ধ এবং স্বৈরশাসকদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তিউনিসিয়ায় দুই যুগ ধরে চলেছে জয়নাল আবেদীন বিন আলীর শাসন। আলজেরিয়ায় ১৯৯১ সাল থেকেই চলছে সামরিক শাসন ও জরুরি অবস্থা। মিসরে ১৯৮১ সাল থেকেই চলেছে জরুরি অবস্থা এবং হোসনি মোবারকের শাসন। ইয়েমেনে ৩০ বছর ধরেই চলছে আলী আবদুল্লাহ সালেহর শাসন। এসবের পাশাপাশি সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাত, জর্ডান, মরক্কোসহ অনেক দেশেই কয়েক দশক ধরেই চলে আসছে রাজপরিবারের শাসন। অন্যান্য সব মুসলিম দেশের অবস্থাও একই। এসব দেশে প্রায় শতভাগ লোক মুসলমান হলেও ইসলামের আলোকে রাজনীতি এখানে নিষিদ্ধ। অধিকন্তু এসব দেশের শাসকেরা সবসময় ইসলামের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছে এবং পশ্চিমাবিশ্বের লেজুড়বৃত্তি ও স্বার্থরক্ষা করেছে। তারা নিজ ধর্ম এবং দেশের মুসলমানদেরকে বানিয়েছে শত্র“ আর ভিন ধর্ম ও ভিন দেশের জনগণকে বানিয়েছে বন্ধু। তাই বছরের পর বছর ধরে পাশ্চাত্য এবং তাদের তল্পিবাহক মুসলিম নামধারী শাসকদের হাতে নিপীড়িত এবং নির্যাতিত এসব দেশের মুসলমানরা তাদের ভাগ্যকে পরিবর্তনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। মুসলিম দেশসমূহে আজ যে গণবিস্ফোরণ, তা সেই পরিবর্তনের অংশ মাত্র। আর বাংলাদেশসহ কোনো মুসলিম দেশই এর বাইরে নয়। ২০১১ সালের শুরুতেই মুসলমানদের গণজাগরণে তিউনিসিয়ার দুই যুগের স্বৈরশাসক জয়নাল আবেদীন বিন আলী ১৪ জানুয়ারি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। জনতার দাবির মুখে সেখানকার নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী আন-নাহদা দলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। একইভাবে জনতার বিক্ষোভে মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক বাধ্য হয়ে গত ১১ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন। সেখানেও অর্ধশতাব্দী ধরে নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। পরিবর্তনের দাবিতে লিবিয়া, সিরিয়া, মরক্কো, ইয়েমেন, জর্ডান, আলজেরিয়া, বাহরাইনসহ অনেক মুসলিম দেশে আন্দোলন শুরু হয়। পশ্চিমাদের হামলায় লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং নিহত হন। সেখানেও ইসলামপন্থীদের উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আগামী নির্বাচনে নিশ্চিতভাবে প্রতিফলিত হবে। অবস্থা বেগতিক দেখে মরক্কোর বাদশাহ মোহাম্মদ নিজের ক্ষমতাকে কমিয়ে সংস্কার কর্মসূচি ও নির্বাচন ঘোষণা করেন আর সেই নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হয়েছে। গণ-আন্দোলনের মুখে ইতোমধ্যেই ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেছেন।
আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদুল আজিজ তার দেশে বলবৎ দুই দশকের জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করেছেন আর জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ তার দেশের ইসলামপন্থীদের প্রতি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। মুসলিম দেশে দেশে যখন পরিবর্তনের আন্দোলন চলছে, তখন তিউনিসিয়া-মরক্কো-মিসরে নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসছে। এদিকে  ইসলামপন্থীদের এই উত্থানে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার একনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্রকে পেয়ে বসেছে সাম্রাজ্য আর আধিপত্য হারানোর ভয় আর ইসরাইলকে পেয়ে বসেছে অস্তিত্ব হারানোর ভয়। কারণ তারা ভাল করেই জানে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম দেশসমূহে যে নেতৃত্ব সৃষ্টি হচ্ছে তা কখনই যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য এবং লেজুড়বৃত্তি করবে না আর ইসরাইলের স্বার্থরক্ষাও করবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাবিশ্ব আজ মুসলিম দেশের পতনোন্মুখ স্বৈরশাসকদের রক্ষায় মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। কিন্তু মুসলমানরা আজ তাদের আসল আদর্শ ও ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত প্রত্যয়ে যেভাবে জেগে উঠেছে, তাতে এসব স্বৈরশাসকের শেষ রক্ষা হবে না। একই সাথে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র এবং তার দোসর ইসরাইলের দাপটও আর বেশি দিন টিকবে না।
