থামছে না প্রশ্নফাঁসের কেলেঙ্কারি -সামছুল আরেফীন

s100বর্তমান সরকারের সময় পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হওয়া সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এটা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোমলমতি শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা, নিয়োগ পরীক্ষা এমনকি ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নও ফাঁস হয়েছে। সর্বশেষ মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ দিন আন্দোলন করলেও কোন লাভ হয়নি। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত এক কর্মকর্তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় রহস্যজনক মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আন্দোলনকারীরা। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় অনেক সময় সরকারদলীয় লোকদের নাম এলেও অপরাধীরা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন।
নকলপ্রবণতা কমে যাওয়ার পর অব্যাহতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে পরীক্ষায় একটি বা দু’টি প্রশ্নের উত্তর নকল করে দেয়া যায়। কিন্তু ফাঁস হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রতিটি প্রশ্নই আগে থেকে জেনে যাচ্ছে। সে অনুযায়ী উত্তর তৈরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এতে পরীক্ষা বলতে প্রশ্ন কমন পড়ার যে অনিশ্চয়তা বা ভালো ফলাফল করার জন্য যে প্রস্তুতি তার কোনোটাই নেয়ার আগ্রহ থাকে না শিক্ষার্থীদের। প্রশ্নফাঁসের ঘটনা শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস করছে। তাদের মতে, প্রশ্নফাঁসের পর তদন্ত কমিটি হয়, কিন্তু বিচার হয় না। এর সঙ্গে জড়িতদের বিচার তদন্তের আড়ালে হারিয়ে যায়। নকল বন্ধের মতো প্রশ্নফাঁস রোধেও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

প্রশ্নফাঁসের শুরুটা
১৯৭৯ সালের প্রশ্নফাঁসের আলোচিত সেই ঘটনায় প্রথমবারের মতো তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটির রিপোর্টে প্রশ্নফাঁসের ঘটনার জন্য সেই সময় সাভারের সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন), ব্যাংকের এক কর্মকর্তা এবং সাভার অধরচন্দ্র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষককে দায়ী করা হয়েছিল। প্রশ্নপত্রের সিলমোহর করা প্যাকেট কেটে ওই বছর প্রশ্ন ফাঁস করা হলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে দায়ী ব্যক্তিদের গায়ে আঁচড় লাগেনি। আর সেই থেকে শুরু। এরপর এসএসসি পরীক্ষাতেই প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটে ১৯৯১ সালে। এবারও তদন্ত কমিটি নোয়াখালীর এক স্কুলের প্রধান শিক্ষককে দায়ী করেন। আবারও একই কারণে পার পেয়ে যায় অপরাধী। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে পদার্থবিদ্যা, হিসাববিজ্ঞান এবং বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায়। ১৯৯৮ সালের ১৬ এপ্রিল এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই ফাঁস হয়ে যায় প্রশ্ন। হয় তদন্ত কমিটি, কিন্তু ফল একই। এভাবে বছরের পর বছর ধরে চলছে এ কর্মকান্ড। প্রথমে প্রশ্নফাঁস, পরে অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা স্থগিত করে তদন্ত কমিটি। এরপর যথারীতি ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়।

বর্তমান সরকারের সময় প্রশ্নফাঁস
২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিসিএস, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ, অডিট, এনবিআর, এটিইও, মেডিক্যাল, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, এসএসসি, এইচএসসি, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে স্থগিত করা হয় ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষা ও অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা। প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ১৭ জেলার পরীক্ষা বাতিল করা হয় একই কারণে।
গত ৫ আগস্ট প্রকাশিত টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে এ প্রবণতা শুরু হয়। গত শতকের সত্তরের দশক থেকে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটলেও গত পাঁচ বছরে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ একটি নিয়মিত ঘটনা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে বিভিন্ন বিষয়ের মোট ৬৩টি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। তার মধ্যে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার সব পত্রের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।

প্রশ্নফাঁসের কিছু ফিরিস্তি
বর্তমান সরকারের সময়ে একের পর এক ফাঁস হচ্ছে পাবলিক ও চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রই ফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আর এর সাথে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কিছু নেতাসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতিতে সবকিছুর পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসেও এসেছে আধুনিকায়ন, প্রশ্নফাঁসের ধরনেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। আগের প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এখন প্রশ্নফাঁসে ব্যবহার করা হচ্ছে মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, ঘড়ি ও ইন্টারনেট। এসব অপরাধ বিষয়ে আইন থাকলেও সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সরকারদলীয় বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না তারা। ফলে আইনের ফাঁকফোকর এবং সরকারি ছত্রছায়ায় তাদের সমর্থক শক্তিশালী সিন্ডিকেটচক্র সব সময়ই শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। এতে সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্য আরও বেড়েই চলছে।
প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে এই আমলে। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিসিএস, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা, অডিট, এনবিআর, এটিইও, মেডিক্যাল, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা, এসএসসি, এইচএসসি, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ও অভিযোগ পাওয়া যায়। মন্ত্রণালয় সূত্র, বিশিষ্টজন ও চাকরিপ্রার্থীদের মতে, বর্তমান সরকারের সময়ের মতো অতীতে এত বেশি ও গণহারে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেনি। ২০১৩ সালের ৩১ মে ফাঁস হয়ে যায় অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সত্যতা পাওয়ার পর ১২ জুন ওই পরীক্ষা বাতিল করা হয়।
২০১০ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা হলেও পরীক্ষা বাতিল হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯১ বছরের ইতিহাসে প্রথম প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে ২০১০ সালের ২১ জানুয়ারি। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে অনার্স প্রথমবর্ষ ভর্তি পরীক্ষার তিনটি সেটের সবটাই ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ওই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। প্রশ্নফাঁসের সিন্ডিকেটের কয়েকজনকে গ্রেফতার ও তদন্ত কমিটিও করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেট চক্রটি আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যায়।
২০১০ সালের ১৬ জুলাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকর্মকর্তা পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। এতে ওই পরীক্ষা বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষাকর্মকর্তা নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ২০১০ সালের ৮ জুলাই সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ২০১০-১১ সালে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সিন্ডিকেট চক্রের ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
২০১১ সালে অডিট বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালের ২৭ জানুয়ারি ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই খাদ্য অধিদফতরের নিয়োগ পরীক্ষা নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ওই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। ২৭ জুলাই জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার আগের রাতে পুরান ঢাকার একটি হোটেল থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নসহ ১৬ জনকে আটক করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ২০১২ সালের ৩ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষায় হলের প্রশ্নের শতভাগ মিলে গেলেও ওই পরীক্ষা বাতিল বা তদন্ত হয়নি। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়। ওই পরীক্ষার আগের রাতে এবং পরীক্ষার দিন সকালে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটে। ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ৩৩তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষার সব কোর্সের প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ ঘটনায় ৬ অক্টোবর পিএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে। ওই বছরের ২১ ও ২২ নভেম্বর শিশুশিক্ষার্থীদের জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা প্রাইমারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার (পিএসসি) গণিত ও বাংলা বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হওয়ার প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। গত ১২ অক্টোবর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও অভিযোগ ওঠে। ১২ ও ১৯ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ক’ ও ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় পরীক্ষার হল থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। একইভাবে ১২ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন হল থেকে ফাঁস হয়। সেই প্রশ্নপত্র দিয়ে একটি সিন্ডিকেট তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধদের উত্তর ঘড়ি সদৃশ মোবাইলে পাঠায়। এর সঙ্গে জড়িত থাকায় ছাত্রলীগ কর্মীসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে ছাত্রলীগ কর্মীদের ছেড়ে দেয়া হয়। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে ইংরেজি, বাংলা, গণিতসহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়। প্রতিটি পরীক্ষার আগে চারটি করে সেট বের হয়। প্রতিটি সেটের একেকটি অংশ করে চারটি সেটেই শতভাগ কমন পাওয়া যায়। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী ১৯৭৯ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়।

আগের আমলেও প্রশ্নফাঁস
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আলোচিত এসএসসি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নও দুইবার ফাঁস হয়েছে। ১৯৯৭ সালে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় কারও শাস্তি হয়নি। ১৯৯৯ সালে আবার এসএসসি পরীক্ষার আগে ভোলার একটি কেন্দ্র থেকে ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। এ ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল করে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু কারও শাস্তি হয়নি। এ ছাড়া ওই আমলে বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে।

ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্নফাঁস
এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও প্রথমে গণহারে সবাই পায় না। সিন্ডিকেট চক্র পরীক্ষার কয়েক দিন আগে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা চায়। যারা টাকা পরিশোধ করে, শুধু তাদেরই বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গোপনে প্রশ্নপত্র ফাঁস করা হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল এ অপরাধ সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সুবিধা সহজলভ্য হওয়ায় কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধরন বদলেছে। এতে প্রশ্নফাঁসের আগেই তথ্য পাওয়া, অপরাধীদের চিহ্নিত ও শাস্তির আওতায় আনা দুরূহ হয়ে পড়ছে। এ কারণে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যেই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। পরীক্ষার হল থেকে সিন্ডিকেট চক্র প্রশ্ন মুহূর্তের মধ্যেই বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তা কারেকশন করে সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ রাখা অসদুপায় অবলম্বনকারী প্রার্থীদের মোবাইল ফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েক বছর এমন ঘটনা প্রত্যেক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অহরহ ঘটছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। তারা পরীক্ষার হলে মোবাইল, সব ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। পরীক্ষার্থী হল থেকে মোবাইল, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করার অপরাধে অনেকেই হাতেনাতে ধরা পড়েছে। তবে কেন্দ্রের অব্যবস্থাপনা, হল পরির্দশকদের শিথিলতা, নিরাপত্তা ও কড়াকড়ি নির্দেশ না থাকার কারণে প্রশ্নফাঁসের নতুন কৌশলকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

ঢাবি ভর্তি জালিয়াতি :
নাগালের বাইরে ছাত্রলীগ
২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের প্রথমবর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ব্যাপক জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নাকের ডগায় ছাত্রলীগের একটি চক্র জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও যেন টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। অনেক সময় মামলা করলেও পরবর্তীতে তার আর কোনো তদারকি করা হয় না। ফলে ছাত্রলীগ ও জালিয়াত চক্রের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়।
প্রশ্নপত্র জালিয়াতির ঘটনায় মামলা হলেও শুধুমাত্র ভর্তি পরীক্ষায় আটকরা ছাড়া আর কারো বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অনেক সময় ভর্তিচ্ছুরাও টাকা ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়। এর বাইরে ছাত্রনেতাদের গ্রেফতার করার কোনো প্রক্রিয়াই করা হয় না বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম দু’টি ভর্তি পরীক্ষাতেই টিচার্স ট্রেনিং কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সবুজের নাম এসেছে। তার বিরুদ্ধে ঢাবি প্রশাসন মামলা করলেও তিনি এখন দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পুলিশের হাতের নাগালে থাকলেও তাকে আটক করা হচ্ছে না।
গত বছর ‘ক’ ইউনিটের পরীক্ষায় মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ আটক হয়েছে ১৫ শিক্ষার্থী ও দুই জালিয়াতচক্রের সদস্য। এ সংখ্যা অতীতের সকল রেকর্ডকে হার মানিয়েছে। জালিয়াতচক্রের এসব সদস্য প্রযুক্তির অপব্যবহার করে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বারবার এমন ঘটনা ঘটার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। শুধু সান্ত¡নার বাণী শুনিয়ে যাচ্ছে।
নীলক্ষেত হাইস্কুল থেকে আটক শিক্ষার্থী বদিউজ্জামানকে ছাড়াতে এসে আটক হন ইমদাদুল হক খোকন নামে এক সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা। এই খোকন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্ন জালিয়াতচক্রের সক্রিয় সদস্য। তিনি এই চক্রের শীর্ষ স্থানীয়দের একজন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি সবুজের ডান হাত। খোকন পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন সরবরাহ, এসএমএস প্রদান ও টাকা-পয়সা সংগ্রহের কাজ করতেন।
প্রশাসন যে তার কিছু করতে পারবে না সে বিষয়ে খোকন অনেক আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কারণ ধরা পড়ার আগ মুহূর্তে তিনি তার এক পরিচিত সাংবাদিককে তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ শিক্ষার্থীকে ছাড়ানোর বিষয় বলেন, ‘বদিউজ্জামানকে পুলিশে দেয়া হলে আমাদের পক্ষে ওকে ছাড়িয়ে আনা কোনো ব্যাপারই না। সে কালই ছাড়া পাবে।’
খোকন আটক হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ১০-১২টি মোটরসাইকেল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিসের সামনে মহড়া দিয়ে যায় সবুজ। এর আগে ‘গ’ ইউনিটের পরীক্ষাতেও এই সবুজের নাম উঠে আসে। এসব কাজে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন পত্রিকা একাধিকবার সবুজের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলেও প্রশাসন তার কিছুই করতে পারেনি।
তবে এবার ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের খবরের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন
২০১৪ সালে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তদন্ত করার জন্য ১০ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) সোহরাব হোসাইনকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যবিশিষ্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে। ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়। কমিটি ৩ দফা সময় বৃদ্ধি করে ২৯ জুন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে তাদের ১২৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করে।

কমিটির প্রতিবেদন :
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সত্য
তদন্ত প্রতিবেদনে কমিটি উল্লেখ করেছে, ‘৫৫টি বিষয়ে ১১০টি প্রশ্নপত্র ছাপানো হয়, তার মধ্যে কয়েকটি প্রশ্নপত্রের বিষয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে ফেসবুক, বিভিন্ন পত্রিকা ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত মুদ্রিত বা হাতে লেখা বা সাজেশন আকারে পাওয়া নমুনা, তথ্য, উপাত্ত ইত্যাদি পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয়েছে যে, ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র ও গণিত দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হওয়ায় এ দু’টি পরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে সে প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ করেছে; ফেসবুক, বিভিন্ন পত্রিকা ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত মুদ্রিত বা হাতে লেখা বা সাজেশন আকারে পাওয়া রসায়ন প্রথমপত্র ও রসায়ন দ্বিতীয়পত্রের নমুনা প্রশ্ন যাচাই করে মূল প্রশ্নপত্রের সাথে আংশিক মিল পাওয়ায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ অধিকতর সতর্কতা অবলম্বনপূর্বক নতুন প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে সে প্রশ্নপত্রে এ দু’টি পত্রের পরীক্ষা গ্রহণ করে; কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষার কিছু প্রশ্ন ফেসবুকের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়ানো হয়। এ প্রশ্নসমূহ ভিন্ন ভিন্ন অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হলেও এক অ্যাকাউন্টের প্রশ্নের সাথে অন্য অ্যাকাউন্টের প্রশ্নের ভিন্নতা রয়েছে। এ সকল প্রশ্নের সাথে কোন কোন ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নপত্রের আংশিক মিল পাওয়া যায়। কখনও কখনও পরীক্ষার দিন বা পরীক্ষা চলাকালীন বা পরীক্ষার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ফলে সময়মত প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ না পাওয়ায় এবং এ বিষয়গুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত না হওয়ায় বোর্ড কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত প্রশ্নপত্রে এ বিষয়গুলোর পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে।”

