দূর হোক হতাশা ভালো থাকার প্রত্যাশা

মোস্তাফিজুর রহমান আশু

Hotshaবাস্তবতার জাঁতাকলে আজ মানুষ নির্মমভাবে পিষ্ট। যান্ত্রিক জীবন আমাদের আনন্দ- বিনোদনের সময়টুকুও দখল করে নিয়েছে। জীবনের এই কঠিন যুদ্ধে কেউ হচ্ছেন বিজয়ী আবার কেউ পরাজিত। আর পরাজিত অনেকেই ডুবে যাচ্ছেন হতাশার সাগরে। শুধু কাজের ব্যস্ততায় নয়, অনেকে একাকিত্বের ভাবনায় হচ্ছেন হতাশ। শত কাজের ব্যস্ততায় নিজেকে ভাবছেন একা, জড়পদার্থ। আবার অনেকে অকারণেই নিজেকে ছোট ভেবে কষ্ট পাচ্ছেন। এর কোনটিই ঠিক নয়, ঝেড়ে ফেলুন হতাশা, স্বপ্নের পেছনে ধাওয়া করুন, গুটিয়ে নয় চুটিয়ে বাঁচুন।
যে ব্যক্তি যত বেশি হতাশ হবে, সে জীবনে তত বেশি পিছিয়ে যাবে। হতাশা শুধু কষ্টই ডেকে আনে, কোনো সাফল্য নয়, মানুষের মস্তিষ্ক তার চিন্তাচেতনা আর আবেগের স্থান। মস্তিষ্কই নিয়ন্ত্রণ করে যাবতীয় মানসিক বিষয়। মস্তিষ্কে রয়েছে অসংখ্য শিরা-উপশিরা আর স্নায়ু। মন খারাপ বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় স্নায়ুগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। একটি স্নায়ু অপর স্নায়ুকে প্রভাবিত করে, ফলে অপর স্নায়ুগুলো দুর্বল হয়ে যায়, এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে অন্য অঙ্গগুলোর ওপর। ফলে দেহ তার স্বাভাবিক কাজকর্মের গতি হারিয়ে ফেলে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ত্বক ও চুলের ওপর।
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে ত্বক অকালেই বৃদ্ধ মানুষের মতো দেখায়। দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলা দুর্বল হওয়ার জন্য চুলও ঝরতে শুরু করে। হারিয়ে যায় চুলের ঔজ্জ্বল্য। ত্বকে সৃষ্টি হয় অজস্ত্র ভাঁজ এবং বলিরেখা।
দুশ্চিন্তা মানুষের শরীরের অক্সিজেন সরবরাহ কমিয়ে দেয়।
ফলে দেহের রক্ত চলাচল বিঘিœত হয়। পরিণামে হৃৎপি-ের ওপর চাপ পড়ে, হৃৎপি- দুর্বল হয়ে পড়ে। এ জন্য অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে অনেকেরই হার্ট অ্যাটাক হয়। তাই ঝেড়ে ফেলুন হতাশা। জীবনকে ভাবতে শুরু করুন নতুন করে। যেকোনো বিপদে মনোবল না হারিয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করার শপথ নিন।
কখনোই নিজেকে ছোট ভাববেন না। যে ব্যক্তি যখন প্রফুল্ল তার কাজ করার ক্ষমতা তত বেশি। চলার পথে সুখের পিছু ধরেই আসে কষ্ট-বেদনা। তাই বলে ভেঙে পড়লে চলবে না। জীবনের দুঃখকে দেখতে হবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে। আমরা তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষ। আমাদের দেশে দুঃখ-দুর্দশা প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। তা ছাড়া নতুন যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক তীব্র সঙ্কট।
সব মিলিয়ে হতাশার যথেষ্ট উপকরণ আমাদের চারদিকে। তাই বলে হতাশ হলে চলবে না। সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। দুঃখের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে সুখ।
নিজে সুস্থ থাকুন, আশপাশের সবাইকে সুখী করার চেষ্টা করুন। আপনার সামান্য মনোযোগ, সামান্য সচেতনতাই চারপাশের পরিবেশকে করে তুলবে আরো বেশি সুন্দর। বাড়িয়ে তুলুন সবার সাথে আপনার মানসিক যোগাযোগ। এতে দূর হবে আপনার একাকিত্ব, শত ব্যস্ততার মধ্যেও আপনি অনুভব করবেন বন্ধুত্বের পরশ।
হতাশার লক্ষণ
জীবনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ব্যর্থ মনোরথ
নিজেকে একা ভাবা
নিজেকে নির্জীব জড়বস্তু হিসেবে ভাবা
নিজেকে অকারণে ছোট ভাবা
সর্বদা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকা
সাধারণ বিষয়েও দ্বান্দ্বিক অবস্থায় থাকা
অনিয়ন্ত্রিত আবেগ।
দূর করার উপায়
নিজেকে সর্বদা সুখী মানুষ ভাবুন। প্রাণ খুলে হাসুন। দেখবেন বিষণœতা পালিয়েছে হাজার মাইল দূরে।
জীবনের প্রতিটি সমস্যাকে সর্বদা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখুন।
যতই বিপদ আসুক মনোবল হারাবেন না। বিপদ আপনাকে মোকাবেলা করতেই হবে, এই শপথ নিয়ে সামনে এগিয়ে যান।
সফল ব্যক্তিদের জীবনী পড়–ন। দেখবেন তাঁরা সবাই অক্লান্ত সংগ্রাম করে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছেন। সিরাত গ্রন্থসমূহ ও আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, কুরআনের বিভিন্ন ঘটনা আপনাকে অনুপ্রেরণা দিতে পারে।
নিজেকে কখনই দুঃখী মানুষ ভাববেন না। হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, যার পরিণতি ভয়াবহ। অবসরে রুচিশীল কোনো গল্পের বই পড়–ন। বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যান বা প্রিয় কোনো কাজ করুন।
হতাশাকে ঝেড়ে ফেলুন
একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন আপনার চেয়ে আরো অনেক কষ্ট ও অসহায়ভাবে পৃথিবীর অনেকেই দিন যাপন করছে। এই মানুষগুলোর কথা চিন্তা করলেই আপনার কষ্ট অনেক কমবে। জুতার জন্য যে মানুষের মন খারাপ, পা-হীন লোক দেখলে যেমন তার দুঃখ দূর হয়, ঠিক তেমনি পাঁচতলা নিজের বাড়ি করতে না পারার কষ্ট রাস্তায় ঝুপড়ি ঘরের বাসিন্দাদের দেখলে দূর হয়ে যায়।
নিজের চেয়ে বড় ও ভালো অবস্থানে যারা আছে, তাদের দেখে কষ্ট পাবেন না, চেষ্টা করুন তাদের মতো হওয়ার। আপনার সততা আর পরিশ্রম আপনাকে এনে দেবে সাফল্য। অল্পে তুষ্ট থাকতে চেষ্টা করুন। জীবনের দুঃখের স্মৃতিগুলো বাদ দিয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলো স্মরণ করুন।
তৈরি করুন ভালো বন্ধু, তার সঙ্গে ভাগ করুন সব মনোভাব, কষ্ট ভাগ করে নিলে নিজেকে অনেক হালকা মনে হবে। সুখের সঙ্গে দুঃখও অনিবার্য এই চরম সত্যটা মেনে নিয়েই আপনাকে পথ চলতে হবে।
মনকে প্রফুল্ল রাখতে পারেন প্রিয় কোনো ছবি বা দৃৃশ্য যা দেখলে মন ভালো হয়ে যায়, ছোট্ট ফুলদানিতে প্রিয় কোনো পাতাবাহার বা ফুলের টব আপনার ঘরের এক কোণে রাখতে পারেন। প্রকৃতির সবুজ রঙ চোখের পুষ্টি জোগায় এবং ফুল আমাদের মন ভালো রাখে। দেখলেই মন ভালো হয়ে যায় শোপিস বা ছবিও দেওয়ালে রাখতে পারেন। এক টানা কাজ না করে একটু বিরতি দেয়ার চেষ্টা করুন। কাজের মাঝে এখানে একটু বিশ্রাম নিন। বিরতি পেলে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিন। মাঝে মাঝে নীরব শান্ত কোনো পরিবেশে গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করুন। কিছু সময় চোখ বন্ধ রেখে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিন। ভাবতে থাকুন আপনি ভীষণ সুখী মানুষ। আপনার কোনো সমস্যা নেই, জীবনযুদ্ধে আপনি সফল হয়েছেন এবং হবেন। এ ধরনের ইতিবাচক চিন্তা করুন এবং জোরে শ্বাস নিন। মনে করুন জীবনের কষ্টগুলো দুঃস্বপ্নের মতো। সামনে আপনার সাফল্যের দিন।
আপনি যত ইতিবাচক চিন্তা (Positive thinking) করবেন, আপনার মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ তত বাড়বে, সুষম খাবার খান, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস অনেক হতাশা দূরীকরণের ইতিহাস বহন করে
একবার এক বেদুইন হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর দরবারে এলেন। নবীজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাহন উট কোথায় রেখেছো? বেদুইন সাহাবী বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! মসজিদের বাইরে খোলা অবস্থায় রেখেছি। আমি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করেছি। আল্লাহই দেখবেন আমার উট। নবী (সা) তখন বললেন, আগে তোমার উটের পা বাঁধ, তারপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল কর।
তকদিরে বিশ্বাস ঈমানের অপরিহার্য দাবি কিন্তু তকদিরের বিশ্বাস মানে অকর্মণ্য হয়ে পড়ে থাকা নয়; বরং সংগ্রাম, সাধনায় জিহাদ ও কর্মময় জীবন ও আল্লাহ ওপর ভরসার ভাবার্থের মধ্যে শামিল। চেষ্টার পথে অগ্রসর হলেই তকদির বা ভাগ্যলিপির অজানা সত্যগুলো প্রকাশিত হবে মানুষের জীবনে।
জালিম বাদশাহ নমরুদ কর্তৃক ইবরাহিম (আ) কে আগুনে নিক্ষেপের পর ইবরাহিম (আ)-এর আল্লাহর ওপর আস্থার দৃঢ়তা
হিজরতের সময় রাসূল (সা) ও আবু বকর (রা) মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে তাদের মধ্যে তৃতীয়জন হিসেবে বিশ্বাস করে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতেও সামান্য ভুল করেননি। তাঁর উম্মত হিসেবে আমাদের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে যথেষ্ট হিসেবে মেনে নিয়ে পথ চলা উচিত, তাহলে হতাশার গ্রাস থেকে আমরা সবাই রেহাই পাবো।
হতাশা দূর করার আরো কিছু কৌশল
বর্তমান নিয়ে ভাবুন, ভবিষ্যতের জন্য কোনো কিছু অবহেলা করবেন না। ভবিষ্যতে কোনো কাজ ফলপ্রসূ হবে না ভেবে কাজ ছেড়ে বসে থাকবেন না। Positive thinking করুন আশাবাদী হোন।
তুচ্ছ কিন্তু লক্ষণীয়, সামাজিক মানবকল্যাণমূলক কার্যকলাপে নিজেকে নিয়োজিত রাখুন। এ ক্ষেত্রে মনে রাখুন পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলে দাও/ তার মত সুখ কোথাও কি আছে আপনার কথা ভুলিয়া যাও। … এটি মনে রেখে কাজ করুন।
সহজ দর্শন, আপনার আশপাশে হয়তো অনেক সমস্যা চোখে ধরা পড়বে। কিন্তু তা নিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। ভাবুন কিভাবে নির্মূল করা যায়। হাজার ব্যস্ততা থাকার পরও নিজেকে কিছুটা সময় দিন, জীবনকে সহজভাবে দেখুন।
সত্য ও সুন্দরের পক্ষে থাকুন, বিবেক সবচেয়ে বড় আদালত। আপনার বিবেক, বুদ্ধি, মেধা, যোগ্যতা মহান আল্লাহর অপার দান। তা দিয়ে প্রত্যেকটি বিষয়কে মূল্যায়ন করুন, সত্য ও সুন্দরের পক্ষে থাকুন প্রশান্তি পাবেন।
শিক্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি, প্রত্যেক বিষয়কে সহজভাবে চিন্তা করুন। কিভাবে আপনার রাগ বা ক্ষোভ দূর করা যায়। সময় ও বিশ্বাসের সাথে সাথে নিজেকে পরিবর্তনশীল করে গড়ে তুলুন। সব সময় শিক্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গির মনোভাব পোষণ করুন।
সবুজ প্রিয়, প্রকৃতি নিষ্পাপ, উদার ও অপরূপ প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, প্রকৃতির কাছাকাছি যান, কাঁচা ঘাস, সবুজ পাতা, সুন্দর ফুল স্পর্শ করুন, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করুন প্রকৃতির মাঝে।
নিন্দুককে ভালোবাসতে শিখুন, যারা আপনাকে নিয়ে সমালোচনা করে তাদেরকে কখনোই ছোট করে দেখবেন না। তারা আপনার সম্পর্কে অজ্ঞাত বিধায় আপনাকে নিয়ে আলোচনা করে। এই ব্যাপারটি যাচাই বাছাই করে নিজের পক্ষে কাজ করুন। মনে রাখবেন ‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো/ যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো।’
প্রিয় মানুষের জন্য, দিনের কিুছুটা সময় প্রিয় মানুষগুলোর সাথে কাটান অন্তত কথা বলুন, ভাইবোন আত্মীয়স্বজন বা দায়িত্বশীল ভাইদের সাথে।
সহযোগিতার মনোভাব, আপনাকে অবশ্যই সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। হয়তো জেনে থাকবেন কারো থেকে কিছু পাওয়ার চেয়ে দেয়ার মধ্যে ভালো লাগা বেশি কাজ করে। তাই মানুষকে খুশি করুন এবং আপনার সাধ্য অনুযায়ী মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন।
ভালো চিন্তা, সর্বশেষ বিষয়টি হলো আপনার চিন্তাশক্তিকে ভালো কাজে লাগান, কুচিন্তা, কু-অভ্যাস, কু-সঙ্গ পরিহার করুন। দেখবেন আপনি আপনার কাক্সিক্ষত সুখের স্বর্গ পেয়ে গেছেন।
স্বপ্ন দেখুন, আশাবাদী হোন, Positive thinking করুন, আল্লাহর ওপর ভরসা করুন, ধৈর্যশীল হোন, পরিশ্রম করুন, সময়কে কাজে লাগান, ভালো থাকার চেষ্টা করুন আল্লাহ তাঁর দ্বীনের সকল মুজাহিদকে হতাশামুক্ত কর্মমুখর আশাবাদী জীবন দান করুন। আমিন।
লেখক : কেন্দ্রীয় গবেষণা সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply