দমন-পীড়নের মাধ্যমে কোনো দলকে নিঃশেষ করা যায় না -প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ

ছাত্র সংবাদ : দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিভাবে দেখছেন?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটময়। আমার মনে হয় যে, বাংলাদেশে এর আগে এমন অনিশ্চয়তা আর সৃষ্টি হয়নি। সব মহলেই একটা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং একটা অনিশ্চয়তার অন্ধকার যেন চারদিক থেকে গ্রাস করে ফেলেছে। ক্ষমতাসীন দলের চিন্তাভাবনাটাই হলো এমন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে এদের খুব নিকট সম্পর্ক দেখি না। অতীতেও দেখিনি এবং এখনও দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ এবং গণতন্ত্র যেন একসাথে চলতে পারে না। এ জন্যই দশম জাতীয় সংসদ নির্বানের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে- এ নিয়ে সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ২০ দলীয় জোট এবং ১৪ দলীয় জোটের মধ্যে অবিশ্বাস, অনাস্থা, বিদ্বেষ একটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারণ হলো, ক্ষমতাসীন সরকার যেভাবে আবারও নির্বাচন করতে চাচ্ছে সংবিধানের ১২৩ (ক) ও (খ) অনুযায়ী। কিন্তু ২০ দলীয় জোট ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। কারণ সংসদকে না ভেঙে, সংসদ সদস্যদের পদকে অক্ষুণœ রেখে নির্বাচন করলে মন্ত্রীদের ক্ষমতা বলবৎ থাকবে, প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব ক্ষমতা নিয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করবেন আর এর মধ্যে নির্বাচন হবে- এ নির্বাচন কোথাও গ্রহণযোগ্য হবে না। আর এ নির্বাচনে ২০ দলীয় জোট যাবে না। আরো কিছু রাজনৈতিক দল আছে যারা ২০ দলীয় জোটের মধ্যে নেই, তাদের কেউ কেউ না যেতে পারে। এমন অবস্থায় নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখছি না। তবে এখনো সময় আছে আল্লাহ যদি এদের হেদায়েত করেন এবং যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয়, তাহলে একটি ভালো নির্বাচন হতে পারে। অন্তত সংসদীয় ব্যবস্থায় সংসদকে বহাল রেখে নির্বাচনের নজির তো কোথাও নেই। যেমন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউজ অব কমন্স না ভেঙে কখনো হাউজ অব কমন্সের নির্বাচন হয়নি। প্রতিবেশী ভারতেও লোকসভা না ভেঙে নির্বাচন হয় না। কোনো জরুরি অবস্থা থাকলে সেটা ভিন্ন কথা, কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় এ রকম হয় না।
ছাত্র সংবাদ : আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে দেশ একটা সংঘাতের দিকে এগিয়ে চলছে। আপনি কী মনে করেন?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : আপাতদৃষ্টিতে কেন, সংঘাত যে অনিবার্য এটা বোঝা-ই যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন জোট চায় এককভাবে নির্বাচন করে অতীতের সেই একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে। অন্য দিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সেটা প্রতিহতের চেষ্টা করবে তাদের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী। ফলে সংঘাত যে হবেই এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এর জন্য প্রধানত বা একমাত্র দায়ী ক্ষমতাসীন দলের একগুঁয়েমি ও জেদ। যখনই ত্রয়োদশ সংশোধনীটা সংবিধান থেকে সরিয়ে ফেলা হলো, নিষিদ্ধ করা হলো, অবৈধ ঘোষণা করা হলো তখন তাদের উচিত ছিল যে কারণে ত্রয়োদশ সংশোধনী হয়েছিল অর্থাৎ নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল দুই পক্ষের মধ্যে যে অবিশ্বাস ও অনাস্থা, বিদ্বেষ বিরাজ করছিল তার থেকে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ বের করা, সেটা যদি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা তখনই বের করা উচিত ছিল। বিচারকরা যে রায় দিয়েছেন, আদালতের অ্যামিকাস কিউরিরা যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় বিকল্প গ্রহণীয় কোনো ব্যবস্থা ঠিক না করে এটা অবৈধ করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বরং ক্ষমতাসীন দলই একতরফা নির্বাচন করার জন্য এবং একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্যই এটা করেছে।
