দার্শনিক মাপযন্ত্রে জীবন অধ্যক্ষ -ডা. মিজানুর রহমান

পৃথিবীর বয়স বিজ্ঞানীদের মতে সাড়ে চার শ’ কোটি বছর। মানুষের আগমন দেড় শ’ থেকে দুই শ’ কোটি বছর আগে। মানুষের জীবন একটাই। শাশ্বত জীবনব্যবস্থার দর্শনে জীবনের কখনও পরিসমাপ্তি নেই। তবে জীবনের স্থান পরিবর্তন একটি প্রাকৃতিক চলমান প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে প্রাণিজগতের আগমন এবং অতঃপর মৃত্যুর মাধ্যমে পৃথিবী থেকে প্রাণের প্রস্থান একটি প্রচলিত আদিপ্রথা।
সাধারণত জন্ম, শৈশব, কৈশোর, বাল্য, যৌবন, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা, কর্মযজ্ঞ, অতঃপর পৌর, বৃদ্ধ, প্রবীণ, বার্ধক্য এবং সর্বশেষ মৃত্যু এই হলো মানুষের জীবন। এই জীবন বা সময়কে পৃথিবীতে অর্থবহ করতে আপাতদৃষ্টিতে কেউ পুরোপুরি সার্থক হয়, কেউ আংশিক আর বেশির ভাগই হয় ব্যর্থ। শাসক, শোষক, শাসিত এই তিন শ্রেণির মানুষের সমন্বিত উদ্যোগে পৃথিবীর সকল প্রকার কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়। এতে যাঁরা মানবরচিত মতবাদের অনুসারী তাঁরা পৃথিবীতে সাময়িক সুখের অধিকারী হলেও পরকাল তাদের জন্য অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আর যাঁরা ওহির বিধান মেনে চলবে বা মেনে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করবে তাঁরা পৃথিবীতে কতটুকু সফলতা অর্জন করতে পারলো তা বড় কথা নয়! বরং আখিরাতে তাঁদের আসল ও চূড়ান্ত ঠিকানা হবে চিরস্থায়ী জান্নাত।

অবশ্য অধুনা দুনিয়ায় খুব কম সংখ্যক মানুষ সৃষ্টিকর্তার বিধান মেনে চলে আর অধিকাংশ মানুষ জেনে বা না জেনে মহান সৃষ্টিকর্তা ও বিধানদাতার প্রদত্ত বিধানের তোয়াক্কা করে না। এক্ষেত্রে যাঁরা জানে ও মানে আর যাঁরা জানে কিন্তু মানে না তাঁরা কখনও সমান হতে পারে না। একশ্রেণির মানুষ মনে করেন তাঁদের জিন্দেগিটাই ¯্রষ্টার বন্দেগি করার জন্য। তবে বন্দেগির প্রকৃত অর্থ তাৎপর্য খুব কম মানুষই বোঝে। অধিকাংশ মানুষ শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক ইবাদত করেই মনে করেন বন্দেগি তো পুরোপুরি হচ্ছেই, কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই জীবনের সকল ক্ষেত্রে মানবরচিত নীতিনীতির অনুসরণ করে থাকেন।
অপর দিকে একশ্রেণির মানুষ আনুষ্ঠানিক ইবাদতের পাশাপাশি জীবনের সকল ক্ষেত্রে অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সকল ক্ষেত্রে ¯্রষ্টার বিধি-বিধান মেনে চলেন বা মেনে চলার চেষ্টা করেন। আবার অনেকে আছেন ¯্রষ্টাকে স্বীকার না করে নিজ নিজ ইচ্ছা মতো জীবন পরিচালনা করেন। আরেক শ্রেণি সৃষ্টিকর্তাকে ভিন্ন অর্থে মানে কিন্তু তার প্রতিকৃতি প্রতিসার সামনে মাথা নত করে পূজা-অর্চনা করে দায়িত্ব শেষ করে কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে এর পূর্ণাঙ্গ প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়। তারা আল্লাহর পছন্দনীয় কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করে কল্পনীয় দেবতার উপাসনা করে যা ¯্রষ্টার নিকট বড়ই অপছন্দনীয়।

এক্ষেত্রে জীবন বা সময়কে সাজাতে সময়ের সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত-এর আদর্শকে বুকে ধারণ করে যাঁরা নশ^রকে অবিনশ^রের চিন্তা চেতনা পরিত্যাগ করতে পেরেছেন তাঁরাই শেষ পর্যন্ত দুনিয়া ও আখিরাতে সার্থক জীবনের অধিকারী। এ ব্যাপারে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সূরা নিসা এর ৭৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “দুনিয়ার সুখ সুবিধাকে যারা আখিরাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দিতে পারে, শুধু তাঁরাই দ্বীনের জন্য সংগ্রাম করার জন্য যোগ্য, অচিরেই আমি (তাদেরকে) পুরস্কার দান করব।” সূরা আত্-তওবা ১১১ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “জান্নাতের বিনিময়ে আল্লাহ্ মুমিনদের জান-মাল অবশ্যই ক্রয় করে নিয়েছেন।” সূরা আলে-ইমরানের ৮৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে- “এবং কোন ব্যক্তি যদি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন জীবনবিধান তালাশ করে তা কখনো কবুল করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
“এই সেই কিতাব যা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট থেকে অবতীর্ণ।” (সূরা আহ্কাফ : ২)। “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে গৌরব গরিমা তাঁরই এবং তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা জাসিয়া : ৩৬-৩৭)। “অতএব পবিত্র ও মহান তিনি, যার হাতেই প্রত্যেক বিষয়ের সর্বময় কর্তৃত্ব; আর তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যবর্তিত হবে।” (সূরা ইয়াসিন : ৮৩)

বিশ^জাহানের সকল প্রাণী ও বস্তুর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ। আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহর। এ রাজত্বে তার কোনো শরিক নেই, তিনি ছাড়া ফয়সালা করার কারো এখতিয়ার নেই। আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা এবং সার্বভৌমত্বের সমস্ত ক্ষমতা মহা পরাক্রমশালী বিধায়ক, রক্ষক, চিরঞ্জীবী ও চিরস্থায়ী মহান রবের হাতে। প্রতিটি মুমিনের সালাত, সাধনা, জীবন, মৃত্যু একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত। তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, তামান্না, তাক্ওয়া, হাশর, মিজান, জান্নাত জাহান্নাম এই কয়েকটি বুনিয়াদি অর্থবোধক মূল্যবান শব্দের মধ্যে ইসলামের মৌলিক পরিচয় ও পূর্ণাঙ্গতার সন্ধান পাওয়া যায়। এ ছাড়া সঠিক ইসলামকে জানতে হলে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ও মহানবীর জীবনাদর্শ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করে সে দর্শনের ভিত্তিতে মানুষের মনোজগৎকে সে আলোকে বিকশিত করার বিকল্প নেই।
প্রতিটি জ্ঞানী মানুষের জীবনের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা দু’ধরনের হয়ে থাকে-এক পৃথিবীতে সফলতা লাভের লক্ষ্য, দুই পরকালীন শান্তি ও পুরস্কার লাভের লক্ষ্য। পৃথিবীতে ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সফলতাকে দুনিয়াবি সফলতা বলা হয়ে থাকে, আর এ জন্য তাকে প্রচুর সময়, শ্রম, মেধা, অর্থ বিনিয়োগ করে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। অপর দিকে দুনিয়ার সময় বা জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে আখিরাতকে আবিষ্কার করা সম্ভব। এতে তিরস্কারের পরিবর্তে পুরস্কার প্রাপ্তির পূর্বাভাস মহাগ্রন্থ আল-কুরআনসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

তবে যারা পরকালে সফলতা অর্জন করতে চায় তাদেরকে পৃথিবীর জীবনে লোভ, হিংসা, মোহ, রাগ, কুদৃষ্টি, কুচিন্তা, অশ্লীলতা, নেশা, অমিতাচার, যৌনাচার, কৃপণতা, অপব্যয়, লৌকিকতা, বাচালতা, পরশ্রীকাতরতা, চোগলখুরি, ছিদ্রান্বেষণ, চলনে বলনে, কথাবার্তায় অমার্জিত বদভ্যাস পরিত্যাজ্য। প্রতিটি মানুষের দেহে এক অদৃশ্য পারমাণবিক শক্তি বিরাজ করে তাহলো আবেগ। যারা এই আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয় তারা পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়। আর যাঁরা বিবেকের শাসন দ্বারা জীবন সাজাতে পারে তারাই হয় সফল।
এক্ষেত্রে যাঁরা জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, বিবেকসম্পন্ন তাঁরা মনে করেন- “আবেগের ঘোড়া যত দ্রুতই ছুটুক- বিবেকের লাগাম তাকে পরাতেই হবে।” “ক্ষণিকের নশ^র জীবনকে অর্থবহ করে গড়ে তোলার উপরই নির্ভর করে অবিনশ^র পরকালীন অনন্ত জীবনের সুখ-দুঃখ।” এ ক্ষেত্রে কেউ হয় ভাগ্যবান আর কেউ হতভাগা।
মূলত জীবন বা সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন ও সদ্ব্যবহারের উপর জীবনের সফলতা বিফলতা নির্ভর করে। আর এ মূল্যবান সময়কে অপব্যয় করা সময়কে হত্যা করার শামিল। জীবন্ত মানুষ হত্যার চেয়ে সময় হত্যার অপরাধ অনেক বেশি। অর্থ অপচয়ের চেয়ে জীবনের সময় অপচয় গুরুতর অপরাধ। এ জন্য স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সময়কে তার মূল্য বুঝে সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করা মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সময় ব্যবস্থাপনা ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন-যাপন করার মতো মহৎ ও মহামূল্যবান কাজ আর হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে নামাজে পঠিত পবিত্র কুরআনের সূরা ফাতিহা, তাশাহুদ, দু’আয়ে মাছুরা, দু’আয়ে কুনুত, সূরা আসর, সূরা মু’মিনুন, আয়াতুল র্কুসি, দু’আয়ে হাশর, চার কালিমা, ঈমানে মুজমাল ও ঈমানে মুফাস্সালের দার্শনিক শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অসাধারণ।

জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে সে লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য সিরিয়াস না হওয়া প্রতিটি মানুষের জন্য মস্তবড় বোকামি। জীবনে অর্জিত শ্রম, মেধা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা যোগ্য নেতৃত্বের একটি বিরাট সম্পদ। এই ধরনের নেতার অর্জিত উল্লিখিত সম্পদ পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সর্বস্তরে বিনিয়োগ করতে পারলে সমগ্র পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যাবে, পৃথিবীটা হবে স্বর্গরাজ্য। অবশ্য এর জন্য তাঁদেরকে নিয়মিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ দ্রুত বাস্তবায়ন, আত্মসমালোচনা, ধ্যান, জীবন দর্শন, তথা ঐশী জীবনব্যবস্থার চর্চা অপরিহার্য। সততা, সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্বশীলতা, শিক্ষা-দীক্ষা, মানবতা, মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, আলোকিত মহান জীবনাদর্শের অনুশীলন নেতাদের দেহ, মন ও আত্মার উন্নতি সাধন করে আলোকিত ঐঙগঙ ঝঅচওঊঘঈঊ জ্ঞানী মানুষ তৈরিতে সহায়তা করে।

এ ধরনের নেতৃত্বই পারে অপরিকল্পিত ছন্নছাড়া, বল্গাহীন, বৈরাগ্য, সন্ন্যাসী, আবেগপ্রবণ, পাগলামি জীবনাচরণ থেকে মুক্ত করে মানুষকে একটি পরিকল্পিত অর্থবহ, সার্থক, জীবন গঠনের জন্য মূল্যবান সময়, মেধা, শ্রম ও অর্থব্যয় করানোর মাধ্যমে একটি সুখী সুন্দর নিরাপদ মানবিক শান্তিময় বিশ^ বিনির্মাণ করতে। কারণ এ ধরনের সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কারণে দুনিয়াতে বাতিলের বিরুদ্ধে হকের বিজয় দান করে সমগ্র দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চান। “যাঁরা সৎকর্মশীল ও সৎকর্মপরায়ণ আল্লাহ তাঁদেরই সঙ্গে রয়েছেন।” ন্যায়বিচার, আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনই পারে শান্তিময় সমাজ কায়েম করতে। মানুষ মেধা বিকাশ, সংরক্ষণ, মূল্যায়ন, বিন্যাস, স্মৃতিচারণ, মুখস্থকরণ, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, আত্মসমালোচনা, অনুশোচনা, আবেগ, বিবেক, হাসি-কান্না, ইশারা অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। যাবতীয় অসাধ্যকে সাধন করতে মানুষ জলে, স্থলে ও আকাশপথের যাত্রী হয়ে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ করতে পারে।
আল্লাহর সৈনিক তথা ইসলামী নেতাদের খাওয়া-দাওয়া, পয়ঃপ্রণালী, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিদ্রা, বৈধ যৌনসম্ভোগ, আনুষ্ঠানিক শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করা পাশাপাশি পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সমাজ-সংগঠন ও রাজনৈতিক নীতি আদর্শের চর্চা করা একটি নিত্যদিনের কাজ। এক্ষেত্রে নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবন-যাপনে খাদ্য, পুষ্টি, পানীয় ওষুধ সেবনে সতর্কতা অবলম্বন করে পরিমিত মাত্রায় গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া নিরাপদ পরিবেশে স্বাস্থ্যসম্মত বায়ুগ্রহণ, শরীরচর্চা করা অত্যাবশ্যক।

আল্লাহর প্রিয় নেতাদের দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, বছর ও যুগের তথা দীর্ঘমেয়াদি ব্যক্তিগত কর্মপরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। এসবের উপরেই জীবনের সফলতা-বিফলতা নির্ভর করে। তবে সাহস, ধৈর্য, প্রচেষ্টা, আত্মবিশ^াস থাকা অত্যাবশ্যক। বেহুদা কাজ বর্জন করে সময় বাঁচানোর পাশাপাশি বিপরীত পরিবেশে প্রতিকূল অবস্থায় অসাধ্যকে সাধন করা অথবা অনিশ্চিত কাজে জড়িয়ে পড়া এক ধরনের বোকামি যা জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তবে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন ও নীতিমালা বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মযজ্ঞে আপসহীনভাবে ব্যক্তিগত মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বিনিয়োগের পাশাপাশি সম্মিলিত আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকা সকল সচেতন নাগরিকের জন্য অপরিহার্য ও অত্যাবশ্যক।
পৃথিবীতে মানুষের বিবেকবোধ সবচেয়ে বড় আদালত। সকল কাজের ক্ষেত্রে বিবেক দিয়ে বিবেচনা করে কোনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটি কম গুরুত্বপূর্ণ এসব পর্যালোচনা করে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে একটি কাজের অজুহাতে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অত্যাবশ্যক কাজকে পরিহার বা এড়িয়ে চলার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। তবে অত্যাবশ্যক কাজের আগে প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ড জরুরি বিষয়। যেমন সালাতের আগে অজু, গোসল, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অত্যাবশ্যক। কাজের আগে, পুষ্টি, সুস্থতা, প্রশিক্ষণ ও উপকরণসহ বিশ্রাম তথা নিরাপদ নিদ্রা এবং উপযুক্ত পরিবেশ অত্যাবশ্যক। এসব না হলে কাজের বাস্তবায়ন অসম্ভব।

আমরা আমাদের জীবনটাকে যদি বিদ্যুতের বাল্ব, শিলাবৃষ্টির বরফের টুকরা, শীতের সকালের শিশির কণা, আকাশের বিদ্যুৎ চমকানো আলোকরশ্মি, বিশাল সাগরে ডুবানো সুচের ডগায় পানির কণা ও হাওয়াই মিঠাই মনে করি তবেই অতি সহজে জীবন বা সময় সম্পর্কে একটি পরিষ্কার দার্শনিক ধারণা অর্জন করা সম্ভব। এতে জীবনের সময় যে কত মূল্যবান এবং তা যে কত দ্রুত কমে যাচ্ছে তা সহজেই অনুমান করা সম্ভব। এক্ষেত্রে জীবনকে জীবন থাকতেই অর্থবহ সার্থক ও মহামূল্যবান জীবন গঠন করা বুদ্ধিমানের কাজ।
পৃথিবীর সকল প্রাণীর চেয়ে মানুষ নামক প্রাণী জন্মের পর সবচেয়ে বেশি অসহায় ও পরনির্ভরশীল। মানুষ গড়ে ষাট বছরের জীবন লাভ করলে বারো বছর বয়সে তার বিবেক বুদ্ধির বিকাশ ঘটে, অন্তত বিশ বছর সময় পরিমাণ ঘুমায়, আর জীবন সায়াহ্নে সাধারণত অবসরে কাটায় আট বছর। এক্ষেত্রে ষাট বছর বয়সের অধিকারী হলেও মূলত মানুষ সচেতন অবস্থায় কর্মময় জীবনের অধিকারী হয় বিশ বছর।
আর অন্যান্য প্রাণী জন্মের পর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই নিরাপত্তা ভারসাম্যতা পরিবেশ ও জীবন ধারণের কলাকৌশল প্রাকৃতিকভাবেই শিখে ফেলে, কিন্তু মানুষ তা পারে না। আবার মানুষ যা পারে অন্যান্য প্রাণী তার ধারে কাছেও নেই। বর্তমান আধুনিক বিশে^ মানুষ তার মেধা অভিজ্ঞতা শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করে বিশ^কে আজ হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। মানুষ আজ চাঁদে বসবাসের কল্পনা করছে। রোবট আবিষ্কার করে মানুষের কর্মক্ষমতার অধিক এবং অসাধ্যকে সাধন করছে।

এই মানুষের জীবনকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপদ ও শান্তিতে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে দুনিয়াকে একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে মূল্যায়ন করে অতুলনীয়ভাবে সাজাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন মহান সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত জীবনব্যবস্থার ঐশীবাণী। এ বাণীর সমষ্টি হলো পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কুরআন। যা সমস্ত জিন ও ইনসানের জন্য একান্তভাবে অনুকরণীয়। এর মূল বিষয়বস্তু হলো মানবতা ও শান্তি। ইনসান, ইনসানিয়াত ও ইনসাফ তথা মানব মানবতা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হলো এ জীবন বিধানের মূল বিষয়। যাঁরা এ বিধান মেনে চলবে তাদের জিন্দেগিটাই কাটে বন্দেগির মাধ্যমে।
এদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তাক্ওয়া বা আল্লাহর নীতিমালা অনুসরণের ভয়। এই মহাগুণ অর্জনই তাঁদের দোজাহানে বিজয়ের অনিবার্য হাতিয়ার ও সফলতার সোপান। এ জন্য দার্শনিকরা বলেন, ইলম তাক্ওয়া ইহ্তেসাব ও তাসকিরায়ে নফস্ অর্থাৎ জ্ঞান, খোদাভীতি, আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধিই হলো আলোকিত পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার মহৌষধ। এর মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিকর্তার প্রিয় সৈনিক ও নেতা হতে সক্ষম। আর এ ধরনের মুমিন মুত্তাকি নেতাদের হাতে বিশে^র শাসনক্ষমতা অবশ্যই একদিন হস্তগত হবে।

এক্ষেত্রে ঈমান, সালাত, সাওম, যাকাত, হজ্জ এর মতো আনুষ্ঠানিক ইবাদতের বুনিয়াদি শিক্ষা তথা পবিত্র কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তা পরিপূর্ণভাবে অনুকরণ বা অনুশীলনের সংগ্রাম অব্যাহত রাখা অত্যাবশ্যক। এমন প্রতিটি মানুষের জীবন অতি মহামূল্যবান সম্পদ। এদের কর্তৃক মানব সম্পদের নিরাপত্তা ও মুখে শান্তির হাসি ফুটানোর জন্য ইসলামের আগমন ঘটেছে। এই হাসি তর্জন গর্জনে ফুটানো সম্ভব নয়। এ জন্য পৃথিবীর কিছু সংখ্যক মানুষকে দুনিয়াতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য জান্নাতের বিনিময়ে নিজ নিজ ব্যক্তিসত্তাকে নিবেদিত করে ইসলামে নেতৃত্বের ও আনুগত্যের শপথ নিতে হয়। যারা এ শপথ নিবেন তাদের উদ্দেশ্যে মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন, “তোমরা পাঁচটি জিনিসকে পাঁচটি জিনিসের আগে গনিমত মনে কর। সেই পাঁচটি জিনিস হচ্ছে: ১. যৌবনকে বার্ধক্য আসার আগে; ২. সুস্থতাকে অসুস্থতার আগে; ৩. প্রাচুর্যতাকে দরিদ্রতা আসার আগে; ৪. অবসর সময়কে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার আগে; ৫. হায়াতকে মওত আসার আগে।”
পৃথিবীতে বিচিত্র মানুষের বসবাস। কেউ কেউ মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী আর অধিকাংশ মানুষই সুস্থ বলে মনে হলেও নানা রকম মেনিয়া, সুরা, সিফিলিস্, সাইকোসিস এবং টিউবারকুলার লক্ষণ বা চরিত্রের অধিকারী। এগুলোর কারণ কখনও জন্মগত, কখনও শিক্ষাগত এবং কখনও পরিবেশগত। মানুষ কখনও স্বনির্ভর হতে পারে না। সর্বজান্তাও হতে পারে না।

মানুষের জীবনে নানা বাঁকে কখনও ¯্রষ্টা কখনও সৃষ্টির সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে। এক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে, “মানুষ মানুষের জন্য-জীবন জীবনের জন্য-একটু সহানুভূতি কী মানুষ পেতে পারে না? ও বন্ধু…।” এই সহানুভূতিটুকুর বিবেকবোধ ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই দুনিয়া জয় করে বিশ^শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক মানুষ আছেন, যারা জীবনে অনেক কিছু অর্জন করেও ডুবে যাওয়া নৌযানের সাঁতার না জানা যাত্রীর ন্যায় নিজ নিজ জীবনের সর্বনাশ ঘটিয়ে থাকেন। পৃথিবীতে যাদের তাক্ওয়া নেই তাদের জীবনের অবস্থাও তেমনি হয়ে থাকে। তাক্ওয়ার এমন শক্তি ও ক্ষমতাগুণ যা দ্বারা পৃথিবীতে, কবরে, হাশরে, মিজানে, পুলসিরাতে, জান্নাতে, জাহান্নামেও এর প্রয়োগ অনিবার্য। “এটিই সেই জান্নাত যার ওয়ারিশ হবে তাঁরাই, যাঁরা মুত্তাকি।” (সূরা মারিয়াম : ৬৩) “যাঁরা তাক্ওয়া অবলম্বন করেছে নিশ্চয়ই তাঁদের জন্য রয়েছে সাফল্য।” (সূরা নাবা : ৩১)

দুনিয়াতে এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের জীবন শরীরটা নানা প্রতিঘাতে রুক্ষ-সূক্ষ্ম খেজুর গাছের ন্যায়। অর্থাৎ কঙ্কালসার খেজুর গাছ যেমন মরুভূমিতে পিপাসার্ত মানুষের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিবারণ করে তেমনি আলোকিত জ্ঞানীরা তাঁদের লেখা বই, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, আলোচনা, জীবনাচরণ, গবেষণা ও অডিও-ভিডিওয়ের সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের আত্মার খোরাক জুগিয়ে বিবেককে শাণিত করে, ফলে সমাজ দিনে দিনে সভ্য হয়। এ ধরনের মানুষ মূলত মোমবাতির মতো নিজেকে জ¦ালিয়ে অন্যদের আলো দান করেন। এ আলোকিত অসাধারণ মানুষ অন্ধকার আকাশের তারকা সদৃশ, যে তারকা দেখে পথহারা নাবিকরা সঠিক পথের সন্ধান লাভ করে সাধারণ যাত্রীদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেন। বিশ্ব আজ এই ধরনের তারকাদের প্রত্যাশায় দিনাতিপাত করছে।
লেখক : জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী

SHARE

Leave a Reply