বিগত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকেই মুসলমানদের মাঝে ইসলামের পুনর্জাগরণ শুরু। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণকে যুক্তিযুক্ত প্রমাণ করে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে বিশ্বরাজনীতি থেকে সমাজতন্ত্রের বিদায় ঘটে। অধিকন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হয় ৬টি মুসলিম দেশ। ওয়ারশ জোটের বিলুপ্তি এবং সমাজতন্ত্র বিদায় পরবর্তী বিশ্বরাজনীতিতে যে শূন্যতা, তা পূরণে পাশ্চাত্যরা তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে মুসলমানদেরকেই গণ্য করে। এ অবস্থায় ইসলামের উত্থানে পশ্চিমাবিশ্ব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং ইসলামের উত্থানকে প্রতিহত করতে তারা গ্রহণ করে দমন নির্যাতনের কর্মসূচি। তাই ১৯৯১ সালে আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করলেও তাদেরকে ক্ষমতায় আসতে দেয়নি। এদিকে ওয়ারশ জোটের বিলুপ্তি সত্ত্বেও ওয়ারশ জোটের প্রতিপক্ষ ন্যাটোকে আরো সম্প্রসারণ করা হয় এবং খোদ রাশিয়াই ১৯৯৭ সালে ন্যাটোর সদস্য হলো। ন্যাটোর বিলুপ্তির পরিবর্তে উল্টো এর সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে তৎকালীন ন্যাটোর মহাসচিবও পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রধান জেভিয়ার সোলানা বলেন, ‘স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়েছে, সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে এ কথা সত্য, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে এবং পৃথিবী মোকাবেলা করবে নতুন এক ধরনের শক্তি- যা পুরো পশ্চিমাবিশ্বের জন্য সৃষ্টি করবে নয়া হুমকি, আর সেই হুমকি হচ্ছে ইসলামিক মৌলবাদ। অতএব অদূর ভবিষ্যতে উদীয়মান ইসলামী মৌলবাদের হুমকিকে মোকাবেলার জন্য ন্যাটোর সম্প্রসারণ ও একে টিকিয়ে রাখা অপরিহার্য।’ এভাবে পশ্চিমাবিশ্ব মুসলমানদের মোকাবেলায় কর্মসূচি গ্রহণ করে। এদিকে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ঝধসঁবষ চ. ঐঁহঃরহমঃড়হ লেখেন ‘ঞযব ঈষধংয ড়ভ ঈরারষরুধঃরড়হং ধহফ ঃযব জবসধশরহম ড়ভ ডড়ৎষফ ড়ৎফবৎ’ নামক একটি বই, যেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও পাশ্চাত্যের সাথে অনিবার্য সংঘাতের কথা উল্লেখ করেন। তিনি তার বইয়ে ইসলামী সভ্যতার পুনরুত্থানের প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠনের অগ্রগতিকে তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য একমাত্র হুমকি বলে ঘোষণা করেন। পাশ্চাত্যের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার পথে ইসলামী সভ্যতা বিরাট প্রতিরোধ সৃষ্টি করবে বলে তিনি রাষ্ট্রনায়কদের সতর্ক করে দেন। তার মতে সমাজতন্ত্র একটি সাময়িক সমস্যা ছিল, যা উত্থানের ৭০ বছর পরই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ইসলাম দেড় হাজার বছর থেকেই পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে সংঘর্ষ বাধানোর শক্তি একমাত্র ইসলামী সভ্যতার মধ্যেই বিদ্যমান। তাই নতুন বিশ্বব্যবস্থা নির্মাতাদের ইসলামী সভ্যতার উত্থানকে প্রতিহত করার বলিষ্ঠ পরিকল্পনা নিতে হবে।” তিনি তার বইয়ে ওংষধস ধহফ ঃযব ডবংঃ শিরোনামের প্রবন্ধে আরো বলেন, পাশ্চাত্য সভ্যতার নেতৃত্ব দিচ্ছে আমেরিকা। আর এই সভ্যতার ওপর হুমকি আসছে ইসলামী পুনরুত্থান আন্দোলন থেকে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ ২০০৫ সালের ২৮ অক্টোবর ভার্জিনিয়ার নরফোকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা দফতরে সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে দেয়া সন্ত্রাস-বিরোধী এক নীতিনির্ধারণী ভাষণে বলেন, গত শতকের পতিত সমাজতন্ত্রের মতোই ইসলামী মৌলবাদ বর্তমান বিশ্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইন্দোনেশিয়া থেকে স্পেন পর্যন্ত তারা উদারপন্থীদের উচ্ছেদ করে একটি ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু তাদের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিমা ও আমেরিকান প্রভাবের ইতি চায়। তারা মানবতাবিধ্বংসী অস্ত্র উৎপাদন, ইসরাইলকে ধ্বংস, ইউরোপকে ভীত ও যুক্তরাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করতে চায়। এই অবস্থায় আমরা কখনো তাদের সামনে নতি স্বীকার করতে পারি না। চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অভিযান ব্যাহত হবে না। তিনি বলেন, ‘‘ইসলামিক র‌্যাডিকেলিজম ও কমিউনিজমের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। গত শতাব্দীতে কমিউনিজমের পতন ঘটানো হয়েছে। একইভাবে এখন এই উগ্রবাদকেও নিশ্চিহ্ন করতে হবে।” সুতরাং ইসলামের পুনর্জাগরণ এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার বিষয়টি একেবারেই পরিষ্কার। এদিকে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার জন্য মুসলমানদের দায়ী করে ইরাক, আফগানিস্তান দখল করে কয়েক লক্ষ মুসলমানকে নির্মমভাবে হত্যা করলেও ইসলামের পুনর্জাগরণ বন্ধ হয়নি বরং গতি লাভ করেছে। তুরস্কে ইসলামপন্থী দলের ক্ষমতারোহণ, লেবানেন হিজবুল্লাহর উত্থান এবং আলজেরিয়া ও ফিলিস্তিনের নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলের বিজয় তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। তিউনিসিয়া-মরক্কো-মিসরে ইসলামপন্থীদের বিজয় তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। আর মুসলিম বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থীদের এই উত্থান আজকের বিশ্বরাজনীতির অনিবার্য বাস্তবতা।
সুতরাং মুসলিমবিশ্ব পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, আর এই পরিবর্তন বিশ্বরাজনীতির টার্নিংপয়েন্ট। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তন হবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এবং রচিত হবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা। মুসলিম দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামপন্থী শক্তি, যারা কখনই যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাবিশ্বের আনুগত্য করবে না। বরং মুসলিম দেশসমূহ হয়ে যাবে পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ। ইরান, তুরস্ক, সিরিয়া, সুদান দীর্ঘদিন থেকেই পাশ্চাত্যের বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এদের সাথে রয়েছে মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের হামাসের ভালো সম্পর্ক। তিউনিসিয়া-মরক্কো-মিসরের নির্বাচিত সরকার কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য করবে না এবং ইসরাইলের স্বার্থরক্ষা করবে না। হোসনি মোবারকের আমলে মিসরের সাথে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও মিসরের সাথে ইরানের এখন ভাল সম্পর্ক। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিসর এখন আর ইসরাইলের বন্ধু থাকবে না। বরং মিসর-মরক্কো-তিউনিসিয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের চিরশত্র“ ইরানের সাথে। এসব দেশের মত আলজেরিয়া, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন বা জর্ডান যেখানেই সরকার পরিবর্তন হোক না কেন, পরিবর্তিত সরকার আর যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য করবে না। বরং তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হবে এবং ইরানের নেতৃত্বাধীন মুসলিম জোটে যোগ দেবে। কারণ সব জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রবিরোধীরাই ক্ষমতায় আসবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন একেবারেই ভঙ্গুর। সেখান থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় প্রস্তুতি চলছে। ফলে অচিরেই যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে অনেকগুলো বন্ধুকে হারাবে, যারা আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শত্র“ হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করবে। ব্যাপারটা কিন্তু একেবারেই সহজ এবং স্বাভাবিক। যেমন ইরানের শাহ ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। তখন ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বন্ধুরাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতায় পরিবর্তন হওয়ায় সেই ইরানই হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রধান শত্র“। একইভাবে তুরস্কের সাথে ইসরাইলের বন্ধুত্ব থাকলেও তুরস্কে ইসলামপন্থী দলের ক্ষমতারোহণের ফলে ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব কমে গেছে বরং তুরস্ক হয়ে উঠছে ইসরাইলের প্রতিপক্ষ। সুতরাং মুসলিম বিশ্বে আজ যেই পরিবর্তনের ঢেউ, সেই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের ক্ষমতার যে পালাবদল তা নিশ্চিতভাবেই ইসলামপন্থীদের উত্থান, যারা পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবেই আবির্ভূত হবে। তার মানে মুসলিম দেশসমূহের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব হারাবে। এদিকে পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে অনেকগুলো মুসলিম দেশের উত্থানে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের নেত্বত্বে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব খুব দ্রুত হ্রাস পাবে। অপর দিকে মুসলিম দেশসমূহে ইসলামপন্থীদের উত্থানে সারা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে দ্রুতগতিতে নবজাগরণ ছড়িয়ে পড়বে। যার ফলে প্রায় সকল মুসলিম দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার নেতারা ক্ষমতাচ্যুত হবেন এবং সেই স্থান ইসলামপন্থীরা দখল করবে। ফলে পুরো মুসলিম বিশ্বই পাশ্চাত্যের হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হবে। আর মুসলিম দেশসমূহ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রকে নেতা মানবে না, সেহেতু যুক্তরাষ্ট্র অটোমেটিক্যালি তার নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলবে। এদিকে মুসলমানদের হাতে তেল, গ্যাসসহ অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার কারণে মুসলমানরাই হয়ে উঠবে বিশ্বরাজনীতি এবং অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক। এ অবস্থায় জনতার প্রতিরোধে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র পালিয়ে আসতে বাধ্য হবে। ফলে ইরাক-আফগানিস্তান দখলদারমুক্ত হবে এবং তারা ইরান-তুরস্ক-মিসরের নেতৃত্বাধীন মুসলিম দেশসমূহের জোটে যোগ দেবে। ফিলিস্তিন এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলন বেগবান হবে। ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতা দিতে ইসরাইল যে কেবল বাধ্য হবে তা নয় বরং ইসরাইলের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। এ অবস্থায় ওআইসি এবং আরব লিগ একটি শক্তিশালী এবং কার্যকরী সংস্থা হিসেবে আবির্ভূত হবে। অপর দিকে মুসলিম দেশগুলোর সাথে ল্যাটিন আমেরিকার কট্টর যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, ভেনিজুয়েলা, নিকারাগুয়া, কিউবা, পেরু ইত্যাদির সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি পাবে। এদের সাথে আবার দুই বৃহৎ পরাশক্তি রাশিয়া এবং চীনের সহযোহিতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে বিশাল একটি জোট গড়ে উঠবে। সুতরাং বিশ্বরাজনীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় অত্যাসন্ন। তার মানে নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা রচিত হচ্ছে আর মুসলমানরাই এর নেতৃত্ব দেবে। তিউনিসিয়া-মরক্কো-মিসরের নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয় তারই সুস্পষ্ট বিজয় তারই সুস্পষ্ট বার্তা ঘোষণা করছে।

তিউনিসিয়া-মরক্কো-মিসরের নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয় মূলতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাবিশ্বকে প্রত্যাখ্যান। বছরের পর বছর ধরে মুসলমানদের ওপর পরিচালিত নির্যাতন, নিপীড়ন এবং মুসলমানদের নিয়ে দ্বিমুখীনীতি আজ পশ্চিমাদের জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। গণভোটের মাধ্যমে খ্রিষ্টান প্রধান দক্ষিণ সুদান এবং পূর্বতীমুরকে স্বাধীন করলেও পশ্চিমারা কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, চেচনিয়া আর মিন্দানাওয়ের জনগণের স্বাধীনতার আন্দোলনকে কোনো সমর্থন জানায়নি। নিজেরা হাজারো পারমাণবিক বোমা বানালেও, এমনকি পারমাণবিক বোমা হামলা করে কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করলেও, ইরানের বিরুদ্ধে এদের অভিযোগের অন্ত নেই। সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমাবিশ্ব আগ্রাসন চালিয়ে দখল করেছে ইরাক এবং আফগানিস্তান। আর পশ্চিমাবিশ্ব গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের শ্লোগান দিলেও এসব শ্লোগানের কোনো প্রয়োগ এবং কার্যকারিতা মুসলমানদের বেলায় নেই। এক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সম্পূর্ণ উল্টো। ১৯৯১ সালে আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হলেও, তাদেরকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি। ফিলিস্তিনের নির্বাচনে হামাস বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলেও পশ্চিমারা তাদেরকে স্বাগত জানায়নি বরং তাদেরকে সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছে এবং ক্ষমতাচ্যুত করেছে। মুসলিম দেশগুলোতে বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসকদেরকে এই পশ্চিমারাই ক্ষমতায় বসিয়েছে এবং সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে। আর পশ্চিমাদের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে আজ জনগণ জেগে উঠেছে। সুতরাং পশ্চিমাদের উচিত মুসলিম বিশ্বের এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো এবং একই সাথে নিজেদের পরাজয়কে হাসিমুখে মেনে নেয়া। কারণ মানুষকে জোর করে যেমন কোন মূল্যবোধ গ্রহণ করানো যায় না, ঠিক তেমনি জোর করে তাকে তার ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখাও যায় না। জনগণ যদি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে পরাজয়কে হাসিমুখে বরণ করাটাই কিন্তু গণতন্ত্রের মূল কথা। আর যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাবিশ্ব যদি মুসলিম বিশ্বের এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ না করে কোন অগণতান্ত্রিক পথকে গ্রহণ করে তাহলে তা হবে মারাত্মক ভুল এবং তা পশ্চিমাদের জন্য আরো বেশি বিপর্যয় নিয়ে আসবে। কারণ নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে যে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা নদীর প্রবাহকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে মাত্র, কিন্তু পরবর্তীতে সেই নদীর প্রবাহ শুধু প্রতিবন্ধকতাকেই উৎখাত করে না বরং পুরো জনপদকেই ডুবিয়ে ধ্বংস করে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের উচিত মুসলিম দেশে দেশে ইসলামপন্থীদের এই উত্থানকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা এবং তাদের সাথে কাজ করা। ইসলামপন্থীদেরকে গালি দেয়া এবং অবজ্ঞা করার সময় কিন্তু শেষ হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী ইসলামের অনিবার্য উত্থান, বিশ্বক্ষমতায় ইসলামের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্ব এবং একই সাথে নিজেদের পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করাটাই হচ্ছে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মূল কথা। ইতিহাসের এই অনিবার্য বাস্তবতাকে মেনে চলাই ভালো। আর এতেই বিশ্বমানবতার জন্য কল্যাণ নিহিত আছে।
omar_ctg@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply