দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে -ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

এক.

একজন দার্শনিক বলেছেন, As far as you look behind so far you came so ahead. অর্থাৎ যে জাতি তার বিগত দিনের ইতিহাস জানার যতবেশি চেষ্টা করবে সে জাতি ততবেশি তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে মহীয়ান হওয়ার গৌরব লাভ করবে। আমার তরুণ প্রজন্মকে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিজেদের ইতিহাসকে জানতে হবে। আমাদের জন্য আনন্দের খবর হচ্ছে, পৃথিবীর প্রতি ৫০ জন মানুষের মধ্যে কমপক্ষে একজন বাংলাদেশী। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টানলি এ কোচানেকের (Stanly A Kochanek) মতে, “বাংলাদেশে একটি অসাধারণ সমরূপ (extremely homogenous) জনগোষ্ঠী রয়েছে।” ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় যেসব রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, সেসব দেশেও সাধারণত এতো সমগোত্রীয় জনগোষ্ঠী দেখা যায় না। জাতিগতভাবে ৯৮.৭% বাংলাদেশি অভিন্ন। প্রায় ৯০% জনগোষ্ঠী একই ধর্মে বিশ্বাস করে। কমপক্ষে ৯৮% লোক বাংলায় কথা বলে। ভাষার জন্য জীবন দিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা বিশ্বদরবারে নিজেদের নাম লিখিয়েছে। স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা। ভাষা আন্দোলনই এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি। তার নেতৃত্ব দিয়েছে এ দেশের ইসলামপ্রিয় মানুষেরা। অধ্যাপক গোলাম আযম ভাষা আন্দোলনে অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিয়েও শুধু রাজনৈতিক কারণে পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি! সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতার ঘোষকের সহধর্মিণী এখন কারাগারে আবদ্ধ হয়ে মর্যাদা পেতে আইনের আশ্রয় নিতে হচ্ছে!
রাজনীতিতে প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ যেন আমাদের অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। এসব বন্ধন সাধারণত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সৃষ্টি করে। অথচ এই বাংলাদেশই আজকে পৃথিবীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত। আসলে এর পেছনে কি কারণ রয়েছে?
বিশ্বব্যাংক প্রতি বছর প্রায় ২০০টি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পরিমাপ করে। Worldwide Governance Indicators শীর্ষক এই বার্ষিক প্রকাশনার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল্যায়ন দেখা যায়- ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশ রাজনৈতিক দিক থেকে পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি অস্থিতিশীল ছিল।
‘যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন পলিসি’ শীর্ষক একটি প্রকাশনা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সম্পর্কে বার্ষিক তথ্য প্রকাশ করে। এই সূচক অনুসারে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সর্বনিম্ন ১৬.২% দেশের অন্তর্ভুক্ত। আর বিশ্বব্যাংকের সূচক অনুসারে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ দুটো সূচক অনুসারেই বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ দেশের মধ্যে রয়েছে। বস্তুত, সূচকভেদে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংস পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না।
অর্থনীতি একটি দেশের স্থিতিশীলতার চিহ্ন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল সময়কালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ও ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় নিষ্পেষিত হয়েছে। অথচ জাতির ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে প্রচন্ড রাজনৈতিক অসন্তোষ সত্ত্বেও অর্থনৈতিক জীবন আজকের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল ছিল।
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অপরাজনৈতিক ধারবাহিক কৌশল হলো বিরোধীদের দমন-পীড়ন করা। উৎখাতের রাজনীতি আওয়ামী লীগের পুরনো চরিত্র। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আওয়ামী লীগ ভয় পায়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের অভিধানে নেই। গণতন্ত্র আজ নির্বাসিত। শাসকদল কথিত গণতন্ত্রের সুর উচ্চকিত করার অন্তরালে একনায়কত্বের অদৃশ্য শাসনপদ্ধতি চালু করেছে।
আজ জনগণের প্রশ্ন আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? এখনো আমাদের গণতন্ত্রের জন্য ভিন দেশের দিকে কেন করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হয়। গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ, সাম্য ও ইনসাফের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম তার সবই আজ আওয়ামী নখরে ক্ষত-বিক্ষত।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, মানুষের জীবনহানি, সম্ভ্রমহানি ও আইনের শাসনের বোধের উপলব্ধির অভাব দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছিয়ে দিয়েছে। জনগণ এখন অগ্নিকুণ্ডের কিনারে দণ্ডায়মান। এক ব্যক্তির খেয়াল-খুশিই যেন ১৭ কোটি মানুষের জীবন নিয়ে এক চরম তামাশায় লিপ্ত। পাহাড়সম দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, সহিংসতা, আগ্রাসন, নাশকতা ও রাজনৈতিক স্বার্থে মিথ্যা নাটক জনসমর্থনহীন এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার শূন্যের কোঠায় সঙ্কুচিত করেছে। বিরোধীদলীয় জোটের আহ্বানে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনে এদেশের ৯৫ ভাগ মানুষের সাড়া আর উপজেলা নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন সরকারকে ইতিহাসের সবচেয়ে নাজুকতর জায়গায় দাঁড় করিয়েছে।
বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি ও একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করুক এটা ভারত কি কখনো চেয়েছে?। যার কারণে ভারত পৃথিবীর এত বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও বিগত ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনের মূল মদদদাতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের নামে সিলেক্টিভ এই সরকারকে পৃথিবীর অন্য কোন দেশ কি আসলে সমর্থন দিয়েছে?
আমাদের সোনার বাংলার প্রতি বিদেশীদের লোলুপতা বাড়ছে। অপরূপ ও অবারিত সম্ভাবনার বাংলাদেশ এখন বহির্বিশ্বের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে। তাই এখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর গণতান্ত্রিক পরিবেশ অনেকেই চায় না। এটি আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ কি বুঝতে পারেন? স্বনির্ভর অর্থনীতি আর আত্মনির্ভর বাংলাদেশ অনেকের জ্বালা বাড়িয়েছে। দেশের গণতন্ত্রকে অনেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

দুই.
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সম্মান, সৌজন্যবোধকে ঝাঁটা দিয়ে বিতাড়িত করছে আওয়ামী লীগ। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের শুধু রাজনৈতিক কারণেই হত্যা করে উপমহাদেশের রাজনীতিতে কালো অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সর্বক্ষেত্রে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, মামলা-হামলা, গ্রেফতার, লুটপাট রাজনীতির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য হস্তক্ষেপ করে বিরোধীদের দমন সরকারের আরেকটি অপরাজনৈতিক কৌশল। যা পুরো রাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনধারাকে বিষিয়ে তুলছে। বাড়ছে জনমনে অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থতির সাধারণ মূল্যায়ন আরো বেশি হতাশ করে তুলছে গোটা জাতিকে।
বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ দুর্নীতি মামলায় ২ কোটি টাকা জরিমানাসহ ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান এবং তাঁর সাথে করা আচরণ দেশের জনগণ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তার সাজাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন যেমন অস্থির হয়েছে, তেমনি আগামী সংসদ নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন- ‘খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলে। তিনি বলেন, এখন দেখার বিষয় খালেদা জিয়া নির্বাচনের অযোগ্য হন কি-না। আর যদি সেটা হয় তাহলে বিএনপি তো বলছেই খালেদাকে ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। আর এতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পুনরাবৃত্তিই হবে। আবার তেমন কিছু একটা হলে দেশ আবারো একটা সঙ্কটের মধ্যে পড়বে। দেশের সাধারণ মানুষ মনে করেন সরকারি দলের একটা প্রভাব এই রায়ের ওপর আছে। ফলে মানুষ আওয়ামী লীগকেই দায়ী করবে।’
সৈয়দ মকসুদ হোসেন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন- অন্যদের সাজা দিতে হবে। একই ধরনের দুর্নীতির অপরাধের কারণে যদি সাজা দেয়া হয় তাহলে বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে খালি জায়গা থাকবে না।
কারারুদ্ধ নেত্রীকে মুক্ত করার জন্য বিএনপির অহিংসভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। তাতেও যেন সরকারের অসহ্য। নেয়া হয়েছে দমন করার অপকৌশল। ছোড়া হয়, টিয়ার গ্যাস, রঙিন পানি, গ্রেফতার করা হয় বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মী।
আওয়ামী লীগ ধরেই নিয়েছিল খালেদা জিয়ার সাজাকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সহিংস আন্দোলনে নামবে, আর আওয়ামী লীগ সেখান থেকে ফায়দা লুটবে। সে সুযোগ না পেয়ে আওয়ামী লীগ হতাশা থেকে আবোল তাবোল বকছে!। বিএনপির আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এক বিরূপ মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায়, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের আমার ছাত্র। কিন্তু আমি তাকে রাজনীতি শেখাতে পারিনি।বলে ।আফসোস করেন।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে সুশীলসমাজকে গাধার সাথে তুলনা করায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে সোস্যাল মিডিয়াসহ সর্বত্র। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের জনগণ ও সুশীলসমাজের অধিকাংশই দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে বিচলিত। বিভাজনের রাজনীতির চরম বিস্মৃতি সুশাসনের পথকে ক্রমেই রুদ্ধ করছে।
প্রতিবেশী দুটি দেশের দুটি কৃত্রিম সংকট বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতাকে চরমভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। একদিকে মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্যাতন করে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে একটি মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ নতুন ও পুরনো মিলে রোহিঙ্গা এখন ১১ লাখের বেশি। (সূত্র : প্রথম আলো) সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিকভাবে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট-পরবর্তী ইস্যুতেও সরকার ব্যর্থ ও নোংরা রাজনীতি করেছে। বিএনপির ত্রাণের ট্রাক আটকে দেয়া ছিল সরকারের চরম রাজনৈতিক নোংরা মানসিকতার পরিচয়।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নোবেল বিজয়ী তিন নারী- ইরানের শিরিন এবাদি, ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান ও যুক্তরাজ্যের মেরেইড ম্যাগুয়ার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। বিদেশী এই তিন নোবেল জয়ীদের ক্ষেত্রেও সরকার সম্মানসূচক আচরণ করেনি। তাদেরকে কোনো প্রকার পুলিশি নিরাপত্তা প্রদান করা হয়নি। যা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদাকে ক্ষুণœ করেছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসান প্রক্রিয়ার যে কথা সরকার বলছে তাতেও ব্যর্থতার ছাপ প্রকাশিত হয়েছে ইতোমধ্যে। কেননা চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি থেকে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও আজ অবধি তা শুরু হয়নি। সবই যেন কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ।

তিন.
ভারতীয় সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতের এখতিয়ারবহির্ভূত সাম্প্রতিক মন্তব্য বাংলাদেশের জন্য চরম উদ্বেগের। তিনি বলেন, ‘ভারতকে অস্থিতিশীলতা করতে চীন ও পাকিস্তান মিলে বাংলাদেশীদের সেদেশে অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে।’ ডেইলি স্টার সম্পাদকীয়তে ভারতের সেনাপ্রধানের এই মন্তব্যকে দায়িত্বহীন বলে উল্লেখ করেছে।
ভারতে আসাম রাজ্য সরকার সেখানকার বৈধ নাগরিকদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সে তালিকায় প্রায় দেড় কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। তাদের প্রায় সবাই মুসলিম। তালিকায় যাদের নাম নেই তাদের বের করে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আসাম সরকার। এ নিয়ে আসাম জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মূলত বাংলাভাষাভাষীদের বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে সেদেশ থেকে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়ার পাঁয়তারা করছে মিয়ানমার সরকারের অনুকরণে। বিগত দিনে সেখানে ৮০০ মানুষকে খুন করা হয় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়। আসাম সরকারের এরূপ আচরণ বাংলাদেশের জন্য আরেকটি সঙ্কটের জন্ম দিবে। তাহলে আসাম কি হতে যাচ্ছে আরেক রাখাইন!!

চার.
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা থেকে শুরু করে জেএসসি ও এসএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষার ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস সরকারের চরম দায়িত্বহীনতার ও ব্যর্থতার আরেক নজির। এর মধ্য দিয়ে আমরা কি মেরুদণ্ডহীন জাতি হতে চলছি!!।
‘প্রশ্নফাঁস নিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ‘প্রশ্নফাঁস নতুন কিছু নয়, এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে’। তার এই দায়িত্বহীন মন্তব্য গোটা জাতিকে হতভম্ব করেছে। হতাশ হয়েছেন অভিভাবকরা। এ নিয়ে সর্বত্র উঠেছে সমালোচনার ঝড়। এমন বক্তব্য প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িত অপরাধী চক্র আরো আশকারা পাবে বলে মনে হয়। অনেকেই বলছেন, আওয়ামী লীগের কারো বিরুদ্ধে কটূক্তি করলে সরকার সাথে সাথে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসে। কিন্তু ১৭ দিনে ১২ বিষয়ের প্রশ্নফাঁসের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে পারলো না? তাহলে জনগণ কি ধরে নিবে সরকারেরই প্রভাবশালীদের একটি অংশ এর সাথে জড়িত! তবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে সরকারকে অতিদ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অবশ্য আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল মতিন খসরু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীত অবস্থান নিয়ে অবশ্য বলেছেন- “Incidents of question leaks in the past cannot be a justification for the recent leaks.”

পাঁচ.
মাত্র কয়েকদিন আগে জাতি পালন করেছে ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডির নবম বার্ষিকী। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো দিন। ২০০৯ সালের এই দিনে বিশ্বের ইতিহাসে পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে ঘটে এক মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের একটি অংশ।
দেশ রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর ও পদানত রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত শুরু হয়েছিল সেদিন থেকে। এ হত্যাযজ্ঞে জাতি হারিয়েছে ৫৭ জন মেধাবী চৌকস সেনাকর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দুইজন সেনাকর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ জন বিডিআর সদস্য ও ৫ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে। আজও উদ্ধার হযনি এর নেপথ্য রহস্য। উন্মোচিত হয়নি মূল ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ।
তাই আজও থামেনি শহীদ পরিবারের কান্নার আওয়াজ। বাংলার জনগণ কি জানতে পারবে ঘটনার পেছনের ইতিহাস? তাঁদের কী অপরাধ ছিল? কারাইবা এই নৃশংসতার পরকিল্পনা করেছিল? সেদিনের সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নানান ভূমিকা অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যা আজো অজানাই রইলো জনগণের। পিলখানা ট্র্যাজেডির মাধ্যমে একটি পদানত রাষ্ট্র বানানোর যে ষড়যন্ত্র তা আজও অব্যাহত। শহীদের রক্তের শপথ নিয়ে এই অপশক্তিকে জনতার মানবপ্রাচীর দিয়ে রুখতে হবে।

ছয়.
বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারবাজার চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারের প্রভাবশালী মহলই এর সাথে জড়িত থাকলেও তারা আজ ধরাছোঁয়ার বাহিরে। শেয়ারবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট, ব্যাংক কেলেঙ্কারি করে অনেক ব্যাংক ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। পুঁজিবাজারের সূচক নিম্নগামিতার হাত থেকে কোনোভাবেই রেহাই পাচ্ছে না। গেল সপ্তাহেও পুঁজিবাজারে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। এক সপ্তাহে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সূচক কমেছে ৪১.৯০ শতাংশ। এ দিয়ে শেয়ারবাজারে ভারত-চীনের প্রকাশ্য টানাটানি নতুন অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। দেশের ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারানোর ভয়ে আর বিনিয়োগ করছেন না। আবার অনেক বিনিয়োগকারী ইতোমধ্যে রাস্তার ফকির বনে গেছেন দরবেশদের কারসাজিতে। দেশের মানুষ বর্তমান সরকারের অর্থ-ব্যবস্থাপনায় সর্বস্ব হারিয়ে দিনাতিপাত করছেন। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আজ পশ্চাৎপদ। অধিকাংশ মানুষ অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
তাই বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রয়োজন যা কেবল এদেশের সচেতন মহল ভাবতে পারে। আর তার প্রথম পদক্ষেপে প্রয়োজন জাতীয় বিভেদ সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করে তার মূলোৎপাটন। একটি দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ জনমত গঠন করাও জরুরি। ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে জনসচেতনতা ও ঐক্যের কোন বিকল্প পথ নেই। শাসকগোষ্ঠীর নেতিবাচক সকল দিক গণমানুষের জানা থাকলেও এর প্রতিকার করার তেমন কোন পথ এখনো সৃষ্টি হয়নি। আর সে পথ তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে দেশের তরুণ ও সচেতন যুবসমাজকে।
১.অতীতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে গণতন্ত্র কাজ করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটেও গণতান্ত্রিক সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর হবে।
২.পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
৩.আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা ভিত্তিক যে মুরব্বি-মক্কেল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা হ্রাস করতে হবে।
৪.বর্তমানে যে সঙ্ঘাতময় হার-জিতের খেলা চলছে, তার প্রশমনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫.জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনে আমরা গণতন্ত্র হারিয়েছি। এখন হারাতে বসছি দেশের অর্থনীতিও। দেশের অর্থনীতি এখন পঙ্গু হতে চলেছে। সেই সুবিধার অংশ কে পাচ্ছে? বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক গবেষণায় দেখা যায় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগ তো হয়নি, উল্টো বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে দেশ থেকে। টাকার অঙ্কে যা বৈদেশিক সাহায্যের চেয়েও বেশি। ভারত পঞ্চম প্রবাসী আয় সংগ্রহ করে বাংলাদেশ থেকে। সিপিডির এই বক্তব্য সঠিক হলে তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের।

সাত.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সরকারের স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিস প্রতিপক্ষ হিটলার তার ফলপ্রসূ প্রচারে কোন বিষয়গুলো ব্যবহার করছে তার অনুসন্ধান করে মোটামুটি সাতটি নিয়মের সন্ধান পায়। তার মূলে হলো মিথ্যাচার। এই স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিস পরে সিআইএ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সেই সাতটি মূলমন্ত্র অনুসরণ করছে। এই সাতটি নিয়ম হলো : ১. কখনো জনগণকে স্বস্তিতে থাকতে দেবে না, ২. নিজেদের ভুল বা অন্যায় কখনো স্বীকার করবে না, ৩. প্রতিপক্ষের কোনো ভালো স্বীকার করবে না, ৪. কখনো বিকল্পের কথা চিন্তা করবে না, ৫. কখনো নিজেদের দোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করবে না, ৬. কোনো সময় একজনের বেশি শত্রুর মোকাবেলা করবে না এবং তাকে সব অন্যায়ের জন্য দায়ী করবে, ৭. মানুষ বড় মিথ্যাকে অবশেষে গ্রহণ করে।
হিটলারের প্রচারের একটি স্তম্ভ ছিল বারবার একই জিনিস প্রচার করা। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন সাধারণত মানসিকভাবে মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা সম্ভব। এ ছাড়া নৈতিকতার বিষয়টি সবাইকে নাড়া দেয়। তাই কারো বিরুদ্ধে নৈতিকতাহীনতার অভিযোগ আনলে তা জনমানসে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। অভিযুক্ত যদিও প্রমাণ করতে সক্ষম হয় অভিযোগটি মিথ্যা, তবুও এই নৈতিকতাসংশ্লিষ্ট অভিযোগ মানুষের মনে রয়ে যায়।
দেশ, জাতি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যাতে কেউ কোনো আওয়াজ তুলতে না পারে সে জন্য আওয়ামী লীগ বিএনপিকে-জামায়াতকে নির্মূল করতে চায়। এভাবে একে একে সকল দেশপ্রেমিক শক্তিকে নির্মূল করে আওয়ামী সরকার একদলীয় বাকশাল কায়েম করে বাংলাদেশকে একটি করদ রাজ্যে পরিণত করছে। আওয়ামী লীগ বিরোধীমতশূন্য বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের হাত থেকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, রক্ষা করার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সহকারী সম্পাদক
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply