দাওয়াতের ফলশ্রুতিতে রাসূল সা.-এর ওপর বিভিন্ন অপবাদ ও নির্যাতন । আবু তাসনীম

দাওয়াতের ফলশ্রুতিতে রাসূল সা.-এর ওপর বিভিন্ন অপবাদ ও নির্যাতন । আবু তাসনীমবিশ্বনবী মোহাম্মদ সা. চল্লিশ বছর বয়সে নবুয়তপ্রাপ্ত হন। নবুয়ত পাওয়ার পর ওফাত পর্যন্ত তিনি মানুষের মাঝে দাওয়াতি কাজ করে গেছেন। কেননা নবীগণ দুনিয়াতে এসেছেন মহান আল্লাহর অমিয় বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য। যাতে পথহারা বিভ্রান্ত মানবসমাজ খুঁজে পায় শান্তির নীড়। এ দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষ সোনার টুকরোয় পরিণত হয়েছে। আল্লাহ বলেন- “তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমাত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়। তোমার প্রতিপালক, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়, সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবগত এবং কারা সৎপথে আছে তাও তিনি সবিশেষ অবহিত।” (সূরা নাহল: ১২৫)
রাসূল সা. ইসলামের প্রাথমিক যুগে গোপনে কিছুদিন দাওয়াতি কাজ করেন আর এ সময়ে তার সহধর্মিণী খাদিজাতুত তাহিরা প্রথমেই ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর দাসদের মধ্য থেকে তারই আযাদকৃত দাস যায়েদ বিন হারেছা, শিশু-কিশোরদের মধ্যে আলী (রা) এবং যুবকদের মধ্যে আবু বকর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে গোপনে আরো অনেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে গোপনে ইসলাম গ্রহণের প্রায় তিন বছর পর রাসূল সা. প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছাতে থাকেন। যার ফলশ্রুতিতে মক্কার কাফিরগণ রাসূল সা.কে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে অত্যাচার নির্যাতন করতে থাকেন। যা নিম্নে পাঠকবর্গের সামনে উপস্থাপন করা হলো।
রাসূল সা.-এর দাওয়াতি মিশন দিন দিন উন্নতির দিকে যাওয়ায় মক্কায় কাফিরগণ তা মেনে নিতে পারছিল না, তাই তারা মোহাম্মদ সা.কে তার দাওয়াতি মিশন থেকে বাধা দেওয়ার জন্য যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করে-

বিভিন্ন ধরনের অপবাদ
রাসূল সা. তাঁর নবুয়তি জিন্দেগিতে বহু অপবাদ সইতে হয়েছে। কাফিররা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপবাদ দিয়েছে যেমন- 
জাদুকর ও মিথ্যাবাদী: রাসূল সা. যখন দাওয়াতি কাজ করেন তখন তার সাথে মানুষ যোগ দিতেন এবং তার দাওয়াত গ্রহণ করতেন। তখন তারা চিন্তা করলো মোহাম্মদ সা.কে যদি মিথ্যাবাদী বা জাদুকর না বলা হয় তাহলে তার অনুসারীর সংখ্যা আরো বাড়বে তাই তারা ঘোষণা দিলো যে মোহাম্মদ একজন জাদুকর ও মিথ্যাবাদী। তাই কেউ তার কথা গ্রহণ করো না। আল্লাহ তায়ালা এ কথাটি কুরআনে এভাবে বর্ণনা করেছেন- “তারা এতে আশ্চর্য হলো যে, তাদের কাছে এসেছে তাদেরই মধ্য থেকে এক সতর্ককারী। আর কাফিররা বলতে লাগল, এই ব্যক্তি তো এক জাদুকর, মিথ্যাবাদী।” (সূরা ছোয়াদ : ৪)
পাগল ও কবি: তারা বলে বেড়াতো যে, মোহাম্মদ পাগল হয়ে গিয়েছে তারা মাথা ঠিক নেই আবার কখনো তারা কুরআনের আয়াত শুনে বলতো মোহাম্মদ তো কবি হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ বলেন- “এবং বলত, আমরা কি এক পাগল কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে পরিত্যাগ করব? (অথচ আমার নবী কোন কাব্য নিয়ে আসেনি) বরং তিনি সত্যসহ এসেছেনে এবং অন্যান্য সকল রাসূলদের সত্যায়ন করেছেন।” (সূরা সাফফাত : ৩৬-৩৭)
মিথ্যারটনাকারী: কখনো কখনো তারা রাসূল সা.কে মিথ্যারটনাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ বলেন- কাফিরারা বলে, ‘এটা মিথ্যা ব্যতীত কিছুই নয়, সে এটা উদ্ভাবন করেছে এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে।’ এরূপে তারা অবশ্যই জুলুম ও মিথ্যায় উপনীত হয়েছে। (সূরা ফুরকান: ৪)
ভবিষ্যদ্বক্তা: তারা বলতো মোহাম্মদ ভবিষ্যদ্বক্তা হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ বলেন- “অতএব তুমি উপদেশ দিতে থাকো, তোমার প্রভুর অনুগ্রহে তুমি গণক নও, উন্মাদও নও। তারা কি বলতে চায় যে, সে একজন কবি? আমরা তার জন্য কালের বিপর্যয়ের (মৃত্যুর) অপেক্ষা করছি।” (সূরা তুর: ২৯-৩০)
পুরাকালের উপাখ্যান বর্ণনাকারী: রাসূল সা. যখন কুরআন তেলাওয়াত করতেন তখন তারা এটাকে আল্লাহর কালাম না বলে প্রাচীনকালের কোন কারো কথা বলে প্রচার করে বেড়াতো। আল্লাহ বলেন- “যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তারা তখন বলে, ‘আমরা তো শ্রবণ করলাম, ইচ্ছা করলে আমরাও এর অনুরূপ বলতে পারি, তা তো শুধু সেকালের লোকদের উপকথা।” (সূরা আনফাল : ৩১)
এভাবে মক্কার কাফিররা রাসূল সা.কে বিভিন্ন অপবাদ দিতে থাকে যাতে করে তিনি তার দাওয়াতি কার্যক্রম থেকে বিরত থাকেন।

লোভনীয় প্রস্তাব
রাসূল সা. ও মক্কার নির্যাতিত মুসলমানদের কাছে বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব আসতে শুরু করলো যাতে তারা এ পথ থেকে সরে আসে। সে সময়কার সেরা ধনী ওলিদ বিন মুগিবার নেতৃত্বে তারা সাহাবায়ে কেরামকে ফুসলাতে লাগলো তোমরা মোহাম্মদকে ত্যাগ করো। তাহলে তোমাদেরকে অর্থসম্পদ দেয়া হবে। যাতে তোমরা সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে এবং যদি পরকাল থেকেই থাকে তাহলে আমরা সে সময় তোমাদের বোঝা বহন করব। আল্লাহ বলেন- “বল, আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য প্রতিপালককে খুঁজব? অথচ তিনিই সবকিছুর প্রতিপালক। প্রত্যেকে স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্য কারো ভার গ্রহণ করবে না। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন তোমাদের প্রতিপালকের নিকটেই, তৎপর যে বিষয়ে তোমরা মতভেদ করতে তা তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।” (সূরা আনআম : ১৬৪)

রাসূল সা.-এর প্রতি নির্যাতন
রাসূল সা. এর দাওয়াতে মানুষ ইসলামে দিন দিন যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছিল ঠিক তেমনি তাদের নির্যাতনের পাশাপাশি রাসূল সা.-এর ওপরও দৈহিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালাতে লাগলো। রাসূল সা.-এর প্রতি যারা দৈহিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালিয়েছে তারা হলো-
আবু লাহাব কর্তৃক
আল্লাহ তায়ালা তার রাসূল সা.কে বরাবরই কুরায়শদের থেকে হিফাজত করেছেন। এই সামাজিক বয়কটকালে তার চাচা এবং তার গোত্র বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব যথারীতি তার পক্ষে রুখে দাঁড়ায় এবং সার্বিক সহায়তা দান করে। কাফিররা যখনই তার ওপর কোন দৈহিক আক্রমণ চালানোর দুরভিসন্ধি করেছে, তখনই তারা ইস্পাত কঠিন প্রাচীররূপে সম্মুখে দাঁড়িয়েছে। অনন্যোপায় হয়ে কুরায়শরা ঠাট্টা-উপহাস ও কূট-তর্কের পথ বেছে নেয়। তাদের এসব অপতৎপরতা সম্পর্কে যুগপৎভাবে কুরআনের আয়াতও নাযিল হতে থাকে। কুরআন তো পরিষ্কারভাবে অনেকের নামও উচ্চারণ করেছে, আবার অনেক সময় সাধারণভাবে কাফিরদের আলোচনাক্রমে তাদের উল্লেখ করে দিয়েছে। কুরআন মাজিদে যাদের নাম উচ্চারিত হয়েছে তার মধ্যে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সা.-এর চাচা আবু লাহাব ইবন আবদুল মুত্তালিব এবং তার স্ত্রী উম্মু জামিল বিনতে হারব ইবন উমাইয়া; যাকে আল্লাহ তায়ালা নাম দিয়েছেন ‘হাম্মালাতাল-হাতাব’ ‘ইন্ধন বহনকারিণী’। কারণ সে কাঁটা বহন করে রাসূলুল্লাহ সা.-এর পথে ছড়িয়ে দিত। আল্লাহ তায়ালা তাদের উভয়ের সম্পর্কে নাজিল করেন- “আবু লাহাবের (দুনিয়া-আখিরাতে) দু’হাতই ধ্বংস হয়ে যাক- ধ্বংস হয়ে যাক সে নিজেও; তার ধন-সম্পদ ও আয়-উপার্জন তার কোন কাজে আসবে না; অচিরেই সে লেলিহান শিখাবিশিষ্ট আগুনে প্রবেশ করবে; সাথে থাকবে জ্বালানি কাঠের বোঝা বহনকারিণী তার স্ত্রীও; (অবস্থা দেখে মনে হবে) তার গলায় যেন খেজুর পাতার পাকানো শক্ত কোন রশি জড়িয়ে আছে। (সূরা লাহাব)

উম্মু জামিলের দুরভিসন্ধি এবং আল্লাহ কর্তৃক তার রাসূলের হিফাজত
ইবন ইসহাক বলেন, আমি শুনেছি এই ইন্ধন বহনকারিণী উম্মু জামিল ও তার স্বামীর সম্পর্কে অবতীর্ণ কুরআনোর আয়াত শুনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হল। সে তৎক্ষণাৎ একখণ্ড পাথর নিয়ে রাসূল সা.-এর উদ্দেশ্যে ছুটে এলো। রাসূল সা. তখন আবু বকর সিদ্দিক (রা)কে নিয়ে কাবা শরীফের পাশে উপবিষ্ট ছিলেন। উম্মু জামিল তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াতেই আল্লাহ রাসূল সা.কে তার দৃষ্টির আড়াল করে দিলেন। ফলে সে কেবল আবু বকর (রা)কেই দেখতে পেল। সে জিজ্ঞেস করল, হে আবু বকর! তোমার সঙ্গী কই? আমি শুনেছি সে নাকি আমার কুৎসা করে। আল্লাহর কসম! এই মুহূর্তে তাকে পেলে আমি এই পাথর তার মুখে ছুড়ে মারতাম। শোন, আমিও একজন কবি। তখন সে বলল, ‘আমরা এক নিন্দিতের নাফরমানি করেছি, আমরা তার নির্দেশ অমান্য করেছি এবং আমরা তার দীনকে ঘৃণা করি।’ এই বলে সে চলে গেল। আবু বকর (রা) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সা.! সেকি আপনাকে দেখেনি? তিনি বললেন: না, সে আমাকে দেখেনি। আল্লাহ তার দৃষ্টি থেকে আমাকে আড়াল করে রেখেছেন। ইবন ইসহাক বলেন, কুরায়শরা রাসূলুল্লাহকে সা. মুয়ায্যম নাম দিয়ে গালমন্দ করত। তিনি বলেন, তোমরা কি আশ্চর্যবোধ কর না যে, আল্লাহ তায়ালা আমার থেকে কুরায়শদের গালমন্দ কিভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তারা গালমন্দ করে ‘মুযাম্মাম’কে আর আমি হচ্ছি ‘মুহাম্মদ’ (প্রশংসিত)
আবু জাহল কর্তৃক অত্যাচার: ইসলাম ও মুসলমানদের চরম শত্রু ছিল আবু জাহল। তার মূল নাম আমর ইবনে হিশাম। জাহেলি যুগে তার উপাধি ছিল আবুল হাকাম। অর্থাৎ জ্ঞানের পিতা। তার আচরণের কারণে রাসূলুল্লাহ সা. তার নাম রাখেন আবু জাহল অর্থাৎ মূর্খের পিতা। আবু জাহল ছিল রাসূল সা.-এর অন্যতম উৎপীড়নকারী। সে বিভিন্ন সময়ে রাসূল সা.কে গাল-মন্দ করত এবং শাসিয়ে দিত।
আস ইবন ওয়ায়ল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সা.কে উপহাস: ইবন ইসহাক বলেন, এরূপ আরেকজন দুরাচার হচ্ছে ‘আস ইবন ওয়ায়ল সাহমী।’ রাসূলুল্লাহ সা. এর অন্যতম সাহাবী খাব্বাব ইবন আরাত (রা) ছিলেন একজন কর্মকার। তিনি মক্কায় তরবারি বানাতেন। একবার তিনি আস ইবন ওয়ায়লের কাছে কয়েকটি তরবারি বিক্রি করেন। তার নির্দেশেই তিনি সেগুলো তৈরি করেছিলেন। একদিন তিনি তার কাছে সে টাকার তাগাদা দিতে গেলে আস বলল, হে খাব্বাব! তুমি যার দীনের অনুসারী, তোমার সেই সাথী মোহাম্মদ কি বলে না যে, যারা জান্নাতে যাবে, তারা সেখানে যত খুশি সোনা রূপা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাকর-বাকর লাভ করবে? খাব্বাব বললেন, বটেই তো। তখন সে বলল তাহলে তুমি হে খাব্বাব! আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দাও। সেখানে গিয়ে আমি তোমার পাওনা শোধ করে দিব। আল্লাহর কসম! হে খাব্বাব! তুমি ও তোমার সাথী আল্লাহর নিকট আমার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে না এবং সেখানে আমার চেয়ে বেশি বেহেশতি নিয়ামত পাবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- “তুমি কি লক্ষ্য করেছ সে ব্যক্তিকে, যে আমার নিদর্শনসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সে বলে, ‘আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেয়া হবেই।’ সে-কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়েছে অথবা দয়াময়ের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে?” (সূরা মারিয়াম: ৭৭-৭৮)
উমাইয়া ইবন খালফ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ সা.কে নির্যাতন: উমাইয়া ইবন খালফ ওয়াহাব ইবন হুযাফা ইবন জুমাহ রাসূলুল্লাহ সা.কে দেখামাত্রই উচ্চস্বরে গালমন্দ ও নিম্নস্বরে নিন্দাবাদ করত। আল্লাহ তা’য়ালা তার সম্পর্কে নাযিল করেছেন- “প্রত্যেক পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর দুর্ভোগ। যে অর্থ সঞ্চিত করে ও গণনা করে। সে মনে করে যে, তার অর্থ চিরকাল তার সাথে থাকবে। কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে পিষ্টকারীর মধ্যে। আপনি কি জানেন, পিষ্টকারী কি? এটা আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নি। যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছবে। এতে তাদেরকে বেঁধে দেয়া হবে। লম্বা লম্বা খুঁটিতে।” (সূরা হুমাযাহ: ১-৯)
নাযর ইবন হারিস কর্তৃক নির্যাতন এবং উপহাস: রাসূলুল্লাহ সা.কে উত্ত্যক্তকারীদের মধ্যে আরেকজন হচ্ছে নাযর ইবন হারিস ইবন আলকামা ইবন কালদা ইবন ‘আবদ মানাফ ইবন আবদুদ্দার ইবন কুসাই। রাসূলুল্লাহ সা. যখনই কোন মজলিসে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান জানাতেন, কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন এবং কুরয়াশদের বিগত ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের ইতিহাস দ্বারা সতর্ক করে মজলিস ত্যাগ করতেন, তখন নাযর ইবন হারিস উঠে সে মজলিসের লোকদের পারস্য বীর রুস্তম, ইসফানদিয়ার ও ইরানি রাজা-বাদশাহের কাহিনী বর্ণনা করে শোনাতো। সে বলত, আল্লাহর কসম! মোহাম্মদ আমার চেয়ে ভালো বর্ণনাকারী নয়। তার বর্ণনা তো অতীত যুগের উপকথা মাত্র। তার মতো আমিও সেগুলো লিখে রেখেছি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা নাযিল করেন- “তারা বলে, এগুলো তো আদি যুগের উপকথা, যা সে লিখিয়ে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার নিকট পাঠ করা হয়।’ বলো, ‘এটা তিনিই অবতীর্ণ করেছেন যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা ফুরকান: ৫-৬)

বিদ্রুপকারীদের পরিচয় ও পরিণাম
রাসূলুল্লাহ সা. ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে দাওয়াতের কাজে ব্যাপৃত থাকেন। তিনি তার সম্প্রদায়কে সদুপদেশ দানের ক্ষেত্রে তাদের যাবতীয় উৎপীড়ন, উপহাস ও মিথ্যারোপকে সওয়াবের আশায় বরদাশত করতে লাগলেন। তার সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল, উরওয়া ইবন যুবায়র (রা) বর্ণনামতে তারা পাঁচজন। স্বগোত্রে তারা ছিল প্রবীণ ও প্রভাবশালী। নিম্নে তাদের পরিচয় দেওয়া হলো-
আসওয়াদ গোত্রের বিদ্রুপকারী: আসওয়াদ ইবন মুত্তালিব ইবন আসাদ। উপনাম আবু যাম‘আ। সে ছিল আসাদ ইবন ‘আবদুল উযযা ইবন কুসাই ইবন কিলাব গোত্রের লোক। বর্ণিত আছে যে, তার উৎপীড়ন-উপহাস যখন মাত্রা ছাড়িয়ে গেল, তখন রাসূলুল্লাহ সা. তার জন্য বদদোয়া করে বললেন: হে আল্লাহ তাকে অন্ধ করে দাও এবং তাকে সন্তানহারা কর। বনু যুহরার বিদ্রুপকারী: আসওয়াদ ইবন আবদ ইয়াগুস ইবন ওয়াহব ইবন আবদ মানাফ ইবন যুহরা। সে যুহরা ইবন কিলাব গোত্রের লোক।
মাখযুম গোত্রের বিদ্রুপকারী: ওয়ালিদ ইবন মুগিরা। সে বনু মাখযুম গোত্রের লোক। বংশ তালিকা এরূপ: ওয়ালিদ ইবন মুগিরা ইবন আবদুল্লাহ ইবন উমর ইবন মাখযুম।
সাহম গোত্রের বিদ্রুপকারী: আস ইবন ওয়ায়ল। সে ছিল সাহম গোত্রের লোক। বংশ তালিকা এরূপ: আস ইবন ওয়ায়ল ইবন হিশাম ইবন সুআয়দ ইবন ইবন স্হাম। ইবন হিশাম বলেন, সে হলো ওয়ায়র ইবন হাশিম।
খুযা’আ গোত্রের বিদ্রুপকারী: হারিস ইবন তুলাতিলা। সে ছিল খুযা’আ গোত্রের লোক। বংশ তালিকা এরূপ : হারিস ইবন তুলাতিলা ইবন আমর ইবন হারিস ইবন আবদ আমর ইবন লুআই ইবন মালাকান। এদের অশুভ তৎপরতা যখন চরমে পৌঁছালো এবং নবী সা.-এর প্রতি তাদের ঠাট্টা-বিদ্রুপের মাত্রা ছাড়িয়ে গেল, তখন আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাযিল করলেন- “অতএব, তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছ তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং মুশরিকদরকে উপেক্ষা করো। আমিই যথেষ্ট তোমার জন্য বিদ্রুপকারীদের বিরুদ্ধে, যারা আল্লাহর সাথে অপর ইলাহ্ নির্ধারণ করেছে। সুতরাং শিগগিরই তারা জানতে পারবে।” (সূরা হিজর ৯৪-৯৬)

বিদ্রুপকারীদের পরিণাম
ইবন ইসহাক বলেন, উরওয়া ইবন যুবায়র ও অন্যান্য আলিম হতে ইয়াযিদ ইবন রুমান আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, একদা এসব কাফির যখন আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করছিল, তখন জিবরাইল (আ) রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট আসেন। তারা পাশাপাশি দাঁড়ালেন। এ সময় আসওয়াদ ইবন মুত্তালিব তাদের পাশ দিয়ে যায়। জিবরাইল একটি সবুজ পাতা তার চেহারায় ছুড়ে মারেন। ফলে সে অন্ধ হয়ে যায়। এরপর আসওয়াদ ইবন আবদ ইয়াগুস তাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। তখন জিবরাইল (আ) তার পেটের প্রতি ইশারা করেন। ফলে সে দুরারোগ্য উদারময়ে ভুগে মারা যায়। ওয়ালিদ ইবন মুগিরাও সেখান দিয়ে অতিক্রম করে। জিবরাইল (আ) তার পায়ের গোছার নিচে একটি ক্ষতের প্রতি ইশারা করেন। এ ক্ষতটি কয়েক বছর আগে একটি তীরের খোঁচায় সৃষ্টি হয়েছিল। ঘটনা ছিল এরূপ: সে একদিন পরিধেয় বস্ত্র মাটিতে হেঁচড়ে হেঁচড়ে পথ চলছিল। এভাবে সে বনু খুযা’আর এক ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল। সে তখন তীর বানাচ্ছিল। তার একটি তীরের ফলক ওয়ালিদের কাপড়ে বিঁধে যায় এবং তারই খোঁচা তার গায়ে রাগে। তবে সে খোঁচায় মামুলি ক্ষতই সৃষ্টি হয়েছিল কিন্তু জিবরাইল (আ)-এর ইশারায় উক্ত ক্ষত আবার তাজা হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত এটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়। এমনিভাবে আস ইবন ওয়ায়ল সেখান দিয়ে অতিক্রম করলে জিবরাইল (আ) তার পায়ের তলার দিকে ইশারা করেন। এরপর সে একটি গাধার পিঠে চড়ে তায়েফ যাচ্ছিল। গাধাটি তাকেসহ একটি প্রকাণ্ড গাছ তলায় বসে পড়ে। এ সময় তার পায়ের নিচে একটি কাঁটা ফোটে এবং শেষ পর্যন্ত এতেই তার মৃত্যু ঘটে। হারিস ইবন তুলাতিলাও সেখান দিয়ে গেলে জিবরাইল (আ) তার মাথার দিকে ইশারা করেন। ফলে তার মাথায় পুঁজ জমে এবং এতেই সে মারা যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, যুগে যুগে সকল নবী-রাসূলকেই তাদের দাওয়াতি কাজের কারণে অনেক নির্যাতন ও নিষ্পেষণের শিকার হতে হয়েছিল। তেমনি এ দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে যারাই মাঠে থাকবে তাদের ওপরও ঠিক সে রকম নির্যাতন ও অপবাদ আসবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, ঢাকা

SHARE

Leave a Reply