দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে ভারত চীনের দ্বন্দ্ব: বাংলাদেশের নির্বাচন । সোলায়মান আহসান

দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে ভারত চীনের দ্বন্দ্ব
               সি জিনপিং                                                            নরেন্দ্র মোদি                                       শেখ হাসিনা

দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে চীন-ভারতের আধিপত্যের লড়াই চলে আসছে বহুদিন ধরেই। একসময় এ লড়াইটা স্পষ্টভাবে চোখে ধরা পড়তো না। এমনিতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভূরাজনীতির বিষয়ে এটা অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। সামনাসামনি যা প্রত্যক্ষ করা যায় তা মোটেই আসল বিষয় না। সাবমেরিনের সঙ্গে তুলনা করা চলে এটাকে। কিছু সাবমেরিন পানির ৪০০ থেকে ৭০০ মিটার নিচ দিয়ে চলাচল করে সম্পূর্ণভাবে রাডার ফাঁকি দিয়ে। এদের গতি যেমন আন্দাজ করা যায় না তেমনি সাবমেরিন থেকে ছুড়ে দেয়া মারাত্মক ধ্বংসক্ষম ব্যালিস্টিক কিংবা ক্রুজ মিসাইল প্রতিহত করা প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রায় অসম্ভব হয়। ভূরাজনীতি তেমনি এক নীরব সংহারক প্রক্রিয়া। কে কখন কার দিকে পাশ ফিরে যাচ্ছে তা আন্দাজ করা যায় না। বিগত বছরের শেষের দিকে (৪ অক্টোবর) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারত সফরের সময় ৫০০ কোটি ডলারের চুক্তির আওতায় এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (৫টি) পাওয়ার প্রেক্ষিতে ভূরাজনীতির একটা পরিবর্তন নির্দেশ করল। সে সম্পর্কে ওই সময় একটি নিবন্ধে (২৮ অক্টোবর নয়া দিগন্ত) বলতে চেয়েছিলাম চীন-রাশিয়া অক্ষ শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিনের আঁতাত না জানি দাঁতাতে রূপ নিতে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে চীন খানিকটা চাপের মুখে পড়তে বাধ্য। এমনিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্কটা দীর্ঘদিন ধরে শীতল যাচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ চলছেই; এটা তো আবার রাখ ঢাকের বিষয় নেই। মূলত চীনের বিশ্বে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে পরাশক্তি হয়ে ওঠা কেউ মেনে নিতে পারছে না। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চীনকে প্রমদিকে ধমক ধামক দিয়ে এবং পরবর্তীতে বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করে বিরূপ মনোভাবের প্রকাশ ঘটায়। এই সেদিন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্যাট্রিক শানাহান বলেছেন চীন, চীন এবং চীনই হবে আমার অগ্রাধিকার। মানে চীনকে মোকাবেলাই তার অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে। রাশিয়ার সঙ্গে চীনের দূরত্ব তৈরি হওয়া মানে চীনকে আরো নাজুক পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে এগোতে হবে। যে কারণে বিগত বছর দুয়েক চীনকে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে একটু রয়ে সয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে। এমনটা মুখে মুখে স্বীকার না করলেও কাজের দ্বারা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। যদিও চীন অপর দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না বরং অর্থনৈতিক ব্যাপারে সহযোগী ও বিনিয়োগবান্ধব দেশ হিসেবে তারা প্রভাব রাখার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ভারতের কাছে তাই বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করা উভয় দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি মনে করছে তারা। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং ভৌগোলিক কারণে প্রভাববলয় রয়েছেই। বিশেষ করে দেশের সরকার পরিবর্তনের বাংলাদেশ কখনো ভারতমুখী নীতির দ্বারা পরিচালিত হয়। আবার ১৯৭৫-১৯৯৬ পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা ভারসাম্য রেখে নীতি মেনে চলতে দেখা গেলেও ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০১৮ পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠায় ভারতমুখী নীতি অনেকটাই স্পষ্ট ধরা দেয়।

দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে ভারত চীনের দ্বন্দ্বএক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দেশগুলোর অন্যতম হওয়ায় ঐতিহাসিকভাবেই পিছিয়ে থাকে। তবে সাম্প্রতিক কালপর্বে চীনের অবস্থানকে গ্রাহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে গোটা বিশ্ব। ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক এবং সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভারতকে এগিয়ে যেতে হলে আরো অপেক্ষা করতে হবে।
চীন সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করার ক্ষেত্রে এবং বিক্রির বাজারে ২০১৩-২০১৭ মেয়াদে শীর্ষ ৫ দেশের মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রাশিয়া, ফ্রান্স তৃতীয় এবং জার্মানত চতুর্থ। এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান মোটেই সন্তোষজনক নয়। ভারতকে তাই অস্ত্র সংগ্রহ করতে পররাজ্যে হাত বাড়াতে হয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও চীন বিশ্বে দীর্ঘ এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পরদ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। অস্ত্র বাণিজ্য বাদ দিলে চীন পণ্য বাণিজ্যে প্রম স্থান অধিকারী। তাই এক্ষেত্রেও চীন পেছনে ফেলেছে ভারতকে। এতদসত্ত্বেও নানান সমীকরণে চীন ভারতের আধিপত্যের লড়াইটা কিন্তু চলছে কোথাও সমান সমান। কোথাও চীন এগিয়ে।
শুধু স্ট্র্যাটেজিক কারণে নয় বা আধিপত্য বিস্তারের জন্য নয়। ঐতিহাসিকভাবে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্ব চলে আসছে। এদের আশু নিরসনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তা ছাড়া ভারতের পররাষ্ট্রনীতির (আদি নেহেরু ডকট্রিন থিউরি) কারণে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে চীনের আশ্রয় পেতে আগ্রহী। ইতঃপূর্বে ভারত কাশ্মীর হায়দ্রাবাদ সিকিমসহ বেশ কয়েকটি স্বাধীন দেশের ব্যাপারে যে নীতি অবলম্বন করেছে তাতে সংগত কারণেই অন্যান্য ক্ষুদ্র দেশ শঙ্কিত। ২০১৬তে এসে ভুটানের অন্তর্গত উপত্যকা ফোকলামে একটি রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে চীন-ভারত ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ সৃষ্টি হওয়ার পেছনে ভারতের ওই ভীতিই দায়ী। ভারত বলেছে চীন-ভুটান সীমানায় ‘দেকলাম’ উপত্যকায় চীনের ওই রাস্তা তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে। তাইত প্রথমে ভুটানকে দিয়ে আপত্তি করায় পরে শক্তি প্রয়োগ করতে সিকিমে সৈন্য সমাবেশ করে। ভুটান কিন্তু ভারতের ওই ভূমিকায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি বরং নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার স্বার্থে চীনের আশ্রয় গ্রহণ করে। বর্তমান ভুটানের সরকার চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলায় ব্যস্ত।
ভারত সব সময় চীনা কার্যযজ্ঞে নেতিবাচক নীতি প্রকাশ করে থাকে তা স্পষ্ট ধরা দেয় ২০১৬তে (১৪-১৫ই মে) বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই সম্মেলনে যোগ না দেয়া এবং তার বিরোধিতা করার মধ্য দিয়েও। ভারত ওই সম্মেলন বর্জন করার কারণ হিসেবে যা উল্লেখ করেছে তা যুক্তিযুক্ত বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেননি। ভারত মনে করে বেল্ট অ্যান্ড বোর্ডের সবচেয়ে বড় প্রকল্প চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর; যা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত ‘আজাদ’ কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে চীন ভারতের সার্বভৌমত্ব নাকি চ্যালেঞ্জ করেছে। অথচ ঐ মহা সম্মেলনে ২৯টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত হন। এমনকি চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতিনিধি প্রেরণ করে সম্মেলনে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানগণ যোগ দেন। ৬৮টি দেশকে যুক্ত করার বেল্ট অ্যান্ড বোর্ডের মহা প্রকল্পে যুক্ত না হওয়ায় ভারত সরাসরি চীনকে একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। যদিও ওই চ্যালেঞ্জ থেকে ইদানীং সরে আসতে চাইছে ভারত। তার প্রমাণ রাশিয়ার অনুরোধে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং সম্প্রতি ভারতকে পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান বেল্ট অ্যান্ড বোর্ডে যোগ দিতে। চীন আসলে চাইছে এশিয়া আফ্রিকা ও ইউরোপকে স্থল ও নৌপথে সংযুক্ত করার উচ্চাভিলাষী এ মহাপরিকল্পনা (বিআরআই) বাস্তবায়ন করে আগামী দিনগুলোতে তাদের পণ্যের বিশাল বাজারকে কার্যকর সম্প্রসারিত করতে। আপাতদৃষ্টিতে চীনের কানেক্টিভিটির মহাপরিকল্পনা একটি বাণিজ্য সম্প্রসারণ হিসেবে মনে হলেও এর পেছনে অন্য উদ্দেশ্য নেই তা বলা যাবে না। ভারত এর কারণ হিসেবে সামরিক উদ্দেশ্যকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। কিন্তু ভারত এটাকে বাধা দিতে গিয়ে একটি ত্রিমুখী আবদ্ধ হয়ে পড়া থেকে বাঁচতে পারল কি? না পারেনি। সেই বিষয়ে পরে আসছি।
দেশের সীমানা নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিকভাবে চলে আসছে। ১৯৬২ সালে দুটি দেশ মারাত্মক এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল; সেই যুদ্ধে ভারত কিন্তু শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। লাদাখের প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার ভূমি দখল করে নেয়। আজও সেই ভূমি তাদের কব্জায় রেখেছে। তারা পুরো লাদাখে চীনা মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করে। ওই অঞ্চলে চীনের সাথে ছোটখাটো লড়াই সারা বছর লেগেই থাকে। এ ছাড়া তিব্বত ও অরুণাচলের ব্যাপারে চীনা দাবি ভারতকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রেখেছে। চীনারা মনে করে ভূপ্রকৃতিগত কারণে পুরো লাদাখ তাদের মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত। এদিকে পাকিস্তান শাসিত ‘আজাদ’ কাশ্মীরের কিছু অংশজুড়ে দিয়ে চীনারা আকসাই চীন নামকরণ করে স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের অন্তর্ভুক্ত করে এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রচন্ড বিরূপ হওয়ায় উভয় দেশের সৈন্যের উপস্থিত হওয়া কঠিন। এছাড়া নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে এনএসজি ভারতকে মাথা দিয়ে আসছে রাশিয়া এখানেও অনুরোধ করেছিল ভারতের প্রবেশদ্বারকে যেন বাধাগ্রস্ত না করে। চীন বলছে, ভারতের অবস্থান এর কোনো পরিবর্তন বা তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি, ৪৮ সদস্যের অভিজাত নিউক্লিয়ার ক্লাবে নতুন সদস্য নেয়ার ব্যাপারে সবাই একমত হবে।
এ দিকে ধীরে ধীরে ভারতকে ঘিরে ধরছে ভারতের ছোট ছোট দেশগুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলায় বেশ আন্তরিক। এসব দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র ও উনড়বয়নকামী দেশগুলোতে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। অবকাঠামো নির্মাণ, রাস্তাঘাট, নৌবন্দর, মেগাসিটি নির্মাণে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালছে। এই নয়া সামরিক শক্তি বাড়াতেও চীন দিচ্ছে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র। এতে ভারত বিব্রত বোধ করছে। অনেকের অভ্যন্তরীণ এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের লড়াই দ্বন্দ্বের অবসানে চীন বন্ধু হিসেবেও এগিয়ে এসেছে। যেমন শ্রীলংকার তামিল অধ্যুষিত অঞ্চলের দীর্ঘ ২৬ বছরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লড়াই দমন করতে চীন সামরিক সহায়তা দেয়। এক সময় তামিলরা ভারতপুষ্ট হয়ে এতটা শক্তিশালী বাহিনী (তামিল টাইগার্স) গড়ে তুলেছিল যাদের দমন করতে শ্রীলংকা সরকার হিমশিম খায়।
রাজা পাকসে ক্ষমতায় আসার পর চীন এফ-৭ যুদ্ধবিমান ৬টি, বিমান বিধ্বংসী বন্দুক ও জেওয়াই-১১ রাডার সিস্টেম দিলে তামিল বিদ্রোহীদের পরাস্ত করতে সমর্থ হয় শ্রীলঙ্কা সরকার। এ ছাড়া ৩৬০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে শ্রীলংকার দক্ষিণাঞ্চলে কৌশলগত সমুদ্রবন্দর হাম্বানটোটা নির্মাণ ও পোর্ট সিটি প্রজেক্ট এর ১.৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে চীন। চীনা বিনিয়োগ মেগা প্রজেক্ট হাম্বানটোটা সিটি গড়ে উঠেছে। এসব বিনিয়োগ কর্মসংস্থান হওয়ায় শ্রীলঙ্কানরা সন্তুষ্ট চীনাদের ওপর। নেপালের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ভারত নেপালের ওপর অসন্তুষ্ট। নেপাল ল্যান্ডলক্ড কান্ট্রি ভারত হতে জ্বালানিসহ যাবতীয় পণ্য আমদানি করে চলতে হয়। এক সময় ভারত কর্তৃক নেপালের ওপর অবরোধের খড়গ নেমে আসায় বিপদে পরে দেশটি। চীন এগিয়ে আসে সহায়তা নিয়ে। নেপালে ভূমিকম্পের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথসহ বেশ কিছু নতুন রেলপথ নির্মাণ করে দেয়। এর মধ্যে তিব্বতের জিগেস থেকে নেপালের সীমান্ত অঞ্চল পর্যন্ত রেলপথ অন্যতম। নেপালকে যৌথ কমান্ড মেকানিজম চুক্তির আওতায় নেপাল-চীন সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ দপ্তর প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী বেইজিং। ২০১৫ সালে বিপর্যয়কর ভূমিকম্পের পর থেকে দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত বৈঠক হয়ে আসছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সেই আদি থেকে এ দুটি দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং পরীক্ষিত এমন নজির বিরল সেই পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এখন বহুমাত্রিক হয় চীনের বর্তমান নেতৃত্ব প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং পাকিস্তানের সঙ্গে। সম্পর্ক উচ্চ মাত্রায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। ২০১৫ সালে পাকিস্তান এসে ৪ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের (৪৬ বিলিয়ন) বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এটা ছিল একক দেশে চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ চুক্তি। পাকিস্তানে পরবর্তীকালে বিনিয়োগ পরিমাণ ৫৬ বিলিয়ন ডলারে উনড়বীত হয়।
চীন বেলুচিস্তানের সমুদ্র উপকূলে গোয়া ট্রেন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে গোয়াদর সিটি নামে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী শহর নির্মাণের মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুত। বন্দর রক্ষা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নির্বিঘড়ব রাখতে পাকিস্তানের এক ডিভিশন সৈন্য চীনের ৩টি সাবমেরিন পাহারায় মোতায়েন রাখা হয়েছে। চীন পাকিস্তান যৌথ প্রযোজনায় সামরিক শক্তি অর্জনেও দুটি দেশ এগিয়ে গেছে। পাকিস্তান চীনাদের সহায়তায় জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমানকে আরো উনড়বত সংস্করণ দেয়ায় তা রাশিয়ার নির্মিত সুকহুই-৩০ এমকেএম (যা ভারতের বিমান প্রতিরক্ষায় প্রধান রক্ষাব্যূহ) অপেক্ষা উন্নত যুদ্ধবিমানে পরিণত হয়েছে। শুধু যুদ্ধবিমান নয় রাডার ব্যবস্থা, মিসাইল সিস্টেম ইত্যাদি ব্যাপারে চীনা সহায়তায় পাকিস্তান অনেকটা আত্মনির্ভরশীল শক্তিতে পরিণত হতে পেরেছে। তাছাড়া দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় এ দুটি দেশ পরস্পর ‘যৌথ প্রতিরক্ষা’র চুক্তি বহু আগের সই করা।
মিয়ানমারের সাথে চীনের সম্পর্ক সুপ্রাচীন কালের। বিগত ৫০ বছর মিয়ানমারে সেনাশাসন প্রতিষ্ঠায় সকল আন্তর্জাতিক অবরোধ ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে চাপ থেকে চীন একাই সামাল দিচ্ছে দেশটিকে। একদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অন্যদিকে চীনা সামরিক অস্ত্রের সেনাবাহিনীকে চৌকস সুসজ্জিত করার কাজ করে আসছে চীন। মিয়ানমারের চীনা বিনিয়োগ হয়েছে গত ৩০ বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। রাখাইন প্রদেশের সিত্তুইয়ে চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। মিয়ানমারের সাথে চীনের ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলগত সম্পর্ক বেশ পুরনো। তাই রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের কাছ থেকে মিয়ানমারের ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা আশা করা যায় না। কিন্তু ভূ-রাজনীতির স্ট্র্যাটেজিক কারণে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে চীনাদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেতে পারতো। চীনা সে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ভুল পথে হাঁটার জন্য রোহিঙ্গা সঙ্কট থেকে বের হয়ে আসা সেভাবে সম্ভব হচ্ছে না, তেমন মিয়ানমারের জাতিগত নির্মূল অভিযান এর ডাম্পিং জোন হিসেবে বাংলাদেশ এখন বিবেচিত হচ্ছে। ভারতও ক্ষুদ্র আত্মস্বার্থে বিভোর হয়ে রোহিঙ্গা প্রশ্নে মিয়ানমারকে সন্তুষ্ট রাখার নীতি অবলম্বন করে চলছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে ভারত। আগেই বলেছি রাজনীতির স্বার্থেই বাংলাদেশকে ভারতের পক্ষে রাখা খুব প্রয়োজন মনে করে বাংলাদেশ। তেমনি চীনও মনে করে বাংলাদেশ হতে পারে তার রাজনীতির এক যোগ্য অংশীদার। ২০১৬তে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং বাংলাদেশে এসে স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশকে বেইজিং স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে পেতে চায়। আর সেই পেতে চাওয়াকে চীন জানে বিনিময় ছাড়া মিলবে না। তাই এক ঝটকায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব। পরে ২৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সই।

দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে ভারত চীনের দ্বন্দ্ব
তিব্বত ও অরুণাচলের ব্যাপারে চীনা দাবি ভারতকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রেখেছে।

ভারতের কিন্তু বাংলাদেশকে আরো বেশি প্রয়োজন। মাথা ও পেটের ব্যথা উভয়ই উত্তর পূর্বাংশের ৭ রাজ্য (সেভেন সিস্টার) নিজেরা আলাদা হবার ঘোষণা দেয় (যে আওয়াজ আছে) তাহলে ওই রাজ্যগুলো রক্ষায় ভারতের প্রবেশপথ মাত্র শিলিগুড়ি করিডোর। যাকে রসিকতা করে চিকেন নেক বা মুরগির গলা বলে। মূল ভারতের সঙ্গে ওই রাজ্যগুলোর সংযুক্ত জমিটি (বাংলাদেশের সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত পঞ্চগড় জেলার উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব বিস্তৃত) সেই সংযোগকারী ভূখণ্ডে ভারতের বিখ্যাত শহরটি, তার নাম শিলিগুড়ি। এই করিডোরটি উত্তর দক্ষিণ চওড়া বা প্রশস্ত কমবেশি ২০ মাইল। তার মানে দেশের দুই দিকে দুটি খণ্ডকে সংযোগকারী ওই করিডোর সব ধরনের কৌশলগত বা রণকৌশলগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য অপর্যাপ্ত অপ্রতুল। তাই ভারতের প্রয়োজন বাংলাদেশে এমন একটা অনুকূল সরকার। ওই করিডোরের উত্তর দিক থেকে যদি বিদেশি কোন হানাদার বাহিনী চাপ প্রয়োগ করে বা বন্ধ করে দেয় সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যে ভারতকে বাঁচাতে পারে। বাংলাদেশ হতে পারতো সুবিধাভোগীদের কিন্তু তা হতে পারেনি স্ট্র্যাটেজিক কারণেই।
বাংলাদেশে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত। ভারত আগে মনে করত স্বাধীনতা যুদ্ধে মিত্রশক্তি হওয়ার সুবাদে বাংলাদেশের কাছে তার পাওনা পেতে বিনিময় ছাড়াই সম্ভব। তা ছাড়া তিন দিকে ঘেরা ও দেশটি ভারতের কাছে নতি স্বীকার না করে যাবে কোথায়? তাই চাপে রেখে বাগাড়ম্বর দিয়ে ব্যক্তি তুষ্ট করার মাধ্যমে ভারত নানা সুবিধা আদায় করে আসছিল এতদিন। কিন্তু চীনের নজর পড়ায় এবং এক চোটে ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সই করার ঘটনা ভারতকে ভাবিয়ে তোলে তাই ভারত ছুটে আসে ঋণদানের প্রস্তাব দিয়ে গত ২০১৭তে। ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা) ঋণ দানের প্রস্তাব নিয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ঢাকা আসেন; চুক্তি সই করেন। এর আগে ২০১০ সালে এক বিলিয়ন এবং ২০১৬ সালে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লাইন অফ ক্রেডিট এর আওতায় বিনিয়োগ অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয়। মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ বিলিয়ন ডলার। বাস্তবতা হচ্ছে এসব ঋণের অর্থ ভারতের প্রয়োজনই ট্রানজিট ও অন্যান্য নির্মাণে ব্যয় হবে। যার শর্তানুযায়ী প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও মেটেরিয়াল কন্ট্রাক্ট ভারতের মাধ্যমেই হাত হবে। আরো বাস্তবতা হচ্ছে গত ৬০ বছরে বাংলাদেশের গৃহীত প্রকল্পের বিপরীতে মাত্র ৩৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার করেছে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক। অপরদিকে চীন তার ২৪ বিলিয়নের ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড় করিয়েছে।
এবার আসা যাক সম্প্রতি অনুষ্ঠিত (৩০ ডিসেম্বর ২০১৮) বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভারত এবং চীন কিভাবে দেখছে। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছিলেন ভারত একটা অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচন হোক বাংলাদেশে এ ব্যাপারে তারা কোন হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী নয়।তেমনই চীনের রাষ্ট্রদূতও বলেছিলেন বাংলাদেশ একটা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যোগ্যতা রাখে। অর্থাৎ নির্বাচনের আগে এ দুটি দেশের মনোভাব ইতিবাচক বলেই মনে হয়েছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক না পাঠানোর ঘোষণা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এর পর্যবেক্ষক পাঠানো ও বাংলাদেশের ১৫ হাজার পর্যবেক্ষকের ব্যয়ভার বহনের ঘোষণা নির্বাচনকে ঘিরে একটা মিশ্র মনোভাব প্রকাশ পায়।
নির্বাচনে কি হয়েছে তা দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম দেখেছে এবং তুলে ধরেছে খানিকটা। আজকাল তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে কোন জিনিস লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার ঘটনায তার প্রমাণ মেলে। তাই বিগত জাতীয় নির্বাচন কিভাবে হয়েছে ভারত এবং চীনের কাছে তার খবর খুব স্পষ্টই আছে। যেহেতু এদের বাংলাদেশ সম্পর্কে রয়েছে আগ্রহ এবং স্বার্থ। ভারত এখন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। সেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘নরেন্দ্র দমোদর দাস মোদি’ নির্বাচনের পরদিন সকালে ফোনে শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানান। এটি ছিল শেখ হাসিনাকে দেয়া প্রথম অভিনন্দন। মোদি টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ওপর আস্থা রাখার জন্য আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানান। ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কাজেই ওই অভিনন্দন প্রাপ্য। কিন্তু চীনের ব্যাপারটাই অবাক করার মতো। ওই দিন বিকেলেই চীনের বাংলাদেশস্ত রাষ্ট্রদূত ঝাং ঝু গণভবনে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এর পক্ষ থেকে অভিনন্দন বার্তা পৌঁছে দেন। রাষ্ট্রদূত এ সময় চীনের তৈরি একটি নৌকা প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেন। ঝাং ঝু শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং আশা করেন তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের ভিশন-২০২১ বাস্তবায়িত হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আগামী পাঁচ বছর আরও বিনিয়োগ আশা করেন। স্পষ্টত বাংলাদেশ চীন ভারতের আধিপত্যের লড়াইয়ের মাঝখানে পড়ে গেছে। ‘কান টানলে মাথা আসে’ প্রবাদটি সবার জানা। যেখানে চীন-ভারত বিরোধ সেখানে রাশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দূরে বসে আঙুল চুষবে? না ভূরাজনীতির খেলায় এরা হচ্ছে সবচেয়ে প্রধান দুই খেলোয়াড়। একসময় ৯০ দশকের (১৯৯২) সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫ টুকরো হয়ে যাবার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ‘গডজিলা’ সেই মহাদানবের মতো মার্কিনিরা গোটা বিশ্বকে তছনছ করে বেড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষিণ এশিয়ার আফগানিস্তান ও আফ্রিকার সোমালিয়া, সুদান, চাদ, তিউনিসিয়া, নাইজারসহ অনেক দেশেই মার্কিনিরা অশান্তির বারুদ জ্বেলেছে। মার্কিনিদের পোড়ামাটি নীতির শিকার হয়ে অন্তত গোটা বিশ্বের বেসামরিক জনগণ নিহতের সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ৫০ লক্ষাধিক। কিন্তু সময় পাল্টে গেছে। মার্কিনিরা হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে অনেক স্থান হতে। কিন্তু তাই বলে মানবতা মুক্তি পাচ্ছে না ওদের ঠাণ্ডা আধিপত্যের হাত থেকে। রাশিয়া ফেডারেশনের হাত বিস্তৃত করছে দিন দিন। পুতিনের নেতৃত্বে বিগত দুই দশকে নতুন অভ্যুদয় ঘটেছে। এশিয়ার ঘুমন্ত বাঘ চীন জেগে উঠেছে তৃতীয় পরাশক্তি হিসেবে। সবাই কিন্তু হিসাব-নিকাশ কষছে এশিয়াকে নিয়ে। স্পষ্টভাবে বললে দক্ষিণ এশিয়ার দিকেই নজর পাকিস্তান- ভারতের। আর দক্ষিণ এশিয়ার পাওয়ার চীন-ভারত বৈরিতা সম্পর্ক জানেনা কে? ২০১৬ তে ভারতের অধিকৃত জম্বু-কাশ্মীরের সীমান্ত অঞ্চল উরিতে যে ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল তাকে কেন্দ্র করে দুটি দেশ (পাক-ভারত) মারাত্মক লড়াইয়ের পথ থেকে সরে এসেছিল। কারণ পরমাণু বোমার অধিকারী শুধু তাই নয় চীনের সঙ্গে মোকাবেলাও অনিবার্য ছিল। পাকিস্তান আক্রান্ত হলেই চীনের পক্ষে সহজ হয় ভারতে ঢুকে পড়া। সে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে ভারতের পক্ষে তখন চীনকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয় ভেবেই যুদ্ধ শেষ হয়নি তাছাড়া রাশিয়াও ছিল চীনের প্রতি অনেকটা ঝুঁকে। পাকিস্তানকেও সমর্থন দিয়েছিল রাশিয়া।

দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে ভারত চীনের দ্বন্দ্বকিন্তু এখন বিশ্বের পরিস্থিতি বদলেছে ৯০ দশকের রাশিয়ার বিপর্যয় থেকে এই শিক্ষা নিয়েছিল। রাশিয়া নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই তাদের নিরাপত্তা অংশীদার হতে পারবে আর সে কারণে মোদি সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লজিস্টিক সাপোর্টের নামে দ্রুত সামরিক চুক্তি করে নেয়। এতে রাশিয়ার কোপানলে ভারত। কিন্তু বছর খানেকের মধ্যেই ভারতের বোধোদয় ঘটে। সরে আসতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কব্জা হতে। পেতে আগ্রহী হয় রাশিয়ার নির্মিত মিসাইল সিস্টেম এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ, যুদ্ধবিমান সুকহুই এম ইউ-৩৫ এবং রাশিয়া থেকে ইতঃপূর্বে ক্রয়কৃত সুকহুই-২৭ এবং সুকহুই-৩০ এমকেএম-কে আধুনিকায়নের সহায়তা ও প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ। দীর্ঘ দুই বছর লেগে থেকে তিন তিনবার করে ভারত অনেকটাই সফল। মিসাইল সিস্টেম এস-৪০০ তারা পেতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য এই মিসাইল সিস্টেমটি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে বিবেচিত। চীনও এর কয়েকটি ২০১৭ এর গোড়ার দিকে রাশিয়া থেকে হাতিয়ে নেয়। কিন্তু ভারত পাঁচটি মিসাইল সিস্টেম এস-৪০০ পাওয়াকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার গোটা চালচিত্র বদলে যেতে বসেছে। আর সবচেয়ে বেশি হিসেব মেলাতে ব্যস্ত চীন এবং পাকিস্তান। এই হিসেবের মধ্যে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে যা উদ্বেগের বটে। এ কারণেই চীন খানিকটা নমনীয় এবং ধীরে চল নীতি অবলম্বন করেছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। ভুটানের অন্তর্গত দোকলামে রাস্তা নির্মাণ নিয়ে ভারতের বাধাদানকে চীন মোটেও বরদাস্ত না করার নীতিতে অনড় ছিল সেই চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চুপি চুপি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করা কি ইঙ্গিত দেয়? চারদিনের চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর ঐ সফর সম্পর্কে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তেমন কিছু প্রকাশ পায়নি কেন? তবে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সীতারামন বলেছেন দোকলাম ঘটনায় দু’দেশের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটানো নাকি এই চুপি চুপি বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল। তাই বলে গুনে গুনে চার দিন! তবে ২০১৭ এর ১৬ ডিসেম্বরে ‘৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়ের স্মরণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড অনুষ্ঠানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল অভয় কৃষ্ণকে উদ্দেশ করে হুংকার ছুড়েন, দোকলামে চালাকির সুন্দর ও উপযুক্ত দেয়া হবে। উল্লেখ্য সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে ৭৩ দিনের টানটান উত্তেজনার অবসান ঘটেছিল সে সময় ভারতের নমনীয় আচরণের জন্যই। ভারত, সিকিম ও ভুটানে ৪০ হাজার মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনী বিনাশর্তে সরিয়ে নিলে সে সময় দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনার অবসান ঘটে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চীন বাংলাদেশের ব্যাপারেও নীতির পরিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে। সরাসরি বিরোধী না গিয়ে সহনশীল, সমতাভিত্তিক, ভারসাম্যমূলক, প্রতিবেশীমূলক নতুন এক সম্পর্কের বন্ধনে দক্ষিণ এশিয়ার নয়া বন্ধু রাষ্ট্র হতে চায় তারা। কিন্তু বাংলাদেশে কোন নীতিতে চলবে? বাংলাদেশের নীতি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সবটুকু গ্রহণযোগ্য হবে? আমাদের রফতানি আয়ের সিংহভাগ কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো হতেই আসে। তাদের চাওয়া-পাওয়া একেবারে আমলে না নিয়ে চীন ভারতের কানামাছি খেলার উদার প্রান্তর হিসেবে ছেড়ে দিলে পশ্চিমা দেশেরা মেনে নিবে? এখানে মেনে নেয়া বা না নেয়ার ব্যাপারটা হয়তো খুব বাহ্যিক দৃশ্যমান হবে না। কারণ ভূ-রাজনীতির খেলায় তারা হারতে চাইবে না। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কিছু অঞ্চল ছেড়ে দিচ্ছে। ছেড়ে দিচ্ছে মানে তারা পরাজয় স্বীকার করে গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেদের? তা মোটেও নয়। তাদের মনোযোগ এখন দৃঢ়ভাবে কেন্দ্রীভূত এশিয়ার দিকে। স্পষ্টভাবে দক্ষিণ এশিয়া।
বৃহৎশক্তির লড়াই থেকে আমাদের গাঁ বাঁচানো খুবই জরুরি। আমরা কি পারবো সত্যি সত্যি এদের লড়াইটা বেধে গেলে নিজেদের নিরাপদ রাখতে? তাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে এমন নীতি যা তাদের দ্বন্দ্বে যাতে আমরা জড়িয়ে না পড়ি। এর জন্য প্রয়োজন দেশে জনগণের দ্বারা সরকার, জনগণের জীবন আদর্শের অনুসারী, কল্যাণকামী সরকার, সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে বলীয়ান সরকার এবং সর্বোপরি দুর্নীতি স্বজনপ্রীতিমুক্ত সৎ মানুষের সরকার। সেই সঙ্গে আমাদের সামরিক সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। আমরা মিয়ানমারের মতো দেশের পিছনে পড়ে থাকব এটা মানা যায় না।

লেখক: কবি, গবেষক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply