দুর্নীতিবাজ নেতৃত্ব দিয়ে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইকবাল

ছাত্র সংবাদ :বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৪০তম বর্ষপূর্তিতে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার অনুভুতি ব্যক্ত করুন ?
মোহাম্মদ ইকবাল : স্বাধীনতার মুল চেতনা ছিল গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তিলাভ।
গণতান্ত্রিক যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল ৯০-এর দশকে আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে। সেটা আবারও বাধাগ্রস্ত হলো আবারো গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হলো। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বর্তমান শাসক যারা তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য একদিকে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করছে অন্য দিকে অর্থনৈতিকভাবে আমরা যতটুকু আশা করেছিলাম তা হয়নি আজকে ৪০তম বর্ষপূর্তিতে এসে দেখি আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কী কী অর্জন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
মোহাম্মদ ইকবাল : উল্লেখযোগ্য অর্জন বলতে আমরা একটি পতাকা পেয়েছি, একটি আবাসযোগ্য ভূমি পেয়েছি, নিজেরা নিজেদের পরিচয় দিতে পারছি। আমরা পাকিস্তান আমলে আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ে এই অংশের লোকদের যেমন ব্যবসা বাণিজ্য চাকরির ক্ষেত্রে সম-অধিকার দেয়নি স্বাধীন হওয়ায় কারণে সেই সকল বিষয়ে আমরা কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করছি বলে আমরা মনে করি। অন্য দিকে স্বাধীনতা অর্জনের ফলে আমাদের দেশের যোগাযোগব্যবস্থার একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছ। বিশেষ করে ৮০ থেকে ৯০-এর দশকে। যেটা আমরা পাকিস্তান আমলে আশা করতে পারিনি। শিল্পে এবং কৃষিতেও আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। যেটা একটি অধীনস্থ দেশ বা প্রদেশ হিসেবে অর্জন সম্ভব ছিল না।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকারসহ আমরা স্বাধীনতার সুফল কতটুকু পাচ্ছি ?
মোহাম্মদ ইকবাল : স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের যে মৌলিক আধিকার পাওয়ার কথা ছিল তা থেকে আমরা এখনও বহু দূরে, যদিও তখন আমাদেরকে বলা হয়েছিল দেশ স্বাধীন হলে সকল মৌলিক অধিকারসমূহ ফিরিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু যখন দেখি স্বাধীন দেশের নাগরিক লাইন ধরে জীবিকা নির্বাহের জন্য রেশনের চাল উত্তোলন করছে, তখন খুব দুঃখ হয়। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট উন্নতি করেছি। চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরে কিছুটা অগ্রগতি হলেও সরকারি সেক্টর দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে যথেষ্ট পিছিয়ে আছে।
ছাত্র সংবাদ : “স্বাধীনতার চেতনা ঐক্যের বিভক্তির নয় ” এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
মোহাম্মদ ইকবাল : ঐক্যের বিকল্প নেই। আমরা স্বাধীনতার জন্য যখন যুদ্ধ করেছিলাম তখন মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান  যে কোন কারণেই হোক যুদ্ধ করতে পারেননি। কিন্তু তখন দেশের আপামর জনতা কৃষক শ্রমিক ছাত্র-জনতা, মজুর, খেটে খাওয়া মানুষ একত্রিত হয়েই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বিধায় এত অল্প সময়ের মধ্যে নিরস্ত্র মানুষ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। তাই ঐক্যের বিকল্প কিছুই নেই। আর আজকের বাংলাদেশকে আমরা যদি উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে চাই এবং বিভিন্ন পরাশক্তির মোকাবেলা করতে হয় তাহলে ঐক্যবদ্ধভাবেই আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। ঈমানী চেতনা যেটা পরকালীন ভয়ভীতি থেকে আসে। মানুষ যদি মনে করে যে পরকালে আমাকে সকল কাজের জবাবদিহিতা করতে হবে। এই চেতনার মাধ্যমে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, তাহলে আমাদের দ্বারা অসম্ভবকে সম্ভব করা কঠিন নয়। কারণ আমাদের রয়েছে বিপুল জনশক্তি। সুতরাং ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
ছাত্র সংবাদ : দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোন বিষয়গুলোকে আপনি প্রতিবন্ধক মনে করছেন?
মোহাম্মদ ইকবাল : স্বাধীনতার প্রথম শর্তই হলো একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা। যখন এদেশে ঔপনিবেশিক শাসন ছিল তখনই এদেশে দুর্নীতির বীজ বপন করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মোস্তফা সাহেবকে বলেছিলেন, দেশে ৮ কোটি কম্বল এলো গাজী গোলাম মোস্তফা আমার কম্বল কোথায়? অথচ দেশে সাড়ে সাত কোটি মানুষ। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। আমরা যে চেতনা নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমরা বাংলাদেশকে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই চেতনা থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা বাহুধা বিভক্ত হয়ে গেছিÑ কেউ সমাজতন্ত্রবাদী, কেউ ধর্মনিরপেক্ষবাদী, কেউ একেশ্বরবাদী। এই যে বাহুধা বিভক্ত হয়ে গেছি যা ব্রিটিশরা করেছিল। তাদের সিস্টেম ছিল উরারফব ধহফ ৎঁষব আগে বিভক্ত কর এবং শাসন কর। ঔপনিবেশিক সেই চেতনা আজও লালন করার কারণে স্বাধীনতার যে কাক্সিক্ষত সুফল সেটা আমরা পাচ্ছি না। আমরা যদি স্বাধীনতাকে আমাদের যে ঐক্যবদ্ধতার চেতনা সেটা লালন করতে পারি তবেই স্বাধীনতার সুফল পেতে পারি। তাই অনৈক্যই হলো দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান প্রতিবন্ধকতা। আর নেতৃত্বের অনৈতিকতা, অনৈক্যতা এবং দুর্নীতই হলো স্বাধীনতার মূল প্রতিবন্ধকতা। জনগণ কোন সমস্যা নয়, সমস্যা হলো দুর্নীতিবাজ নেতৃত্ব। যতক্ষণ পর্যন্ত দেশে দুর্নীতিবাজ অসৎ নেতৃত্ব থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত দেশের উন্নতি সম্ভব নয়।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
মোহাম্মদ ইকবাল : তারা যেন দুর্নীতিমুক্ত হয়ে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করেন। রাজনীতি তো মানুষের জন্য নিজের জন্য নয়। আজকের রাজনীতিবিদেরা মানুষের জন্য রাজনীতি না করে নিজের জন্য নিজের প্রয়োজনে রাজনীতি করছেন। ক্ষমতায় গিয়ে কিভাবে সম্পদের পাহাড় গড়া যায় সেটিই এখন রাজনীতিবিদদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। তাইতো আমরা দেখছি দলীয় মনোনয়ন টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর নির্বাচিত হয়ে সেই টাকা সুদাসলে উসুল করা হচ্ছে । এসব দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের কারণে স্বাধীনতার সুফল দেশের জনগণ পাচ্ছে না। যেসব রাজনীতিবিদ রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছেন তাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে দেশের উন্নতি অগ্রগতি সম্ভব হচ্ছে না। তাই দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্যক্তিস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে জনগণের স্বার্থে কাজ করবেন এটাই রাজনীতিবিদদের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জনগণের পক্ষ থেকে এই আমার প্রত্যাশা।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখা ও দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তরুণ ছাত্র ও যুবসমাজের কাছ থেকে আপনি কেমন ভূমিকা প্রত্যাশা করেন ?
মোহাম্মদ ইকবাল :  তরুণরাই একটা জাতির সত্যিকারের ভবিষ্যৎ। অধ্যয়নই তাদের মূল কাজ। কিন্তু স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তরুণদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। তরুণদের যে চেতনা, সাহসী ভূমিকা এবং ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণের যোগ্যতা তাদের তারুণ্যের কারণে তা কাজে লাগাতে হবে।  অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের কারণে কোন জাতির নেতৃত্ব থাকবে অগ্রজদের কাছে। তরুণ একদল কর্মী যদি সংঘবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যায় এবং নেতৃবৃন্দকে সহযোগিতা করে সেই জাতির অগ্রগতি হতে বেশি সময় লাগে না, যার প্রমাণ হলো ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। আমাদের অনেক পর স্বাধীনতা অর্জন করেও আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে তারা। তারা আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এমনকি খাদ্যশস্য রফতানিও করছে। এলডিসি থেকে তারা আজ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। হয়ত কিছু দিনের মধ্যে তারা উন্নত দেশ হিসেবেও পরিচিতি পাবে। আমাদের এক যুগ পরে স্বাধীনতা অর্জনের পরও তারা সৎ নেতৃত্ব, তারুণ্যের উচ্ছলতা এবং ঐক্যবদ্ধতার কারণে আমাদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে আছে। তাই তারুণ্যের উচ্ছলতা এবং সৎ নেতৃত্ব একীভূত হলে একটি দেশ স্বয়ংস¤পূর্ণরূপে এগিয়ে যেতে পারে এবং কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে।
ছাত্র সংবাদ : একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সমৃদ্ধি আনয়নে আপনার পরামর্শ কী?
মোহাম্মদ ইকবাল : প্রথমেই কাজ হলো জাতিকে আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা। আমাদের সম্পদের যাতে সুষম বণ্টন হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। দুর্নীতিকে উচ্ছেদের জন্য দরকার লোক তৈরির প্রোগ্রাম, চরিত্র গঠনের জোগান। চরিত্র গঠনের জন্য যদি কোনো ঢ়ৎড়মৎধস না থাকে তাহলে দুর্নীতি আপনা আপনি বৃদ্ধি পাবে। আগাছা ফেলে রাখলেই বৃদ্ধি পায়, কিন্তু একটি অর্থকরী প্রয়োজনীয় ফসল এমনি এমনি জন্ম লাভ করে না, তার পরিচর্যা নিতে হয়। তদ্রƒপ দেশের উন্নতি এবং সমৃদ্ধির জন্য দরকার একটি সৎ এবং চরিত্রবান নেতৃত্ব। আর একজন সৎ এবং চরিত্রবান মানুষ পেতে হলে একটি সঠিক দিকেনির্দেশনামূলক ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন। যদি সেই রকম একটি শিক্ষাব্যবস্থা একটি কর্মসূচি একটি নেতৃত্ব একটি ঞবধস দিয়ে তরুণ সমাজকে চরিত্রবান করা যায় তাহলে আগামী দিনে তারাই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে রাখার ব্যাপারে সঠিক ভূমিকা পালন করবে এবং সমৃদ্ধির ব্যাপারেও এসব সৎ নেতৃত্ব আগামীতে দেশকে এগিয়ে নেবে বলে আমি মনে করি।

SHARE

Leave a Reply