দেশের সংবিধানের ব্যবচ্ছেদ ও পুনর্লিখন

ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব|
দেশে এখন যে রাজনৈতিক সঙ্কট দেখা দিয়েছে তার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী। এ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এ সংশোধনীর ফলে সংবিধানে আরো এমন কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যার ফলে সাংবিধানিক জটিলতা আরো তীব্র সঙ্কটে পড়েছে। এর মধ্যে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা স্পষ্ট না করা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এ দিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুরে অবিরাম বলে চলেছেন, তারা সংবিধানের বাইরে যাবেন না। দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিক, সুশীলসমাজের ব্যক্তিবর্গ ও নাগরিকদের অনেকেই সংবিধান পুনর্লিখনের কথা বলেছেন। সংবিধানপ্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আওয়ামী লীগ নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছে; আর এখন সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। এটা জাতির সাথে প্রতারণা। আ স ম আবদুর রব বলেছেন, বর্তমান সংবিধান সম্পূর্ণ স্বৈরাচারী সংবিধান। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও প্রফেসর ডা: বদরুদ্দোজা চৌধুরীও একই মত ব্যক্ত করে চলেছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট তো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। বিশিষ্ট লেখক ফরহাদ মজহার বলেছেন, সংবিধান পুনর্লিখন ছাড়া সমস্যার সমাধান হবে না। ডেইলি নিউজের সম্পাদক নুরুল কবীর, প্রফেসর বদিউল আলম মজুমদার, প্রফেসর আসিফ নজরুল থেকে শুরু করে অনেকেই একই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে আওয়ামী লীগ সরকার শুরু থেকেই সংবিধানকে নিজেদের দলীয় স্বার্থে এবং ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য বারবার সংশোধন করে সঙ্কট তৈরি করেছে। সংবিধানে বড় আকারের সংশোধনী এনে (চতুর্থ সংশোধনী) আওয়ামী লীগ প্রথমবার দেশকে ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল। এখন আওয়ামী লীগের উদ্যোগে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আরেকবার জাতিকে সঙ্কটে ফেলা হয়েছে।
এবারে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনী প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা। এ পর্যন্ত সংবিধানের ১৫ দফা সংশোধনী ঘটেছে। কোনোটি প্রয়োজনে আবার কোনোটি করা হয়েছে অপ্রয়োজনে। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান কার্যকর করে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে প্রথম সংশোধনী (জুলাই ১৯৭৩), এর দুই মাস পর দ্বিতীয় সংশোধনী (২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩), তারপর আট মাসের মাথায় তৃতীয় সংশোধনী (২৮ নভেম্বর ১৯৭৪) এবং এর আট মাস পর চতুর্থ সংশোধনী (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) আনা হয়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধান কার্যকর করার পর মাত্র দুই বছর অতিক্রান্ত না হতেই সংবিধানের চারবার সংশোধনী আনে এবং চতুর্থ সংশোধনী দিয়ে সংবিধানের খোলনলচে পাল্টে ফেলে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গণপরিষদ কর্তৃক সংবিধান অনুমোদনের পর সংবিধানে চারবার সংশোধনী আনার ক্ষেত্রে এ বিষয়ে কখনোই জনগণের কোনো মতামত নেয়া হয়নি।
প্রথম সংশোধনী আনা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ও আত্মসমর্পণকৃত পাকিস্তানি সৈন্য ও তার সহযোগীদের বিচারের জন্য। বিস্ময়কর হলো, বাংলাদেশে গণহত্যায় লিপ্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের একজনেরও শেষ পর্যন্ত বিচার হয়নি। শেখ মুজিব এ বিচার করতে পারেননি; বরং ভারত সরাসরি পাকিস্তানের সাথে আপস-মীমাংসা করে পাকিস্তানি সৈন্যদের ফেরত দেয়। ফলে সংবিধান সংশোধন করে যে উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আইন করা হয় তা কাজে লাগেনি।
দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে মূল সংবিধানের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের প্রতি বিরাট আঘাত করা হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণয়ন ও তার আওতায় নিবর্তনমূলক আটকাদেশের ব্যবস্থা করার জন্য এ সংশোধনী আনা হয়। এর মাধ্যমে আইনটির অপপ্রয়োগ তথা বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর মতো কালো আইনের প্রবর্তন ও এর রাজনৈতিক অপপ্রয়োগের সূচনাটি তখনকার ক্ষমতাসীন মুজিব সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় সংশোধনীতে অবশ্য যুদ্ধ ঘোষণা, জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও সংসদ অধিবেশনের বিরতিকাল সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কয়েকটি সংযোজনী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
তৃতীয় সংশোধনী ছিল ভারতের স্বার্থে। এ সংশোধনীর সুবাদে ভারতের সাথে ১৬ মে ১৯৭৪ সালে এক চুক্তি করো হয় যার আওতায় বাংলাদেশের বেরুবাড়ী ইউনিয়ন ভূখ- ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ী ইউনিয়ন হস্তান্তরের বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারত থেকে যে দু’টি ছিট মহলের করিডোর পাওয়ার কথা ছিল অদ্যাবধি তা পাওয়া যায়নি। সুতরাং ওই সংশোধনীও বিশেষ কোনো কাজে লাগেনি।
চতুর্থ সংশোধনী ছিল শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগের আত্মপ্রবঞ্চনা ও জনগণের সাথে প্রতারণার বড় দলিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়। ওই দিন পার্লামেন্টে সংবিধানে ব্যাপকভিত্তিক এই সংশোধনী অনুমোদিত হয়। সংবিধানের মোট ১৫৩টি অনুচ্ছেদের ৩৭টিতে পরিবর্তন ও ৩টি নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়। এ ছাড়া ৩টি তফসিলেও সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীর ফলে সংবিধানের মূল চরিত্রই পাল্টে যায়। বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রপতিকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়ে নামমাত্র উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদ রাখা হয়। এমনকি আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত করে দিয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ তথা বাকশাল গঠন করা হয়। সব দল, সংগঠন এমনকি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের বাকশালে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা হ্রাস করে রাষ্ট্রপতিকে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা দেয়া হয়। সংবিধানে নাগরিকদের প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ব্যাপকভাবে খর্ব করা হয়। এক কথায়, দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের কবর রচিত হলো এমন নেতা ও তার দলের হাতে যারা দীর্ঘকাল গণতন্ত্রের মুখরোচক বাণী কপচে জনগণের হৃদয় জয় করেছিলেন। শেখ মুজিব একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক ও চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন বলেই প্রতীয়মান হয়।
সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন তথা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন আনয়নের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যেসব অনাকাক্ষিত ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে পঞ্চম সংশোধনীর দ্বারা তার বেশির ভাগেরই প্রতিবিধান করা হয়। এ ছাড়া রাষ্ট্রের মূলনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : ১. সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন; ২. রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ৮(১) অনুচ্ছেদে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র পরিবর্তে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ প্রতিস্থাপন। একই সাথে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হইবে যাবতীয় কার্যাবলীর ভিত্তি’ সংযোজন; (৩) ৮(১) অনুচ্ছেদের আরেক রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ‘সমাজতন্ত্র’-এর পরিবর্তে ‘সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার’ প্রতিস্থাপন; এবং ৪. ২৫(২) অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবে’Ñ মর্মে সংযোজন; ৫. ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর সাংবিধানিক বাধা অপসারণ এবং একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা বাতিল; ৬. সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক এখতিয়ার পুনঃবলবৎকরণ; ৭. সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনসংখ্যা ১৫ থেকে ৩০-এ বৃদ্ধিকরণ।
উল্লিখিত সংশোধনীগুলোর তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো সংবিধান তথা রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলামী চেতনার প্রাধান্য এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক চিন্তা ও বিশ্বাসের যে গুরুত্বপূর্ণ দিককে উপেক্ষা করেছিলেন, জিয়াউর রহমান ঠিক সে দুটোকেই সঠিক মূল্যায়ন করে তাকে যথাস্থানে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; অর্থাৎ জেনারেল জিয়া জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও চেতনা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন। এ দুটো বড় কাজের জন্য জিয়া জনগণের হৃদয় যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবেন।
জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের ব্যাপারে যে আন্তরিক ছিলেন তার প্রমাণ দিয়েছেন আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করার মাধ্যমে। তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল আওয়ামী লীগ। অথচ তারই উদ্যোগে আওয়ামী লীগ আবার পুনরুজ্জীবিত হয়। দেশের ইসলামী ও মুসলিম জাতীয়তাবাদী দেশগুলো জিয়াউর রহমানের কাছে বহুলভাবে ঋণী। তিনি পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র মূলত ইসলামী চরিত্র না দিলে রাজনৈতিক ময়দানে তাদের পুনরাবির্ভাব কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ত। অবশ্য এসব দল কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করেছে। জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর ব্যাপারে জনগণের মতামত নেয়ার জন্য গণভোটের আয়োজন করেন। আরো লক্ষণীয়Ñ ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি সংবিধানে সন্নিবেশিত করার বিষয়ে শেখ মুজিব জনগণের কোনো রায় নেননি; কিন্তু জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর ব্যাপারে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায়ের ব্যবস্থা করেন।
ষষ্ঠ (১০ জুলাই ১৯৮১) সংশোধনীর বিশেষ কোনো রাজনৈতিক তাৎপর্য নেই। রাষ্ট্রপতি জিয়ার নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। তখন তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত হওয়ার পর তার সদস্যপদ যাতে বাতিল হয়, সে জন্য সংবিধানের ষষ্ঠ সংশোধনী আনা হয়।
জেনারেল এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে চারবার সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়। সপ্তম সংশোধনীর (১০ নভেম্বর ১৯৮৬) মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬২ থেকে ৬৫ বছর করা হয়।
অষ্টম সংশোধনীর (৯ জুন ১৯৮৮) মাধ্যমে সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ দু’টি পদক্ষেপ নেন। প্রথমত, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সাংবিধানিক মর্যাদা প্রদান করেন আর দ্বিতীয়ত, দেশের বিভিন্ন স্থানে হাইকোর্টের ছয়টি স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা করেন। দুটো বিষয়ই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনায় মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে, যা সংযোজন করা হয়েছে সেই রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না সে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। রাজনৈতিক মহল ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এরশাদ রাজনৈতিক বৈধতা সঙ্কটে ভুগছিলেন। তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষের সহানুভূতি লাভের জন্য রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার কৌশল গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার মাধ্যমে তিনি দেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হননি। ইসলামী নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহারে এরশাদের কৌশল বলে উপলব্ধি করেছিলেন এবং সে জন্য তারা এ উদ্যোগে বিশেষ কোনো উৎসাহ প্রকাশ করেনি। বিএনপিও এরশাদের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়নি। আওয়ামী লীগ সেকুলার দল হিসেবে স্বাভাবিক কারণেই রাষ্ট্রধর্ম সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রবল বিরোধিতা করে। অষ্টম সংশোধনীর ব্যাপারে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত গ্রহণের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।
নবম সংশোধনীর (১১ জুলাই ১৯৮৯) মাধ্যমে উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি করে, তা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচনের বিধান করা হয়। এর মাধ্যমে এরশাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি রানিংমেট হিসেবে একই সাথে নির্বাচনের পদ্ধতি চালু করতে সচেষ্ট হন।
দশম সংশোধনী সংসদে অনুমোদিত হয় ১২ জুন ১৯৯০ সালে। এতে দুটো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন সংযোজন করা হয়। প্রথমত, জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য ৩০টি সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ আরো ১০ বছরের জন্য বর্ধিত করা হয়। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি বা উপরাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
একাদশ সংশোধনীর (১০ আগস্ট ১৯৯১) মাধ্যমে দেশের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে উপরাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষে সুপ্রিম কোর্টে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ সংশোধনীর ব্যাপারে সব দলের সম্মতি ছিল।
দ্বাদশ সংশোধনী সম্পাদিত হয় ১৯৯১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। এ সংশোধনী ছিল ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে বিলোপ করা হয়েছিল পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে তার আংশিক এবং দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তার পুরোটা পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সংবিধানের ৩৪টি অনুচ্ছেদ ও দুটো তফসিলের সংশোধন বা সংযোজন করা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রধানত মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় মূল নীতির পরিবর্তন ঘটানো হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতিশাসিত রাষ্ট্রকাঠামোতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির গঠনতন্ত্রেও প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। বৃহত্তম বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ বামপন্থী ও অন্যান্য ক্ষুদ্র দলের পক্ষ থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে সংশোধনীর কথা বলা হয়। বিএনপির জন্য বিষয়টি ছিল একটু স্পর্শকাতর; কারণ তাদের দলীয় প্রতিষ্ঠাতা ও দলের গঠনতন্ত্র সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে ছিল না। অবশ্য রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের মনোভাব বিবেচনা করে বেগম খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপি সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের লক্ষ্যে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী আনতে উদ্যোগ গ্রহণ করে। দেশের সংবিধানের যতগুলো সংশোধনী হয়েছে, তার মধ্যে দ্বাদশ সংশোধনী ছিল সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ও জাতীয় ঐক্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বসম্মতভাবে সেই দিন সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে। দেশের প্রধান দুটো বড় রাজনৈতিক দলের দুই নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা সেই দিন সংসদের লবিতে একত্রে ফটোসেশন করেন। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননও সেই দিন আনন্দে কোলাকুলি করেন, যা ছিল বিরল ঘটনা। বস্তুত দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে তার যাত্রা শুরু করে এবং জনগণের দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার বাস্তব রূপায়ণ ঘটে।
ত্রয়োদশ সংশোধনী বাংলাদেশের সংবিধান ও রাজনীতির ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি এ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তন করা হয়। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের জন্য ১৭৩ দিন হরতালসহ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। তাদের যুগপৎ আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি সংবলিত এ সংশোধনী আনতে বাধ্য হয়। এ পদ্ধতি বিশ্বের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি ব্যতিক্রমী নতুন সংযোজন। ইতোমধ্যে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে তিনটি নির্বাচন (১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে) অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে, যা দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। অবশ্য ১৯৯১ সালের নির্বাচনও কেয়ারটেকার সরকারের অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তখনকার বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের সরকার সাংবিধানিকভাবে কেয়ারটেকার ছিল না, বরং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
চতুর্দশ সংশোধনী আনা হয় ১৬ মে ২০০৪ সালে। এর মাধ্যমে সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনসংখ্যা ৩০ থেকে ৪৫-এ বৃদ্ধি করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বয়স ৬৫ বছর থেকে বৃদ্ধি করে ৬৭ বছর করা হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা ছাড়াও সংবিধানের রাষ্ট্রপরিচালনার মূল নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়ার নেতৃত্বে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে বাদ দিয়ে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাদ দিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে আবার সংযোজন করা হয়। তবে সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বহাল রাখা হয়। আবার অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ যে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন, তাও বহাল রাখা হয়। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে আবার সংযোজন করার বিষয়টি বিএনপি ও অন্য দিকে ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভের সঞ্চার করে। এ সংশোধনীতে আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নাগরিকেরা ‘বাংলাদেশী’ পরিচিত হবেন বলে স্বীকৃতি দেয়। এ ছাড়া অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলকে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য করা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে বেশ কিছু অনুচ্ছেদ পরিবর্তন-অযোগ্য এবং সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে এ সংশোধনী সংসদে অনুমোদিত হলেও তারা এত সব গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন আনয়নের ক্ষেত্রে জনগণের কোনো প্রকার মতামত নেয়নি। এ বিষয় জাতির সামনে তাদের কোনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও ছিল না। এমনকি এ সংশোধনী সংসদে উত্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট কমিটি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর নাগরিকদের সাথে আলোচনাকালে প্রায় সবাই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দিয়েছিল। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপেও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে ৮০ শতাংশের বেশি জনসমর্থন রয়েছে বলে দেখা যায়।
দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে অন্তত দু’বার তথা চতুর্থ ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতিকে সাংবিধানিক সঙ্কটে ফেলা হয়েছে। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যে একদলীয় স্বৈরশাসন চালু হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করে জাতিকে উদ্ধার করেছিলেন। এবার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই বাতিল নয়, আরো প্রায় ডজনখানেক সংশোধনী এনে সংবিধানকে আরো জটিল করে তোলা হয়েছে। আর এর বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের তীব্র আন্দোলন চলছে এবং জনগণও অধিকমাত্রায় সম্পৃক্ত হচ্ছে। এবারের সঙ্কট উত্তরণে আপাতত যদিও নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবিটিই সামনে এসেছে; কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট নিরসনে সংবিধানের পুনর্লিখন ছাড়া সহজ কোনো উপায় নেই। বাস্তবতা বলছে, সঙ্কট নিরসনের পথ অনেক বন্ধুর। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের পক্ষে দাবি আদায় করা কতটা সম্ভব হবে তা কারো জানা নেই। তবে তারা ক্ষমতায় যেতে পারলে সংবিধানের কী ধরনের সংশোধনী আনবেন তা এখনই জাতির সামনে তথা নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে স্পষ্ট করে বলা দরকার।

লেখক : বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব
ayubmiah@gmail.com

SHARE

Leave a Reply