ছাত্র সংবাদ : ক্ষমতাসীনেরা বলছেন, বিরোধীদল আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ এর মধ্যে কি একদলীয় শাসনের কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : এটা ক্ষমতাসীন দলের কিছু অর্বাচীন তো বলতেই পারে। সময় আসুক, বিরোধী দল আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে কি না তা বোঝা যাবে। বিএনপি এই মুহূর্তে দেশের সর্ববৃহৎ দল। সুতরাং এই পর্যায়ে তারা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না এটা বিশ্বাসযোগ্য ব্যাপার না। আসলে সরকার পক্ষ বিরোধীদেরকে উত্তেজিত করে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে যাতে পুরোপুরি প্রস্তুতি না নিয়েই যেন ২০ দলীয় জোট আন্দোলনে যায় এবং হরতাল বা অন্যান্য কর্মসূচি পালন করার সময় তাদেরকে অ্যারেস্ট করে দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে গিয়ে তাদেরকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করা যায়।
ছাত্র সংবাদ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলনের শেষ পরিণতি কী?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : আমি বলবো এই শব্দটার প্রতি যদি কারোর এলার্জি থাকে, কেউ যদি এই শব্দটাকে ব্যবহার করতে না চায়- অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা অন্য কোনো নামে করতে চায়- তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থাৎ দুই বৃহৎ জোটে যতক্ষণ বা যতদিন অবিশ্বাস ও অনাস্থা থাকবে, বিশ্বাস যতদিন পর্যন্ত সৃষ্টি না হবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি যতদিন পর্যন্ত স্থিতাবস্থায় না আসবে, ততদিন পর্যন্ত এই ব্যবস্থা তাকে যে নামেই ডাকি না কেন, এই পদ্ধতিতেই নির্বাচন ব্যবস্থাপনা তৈরি করতেই হবে। সংবিধানে এই ব্যবস্থা থাকতেই হবে।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ২৮ অক্টোবরের ভূমিকাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : ২৮ অক্টোবর যে ঘটনা ঘটেছিল তা হঠাৎ করে কোনো ঘটনা নয়, এটা সুদূরপ্রসারী একটা পরিকল্পিত ঘটনা। সেই চক্রান্তের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশকে একটা অকার্যকর রাষ্ট্র ও পরনির্ভরশীল একটা রাষ্ট্রে পরিণত করা। সুতরাং বাংলাদেশের বর্তমান যে পরিস্থিতি সেদিনের ঘটনাটাই ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার সূত্রপাত।
ছাত্র সংবাদ : বিদেশী অনেক বন্ধুদেশ নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন- এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : তাৎপর্য তো আছে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের যে অবস্থান তা কৌশলগত দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে চীন (রাশিয়া সমর্থিত) আর একদিকে ভারত (যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সমর্থিত ভারত) এখনও চিহ্নিত না হলেও এই দুই পরাশক্তির যে একটা দ্বন্দ্ব আছে, তাই এই এলাকায় (অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার) অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয় এটা দুই পক্ষই চায়। কেউই অন্যের মাতব্বরি এখানে মেনে নিতে চাইবে না। অন্যের দ্বারা অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হোক তা কেউ চায় না। এর আগেও লক্ষ্য করেছি আমরা। চীন কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কথা বলে না। ইংল্যান্ড বা যুক্তরাষ্ট্র বলে। এবার যেহেতু চীনও কথা বলেছে, কাজেই বুঝতে হবে তারা বাংলাদেশকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশে কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ভারত সরকার কথা বলে আসছে। আগামীতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের ভূমিকা কী হতে পারে?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : এটা খুবই দুঃখজনক। নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে এটা ঘটছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে কী হচ্ছে না অথবা কিসের বিচার হচ্ছে- এটা ভারত বলার কে? শুধু ভারত কেন, অন্য কোনো রাষ্ট্রের এ ব্যাপারে কিছু বলা ঠিক না। ভারতে তো অহরহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হচ্ছে, মাওবাদীদের সাথে সংঘাত হচ্ছে, এ বিষয়ে তো আমরা কিছু বলার সাহসই পাচ্ছি না। অথচ ভারত এসব বলছে। বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ বিক্রি করে শুধু দিয়েই যাবে, বিনিময়ে পাবে না কিছুই- এই ধরনের দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি বহাল থাকলে এটা হতেই থাকবে। আমেরিকা-কানাডা বা আমেরিকা-মেক্সিকোর মাঝে যে সম্পর্ক সে রকম সম্পর্কই ভারত-বাংলাদেশের মাঝে থাকা উচিত।
ছাত্র সংবাদ : বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী মনে করেন?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : জামায়াতের রাজনীতি তো সত্যিই অনিশ্চিত হয়ে গেছে। জানি না তারা কী করবে। কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ন্যায়ভ্রষ্ট মিথ্যা রায় দিতে গিয়ে প্রয়োজন না থাকলেও একটা রাজনৈতিক দল সম্পর্কে উক্তি করেছেন বিচারকেরা। যাতে এই দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা যেতে পারে। কিন্তু একটা রাজনৈতিক দল অত সহজে নিষিদ্ধ হয় না। অত সহজে নিঃশেষ হয় না। দমন-পীড়নের মাধ্যমে কোনো দলকে নিঃশেষ করা যায় না। বরং আরো শক্তিশালী হয়। এ জন্য জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে সামনের দিকে আমি অত অন্ধকার দেখি না। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, জামায়াত তার নিজস্ব গতিতে চলবে।
ছাত্র সংবাদ : রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে তৃতীয় পক্ষ ক্ষমতায় আসবে এমন কথাও কেউ কেউ বলছেন- এর বাস্তবতা কতটুকু?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : এটার সম্ভাবনাও আছে। তৃতীয় পক্ষ ভেতর থেকে তৃতীয় শক্তি হতে পারে। আবার বাইরে থেকে তৃতীয় শক্তি যেমন মাল্টি ন্যাশনাল করপোরেশন বাংলাদেশে যে সম্পদগুলো আছে তার ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য নাক গলাতে পারে। দেশে অস্থিতিশীল অবস্থা থাকলে ভেতর থেকে হোক বা বাইরে থেকে, তৃতীয় শক্তি আসতে পারে। চীনের কথা বলা থেকে এটা বোঝা যায়। চীন তো এমনিতেই কথাটা বলেছে বলে মনে হয় না।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের নিরাপত্তা সঙ্কট এখন কোথায়?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : নিরাপত্তা সঙ্কট তো দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি যদি এভাবে চলতে থাকে, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের নীতি যদি গ্রহণ করা না হয় এবং ক্ষমতা যদি এই সরকারের হাতে থাকে তাহলে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হবে। বাংলাদেশের লোকজন চায় ভারতের সাথে সুসম্পর্ক। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। এটা আরো স্থিতিশীল হোক তারা তা চায়। কিন্তু ভারতকে প্রভু হিসেবে বা বিগ ব্রাদার হিসেবে কেউ কোনো দিন চায় না।
ছাত্র সংবাদ : সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের জন্য ছাত্র ও যুবসমাজের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?
প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ : সভ্যতার সকল সময় ছাত্র ও যুবকেরাই কিন্তু সমাজ পরিবর্তনের নেয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ভাষা আন্দোলন ’৬৯ গণ-অভ্যুত্থান, ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ছাত্র-যুবসমাজই তাদের প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। দুর্ভাগ্যজনক যে আমরা বর্তমান সময়ে সেই জায়গায় কিছুটা ঘাটতি দেখতে পাচ্ছি। এই ঘাটতির মূল কারণ সমাজের অবক্ষয়গুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ছাত্র-যুবসমাজ সঠিক দিকনির্দেশনা খুঁজে পাচ্ছে না। আমরা যদি ছাত্র-যুবসমাজকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করতে পারি, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারি তবে তারা নিশ্চয়ই দেশের জন্য জনগণের জন্য কাজ করবে। তাদের নেতৃত্ব আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এবং আমরা সেই দিনের জন্য অপেক্ষা করছি।
লেখক : সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply