দুই পরাশক্তির নজরে বাংলাদেশ একক নির্ভরতা কমানোর মধ্যেই কল্যাণ – মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

কূটনীতির ভাষায় স্থায়ী শত্রুতা বা স্থায়ী বন্ধুত্ব বলে কিছু নেই। কখনো কাউকে চিরস্থায়ী বন্ধু মনে করে সব ব্যাপারে তার ওপর নির্ভরতাকে কখনোই দক্ষ কূটনীতি বলা যায় না। একইভাবে কাউকে শত্রু জ্ঞান করে সব সময় তার সাথে যুদ্ধাবস্থা বজায় রাখাও অপরিপক্ব পররাষ্ট্রনীতিরই পরিচায়ক। ভারত ও চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের হিসাব-নিকাশ কষতে গিয়ে এই বাস্তবতার সাথেই যেন প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে আবেগের জায়গা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে একটু ঘাঁটলেই বিষয়টি পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। একাত্তরে বাংলাদেশকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছিল ভারত। আর সে কারণে আজও ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষ কৃতজ্ঞ। তবে, ভারত তার নিজের স্বার্থে দুই পাকিস্তানকে ভাগ করে দিয়ে অখণ্ড পাকিস্তানকে দুর্বল করে দেয়ার জন্যই যে সেদিন বাংলাদেশ বা তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছিল তা এক ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু সেই পটভূমির চেয়েও বাংলাদেশের মানুষের কাছে বড় হচ্ছে ভারতের সহায়তায় তারা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ পেয়েছেন, পেয়েছেন লাল-সবুজের পতাকা এবং মায়ের ভাষা বাংলার পূর্ণ অধিকার। তাই বাংলাদেশের মানুষ সব সময়ই ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ, ভারতকে বন্ধু ভাবতে চায় সারাজীবন।
এবার আসা যাক চীন প্রসঙ্গে। একাত্তরে চীন সর্বান্তকরণে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করেছিল। সেদিন পাকিস্তানের পাশে চীন না থাকলে বাংলাদেশে যে হত্যাযজ্ঞ পাক হানাদার বাহিনী চালিয়েছিল তা হয়তো এতদূর গড়াতে পারতো না। খুব সম্ভবত পাকিস্তানি বাহিনী অনেক আগেই একটি সমঝোতায় পৌঁছতো। দীর্ঘ নয় মাসের লোমহর্ষক যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস রচিত হতো না। চীনের সেই ভূমিকার জন্য স্বাভাবিকভাবেই সেদিন চীনকে বাংলাদেশের জাতশত্রুই মনে হয়েছিল। এই চীন কোনদিন বাংলাদেশের বন্ধু হতে পারবে সেটা হয়তো সেদিনের বাস্তবতায় অনেকের কল্পনারও বাইরে ছিল।
স্বাধীনতার পর বিগত ৪৫ বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে এবার একটু দৃষ্টিপাত করা যাক। আমরা কী দেখতে পাই? ভারত একের পর এক বাংলাদেশের ক্ষতি করে গেছে। ভারতের আগ্রাসনের মাত্রা দিনকে দিন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফারাক্কা বাঁধের মতো মারণফাঁদ নির্মাণ করে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে রীতিমতো মরুভূমি বানানোর কাজ এরই মধ্যে ভারত অনেকখানি সম্পন্ন করে ফেলেছে। শুধু পদ্মার বুক চিরে ফারাক্কাই নয়, একে একে ভারত ৫৪টি মতান্তরে ৫৩টি অভিন্ন নদীতে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিই যেন ধ্বংস করে দিয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশ যেন আজ ধু ধু বালুচর।
সীমান্ত হত্যা, পাটশিল্প ধ্বংস, গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের নীলনকশা প্রণয়ন, যুবসমাজকে ধ্বংস করতে সীমান্ত পথে নেশাজাতীয় দ্রব্য পাচার, মানুষের জীবনীশক্তি ও মেধা ধ্বংসে ভেজাল ওষুধ ও খাবার পাচার-এমন হাজারো আগ্রাসী তৎপরতা চালাচ্ছে ভারত। পরকীয়া ও নষ্টামিতে পরিপূর্ণ বস্তাপচা হিন্দি ও বাংলা সিরিয়াল দিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে নারীসমাজ ও উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের। এত কিছুর পরও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ যদিও সেই মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকারই করে না ভারত। তাদের ভাষায় সেটা ছিল পাক-ভারত যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে ভারত জিতেছিল।
উপরে বর্ণিত প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে জোরালো প্রমাণ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ গত ১২ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত ‘পাটের ওপর ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক’Ñ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা হুবহু তুলে ধরছি:
“ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যবৈষম্য ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। বৈষম্য কমিয়ে বাণিজ্যকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে বাংলাদেশের তরফ থেকে তাগিদ থাকলেও ভারতের অবস্থান বরং বিপরীত। গত অর্থবছরে (২০১৫-২০১৬) বাংলাদেশ ভারত থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি করলেও বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি ডলারের পণ্য। এর মধ্যে কাঁচাপাটের মত ট্র্যাডিশনাল পণ্যের অবদান অর্ধেকের বেশি। আন্তর্জাতিক বাজার ও উৎপাদন সক্ষমতা হারিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভারতে অনেকগুলো বড় পাটকল গড়ে উঠেছে এবং পাটের আন্তর্জাতিক বাজারও এখন ভারতের হাতে।
বাংলাদেশের পাটশিল্প তার আন্তর্জাতিক বাজার ও ঐতিহ্য হারানোর সুযোগ গ্রহণ করেছে ভারত। সেই সাথে বাংলাদেশের কাঁচাপাট, পাটের সুতা এবং পাটজাত পণ্যের অন্যতম ক্রেতাও ভারত। আমাদের ভারতনির্ভর পাটশিল্প আবারো বড় ধরনের ধাক্কা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্যবৈষম্য ইত্যাদি বিষয়গুলো বাদ দিলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কনভেনশন ও বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে, কোন নির্দেশনা ছাড়াই হঠাৎ করে ভারত বাংলাদেশের পাটপণ্যের ওপর উচ্চ হারের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে দেশের পাটশিল্প এবং পাটচাষিদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অ্যান্টি ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এক ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য। বাংলাদেশ ও ভারত ডব্লিউটিওর সদস্যরাষ্ট্র হওয়ায় যথাযথপ্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ভারতের জন্য বৈধ নয়, শোভনীয়ও নয়।”
গত ১১ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে “ভারত থেকে আসছে নিম্নমানের মাছ ও শুঁটকি : ক্রেতারা ঠকছেন”-এই শিরোনামে দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত ও মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের নাজিরহাট শুঁটকিমহালে আসছে নিম্নমানের এসব মাছ। পরে এগুলোতে বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো হয়।”
বাংলাদেশের ওপর ভারতের অনৈতিক আচরণের বিষয়টি খোদ ভারতের গণমাধ্যমেও অনেকবার ফুটে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ ২০১৬ সালের ৬ মে ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারে “বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ভোগ করছে ভারত, আমেরিকাও”- শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা হুবহু তুলে ধরছি:
“দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪৯ হাজার ১৩ কোটি ডলার। পরিমাণটা কি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার মতো? টাকাটা কোথায় কিভাবে খরচ হলো সেটাও তো দেখা দরকার। সব রফতানিকারক সংস্থাই যে এ কাজ করছে এমন তো নয়। অপরাধীদের জেরা করলেই জানা যাবে কোন দেশে কত টাকা যাচ্ছে। কী কাজে লাগছে। বাংলাদেশের ঊর্ধ্বমুখী অর্থনীতিকে টান মেরে নিচে নামানোর চেয়ে জঘন্য কাজ আর কী হতে পারে। যাদের জেলখানার ভেতরে থাকার কথা, তারা বাইরে ঘুরে বেড়ায় কী করে!”
সবচেয়ে মজার ও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো বাংলাদেশের ক্ষতিসাধনে ভারত তার নিজ ধর্মীয় বিধানের প্রতিও কোন তোয়াক্কা করছে না। গত ৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং জুরিসপ্রুডেন্স ও ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল ল-এর অধ্যাপক ড. মাইমুল আহসান খানের সঙ্গে। তিনি আলাপের এক পর্যায়ে বললেন, খোদ ভারতীয় দর্শনেই এটা একটা বড় অপরাধ।
অধ্যাপক মাইমুল বলেন, ভারতের চানক্য আইন ও মানু আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে একজন ব্রাহ্মণ কোন কিছুর ওপরই কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। সেটা হোক পানি, হোক বাতাস বা অন্য কিছু। যদি কেউ এমনটা করে তাকে বলো সে যেন মন্দিরে না আসে। কারণ সে নাপাক (অপবিত্র)। তার মানে হলো পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলে হিন্দুদের সর্বোচ্চ জাত ব্রাহ্মণ পর্যন্ত নাপাক বা অপবিত্র হয়ে যায়। তাই ফারাক্কা বাঁধসহ কোন বাঁধ দেয়ার ন্যূনতম অধিকার নেই ভারতের। কিন্তু বাংলাদেশের দ্বিধাবিভক্ত ও সঙ্কীর্ণ রাজনীতিবিদরা এ বিষয়ে ভারতের ওপর কখনই কোন কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারেননি, অদূর ভবিষ্যতেও পারবেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
এবার একটু নজর দেয়া যাক চীনের দিকে। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে চীনের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও আমলারা হর-হামেশা বলতেন আমরা কখনোই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হবো না। আমরা তো আমেরিকার অর্থনীতির মাত্র এক-দশমাংস বা দশ ভাগের একভাগ। আর জাপান হচ্ছে আমেরিকার অর্থনীতির অর্ধেক। ভবিষ্যতে আমাদের যদি কম্পিটিশন (প্রতিযোগিতা) হয় তাহলে খুব বেশি হলে তা জাপানের সাথে হলেও হতে পারে। অথচ সেই চীনই অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি হতে যাচ্ছে বলেই আজ অভিমত আসছে বিশ্বের সব মহল থেকে, প্রায় সমস্ত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছ থেকে।
আর বাংলাদেশকে এখন চীন যে সহায়তা দিচ্ছে তা রীতিমতো এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করছে। বিগত ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, রেলওয়ে ও বিদ্যুৎ খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সেক্টরে ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের ২৬টি নানা ধরনের ঋণ সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় দুই দেশের মধ্যে যা এক নতুন রেকর্ড। অথচ এর মাত্র এক বছর আগে ২০১৫ সালের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় ভারত মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও সহায়তা চুক্তি করে বাংলাদেশের সাথে, যা কিনা আবার নানা ভারতীয় স্বার্থের কূটচক্রে বাঁধা। কিন্তু চীনের ২৪ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্যাকেজের সামনে রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়ে ভারতের ২ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ।
যদিও কূটনীতিবিদদের মতে, আসল বাস্তবতা হলো ভারত ও চীনের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। তাই আসছে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তির পথে দ্রুত ধাবমান চীন স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটি চমৎকার কৌশলগত অবস্থানে থাকা বাংলাদেশকে বোঝাতে চাইবে ভারতের ২ বিলিয়ন ডলার কিছুই না। আমি তোমাকে দেবো, তুমি কত চাও- ২৪ বিলিয়ন, ৪০ বিলিয়ন, ৬০ বিলিয়ন? এটা এক ধরনের প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশ সফর শেষে চীনের রাষ্ট্রপতির ভারত সফরে দেশটি তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গেও ১০ বিলিয়ন ডলারের একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। অপরদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার এবং মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম দেশ পাকিস্তানের সঙ্গেও চীন এরই মধ্যে ৪০ বিলিয়ন ডলারের ঋণসহায়তা চুক্তি করেছে। যদিও পাকিস্তান ৫ বিলিয়ন ডলারও খরচ করতে পারেনি বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়। প্রকৃত অর্থে চীনের এইসব অর্থলগ্নি এক ধরনের বিনিয়োগ যার ফল সে সুদে-আসলে ফেরত পাবে।
অধ্যাপক মাইমুলের ভাষায়, চীনের বর্তমান অর্থনীতি রীতিমতো এক মিরাকল। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছরে চীনে সিমেন্ট ও রডসহ এই জাতীয় জিনিস যে পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে বিগত ১০০ বছরেও আমেরিকায় তা হয়নি। এ থেকেই চীনের উন্নয়ন কাজের ধারণা পাওয়া যায়। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১২৮ কোটি মানুষ রয়েছেন যা আমেরিকার মোট জনসংখ্যার তিন গুণেরও বেশি। আমেরিকা, কানাডা ও গোটা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মিলে যে পরিমাণ বিদেশী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করছে তার থেকে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিচ্ছে চীন একাই শুধু চীনা ভাষা শেখার শর্তে। তিন কোটিরও বেশি চীনা নাগরিক বর্তমানে ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারছেন। পর্যটন খাতেও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে চীন।
বিগত ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বহরে ২০ কোটি ৩৩ লাখ ডলার বা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার চীনের তৈরি দুটি সাবমেরিন ক্রয়ের চুক্তি হয় যা টর্পেডো ও মাইন দ্বারা সুসজ্জিত এবং শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও ডুবোজাহাজে আক্রমণ করতে সক্ষম। এ ঘটনায় নতুন করে টনক নড়ে নয়াদিল্লির। সবশেষ গত ৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে আমদানিকৃত তেল সহজে ও কম খরচে পরিবহনের জন্য সাগরের নিচ দিয়ে ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন ও সাগরে তেলবাহী জাহাজ নোঙরের মুরিং বা ঘাট নির্মাণের জন্য চীনের পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ব্যুরো-সিপিপিবির সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫,৪২৬ কোটি টাকা যার বশির ভাগ অর্থাৎ ৪,২৯৩ কোটি টাকার জোগান দেবে চীন। আগামী ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কার্যক্রম চালু করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যদিও চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন এই মাইলফলককে খুবই নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে ভারত। নানাভাবে ভারত তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে যা দেশটির গণমাধ্যমের খবরেও উঠে এসেছে। তবে, চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন কেনাসহ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশের এখন আর না করার উপায় নেই। তাতে ভারতের প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন। বাংলাদেশ যদি আজ বলে আমরা সাবমেরিন কিনবো না, তো কাল চীন বলবে পদ্মা সেতুতে আমরা আর কাজ করবো না। চলমান অন্যান্য প্রকল্পেও আমরা আর কাজ করবো না। এটা বাংলাদেশকে সব সময় মাথায় রাখতে হবে।
চীন বাংলাদেশকে যেসব প্রস্তাব দিয়েছে সম্প্রতি তার মধ্যে রয়েছে ঢাকা থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত বুলেট ট্রেন সংযোগ লাইন স্থাপন। এতে করে ঢাকা থেকে যে কেউ চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কুনমিং যেতে পারবেন মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে, বড়জোর তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। অথচ আমাদেরকে ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতেও তিন ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। এটা হলে যে কেউ কম খরচে চীনে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা সেবা নিতে পারবেন। তাদের (চীনের) ভাবনা থাকতে পারে কেন বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করেন, চীনের হাসপাতালে কেন নয়। চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, তাই এমনটা ভাবা তাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক।
অধ্যাপক মাইমুলকে প্রশ্ন করেছিলাম, কিন্তু এই ধরনের যে কোন প্রকল্পে ভারতের পক্ষ থেকে যে বাধার সৃষ্টি হবে তা উপেক্ষা করার সাধ্য কি বাংলাদেশের আছে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে এ ধরনের বাধায় বেশি কিছু হয় না। আফগানিস্তানের ওপর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেছিল। কিন্তু তাতে শেষ পর্যন্ত কিছু হয়নি। পরে আমেরিকা এসেও একই ধরনের নানা চাপ সৃষ্টি করছে। এটা আসলে সংশ্লিষ্ট দেশের চলমান বাস্তবতার ওপর অনেকখানি নির্ভর করে। মালয়েশিয়ার কথাই ভাবুন, অনেকেই চাননি মালয়েশিয়া উন্নতি করুক, কিন্তু তাতে আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক মাহাথির মোহাম্মদকে দমিয়ে রাখা যায়নি, আটকানো যায়নি মালয়েশিয়ার উন্নয়নের গতি। বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে চিন্তা-ভাবনা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং চাপ মোকাবেলার সাহস রাখতে হবে। শুধু ভারতনির্ভরতা ও ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ভারত-তোয়াজ নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। আবার অকারণে ভারতকে রাগিয়ে তোলারও দরকার নেই। চীনকেও মাথায় নিয়ে নাচার আবশ্যকতা নেই কিংবা একাত্তরের কথা তুলে চীনকে দূরে সরিয়ে দেয়ারও যৌক্তিকতা নেই এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে অন্তত নেই। সেই শুরুর কথা দিয়েই শেষ করতে চাই- কূটনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রুতা বা মিত্রতা বলে কিছু নেই।
লেখক : সাংবাদিক

SHARE