দৈনিক সংবাদপত্রের কাঠামো -আযাদ আলাউদ্দীন

একটি সংবাদপত্র কিভাবে প্রতিষ্ঠা হয়, জনবল কাঠামো কিভাবে গড়ে ওঠে এবং কিভাবে পরিচালিত হয় এ বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। এই আলোচনাটি যারা সংবাদপত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের কাছে তেমন কোন গুরুত্ব বহন করবে না, কিন্তু যারা সংবাদপত্রের অন্দরমহল সম্পর্কে একেবারেই ওয়াকিফহাল নন তাদের এ বিষয়ে কিছুটা জানার পরিধি অর্জিত হতে পারে।

ডিক্লারেশন বা অনুমোদন
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে যদি কেউ দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করতে চান- প্রথমেই তাকে ডিক্লারেশন বা অনুমোদন নিতে হবে। এই অনুমোদনকারী অথরিটি হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি ফরম সংগ্রহ করে তা পূরণ করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসসহ জমা দিতে হয়। এসব ডকুমেন্টসের মধ্যে রয়েছে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার অফিস ঠিকানা- পত্রিকা মালিকের নিজস্ব না ভাড়া ভবন? যদি নিজস্ব হয়ে থাকে তাহলে জমির দলিল, আপডেট খাজনা আদায় রসিদসহ যাবতীয় কাগজপত্র। ভাড়া ভবনে হলে- স্ট্যাম্পে ভাড়াটিয়া চুক্তিপত্রের কাগজ। যে প্রিন্টিংপ্রেসে পত্রিকাটি ছাপা হবে তা পত্রিকা মালিকের নিজস্ব প্রেস না অন্যের প্রেস? সেই প্রেসের সাথে পত্রিকা ছাপানোর রেজিস্ট্রি চুক্তিপত্র থাকতে হবে। এরপর যিনি পত্রিকাটি সম্পাদনা করবেন তার পূর্ব অভিজ্ঞতা ও এসংক্রান্ত ডকুমেন্টস আবেদনের সাথে উপস্থাপন করতে হবে। এমনিভাবে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে সকল কাগজপত্রসহ জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করতে হয়। জাতীয় পত্রিকার জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় পত্রিকার জন্য স্ব স্ব জেলা প্রশাসক অনুমোদন দেন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- পত্রিকার নামের ছাড়পত্র। আবেদনের সময় একাধিক নাম প্রস্তাব করতে হবে। আপনার প্রস্তাবিত নামে সারাদেশে যদি অন্যকোন পত্রিকার অনুমোদন থেকে থাকে তাহলে আপনি একই নামে তা অনুমোদন পাবেন না। আপনার পছন্দের নামগুলো বাছাইয়ের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ডিএফপিতে প্রেরণ করবে জেলা প্রশাসন। সেখান থেকে নামের ছাড়পত্র নেয়া হবে।
সকল কাগজপত্র যাচাই বাছাই ও তদন্ত শেষে সবকিছু ওকে থাকলে পত্রিকার অনুমোদন দেবেন জেলা প্রশাসক। এই অনুমোদনের পর নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশ করতে পারবেন। ডিক্লারেশনের পর নিয়মিত প্রকাশিত পত্রিকা কয়েকটি সরকারি দফতরে প্রেরণের শর্ত থাকে। ওইসব দফতরে নিয়মিত প্রেরণ করতে হবে। জেলা প্রশাসক প্রদত্ত ডিক্লারেশনপ্রাপ্ত পত্রিকায় আপনি নিউজের পাশাপাশি প্রাইভেট ও বেসরকারি বিজ্ঞাপন ছাপাতে পারবেন কিন্তু কোনো সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপাতে পারবেন না। সরকারি বিজ্ঞাপন ছাপাতে হলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতর’ বা ডিএফপির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে ডিক্লারেশন পাওয়া পত্রিকাটি তিন মাস বা ৯০ দিন প্রকাশের পর ডিএফপির অনুমোদনের জন্য আবেদন করা যায়। ডিএফপিতে আবেদনের পর তথ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকদফা তদন্ত শেষে ডিএফপির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর পত্রিকায় সকল ধরনের খবর ও বেসরকারি বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি সরকারি বিজ্ঞাপনও ছাপা যায়।

প্রকাশক
একটি পত্রিকার প্রকাশকই মূলত মালিক। তার নামেই পত্রিকাটির অনুমোদন হয়। সাংবাদিকতার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলে প্রকাশক একই সাথে সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অথবা অভিজ্ঞ কোন সাংবাদিককে সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। প্রকাশকের পলিসি অনুযায়ীই পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারিত হয়। এই পলিসির বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করার সুযোগ সাংবাদিকদের থাকে না। অনেক পত্রিকার নেপথ্যে থাকেন বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ বা কোম্পানি। তারা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে মিডিয়ার প্রকাশক বানিয়ে অথবা নিজেরা প্রকাশক হয়ে সেই মিডিয়ার মাধ্যমে সমাজে ‘প্রভাব’ বিস্তারের চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন বহু উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে রয়েছে।

সম্পাদক
সম্পাদক একটি পত্রিকার কাণ্ডারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রকাশক কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে পত্রিকার পুরো টিমকে পরিচালনা করেন। তার অধীনস্থ সকল জনবলের নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করেন তিনি। যদিও পত্রিকা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাকে মালিকপক্ষের পলিসি ও পাঠকের প্রত্যাশা এই দুটি বিষয় খেয়াল রেখে কাজ করতে হয়। যা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। একই সাথে দু’পক্ষকে খুশি রাখা সহজ নয়। মালিকপক্ষের অবৈধ হস্তক্ষেপের বিপরীতে- পাঠকের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে অনেক সম্পাদককে চাকরি হারাতে হয়েছে।

একটি পত্রিকায় অনেকগুলো বিভাগ থাকে। যেমন:

নিউজ বিভাগ : নিউজ বিভাগটি পত্রিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। এই বিভাগে বার্তা সম্পাদক, সিটি এডিটর ও চিফ রিপোর্টারের নেতৃত্বে সেন্ট্রাল ডেস্কে কাজ করেন বিশেষ প্রতিবেদক, সিনিয়র রিপোর্টার ও নিজস্ব প্রতিবেদকরা। তারা সাধারণত অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট ভিত্তিক কাজ করেন। কখনো কখনো তারা নিজস্ব কৌশলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করে পত্রিকার সুনাম বৃদ্ধি করেন।

ফিচার বিভাগ : এই বিভাগটি নিউজ সেকশনেরই অংশ। একটি পত্রিকায় একাধিক ফিচার বিভাগ থাকে। এসব ফিচার পাতার দায়িত্বে থাকেন এক একজন বিভাগীয় সম্পাদক। তারা ফিচার পাতার মেকআপ করে বার্তাসম্পাদক ও সম্পাদককে দেখিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন নিয়ে ছাপার জন্য প্রেসে পাঠান। মফস্বল, আন্তর্জাতিক, খেলাধুলা, সাহিত্য পাতা সবকিছুর জন্য আলাদা আলাদা সম্পাদক থাকেন, তাদের অধীনে কাজ করেন বেশ কয়েকজন সাব-এডিটর। তারা এসব ফিচার পাতা তৈরিতে বিভাগীয় সম্পাদকদের সহায়তা করেন।

উপসম্পাদকীয় বিভাগ : প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদকীয় এবং উপসম্পাদকীয় প্রকাশের কাজটি সমন্বয় করে এই বিভাগ। এই বিভাগে কর্মরত সহকারী সম্পাদকরা নিজেরা যেমন লেখেন তেমনি কলামিস্টদের লেখা সংগ্রহ করে সম্পাদনার কাজটি করেন। পাঠকদের ‘চিঠিপত্র’ কলাম পাতাটিও উপ-সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাধীন।

কম্পিউটার বিভাগ : এই বিভাগে কর্মরত কর্মীরা সারাদেশ থেকে প্রেরিত নিউজ, ফিচার, এডিটোরিয়াল, পাঠকের চিঠিপত্র এবং অফিসে কর্মরত রিপোর্টার ও সাব-এডিটরদের সকল লেখা কম্পোজ করা, ছবি সেটিং, ক্যাপশন বসানোসহ পত্রিকার নান্দনিক মেকআপ বা অঙ্গসজ্জার যাবতীয় কাজ করে থাকেন।

সম্পাদনা সহকারী বা প্রুফ বিভাগ : প্রুফ রিডার বা সম্পাদনা সহকারীগণ পুরো পত্রিকায় প্রকাশিত নিউজ, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, ফিচার ও বিজ্ঞাপনের প্রুফ দেখা বা সঠিক বানানের বিষয়টি নিয়ে কাজটি করেন। একটি পত্রিকা নির্ভুলভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপনে এই বিভাগের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

মার্কেটিং বিভাগ : এই বিভাগের কর্মীরা পত্রিকার ‘রক্তসঞ্চালক’ হিসেবে কাজ করেন। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে পত্রিকার আয়ের পথ সুগম করেন তারা। একটি পত্রিকার আয়ের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপন। এই বিভাগের সক্রিয় ভূমিকা পত্রিকাটির ভালো থাকা কিংবা মন্দ থাকা নির্ভর করে। এখানে বিভিন্ন পদে বেশ কিছু জনবল কাজ করেন।

সার্কুলেশন বিভাগ : এই বিভাগ সারাদেশে পত্রিকা বিপণনের কাজটি করে থাকেন। সারাদেশের সকল বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পত্রিকার এজেন্সিগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করেন তারা। বিক্রি হওয়া পত্রিকার টাকা আদায়ের কাজটিও করে থাকেন এই বিভাগের কর্মীরা।

অ্যাডমিন বিভাগ : এই বিভাগের কর্মকর্তাদের কাজ হলো পত্রিকার সকল জনবলের নিয়োগপত্র প্রদান, ইনক্রিমেন্ট, এসিআর, পদোন্নতি, শোকজ, নিয়োগ বাতিল, আইডি কার্ড প্রদানসহ যাবতীয় প্রশাসনিক দিক দেখাশোনা করা। এইচআর বা হিউম্যান রিসোর্সের কাজটিও করে থাকে অ্যাডমিন বিভাগ। তাছাড়া কাগজ ক্রয় থেকে শুরু করে সকল ধরনের কেনাকাটার যে পারচেজ বিভাগ থাকে তারাও অ্যাডমিন বিভাগের অংশ।

হিসাব বিভাগ : পত্রিকার যাবতীয় আয়-ব্যয়ের দিকটি দেখাশুনা করেন এই অ্যাকাউন্টস বিভাগের কর্মীরা। তারা কর্মরত সকল স্টাফের অনুমোদিত বেতন-ভাতা প্রদান, বিজ্ঞাপন চেক গ্রহণ, কমিশন প্রদান, পরিবহনসহ যাবতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব সমন্বয় করেন।

প্রেস সেকশন : পত্রিকা ছাপানোর যাবতীয় দিক দেখাশোনা করে প্রেস বিভাগ। সার্কুলেশন বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী প্রেস বিভাগ প্রতিদিন প্রয়োজনীয় সংখ্যক পত্রিকা ছাপে। ছাপাখানা থেকে সার্কুলেশন বিভাগের চাহিদাপত্র অনুযায়ী রাতের মধ্যেই সারাদেশে সরবরাহ হয় পত্রিকা।

লেখক : বরিশাল ব্যুরো চিফ, দৈনিক নয়া দিগন্ত

SHARE

Leave a Reply