দোষীদের চিহ্নিত করতে পারেনি কমিটি
প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেকে তদন্ত কমিটিকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া সম্পর্কে অনেক তথ্য দিয়েছেন কিন্তু এ চক্রকে ধরার জন্য যে উৎসের তথ্য প্রয়োজন তা কেউই দেননি। এমনকি কোন কোন বিশিষ্টজন ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের নমুনা তদন্ত কমিটিকে সরবরাহ করেছেন কিন্তু কোন উৎস জানাতে তারা দৃঢ়ভাবে অপারগতা জানিয়েছেন। এ উৎস সম্পর্কে জানতে পারলে তদন্ত কমিটির পক্ষে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষীদের হয়ত সনাক্ত করা সম্ভব হতো। তার পরও তদন্ত কমিটির সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ফলে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে ফরিদপুরে গণিত দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্নপত্রের নমুনাসহ হাতেনাতে আটককৃত আবুল হাসানের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন ১৯৮০ এর ৪ ধারা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাকে সঠিকভাবে জেরা করা হলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত চক্রকে চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে বলে কমিটি উল্লেখ করেছে।

চার দফা সুপারিশ
প্রচলিত প্রক্রিয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব নয়। তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ ও বেশি জনবলের সম্পৃক্ততা কমিয়ে এনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের আশঙ্কাকে অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায় বলে কমিটি মনে করে। কমিটির মূল চারটিসহ মোট ৬৬টি সুপারিশ রয়েছে। এর মধ্যে ভবিষ্যতে প্রশ্নফাঁস রোধে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে কিছু উদ্ভট সুপারিশও রয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষার দিন প্রশ্নপত্র ছেপে সরবরাহ করা।
সুপারিশ-১ : সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রিত Question Attribute এর ভিত্তিতে প্রশ্ন প্রণয়নের মাধ্যমে একদল শিক্ষক প্রশ্ন ইনপুট করবেন। একই প্রশ্ন অনেকজন শিক্ষক প্রশ্নের মান, ধরন অনুযায়ী রেটিং নির্ধারণ করবেন। মডারেশনকারী শিক্ষকরা এ র‌্যানডম প্রশ্নসেট গ্রহণ, সংশোধন ও পরিমার্জন এবং প্রুফ রিডিং সম্পন্ন করবেন। প্রশ্নের টেম্পলেট অনুসারে যৌক্তিকভাবে কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে (র‌্যানডম) প্রশ্নের সেট তৈরি করবে। এভাবে সকল প্রশ্নের ডাটাবেজ/প্রশ্নব্যাংক তৈরি হবে এবং সফটওয়্যার থেকে ছাপার উপযোগী আউটপুট পাওয়া যাবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রশ্নপত্র তৈরি ও সেট নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধিবৃত্তি উল্লিখিত Knowledgebase এ সংযুক্ত করতে হবে; প্রশ্নপত্রের Knowledgebase & Database তৈরির মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় ‘প্রশ্নব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখানে Artificial Intelligence (A.I.) ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে একাধিক প্রশ্ন সেট তৈরি করা যাবে; প্রশ্নপত্রের জন্য ব্যবহুত ডিভাইসে ৩ (তিন) স্তরে নিরাপত্তাব্যবস্থা (ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড, বায়োমেট্রিক্স, ইউজার একসেস কার্ড) প্রবর্তন করতে হবে; কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সময়সীমার মধ্যে প্রশ্নপত্র খোলা ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য Digital Right Management (D.R.M.) ও সময় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা  (Time Stamp Control) প্রবর্তনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; ছাপানো প্রশ্নপত্র পরীক্ষা কক্ষ অনুযায়ী প্যাকেটজাত করে সিকিউরিটি টেপ (Security Tape) লাগিয়ে পরীক্ষা কক্ষে পৌঁছানোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সুপারিশ-২ : প্রথম সুপারিশের অনুরূপ, সকল বিষয়ের পরিশোধিত প্রশ্নের একটি ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। তবে ডাটাবেজ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সিলেবাস অনুযায়ী দক্ষ, অভিজ্ঞ, প্রশিক্ষিত ও সুনামধারী শিক্ষকমন্ডলীর মাধ্যমে প্রতি বিষয়ের অন্তত ১০ (দশ) সেট প্রশ্নপত্র নিরাপদ Removable Storing Device  উবারপব এ পৃথক পৃথক ফোল্ডারে সংরক্ষণ করতে হবে; ফোল্ডারসমূহ এনক্রিপটেড অবস্থায় থাকবে। পরীক্ষার পূর্বে Removable Storing Device  এ সংরক্ষিত প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে পৌঁছাতে হবে। জবসড়াধনষব ঝঃড়ৎরহম উবারপব এ অ্যাকসেস কন্ট্রোলের ক্ষেত্রে Removable Storing Device প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পরীক্ষার দিন নির্দিষ্ট সময়ে এনক্রিপটেড প্রশ্নপত্র ডিক্রিপ্ট করতে হবে। পরীক্ষা শুরুর পূর্বে যথাসময়ে প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে ছাপাতে হবে। ছাপানো প্রশ্নপত্র পরীক্ষা কক্ষ অনুযায়ী প্যাকেটজাত করে সিকিউরিটি টেপ Digital Right Management (D.R.M.) লাগিয়ে পরীক্ষা কক্ষে পৌঁছানো পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সুপারিশ-২, সুপারিশ-১ এর সহজে বাস্তবায়নযোগ্য সহজ রূপ, তুলনামূলকভাবে সহজে বাস্তবায়নযোগ্য। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সুবিধা পাওয়া গেলে তুলনামূলক সহজ প্রযুক্তি প্রয়োগে প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষা সম্ভব। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ সুপারিশটি স্বল্পতম সময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
সুপারিশ-৩ : সিলেবাস অনুযায়ী বিষয়, অধ্যায় ও প্রশ্নের মানবণ্টন অনুসারে সকল বিষয়ের সম্ভাব্য সকল ধরনের অন্তত ২০ সেট প্রশ্নপত্রের পান্ডুলিপি তৈরি করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বোর্ড কর্তৃপক্ষ মুদ্রণের উদ্দেশ্যে ২০ (বিশ) সেট হতে লটারির মাধ্যমে ০৫ (পাঁচ) সেট পান্ডুলিপি নির্ধারণ করবে। বি. জি. প্রেসে প্রশ্নপত্র ছাপানোর পর বিশেষ R.F.I.D. (Radio Frequency Identification) সংবলিত বক্সে প্যাকেটজাত করবে, যাতে শুধু অনুমোদিত কর্মকর্তা যার নিকটR.F.I.D. (Radio Frequency Identification কন্ট্রোল চিফ থাকবে তিনি পূর্ব নির্দিষ্ট সময়েই কেবল প্রশ্নের প্যাকেটটি খুলতে পারবেন; ডিজিটাল প্রিন্টিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে সিস্টেম ছাপার উপযোগী আউটপুট সরাসরি কম্পিউটার থেকে নিয়ে ছাপাতে সক্ষম। এর জন্য কাগজ প্রদান ও ছাপানো কাগজ বের করা ছাড়া অন্য কোনো মানবিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে না। সুতরাং ছাপানোর বিভিন্ন স্তরে যে বিপুলসংখ্যক জনবল প্রয়োজন পড়তো তা লাগবে না। প্রশ্নপত্র মুদ্রণের পর আগের নিয়মে তা জেলা ও উপজেলা কেন্দ্রে প্রেরণ করা হবে; পরীক্ষার দিন পূর্বনির্ধারিত সময়ে মুদ্রিত প্রশ্নপত্রের কোন সেটে পরীক্ষা হবে তাও লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেয়া হবে।
সুপারিশ-৪ : প্রশ্নপত্র তৈরি, রেটিং, মডারেশন ও ডিজিটাল প্রিন্টিং সিস্টেমে ছাপার উপযোগী আউটপুট পাওয়ার জন্য সফটওয়্যার তৈরি করতে হবে। সফটওয়্যার থেকে ছাপার উপযোগী আউটপুট পাওয়া যাবে। ছাপার উপযোগী আউটপুট সরাসরি কম্পিউটার থেকে নিয়ে ছাপাতে সক্ষম। আউটপুট মেইলে, সিডি, মোবাইল স্টোরেজ বা ডাটা কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ছাপার জন্য প্রেরণ করা যেতে পারে। প্রশ্নপত্র সংক্রান্ত ব্যবহুত ডিভাইসে ৩ (তিন) স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রবর্তন (ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড, বায়োমেট্রিক্স, ইউজার একসেস কার্ড) করতে হবে। প্রয়োজনে নিরাপত্তার স্বার্থে সিস্টেমের আউটপুট দুই স্তরে এনক্রিপ্ট করতে হবে। বি. জি. প্রেসকে ছাপার উপযোগী আউটপুট থেকে ডিজিটাল প্রিন্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে বোর্ড নির্ধারিত সেটে প্রশ্ন সরাসরি ছাপার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ডিজিটাল পেপার কাউন্টার ব্যবহার করে পেপার গণনার কাজ করতে হবে, ফলে প্রশ্নপত্র গণনা ও প্যাকেট করার কাজেও কম সংখ্যক মানুষের সংশ্লিষ্টতা থাকবে; বি.জি. প্রেসে প্রশ্নপত্র ছাপানোর পর প্যাকেটজাতকরণ করে বিশেষ ধরনের নিরাপত্তা সংবলিত অথবা কন্ট্রোল চিপ ব্যবহার করে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুসংহত করতে হবে।

প্রতিদিন পরীক্ষা নেয়াসহ
আরো কিছু সুপারিশ
কমিটি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গ্রহণ করার জন্য বেশ কিছু সাধারণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, বি.জি. প্রেস ছাড়া অন্য কোথাও (উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া গেলে) প্রশ্ন ছাপানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়; এম.সি.কিউ. প্রশ্নের নম্বর কমিয়ে আনা যায়; দীর্ঘ সময়ব্যাপী অনুষ্ঠিত পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করে সম্ভব হলে প্রতি দিন দু’টি করে, একান্ত সম্ভব না হলে অন্তত প্রতিদিন একটি করে একনাগাড়ে পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে পরীক্ষার সময়ের ব্যাপ্তি কমিয়ে আনা যায়; বোর্ডভিত্তিক ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা পরিচালনা করা যায়; পাবলিক পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনা যায়। অনধিক ০৫টি বিষয়ের পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। অনধিক এ ০৫টি বিষয়ের সমন্বিত প্রশ্ন এবং প্রশ্নের মান এমন হবে যে, পরীক্ষার্থী যে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবেন সে পর্যায়ের সনদ পাওয়ার জন্য তা উপযুক্ত হবে। The Public Examinations (offences) Act 1980 (amended 1992)  আইনে বর্ণিত শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে কঠোরভাবে তা প্রয়োগ ও ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা যায়।

পাবলিক পরীক্ষায় এবার প্রশ্নপত্র ৩২ সেট
ফাঁস রোধে তদন্ত কমিটি বিষয় প্রতি ২০ সেট প্রশ্নপত্র তৈরির সুপারিশ করেছিল। শিক্ষাবোর্ড প্রণয়ন করছে ৩২ সেট। এখন থেকে এসব প্রশ্নের মধ্য থেকেই বাছাই করে যে কোনো একটিতে নেয়া হবে পরীক্ষা। প্রতিটি শিক্ষাবোর্ড আলাদাভাবে এ প্রশ্নপত্র তৈরি করবে, যাতে একটি বোর্ডের প্রশ্ন ফাঁস হলে সারা দেশের পরীক্ষা স্থগিত করতে না হয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য বিভিন্ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানদের প্ল্যাটফর্ম আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটি সম্প্রতি এ সিদ্ধান্ত নেয়।

মন্ত্রী বললেন ফাঁস হয়নি
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহোৎসবের মধ্যেও গত বছরের ২৬ জুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দাবি করেছেন, গত পাঁচ বছরে কোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: আবদুল্লাহ শিক্ষামন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘দেশের প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায়, বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতি বছরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। এতে মাঝেমধ্যে পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়। এসব প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে চিহ্নিত করা হয়েছে কি? কতজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে?’
জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গত পাঁচ বছরে কোনো পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ বছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, ঢাকার অধীন অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয় এবং প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। নতুন প্রশ্নপত্রে নতুনভাবে পরীক্ষা নেয়া হয়।

মেডিক্যালে ৭৭ প্রশ্নে মিল
রাত ১২টা ৩০ (মিনিট) তার মানে পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা সকাল ১০টায়, সেখানে সাড়ে নয় ঘণ্টা আগে প্রশ্নটা এখানে আসল (অনলাইনে দেখা গেছে)। কাকতালীয়ভাবে ১০টা (প্রশ্ন) মিলতে পারে, ২০টা প্রশ্ন মিলতে পারে, ৩০টা প্রশ্ন মিলতে পারে, ধরেন ৫০টা বললাম; ৭৭টা প্রশ্ন মিলে যাওয়া- এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না।’ গত ১১ অক্টোবর সাংবাদিক সম্মেলনে আন্দোলনরত ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে সমন্বয়ক আসেফ বিন তাকি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিভিন্ন ‘তথ্যপ্রমাণ’ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থাপনের সময় এসব যৌক্তিকতা তুলে ধরলেন। এমনকি প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একটি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার সে প্রমাণও ছাত্রছাত্রীরা দিয়েছে। ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীরা একাধিকবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সরাসরি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ জানানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। সরকার মনে করেছিল অতীতের মতো ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকেও দমন করতে পারবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা বাধাবিপত্তি ও নিগৃহীত করায় এবং ছাত্রীসহ অসংখ্য ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবক আহত হলেও তাতে দমে না গিয়ে শিক্ষার্থীরা নতুন ভর্তি পরীক্ষার দাবিতে টানা আন্দোলন করছে। ঢাকা মেডিক্যাল ও সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র শিক্ষার্থীরাও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর মেডিক্যাল ও ডেন্টালের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস হওয়ার অভিযোগ এনে ওই দিন থেকেই ভর্তিচ্ছুরা আন্দোলন করে। এই দাবিতে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। একাধিকবার তাদের ওপর পুলিশের হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে দুই দিন শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেন আন্দোলনকারীরা। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিদিন অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি টানা ৩২ ঘণ্টা অনশন কর্মসূচি পালন করে। পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছেন তারা।
মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক সহকারী পরিচালক ওমর সিরাজসহ তিনজনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে র‌্যাব হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
মেডিক্যালে ভর্তিচ্ছুদের সংহতি সমাবেশে এসে গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা: জাফরউল্লাহ বলেন, র‌্যাব হেফাজতে ইউজিসি কর্মকর্তার মৃত্যুই প্রমাণ করে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। তিনি বলেন, অভিযোগ ওঠার পরই সরকারের উচিত ছিল ফলাফল স্থগিত করা। কিন্তু তারা তা করেনি। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন, তিনি সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম শুরু থেকেই বলে আসছেন, মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষার কোনো প্রশ্ন ফাঁস হয়নি।

প্রশ্নফাঁসের কারণে ভারতে পরীক্ষা বাতিল
২০১৫ সালের ১৫ জুন ভারতে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সত্যতা পাওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কেন্দ্রীয় বোর্ডকে (সিবিএসই) ৪ সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেয়ার নির্দেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত। এর ফলে ৬ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে আবারও অল ইন্ডিয়া প্রি- মেডিক্যাল টেস্টে (এআইপিএমটি) অংশগ্রহণ করতে হয়। বিচারক আর কে আগারওয়াল ও অমিতাভ রায়ের বেঞ্চ রায়ে বলেন, ‘পরীক্ষা সন্দেহজনক হয়ে গেছে, কোনোভাবেই এর সঙ্গে আপস করা যায় না।’

টিআইবির গবেষণা
গত ৫ আগস্ট ‘পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস: প্রক্রিয়া, কারণ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এতে বলা হয়, গবেষণায় প্রশ্নফাঁস ও ফাঁসকৃত প্রশ্ন ছড়ানোর এবং বাজারজাতকরণে সম্ভাব্য অংশীজনের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রশ্নফাঁসের প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের একাংশের একইসাথে সরকারি নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, গাইডবই ব্যবসায়ী, ফটোকপিয়ার, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং মোবাইল, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকে। প্রশ্ন হাতে পাওয়ার আগে, প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর এবং পরীক্ষায় প্রশ্ন মিলে যাওয়ার পর এককভাবে সর্বোচ্চ ১০০০০ টাকা এবং দলগতভাবে ১০০০০-২০০০০ টাকা লেনদেন হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রশ্নফাঁসের সাথে সরকারি ও বেসরকারি উভয় অংশীজন জড়িত। প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণে এবং তদারকির সাথে সম্পৃক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িত। প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, প্রশ্নপ্রণয়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়া, ম্যানুয়াল পদ্ধতির সাথে অনেকের সম্পৃক্ততাও প্রশ্নফাঁসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গবেষণায় প্রশ্নফাঁসের তিনটি পর্যায়ের মোট ১৯টি ঝুঁকি চিহ্নিত করা রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের সাথে সরকারি ও বেসরকারি এই দু’ধরনের ভাগীদার রয়েছে। তবে সরকারি পর্যায়ের ভাগীদারদের যোগসাজশ ছাড়া কোনো মতেই প্রশ্নপত্র ফাঁস করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নের বিভিন্ন ধাপে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকেন তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে এ ধরনের অনৈতিক কাজের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে এই সিন্ডিকেটের সাথে যারা জড়িত তাদেরকেও বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’

৭ দফা সুপারিশ
গবেষণার উত্থাপিত সাত দফা সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) (সংশোধন) আইন, ১৯৯২’ এর ৪ নং ধারা পুনরায় সংশোধন করে শাস্তির মাত্রা ৪ বছরের পরিবর্তে আগের মতো ১০ বছর নির্ধারণ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োগ; কোচিং সেন্টার নিষিদ্ধকরণে সরকারের ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২ এর অস্পষ্টতা দূর করা এবং কোচিং বাণিজ্য বন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি এবং প্রশ্নফাঁস রোধ ও সৃজনশীল পদ্ধতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে গাইডবইয়ের আদলে প্রকাশিত সহায়ক গ্রন্থাবলি বন্ধে প্রচলিত আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর তদারকি বৃদ্ধি ও বিদ্যমান আইনের অধীনে শাস্তি নিশ্চিত করা; ঝুঁকি কমাতে প্রশ্ন প্রণয়ন, ছাপানো ও বিতরণের কাজটি পরীক্ষামূলকভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ; প্রশ্নফাঁস নিয়ে গঠিত যেকোনো তদন্ত প্রতিবেদনের ফল জনসম্মুখে প্রকাশ এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশ্নফাঁস রোধে বহু নির্বাচনী প্রশ্নব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে রহিতকরণ ছিল অন্যান্য সুপারিশের অন্তর্ভুক্ত।

প্রশ্নফাঁসের ফলাফল ও প্রভাব
এক দিকে আসল প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে ও অন্য দিকে প্রশ্নফাঁসের প্রপঞ্চকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া প্রশ্ন দিয়ে সম্পৃক্তদের বাণিজ্য করতে দেখা যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশের ‘তথাকথিত সুনাম’ ও পাসের হার বৃদ্ধির জন্য পরীক্ষার আগে প্রশ্ন কেনার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করার উদাহরণ রয়েছে। কোচিং ব্যবসার সাথে স্কুলের শিক্ষকরাও জড়িত থাকেন বলে দেখা যায়। কোনো কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার কথা ভেবে পাঠদানের চেয়ে প্রশ্ন সংগ্রহ করার চেষ্টায় অধিকতর মনোযোগী থাকেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া ও কম পরিশ্রমে ভালো ফলাফল করার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। প্রশ্নফাঁসের কারণে সুষ্ঠু পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়। পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও পাঠদানের সাথে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান থেকে পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার পরও প্রশ্নফাঁসের কারণে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।
প্রশ্নফাঁসের ফলে একটি নীতিহীন সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বেড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। অভিভাবক ও শিক্ষার্থী থেকে সব ধরনের সুবিধাভোগী ও অংশীজনের মধ্যে প্রশ্ন পাওয়া, অন্যকে বিতরণ ও সর্বোপরি পুরো বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়ার মত মানসিকতা লক্ষ করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে যা নীতিবিবর্জিত প্রজন্ম উপহার দেয়ার মত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। প্রশ্নফাঁসের কারণে সার্বিকভাবে শিক্ষার গুণগত মান হ্রাস পায়, যার বিরূপ প্রভাব অদূর অবিষ্যতে দেশের ওপর পড়তে পারে।

প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট আইন
প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে পৃথক কোনো আইন না থাকলেও পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধনী) আইন ১৯৯২, এর ধারা ৪ (ক) ও (খ) এ কোনো পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কোনো প্রশ্ন সংবলিত কোনো কাগজপত্র অথবা পরীক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছে বলে মিথ্যা ধারণা দিয়ে কোনো প্রশ্নের সাথে হুবহু মিল আছে বলে বিবেচিত হওয়ার অভিপ্রায়ে লিখিত কোনো প্রশ্ন সংবলিত কোনো কাগজ যেকোনো উপায়ে ফাঁস, প্রকাশ বা বিতরণ করলে চার বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রয়েছে; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২ অনুযায়ী বেতনভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্ত, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি, স্বীকৃতি বা অধিভুক্তি বাতিল প্রভৃতি শাস্তির ব্যবস্থার বিষয়ে বলা হয়েছে; নোট বই (নিষিদ্ধকরণ) আইন ১৯৮০ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল অথবা সর্বোচ্চ পঁচিশ হাজার টাকা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ধারা ৬৩ (১, ২) প্রশ্নফাঁসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

প্রশ্নপত্র ফাঁস, না শিক্ষার গলায় ফাঁস?
কথাসাহিত্যিক শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এক নিবন্ধে বলেন, পাবলিক পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াটা এ দেশে নতুন অনৈতিক কাজে আমাদের মেধা যেভাবে খরচ করি, তাতে এই চর্চা নতুন হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু ভাবনার কথা হলো প্রশ্নফাঁসের ঘটনা বাড়ছে। অনেক লোকের কাছে এটি লোভনীয় ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ব্যবসানিরপেক্ষ আনন্দের ভাগীদারও হচ্ছেন অনেকে। কিন্তু ওই প্রশ্নফাঁস হওয়ার ব্যাপারটা যে আমাদের শিক্ষা-দর্শনের গলাতেই ফাঁস পরিয়ে এর দফারফা করছে, তা আমরা খেয়াল করছি না। কিন্তু আজ যা সামান্য একটু দমকা বাতাস, কাল যে তা ঝড়ে তান্ডবে রূপ নেবে না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply