দেশকে বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্র

pholitic

মতিউর রহমান আকন্দ#

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সংবিধানের ৭ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’
৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয় তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইবে।’
সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে। মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ (Effective participation by the people) নিশ্চিত হইবে।’
বাংলাদেশের সংবিধানের উপরোক্ত বিধান অনুযায়ী এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে জনগণের দ্বারা, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে। অন্য কথায়, রাষ্ট্র কখনো অনির্বাচিত প্রতিনিধির দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না। যেহেতু তত্ত¡াবধায়ক সরকার ছিল একটি অনির্বাচিত পদ্ধতির সরকার এই যুক্তি দেখিয়ে এই পদ্ধতিটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বিধায় তদানীন্তন বিচারপতি খাইরুল হক তা বাতিল করেন। মূলত এখান থেকেই রাজনৈতিক সঙ্কটের শুরু।
জনগণের প্রতিনিধি নির্ধারিত হয় জনগণের ভোটে নির্বাচনের মাধ্যমে। এটাই জনপ্রতিনিধি নির্বাচন সংক্রান্ত সংবিধানের মূল চেতনা। বাংলাদেশের জনগণ ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে অংশগ্রহণমূলক অবাধ, স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিল। বিশ্বব্যাপী এ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তুলনামূলকভাবে ১৯৯১-২০০৬ পর্যন্ত এ ১৫ বছর জনগণ মোটামুটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও সংবিধান বর্ণিত তাদের অধিকার কিছুটা হলেও ভোগ করতে পেরেছে। এ সময় দেশে জনগণের গণতান্ত্রিক ও ন্যায্য ভোটাধিকার প্রয়োগের একটি পদ্ধতি গড়ে উঠেছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে এ পদ্ধতির বুকে ছুরি চালানো হয় এবং গণতন্ত্র হত্যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে এবং বিরোধী রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানোর লক্ষ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ১৫ বছরের গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক ধারা নস্যাৎ করে আদালতের দোহাই দিয়ে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। অথচ আদালতের রায়ে পরপর দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার কথা বলা হয়েছিল। এ নির্দেশনাটিও যদি অনুসরণ করা হতো তাহলে দেশে রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হতো না।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন ও ২৮ এপ্রিল ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থার কবর রচনা করা হয়েছে। জনগণের ন্যায্য ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও সংবিধানে বর্ণিত জনগণের মৌলিক অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের কী দুরবস্থা হতে পারে এবং নির্বাচন কমিশনের চরিত্র কত বীভৎস হতে পারে তার এক নিকৃষ্ট নমুনা আওয়ামী সরকারের অধীনে দেড় বছরের নির্বাচনসমূহ। নির্বাচন নামক সিঁড়ি ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন অংশ থেকে বাদ দেয়ার এক অভাবনীয় পদক্ষেপ এ সরকারকে মোহগ্রস্ত করে রেখেছে।
দলীয় সরকারের অধীনে এ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দ্বারা বাংলাদেশে মূলত নির্বাচনের নামে প্রহসন, প্রতারণা ও শঠতার মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার কেড়ে নেয়ার পাশাপাশি দেশ থেকে বিরোধী রাজনীতি সমূলে উৎপাটনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে। সরকার জনগণের এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেয়ার যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে তার চূড়ান্ত গন্তব্য হচ্ছে দেশকে রাজনীতিহীন করা।
সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘নাগরিকদের অবাধ চলাফেরার স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে।’ ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘সমবেত হওয়ার, জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিককে দেয়া হয়েছে।’ ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘সংগঠন, সঙ্ঘ বা সমিতি করার অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।’ ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।’ একই অনুচ্ছেদে ‘নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।’ পরিপূর্ণভাবে এ অধিকারসমূহ ভোগ করার সুযোগের পূর্ণ বাস্তবায়ন দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে নিশ্চিত করবে। বাস্তবতা হলো এর কোনটিই বর্তমান সরকারের অধীনে নিরাপদ নয়। সরকার সব অধিকারকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে ‘বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা আর খুব বেশি দিন থাকবে না।’ প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। যারা বিবেকের তাড়নায় অন্যায়, অসত্য ও অসাংবিধানিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কথা বলেন তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। টেলিভিশন চ্যানেল, পত্র-পত্রিকা ও গণমাধ্যমের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাখা হয়েছে। কোথাও সরকারের অসাংবিধানিক কর্মকান্ড ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হলেই সেখানে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ আচরণ কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে এসব অহরহ ঘটছে।
জনগণের জন্য উদ্বেগ ও হতাশার বিষয় হলো, তাদের ন্যায্য ভোটাধিকার হরণ। যে দেশের নাগরিকগণ তাদের নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না কিংবা নির্বাচনে তার রায়কে পাল্টে দেয়া হয় সেটাকে গণতান্ত্রিক দেশ বলা যায় না। গণতান্ত্রিক দেশের চরিত্র এটা নয়। গণতন্ত্রে বিরোধী মতপ্রকাশের অধিকার অনস্বীকার্য। এ সরকার সে অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নিয়েছে। আমাদের দেশে নির্বাচনের নামে জনগণের সাথে যে প্রতারণা, কূটকৌশল ও প্রহসন করা হলো তা শুধু দেশের জনগণকেই হতাশ করেনি, বিশ্বদরবারে আমাদের মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণœ করেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে যেনতেনভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার নেশা।

জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা
বাংলাদেশের ৪৪ বছরের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে জোর করে ক্ষমতায় যাওয়ার এবং থাকার একটি প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রবণতা গণতান্ত্রিক চেনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। রাজনৈতিক দলসমূহ যদি জনগণের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করতেন তাহলে তাদের এ ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার কথা নয়।
বলা হয় রাজনীতি মানুষের জন্য। কিসে মানুষের কল্যাণ কিসে অকল্যাণ সেটাই রাজনীতির মূল বিষয়। রাজনীতি কবিতা নয়, সাহিত্য নয়, বিজ্ঞানও নয়। তবে রাজনীতিবিদদের এ তিনটি বিষয়ের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। কবিতা মানুষের কল্পনা ও ভাবের জগৎকে আলোড়িত করে। কবিতার ভাষায় থাকে ছন্দ, যা মানুষের চিত্তকে করে আকৃষ্ট। কল্পনার জগৎকে করে শাণিত। কবিতার ছন্দময় উচ্চারণ হৃদয়-মনে এক বিশেষ উদ্দীপনার সৃষ্টি করে, মানুষ স্বপ্ন দেখতে শিখে। যিনি মানুষের মাঝে স্বপ্ন দেখাতে পারেন, তিনিই কবি।
সাহিত্য আত্মার উৎকর্ষতা সাধন করে। মানবজাতির আত্মার প্রতি চিরন্তন কল্যাণ আহবানের নাম সাহিত্য। যে সাহিত্যে মানুষের কল্যাণ ও চিত্তকে পরিশুদ্ধ করার প্রবণতা থাকে না সেটা সাহিত্য নয়। বিজ্ঞান-পরীক্ষা, নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিক্ষা দেয়। এর ব্যতিক্রম হলে সেখানে বিপর্যয় অনিবার্য। বাস্তবতা মেনে চলতে শিক্ষা দেয়াই বিজ্ঞানের কাজ। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনের সূরা ইয়াসিনে ঘোষণা করেছেন, ‘বিজ্ঞানময় কুরআনের শপথ’। কুরআন হচ্ছে বাস্তবতার নিরিখে মানবজাতির কল্যাণ, অকল্যাণের নির্দেশিকা সংবলিত এক বিজ্ঞানময় গ্রন্থ। তাই যারা সত্যানুসন্ধিৎসু মন নিয়ে কুরআনের এই বাস্তব বক্তব্য অধ্যয়ন করেছেন তাদের জীবন কুরআনের আলোকে উদ্ভাসিত হয়েছে। যুক্তি মেনে নিতে শিক্ষা দেয়া বিজ্ঞানের কাজ।
রাজনীতিতে থাকতে হয় যুক্তি ও বাস্তবতা। কারণ মানুষকে নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের পক্ষে অযৌক্তিক, অবাস্তব পথে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। তাই মানবজীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে মানবরচিত মতবাদ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের পালাবদল ঘটে থাকে।
যে রাজনীতিতে বাস্তবতার অস্তিত্ব থাকে না সেই রাজনীতি বিপর্যয় ডেকে আনে। আবার জোরজবরদস্তি করে কারো মত ইচ্ছা বা প্রত্যাশার ওপরে কোন কিছু চাপিয়ে দেয়ার নাম রাজনীতি নয়। প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা বিধান এবং কল্যাণকর পরিবেশ নিশ্চিত করা রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে রাজনীতিতে এসব অস্বীকার করা হয় সেটা কোন রাজনীতি নয়। তা হচ্ছে রাজনীতির নামে একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের ‘দস্যুবৃত্তি’। বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে মানুষের সম্পদ ছিনতাই করে নেয়ার নাম ‘ডাকাতি’ হলে রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার করে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যারা ক্ষমতা দখল করে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে তারা ‘রাজনৈতিক দস্যু’ ছাড়া আর কিছু নয়।
বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক দস্যুবৃত্তির কবলে নিপতিত। অতীত কালে ডাকাতদের সঙ্ঘবদ্ধ হামলায় মানুষের জীবন যেমন বিপর্যস্ত হতো বর্তমানে রাজনৈতিক দস্যুবৃত্তির কারণে দেশের প্রতিটি নাগরিক আজ ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত। বিনা ভোটে নির্বাচন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া, ভয়ভীতি দেখিয়ে মানুষকে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখা, জোর করে অন্যের ভোট ছিনিয়ে নিয়ে নিজ দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করা এবং বিরোধী দলের মনোনীত প্রার্থীকে নানা কলাকৌশলে পরাজিত করে গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল দস্যুতা ছাড়া আর কিছু নয়। নিঃসন্দেহে এ এক ভয়াবহ ডাকাতি। পার্থক্য এটাই ডাকাতদের কোন রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স ছিল না আর রাজনৈতিক দস্যুবৃত্তি চলে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মাধ্যমে।
আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন শুরু হয়েছে তার শেষ কোথায় তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবেন না। তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় এ পশুত্ব বর্বরতা, হিংস্রতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতার পরিসমাপ্তি অবশ্যই হবে এবং তা অনিবার্য। পৃথিবীর কোন দেশেই জনগণের মতের বিরুদ্ধে কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ড বেশি দিন ক্রিয়াশীল থাকতে পারে না। বাংলাদেশে জনগণের ইচ্ছা, অভিব্যক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করে জোর করে ক্ষমতায় থাকার যে হিং¯্র পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে তার পরিণতি কিছুতেই শুভ হতে পারে না। অবশ্যই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে এবং জনগণ শৃঙ্খলিত অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে।

দেশপ্রেমিক ও দেশদ্রোহী বানানোর প্রবণতা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজেকে দেশপ্রেমিক ঘোষণা ও অন্যকে দেশদ্রোহী বানানোর এক ভয়ঙ্কর খেলা বিদ্যমান। যারা ক্ষমতায় আছেন তাদের বক্তব্য, ভাষা থেকে মনে হয় তারাই একমাত্র দেশপ্রেমিক। তাদের বাইরে কাউকে দেশপ্রেমিক ভাবা প্রকারান্তরে দেশদ্রোহিতা। রাজনীতিতে এ মানসিকতা মোটেই কল্যাণকর বিবেচিত হতে পারে না। কোন রাজনৈতিক দলের অধিকার নেই অন্য রাজনৈতিক দলকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করার। কে দেশপ্রেমিক আর কে দেশদ্রোহী তা প্রমাণিত হবে আচরণের মাধ্যমে এবং তা মূল্যায়ন, গ্রহণ বা বর্জন করবেন জনগণ। কোন রাজনৈতিক দলকে এই লাইসেন্স দেয়া হয়নি। যারা দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছেন, মানুষের অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করেছেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে তছনছ করে দিয়েছেন তারা দেশপ্রেমিক না দেশদ্রোহী তা জনগণের কাছে স্পষ্ট। জনগণকে অবাধ মতপ্রকাশের সুযোগ দিলে সহজেই এই বিষয়ের ফয়সালা হবে। কিন্তু সে পথে তারা হাঁটবেন না। তবে এটাও বলা যায় শেষ পর্যন্ত জনগণের দ্বারেই তাদের ফিরে আসতে হবে।

রাজনীতির ধারা
দেশের রাজনীতিতে দুটো ধারা দৃশ্যমান। একটি সত্য পথের সন্ধানীদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড অপরটি প্রতিহিংসাপরায়ণতার শৃঙ্খলিত রাজনীতি। প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ ও হিংস্রতার রাজনীতি কখনো স্থায়ী হতে পারে না। মুখে যে যাই বলুন, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক বর্তমান অভিশপ্ত রাজনীতি থেকে মুক্তি চায়। যারা সত্যিকার ও সত্যনিষ্ঠ চেতনা নিয়ে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা পালন করছেন তাদেরকে সব জায়গায় কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। বিগত ৭ বছর ধরে তাদের ওপর চলছে সীমাহীন জুলুম, নির্যাতন এবং নিপীড়ন। নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে কারাগারগুলো ভর্তি করে রাখা হচ্ছে। রিমান্ডে নিয়ে আহত, পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। চোখ তুলে ফেলা হচ্ছে। পা ভেঙে দেয়া হচ্ছে। গায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হচ্ছে। এসব নির্যাতন বুকে ধারণ করে সত্যপন্থী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এগিয়ে চলেছেন।
অপর দিকে মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার হরণকারী অপশক্তি জোরজবরদস্তি করে রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার করে নির্যাতনের এ ধারা অব্যাহত রেখেছে। তারা নিজেরা জানেন রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া তাদের আর নিরাপদ কোনো শেল্টার নেই। তাই ছলে-বলে-কৌশলে নানান সুযোগ-সুবিধার ছদ্মাবরণে একটি সুবিধাবাদী চক্র গড়ে তুলে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করাই তাদের আসল উদ্দেশ্য। এ ধারার রাজনীতি বাংলাদেশকে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। জনগণ এ জবরদস্তি রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ এবং সোচ্চার। পথে, ঘাটে, শহরে, নগরে-বন্দরে সর্বত্রই জনমত এ প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির বিপক্ষে। কিন্তু সে মতপ্রকাশের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। জনগণ তাদের মতপ্রকাশের সুযোগ পেলে এ হিং¯্র রাজনীতিবিদগণ বুঝতে পারতেন, জনগণের নিকট তাদের স্থান কোথায় !
আবদ্ধ জলাশয় যেমন বিষাক্ত কীট-পতঙ্গের জন্ম দেয়, আবদ্ধ রাজনীতিও এক শ্রেণীর দস্যুর জন্ম দিচ্ছে। এর পরিসমাপ্তি ঘটানোর জন্য জনগণই চূড়ান্ত ফয়সালা করবে।

বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতির পরিণাম
বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও প্রতিহিংসার রাজনীতি জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণ কখনো ভুল করে না। ১৭৫৭ সালে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার পতনের পর জনগণ স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মাত্র ৬ বছরের মধ্যেই জনতার কাতার থেকে এ স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা। এ স্বাধীনতা সংগ্রাম সুদীর্ঘ রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে ১৯০ বছর পর সফলতা অর্জন করে। ১৮৩১, ১৮৫৭ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে রক্তাক্ত ইতিহাসের উত্তরাধিকার সৃষ্টি করেছে তা এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে এগিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণ স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করে। কিন্তু আবার সেই বিশ্বাসঘাতকতা, চক্রান্ত ও স্বার্থপরতার রাজনীতি বাংলাদেশের মানুষকে আন্দোলন, সংগ্রাম, লড়াইয়ের পথে ঠেলে দেয়। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণ-আন্দোলন দেশের লড়াকু জনতার এক ঐতিহাসিক আপসহীন ভূমিকার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের মানুষকে শোষণ, বঞ্চনা ও জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক আপসহীন লড়াই। জনতার এ লড়াইয়ে বাংলাদেশের জনগণ বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের অভ্যুদয় ঘটে।
জনগণ যেমন ১৭৫৭ সালে ভুল করেনি, ১৯৪৭ সালেও ভুল করেনি, ১৯৭০ সালেও ভুল করেনি। জনগণ স্বৈরাচার ও জবরদখলকারী শক্তির বিরুদ্ধেও আপসহীন ভূমিকা পালনে পিছপা হয়নি। ’৮২ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রাম ও রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিয়ে দেশের জনগণ স্বৈরাচারের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করেছিল। জনতার এ রায় মূল্যায়ন, গ্রহণ ও সম্মান প্রদর্শন করার সাহস এবং হিম্মত যারা দেখাতে পারেনি, তারা রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেছেন।
ইতিহাস সাক্ষী জনতা দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব নির্ধারণে ভুল করে না। নবাব সিরাজউদ্দৌলা আজও মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে বেঁচে আছেন। আর মীরজাফর বেঁচে আছেন বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে। রাজনীতির এ দুটো চরিত্র বাংলাদেশ থেকে কখনো মুছে ফেলা যাবে না। এটাও সত্য নবাব সিরাজউদ্দৌলার রাজনৈতিক পরিচয় মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে ঢেকে রাখা যাবে না। নবাবকে মীরজাফর বা মীরজাফরকে নবাব বানানোর অপপ্রয়াসও কোন দিন সফল হবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দুঃশাসন, জুলুম-নিপীড়ন, অত্যাচার, অবিচার জনজীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কোথাও শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। সর্বত্রই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। ছলে-বলে-কৌশলে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছেন জনগণের কল্যাণ চিন্তা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। নিজেদের স্বার্থ, প্রতিহিংসা ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। যেটা রাজনীতির সাথে সম্পূর্ণ অসঙ্গতিপূর্ণ। এর পরিণতি ক্ষমতাসীনদেরই ভোগ করতে হবে। ভুক্তভোগী জনতা পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে। রাজনীতিকে চার দেয়ালের ভেতর আবদ্ধ করে মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা বিস্ফোরিত হয়ে অত্যাচারীর দম্ভ চূর্ণ করে দেবে।

ফিরে আসতে হবে সংবিধানের পথে
বহু রক্ত, সংগ্রাম ও আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা এবং সংবিধানবহির্ভূত কোনো হঠকারী রাজনৈতিক কর্মকান্ড কারো জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন সুফল বয়ে আনেনি। মানুষের সামগ্রিক কল্যাণ চিন্তা, বিবেচনায় নিয়ে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সংবিধান সংশোধন করলে কখনো রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। যেখানে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলীয় স্বার্থ সেখানেই সঙ্কট। এসকল কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধানের চেতনা ও সামগ্রিকতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সকল নাগরিক ও রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তার গ্যারান্টি হচ্ছে সংবিধান। এই সংবিধানের পথেই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীকে ফিরে আসতে হবে। সংবিধানকে পদদলিত করে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা তাদের জন্যই আত্মঘাতী হবে। তারা যে ধারার সূচনা করে যাচ্ছেন এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে তাদেরকেই আবারো রাজপথে নামতে হবে। সেদিন তারা কী করবেন? নদীর এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে। রাজনীতির পালাবদল ঘটে। বাতাসের গতিরও পরিবর্তন হয়। আবহাওয়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। এটাই হচ্ছে ঐতিহাসিক বাস্তবতা। মানবজীবনে ক্ষমতার পালাবদল মুদ্রার এ-পিঠ, ও-পিঠ মাত্র। এ পালাবদল মেনে নিয়ে দেশকে রাজনীতিহীন করার চক্রান্ত থেকে সরকারকে ফিরে আসতে হবে। সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে হবে।

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply