দুর্নীতিতে ডুবল পদ্মাসেতু

রাফিউল ইসলাম

দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু প্রকল্পে ঋণচুক্তি বাতিলের পর জাইকা, এডিবি এবং আইডিবি তাদের ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। বিশ্বব্যাংক তাদের চুক্তি বাতিলের পরও সরকার বলছে পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়নি। আসলে ব্যাপারটা কী? হ্যাঁ, পদ্মাসেতুতে যে দুর্নীতি হয়েছে এটা কেবল বিশ্বব্যাংক একাই বলেনি। পদ্মাসেতু সংক্রান্ত কাজ দেয়ার যে পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া সেসব বিষয় নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে, পদ্মাসেতুতে দুর্নীতির ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক যে একপেশে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এ কথা বলার কোনো অবকাশ নেই। আর এ ব্যাপারে সরকারের বিরোধিতা করার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। সরকার নিজেই বিশ্বব্যাংকের অভিযোগগুলো নিয়ে শক্ত অবস্থান নিতে পারতো। একটা তদন্ত করতে পারত এবং নিরপেক্ষ একটা জায়গায় থেকে প্রমাণ করে দেখাতে পারতো যে দুর্নীতি হয়নি। কিন্তু তা না করে দুর্নীতি হয়নি এ কথাটা একটা রাজনৈতিক জায়গায় থেকে বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যান করা হলে দু’তিনটা জায়গা থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং সরকারকে অভিযুক্ত করা যেতে পারে। প্রথমত যখন এ ধরনের দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠে তখন দেশের সার্বিক ভাবমর্যাদা রক্ষার জন্য হলেও একটা নিরপেক্ষ তদন্তের দিকে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা সরকারের ওপর বর্তায়। কিন্তু সরকার সে দিকে যায়নি। দ্বিতীয়ত যে বিষয়টা এখানে আসতে পারে সেটি হচ্ছে- বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে যেভাবে ট্রিট করেছে অর্থাৎ অতি সহজে একটি চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে, সেটি ভারত বা অন্য কোনো শক্তিশালী দেশ হলে এটা করতে পারতো না। কারণ এটা এক গুরুতর বিষয়। ফলে, এখানে যে জিনিসটি প্রমাণিত হয় তাহলো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল। আর তৃতীয়ত কেবল পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে এমন অভিযোগ নয়। বিদ্যুৎ ইস্যুতে বিভিন্ন রেন্টাল পাওয়ার কোম্পানির সঙ্গে সরকার যে চুক্তিগুলো করেছে সেক্ষেত্রে আইন করে সরকার দুর্নীতি করেছে। অর্থাৎ, এসব চুক্তির ক্ষেত্রে সরকার কোনো টেন্ডার ছাড়াই চুক্তি করেছে। ফলে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রমাণ রেখেছে যে, তারা দুর্নীতিগ্রস্ত। দুর্নীতি করার জন্য যদি কোনো সরকার আইন করে আইন বদলায় তাহলে তা সত্যিই অস্বাভাবিক ঘটনা। ফলে, স্বভাবতই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংক একটি বিশেষ ধরনের অর্থ-লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান। সংস্থাটি মুনাফা অর্জনের জন্য বিশেষ ধরনের কিছু শর্ত চাপিয়ে দেয়। বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক অর্থ-তহবিলের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ শর্তারোপ করা হয়ে থাকে। কিন্তু, বিনা কারণে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলবে এবং ঋণচুক্তি বাতিল করবে এটা নিঃসন্দেহে হতে পারে না। বিশ্বব্যাংক কেন বিনা কারণে এ অভিযোগ তুলবে! বিশ্বব্যাংক যখন দুর্নীতির কথা বলছে সেটা অবশ্যই গুরুতর একটা বিষয়। কারণ বিশ্বব্যাংক কেবল যে মুনাফা অর্জন করতে চায় শুধু তাই নয় তার সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থও সে চায়

নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস

তারপরও এটা নিঃসন্দেহ যে, বাংলাদেশ সরকার দুর্নীতি করেছে পদ্মা সেতুর বিষয়ে। আর দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাংক সমস্ত প্রমাণ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের কাছে।  বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ও প্রমাণ দেয়ার পরও সরকার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বলেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করেছে। ফলে, এটা অত্যন্ত গুরুতর একটা অভিযোগ। সরকার শুধু মুখে বললেই হবে না-এটার সাথে পুরো রাষ্ট্রের স্বার্থ, বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া, এর সাথে দেশের যে ভাবমর্যাদা জড়িত তা বর্তমান সরকার নষ্ট করেছে। এটাকে শুধু কেলেঙ্কারি বলা যাবে না এটা একটা গুরুতর রাজনৈতিক ও নৈতিক অপরাধও বটে।
একটি স্মরণীয় ইতিহাস!
বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে বিবেচিত হবে গত ৩০ জুন। স্মরণীয় দিন সাধারণত ভালো অর্থেই বিবেচিত হয়ে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, এখানে তা হয়েছে খারাপ অর্থে। কলঙ্কজনক দিন বললেও খুব একটা বেশি বলা হবে না। এই দিন বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ শুনল পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বিশ্বব্যাংক। বাতিল করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ঋণচুক্তি। সংস্থাটির ওয়াশিংটন সদর দফতর থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে বেশ কঠোর ভাষায় চুক্তি বাতিলের ঘোষণাটি দেয়া হয়। বলা হয়, ‘পদ্মা বহুমুখী সেতুর ব্যাপারে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা, এসএনসি লাভালিনের (কানাডিয়ান পরামর্শক ফার্ম) কর্মকর্তা এবং বেসরকারি পর্যায়ে ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিমূলক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্বব্যাংকের কাছে রয়েছে।’ বিশ্বব্যাংকের বিবৃতিতে বলা হয়, এ ব্যাপারে সরকারকে জানানোও হয়েছিল। কিন্তু ‘বাংলাদেশ সরকার থেকে পর্যাপ্ত বা ইতিবাচক সাড়া না মেলায় বিশ্বব্যাংক পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সহায়তা ১২০ কোটি ডলার ঋণ বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।’ এ ঘোষণার ফলে পুরো পদ্মা সেতু প্রকল্পটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার পথে চলে গেল।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে বিশ্বব্যাংকের বিবৃতির এক জায়গায়  উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ঘটনায় চোখ বুজে থাকতে পারে না, তা উচিত নয় এবং থাকবেও না। আমাদের শেয়ারহোল্ডার ও আইডিএ দাতাগুলোর প্রতি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং সুষ্ঠু আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দায়িত্ব রয়েছে। এটি নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব যে, আইডিএ সম্পদ কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কেবল তখনই একটি প্রকল্পে আমরা অর্থায়ন করব যখন আমরা যথেষ্ট নিশ্চয়তা পাব যে প্রকল্পটি পরিষ্কার ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হবে।’
চুক্তি হয়েছিল ২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে সেতু নির্মাণ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি ১২০ কোটি ডলার দেবে। বাকি ৪০ কোটি ডলার করে দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানি সংস্থা জাইকা। বাকি ১৪ কোটি ডলার প্রদান করবে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)। সেই অনুযায়ী কাজও অনেকখানি এগিয়েছিল। সেতু নির্মাণের জায়গা অধিগ্রহণ ও মানুষজনকে পুনর্বাসনের জন্য ব্যয় করা হয়েছিল ১৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু হুট করেই বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় পদ্মা সেতু নির্মাণের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে প্রাক-যোগ্যতা বাছাইয়ের সময়ে ঘুষ চাওয়া হয়েছে। প্রথমে অভিযোগ, পরে তথ্য-প্রমাণ হাজির করা হয় সরকারের সামনে। বলা হয়, কানাডিয়ান নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘এসএনসি লাভালিন’কে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য বাংলাদেশের অন্তত তিনজন ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ  থেকে ঘুষ চাওয়া হয়েছিল।
এই প্রতিষ্ঠান ছিল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সাকো ইন্টারন্যাশনাল। আর যে তিন ব্যক্তির নামে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল তারা হলেন, সাবেক যোগযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ  হোসেন ভূঁইয়া (বর্তমানে যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত) এবং পদ্মা সেতু প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) রফিকুল ইসলাম। বিশ্বব্যাংকের পরে চিঠিগুলোতে দুর্নীতির সাথে আরো কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও অন্যান্য ব্যক্তির নাম এসেছে বলে স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী।
ঘটনার সূত্রপাত
গত সেপ্টেম্বরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যান ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় যোগ দিতে। পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে করা একটি তদন্ত প্রতিবেদন গত ২১ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে অর্থমন্ত্রীকে দেয়া হয়। অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিবেদনটি দেন বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্ট লিওনার্দ এফ ম্যাকার্থি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সেতুর মূল অংশের প্রাক-যোগ্যতা চুক্তির সময়কালে দুর্নীতিসংক্রান্ত অসংখ্য অভিযোগ পেয়েছে বিশ্বব্যাংক। অভিযোগগুলো মূলত তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও তার মালিকানাধীন কোম্পানি সাকোর শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। যোগাযোগমন্ত্রীর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যোগাযোগমন্ত্রী ও সাকোর কর্মকর্তারা মিলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে মনে হচ্ছে, সাকো হলো পদ্মা সেতু নির্মাণের যেকোনো কাজ পাইয়ে দেয়ার ব্যাপারে একধরনের নীরব প্রতিনিধি (সাইলেন্ট এজেন্ট)। কোনো কাজ পেতে হলে বা প্রাক-যোগ্যতায় টিকতে হলে সাকোকে অর্থ দিতে হবে। সাকোর পক্ষ থেকে ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সাকোরই একজন প্রতিনিধি বিশ্বব্যাংককে জানান, পদ্মা সেতুর মূল অংশের জন্য যে চুক্তি মূল্য হবে, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ সাকোর জন্য রাখার ব্যাপারে সৈয়দ আবুল হোসেনেরই নির্দেশনা ছিল। বলা হয়, সাকোকে নির্দিষ্ট কমিশন দেয়া হলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কাজটি পাইয়ে দেয়ার ব্যাপারে সাহায্য করবেন সৈয়দ আবুল হোসেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আরেকটি সূত্র থেকে বিশ্বব্যাংক যোগাযোগমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরো অভিযোগের কথা জানতে পারে। সেটি হলো, সাকোর পাশাপাশি অন্য একটি কোম্পানিকেও সাকোর হয়ে কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন আবুল হোসেন। কোম্পানিটির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ভয়ভীতিও দেখান মন্ত্রী। সৈয়দ আবুল হোসেন ও সাকোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির আরো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ বিশ্বব্যাংক পেয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।


দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান

এ ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর সেতু বিভাগের সচিব ও প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দেয়া হয়। আর  সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরিয়ে করা হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দাবি করে, তারা তদন্ত করে মন্ত্রীর দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পায়নি। ফেব্রুয়ারিতে দুদকের এ বক্তব্যের পর গত এপ্রিলে আবার একটি তদন্ত প্রতিবেদন দেয় বিশ্বব্যাংক। সেখানে মন্ত্রীসহ শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তারা কাজ পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে ১০ শতাংশ কমিশন চেয়েছিল।
দৃশ্যপটে দুদক ও ড. ইউনূস
একদিকে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ করছে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ ও প্রমাণ দেয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার সহযোগিতা করেনি; অন্যদিকে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান অভিযোগ করেছেন, দুর্নীতি তদন্তে বিশ্বব্যাংক অসহযোগিতা করেছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমও বলেছেন, তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগটা সঠিক নয় বা বিশ্বব্যাংক সহযোগিতা করছে নাÑ দুদকের এ বক্তব্যটা সঠিক মনে হয় না, বিশিষ্টজনদের মন্ত্রব্য এমনটাই। এটা রাজনৈতিক মন্তব্য। কেননা, বিশ্বব্যাংক তাদের অভিযোগ সম্পর্কে যেসব তথ্য বা কাগজপত্র দেয়ার কথা তা তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে দিয়েছে।
পদ্মাসেতু প্রকল্পে মূল অভিযুক্ত ব্যক্তি সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা বলছেন, ‘পদ্মাসেতু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার।’ ঋণচুক্তি বাতিলের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছেÑ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসের হাত রয়েছে। আজিব তামাসাই বটে। এ ধরনের ছেলেমানুষি দিয়ে সামনে এগুনো সম্ভব না। ঋণচুক্তি বাতিলের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূসের হাত রয়েছেÑ এটাও একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। ড. ইউনূস বলবেন বা খালেদা জিয়া বলবেন আর ঋণচুক্তি বাতিল হয়ে যাবেÑ পাগলেও তা বিশ্বাস করবে না। অভিযোগ এক জিনিস আর পদ্মাসেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করা অন্য জিনিস, এটা একটা ভয়াবহ, গুরুতর বিষয়। একটা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে এ কাজটি করতে পারে না। কারণ এটা শুধু তার নিজের ব্যাপার না। এটা আন্তর্জাতিক নিরীক্ষণের একটি বিষয়। এখানে অন্যান্য দেশ প্রশ্ন তুলতে পারে যে, কিসের ভিত্তিতে ঋণচুক্তি বাতিল করা হলো। বিশ্বব্যাংক টাকা দেয় তবে তার সঙ্গে বহু ব্যবসা জড়িত, বহু কোম্পানি জড়িত এখানে তাদেরও স্বার্থ জড়িত। বিশ্বব্যাংকের পদ্মাসেতুর ঋণচুক্তি বাতিলের ফলে তাদেরও স্বার্থ ক্ষুণœ হয়েছে। তারাও যে এ ব্যাপারে চুপ করে বসে থাকবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ শুধু যে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাপারটা শুধু তা নয়। পদ্মাসেতু যারা তৈরি করবেÑ যেসব কন্ট্রাক্টর রয়েছে, কনসালট্যান্ট রয়েছে, যেসব টেকনিক্যাল গ্রুপ রয়েছে তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তীরের ফলা যেদিকে
পদ্মাসেতুতে দুর্নীতির অভিযোগের মূল তীরটা সে সময়কার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের দিকে। তার বিরুদ্ধে পদ্মাসেতু প্রকল্পে পারমর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ করে বিশ্বব্যাংক। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়। কিন্তু এখানেও শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হলো না তার। ২৩ জুলাই মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি।
এদিকে আবুল হোসেনের সততাকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ করে একটি খবর প্রকাশ করেছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুনিয়া কাঁপানো স্যোসাল মিডিয়া উইকিলিকস। এতে বলা হয়েছে, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি তার মূল্যায়নে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণের দায়িত্ব এমন এক মন্ত্রীর কাঁধে দিয়েছেন, যার সততা প্রশ্নবিদ্ধ। এ মন্ত্রী হিসেবে তিনি সৈয়দ আবুল হোসেনকেই নির্দেশ করেছিলেন। মার্কিন দূতাবাস থেকে তারবার্তাটি যুক্তরাষ্ট্রে যায় ২০১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। এতে মরিয়ার্টি লিখেন, ‘দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে যোগাযোগমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। তার কাজের ধরণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চীনের সঙ্গে এই মন্ত্রীর রয়েছে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, যা সবার জানা।’
মরিয়ার্টি তার বার্তায় ২০১০ এর ৩ ফেব্রুয়ারি যোগাযোগমন্ত্রীর দেয়া এক ভোজসভায় অংশ নেয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জানান, ওই ভোজসভাতেই সৈয়দ আবুল হোসেন পদ্মাসেতু নির্মাণে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অ্যাজেন্সি (জাইকা)’র শর্ত নিয়ে আপত্তি তুলে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তদবিরের অনুরোধ করেন। এ সময় ঢাকায় উড়ালপথ (এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) নির্মাণেও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে কাজের অনেক সুযোগ থাকবে এমন প্রলোভন দেখান। তবে আবুল হোসেনের দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ ফুটে ওঠে মরিয়ার্টির অন্য বক্তব্যে। ওই বার্তায় তিনি বলেন, ‘পরবর্তী নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে যোগাযোগমন্ত্রী ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সম্প্রসারণের কাজকে ব্যবহার করতে চান। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণের ২০ কোটি ডলারের কাজের জন্য ১০টি দরপত্রে সাতটি বিদেশী ও তিনটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে।’
এছাড়া একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও মন্ত্রী মরিয়ার্টিকে জানান। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চেয়ে তিনি রাষ্ট্রদূতকে বলেন, ‘মহানগরীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে আমরা এমন একটি প্রকল্প চাই, যা দুই দেশের সম্পর্কের প্রমাণ বহন করবে।’ বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গও উঠে আসে ওই ভোজসভার আলোচনায়।  এ সময় আবুল হোসেন মরিয়ার্টিকে জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন সম্প্রসারণের পাশাপাশি এই রেলপথকে ‘ডাবল লাইন’ করার কাজও শিগগির শুরু হবে। মরিয়ার্টি তার বার্তাটিতে বলেন, মন্ত্রী যোগাযোগ উন্নয়নের সব পদক্ষেপেই পরবর্তী নির্বাচনে ভোট নিশ্চিত করার অঙ্ক কষেছেন। যেন আওয়ামী লীগের ভোট নিশ্চিত করার মিশন সফল করতেই এই মন্ত্রী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সব বড় বড় প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসার সুযোগ রয়েছে সেটিও তিনি বার বার মনে করিয়ে কিংবা বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে তার বার্তাটি মরিয়ার্টি শেষ করেন এই বলে যে, ‘ঢাকা দূতাবাস মনে করে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানিগুলো যাতে বৈধ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এসব কাজ পেতে পারে, সেই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’
কানাডায় বিচার
অর্থের অবৈধ লেনদেনের অভিযোগে পদ্মা সেতুর পরামর্শক হতে আগ্রহী কানাডাভিত্তিক প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়েরে দুহাইমকে গ্রেফতার করে সে দেশের পুলিশ। আর গত ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয় প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মকর্তা রমেশ সাহা ও মোহাম্মদ ইসমাইলকে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে ঘুষ দেয়ার পরিকল্পনার সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। যদি এই অভিযোগ প্রমাণিত হয় তবে এই দুই ব্যক্তির জেল খাটতে হবে কমপক্ষে পাঁচ বছর এবং গুনতে হবে মোটা অঙ্কের জরিমানা।
সরকারের অবস্থান
প্রথম দিকে সরকার বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ আমলেই নেয়নি। সব সময়ই তা অস্বীকার করে আসছে। এখানে সরকারের একটি ‘ডিনাইয়েল সিনড্রম’ কাজ করেছে। এরই মাঝে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে সংস্থাটির কাছে মোট চারটি চিঠি পাঠানো হয়। এই চিঠিগুলো যত না বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ খণ্ডন করা হয়েছে তার চেয়ে বেশি চেষ্টা করা হয়েছে, অনুনয় বিনয় করে বিশ্বব্যাংককে সেতু নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়নে রাজি করানো। কিন্তু কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি, তার বড় প্রমাণ গত ৩০ জুনের ঋণচুক্তি বাতিলের ঘোষণা। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংককে তেমন কোনো দোষ দেয়া যাবে বলে মনে হয় না। কারণ দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য সংস্থাটির পক্ষ থেকে সরকারকে ১০ মাস সময় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এ সময়ে সরকার করতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনটি উদ্যোগ নেয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধও জানানো হয়েছিল। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের মন্তব্যটি ছিল এ রকম, ‘বিকল্প টার্নকি পন্থায় অগ্রসর হওয়ার জন্য আমরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো প্রস্তাব করেছিলাম : ১. যেসব সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের ছুটি প্রদান; ২. এই অভিযোগ তদন্তের জন্য দুদকের অধীনে একটি বিশেষ তদন্তদল নিয়োগ এবং ৩. আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত বিশ্বব্যাংকের নিয়োগকৃত একটি প্যানেলের কাছে তদসংশ্লিষ্ট সব তথ্যের পূর্ণ ও পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকারে সরকারের সম্মতি প্রদান যাতে এই প্যানেল তদন্তের অগ্রগতি, ব্যাপকতা ও সুষ্ঠুতার ব্যাপারে উন্নয়ন সহযোগীদের নির্দেশনা দিতে পারে। আমরা সরকার ও দুদকের সাথে ব্যাপক ও গভীরভাবে কাজ করেছি এটি নিশ্চিত করতে যে অনুরোধকৃত সব পদক্ষেপে সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব আইন ও বিধিবিধানের আওতায় থাকে।’ কিন্তু সরকার এর কোনোটিই মেনে নিতে রাজি হয়নি। কারণ এটি করা হলে ‘থলেতে থাকা অনেক বিড়াল’ বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ছিল।
বিকল্প প্রস্তাব

কানাডায় অবস্থিত লাভালিন অফিস

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক টাকা দেয়নি তো কী হয়েছে। আমরা নিজেরাই এই সেতু বানাবো। ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি হাত দিয়েই সেতুটি বানানো হবে বলে ‘লোকভোলানো’ কথা বলা হচ্ছে। সরকারদলীয় উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী তো গত ৬ জুন বলেই বসলেন, একবেলা কম বাজার করে হলেও পদ্মা সেতু আমরা নিজেদের অর্থে বানাবোই। আমরা জানি না, সাজেদা চৌধুরীরা দিনে ক’বার বাজার করেন। কিন্তু এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ যে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থার মধ্যে দিনে একবার কেন সপ্তাহেও একবার বাজার করতে পারেন কি না সন্দেহ রয়েছে। বাজার খরচ কমানোর তাদের উপদেশ দেয়া কতখানি যুক্তিযুক্ত তা কাউকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য যে ঋণটি দিতে চেয়েছিল তার সুদহার উল্লেখ করা ছিল শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। পুরো টাকা চল্লিশ বছরে পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে প্রথম ১০ বছর ঋণের টাকা পরিশোধের কোনো প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু আমরা যদি মালয়েশিয়া বা অন্য কোনো উৎস থেকে পদ্মা সেতুর জন্য অর্থ ধার করি, তখন সুদের হার গিয়ে ঠেকবে ৫ শতাংশের ঘরে। আর পরিশোধের মেয়াদও হবে অপেক্ষাকৃত অনেক কম। বলা হচ্ছে, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন ডলার। এখান থেকে ২ বিলিয়ন ডলার পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় করলে ক্ষতি কী! ক্ষতি আছে, প্রথমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে ডলার রক্ষিত আছে তার পুরোটা সরকারের নয়। এর একটি বিশাল অংশ রেমিট্যান্স আকারে পাঠিয়েছেন বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীরা। বাকি অংশ এসেছে রফতানি আয় হিসেবে। কিছু পাওয়া গেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ইসিএফের ঋণ হিসেবে। রিজার্ভে বিদেশী সাহায্য রয়েছে খুবই কমÑ যা কিনা সরকার নিজের বলে দাবি করতে পারে। প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর এই রিজার্ভ থেকে তেলের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য ‘আকু’ (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) পেমেন্টের অংশ হিসেবে  ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়। এই রিজার্ভ দিয়ে মেটানো হয় দেশের বিশাল আমদানিব্যয়। তাই যারা বলছেন, রিজার্ভ দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করবেন, তাদের চিন্তা কতখানি বাস্তবসম্মত তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রস্তাব
বিশ্বব্যাংকের সাথে টানাপড়েনের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে প্রস্তাব আছে তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। সে অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় একটি চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। কিন্তু মালয়েশিয়া এই তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ৩৭ বছরে ১২ বিলিয়ন ডলার তুলে নিতে চায় বলে তাদের জমা দেয়া এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি শর্তও দেয়া হয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতমÑ বিওওটি (নির্মাণ, মালিকানা, পরিচালনা ও হস্তান্তর) প্রক্রিয়া। মালয়েশিয়ার সরকার এই সেতুর মালিকানা ভোগ করবে ৩৭ বছর। সেতু নির্মাণে রাজস্ব ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। রাজস্ব আয়ের উপর কর অবকাশ এবং সেতুটি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সব পণ্যের শুল্কসুবিধা দিতে হবে। হঠাৎ করে সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন কোনো শুল্কারোপ না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এই ধরনের অন্য কোনো অবকাঠামো এটির প্রতিযোগী হবে না তারও নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং পরিবেশ ও মানবাধিকার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে হবেÑ যাতে এসব কারণে সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়া ধীর না হয়ে পড়ে।
শর্তের মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতুর কাছাকাছি দ্বিতীয় কোনো সেতু নির্মাণ করা যাবে না। সেতু বছরের নির্দিষ্ট পরিমাণ যানবাহন না চলাচল করলেও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সরকারকে। মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণের পর এর ওপর দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের টোল কত হবে তারও একটি পরিসংখ্যান বাংলাদেশের কাছে দিয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, ২০২৩ সালে পদ্মা সেতু দিয়ে একটি ট্রাক চলাচলের জন্য টোল দিতে হবে ২৩ দশমিক ৪০ ডলার (ডলারের সাথে টাকার বিনিময় হার বর্তমান হিসাবে ধরলে তা হবে এক হাজার ৯০০ টাকা)। ২০৩০ সালে এই টোল বেড়ে হবে ২৬ ডলার। একইভাবে এবং একই সময়ে বাসের টোল হবে যথাক্রমে ১৯ ডলার ৯০ সেন্ট ও ২২ ডলার ১০ সেন্ট এবং  মোটরসাইকেলে টোল প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭৫ সেন্ট ও ৮৩ সেন্ট।
তাই এখানে দেখা উচিত মালয়েশিয়ার প্রস্তাব বিবেচনা করা নাকি বিশ্বব্যাংকের কাছে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য আবার দ্বারস্থ হওয়া। তবে বিশ্বব্যাংক যদি পদ্মা সেতু নির্মাণে আবার অর্থায়ন করতে রাজি হয় সে ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের এ মেয়াদে সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করা যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

SHARE

Leave a Reply