দিকে দিকে নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহ – আতিকুর রহমান

সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অলিতে গলিতে মুসলমানগণ বিভিন্ন উপায়ে আজ নির্যাতিত হচ্ছে কেউবা হচ্ছে ভিটে-মাটি ছাড়া, কেউবা হচ্ছে দেশ ছাড়া, কেউবা সব থাকা সত্ত্বেও করছেন কারাবরণ। আবার কারো অবস্থা এমন যাকে না বলা যায় কারাবরণ, না বলা যায় দেশ ভিটে-মাটি ছাড়া। তারা নিজ দেশেই এমন এক অসহায় অবস্থায় আছেন যে নিজের দ্বীনকে টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতে নির্যাতিত মুসলমানগণ পাশে পাচ্ছে না কোন সহযোগিতার হাত। মুসলিম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোও যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে। কেউতো আবার নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে জাহির করতে উঠে পড়ে লেগেছে। মুসলিম দেশগুলো নিজেদের মেরুদণ্ড হারিয়ে বসেছে। বুকে তাদের জোর নেই অসহায় ভাইদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। ধীরে ধীরে তাদের শাসনক্ষমতা চলে যাচ্ছে পরাশক্তির হাতে। এ যেন আরেক জাহেলি যুগের সূচনা বা সব যুগের সমাপ্তি লগ্ন শেষ জমানার আলামত।

মগজ ধোলাইয়ের মহড়া
বর্তমান বিশ্বে চীন দেশ একটি বহুল পরিচিত দেশের নাম। সারা বিশ্বব্যাপী তার একচেটিয়া বাণিজ্য। ইলেকট্রনিকসের জগতে চায়না প্রোডাক্টের রাজত্ব। এই প্রতাপশালী দেশে বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আরও বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের পাশাপাশি ইসলাম ধর্মেরও অবস্থান রয়েছে। যদিও তা সংখ্যালঘু পর্যায়ে পড়ে, তারপরও গর্বের বিষয় এই যে, চীনে প্রায় ১৪০০ বছর ধরে ইসলাম ধর্মের অবস্থান।
এই মুসলিম সম্প্রদায়টি উইঘুর নামে পরিচিত। যারা চীনের জিনজিয়াংয়ের অধিবাসী। উইঘুর সম্প্রদায় চীনের ৫৫টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি। এই শান্তিপ্রিয় মুসলিম সম্প্রদায়টি বর্তমানে চীন সরকারের রোষানলে নিষ্পেষিত হচ্ছে। শুধু উইঘুররা নয়, তাদের পাশাপাশি যত মুসলমান চীনে অবস্থান করছে সবাই নির্যাতিত হচ্ছেন। এ এক অভিনব কায়দায় চীন সরকার দেশ থেকে মুসলমানদের তাড়িয়ে না দিয়ে অন্য পন্থা অবলম্বন করছে। তারা মুসলমানদের মন থেকে ইসলাম মুছে দেয়ার জন্য তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং জোরপূর্বক তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলামবিরোধী কাজ করতে বাধ্য করছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তারা এ অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামকে দমনের উদ্দেশ্যে ২০১৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে তারা কার্যক্রম শুরু করে। চীন সরকার তাদের এই কার্যক্রমকে বিশ্বদরবারে স্বেচ্ছাসেবা মূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপন করে এর গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার প্রয়াস চালিয়েছে। তারা বলছে যে এই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় উন্নত জীবনব্যবস্থা ও আর্থিক দিক থেকে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। কিন্তু আদতে ঘটছে একদম অন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। চীন সরকার মূলত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মগজধোলাই করার ষড়যন্ত্র করেছে এবং বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে।
বিবিসি প্যানোরামা (BBC Panorama) নামক প্রোগ্রামে দেখানো হয়েছে কিভাবে মুসলিম অধিবাসীগণকে বন্দী করে রাখা হয়েছে, তাদের নির্যাতন করা হচ্ছে। চীন সরকার পূর্বপরিকল্পিতভাবে তিন বছর যাবৎ এই বন্দিশিবির তৈরি করে। তারা ইসলামকে চরমপন্থা বলে মুসলমানদের মন থেকে ইসলামী শিক্ষা মুছে দেয়ার জন্য পুনঃশিক্ষা ব্যবস্থা করেছে বলে দাবি করে। কিন্তু আদতে তারা যা করছে তাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ নির্দোষ মুসলমানকে কোন রকম আইনি পন্থা ছাড়াই বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাদের উচ্চ পাহারাদারি ব্যবস্থায় আটকে রাখা হচ্ছে। ইলেকট্রিক ব্যাটন হতে পাহারাদার সর্বক্ষণ পাহারারত থাকে। যাতে করে কেউ পালাতে না পারে। কড়া সিসিটিভি নিয়ন্ত্রণে থাকে পুরো বন্দিশিবির। কেউ যে লুকিয়ে একটু নামাজ পড়বে তার কোনো সুযোগ নেই। নামাজরত অবস্থায় কাউকে পেলে তার ওপর নেমে আসে অসহনীয় নির্যাতন। মুসলিম পুরুষদের দাড়ি রাখতে দেয়া হচ্ছে না। তাদেরকে জোর করে হারাম খাওয়ানো হচ্ছে। শূকরের গোশত ইসলামে হারাম, অথচ সেখানে জোরপূর্বক শূকরের গোশত খাওয়ানো হচ্ছে। তাদের মাতৃভাষা বাদ দিয়ে শুধু চীনা ভাষায় কথা বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিদিন সকালে অন্তত ত্রিশ মিনিট ধরে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানো হয়। প্রত্যেককে দিয়ে নিজে নিজের নিন্দামূলক কথা বলা ও লিখতে বাধ্য করা হচ্ছে। বন্দীদের সন্তানদের জোর করে এতিমখানায় পাঠিয়ে দিচ্ছে।
ওমির বেকালি নামক এক ব্যক্তি বলেন, তিনি সেই বন্দিশিবিরে বেশ কয়েক সপ্তাহ কাটিয়েছেন। একে নামে শিক্ষা শিবির বললেও তিনি মানসিকভাবে জর্জরিত। মুসলমানদের মন থেকে ইসলামী চেতনা সম্পূর্ণরূপে মুছে দেয়ার এক সুকৌশলী ব্যবস্থা। ওমির বেকালি বলেন, তিনি কাজাকস্থানে চাকরি করতেন ২০০৬ সাল থেকে। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে যখন ফিরে আসেন, তখন তাকে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে আটক করা হয়। সাত মাস পর তাকে কারামি নামক স্থানের পুনঃশিক্ষা শিবিরে পাঠানো হয়, তাকে সেখানে শিকল দিয়ে রাখা হয়, প্রত্যেক জুমাবার বন্দীদের শূকরের গোশত খেতে বাধ্য করা হতো। তাদের নামাজ পড়া, কুরআন পড়া নিষেধ ছিল। এমনকি দাড়ি রাখতে দেয়া হতো না। কারণ ইসলামী চলনরীতি নাকি চরমপন্থা শিক্ষা দেয়। তাদেরকে জোরপূর্বক চায়না ভাষায় কথা বলানো হতো। যখন মি. বেকালি এই নির্দেশগুলো মানতে অস্বীকার করেন তখন তাকে দেয়ালের দিকে মুখ করিয়ে রেখে পাঁচ ঘণ্টা টানা দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেয়া হতো। তাকে একটি নির্জন কক্ষে একঘরে করে রাখা হয়। ২৪ ঘণ্টা কোনো খাবার দেয়া হয়নি। সাইকোলজিক অত্যাচার ছিল অসহনীয়। নিজের ও নিজের জাতিকে দিনের পর দিন ভর্ৎসনা করানোর মাধ্যমে মানসিক অত্যাচার করা হতো। মি. বেকালি বলেন, তিনি রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেননি। এই মানসিক অত্যাচার এখনো তাকে কষ্ট দিয়ে বেড়ায়।
বন্দীদের দিয়ে কঠিন পরিশ্রমের কাজ করানো হচ্ছে। চীনা সরকারের দাবি এতে করে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব। অথচ এই কায়িকশ্রমে খাটানো লোকদের ভেতর, খুব সফল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী এমনকি বিজ্ঞানী পর্যন্ত রয়েছেন। উইঘুরদের জোরপূর্বক পশ্চিমা চাইনিজ শ্রমবাজারে পাঠানো হচ্ছে। এ যেন জোরপূর্বক দাস প্রথার প্রয়োগ। তাদের নামমাত্র মূল্য দেয়া হচ্ছে যা মোটেই দরিদ্রতা দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়।
উইঘুরদের হজের জন্য পাসপোর্ট, ভিসার অনুমোদন দেয়া হয় না। সবদিক দিয়ে তাদের ইসলাম থেকে দূরে রাখার চেষ্টায় চীনা সরকার যেন সংকল্পবদ্ধ। যেন চীনে কোনোভাবেই ইসলামের অস্তিত্ব না থাকে সেজন্য উইঘুরদের এলাকা জিনজিয়াংয়ের গ্রাম ও শহরগুলোতে সিসি ক্যামেরাসহ প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করে রেখেছে। তাদের পরিচয়পত্র, ছবি, আঙুলের ছাপ উপর্যুপরি চেক করা হচ্ছে। এমনকি তাদের ফোনালাপও ট্র্যাকিং করা হয়। তাদের রোজা রাখতে দেয়া হয় না, মসজিদগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে যাতে কেউ জামাতে নামাজ পড়তে না পারে। সদ্যোজাত শিশুদের কোনো ইসলামী নাম রাখতে দিচ্ছে না। এমনকি হাটে বাজারে হালাল খাবারও দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে। নেতৃত্ব দেয়ার উপযুক্ত লোকদের গুম করে দেয়া হচ্ছে একের পর এক। বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা সেজন্য চায়না সরকারকে অতিদ্রুত এই সব কার্যকলাপ বন্ধের জন্য সতর্ক করলেও দুঃখের বিষয় হলো সব মুসলিম দেশগুলো নীরব। সকলে যেন জিম্মি হয়ে আছে চীনের কাছে। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাহায্য ছাড়া আর কি কোন পথ নেই। তাই আমাদের উচিত মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করা যেন আল্লাহ এই জালিম শাসকদের থেকে মুসলমানদের রেহাই করেন।

সমূলে উৎপাটনের চেষ্টা
মিয়ানমার নামটা বর্তমানে বিশ্বে একটি অত্যন্ত আলোচিত নাম। কারণ তাদের ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ মারার ক্ষমতা আজ সবাই জানে। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর একটি অংশে মুসলমানরাও ছিল। এটি বলার কারণ এখন আর সেই দেশে মুসলমান আছে কি না সন্দেহ। এই হতভাগা জনগোষ্ঠীরও একটি নাম আছে তা হলো রোহিঙ্গা। তারা এখন উদ্বাস্তু। প্রায় পঞ্চাশ বছর হতে চলেছে এই জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগের সময়সীমা, তারা মূলত মিয়ানমারের রাখাইন নামক অঞ্চলে বাস করত। তারা বহু বছর ধরে অত্যাচারিত হচ্ছে নিজ দেশে। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্যসহ সবধরনের মৌলিক অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত রাখা হয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকে শুধু তাদের চিরতরে নিধনের প্রচেষ্টা। ১৯৭৮, ১৯৯১-১৯৯২ সালে তাদের দেশ থেকে সমূলে উৎপাটন করার চেষ্টা করা হয়। তারপর আবার ২০১৬ সাল থেকে শুরু হয় একই ধ্বংসলীলা। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ন্যক্কারজনকভাবে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা ও তাদের অন্যায়ভাবে দেশে থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এই অসহায় মানুষগুলোকে শেষ আশ্রয় হয় প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের কক্সবাজারে। প্রায় ১০ লক্ষ নারী পুরুষ, শিশুবৃদ্ধ পালিয়ে আসে জীবন বাঁচানোর তাগিদে।
গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। স্ত্রীকে তার স্বামীর চোখের সামনে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। বাদ যায়নি ছোট মেয়ে, কিশোরী থেকে বৃদ্ধাও। রোহিঙ্গাদের নারীরা বলেন যে তারা সারা বছর গর্ভধারণ করতেন, কারণ এই অত্যাচারী সরকারের বাহিনী গর্ভবতী নারীদের ছেড়ে দিতো। স্ত্রীর চোখের সামনে স্বামীকে অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। তাদের হাত-পা কেটে ফেলে দিত, চোখ উপড়ে নেয়া হতো, কারও বা লজ্জাস্থান কেটে ফেলে রাখত ধুঁকে ধুঁকে মারা যাওয়ার জন্য। ছোট ছোট শিশুদের মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আছড়ে মারতো। আরও অনেক অবর্ণনীয় অত্যাচারের শিকার তারা এখন চিন্তা করতেই কেঁপে ওঠে, শিউড়ে ওঠে তাদের সারা শরীর, আতঙ্কে ঘুমাতে পারে না।
গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচার জন্য রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশের উখিয়া, টেকনাফে এসে আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নেয়। জীবন নিয়ে পালানোর সময় আরও মারা যায় কত মানুষ। এক অসহায় মা বলেন, জানের ভয়ে সারারাত হেঁটেছি, পালিয়ে বেরিয়েছি আমরা কয়জন। কোলের সোনামানিক আমার সেই রাতে কোলেই মারা যায়। চিৎকার করে কাঁদতে পারিনি জীবনের ভয়ে। বুকে পাথর চাপা দিয়ে সোনাকে আমার নরম কাদামটির নিচে কবর দিয়ে আবার পথ চলা শুরু করি। জানাযার নামাজ পড়ার সময়টুকুও পাওয়া যায়নি। জীবন নিয়ে আশ্রয় শিবিরে এসে আশ্রয় নেয়ার পর স্বামী আমার কাজের খোঁজে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। এখন আমি জংগলে গিয়ে কাঠ কুড়িয়ে খাই। কখনো সপ্তাহে তিনবেলা, কখনো চারবেলা খাবার জোটে কপালে।
আর এক অসহায় নারীর ছবি ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়, তিনি গর্ভবতী ছিলেন। জীবন নিয়ে পালানোর পথে নরম ঘাসের উপরই তার বাচ্চা প্রসব হয়ে যায়। সেই বাচ্চা কোলে নিয়েই আবার অনিশ্চিত যাত্রা শুরু করতে হয় তাকে। এমনই অসংখ্য কঠিন জীবনযুদ্ধের সাক্ষী এই অসহায় জনগোষ্ঠী। একটি ছোট মেয়ের জীবনের অসহায় অবস্থার কথা সে জানায় এভাবে, বাবা তার মাকে মেরে ফেলে তারই চোখের সামনে। ছোট দুই ভাইকে নিয়ে আড়াল থেকে তা দেখে পালিয়ে আসে বাংলাদেশে। এক ভাই হাতেম আর এক ভাই কোলে দুধের শিশু। বড় ভাইটি মারা যায় ক্ষুধায় রোগে ভুগে। যখন ত্রাণ নিয়ে আসে ছোট মানুষ সে পারে না সবার সাথে কোলের ভাইটিকে নিয়ে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে। কেউ দয়া করে একটি রুটি বা ছোট এক প্যাকেট বিস্কুট দিলে রুটিটি নিজে খায় আর বিস্কুট পানিতে গুলিয়ে ভাইকে খাওয়ায়। এমন অনেক ট্র্যাজিক কাহিনী আছে যা শুনলে মর্মপীড়া দেয়। রাতের দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে বারবার।
মিয়ানমার সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের অধিবাসী। অথচ সেই ১৫০০ শতাব্দী থেকে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বসবাস করছে। তাদের নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করার আগেও অনেক ধরনের নিপীড়ন করা হতো। বিয়ে করার জন্য রোহিঙ্গা নারী পুরুষকে সরকারের অনুমতি নিতে হতো। নারীদের মাথায় হিজাব দেয়ার অনুমতি ছিল না। পুরুষদের ক্লিনসেভ হওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। তারা নিজ এলাকার বাইরে যাতায়াত করার জন্যও অনুমতি নিতে হতো। মোট কথা একঘরে করে রাখা হয়েছিল এই জনগোষ্ঠীকে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হয় না। তার বদলে তাদের White Card দেয়া হতো, যা নাগরিকত্বের পরিচয় বহন করতো না। তাদের অস্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করত। এর দ্বারা তারা সীমিত কিছু অধিকার পেত। জীবন ধারণের জন্য সব অধিকার তাদের দেয়া হতো না।
এমনকি তাদের এলাকায় মৌলিক চাহিদার সরঞ্জামও ছিল অপ্রতুল। ২০১৪ সালের আদম শুমারিতে মিয়ানমারের বৌদ্ধরা মুসলিম রোহিঙ্গারা যাতে নিবন্ধন করতে না পারে সে জন্য আন্দোলন শুরু করে। তারা রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত ছিনিয়ে নেয় ২০১৫ সালে। যে সামান্য মৌলিক অধিকার তারা পেত White Card-এর মাধ্যমে তা বাতিল করে দেয়া হয়। কোন মুসলমান সংসদীয় নির্বাচনে দাঁড়াতে পারতো না। অবশেষে তাদের National Verification Card দেয়া হয় যা মূলত তাদের বিদেশী হিসেবে শনাক্ত করে। আসলেই এসবই ছিল তাদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার প্রাথমিক ষড়যন্ত্র। এতকিছুর পরও মিয়ানমার সরকার তাদের মিলিটারি বাহিনী দিয়ে গণহত্যা চালালো নির্বিচারে। এই বাহিনীর নাম হলো ARSA প্রায় ১০ হাজার মানুষ তার প্রথমেই নির্বিচারে মেরে ফেলে। পলায়নপর মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এমনকি তাদের পালানোর পথে সীমান্তে Land miner পুঁতে রাখে। ফলে জান নিয়ে পালাতে গিয়েও প্রাণ হারিয়েছে শত শত মানুষ।
যারা পালিয়ে বাঁচতে পেরেছে তার সিংহভাগ লোক বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বাকিরা মালয়েশিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমার সরকার প্রধান অং সান সু চি যে কিনা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী, তার হাতেই খড়গ উঠেছে এই মুসলিম জনগোষ্ঠী নিধনে। সে আন্তর্জাতিক আদালতের জবাবদিহিতার মুখে বারবার অস্বীকার করেছে এই ন্যক্কারজনক কাজের দায়ভার নিতে। এমনকি সে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে অসম্মতি জানাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা সহ আরও অনেক সংস্থা মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ করে তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য চাপ দিলেও পরিস্থিতির কোনো উল্লেখজনক কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

নাগরিকত্ব হনন
ভারত বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন খুব শক্তিশালী একটি দেশ। খেলাধুলা, মিডিয়া, বাণিজ্য সর্বক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য অবস্থান বিশ্বের বুকে। এই দেশটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার দেশ। কিন্তু এখানে আরও অনেক ধর্ম বিশ্বাসের জনগোষ্ঠী আছে। ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যালঘু হিসেবে অবস্থান করছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা ২০০ মিলিয়ন এর কম না। এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার আজ হুমকির মুখে। ভারত সরকার তাদের দেশ থেকে তাড়ানোর এক ভদ্র উপায় বের করেছে। তারা নাগরিকত্ব সংশোধনীমূলক বিল পাস করাচ্ছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে তারা তাদের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীকে রক্ষার জন্য এই কাজ করেছে। বিলের মূল কথা হলো “হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, ফারসি এবং খ্রিষ্টান যারা আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছে তাদের অবৈধ হিসেবে ধরা হবে না। এবং নাগরিকত্ব দেয়া হবে।” একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এই তালিকায় মুসলিম নামটি নেই। ভারত সরকার মুসলমানদের দেশ থেকে তাড়ানোর জন্য এ এক অভিনব পন্থা গ্রহণ করেছে। যে দেশে এক সময় মুসলিম শাসন ছিল, যে দেশের মোড়ে মোড়ে মুসলমানদের স্থাপনা এখনো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের টেনে আনে। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি তাজমহল, যা কিনা মুসলমানদের হাতে তৈরি, সেই দেশের সরকার এখন মুসলমানদের দেশচ্যুত করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে।
এই উত্থাপিত বিলটি সংক্ষেপে CAB নামে পরিচিত (Citizenship Amendment Bill) যা কিনা NRC (National Register of Citizens) এর সাথে সম্পৃক্ত। এই লিস্টের মাধ্যমে ভারত সরকার মুসলমানদের অস্তিত্ব ভারত থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছে। NRC এর লিস্টটি আগস্ট ২০১৯ এ প্রকাশিত হয়। এই তালিকায় মুসলমানসহ কিছু হিন্দুর নাম বাদ পড়ে। সরকার তাদের নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে বলেছে এই সময়ের ভিতর তারা যদি নাগরিকত্বে প্রমাণ দিতে না পারে তবে তাদের বন্দিশিবিরে পাঠিয়ে দেয়া হবে এবং অতিসত্বর দেশ থেকে বের করে দেয়া হবে। অথচ মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এ মানুষগুলো না আছে জন্মনিবন্ধন পত্র, না অন্য কোন দাপ্তরিক কাগজপত্র। এমনকি যাদের আছে তাদের অধিকাংশ নিরক্ষর। এমন অসহায় জনগণের সাথে এ সময়সীমা বেঁধে দেয়া যেন নিতান্তই তাদের পরিহাস করা এবং পূর্বপরিকল্পিত চক্রান্ত। ভারত সরকার এখন থেকেই সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছে। তারা ১০টি বিশাল এলাকা সমৃদ্ধ বন্দিশিবির নির্মাণ করেছে। প্রথমটির আকৃতি সাতটি ফুটবল মাঠের সমান। তারা দুগ্ধপোষ্য শিশু থেকে শুরু করে কাউকেই রেহাই দেবে না। গণহারে সবাইকে বন্দী করে রাখবে।
ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠী এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে মাঠে নামলে তাদের ওপর পুলিশ মোতায়েন করা হয়, নির্বাচারে আহত, নিহত করা হয় বিক্ষোভরত ছাত্রসহ সাধারণ জনতাকে। ভারত সরকার দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের সুযোগ দেয় না। নিজ নিজ ধর্মপালনেও বাধা প্রদান করে। ধর্মীয় রীতি হিসেবে কোরবানি দেয়াকে ভারতীয় চরমপন্থী হিন্দুরা অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করে নিজেরাই দল বেঁধে মুসলমানদের জবাই দিত। এর জন্য কোন উল্লেখজনক আইনি ব্যবস্থাও নেয়া হতো না। নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ছিল না মুসলমানদের। যখন তখন গণহত্যা চালায় মুসলমানদের ওপর। (মসজিদ ভাঙা হয়েছে, যারাই বাধা দিতে চেয়েছে তাদের মেরে ফেলা হয়েছে) আর তাদের এই ষড়যন্ত্র সফল হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ন্যক্কারজনক ঘটনায় পরিণত হবে। প্রতিবেশী দেশগুলো সম্প্রতি মিয়ানমারের গণহত্যার দরুন পালিয়ে আসা মানুষদের আশ্রয় দিয়েছে বিধায় তারা ভারত থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করা হলে তাদের আশ্রয় দিতে পারবে না এই মর্মে সকলে মতামত দিচ্ছে। তখন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকবে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই অবস্থায় পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও এই ধ্বংসলীলা ঠেকানো কতটুকু সম্ভব হবে তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

চীন সরকার তার মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর অত্যাচারের পিছনে কারণ দর্শন করছে এই বলে যে তারা ধর্মীয় চরমপন্থীদের প্রতিহত করতে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটন করতে চাইছে তারা। মিয়ানমার সরকার তাদের এই গণহত্যার পিছনেও ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করেছে। আর ভারত তার বর্তমান পদক্ষেপের পিছনে ধর্মনিরপেক্ষতাকে হাতিয়ার বানিয়েছে। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সবাই কিন্তু ইসলাম ধর্মকে টার্গেট করে, ইসলাকে মানুষের মন থেকে দূর করার জন্য নিজেরাই এক জঘন্য সন্ত্রাবাদের রচনা করেছে। অন্য কোন ধর্মকে তারা টার্গেট করেনি। যেই মুসলমান একসময় অর্থজাহান শাসন করেছে, তারাই আজ বিশ্বের বুকে নিঃগৃহীত, নির্যাতিত। তাদেরই নিশ্চিহ্ন করার জন্য একের পর এক গণহত্যার ষড়যন্ত্র হচ্ছে ও তা কার্যকর করা হচ্ছে।
আমরা মুসলমান নিজের দ্বীন ভুলে অন্যের দ্বীন নিয়ে ব্যস্ত। অন্য ধর্মের আচার ব্যবহার অনুসরণ করে আমরা নিজেদের আধুনিক মনে করি। নিজের দ্বীন পালনে আমাদের যত অনীহা। আমরা কুরআনকে পরিষ্কার কাপড়ে মোড়ে ঘরে উঁচু কোনো জায়গায় ফেলে রাখি। এই কুরআনকে পুঁজি বানিয়ে একসময় আমাদের পূর্বসূরিগণ বিশ্বজয় করে বেড়িয়েছে। আর আমরা আজ বিশ্বেও ক্ষমতাসীনদের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে রেখেছে অথচ আমরা ভুলপথে হেঁটে ফিরছি। মহান আল্লাহ আমাদের বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করুন এবং আমাদের সকলকে হেদায়েত দান করুন। আমিন।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply